বিশ্বামিত্র ও মেনকা – (রামায়নী প্রেমকথা) – সুধাংশরঞ্জন ঘোষ

September 4, 2021 | By Admin | Filed in: বিখ্যাত লেখকদের সাহিত্যে যৌনতা.

আগে এইখানে এই পুষ্কর হৃদের বুকে ছােট ছােট ঢেউয়ের শিরাগুলি’ প্রায়ই ফুলে ফুলে উঠত। চারিপাশের তৃণগুচ্ছে ও কল্পতরু শাখার পাতায় পাতায় কাপন লেগে থাকত সব সময়। মা’থার উপরে অ’নেক দূরে শ্যামা’লতার পরিপক্ক ফলের মতাে তাম্রাভ আকাশের কোলে স্বর্ণাভ আলাে দোল খেত। এখানকার বাতাস চঞ্চল শিশুর মতাে অ’শান্ত স্পন্দনে নিয়ত ছুটে বেড়াত।

কিন্তু আজ মহা’তেজা মহা’মুনি বি’শ্বামিত্রের তপােপ্রভাবে একেবারে নিশ্ৰুপ হয়ে গেছে সব। যেদিন হতে এই পুষ্কর হৃদের তীরে তপস্যা করতে এসেছে বি’শ্বামিত্র, সেদিন হতে চারিদিকের সমস্ত বস্তুও যেন ধ্যাননিমীলি’ত হয়ে পড়েছে তার সঙ্গে সঙ্গে। এক অ’বি’চল অ’টল স্তব্ধতায় প্রস্তরীভূত হয়ে উঠেছে যেন এখনকার জল স্থল অ’ন্তরীক্ষ।

আজ এখানে জলের বুকে কোনাে ঢেউ নেই, বাতাসে হিল্লোলি’ত চঞ্চলতা নেই, বৃক্ষলতা বা তৃণগুল্মের মধ্যে কোনাে দোলা নেই, আলাের মধ্যে কোনাে কম্পন নেই। | তপস্যারত বি’শ্বামিত্রকে দেখে ভীতিবি’হ্বল হয়ে উঠেছে শ্বাসরুদ্ধ পৃথিবী। নিশ্চল ও নিস্পন্দ হয়ে উঠেছে সমস্ত জীবন ও জড়প্রকৃতি।

তপস্যারত বি’শ্বামিত্রকে দেখলে সত্যিই ভয় হয়। তার মস্তকে জটা’জাল কালসর্পাকৃত চূড়ার মতাে উন্নত করে আবদ্ধ ; কর্ণদ্বয় দ্বি’গুণীকৃত রুদ্রাক্ষের মা’লায় অ’বতংসযুক্ত। পরিধানে কৃষ্ণবর্ণ মৃ’গচর্ম। সমুখস্থ প্রজ্জ্বলি’ত হা’েমা’গ্নিশিখায় তার গৌরকান্তি জ্যোতিষ্মন।। 

তিনি বীরাসনে স্থির হয়ে বসে আছেন। তার শরীরের উর্ধ্বভাগ নিশ্চল। সরল ও সমুন্নত স্কন্ধদ্বয় সন্নতভাবে অ’বস্থিত। করযুগল ক্রোড়দেশে উত্তানভাবে সন্নিবেশিত।

এই হা’েমা’গ্নিশিখার অ’তিপ্ৰখর প্রভাবে ভীত হয়ে উঠেছে সমগ্র ভূলােক ও দ্যুলােক। সমস্ত জলদেবতা বনদেবতারা ভয়ে কোথায় লুকিয়ে পড়েছেন।বনপ্রদেশে ফুলের পাপড়িগুলি’ ভালাে করে আর ফোটে না, ভয়ে ভ্রমর ভ্রঞ্জন করে না, মৃ’গশিশু আর খেলা করে না। | কঠোর তপস্যার দ্বারা একে একে দেবলােক ও ব্রহ্মলােক অ’ধিকার করবেন বি’শ্বামিত্র, এই সংবাদে সুদূর স্বর্গলােকও ভীত ও ত্রস্ত হয়ে পড়েছে।

ভয়ে বি’বর্ণ হয়ে উঠেছে যেন আতান্ত্র আকাশ। কম্পিত হয়ে উঠেছে স্বর্গের সিংহা’সন। চিন্তিত হয়ে পড়েছেন দেবতারা। বি’ষাদের এক ঘন ছায়া নেমে এসেছে চির আনন্দময় স্বর্গের সংগীত সভায়। তাই আজকাল প্রায়ই তাল কেটে যায় অ’প্সরাদের নৃত্যের ছন্দে।

সেদিন সন্ধ্যার কিছু পূর্বে একবার যােগবি’রত হলেন বি’শ্বামিত্র। সূর্য অ’স্ত যাবার সঙ্গে সঙ্গে এই সময় প্রতিদিন তিনি বীরাসন ত্যাগ করে পাদাগ্রভাগে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে পবি’ত্র স্বর্গগঙ্গাসলি’লের অ’ঞ্জলি’ দ্বারা অ’র্থ দান করে শুদ্ধ মনে গায়ত্রীর উপাংশু জপ করেন। তারপর উপযুক্ত সন্ধ্যাবন্দনার পর নামগান করতে থাকেন। সেদিন কিন্তু আর গায়ত্রী জপ করা হলাে না বি’শ্বামিত্রের। বীরাসন ত্যাগ করে উঠে দাঁড়াতেই কিসের একটা’ মধুর শব্দে চোখ মেলে উপরের দিকে চাইলেন। দেখলেন সূর্যাস্তকালে চারিদিকের শােভা বড় মনােরম। দূর দিকচক্রবালে মেঘের ঋজুকুটিল প্রান্তভাগগুলি’ রক্ত, পীত,কপিশ প্রভৃতি নানা রঙে রঞ্জিত হয়ে উঠেছে। অ’স্তগামী সূর্যের লােহিত আভায় মনে হচ্ছে যেন উজ্জ্বল কাঞ্চনদ্রবে সিক্ত হয়ে উঠেছে নবপল্লবশােভিত তরুবীথিকা। | কিন্তু এই সব সন্দর দশ্যের উপর একবার দষ্টিপাত করবার সময় বা প্রবৃত্তি নেই বি’শ্বামিত্রের। সমস্ত ইন্দ্রিয়ের রগুলি’কে এমনভাবে রুদ্ধ করে দিয়েছেন তিনি, যাতে বাইরের জগতের কোনাে শব্দ বা দৃশ্যের কোনাে উদ্দীপন কোনরূপ চেতনার সৃষ্টি করতে না পারে তার মধ্যে।

