রাবণ ও রম্ভা – (রামায়নী প্রেমকথা) – সুধাংশরঞ্জন ঘোষ

October 22, 2021 | By Admin | Filed in: বিখ্যাত লেখকদের সাহিত্যে যৌনতা.

কৈলাস পর্বতের অ’মল ধবল তুষারের উপর কুন্দাভ কৌমুদীজাল ছড়িয়ে পড়েছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন শুভ্র বি’গলি’ত রজত প্রবাহ আকাশ হতে ঝরে পড়ে তরঙ্গায়িত হয়ে প্লাবি’ত করছে। সমগ্র পর্বতদেশকে। পর্বতগাত্র বন্ধুর বলে জ্যোৎস্নারাশি কোথাও শ্বেতােজ্জল, কোথাও ঘাের কৃষ্ণবর্ণ, আবার কোথাও বা ঈষৎ পিঙ্গলাভ। চন্দ্রকিরণসিক্ত পৰ্বাস্থিত একটি চন্দ্রকান্ত শিলার উপর বসে বি’শ্রাম গ্রহণ করেছিলেন রাবণ।

স্বর্গ ও মর্ত্যের মধ্যস্থল এই কৈলাস পর্বত। একে একে মর্ত্য ও পাতাল প্রদেশ জয় করে এসে এই কৈলাস পর্বতে কিছুদিনের জন্য বি’শ্রাম করছেন রণক্লান্ত রাবণ। এখান হতে এবার স্বর্গাভিমুখে রওনা হবেন তিনি। জয় করবেন একে একে স্বর্গের সকল দেবতাকে।

ত্রিভুবন জয়ের নেশায় এমনই মা’তাল হয়ে ছিল রাবণের মন যার জন্য প্রকৃতির কোনাে শােভা নিরীক্ষণ করবার কোন অ’বকাশই পাননি এতদিন। আজ পূর্ণিমা’ রজনী একথা ভুলেই গিয়েছিলেন তিনি।

আজ পূর্ণিমা’! পূর্ণচন্দ্রের প্রভায় উদ্ভাসিত সমগ্ৰ আকাশমণ্ডল। কিন্তু রাবণ লক্ষ্য করলেন পূর্ণচন্দ্রের সেই অ’মল আলােকমা’লা ঠিক তির্যকভাবে প্রতিফলি’ত হচ্ছে না পর্বতগাত্রে। চারিদিকের কল্পতরু ও পুন্নাগ বৃক্ষে প্রতিহত হচ্ছে তার গতি। বৃক্ষপত্ৰজর্জর ছায়াক্লি’ষ্ট চালােকের অ’র্ধতিমিরাবৃত রহস্যময়তায় চারিদিকের শােভা দেখতে দেখতে নিবি’ষ্ট হয়ে পড়ল রাবণের মন।

শুধু আজ নয়। বহুবার বহু জ্যোৎস্নাললাকিত রাত্রির শােভা দেখছেন রাবণ। কিন্তু চাঁদের আলাের মধ্যে এতখানি উজ্জ্বলতা কখনাে দেখেননি তিনি। চাদের আলাের এমন মা’দকতা অ’নুভব করেননি কোনদিন। চাঁদের ওই মা’দকতাময় আলাের প্রভাবেই তরুস্কন্ধে নিদ্রিত হয়ে পড়েছে ময়ুরকুল। তরুতলে তন্দ্রাহত হয়ে পড়েছে রতিক্লান্ত কোনাে এক মৃ’গদম্পতি।

সহসা রাবণও এক তীব্র মা’দকতার জ্বালা অ’নুভব করলেন সারা অ’ঙ্গে। আজ সন্ধ্যা হতে এখনাে এক বি’ন্দু কোনাে মা’ধুকীবারি পান করেননি রাবণ। তবু কেন এই মা’দকতা কিছুই বুঝতে পারলেন না তিনি।

ক্রমে সেই মা’দকতা পরিণত হলাে এক স্পষ্ট কামচেতনায়। এক জারজ উন্মা’দনার ঢেউ ফুলে ফুলে উঠতে লাগল তার প্রতিটি শিরায়। শােণিতকণিকারা মা’তাল হয়ে নাচতে নাচতে গা ভাসিয়ে দিল সেই ঢেউএর উপর। এক উগ্র নারীসঙ্গলি’প্সা অ’স্বাভাবি’ক রকমের অ’শান্ত করে তুলল তাকে।

যাঁর রমণাকাঙ্ক্ষাকে প্রীত করবার জন্য দশ সহস্র রমণী লঙ্কার প্রাসাদ অ’ন্তঃপুরে সতত প্রস্তুত, তিনি আজ স্বেচ্ছায় মা’সাধিককাল কোনাে রমণীসঙ্গ লাভ করেননি। একে একে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অ’তুলনীয় বীরত্ব প্রকাশ করে ত্রিভুবন জয় করতে চান তিনি। তার এই জয়ের পথে নারীসঙ্গ প্রতিকূলতার সৃষ্টি করতে পারে বলেই কোনাে নারীকে তিনি সঙ্গে নেননি তার জয়যাত্রার পথে।

জয়ের নেশায় তিনি এতদিন এমনই উন্মত্ত হয়েছিলেন যে নারীসঙ্গের কোনাে অ’ভাব কোনাে মুহূর্তে অ’নুভব করেননি। জয়ের চিন্তায় মন তার এমনই নিবি’ষ্ট ছিল যে কোনাে নারীর কথা ভাববার কোনাে অ’বকাশই পাননি তিনি।

উচ্ছঙ্খল ভােগবৃত্তির সঙ্গে সঙ্গে আত্মসংযমের এক অ’সাধারণ শক্তি লুকিয়ে আছে তার মধ্যে, একথা জীবনে প্রথম এবার উপলব্ধি করলেন রাবণ। রাজপ্রাসাদের বি’শাল রতিমন্দিরে অ’ফুরন্ত সুরাপানে মত্ত ও সহস্র রমণী পরিবেষ্টিত হয়ে আরামশয্যায় রাত্রিযাপনে যিনি অ’ভ্যস্ত, আজকাল সামা’ন্য শিবি’রে নিঃসঙ্গ রাত্রিযাপন করেও কোনাে ক্লেশ বা কোনাে জৈব অ’স্বস্তি অ’নুভব করেন না তিনি।

কিন্তু আজ প্রথম নৈশ নিঃসঙ্গতাটা’কে দুর্বি’ষহ মনে হলাে রাবণের। ললি’তকান্তা কোনাে নারীর স্পর্শসখ উপভােগ করবার জন্য এক অ’পরিসীম লালসায় উগ্র হয়ে উঠল তার সারা অ’ঙ্গ। ক্রমে যত নিবি’ড় হতে লাগল তার নারীচিন্তা, ততই তার দৃষ্টি হয়ে উঠল লালসাতুর, অ’ধরােষ্ঠ হয়ে উঠল অ’ধীর, ব্যগ্র হয়ে উঠল হা’ত দুটি।

উপরের দিকে মুখ তুলে ঊর্ধ্বে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন রাবণ। হয়ত কামনার এই অ’সহ্য পীড়ন হতে মনকে মুক্ত করতে চাইলেন তিনি। স্বর্গচিন্তায় তন্ময় করতে চাইলেন নিজেকে।

উপরে শুধুনীল আকাশ আর চাঁদের আলাে ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেলেন না রাবণ। কিন্তু স্বর্গলােক সন্দর্শনের জন্য সহসা ব্যাকুল হয়ে উঠলেন রাবণ। তিনি ক্ষণিকের জন্য একবার দেখতে চাইলেন, ওই নীল আকাশের ওপারে কোথায় শুভ্র সুগন্ধি পারিজাতবি’ভূষিত চিরবসন্তময় সেই স্বর্গোদ্যান যেখানে চিরহরিৎ তৃণসমা’চ্ছন্ন ভূমির উপর পুষ্পধনু হা’তে কামদেবতারা ইতস্ততঃ ঘুরে বেড়ায় আর কামগন্ধা অ’প্সরারা অ’ঙ্গের সুবাস ছড়িয়ে চলে নৃত্যের তালে তালে, দিব্যকান্তি দেবগণের অ’নন্ত যৌবনবি’ভুতিতে নিয়ত উজ্জ্বল থাকে যেখানকার দশদিক।

তিনি আরও দেখতে চাইলেন কোথায় সেই মণিমা’ণিক্যখচিত স্বর্ণসিংহা’সনােপরি উপবি’ষ্ট দেবরাজ ইন্দ্র যাঁর হস্তধৃত অ’গ্নিগর্ভ বজ্রের গর্জনে ত্রিভুবন কম্পিত হয়। | একে একে চন্দ্র সূর্যকে পরাভূত করে রাবণ জয় করবেন সেই সিংহা’সন। চূর্ণ করবেন দেবরাজ ইন্দ্রের সকল দম্ভ। কিন্তু কিছুই দেখতে পেলেন না রাবণ। ক্রমে অ’স্বচ্ছ হয়ে আসতে লাগল তার দৃষ্টি।

সহসা তার দৃষ্টিপথে এক নারীমূর্তি আবি’র্ভূত হলাে। বি’স্মিত হয়ে ভাবলেন, হয়ত ভুল দেখছেন তিনি। চন্দ্রালােকের মদির মা’য়াজালে বি’ভ্রান্ত হয়ে উঠেছে তার দৃষ্টি। অ’থবা হয়ত কামচঞ্চল চিত্তের বি’কার এক মা’েহিনী রূপ পরিগ্রহ করেছে ওই মূর্তির মধ্যে। | তবু একবার ভালভাবে নিরীক্ষণ করবার জন্য উঠে দাঁড়ালেন রাবণ। তিনি দেখলেন, ক্রমশঃ স্পষ্ট হতে স্পষ্টতর হয়ে উঠেছে সেই নারীমূর্তি। তখন সেই নারীমূর্তিকে আকর্ষণ করবার জন্য উধ্বে উৎক্ষিপ্ত করলেন তার বি’শাল একটি বাহু।

এত রূপ কোনাে নারীর মধ্যে এর আগে দেখেননি রাবণ। মা’নবী বা দানবী তাে দূরের কথা, কোনাে সুরকন্যা বা গন্ধর্বকন্যাদের মধ্যেও খুঁজে পাওয়া যায় না এমন রূপরম্যা বরতনু।

বি’স্ময়াহত হয়ে রাবণ জিজ্ঞাসা করলেন, কে তুমি নারী, এই নির্জন নিশীথে একাকী আকাশ পথে বি’চরণ করছিলে?

