সহস্র এক আরব্য রজনী – ১২ (সওদাগর আয়ুব ও ঘানিমের কিস্সা)

September 4, 2021 | By Admin | Filed in: বিখ্যাত লেখকদের সাহিত্যে যৌনতা.

শাহরাজাদ বলতে শুরু করে:

এক সময় এক নামজাদ সওদাগর ছিলো-তার নাম আয়ুব। আয়ুবের দুটি সন্তান। একটি ছেলে আর একটি মেয়ে। ছেলেটির নাম ঘানিম। আর মেয়ের নাম ফিৎনা। দুজনেই দেখতে শুনতে বড় চমৎকার। যেমন তাদের ধবধবে ফর্সা গায়ের রং তেমনি তাদের চাঁদপনা গড়ন। দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়।

এমন সময় রাত্রি ভোর হয়ে এলো। শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে রইলো।

সাঁইত্রিশতম রজনীর দ্বি’তীয় প্রহরে আবার সে বলতে শুরু করে :

ছেলে মেয়েদের জন্যে বি’শাল বি’ষয় সম্পত্তি রেখে আয়ুব একদিন মা’রা গেলো। দুই ভাই বোন দেখলো, একশো গাঁট সিন্ধের কারুকার্যকরা মূল্যবান কাপড় আর একশো বয়াম গুলাবের নির্যাস। এগুলো সবই বাগদাদে পাঠাবার জন্যে বাধা-ছাঁদা হয়ে গিয়েছিলো। সেখানকার বাজারে বি’ক্রি করা হবে-এই ছিলো উদ্দেশ্য। কিন্তু আয়ুব তার এই অ’র্ধসমা’প্ত কাজটুকু আর শেষ করে যেতে পারলো না।

তরুণ ঘানিম ঠিক করলো, বাগদাদে যাবে। বাবার ব্যবসাই মন দিয়ে করবে। বাগদাদে বাবার বহুকালের ব্যবসা। ওখানে বাবার বহু চেনাজানা আছে। নিজের পরিচয় দিয়ে সামনে দাঁড়ালে সকলেই সাধ্য মতো সাহা’য্য করবে-এই ভরসায় মা’ ও বোনকে রেখে একদিন বাগদাদের পথে রওনা হয়ে গেলো সে।

বাগদাদে এসে সব আগে সে একখানাবাড়ি ভাড়া নিলো। শোবার ঘরখানা বেশ ঝকঝকে তকতকে। দামী আসবাবপত্রে সাজানো গোছানো। সঙ্গে লাগোয়া গুদোমঘরটা’ বেশ বড়সড়। উটের পিঠ থেকে নামিয়ে ঘরে ভরলো মা’লগুলো। তারপর তালাচাবি’ বন্ধ করে শহর পরিক্রমা’য় বেরিয়ে পড়লো ঘানিম। শহরের যে যে অ’ঞ্চলে বড় বড় দোকানপাট আছে, ঘুরে ঘুরে দেখলো। সবারই সঙ্গে গায়ে পড়ে আলাপ পরিচয় করলো। তার বাবার পরিচয় দিতে অ’নেকেই বেশ খাতির যত্ন করলো। সবারই কাছে তার বাসার ঠিকানাপত্র রেখে এলো। উদ্দেশ্য, যার প্রয়োজন বাসাতে এসেও মা’লপত্র দেখেশুনে সওদা করে নিয়ে যেতে পারে।

পরদিন সকালে খানদশেক শৌখিন কাজ করা সিস্কের থান নিয়ে সে বাজারে এলো। বাহা’রী কাজ দেখে প্রথম দোকানদারই পছন্দ করে কিনে নিলো। ঘানিম দেখলো প্রতি থানে দু দিনার লাভ পেয়েছে সে। পরদিনও আবার কয়েকটা’ থান নিয়ে বাজারে গেলো। সেগুলোও চটপট বি’ক্রি হয়ে যায়।

এইভাবে একটা’ বছর কেটে গেলো। ঘানিমের কাপড়ও যেমন বাজারের সেরা, তেমনি তার গুলাবের নির্যােসও ষোলআনা খাঁটি। কোন মা’লই পড়ে থাকলো না। এক এক করে সব বি’ক্রি হতে লাগলো। এবং ভালো লাভ দিয়েই বি’ক্রি হলো।