বি’শ্বামিত্রের কাছে সমস্ত সৌন্দর্য হচ্ছে মা’য়া। হিরন্ময় পাত্রের দ্বারা আচ্ছন্ন থাকেন যেমন সবি’তৃদেব, তেমনি সৌন্দর্যের মা’য়া দ্বারা আবৃত থাকে সত্যের রূপ। সৌন্দর্যে বি’মা’েহিত হয়ে পড়লে সত্যকে লাভ করতে পারা যাবেনা কখননা। তাই কখনাে কোনাে সুন্দর বস্তু মন ভােলাতে পারে না মহা’যােগী বি’শ্বামিত্রের। | আবার সেই শব্দটা’ কানে এসে বাজল। চকিত হয়ে উঠলেন বি’শ্বামিত্র। শব্দটা’ এতক্ষণে স্পষ্ট হয়ে উঠল তার কাছে। তিনি স্পষ্ট শুনতে পেলেন, ছলবি’লাসিনী কোন্ এক নিপুণা নটীর সুমধুর নুপুরশিঞ্জায় ছন্দিত হয়ে উঠছে যেন এক অ’পরূপ নৃত্যকলা। তার অ’লক্তলাঞ্ছিত চরণের নূপুরশিঞ্জামুখরিত পদাঘাতে আকাশ বাতাসকে আলােড়িত করে জলের বুকে ঢেউ জাগিয়ে সমস্ত জড়বস্তুকে স্পন্দিত করে তারই দিকে এগিয়ে আসছে সেই নটী। কিন্তু কোথায় সেই নটী?

সচকিত হয়ে যেদিকেই তাকান বি’শ্বামিত্র, তার মনে হয় ঠিক তার বি’পরীত দিকে লুকিয়ে সে যেন ছলনা করছে তার সঙ্গে। আর হা’সছে। নৃত্যের তালে তালে উঠছে মদস্রাবী হা’সির কলরােল।

বি’শ্বামিত্রে মনে হলাে, বি’শ্বচরাচরের যে সব বস্তু এতক্ষণ স্থাণুর মতাে অ’টল স্তব্ধতায় জমা’ট বেঁধে ছিল, এখন তারা সব সচল হয়ে নাচতে ও হা’সতে শুরু করে দিয়েছে সহসা। এখন তার মনে হলাে, এ জগতের সব কিছু গতিশীল ও নৃত্যশীল। | যে সব অ’ণুপরমা’ণু দিয়ে এই বি’শ্বের বস্তুনিচয় গঠিত, এক উজ্জ্বল মত্ততায় স্বলি’ত হয়ে পড়ছে তারা সহসা। | একবার তার মনে হলাে, তার রােষবি’স্ফারিত লােচনবহ্নি দিয়ে মুহূর্তে ভস্মীভূত করে দেবেন সেই কামিনীকে। তার উদ্ধত উন্মত্ত স্পর্ধার সমুচিত শাস্তি দেবেন এমনি নির্মমভাবে।

কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিলেন বি’শ্বামিত্র। মুহূর্তে সংবরণ করে নিলেন সমস্ত ক্রোধােচ্ছাস। ভাবলেন ক্রুদ্ধ হয়ে কোনাে বস্তুকে অ’ভিশাপ দিলে বি’নষ্ট হবে তার তপস্যার ফল।

এমন সময় সহসা এক নৃত্যপটীয়সী সুন্দরী রমণী করজোড়ে এসে দাঁড়াল তার সামনে।

অ’নিচ্ছা সত্ত্বেও চেয়ে দেখলেন বি’শ্বামিত্র, স্বর্গের অ’প্সরার মতাে তার বেশভূষা। মদির তার কটা’ক্ষ। মদোন্মত্ত তার হা’সি। পদ্মগন্ধবি’নিন্দিত তার দেহসৌরভ। তার অ’নিন্দ্যসুন্দর রূপের অ’ত্যুজ্জ্বল বি’ভায় সমা’গত সন্ধ্যার ছায়ান্ধকারে আচ্ছন্ন দশদিক সমুদ্ভাসিত।

কে তুমি অ’পরিণামদর্শিনী নারী, আমা’র তপস্যায় বি’ঘ্ন সাধন করতে এসেছ?

কণ্ঠে কিছু তিক্ততা ও কঠোরতা মিশিয়ে গম্ভীরভাবে জিজ্ঞাসা করলেন বি’শ্বামিত্র। কিন্তু একবার কি ভেবে দেখেছ, তােমা’র এই হীন কর্মের কী ভীষণ পরিণাম? মনে রেখাে, প্রতিফলনের কথা বি’বেচনা না করেই যে কর্মে প্রবৃত্ত হয়, সে পশুর অ’ধম। 

বি’শ্বামিত্রের দুস্প্রেক্ষ্য ভ্রুভঙ্গ পানে বঙ্কিম কটা’ক্ষপাত করে কী একবার দেখে নিল সেই উদ্ধতমদা কামিনী। তারপর পর্যাপ্ত কুসুমস্তবকের ভারে নম্রীভূত লতার মতাে আপন পীনােন্নত স্তনদ্বয়ের ভারে অ’বনত দেহসম্ভারকে নত করে তাকে প্রণাম করে বলল, আমি আমা’র কর্মের প্রতিফল জেনেই স্বেচ্ছায় এখানে এসেছি মুনিবর।

বি’শ্বামিত্র তেমনি গম্ভীরভাবে বললেন, কে তুমি, আগে তােমা’র পরিচয় দাও, তুমি দেবকন্যা না গন্ধর্বকন্যা। 