নারীমূর্তি উত্তর করলেন, আমা’র নাম রম্ভা। আগে অ’প্সরা ছিলাম। বর্তমা’নে আমি নল কুবেরের স্ত্রী। আমি তারই কাছে যাচ্ছি। কিন্তু আপনি কে? কেনই বা অ’কারণে আমা’র গতিরােধ করলেন?

রাবণ বললেন, আমি হচ্ছি লঙ্কার রাজা রাবণ।

রম্ভা বললেন, তাহলে আপনি কুবেরের ভ্রাতা। রাবণ গম্ভীরভাবে বললেন, তার সঙ্গে আমা’র বর্তমা’নে কোনাে সম্পর্ক নেই।

রম্ভা বললেন, কিন্তু লঙ্কার রাজপ্রাসাদ ছেড়ে কেন আপনি একা একা এই নির্জন পর্বতে বাস করছেন?

রাবণ বললেন, মা’সাধিককাল হলাে ত্রিভুবন জয়ে বার হয়েছি আমি। মর্ত্য ও পাতালের রাজাদের একে একে জয় করে কিছুদিনের জন্য আমি বি’শ্রাম করছি স্বর্গ ও মর্ত্যের মধ্যস্থল এই কৈলাস পর্বতে। এবার এখান হতে স্বর্গলােক অ’ভিযান করব। অ’মৃ’তগর্বী দেবতাদের সকল গর্ব আমি চূর্ণ করে আমা’র বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করব তাদের। তােমা’র স্বামী দেবতাদের কোষাধ্যক্ষ কুবেরও বাদ যাবেন না আমা’র কবল হতে।

কাতরকণ্ঠে অ’নুনয় করে রম্ভা বললেন, কিন্তু আমা’কে আপনি ছেড়ে দিন। আমি সামা’ন্যা নারী। আমি তাে আপনার সমযােদ্ধা কোনাে শত্রু বা জয়ের বস্তু নই। তবে কেন অ’কারণে আমা’র পথরােধ করলেন আপনি?

সশব্দে হেসে উঠলেন রাবণ, দশানন রাবণের মতাে রাজার অ’কারণে কোনাে কাজ করবার মতাে সময় বা শিশুসুলভ কোনাে প্রবৃত্তি নেই সুন্দরি।

তবে কি কারণে মহা’রাজ?

রাবণ বললেন, কারণটা’ খুবই সহজ সুন্দরি। মা’সাধিক কাল আমি যুদ্ধ-বি’গ্রহে ব্যস্ত আছি বলে কোনাে নারীসঙ্গ লাভ করতে পারিনি। নানাস্থানে পরিভ্রমণ করতে হয় বলে কোনাে নারীকে সঙ্গেও আনিনি। ত্রিভুবন জয়ের জন্য কর্ম ও চিন্তায় আমা’র সমগ্র দেহমন এমনই প্রবৃত্ত থাকে যে এসব কথা আমা’র মনে উদয়ই হয় না। আজ সন্ধ্যায় উপত্যকা প্রদেশের ওই শিলাখণ্ডের উপর একাকী বসেছিলাম। কিন্তু চন্দ্রালােকের মধ্যে কি মা’য়ামদিরতা আছে জানি ন, সহসা আমা’র চিত্ত কামচঞ্চল হয়ে উঠল প্রবলভাবে। নিজের মনে তখন ভাবতে লাগলাম, হরপার্বতী-অ’ধ্যুষিত এই ভয়ঙ্কর কৈলাসপর্বতে যার ত্রিসীমা’নাতে কোনাে দানব বা কিন্নর। পর্যন্ত আসে না ভয়ে, কোথায় পাব সেই নারী যে আমা’র এই দুর্দমনীয় প্রবৃত্তিকে পরিতৃপ্ত করবে। এমন সময় আমা’র দৃষ্টিপথে পতিত হলে তুমি অ’প্রত্যাশিতভাবে।

কথা শেষ করে আবার তেমনি জোরে হা’সতে লাগলেন রাবণ। তার বি’কট অ’ট্টহা’সির শব্দে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠতে লাগল দুপাশের তুষারধবল স্তব্ধ দুটি গিরিশৃঙ্গ। স্খলি’ত হয়ে যেতে লাগল রম্ভার ভীতিবি’হুল বক্ষের প্রতিটি পঞ্জর।

রাবণ বললেন, মনে হচ্ছে স্বয়ং ভাগ্যলক্ষ্মীও আমা’য় ভয় করেন সুন্দরি। তাই আমা’য় তৃপ্ত ও তুষ্ট করবার জন্য তিনিই তােমা’য় পাঠিয়ে দিয়েছেন আমা’র কাছে। আমা’র মনে হচ্ছে সুদূর স্বর্গ হতে স্বয়ং কামদেবতা এই চন্দ্রালােকিত রাত্রিতে আমা’য় ফুলশর হেনে কামজৰ্জর করেই পরমুহূর্তে ভয়ে কৌশলে তােমা’য় পাঠিয়ে দিয়েছেন আমা’র সেই কামজ্বালা নিবারিত করবার জন্য।

ভয়ে কাঁপতে লাগলেন রম্ভা।

রম্ভা আবার কাতরকণ্ঠে বললেন, দয়া করে আমা’য় ছেড়ে দিন। আমা’র স্বামী আমা’র জন্য পথ চেয়ে আছে। আমি গিয়ে তার অ’ঙ্কশায়িনী না হলে নিদ্রাসুখ উপভােগ করতে পারবেন্ নাতিনি। আমি গিয়ে তার অ’ঙ্গ স্পর্শ না করলে চক্ষুপল্লব মুদ্রিত হবে না তার।

রাবণ বললেন, আমা’র কামনাকে অ’তৃপ্ত রেখে কিছুতেই তােমা’র স্বামীর অ’ঙ্কশায়িনী হতে দেব না তােমা’য়। তােমা’র মতাে নারীকে একবার কাছে পেয়ে ছেড়ে দিয়ে কেমন করে এই উতল রাত্রি যাপন করব সুন্দরি!

রম্ভা বুঝলেন, তার আর পরিত্রাণ নেই। তিনি বুঝলেন দশ সহস্র রমণীর অ’শ্রু যার কঠিন হৃদয়কে দ্রবীভূত করতে পারেনি সেই নিষ্ঠুর নিষ্করুণ রাবণের কাছে অ’নুনয়-বি’নয় করা বৃথা।।

নীরবে তাই অ’শ্রুবি’সর্জন করতে লাগলেন রম্ভা।

রম্ভাকে বাহুদ্বারা আবদ্ধ করে কাছে টেনে নিলেন রাবণ। বললেন, সুন্দরী নারী আমি অ’নেক দেখেছি, কিন্তু তােমা’র মতাে স্বাস্থ্যবতী নারী আমি খুব কম দেখেছি রম্ভা। তােমা’র মতাে সুন্দরী ও স্বাস্থ্যবতী ললনাকে কখনাে কুবেরের পাশে মা’নায় না। আমা’র মতাে বীর পুরুষই তােমা’র একমা’ত্র যােগ্য পাত্র।

রম্ভা কোনাে কথা বললেন না। ক্রোধে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে রইল তার।

রাবণ বললেন, সত্যিই তুমি অ’বি’কল্প সুন্দরী রম্ভা। রক্তকোকনদের পাপড়ি অ’পেক্ষা কোমল ও রক্তাভ তােমা’র অ’ঙ্গ। তােমা’র আকর্ণবি’শ্রান্ত অ’ক্ষিযুগল হরিণচক্ষু অ’পেক্ষা উদার ও আয়ত। চন্দ্রালােকপ্রতিবি’ম্বি’ত কৈলাসের শুচিশুভ্র পাষাণফলকের মতাে অ’মল ও উজ্জ্বল তােমা’র গণ্ডভিত্তি।

রম্ভার সেই অ’মল গণ্ডভিত্তির উপর দৃঢ় চুম্বনের এক অ’নপনেয় কলঙ্করেখা টেনে দিলেন রাবণ। সঙ্কোচে ও শঙ্কায় হতবাক হয়ে বসে রইলেন রম্ভা।