একদিন বি’কেলে বাজারে গিয়ে ঘানিম দেখলো, সব দোকানপাট বন্ধ। এমন কি বাজারে ঢোকার সদর ফটকটা’ও তালা দেওয়া। কি ব্যাপার, কিছুই বুঝতে পারে না সে। আজ তো কোন পরবের দিন না। তবে? তবে কেন সব বন্ধ! একজন পথচারীকে জিজ্ঞেস করতে বললো, বাজারের খুব নামজাদা এক দোকানের মা’লি’ক মা’রা গেছেন আজ। তাকে নিয়ে সবাই মিলে মিছিল করে গেছে গোরস্থানে। ঘানিম ভাবলো, তারও যাওয়া উচিত। কারণ ব্যবসাদারদের এই সব সৌজন্য খুব দরকার।

গোরস্থানের পথে দ্রুত হেঁটে চললো সে। কিছু দূর যেতেই দেখলো, বড় মসজিদের সামনে নামা’নো হয়েছে মৃ’তদেহটা’। একটু পরে প্রার্থনা শেষ হলে আবার উঠানো হলো শব। ঘানিমকে পেয়ে দোকানদাররা খুব খুশি হলো। বি’দেশী হয়েও সে তাদের কাজের সময় এসেছে।

কবর দেওয়া শেষ হতে অ’নেক রাত হয়ে গেলো! ঘানিমের। ভয় করতে লাগলো। বাসাতে তার দ্বি’তীয় কোন লোক নাই। অ’থচ চোর ডাকতের উপদ্রব্য যথেষ্টই আছে। যদি তার ঘরের তালা ভেঙে চুরি করে নিয়ে যায় সব মা’লপত্র। ঘানিম দ্রুত পা চালি’য়ে বাসার দিকে এগোতে থাকে। কিন্তু কিছু দূরে গিয়ে আর এগোতে সাহস পায় না। সামনে একটা’ বান্দাবন পেরুতে হবে। শেয়াল, পেচা, হোদল প্রভৃতি নানারকম জন্তুজানোয়ারের ডাক শুনতে পেলো। ঘানিম দাঁড়িয়ে পড়ে; অ’চেনা অ’জানা জায়গা। রাতের বেলায় এদিকে সে কখনও আসেনি। না জানি কোন বাঘ ভালুকের আস্তানায় গিয়ে পড়বে সে। দারুণ ভয় করতে লাগলো তার। এখন সে কি করবে? কী করে পৌঁছবে তার বাসায়? আর তাছাড়া যাবেই বা কোথায়? কালো লম্বা মতো কি একটা’ বস্তু যেনো তার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। ঘানিম। ভয়ে একপা একপা করে পিছু হটতে থাকে। তারপর পিছন ফিরে চোঁ দৌড়। দৌড়ে যে কোথায় যাবে তার হদিস জানা নাই। উদ্দেশ্যবি’হীন ভাবেই দীেড়তে দৌড়তে এক সময় একটা’ ছোট্ট গোরস্থানে এসে ঢুকে পড়ে। একটু আগে সে তার মা’লপত্রের চিন্তায় অ’স্থির হয়ে পড়েছিলো। এখন কিন্তু সে-সব চিন্তাভাবনা উবে গেছে। আপন প্ৰাণ বাঁচানোর সমস্যাই এখন সবচেয়ে বড় তার কাছে।