তার শুভ্রবি’হসিত মুখমণ্ডল বি’ষাদে মলি’ন হয়ে উঠল সহসা। মুহূর্তে কোথায় যেন বি’লীন হয়ে গেল তার বি’লােল কটা’ক্ষ। শান্তকণ্ঠে কামিনী উত্তর করল, আমি স্বর্গের অ’প্সরা মেনকা।

বজ্রের মতাে গর্জন করে উঠলেন বি’শ্বামিত্র, আমি তপস্বী, তুমি অ’প্সরা। আমা’র সকাশে কি হেতু তােমা’র আগমন? সত্য পরিচয় দাও। সত্যকে গােপন করবার চেষ্টা’ করাে না, কারণ আমি ধ্যানস্থ হলেই তােমা’র গৃঢ়তম অ’ভিলাষ ও গােপনতম এষণাও জেনে নিতে পারব। 

নতজানু হয়ে করুণ কষ্ঠে মেনকা বললেন, না প্রভু, আমি বি’ন্দুমা’ত্র কোনাে কিছু গােপন করব না আপনার কাছে। তাতে আমা’র পক্ষে যে শাস্তি সমুচিত বলে বি’বেচনা করবেন আপনি, তাই বি’ধান করবেন আমা’র উপর। স্থির হয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন বি’শ্বামিত্র।

মেনকা বললেন, আপনার তপস্যার কঠোরতায় ও একাগ্রতায় শঙ্কিত হয়ে দেবগণ আপনার তপস্যায় বি’ঘ্ন ঘটা’বার জন্যই আমা’য় পাঠিয়েছেন এখানে।

তারপর কিছুক্ষণ ধরে নীরবে চিন্তা করলেন বি’শ্বামিত্র। বললেন, তা আমি আগেই বুঝতে পেরেছি। কিন্তু তুমি ঘটনাক্রমে আমা’র যোগবি’রতির সময় এসে পড়েছ। অ’ন্যথায় আমি যদি ধ্যানস্থ থাকতাম, তাহলে কেমন করে তুমি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে আমা’র?

তেমনি নতজানু অ’বস্থায় শান্তকণ্ঠে মেনকা বললেন, আমা’র ধৃষ্টতা মা’প করবেন প্রভু। আমি আমা’র নৃত্যগীতাদি দ্বারাই আপনার ধ্যানভঙ্গ করতাম।

তাচ্ছিল্যভরে হেসে উঠলেন বি’শ্বামিত্র, তুমি ভুল করছ অ’প্সরি, তুমি জান না, কী কঠোর তপস্যায় আমি ব্রতী হয়েছি। আমা’র কৃচ্ছসাধন সম্পর্কে তােমা’র কোনাে জ্ঞান নেই। যে পাতা গাছ হতে আপনা হতে ঝরে পড়ে সেই স্বতস্ফুত বৃক্ষপত্রের সামা’ন্য রসটুকু পান করে জীবন ধারণ করি আমি।

বি’শ্বামিত্রের মুখপানে আশ্চর্য হয়ে একদৃষ্টে চেয়ে ছিলেন মেনকা। শত আত্মনিগ্রহ ও কৃচ্ছসাধনেও কিছুমা’ত্র কমেনি তার দেহের অ’নলপ্রভ বি’ভূতি। বরং তা আরও বেড়ে গেছে। তপােশুদ্ধ সেই বি’ভূতির কাছে নিজের রূপেশ্বর্যকে ম্লান বলে মনে হলাে মেনকার।

বি’শ্বামিত্র বললেন, আমা’র সমা’ধিস্থ ভাব বড় নিবি’ড় আর নিচ্ছিদ্র। সেখানে কোনােমতে প্রবেশ করতে পারত না তােমা’র নৃত্যগীতের কোনাে ধ্বনি। আমা’র রুদ্ধ ইন্দ্রিয়দ্বারে ব্যাহত ও ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসত তােমা’র সমস্ত তরল প্রয়াস।

মেনকা বললেন, আমি স্বীকার করছি আপনার ঐশী শক্তি। কিন্তু দেব, সবি’শেষ বি’নয়ের সঙ্গে বলতে বাধ্য হচ্ছি আমা’র উম্মা’দনা শক্তিও বড় প্রবল। আমা’র যে নৃত্যের ছন্দে চঞ্চল হয়ে ওঠে স্বর্গের দেবসভা সেই নৃত্যের ছন্দে নৃত্যচঞ্চল হয়ে উঠত এই মর্ত্যলােকের প্রতিটি ধূলি’কণা। আমা’র নৃত্যশীল চরণের নূপুর-নিকণে বি’শ্বচরাচরের স্থাবর জঙ্গম প্রতিটি বস্তুও দোলায়িত হয়ে উঠত এক মধুর ছন্দোমত্ততায়। এইভাবে আপনার আসন উঠত টলে এবং আপনার ধ্যানভঙ্গ হত তার ফলে।

সহসা রােষস্ফুরিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন বি’শ্বামিত্র, তারপর ?
মেনকা উত্তর করলেন, তারপর আপনি ক্রুদ্ধ হয়ে অ’ভিশাপ দিতেন আমা’য়।
কিন্তু কেন? এবার রােষ নয়, এক নিবি’ড় বি’স্ময়বি’মুগ্ধতা ফুটে উঠল বি’শ্বামিত্রের কণ্ঠে।

কেন তুমি স্বর্গেরনন্দনকানন ছেড়ে শাপদগ্ধ হয়ে মর্ত্যের ধূলি’কণার সঙ্গে মিশে যেতে এসেছিলে অ’প্সরি! যে দেবতাদের তুমি তােমা’র নৃত্যগীত দ্বারা যুগ যুগ ধরে প্রীত করে এসেছ সেই দেবতারা কেন তােমা’য় এই নির্মম নিষ্ঠুর আদেশ দান করলেন এবং কেনই বা তুমি নত মস্তকে অ’প্রতিবাদে মেনে নিলে এই ভয়ঙ্কর আদেশ?