রাবণের কোনাে কাজের বি’রুদ্ধে প্রতিবাদ করবার মতাে শক্তি বা সাহস কিছুই নেই তার। তাই নিজেরই অ’ন্তর্নিহিত অ’ফুরন্ত ঘৃণার গরলে নিজেই জর্জরিত হতে লাগলেন তিনি। নিষ্ফল ক্রোধের আগুনে নিজেই জ্বলতে লাগলেন মনে মনে।

রম্ভার আলুলায়িত ঘনকৃষ্ণ কেশগুচ্ছের উপর মৃ’দু হস্ত সঞ্চালন করে রাবণ বললেন, অ’মন সন্নতাঙ্গী হয়ে নীরবে বসে আছ কেন সুন্দরি ? অ’ত সঙ্কোচ ও দুঃখের কারণ কি। এ তাে উল্লসিত হবার কথা। সারা ত্রিভুবনের শ্রেষ্ঠ নরপতি ও বীর আজ নতজানু হয়ে তােমা’র কাছে ভিক্ষা চাইছে, এ কি কম গৌরবের কথা তােমা’র পক্ষে! স্বর্ণময় সুমেরু পর্বতের হিরন্ময় শৃঙ্গ অ’পেক্ষা গৌরবময় ও সমুন্নত তার রাজমুকুট তােমা’র পদতলে আজ লুণ্ঠিত।

সত্যসত্যই রম্ভার সামনে নতজানু হলেন রাবণ।

রাবণ বললেন, মা’নিনী ওঠ। আর মা’ন করাে না। উঠে ভালাে করে আমা’র পানে চেয়ে দেখাে, স্বর্গ ও মর্তের মধ্যে এত বড় শক্তিশালী বীর জীবনে কখনাে দেখেনি। সেই অ’তুলনীয় বীরের সংস্পর্শে তােমা’র জীবনকে ধন্য করাে, সার্থক করাে। আমা’র অ’ফুরন্ত শক্তির মা’ধুর্যকে তােমা’র দেহের মধ্য দিয়ে উপভােগ করাে।

তবু মুখ তুলে একবার চাইলেন না রম্ভা রাবণের পানে!

রাবণ বললেন, একথা কেন ভুলে যাচ্ছ মা’নিনী, বসুন্ধরার মতাে নারীও বীরভােগ্যা। স্থাবর জঙ্গমা’ত্মক এই বি’শাল বসুন্ধরা একমা’ত্র তারই পদানত হতে চায় যে তার শৌর্য বীর্য দ্বারা আর সকলকে পরাজিত করে অ’পরাজেয় হয়ে উঠেছে নিজে।

সুন্দরি, মুখ তুলে একবার দেখাে, আমি সেই অ’পরাজেয় পুরুষ।

রাবণ একটু থেমে রম্ভাকে একবার চকিতে দেখে নিয়ে আবার বলতে লাগলেন, বসুন্ধরার মতাে সকল নারীই একমা’ত্র বীরপুরুষের কাছে দেহমন সমর্পণ করতে চায়। এই সমর্পণের মধ্য দিয়েই তারা পায় জীবনের চরম আনন্দ আর চুড়ান্ত সার্থকতা। আয়তাক্ষী, একবার চোখ মেলে দেখাে, আমি সেই বীর।

তবু মুখ তুলে একবার চাইলেন না রম্ভা। রম্ভার চিবুকে হা’ত দিয়ে তার মুখখানিকে কিছুটা’ তুলে ধরলেন রাবণ। তারপর বললেন, কি অ’নিন্দ্যসুন্দর এই মুখমণ্ডল! প্রস্ফুটিত পদ্মের চেয়েও সুন্দর। পৃথিবীর কোনাে সুন্দর বস্তুর সঙ্গে উপমিত হতে পারে না এ মুখ। এই মুখই হচ্ছে পৃথিবীর সকল সুন্দর বস্তুর উপমা’স্থল।

তারপর রম্ভার বক্ষঃস্থল হতে বনাঞ্চলটিকে অ’পসারিত করে তার শােভা দেখতে লাগলেন রাবণ।

রাবণ বললেন, তােমা’র পীনােত বক্ষের শােভা বড় চমৎকার। দুটি সুবর্ণ পর্বতশৃঙ্গের মতােই উত্তুঙ্গ তােমা’র স্তনদ্বয়। তােমা’র কটিদেশ যেমন ক্ষীণ তেমনি জঙঘাদ্বয় বি’পুল ও সুবর্তুল। উরুভাগ কদলী তরুর ন্যায় কোমল ও স্নিগ্ধ। তােমা’র জ্বলতার বি’লাসমা’ধুর্য কন্দর্পের ফুলধনু অ’পেক্ষা বকুটিল ও মা’দকতাময়।

রম্ভার নাভিদেশের বসনগ্রন্থির উপর রাবণ হস্তস্থাপন করতেই রম্ভা সরােষে তা ঠেলে দেবার চেষ্টা’ করলেন।

সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে আপনার মনে বলে চললেন রাবণ, বর্ষারম্ভে নব মেঘমা’লার গভীর মধ্বনিতে পর্বত কন্দর হতে বি’চ্ছুরিত যে উজ্জ্বল রত্নশলাকার দ্বারা চারিদিক উদ্ভাসিত হয় তার থেকেও শতগুণে উজ্জ্বল তােমা’র অ’ঙ্গলতিকা।

রাবণের প্রতি অ’পরিসীম ঘৃণা অ’নুভব করছিলেন রম্ভা। তবু রাবণের কথাগুলাে শুনতে তার ভালাে লাগছিল। অ’দ্ভুত রকমের এক নিগুঢ় পুলক অ’নুভব করছিলেন অ’ন্তরের নিভৃতে। এর আগে অ’প্সরা থাকা কালে অ’নেকে উপভােগ করেছে তার দেহটা’কে। তারপর তার স্বামী প্রেমদ্বারা প্রীত ও অ’লঙ্কত করেছেন তার মনটা’কে। কিন্তু কেউ কখনাে রাবণের মতাে অ’কুণ্ঠ প্রশংসাবাক্য দ্বারা তার দেহের প্রতিটি অ’ঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গৌরবান্বি’ত করেনি এমন করে।

তবু তার সেই নিগৃঢ় পুলককে বাইরে প্রকাশ করলেন না রম্ভা। রম্ভা যথাসাধ্য কঠোরতার সঙ্গে বললেন, মৃ’ণাললােলুপা মরালী যেমন মরুস্থলীয় কোননা বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট হয় না, আমিও তেমনি আমা’র স্বামী ছাড়া অ’ন্য কোনাে পুরুষে আসক্ত হতে পারব না।

কিন্তু আমি তাে যে-সে পুরুষ নয়। বি’চিত্র রত্নখচিত ইন্দ্রের যে বি’পুল ইন্দ্রধনুর দ্বারা বৃত্রাসুর নিহত হয়, যার কোদণ্ডটঙ্কারে ত্রিভুবন কম্পিত হয়, আমা’র ক্রোধস্ফুরিত কুটি সেই ইন্দ্রধনু অ’পেক্ষা ঢের বেশি ভয়ঙ্কর।

ভয়ে ভয়ে রম্ভা বললেন, আপনি বড় দেহবাদী মহা’রাজ। এই মা’টির দেহ আর মা’টির পৃথিবী ছাড়া আপনি আর কিছুই জানেন না। আপনি জানেন না যে, মা’টির এই মর্ত্যভূমির উর্ধ্বে আছে অ’মৃ’তময় এক অ’মর অ’বি’নশ্বর আত্মা’।

রাবণ হা’সলেন। হেসে উড়িয়ে দিতে চাইলেন রম্ভার কথাটা’কে।

রম্ভা তবু বললেন, আপনি শুধু দেহের শক্তি আর দেহের সৌন্দর্যটা’কেই বড় করে দেখেন। তাই বুঝতে পারেন না, আপনারই অ’ফুরন্ত দেহের শক্তির অ’পরিসীম চাপে আপনার আত্মা’ পিষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

রাবণ আবার হা’সলেন, আমি আত্মা’ ও দৈব শক্তিতে বি’শ্বাস করি না। রম্ভা বললেন, আপনি দেহের শক্তিতে হয়তাে দেবতাদের থেকে বড় হতে পারেন, কিন্তু তারা যে অ’ষ্টগুণে ও যােগৈশ্বর্যে ভূষিত আপনার তা নেই। তাদের আত্মিক সুষমা’ ও আধ্যাত্মিক মহিমা’ আপনি কোনােদিনই লাভ করতে পারবেন না।

রম্ভার দেহটা’কে নিজের দেহের কাছে সবলে আকর্ষণ করে রাবণ বললেন, এই দেহই জীবনে একমা’ত্র সত্য সুন্দরি। দেহকেই জীবনে সবচেয়ে বড় বলে মনে করি বলেই দেহের এই অ’ফুরন্ত শক্তি ও সম্পদ লাভ করেছি আমি।

রাবণ সহসা গম্ভীর হয়ে বললেন, স্বর্গে মতে পাতালে যেখানে যাবে দেখবে এই দেহই সত্য। জীবনের যত কিছু রঙিন উচ্ছ্বাস তা শুধু এই দেহের পাত্রকে অ’বলম্বন করেই। তাই জীবনে যতদিন বাঁচতে চাই এই দেহটা’ অ’বলম্বন করেই বাঁচতে চাই। এই দেহ যদি এতই তুচ্ছ ও মূল্যহীন তাহলে কেন তােমা’র দেবতারা দেহ ধারণ করেন? কেন তারা দেহের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের দ্বাৰা ভােগ করেন জীবনকে? অ’প্সরাদের নিয়ে নৃত্যগীত সহ আনন্দ উৎসবেই বা উন্মত্ত হয়ে ওঠেন কেন এমনভাবে?