কোন এক বড়লোক পরিবারের ব্যক্তিগত সমা’ধিক্ষেত্র। গুটি কয়েক মা’ত্র কবর। মা’ঝখানে বেশ বড় রকমের একটা’ গম্বুজ। পাশেই একটা’ নারকেল গাছ। আর এ পাশে শান বাঁধানো একটা’ চবুতরা। ঘানিম রাতটা’ এখানেই কাটিয়ে দেবে বলে চবুতরার উপরে শুয়ে পড়লো। কিন্তু ঘুম আসে না কিছুতেই। উঠে গিয়ে ফটকের দরজাটা’ বন্ধ করে এসে আবার শুয়ে পড়ে। তবু ঘুম আসে না। একটু পরে দেখতে পেলো, একটা’ লণ্ঠনের আলো শহরের প্রধান ফটক ছাড়িয়ে ক্রমশ ঘানিমের দিকেই আসছে। ভয়ে শিউরে উঠে সে। কি করবে। কোথায় লুকোবে ভেবে পেলো না। এখন যদি দরজা খুলে বাইরে পালাতে যায়, নিৰ্ঘাৎ ধরা পড়ে যাবে ওদের হা’তে। উপায়ন্তর না দেখে নারকেল গাছ বেয়ে উপরে একেবারে মা’থায় উঠে গেলো সে। আলো আরো নিকটবতীর্ণ হলে গাছের মা’থায় বসে ঘানিম দেখলো, তিনটি নিগ্রো। একেবারে দৈত্যের মতো দেখতে। একটা’ বি’রাট বড় বাক্স দুজনে মা’থায় করে বয়ে আনছে। আর একজনের হা’তে একটা’ লণ্ঠন আর একখানা কোদল। ফটকের সামনে এসে লণ্ঠনটা’ উঁচু করে তুলে ধরে একটা’ নিগ্রো আশ্চর্য হয়ে বললো, কী ব্যাপার, সবাব। সন্ধ্যাবেলা আমরা দেখে গেলাম দরজা খোলা। আর এর মধ্যে ভিতর থেকে বন্ধ করলে কে?

সবাব জবাব দিলো, তাই তো, আমা’র মনে হচ্ছে, কাফুর ভিতরে লোক আছে।

তৃতীয় নিগ্রোটা’র নাম বুখাইৎ। বললো, তোমা’দের যেমন বুদ্ধি! মা’লি’ক দরজা খুলে রেখে দেবে তোমা’দের? আর তোমরা এসে দিব্যি মর্যাটা’ তুলে ফলার করো আর কি?

অ’পর দু’জন বলে, দুর্থাৎ, আবোলতাবোল বকছিস খালি’। মা’লি’কের খেয়েদেয়ে কাজ নাই সে এই গোরস্থানের দরজা বন্ধ করতে আসবে।

বুখাইৎ বলে, বি’শ্বাস না হয় ভিতরে ঢুকে দেখো, নিশ্চয়ই কেউ পাহা’রায় আছে! আর এও ঠিক আমা’দের হা’তের আলো দেখার পর সে নারকেল গাছের মা’থায় উঠে লুকিয়ে পড়েছে।

ঘানিম ভাবলো আর কোন বাঁচার উপায় নাই। এখুনি ওরা ভিতরে ঢুকবে। নারকেল গাছে উঠে তাকেহিড়ী হিড় করে টেনে নামা’বে। তারপর? তারপর আর ভাবতে পারে না সে। ঐ তিনটি সুদানী নিগ্রোর হা’তে তার জানটা’ আজ যাবে। একমা’ত্র আল্লাই ভরসা। তিনি ছাড়া আর কেউই বাঁচাতে পারবে না।

দুই নিগ্রো সবাবকে বোঝাবার চেষ্টা’ করলো, সবাব তুই দেওয়ালটা’ টপকে ওপারে গিয়ে দরজা খুলে দে। তোকে সবচেয়ে চর্বি’ওলা মা’ংসগুলো দেবো।

সবাব বললো, আমা’কে কি তোমরা এতোই হা’ঁদা পেয়েছো? তার চেয়ে এসো একসাথে মিলে বাক্সটা’কে দেওয়ালের মা’থায় তুলে ওপারে ফেলে দিই।

কিন্তু অ’ন্যজন রাজি হলো না।–না না সে হয় না। বাক্সটা’ই ভেঙে চুরমা’র হয়ে যাবে।

সবাব মা’থা নাড়ে, তা ভাঙ্গতেও পারে বটে। আবার ওদিকটা’ও ভাবো। আমরা হয়তো ভেতরে ঢুকে দেখলাম আর এক মস্তান তার সাঙ্গ-পাঙ্গ নিয়ে আমা’দের জন্যেই বসে আছে। তখন তাদেরও ভাগ দিতে হবে।

—তুই একটা’ আস্ত গাধা। যত সব বি’দঘুটে কল্পনা—

ওরা দুজনে দেওয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে ফটক খুলে দিলো। সবাব আলো দেখালো আর ওরা দু’জনে বাক্সটা’কে টেনে ভিতরে ঢুকিয়ে আবার দরজাটা’ বন্ধ করে দিলো।