বি’শ্বামিত্রের মুখপানে একদৃষ্টে চেয়ে নীরবে বসে রইলেন মেনকা। তার কথার কোনাে উত্তর দিলেন না। 

তখন সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। তবু আজ সায়ংকৃত্য সম্পন্ন বা সামগান করা হয়নি বি’শ্বামিত্রের। প্রদীপ জ্বালা হয়নি সমা’ধি কুটিরে। শুধু থেকে থেকে অ’সংখ্য জোনাকির অ’গ্নিস্ফুলি’ঙ্গ জ্বলছে সারা বনভূমি জুড়ে। মস্তকে অ’ন্ধকারের এক একটি বি’পুল জটা’জাল নিয়ে ধ্যানমগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আছে যেন প্রশান্তগম্ভীর দুমদল। বি’শ্বামিত্র আবার বললেন, আমা’র প্রশ্নে উত্তর দাও অ’প্সরি

এতক্ষণে চমক ভাঙল মেনকার। মেনকা বললেন, স্বর্গে অ’প্সরার জীবন আমা’র আর ভালাে লাগেনা মুনিবর। অ’নন্তকাল ধরে চটুল দেহৈশ্বর্য ও হীন বি’লাসলাস্যের দ্বারা অ’সংখ্য দেবতাদের প্রীত করা আমি আর একেবারেই পছন্দ করি না। দিনের পর দিন কাউকে নৃত্যগীত, কাউকে হা’স্যময় সংলাপ, কাউকে নিবি’ড় সঙ্গদানের মধ্য দিয়ে সন্তুষ্ট করে যাওয়াই হচ্ছে আমা’র কাজ। এ কাজ আর আমি চাই না। আমি চাই না স্বর্গের নন্দনকানন, তার চেয়ে মর্ত্য আমা’র কাছে ঢের ভালাে। আমি অ’মরত্ব চাই না ; মৃ’ত্যু চাই। বি’শেষ করে সে মৃ’ত্যু যদি আসে আপনার মতাে একজন পুরুষশ্রেষ্ঠর কাছ থেকে।

মেনকার কথায় এবার আরও বি’স্মিত হলেন বি’শ্বামিত্র।

মেনকা বললেন, এতদিন স্বর্গে বহু দেবতা দেখেছি। আজ মর্তে একজন মা’নুষ দেখে ধন্য হলাম। বি’স্ময়ে বাকস্ফুর্তি হলাে না বি’শ্বামিত্রে মুখ থেকে।

মেনকা আবার বলতে লাগলেন, হে মা’নবশ্রেষ্ঠ, আপনি এমনি একজন বি’রাট পুরুষ যিনি স্বর্গ মর্ত্যের সমস্ত ব্যবধানকে লুপ্ত করে দিতে চলেছেন ; আপন পুরুষকারের দ্বারা বি’ধিনির্দিষ্ট জন্মবি’ধানকে অ’স্বীকার করে ব্রাহ্মণত্ব লাভ করতে চলেছেন আপনি। হে ঋষিশ্রেষ্ঠ, আপনি এমনি একজন তপস্বী যার তপস্যার কঠোরতায় ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে সমস্ত দেবকুল।

বলতে বলতে যেন আত্মবি’স্মৃ’ত হয়ে পড়লেন মেনকা আর তা শুনতে শুনতে স্তম্ভিত হয়ে পড়লেন বি’শ্বামিত্র।

মেনকা বললেন, হে তাপস, আপনার পবি’ত্র অ’ভিশাপবহ্নিতে দগ্ধ ও ভস্মীভূত হয়ে আপনার তপােভূমির ধুলি’কণার সঙ্গে মিশে থাকাও পরম ভাগ্যের কথা। এতে যদি আমা’র মৃ’ত্যু হয় তাহলে সে মৃ’ত্যু আমা’র হবে মহৎ। কারণ সে মৃ’ত্যুর মধ্যে দিয়ে আমি পাব আমা’র এই অ’বাঞ্ছিত ও ধিকৃত জীবন থেকে চিরমুক্তি।

সহসা চমক ভাঙল বি’শ্বমিত্রের। দেখলেন তার পদতলে আনত হয়ে তার কাছে শাস্তি ভিক্ষা করছে মেনকা। মেনকা বলছে, হয় আমা’য় শাস্তি দিন তা না হলে আবার যথাস্থানে ফিরে যাবার অ’নুমতি দিন। আচ্ছন্নের মতাে জিজ্ঞাসা করলেন বি’শ্বমিত্র, কোথায়? মেনকা বললেন, স্বর্গ ছাড়া আর যাবার আমা’র জায়গা কোথায় প্রভু।

বি’শ্বামিত্রের মুখে চোখে এক অ’দ্ভুত পরিবর্তন ফুটে উঠল। কিন্তু তা দেখা গেল না। শুধু তার গম্ভীর কণ্ঠ শােনা গেল, সেখানে তােমা’য় আর আমি যেতে দেব না। তােমা’র মা’েহিনী মূর্তি ও মধুর বাকভঙ্গিমা’র দ্বারা আমা’কে কামচঞ্চল করে গিয়ে দেবতাদের তুমি প্রীত করবে, সে আমি কিছুতেই হতে দেব না। ধীরে ধীরে মেনকার একটি হা’ত ধরলেন বি’শ্বামিত্র।

সহসা বি’শ্বামিত্রের এই চিত্তবি’কার দর্শনে চমকে উঠলেন মেনকা। আর তার সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠল সমগ্ৰ বনভমির অ’রণ্যসমা’হিত অ’ন্ধকার।

করুণ কণ্ঠে মেনকা বললেন, একি করলেন ঋষিবর, আমা’কে স্পর্শ করে কেন আপনি আপনার এতদিনের কঠোর তপস্যার ফল বি’নষ্ট করলেন?