তাছাড়া তুমি আত্মা’র শক্তিতে এতই যদি বি’শ্বাসী হও তাহলে আমা’র এই দেহের শক্তিকে এই মুহুর্তে খণ্ডন করে কেন মুক্ত করতে পারছ না নিজেকে ?

রম্ভাকে নির্মমভাবে আলি’ঙ্গন করে এক অ’দ্ভুত শৃঙ্গার আসনে বসলেন রাবণ। শৃঙ্গারকলাবি’শারদ রাবণের শৃঙ্গারচাতুর্যে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন রম্ভা।

রাবণ বললেন, শুধু তুমি নও, দুদিন পরে তােমা’র দেবতারাও আমা’র কবল থেকে মুক্ত করতে পারবে না নিজেদের। একে একে ব্যর্থ হবে তাদের আত্মা’র সমস্ত সুষমা’। ভূলুণ্ঠিত হবে তাদের আধ্যাত্মিক মহিমা’।

রম্ভা বললেন, আপনি অ’ন্যায়ভাবে পরনারীকে ধর্ষণ করছেন। এই পাপকর্মের জন্য আপনাকে একদিন প্রতিফল পেতেই হবে।

রাবণ বললেন, পাপ-পুণ্যে বি’শ্বাস করি না আমি। কিছুদিন আগে নরকে গিয়ে আমি নিজের হা’তে সমস্ত পাপীদের মুক্ত করেছি। আমি বাহুবলে জয় করেছি তােমা’দের ধর্মরাজকে।

রাত্রি যত গভীর হতে লাগল, কৈলাসের তুহিনশীতল পাষাণফলক শীতলতর হয়ে উঠতে লাগল তত অ’বি’রাম শিশিরপাতে! প্রথম প্রথম শৈত্য অ’নুভব করছিলেন রম্ভা তার সারা দেহে। কিন্তু রাবণের দেহের শিরায় শিরায় উষ্ণ রক্তের যে ঢেউ বয়ে যাচ্ছিল তার তাপে রম্ভার দেহটা’ও তপ্ত হয়ে উঠছিল ক্রমশঃ।

রম্ভার স্পষ্ট মনে হলাে, ধীরে ধীরে কোথায় যেন বি’লীন হয়ে যাচ্ছে তার সমস্ত শৈত্যানুভূতি। চোখে দেখতে না পেলেও সারাটি রাত ধরে রম্ভা শুধু রাবণের দেহের উষ্ণচঞ্চল রক্তস্রোতের অ’জস্র লীলালহরীকে অ’নুভব করতে লাগলেন নিজের দেহের মধ্যে।

শেষরাত্রির দিকে স্তিমিত হয়ে আসতে লাগল চাদের আলোে৷ হিমশীতল জড়তায় কেমন যেন জমা’ট বেঁধে উঠতে লাগল সারা পৃথিবী। দূর আকাশের চাঁদের দিকে নিমেষহা’রা দৃষ্টিতে চেয়েছিলেন রম্ভা। একটু পরেই ঐ চাদ অ’স্ত যাবে। | রম্ভা ভাবলেন, চঁাদের মধ্যে কলঙ্ক আছে বলেই হয়ত চাদ তার স্নিগ্ধনিবি’ড় এক রহস্যময় কিরণজালের দ্বারা সবার সব কলঙ্ককে আচ্ছন্ন করে রাখে সারারাত। কিন্তু যখন এই চাদ আর কিরণ দান করবে না আকাশে, স্পষ্ট দিবালােকে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে যখন দশদিক তখন এই কলঙ্ককে কেমন করে কোথায় লুকিয়ে রাখবেন, কিছুই ঠিক করতে পারলেন না রম্ভা। জগতের সব প্রচ্ছন্ন বস্তুকে নির্মমভাবে প্রকাশিত করে তােলে যে সৌরালােক, সে আলােক কি তার দেহের এই অ’নপনেয় কলঙ্ককেও উদঘাটিত করে তুলবে না সকলের কাছে?

অ’শুভারাক্রান্ত হল রম্ভার আঁখি উৎপল। রাবণ বললেন, চাঁদের দিকে অ’মন করে একদৃষ্টে চেয়ে আছ কেন সুন্দরি? আমি তাে কই একটিবারও চাঁদকে দেখছি না। আমা’র কাছে তুমি চাঁদের থেকে অ’নেক বেশি সুন্দর। তাছাড়া আমি দুদিন পরেই চন্দ্র ও সূর্যকে জয় করব একে একে। চূর্ণ করব তাদের সমস্ত দম্ভ।

রম্ভা কোনাে উত্তর দিলেন না।

রাবণ বললেন, তার চেয়ে আমা’কে ভালাে করে চেয়ে দেখ। সমস্ত অ’ভিমা’ন ও আশঙ্কা মন হতে ঝেড়ে ফেলে দেহ দিয়ে দৃষ্টি দিয়ে উপভােগ করাে আমা’র দেহের এই অ’তুলনীয় ঐশ্বর্যকে। 

আমি মনে করি জগতে শক্তিই একমা’ত্র নীতি, শক্তিই প্রকৃত সত্য, শক্তিই প্রকৃত সৌন্দর্য। ভালাে করে নিরীক্ষণ করলে দেখবেচাদের সৌন্দর্য অ’পেক্ষা আমা’র দেহের শক্তি অ’নেক বেশি সত্য ও সুন্দর। শক্তিই ধর্ম কারণ এই শক্তির উপরেই নির্ভর করছে সকল জীবের জীবন। পৃথিবীতে যার শক্তি বেশি আছে সেই বেঁচে থাকবে। চারি পাশের ছােট ছােট গুল্ম ও গাছগুলি’কে বঞ্চিত করে বেশিমা’ত্রায় রস শােষণ করেই এতখানি বি’রাট হয়ে বেড়ে উঠেছে ঐ সব বনস্পতির দল। অ’ধিকতর বলবান প্রাণীরা দুর্বল প্রাণীদের দ্বারা উদর পূরণ করেই বেঁচে থাকে। সমুদ্র হচ্ছে মর্ত্যের সম্পদ। কিন্তু মর্ত্যের সকল মা’নব ও দানবকে বঞ্চিত করে সেই সমুদ্র হতে উথিত অ’মৃ’ত ভােগ করে অ’মর হয়ে উঠেছে অ’ষ্টবি’ধ গুণে ভূষিত তােমা’র প্রিয় দেবতারা।

সৃষ্টির পর হতে এই বি’শ্বের যদি ইতিহা’স লেখা হয় তাহলে দেখবে সে ইতিহা’স হচ্ছে শশাষণ ও শক্তির একাধিপত্যের ইতিহা’স।

রম্ভা দেখলেন ভাের হয়ে আসছে। ভােরের স্বচ্ছ আলাে উকি মা’রছে কল্পতরু শাখার ফাকে ফাকে।

রম্ভা করুণ কণ্ঠে বললেন, এবার উষাকাল সমা’গত। আপনি আমা’য় মুক্তি দিন মহা’রাজ।

রাবণ বললেন, না, যে উদ্দেশ্যে তােমা’য় আবদ্ধ করেছি আমি, সে উদ্দেশ্য আমা’র এখনাে সার্থক হয়নি। তােমা’র দ্বারা যে প্রবৃত্তিকে আমা’র চরিতার্থ করতে চাই, তা এখনাে তৃপ্ত হয়নি।

রম্ভা বললেন, যে পবি’ত্র কৈলাস পর্বত দেবাদিদেব মহা’দেবের নিবাস-ভূমি তারই একটি অ’ংশে এমন ভাবে পরনারী ধর্ষণ করে আর কলঙ্কিত করবেন না সে পর্বতের পবি’ত্রতাকে।

তাচ্ছিল্যভরে হা’সলেন রাবণ। হা’সতে হা’সতে বললেন, তার পবি’ত্রতা বহু আগেই বি’নষ্ট হয়েছে সুন্দরি।

কথাটা’ বুঝতে না পেরে বি’স্মিত হয়ে রাবণের পানে চেয়ে রইলেন রম্ভা।

রাবণ বললেন, এই কৈলাস পর্বতেই একদিন মহা’যােগী মহা’দেবের কামা’েন্মা’দনা জেগেছিল অ’নিন্দ্যসুন্দরী পার্বতীর প্রতি। পরে এই উন্মত্ততায় অ’ন্ধ হয়ে তিনি তাকে বি’বাহ করে একশত বৎসর ধরে তার সঙ্গে শৃঙ্গার করেছিলেন এই পর্বতে।।

রম্ভা বললেন, কিন্তু তিনি বি’বাহের পর বি’ধিমত ধর্মপত্নীর সঙ্গেই সহবাস করেছিলেন। রাবণ মৃ’দু হেসে বললেন, আমি স্বীকার করি তিনি বি’বাহ করেছিলেন, কিন্তু বি’বাহের আগেই তিনি কামা’বি’ষ্ট হয়েছিলেন পার্বতীর প্রতি। সে বি’বাহ ধর্মভাবের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না, প্রতিষ্ঠিত ছিল কামভাবের উপর।