একজন হা’ঁপাতে হা’ঁপাতে বললো, কি শালা লম্বা পথ, ফুরাতে আর চায় না।

বোঝা গেলো অ’নেকটা’ পথ বাক্সটা’ বয়ে নিয়ে আসতে হয়েছে। তারপর কসরৎ করে দেওয়াল টপকে ভিতরে ঢুকেছে। তাই তাদের হা’ঁপ ধরে গেছে। একজন বললে, দাঁড়াও আগে একটু জিরিয়ে নিই। তারপর গর্ত খোঁড়া যাবে ‘খান! এখন সবে মা’ঝ রাত্তির। সকাল হতে ঢের বাকী।

আর একজন বললো, তা এই মা’ঝ রাতে শুয়ে শুয়ে তো আর জিরোনো ঠিক হবে না। শালা ঘুমিয়ে পড়লেই চিক্তির। এক্কেবারে সকাল হয়ে যাবে।

আর একজন বললে তার চেয়ে গল্প বলো, নিজের নিজের খোজা হবার কাহিনী এসে বলি’ আমরা তিনজন। তাতে আয়েসও হবে, গল্পও শোনা যাবে-অ’থচ ঘুমও আসবে না।

বাকী দুজনে সায় দিয়ে বললো, খুব ভালো বলেছো। আজ আমরা নিজের নিজের কাহিনী বলবো। কি করে আমরা খোজা হলাম। সেই কাহিনী।

এই সময় শাহরাজাদ দেখলো, রাত্রি প্রায় শেষ। গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে রইলো সে!

 

আটত্রিশতম রজনী।

শাহরাজাদ আবার কাহিনী শুরু করে। সেই তিনজন সুদানী নিগ্রো তাদের খোজা হওয়ার কাহিনী বলবে বলে ঠিক করলো। প্রথমে শুরু করে সবাব।

নিগ্রো সাবাবের খোজা হওয়ার কিস্সা

আমা’র তখন বয়স মা’ত্র পাঁচ। সেই সময় বাগদাদের বাজারে এনে বি’ক্রি করে দিয়ে যায় আমা’র মা’-বাবা। সুলতানের প্রাসাদের দ্বাররক্ষী আমা’কে কিনে নিয়েছিলো। তার নিজের একটি তিন বছরের মেয়ে ছিলো। আমি যেমন ঘরদোরের কাজ করতাম, তেমনি তার খেলার সাখীও ছিলাম আমিই। আমি তাকে গান শোনাতাম, নাচ করতাম, মজার মজার গল্প করতাম। মোট কথা সে ছিলো আমা’র নিত্য সহচরী।

এইভাবে আমা’র বয়স যখন বারো, তখন ওর দশ। একদিন আমি একটা’ বাগানে নির্জন নিরিবি’লি’ জায়গায় দাঁড়িয়ে গুলতি দিয়ে পাখী তাক করছিলাম। এমন সময় মেয়েটি এসে পিছন থেকে আমা’র চোখ চেপে ধরলো। আমি তখুনি বুঝেছি। কিন্তু না বোঝার ভান করে ওর হা’তটা’ চেপে ধরে বললাম, কে?

কিন্তু মেয়েটা’ জবাব দেয় না। আমা’র পিঠের সঙ্গে ওর বুকটা’ আরও সেঁটে আরও শক্ত করে চেপে ধরে আমা’র চোখ দু’টো। আমি ওর সারা হা’ত দু’টো বাহু পর্যন্ত হা’ত বুলাতে থাকি। কি নরম আর মসৃন সুডৌল ওর বাহু। সদ্য উকি দেওয়া তার ছোট্ট স্তন দুটোর স্পর্শ আমি স্পস্ট অ’নুভব করতে লাগলাম। সে আরও জোরে আমা’র পিঠে চাপ দিল। বুঝলাম, তার স্তন দুটো আমা’র পিঠের চাপে পিস্ট হওয়াতে সে মনে মনে রোমা’ঞ্চ অ’নুভব করছে। আমা’র পিঠে ওর বুকের ছোট ছোট স্তন দুটি পিষ্ট হতে থাকলো। কেমন যেন শিহরণ খেলে গেলো আমা’র শরীরে। বোধহয় মেয়েটা’রও ঐ একই দশা হয়ে থাকবে। সেও আমা’কে ছাড়ে না। আমিও তাকে ছাড়তে চাই না।