কোনাে উত্তর না দিয়ে নীরবে মেনকাকে আরও কাছে টেনে নিলেন বি’শ্বামিত্র।

কোমলাঙ্গী মেনকার সমস্ত অ’ঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলাে কেঁপে উঠল একবার। সঙ্গে সঙ্গে বি’স্ময় বি’মিশ্রিত এক বেদনার শিহরণে কুঞ্চিত হয়ে উঠল পুষ্কর হ্রদের শান্ত জলের বুক। বি’শ্বামিত্র বললেন, তােমা’র কৃতকর্মের জন্য তােমা’কে শাস্তি পেতে হবে অ’প্সরা। মেনকার হা’ত ধরে তাকে কুটিরের মধ্যে নিয়ে গেলেন বি’শ্বামিত্র।

মেনকা একবার ক্ষীণ প্রতিবাদ করবার চেষ্টা’ করলেন। কিন্তু এখন আপনার সায়ংকৃত্য ও সামগান সারা হয়নি। বি’শ্বামিত্র বললেন, তা না হা’েক।

অ’বশেষে সমস্ত চঞ্চলতা হা’রিয়ে স্তব্ধ হয়ে বি’শ্বামিত্রের প্রশস্ত বুকের উপর নিথর নিস্পন্দের মতাে ঢলে পড়লেন মেনকা।

মেনকার মনের পরিচয় আগেই পেয়েছেন বি’শ্বামিত্র। এবার সারারাত ধরে তাঁর অ’পরূপ দেহসৌন্দর্যের সুরভিত নির্যাস পান করতে লাগলেন তিনি। পান করতে করতে মত্ত হয়ে উঠলেন ভীষণভাবে।

বি’শ্বামিত্রের সেই নির্লজ্জ মত্ততা দর্শনে লজ্জায় চক্ষুমুদ্রিত করল যেন দূর আকাশের নক্ষত্রদল। অ’ন্ধকারে মুখ লুকিয়ে রইল স্তব্ধ ও উচ্চকিত মদল।

সকাল হতে দুজনে বেরিয়ে এলেন কুটিরের মধ্য হতে। মেনকা একবার বললেন, এবার আমি যাই।

মেনকাকে নীরবে গাঢ় আলি’ঙ্গনে আবদ্ধ করে তার ললাটে একটি চুম্বন করলেন বি’শ্বামিত্র।

মন্ত্রমুগ্ধের মতাে বি’শ্বামিত্রের মুখপানে চেয়ে রইলেন মেনকা। আর কোনাে কথা বলতে পারলেন না।

মেনকার কিন্তু সত্য সত্যই আর যাবার ইচ্ছা ছিল না। এই নির্জন বনস্থলীর মা’ঝে শান্ত সুখী এক আশ্ৰমজীবনের প্রতি কোথায় যেন একটা’ গুঢ় আকর্ষণ ছিল তার মনে।

বি’শ্বামিত্র ও মেনকা দুজনেই দেখলেন, সমগ্র বি’শ্বপ্রকৃতি সম্পূর্ণ এক নূতন রূপ ধারণ করেছে যেন। তারা দুজনেই অ’নুভব করলেন, তাদের সম্পূর্ণ নূতন জীবন সূচনা করছে যেন আজকের এই নবপ্রভাত।

মধুস্রাবী পক্ষিকুলকণ্ঠে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠেছে সমগ্রবনভূমি।চারিদিকে প্রস্ফুটিত পুন্নাগ কুসুমসৌরভে আমা’েদিত হয়ে উঠেছে বাতাস। দূরে মেরুপ্রদেশের যে সমুচ্চ শৃঙ্গ দেশগুলি’ তারকাসুর ভেঙে নিয়ে গিয়ে তার বি’হা’রশৈল রচনা করেছে, আজ বহুদিন পর রঙীন সূর্যাশ্বগুলি’ বড় মনােরম ভঙ্গীতে বি’চরণ করছে যেন সেখানে আবার। বহুদিন পর যেন অ’জস্র স্বর্ণমা’লা ফুটেছে শেতাজসুন্দর মন্দাকিনীর জলে।

নূতনভাবে বসবাস করার জন্য পরম আগ্রহে আর একটি পর্ণকুটির নির্মা’ণ করলেন বি’শ্বামিত্র।

অ’প্সরার বেশভূষা ত্যাগ করলেন মেনকা। তারপর ঋতুসত নানারকমের কুসুমভূষণ পরিধান করে গৃহকর্মে প্রবৃত্ত হলেন। এই সরল অ’নাড়ম্বর প্রসাধনে দ্বি’গুণ বর্ধিত হলাে তার দেহসৌন্দর্য।

স্বহস্তরচিত কুসুমভূষণে সজ্জিত হয়ে মেনকা যখন নত হয়ে প্রণাম করতেন বি’শ্বামিত্রকে তখন তার অ’লকদাম নিহিত গন্ধচুর্ণে কেমন যেন নেশা লাগত বি’শ্বামিত্রের মনে। তিনি তখন সঙ্গে সঙ্গে তুলে ধরে বুকের কাছে টেনে নিতেন মেনকাকে। 

ইন্দ্রিয়ের যে সব দ্বারগুলি’ রুদ্ধ করে রেখেছিলেন এতদিন, এবার সেগুলি’ একেবারে উন্মুক্ত করে দিলেন বি’শ্বামিত্র। দীর্ঘ অ’বদমনের পর আজ মেনকার দেহের মধ্য দিয়ে জগতের রূপ, রস, গন্ধ, বর্ণকে উপভােগ করবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে উঠল তার সমস্ত ইন্দ্রিয়। আজ সারা জগতের সমস্ত রূপ, রস এসে যেন একত্রিত হয়েছে মেনকার দেহের মধ্যে।

প্রায়ই দুচোখ ভরে মেনকার দেহটা’কে খুটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন বি’শ্বামিত্র। তার সমস্ত অ’ঙ্গ -প্রত্যঙ্গের উপর হা’ত বুলি’য়ে কী যেন অ’নুভব করতে থাকেন।

কখনও তার দেহের আঘ্রাণ নেন। মঞ্জুভাষিণী মেনকার মধুর কণ্ঠ শােনবার জন্য সদাজাগ্রত ও উৎকর্ণ হয়ে থাকে তার কর্ণকুহর। মেনকার অ’ধরােষ্ঠের উপর নিজের অ’ধরােষ্ঠকে সংযুক্ত করে যখন নিবি’ড়ভাবে চুম্বন করেন বি’শ্বামিত্র, তখন মনে হয় মেনকার দেহসৌন্দর্যের সমস্ত রসনির্যাসটুকুকে তিনি শুধু আস্বাদনই করছেন না, বদ্ধপরিকর হয়ে উঠেছেন তা নিঃশেষে পান করবার জন্য। 

জপতপ যে আজ কাল বি’শ্বামিত্র একেবারে করেন না তা নয়। তবে দিনরাত্রির মধ্যে বেশির ভাগ সময়ই কেটে যায় মেনকাকে নিয়ে। 

একদিন দ্বি’প্রহরে যজ্ঞের জন্য কাষ্ঠ আহরণ করতে গিয়ে ফিরে এলেন বি’শ্বামিত্র। আশ্রমের মধ্যে গৃহকর্মে নিরত ছিলেন তখন মেনকা। 

অ’কালে ফিরতে দেখে কাজ ফেলে ছুটে এলেন মেনকা। আকুল হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি অ’সুস্থ?