সুন্দরি যদি ইচ্ছা করাে, তাহলে আজ আমিও তােমা’য় বি’বাহ করতে পারি। এক মিথ্যা ধর্মভাবের প্রলেপ দিয়ে পরিশুদ্ধ করে তুলতে পারি আমা’র প্রবৃত্তিটা’কে। শিউরে উঠলেন রম্ভা। তা দেখে বি’জয় গর্বে হা’সলেন রাবণ।

হেসে বললেন, অ’বনতাঙ্গি, তুমি শুধু দেবচরিত্রের একটা’ দিকই দেখছ। তাই তাদের সম্বন্ধে পক্ষপাতিত্বমূলক মনােভাব পােষণ করছ। কিন্তু তুমি তাদের চরিত্রের আর একটি দিকের কথা জান না, একদিন সৃষ্টিকর্তা পিতামহ ব্রহ্মা’র মধ্যে চিত্তবি’কার ঘটেছিল। আপন কন্যা অ’মলধবলকান্তি সরস্বতীর প্রতি কামা’র্ত হয়ে দৃষ্টিপাত করেছিলেন। দেবরাজ ইন্দ্র একদিন কেমন করে গৌতমপত্নী অ’হল্যাকে ধর্ষণ করেছিলেন সে কথা নিশ্চয়ই অ’বি’দিত নেই তােমা’র।

রম্ভা বললেন, একটা’ কথা ভুলে যাচ্ছেন, কামদেব কন্দর্পের পঞ্চবাণে জর্জরিত হয়েই ব্রহ্মা’ অ’মনভাবে কামা’র্ত হয়ে উঠেছিলেন সহসা। আর কঠোর তপস্যার দ্বারা গৌতম দেবতােক অ’ধিকার করবেন এই ভয়ে দেবতারা দেবরাজ ইন্দ্রকে মর্ত্যে পাঠিয়েছিলেন গৌতমের মধ্যে ক্রোধ সঞ্চার করে তার তপস্যার ফল বি’নষ্ট করতে। 

তাচ্ছিল্যভরে আবার বি’কট শব্দে হেসে উঠলেন রাবণ। বললেন, তুমি আমা’য় হা’সালে সুন্দরি। দেবতারা চিরকাল এমনি চতুর। তারা তাদের উচ্ছঙ্খল কামপ্রবৃত্তিকে ঢাকা দিয়ে সাধু সাজবার জন্য চিরকালই এমনি করে কামদেবের উপর সব দোষ চাপিয়ে দিয়ে আসেন। তাদেরি দুর্মর নির্লজ্জ কামপ্রবৃত্তির এক মনগড়া প্রতীক ছাড়া কামদেব আর কেউ নয়।

দেবরাজ সম্বন্ধে তুমি যে কথা বললে সে কথাও সত্য নয় সুন্দরি। তুমি যে কারণ দেখালে তা যদি সত্য হতাে তাহলে আমি বলব তার স্ত্রীকে ধর্ষণ না করেও দেবরাজ অ’ন্য কোনােভাবে ক্রোধ সঞ্জাত করতে পারতেন গৌতমের মধ্যে।

আর কোনাে কথা বললেন না রম্ভা। রাবণ চুপকরে রইলেন। বেলা প্রথম প্রহর অ’তীত হলে রম্ভাকে কিছুক্ষণের জন্য মুক্তি দিলেন রাবণ।

রম্ভাকে মুক্তি দিয়ে আকাশগঙ্গা মন্দাকিনীর জলে স্নান করতে গেলেন রাবণ। গিয়ে। দেখলেন, বড় মধুর ঝঙ্কারে নৃত্য করতে করতে ছুটে চলেছে খরস্রোতা মন্দাকিনী। দুই তীর হতে মন্দার কুসুম ঝরে পড়ছে তার জলে। চারিদিকে মধুগন্ধী ফুলের প্রাণমা’তানাে সৌগন্ধে মা’তােয়ারা হয়ে উঠেছে বসন্তের মদিনরাজ্জ্বল বাতাস। 

মন্দাকিনী জলে স্নান করে তীরে উঠে অ’গ্নিদেবের পূজা করলেন রাবণ। পূজা শেষে প্রজ্বলি’ত অ’গ্নিকে ঘিরে নৃত্য করতে লাগলেন আপন মনে।

অ’দূরে একটি শিলাখণ্ডের উপর বসে মন্ত্রমুগ্ধবৎ একদৃষ্টিতে সব কিছু দেখতে লাগলেন রম্ভা। যতক্ষণ পর্যন্ত না রাবণ তাকে যাবার অ’নুমতি দেবেন ততক্ষণ কোথাও যেতে পারবেন না তিনি। রাবণের বি’রুদ্ধে কাজ করবার কোনাে শক্তিই নেই তার।

তাই নীরবে নিতান্ত অ’সহা’য়ভাবে বসে রইলেন রম্ভা। কিন্তু সকল দেবতাকে বাদ দিয়ে কেবলমা’ত্র অ’গ্নিদেবের কেন পূজা করছেন রাবণ কিছুই বুঝতে পারলেন না।

জিজ্ঞাসা করতে রাবণ বললেন, আমি একমা’ত্র অ’গ্নির উপাসক। এই অ’গ্নিই হচ্ছে জীবন, অ’গ্নিই পৌরুষ। অ’গ্নি যে তেজ উৎপন্ন করে সেই তেজের দ্বারাই জীবন ধারণ করি আমরা। অ’গ্নির অ’ভাবই মৃ’ত্যুর কারণ।

রম্ভা তবু বুঝতে পারলেন না রাবণের কথাটা’।

রাবণ বললেন, সকল মা’নব দেহের মধ্যেই অ’গ্নির একটি বি’শেষ স্থান আছে। কিন্তু নারীদের মধ্যে অ’গ্নি অ’ধিকতর প্রবলভাবে বি’রাজমা’ন। তাই নিবি’ড় নারীসঙ্গের মধ্য দিয়ে আমা’র পৌরুষের উত্তাপ ও প্রাণশক্তির তেজকে বাড়িয়ে নিই মা’ঝে মা’ঝে। রাবণের কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে গেলেন রম্ভা।

রাবণ আরও বললেন, সকলেই বলে, রাবণের মতাে নারীদেহ লােলুপ আর কেউ কোথাও নেই। কিন্তু তারা আমা’র জীবনের প্রকৃত রহস্য জানে না। তারা জানে না, নারীদেহের মধ্য দিয়ে এমনি করে আমা’র এক দেহা’তীত প্রয়ােজনকে সিদ্ধ করি আমি। শুধু দেহগত তৃপ্তিই নারীসঙ্গলাভের একমা’ত্র উদ্দেশ্য নয় আমা’র। এর বাইরেও আরও একটা’ বড় উদ্দেশ্য আছে। | নারীধর্ষণের আমা’র আর একটি উদ্দেশ্য হলাে শত্রুর উপর প্রতিশােধ। তাদের সবচেয়ে প্রিয়বস্তুকে জোরপূর্বক অ’ধিকার ও ভােগ করে তাদের উপর অ’দ্ভুত রকমের এক প্রতিশােধ গ্রহণ করি আমি। তাই শত্রনারী ধর্ষণ করে শত্রুকে জয় অ’থবা বধ করার চেয়ে বেশি আনন্দ পাই। শত্রনারীধর্ষণের মধ্য দিয়ে ঘােষিত হয় আমা’র এক অ’ভিনব বি’জয় গৌরব।

রম্ভা নীরব হয়ে বসে রইলেন।

বেলা দ্বি’প্রহর হতে রম্ভাকে নিয়ে আবার শৃঙ্গার আসনে বসলেন রাবণ।

এখন মধ্যাহ্নকাল। কারণ এখন সূর্য ঠিক মধ্য আকাশে অ’তুলনীয় উজ্জ্বলতায় বি’রাজ করছে। জ্বলন্ত অ’গ্নি যেমন বর্ণহীন, এখন সূর্যও তেমনি বর্ণহীন। এখনকার মতাে রৌদ্র আর কখনাে প্রখর হয় না। রৌদ্র যেমন প্রখর হয়ে ওঠে এখন, তেমনি বৃক্ষছায়াও হয়ে ওঠে স্নিগ্ধ ও ঘনশ্যাম। বায়ুস্তর ক্লান্ত ও নিস্তরঙ্গ থাকে এই সময়।

রাবণ বললেন, মধ্যরাত্রির মতাে শান্ত স্তব্ধ এই দ্বি’প্রহরও এক মহা’লগ্ন। শৃঙ্গার কার্যের জন্য এই সময় সবচেয়ে প্রশস্ত।

লজ্জারক্ত মুখমণ্ডলের উপর আপন বস্ত্রাঞ্চলখানিকে চেপে ধরলেন রম্ভা। কোনাে কথা বললেন না।

রাবণ বললেন, আমি বৈদিক যােগশাস্ত্র পাঠ করে দেখেছি। তুমি হয়তাে শুনে আশ্চর্য হয়ে যাবে, আমা’র মতে শৃঙ্গারও এক প্রকারের যােগ। সমস্ত যােগক্রিয়ার লক্ষ্য হলাে, বি’ভিন্ন স্তর অ’তিক্রম করে সমা’ধির স্তরে উন্নিত হওয়া। এই সমা’ধি হলাে এমন এক উচ্চতম সাধারণ উপলব্ধির স্তর যেখানে যােগী তার আরাধ্য বস্তুর সঙ্গে এক গুণগত মিলন লাভ করে।

রম্ভার বি’স্ময়কে আরও বাড়িয়ে দিয়ে রাবণ বললেন, সার্থক শৃঙ্গারও হচ্ছে ঠিক তাই। এতে দুটি দেহ বস্তুগত ভিন্নতা সত্ত্বেও এক গুণগত মিলন লাভ করে। দুটি দেহের শিরায় শিরায় বইতে থাকে তখন একই উষ্ণ রক্তের প্রবাহ। একই অ’নুভূতির মধুর শিহরণে রােমা’ঞ্চিত হতে থাকে দুটি মন। তখন আমা’র আনন্দ হবে তােমা’র আনন্দ। তােমা’র বেদনা হবে আমা’র বেদনা।

প্রথম প্রথম রাবণের কথাটা’ বুঝতে না পেরে সত্যিই বি’স্ময় অ’নুভব করছিলেন রম্ভা। | তারপর সেই বি’স্ময়ের ভাবটা’ আপনা হতে কেটে যেতে তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারলেন, প্রেমহীন আত্মা’হীন রাবণের বি’পুল দেহের জড় অ’স্তিত্বভার তার দেহের সব চেতনা ও অ’নুভূতিকে গ্রাস করে ফেলছে।

রাবণ তাঁর অ’প্রতিরােধ্য গায়ের জোরে তার দেহের প্রতিটি অ’নুভূতি সঞ্চারিত করে দিতে লাগলেন যেন রম্ভার দেহের মধ্যে। রম্ভার নিজস্ব অ’নুভূতি বলতে যেন এখন আর কিছুই রইল না

রম্ভা চোখ মেলে চেয়ে দেখলেন, সম্ভোগজনিত এক অ’দ্ভুত পুলকচিহ্ন ফুটে উঠেছে রাবণের সারা মুখমণ্ডলে। সেই পুলকেরই দুরন্ত শিহরণে চঞ্চল হয়ে উঠেছে তার প্রতিটি অ’ঙ্গ -প্রতঙ্গ।

এবার স্পষ্ট অ’নুভব করলেন রম্ভা, তারও প্রতিটি অ’ঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অ’স্থিমজ্জার গভীরে অ’দ্ভুত রকমের এক পুলকোদগম হতে শুরু করেছে। অ’নাস্বাদিতপূর্ব সেই পুলকের রহস্যকে কে যেন সঞ্চারিত করে দিচ্ছে তার দেহের প্রতিটি শিরায়। এ পুলক এ রহস্য জীবনে এর আগে কখনাে কোনােদিন অ’নুভব করেননি রম্ভা। | রম্ভার মনে হলাে, এ রহস্যের বর্ণ আছে। এ পুলকে মা’ধুর্য আছে। এ রহস্যের রঙিন স্পর্শে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে তার দেহের রক্তস্রোত। আর সেই স্রোতের নির্মম আঘাতে ক্রমশঃ শিথিল হয়ে পড়েছে তার সমস্ত নীতিচেতনা।

রাবণের প্রতি ঘৃণা ভাবটা’ ক্রমশঃ ক্ষীণ হয়ে গেল রম্ভার।

নিজের মুখখানা নিজে দেখতে না পেলেও রম্ভার মনে হলাে, বসন্তের নবমঞ্জরী-সমুল্লসিত রক্তালশাকতরুর মতাে রঙে রসে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে সে মুখমণ্ডল। ফুল্লকুসুমিত কুঞ্জলতার মতাে সমৃ’দ্ধ হয়ে উঠেছে তার অ’ঙ্গলতিকা।

রাবণের দেহের সঙ্গে নিজের দেহের সাযুজ্য লাভ করার সঙ্গে সঙ্গে রাবণের মনটা’কে জানতে ইচ্ছা হল রম্ভার। মনে হতে লাগল, আত্মা’ যাক, মন বলে কি কোন জিনিস নেই রাবণের? কঠোর পৌরুষদৃপ্ত এই বি’পুল স্থূল দেহভারের অ’ন্তরালে এতটুকুও কি নেই কোনাে সূক্ষ্মসুন্দর মনের মা’ধুরী!

ভাবতে গিয়ে আশ্চর্য হয়ে গেলেন রম্ভা। কি করে এমন হয়! এত বি’শাল যাঁর দেহসম্পদ, এমন অ’পরিসীম যাঁর দেহৈশ্বর্য, মনের দিকে হতে এতখানি কাঙাল তিনি কেমন করে হলেন! রাবণের প্রতি এক গােপন মমতা অ’নুভব করলেন মনে মনে।। | সহসা কি মনে হলাে একবার জিজ্ঞাসা করে ফেললেন রম্ভা। আচ্ছা মহা’রাজ, আপনি কি জীবনে কাউকে কখনাে ভালবাসেননি? অ’ন্য কেউও কি ভালবাসেননি আপনাকে?

রাবণ হা’সলেন, সদর্পে বললেন, ভালবাসায় বি’শ্বাস করি না আমি। আমি কখনই বি’শ্বাস করব না, কেউ কাউকে সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে ভালবাসতে পারে। আমরা শুধু নিরন্তর নিজেকে খুঁজে চলেছি অ’পরের মনের মধ্যে। যখনি যার কর্ম ও চিন্তার সঙ্গে আমা’দের কর্ম ও চিন্তার কোনােরূপ সাদৃশ্য খুঁজে পাই,তখনি তাকে আমরা প্রেমা’স্পদ বলে গ্রহণ করি। আমরা অ’পরের মধ্যে নিজেকেই ভালবাসি অ’ন্যরূপে। তাছাড়া মা’নবজগতের কথা ছেড়ে প্রকৃতি জগতের দিকে চেয়ে দেখ, সেখানেও কেবল শক্তিরই প্রাধান্য। প্রেম ভালবাসার কোন স্থান নেই। বৃক্ষ কাউকে ভালবেসে ফল দান করে না; তার কাছে গিয়ে তার শাখাবাহু থেকে জোর করে তা ছিড়ে নিতে হয়।নদী কখনাে নিজে থেকে জলদান করে না ; তার বুকে গিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে তুলে আনতে হয় সে জল। বসুন্ধরা তার বুকের গভীরে যে ফসল রাখে ত কর্ষণ করে জোর করে বার করতে হয়। অ’ন্ধকার রাত্রিতে শত কাদলেও চন্দ্র বা সূর্য এক ফোটা’ কিরণ দান করে না কোনাে আর্ত পথিককে। |

সুন্দরি, আমি শক্তির উপাসক। শক্তি দিয়ে সব কিছুকে জয় করে নিতে চাই। প্রেম দ্বারা বশীভূত করে নয়। শত ভালবাসার বি’নিময়েও কোনাে নারী কখনাে তার দেহের সমস্ত সুষমা’ নিঃশেষে উজাড় করে দেয় না কোনাে পুরুষকে। একমা’ত্র কোনাে ধর্ষকাম পুরুষই তার বি’পুল দেহশক্তির দ্বারা নির্দয়ভাবে উপভােগ করতে পারে সে সুষমা’কে। বহু সুন্দরী নারীকে নতজানু হয়ে কাতরভাবে অ’নুনয় বি’নয় করে দেখেছি কোনাে ফল হয়নি! জোর করে তা আদায় করে নিতে হয় তাদের কাছ থেকে।

সন্ধ্যা হয়ে এলাে। তবু আজ পূর্ণিমা’র পরদিন বলে চাঁদ উঠল না। একটু পরে উঠবে। তাই তরল অ’ন্ধকার তত ঘন হয়ে ওঠেনি।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রাবণ বললেন, কারাে কাছ থেকে আমি কোনাে ভালবাসা না চাইলেও আমা’র মনে হয় একজন আমা’য় ভালবাসে। সে হচ্ছে আমা’র প্রধানা মহিষী মন্দোদরী। সকলেই আমা’র শক্তিকে ভয় করে। আমা’র কর্মকে ঘৃণা করে। একমা’ত্র মন্দোদরী আমা’র সমস্ত ত্রুটি-বি’চ্যুতি সত্ত্বেও আমা’য় ভালবাসে। মঙ্গল কামনা করে আমা’র কায়মনােবাক্যে। আমা’র মৃ’ত্যুতে সকলেই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবে। শুধু একজনের বুক ফেটে বেরিয়ে আসবে একটি সকরুণ দীর্ঘশ্বাস। আমা’র মৃ’ত্যুতে ভারমুক্ত হবে ত্রিভুবন; কিন্তু তাতে শুধু অ’ন্তহীন ব্যথাভারে ভারাক্রান্ত হয়ে উঠবে একটি হৃদয়।

রম্ভার এতক্ষণে মনে হলাে, রাবণের মনের সন্ধান পেয়েছেন যেন তিনি সহসা। কথায় কথায় রাবণের মনের অ’নেক কাছে এসে পড়েছেন যেন।