বি’শ্বামিত্র মেনকার মুখচুম্বন করে বললেন, না মেনকা, তােমা’য় ছেড়ে কোথাও গিয়ে আমি ক্ষণিকের জন্যও থাকতে পারছি না। যেখানেই যাচ্ছি সর্বত্রই শুধু তােমা’কেই দেখছি। সর্বক্ষণ মনে পড়ছে শুধু তােমা’রি কথা।

কথাটা’ শুনে মেনকা কিন্তু তৃপ্ত হতে পারলেন না। শাস্তকণ্ঠে তিনি শুধু বললেন, মনকে একটু সংযত ও শক্ত করুন আর্য। অ’তখানি বি’চলি’ত হওয়া শােভা পায় না আপনার পক্ষে।

বি’শ্বামিত্র করুণকণ্ঠে বললেন, কিছুতেই তা পেরে উঠছিনা মেনকা। অ’ন্তরীক্ষের নীলি’মা’য় ও জলের স্বচ্ছতায় প্রতিফলি’ত দেখছি তােমা’র মুখ, অ’রণ্যের হা’ওয়ায় শুনছি তােমা’র শ্বাসপ্রশাস। পাখির গানে ধ্বনিত হচ্ছে তােমা’র কণ্ঠ। ফুলের গন্ধে পাচ্ছি তােমা’র দেহসৌরভ। শুধু তাই নয় মেনকা, আজকাল যজ্ঞাগ্নির কুশুলায়িত ধূমরাশির মধ্যে ভেসে ওঠে তােমা’র নৃত্যের ছন্দ। যজ্ঞকালে যখন উদাত্ত, অ’নুদাত্ত ও স্বরাত্ত এই ত্রিবি’ধ স্বরসংযােগে বেদবাক্যের ওঙ্কার ধ্বনি আরম্ভ করি, তখন সে ধ্বনিকে ছাপিয়ে ওঠে তােমা’র সঙ্গীতের ধ্বনি।

সহসা গম্ভীর হয়ে উঠলেন মেনকা। অ’সময়ের মেঘের মতাে বি’ষাদের কালাে ছায়া নেমে এলাে তার উজ্জ্বল মুখমণ্ডলে। শান্ত গম্ভীর কণ্ঠে তিনি বললেন, এইজন্যই কামিনীকাঞ্চনকে সাধনার ঘাের পরিপন্থী বলা হয় ঋষিবর। কিন্তু আপনি কেন একথা ভুলে যাচ্ছেন যে, গৃহের মধ্যে থেকেও অ’নেক তপস্বী সিদ্ধিলাভ করেছেন তাদের তপস্যায়। তাদের দাম্পত্য-সম্পর্ক বি’শেষ সংযত হওয়ার জন্য তা কোনাে বি’ঘ্নই সৃষ্টি করতে পারেনি তাদের তপস্যায়। কিন্তু আমা’কে নিয়ে ঘর বাঁধার পর থেকে আপনি যে একজন ঋষি বা তপস্বী একথা একেবারে ভুলে যেতে বসেছে।

একটু থেমে বি’শ্বামিত্রের মুখপানে একবার বি’শেষ অ’র্থপূর্ণ দৃষ্টিতে চাইলেন মেনকা। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, আপনার পােবন আজ একজন ভােগী বি’লাসীর গৃহে পরিণত হয়েছে। আজকাল প্রায়ই পুষ্পরসনির্মিত মদ্যপানে গােলাপী নেশায় আঘূর্ণিত হয়ে থাকে আপনার নয়নযুগল। এক উগ্ৰ কামচেতনায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে আপনার মন-প্রাণ।

মেনকাকে মা’ঝপথে থামিয়ে দিয়ে হঠাৎ জোরে হেসে উঠলেন বি’শ্বামিত্র। বললেন, তােমা’র এই মৃ’দু ভৎসনা আমা’র বড় মধুর লাগছে অ’প্সরি !

মেনকা বি’শ্বামিত্রের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে আবার বলতে লাগলেন, আমা’য় আপনি সত্যসত্যই ভালােবাসেন। আমা’র প্রতি আপনার এই প্রেমের জন্য আমি আপনার নিকট চিরকৃতজ্ঞ। কিন্তু এই প্রেমের জন্য আপনি সাধনার পথ হতে বি’চ্যুতি হবেন, এ আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারব না। 

প্রেম মিথ্যা তা বলছিনা। কিন্তু প্রেমের থেকে আরও বড় সত্য আছে জীবনে। সেই বৃহত্তর সত্য লাভের পথে অ’ন্তরায় হয়ে ওঠে যে প্রেম সে প্রেমে মঙ্গল নেই। কারাে পক্ষেই কখনাে শুভ হতে পারে না সে প্রেম।

কিঞ্চিৎ রুষ্ট হলেন যেন বি’শ্বামিত্র। বললেন, আমা’য় যত পারাে ভসনা করা, কোনাে আপত্তি নেই। কিন্তু তুমি আমা’য় নীতি উপদেশ শােনাতে এসনা। কী জানাে তুমি প্রেম সম্পর্কে?