সাহসে ভর করে রম্ভা বললেন, কিন্তু আপনি কেন সকলকে ভালবেসে যেতে পারেন না। মহা’রাজ? অ’ন্যের সঙ্কীর্ণতায় আপনি কেন অ’নুদার হয়ে ওঠেন। আপনার জানা উচিত যে যত বেশি ক্ষুদ্র ও সংকীর্ণ সে তত বেশি স্বার্থপর।

রাবণকে চুপ করে থাকতে দেখে রম্ভা বললেন, আমি বুঝতে পারি না মহা’রাজ, আপনার দেহের মতাে মনটা’ও কেন বলি’ষ্ঠ হয়ে ওঠেনা। আপনার ওই বি’স্তৃত বক্ষপটের মতাে প্রসারিত কেন হয় না আপনার আত্মা’। আপনার অ’ফুরন্ত শক্তির মতাে প্রেমও কেন অ’ফুরন্ত হয়ে ওঠে আপনার অ’ন্তরে।

শক্তি দিয়ে নয়, প্রেম দিয়ে সব কিছুকে জয় করে চলুন মহা’রাজ। এমন অ’ফুরন্ত হয়ে উঠুক আপনার প্রেমের উৎস যাতে সকলকে অ’কাতরে দিয়েও তা ফুরিয়ে যাবে না কখননা। এতদিন ত্রিভুবন শুধু দেহের ঐশ্বর্য দেখে ভীত হয়ে এসেছে মহা’রাজ রাবণের। এবার তারা তার অ’ন্তরের ঐশ্বর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে যাক। তা যদি করেন তাহলে আপনার মৃ’ত্যুতে শুধুমন্দোদরী নয়, সমগ্র ত্রিভুবন অ’শ্রু বি’সর্জন করবে শশাকে।

মুক্তানি স্বেদবি’ন্দু দেখা যাচ্ছিল রতিক্লান্ত রম্ভার ললাটে। রম্ভার সেই স্বেদাঙ্কুরচিত্রিত ললাটে একটি মৃ’দু চুম্বন করে রাবণ বললেন, তুমি যতই চেষ্টা’ করাে না কেন কুটিলাক্ষি, তুমি আমা’য় ধর্মা’ন্তরিত করতে পারবে না। কিছুতেই আমা’র মত বা পথের কোনাে পরিবর্তন হবে না। সে বি’জয় অ’ভিযানে আমি বার হয়েছি তা সম্পন্ন করবই। 

কৃত্রিম রােষস্ফুরিত কণ্ঠে রম্ভা বললেন, শক্তির ধ্বজা উড়িয়ে যতই আপনি সব কিছুকে জয় করে বেড়ান, একটা’ কথা সব সময় মনে রাখবেন, আসলে কিন্তু কেউ আপনাকে ভয় করে । আপনিই ত্রিভুবনের সকলকে ভয় করেন। এই ভয়ই আপনার অ’দম্য জিগীষার কারণ।

জগতের যে-কোনাে বস্তু বা ব্যক্তি সহসা প্রবল হয়ে আপনার প্রভুত্বকে খর্ব করে ফেলবে এই ভয়েই আপনি আপনার শক্তির পরীক্ষা দিয়ে চলেছেন সকলের কাছে।

পরদিন সকালে আবার মন্দাকিনীর জলে স্নান করতে গেলেন রাবণ।

রম্ভা কিন্তু আজ আর যাবার কথা বললেন না। সারাদিন রাবণের সঙ্গে প্রণয়কলাপে মত্ত হয়ে যাপন করলেন। 

একবার দুজনে সেই তুষারশৃঙ্গপরিবৃত উপত্যকা প্রদেশ ছেড়ে পর্বতের সানুদেশে এক গভীর অ’রণ্যে প্রবেশ করলেন।

রম্ভা কেবল বারবার বসন্তপ্রকৃতির বি’ভিন্ন শােভার প্রতি রাবণের দৃষ্টি আকর্ষণ করবার চেষ্টা’ করতে লাগলেন।

রম্ভা একবার বললেন, ওই দেখুন মহা’রাজ, অ’চিরােগত তাম্রাভ নবপল্লবগুচ্ছে ঈষদানত সহকারতরু লজ্জাবতী যুবতীর মতাে বায়ু-ভরে কেমন কাঁপছে। কিংশুক ও কর্ণিকার কুসুমের বর্ণসমা’রােহে কেমন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে সমস্ত বনভূমি। সুগন্ধি শিলাজতুসৌরভে আমা’েদিত হয়ে উঠেছে কেমন সানুদেশের শিলাপটনিচয়।

রাবণ সে সব কিন্তু কিছুই দেখলেন না। তিনি কেবল অ’নুরাগান্ধ হৃদয়ে সুরতােৎসবে মত্ত হয়ে রম্ভাকে আলি’ঙ্গন করলেন।

রম্ভা বললেন, ছিঃ মহা’রাজ, আপনি কি চিত্তকে একবারও নিষ্কাম করে তুলতে পারেন না?

য়ে একবার চারিদিকের সুন্দর দৃশ্যাবলীর দিকে চেয়ে থাকন । নিবি’ড় সৌন্দর্যেপলব্ধি ধীরে ধীরে প্রসারিত করে তুলবে আপনার মনকে। আপনার মনের সমস্ত কালি’মা’ ও সংকীর্ণতা দূর হয়ে যাবে একে একে।

রাবণ বললেন, তুমি যা বললে, আমা’র ক্ষেত্রে কিন্তু ঠিক তার উল্টো হয় সুযৌবনা। নিবি’ড় সৌন্দর্যোপলব্ধি শুধু আমা’র ভােগলালসাকে বাড়িয়ে তােলে। তােমা’র মুখচ্ছবি’বি’শিষ্ট, রূপ রস বর্ণ গন্ধ সমন্বি’ত ওই সব কুসুমরাজি ও মধুমত্ত ভ্রমরের কলমধুর গুঞ্জরণ আমা’র কামচেতনাকে ক্রমশই অ’দম্য ও অ’শান্ত করে তুলছে সুন্দরী।

সন্ধ্যার প্রাক্কালে আবার সেই উপত্যকাপ্রদেশে ফিরে এলেন দুজনে।

রাবণ বললেন, আগামীকাল সন্ধ্যায় তিন দিন তিন রাত্রি পূর্ণ হবে। যদিও তােমা’র সঙ্গলি’ঙ্গাকে কোনােমতে প্রশমিত করতে পারছিনা অ’ন্তরে তথাপি ঐ সময় মুক্তি দেব তােমা’য়। আমিও তারপর স্বর্গাভিমখে অ’ভিযান করব।

একটি শিলার উপর বসেছিলেন রম্ভা। চলে যেতে হবে ভেবে অ’ন্তরের নিভৃতে সূক্ষ্মনিবি’ড় একটা’ ব্যথা অ’নুভব করছিলেন কোথায় যেন।

এদিকে একমনে রসাল চুতমঞ্জরীনির্মিত একরকমের মদ্য পান করছিলেন রাবণ। তার মধ্যে কোনাে ভাবান্তর লক্ষ্যগােচর হলাে না রম্ভার। | রম্ভা বললেন, একবার চেয়ে দেখুন মহা’রাজ, কেমন নিঃশব্দ নিশ্ৰুপ পদক্ষেপে অ’ন্ধকার নেমে আসছে পৃথিবীতে। এখন অ’ন্ধকার যেমন তরল ও অ’গভীর, বাতাস স্থির ও অ’চঞ্চল। আবার উন্নত ঋজুশীর্ষ দ্রুমশ্রেণীও তেমনি প্রশান্ত গম্ভীর।

রাবণ বললেন, প্রকৃতির মধ্যে সবকিছুকেই তুমি শান্ত ও সুন্দর দেখছ সবসময়। কিন্তু আমা’র হৃদয় কেন শান্ত হচ্ছে না সুন্দরি? আমি তােমা’য় ঠিক দেখাতে পারছিনা, আমা’র বুকের ভিতর কেমন এক দানবি’ক ঝড় বয়ে যাচ্ছে যেন সব সময়।

শাস্তকণ্ঠে রম্ভা বললেন, ও ঝড় আপনার অ’দম্য ভােগলালসার ঝড় মহা’রাজ। ভােগের মধ্য দিয়ে কখনাে ভােগ বাসনাকে নিবৃত্ত করতে পারা যায় না; তাতে আরও তা বেড়েই যায়। একমা’ত্র ত্যাগ ও সংযমের দ্বারাই ও ঝড়কে আপনি শান্ত করতে পারেন।

রম্ভার কোনাে কথা শুনলেন না রাবণ। কোনাে বাধা-নিষেধ বা সদুপদেশ প্রতিনিবৃত্ত করতে। পারল না দুরন্ত রাবণকে।

রম্ভাকে নিয়ে আবার শৃঙ্গারে মত্ত হয়ে উঠলেন রাবণ। তার এই অ’স্বাভাবি’ক মত্ততা দর্শনে বি’স্মিত হয়ে পড়লেন রম্ভা।

রাবণ বললেন, আসন্ন বি’চ্ছেদ আমা’য় কোনরূপ ব্যথাতুর না করে কেবল আমা’র ভােগ বাসনাকে প্রবল করে তুলছে সুন্দরি। যখনি ভাবছি, কাল তােমা’য় ত্যাগ করতে হবে, তখনি তােমা’র দেহ সম্ভোগের জন্য এক অ’সহ্য উন্মা’দনা অ’নুভব করছি।

রম্ভা বললেন, ইচ্ছা করলে আমা’কে আপনি মুক্তি নাও দিতে পারেন মহা’রাজ। ত্রিজগতের দশসহস্র রমণীকে যেমন বলপূর্বক বন্দী করে রেখেছেন আপনার রাজ-অ’ন্তঃপুরে তেমনি আমা’কেও রেখে দিতে পারেন।

রম্ভার কণ্ঠে কোথায় ক্ষোভ ছিল তা বুঝতে পারলেন রাবণ। বললেন, না সুন্দরি, তাদের হতে তুমি স্বতন্ত্র। তাদের সঙ্গে তােমা’র তুলনা করা চলে না। তাদের মতাে তােমা’কে কিছুতেই বন্দী করে নিয়ে যেতে পারব না আমি। বি’চ্ছেদের পরও জীবনে তােমা’র কথা কোনদিন ভুলব না আমি। বি’স্ময়স্ফুরিত কণ্ঠে রম্ভা বললেন, কিন্তু কেন, কোনদিক থেকে তাদের হতে স্বতন্ত্র আমি মহা’রাজ?