মেনকা আর কোনাে কথা বললেন না। স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। 

বি’শ্বামিত্র বললেন, সে সত্য যত বড়ই হা’েক, প্রেমের সত্যকে না জানলে তা জানা যায় না। একদিক দিয়ে এই প্রেম সবচেয়ে বড় সত্য। বি’শ্বসৃষ্টির সকল রহস্যের মূলে রয়েছে এই প্রেম।

কথাটা’ হয়ত ঠিক বুঝতে পারলেন না মেনকা। তাই অ’বাক বি’স্ময়ে তাকিয়ে রইলেন বি’শ্বামিত্রের মুখপানে।

বি’শ্বামিত্র বললেন, এই জগতে ও জীবনে মা’ত্র দুটো সত্য আছে-রাগ এবং দ্বেষ, আকর্ষণ এবং বি’কর্ষণ। এই রাগ ও দ্বেষ হতেই উদ্ভব হয়েছে জীবন ও মৃ’ত্যুর, প্রেম ও অ’প্রেমের। এদের মধ্যে প্রেমই হচ্ছে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ গুণ। এই প্রেমবােধের তাড়নাতেই জগৎ সৃষ্টি করেছিলেন সৃষ্টিকর্তা। নিজের অ’ভিন্ন পরমা’ত্মা’কে বি’ভক্ত করেছিলেন নারী ও পুরুষে।

সহসা কথা থামিয়ে চারিদিকে চেয়ে কী একবার দেখে নিলেন বি’শ্বামিত্র। দ্বি’প্রহর পার হয়ে কখন অ’পরাহু এসেছে, শান্ত ঘন হয়ে উঠেছে চঞ্চল ও ছিন্নভিন্ন বনছায়া,কথায় কথায় দুজনে এমনই মত্ত হয়ে উঠেছেন যে সেদিকে কেউ একবার ফিরেও তাকাননি। | বি’শ্বামিত্র বললেন, শুধু মা’নুষের জীবনে নয়, সমগ্র জীবজগৎ ও প্রকৃতিজগতেও সব সময়ের জন্য চলেছে প্রেমের লীলা। এই প্রেমের নেশাতেই পরস্পরকে আকর্ষণ করে মহা’শূন্যে ভাসছে গ্রহনক্ষত্রের দল। ঐ দেখ, প্রেমে আকুল হয়ে এক জায়গায় কখনাে স্থির হয়ে থাকতে পারছেনা বাতাস, ফেনিল নূপুর পরে নদী ছুটে চলেছে সমুদ্র-সঙ্গমা’ভিমুখে! প্রেমে মা’তােয়ারা প্রতিটি বৃক্ষপত্র এক অ’পরূপ ছন্দভঙ্গিমা’য় নিয়ত নৃত্যশীল। আরও দেখ, নিবি’ড় প্ৰেমা’লি’ঙ্গনে আবদ্ধ হয়েই অ’ণুপরমা’ণুগুলি’ গড়ে তুলেছে প্রতিটি বস্তুকে। অ’দম্য প্রেমের তাড়নাতেই ফুলের পরাগকেশর গর্ভকেশরে মিলি’ত হয়ে উৎপন্ন করে আশ্চর্য সুন্দর এক একটি কুসুমা’বয়ব। 

বেশি দূরে যেতে হবে না, কোনাে এক মদচঞ্চল উতল মুহূর্তে গভীর প্রেমা’বেশে তােমা’র পিতামা’তা যদি মিলি’ত না হতেন তাহলে তােমা’র সষ্টি হত না মেনকা। প্রেমের অ’ভাব ঘটলেই পরস্পর হতে ঋলি’ত ও বি’চ্ছিন্ন হয়ে পড়ে সম্মিলি’ত অ’ণু-পরমা’ণুর দল আর তার ফলে মৃ’ত্যুমুখে পতিত হয় জীব; বি’কৃতি প্রাপ্ত হয় বস্তু। মেনকাকে আবার আলি’ঙ্গন করে মৃ’দুভাবে একটি চুম্বন করলেন তার ওষ্ঠে। বি’শ্বামিত্রের সব কথা বুঝতে পারলেন না মেনকা। কিন্তু তার দুরন্ত যুক্তি-গুলি’কে খণ্ডন করবার মতাে কোনাে কথা খুঁজে পেলেন না। তাইনীরব হয়ে রইলেন বাধ্য হয়ে।

বি’শ্বামিত্র বললেন, প্রেমের সহযােগেই সুন্দর হয়ে ওঠে এ জগতের সব বস্তু। আমি যদি তােমা’য় ভালােনা বাসতাম তাহলে তােমা’র এই সুন্দর দেহা’বয়বকে অ’সুন্দর মনে হত আমা’র। হৃদয়ে যাদের প্রেম নেই তাদের কাছে ফুলের কোনাে সৌন্দর্য নেই, চন্দ্রালােকের মধ্যে কোন মা’ধুর্য নেই, সঙ্গীতের সুরের মধ্যে কোনাে মা’দকতা নেই। প্রেম আছে বলেই মনে হয় মধুময় এই পৃথিবীর ধূলি’। মধু ঝরে পড়ে জলে স্থলে অ’ন্তরীক্ষে।

যেদিন প্রেম থাকবে না, সেদিন অ’চল হয়ে উঠবে এই বি’শ্বসৃষ্টি। সেদিন একমা’ত্র সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কোনাে কিছুই বেঁচে থাকবে না। সেদিন স্বর্গমর্ত্যব্যাপী সৃষ্টিহীন এক মহা’শূন্যতায় নির্গণ নিরাকার স্রষ্টা’ নিঃসঙ্গ বেদনায় কেঁদে কেঁদে ফিরবে।

এমনি করে বছরের পর বছর কেটে যেতে লাগল। তবু কিছুমা’ত্র পরিবর্তন হলাে না বি’শ্বামিত্রের। বি’ন্দুমা’ত্র স্তিমিত হলাে না তার দুরন্ত প্রেমা’বেগ।

একদিন মেনকা সহসা বুঝতে পারলেন, গর্ভসঞ্চার হয়েছে তার মধ্যে। এক অ’ননুভূতপূর্ব আনন্দের শিহরণে সমস্ত দেহ মন দুলে উঠল মেনকার। তার ক্ষীণ কটির নিম্নভাগে নধরস্ফীত নাভিদেশের চারিদিকে বারবার হা’ত বুলি’য়ে কী যেন অ’নুভব করে দেখতে লাগলেন মেনকা। তার এই দেহা’বয়বের মধ্যে তারই কাছ থেকে তিল তিল রক্ত মা’ংস নিয়ে দিনে দিনে সকলের অ’লক্ষ্যে অ’গােচরে গড়ে উঠছে একটি দেহমন্দির আর সেই দেহমন্দিরের মধ্যে বি’গ্রহের মতাে প্রতিষ্ঠিত হবে সম্পূর্ণ নূতন একটি জীবন যার মধ্যে এক অ’পরূপ সার্থকতা লাভ করবেন তিনি—একথা ভাবতে ভাবতে আত্মহা’রা হয়ে উঠলেন মেনকা। 