রাবণ বললেন, কার্যকারিতার মধ্য দিয়েই সকল বস্তুর মূল্যকে আমি বি’চার করি। আমা’র কাছে কোনাে বস্তুততখানি সত্য ও সুন্দর যতখানি তা আমা’র কোনােনা-কোনাে প্রয়ােজন সিদ্ধ করতে পারে। যুদ্ধকালে আমি এই সব বৃক্ষশাখা ও পর্বত শৃঙ্গ উৎপাটিত করে অ’স্ত্ররূপে ব্যবহা’র করি বলেই এরা আমা’র কাছে সত্য। যে নারীর সৌন্দর্যকে আমি আমা’র পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে নিঃশেষে ভােগ করতে পারি একমা’ত্র সেই নারীই আমা’র কাছে সুন্দর। যেফুল হতে উত্তম পুষ্পসার মদ্য প্রস্তুত হয় একমা’ত্র সেই ফুলের সুষমা’কেই স্বীকার করি আমি। অ’ন্য সব নারী থেকে তুমি সর্বপেক্ষা বেশি আনন্দ আমা’য় দান করেছ বলেই অ’বি’স্মরণীয় হয়ে থাকবে তুমি আমা’র মনে।

তীব্র ঘৃণায় নাসিকাটি কুঞ্চিত হয়ে উঠল রম্ভার। ক্ষুন্নকণ্ঠে বললেন, আপনি এত নীচ! আপনি কি কখনাে আপনার সংকীর্ণ প্রয়ােজনচেতনার উর্ধ্বে উঠতে পারেন না? | রাবণ কোনাে কথা বললেন না। রম্ভা আবার বললেন, আপনি বি’ধাতার এক অ’দ্ভুত সৃষ্টি। আত্মা’, আদর্শ, নীতি, ধর্ম প্রভৃতি মা’নবসভ্যতার যা কিছু শ্রেষ্ঠ দান আপনি তাদের শ্রেষ্ঠত্বে কোনােদিন বি’শ্বাস করবেন না। শুধু অ’ন্ধ বর্বর জৈবশক্তির দ্বারা প্রবলভাবে স্পন্দিত এক বি’পুল জড়শক্তি ছাড়া আপনি আর কিছুই নন।

নিতান্ত উদাসীনভাবে রাবণ বললেন, হয়তাে তাই।

পরদিন রম্ভাকে সত্যসত্যই মুক্তি দিলেন রাবণ। কিন্তু নির্দয়ােপভুক্তা রম্ভাকে দেখে চেনাই যাচ্ছিল না। দশনাঘাত আলেখিত ক্লান্ত মুখমণ্ডলের চারিদিকে ইতস্ততঃ ছড়িয়ে পড়েছে করবীবন্ধনবি’মুক্ত আলুলায়িত অ’লক-লতা। নিষ্ঠুর বি’মর্দনে সব শােভা হা’রিয়ে ম্লান হয়ে উঠেছে তার কুঙ্কুমা’ক্ত স্তনট। হেমসূত্রগ্রথিত রত্নময় যে রশনাদামে বি’ভূষিত ছিল তার নিতম্ববি’ম্ব তা এখন শশাচনীয়ভাবে ছিন্নভিন্ন।

মন্দাকিনীজলে দেহ প্রক্ষালন করে আবার কমনীয়কান্তি হয়ে উঠলেন রম্ভা। তারপর নতমুখে বি’দায় চাইলেন রাবণের কাছে।

রাবণ বললেন, আকাশ যেমন অ’ত্রিমুনির তেজ ধারণ করেছিল, মন্দাকিনী যেমন ধারণ করেছিল মহা’দেবের অ’নলনিহিত রৌদ্র তেজ, তেমনি তুমিও আমা’র অ’শেষ শক্তিসম্পন্ন তেজ ধারণ করতে সক্ষম হয়েছ তােমা’র গর্ভে। কিন্তু তাতে তােমা’র কোনাে সশ্রদ্ধ ইচ্ছা ছিল না বলে কোনাে সন্তান উৎপন্ন হবে না তার থেকে।

রম্ভা তেমনি চুপ করে নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি বি’ষন্ন না উৎফুল্ল তা বােঝা গেল না তাকে দেখে।

রাবণ বললেন, আমি বহু নারীসংসর্গ করি বলে আমা’র তেজ অ’মা’েঘ নয়। তা না হা’েক। আমি সন্তান চাই না। আমি চাই শুধু আমা’র দেহতৃপ্তি। তুমি আমা’র দেহকে আনন্দ দান করেছ। এতে আমি বি’শেষ সন্তুষ্ট হয়েছি তােমা’র প্রতি। দেহই আমা’র কাছে সব। এই দেহ ধারণের আগে বা পরে জীবন হচ্ছে এক মিথ্যা শূন্যতা। আত্মা’ ও অ’মরত্বে আমি বি’শ্বাস করি না।

লােকে বলে দেহের মৃ’ত্যুর পর আত্মা’ অ’মর হয়ে বেঁচে থাকে। কিন্তু কোথায় সেই আত্মা’। আকাশে বাতাসে কোনাে মৃ’তব্যক্তির একটি আত্মা’র অ’স্তিত্বকেও তাে আমি দেখতে পাচ্ছি না। কই, কেউ তাে তারা আমা’দের মতাে সুখ দুঃখ ভােগ করছে না। ভালাে করে চেয়ে দেখ, দেখবে উজ্জ্বল সৌরকিরণচ্ছলে কোনাে অ’মর আত্মা’ হা’সছেনা। তৃণাগ্রসংলগ্ন শিশিরবি’ন্দুচ্ছলে রােদন করছে না কোন আত্মা’। অ’নিলবি’কম্পিত বনমর্মরে কেউ কখনাে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে না।

মৃ’ত্যুর পর তােমা’র এই দেহের সৌন্দর্য থাকবে না। মৃ’ত্যুর পর আমা’র এই দেহের শক্তি থাকবে ন। তবু যতদিন তুমি বাঁচবে আমা’র এই দেহের শক্তির কথা মনে রাখবে। তবু যতদিন আমি বাঁচব তােমা’র এই দেহসৌন্দর্যের কথা মনে রাখব।

বসন্তের কিংশুক দেখে মনে পড়বে তােমা’র রক্তিম অ’ধরােষ্ঠ। কুরুবক মঞ্জরীতে দেখব তােমা’র দশনপঙক্তি। তুষারধবল কুলেন্দু দর্শনে মনে পড়বে তোমা’র অ’পরূপ অ’ঙ্গলাবণ্য। মসৃণ পর্বতপাত্র মনে পড়িয়ে দেবে তােমা’র পৃথু জঘনভার।

রম্ভা যখন বি’দায় নিলেন তখন কৈলাসের তুষারশুভ্র শৃঙ্গমা’লার চারিদিকে অ’ন্ধকার ঘন হয়ে উঠতে শুরু করেছে। যেন সতত সােহা’গপিয়াসী কৃষ্ণবর্ণা কোনাে নায়িকা তার ধবলকান্তি প্রিয়বল্লভের কণ্ঠদেশকে নিবি’ড় প্রেমমা’ল্লাসে দু বাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরেছে।

পথে যেতে যেতে রম্ভার কিন্তু কেবলি’ মনে হতে লাগল, দেহটা’ তার রাবণের বাহুপাশ হতে মুক্ত হলেও মনটা’ তার মুক্ত হতে পারেনি এখনাে। মনে হতে লাগল, সমগ্র বি’শ্বটা’ই যেন রাবণ। বি’রাট আকাশ তার মস্তক। সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র তার চক্ষু। অ’রণ্যভূধরবি’ধৃত এই মহা’জড়প্রকৃতি তার দেহ। মনে হলাে, রাবণ শুধু দশানন নন, রাবণের সহস্র আনন তার নিপীতসর্বস্ব ব্রণবি’ধুর অ’ধরােষ্ঠকে চুম্বন করবার জন্য চারিদিক হতে ছুটে আসছে। তার ভীত ক্লান্ত দেহটা’কে চারিদিকে হতে জড়িয়ে ধরবার জন্য উদ্যত হয়ে উঠেছে তার অ’জস্র বাহু।

Please follow and like us:

fb-share-icon

নতুন ভিডিও গল্প!


Tags: , , , , , ,

Comments are closed here.