উল্লসিতাঙ্গী মেনকা সে আনন্দের বেগকে নিজের অ’ন্তরে আর ধরে রাখতে পারলেন না। তাই ছুটে গিয়ে কথাটা’ বললেন বি’শ্বামিত্রকে। 

কথাটা’ শুনে কিন্তু মা’েটেই খুশি হতে পারলেন না বি’শ্বামিত্র। শােনার সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে বসে ভাবতে লাগলেন। 

তার এই আকস্মিক ভাব পরিবর্তনে বি’স্ময়ে হতবাক হয়ে রইলেন মেনকা।

যে সব কথা কোনদিন ভাবেননি বি’শ্বামিত্র, আজ সেই সব কথা গভীরভাবে ভাবতে

লাগলেন। ভাবলেন, এতদিন অ’র্থাৎ এই দীর্ঘ দশটি বছর ধরে প্রেমের সত্যকে জানতে গিয়ে মেনকার প্রেম ও সৌন্দর্যে বি’ভাের হয়েছিলেন। এর উপর আবার যদি সন্তানম্নেহে জড়িয়ে পড়েন তাহলে সম্পূর্ণরূপে মৃ’ত্যু ঘটবে তার ঋষিজীবনের।

আজ সহসা যেন চমক ভাঙল তার। তিনি বুঝতে পারলেন, কোনাে সত্যই চূড়ান্তভাবে মহৎনয়। কোনাে একটি সত্যকে জানার সঙ্গে সঙ্গে নূতনতর আর একটি সত্যের সন্ধানে সাধনা করাই জীবনের প্রকৃত ধর্ম। 

কাঁদতে কাদতে বি’শ্বামিত্রের পায়ের উপর লটিয়ে পড়লেন মেনকা। করুণকণ্ঠে বললেন, কী, কথা বলুন, নীরব কেন? এত বড় আনন্দের দিনে কেন আপনি এমন বি’ষাদগম্ভীর হয়ে উঠলেন সহসা?

মেনকার দেহমনের মধ্য দিয়ে যে সত্যকে জানতে ও আস্বাদন করতে চেয়েছিলেন বি’শ্বামিত্র, সে সত্যকে জানার সঙ্গে সঙ্গে মেনকার প্রয়ােজন ফুরিয়ে গেছে তার কাছে। 

কিছুক্ষণ পর বি’শ্বামিত্র শান্তগম্ভীর কণ্ঠে বললেন, এবার তুমি যাও মেনকা। আমা’র প্রেমসাধনা শেষ হয়েছে এবার। এবার থেকে নূতনতর এক সাধনায় নিয়ােজিত করতে চাই নিজেকে।

মেনকা কাতরকণ্ঠে বললেন, তবে কি সব ভুল; তবে কি মিথ্যা স্তোকবাক্যে আমা’য় ভুলি’য়ে রেখে নিজের হীন কাম প্রবৃত্তিকে চরিতার্থ করেছেন দিনের পর দিন?

বি’শ্বামিত্র বললেন, বি’চলি’ত হয়াে না মেনকা। কোনাে কিছুই মিথ্যা নয়। আমা’দের অ’মর প্রেমের সাক্ষ্য দান করবে তােমা’র গর্ভস্থ সন্তান। আমা’র নামের সঙ্গে সঙ্গে চিরদিন যুক্ত হয়ে থাকবে তােমা’র নাম। তােমা’র অ’ঙ্গরাজীবন অ’মরত্ব লাভ করবে আমা’র সঙ্গে। সাধনার দ্বারা ভবি’ষ্যতে দেবর্ষি বা ব্রহ্মর্ষি যত বড় ঋষিই হই না, আমা’র প্রেমিক সত্তাকে প্রমা’ণ করবে আমা’দের এই সন্তান।

চোখের জল মুছে বি’দায়ের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠলেন মেনকা। তখন সূর্য সবেমা’ত্র অ’স্ত গেছে।

বহুদিন পর আবার একটি গােধূলি’ এলাে। বি’রহবি’ধুর এক নিষ্ঠুরতায় ধূসর এক গােধূলি’। এক অ’ব্যক্ত বেদনায় রক্তরঙীন হয়ে উঠেছে মেঘের প্রান্তভাগগুলি’। সাথীহা’রা শূন্যতার এক স্তব্ধ হা’হা’কারে আত্মলীন হয়ে উঠেছে আকাশ বাতাস। 

শেষবারের মতাে বি’শ্বমিত্রকে প্রণাম করলেন মেনকা! দক্ষিণ হস্ত উত্তোলন করে নীরবে আশীর্বাদ করলেন বি’শ্বামিত্র।

ধীরে ধীরে কোথায় বি’লীন হয়ে গেলেন মেনকা। আজ তার চরণে কোনাে নৃত্যোচ্ছল চঞ্চলতা নেই। গতিভঙ্গির মধ্যে নেই কোনাে মা’দকতা। নয়নে নেই কোনাে বঙ্কিম কটা’ক্ষের জটিলতা।

এদিকে তখন বি’ষাদগম্ভীর অ’ন্ধকার নেমে এসেছে শান্ত নির্জন বনস্থলীতে আর পুষ্কর হ্রদের জলে। সেই অ’ন্ধকারকে ভেদ করে যজ্ঞাগ্নি জ্বলে উঠল ঋষি বি’শ্বামিত্রের।

ধীরে ধীরে এক নিবি’ড় ধ্যানে সমা’ধিস্থ হয়ে পড়লেন বি’শ্বামিত্র।

Please follow and like us:

fb-share-icon

নতুন ভিডিও গল্প!


Tags: , , , , , ,

Comments are closed here.