এইভাবে কয়েক মুহুর্ত কেটে গেছে। এবার আমি ওর বাহু ছাড়িয়ে গলায় হা’ত বুলাতে থাকি। তারপর হা’তখানা ক্রমশ নিচের দিকে নেমে যেতে থাকে। হা’ত বুলাতে বুলাতে ওর ছোট ছোট কচি বুকগুলোর উপর নিয়ে আসলাম। কি নরম আর গরম। মুঠির মধ্যে নিয়ে কিছুক্ষন টিপলাম। আহ কি সুখ। হা’ত আরো নামিয়ে তলপেটে রাখলাম। নাভির গর্তে সুরসুরি দিলাম। আরো নিচে নামিয়ে ওর দুপায়ের সন্ধিস্থলে রাগলাম। পুরো গরম হয়ে আছে জায়গাটা’।

এমন সময় মেয়েটা’ খিলখিল করে হেসে আমা’র হা’ত ছাড়িয়ে নিয়ে ছুটে দৌড় মা’রে। কিন্তু বেশী দূর যায় না। একটা’ বি’রাট মোটা’ গাছের গুডি পড়েছিলো, তার ওপরে গিয়ে শুয়ে পড়ে সে। আমিও ছুটতে ছুটতে গিয়ে তার ওপরে হুমডি খেয়ে পড়ি। তারপর শুরু হয় ধস্তাধস্তি। কামড়া কামডি, খামচাখামচি। ও আমা’র ডান হা’ত-এর বাহুতে এমন জোরে দাঁত বসিয়ে দিলো যে রক্ত বেরিয়ে গেলো। আমি ছেড়ে কথা কইবার ছেলে নই। দিলাম ওর ঠোঁটটা’ কামড়ে। ও আমা’কে এলোপাথাড়ী কিল চড় ঘুষি মা’রতে লাগলো। আমা’র বেশ ভালোই লাগছিলো। ওর ছোট্ট নরম হা’তের মা’র আমা’র বেশ আরামই লাগছিলো। এমন সময় একটা’ কাণ্ড ঘটলো। আমি আলতো করে ওর কোমরটা’ আমা’র দেহের কাছে টেনে নিতেই আবার ছুটে পালাবার চেষ্টা’ করলো। কিন্তু আরও ক্ষিপ্রতায় ওর বুকে হা’ত ঢুকিয়ে চেপে ধরলাম সেমিজটা’। আর সঙ্গে সঙ্গে দুফালা হয়ে ছিঁড়ে গেলো। সেই প্রথম দেখলাম ওর দেহে সবে যৌবনের জোয়ার আসতে শুরু করেছে। লজ্জায় ও দু’হা’ত দিয়ে বুকটা’ ঢাকবার ব্যর্থ চেষ্টা’ করতে লাগলো। আমি তখন হা’সছি। ওর চোখে দেখলাম এক আদিম হিংস্রতা। এক মুহূর্ত। তারপরে ও ঝাঁপিয়ে পড়লো আমা’র ওপর। ওর এই আচমকা আক্রমণের জন্যে তৈরি ছিলাম না। টা’ল সামলাতে না পেরে চিৎপাত হয়ে পড়ে গেলাম। তারপর আমা’র ইজেরটা’ ধরে এমন জোরে একটা’ হ্যাঁচকাটা’ন মা’রলে যে, পড়াৎ করে ছিঁড়ে ওর হা’তের মধ্যে চলে গেলো একটা’ টুকরো। আর সেই মুহূর্তে নিশ্চল নিথর পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলো সে। অ’পলক চোখে দেখতে থাকলো আমা’র ছেড়া ইজেরটা’র দিকে। আমিও নির্বাক নিশ্চল। তারপর আকাশে ঝড় উঠলো। কালো মেঘে ঢেকে গেলো সারা দুনিয়া। ভয় হলো এখনই প্রবল বর্ষণ শুরু হবে। হলোও তাই। সেই প্রথম বর্ষণেই সব ভেসে গেলো।

বাড়ি ফিরে গেলো সে ভয়ে ভয়ে। জামা’ ছেড়া, রক্তের দাগ। ওর মা’র সন্দেহ হলো! ভালো করে পরীক্ষা করে বুঝলো মেয়ে সর্বনাশ করে এসেছে। মা’য়ের কাছে কিছুই গোপন করতে পারলো না সে। ওর মা’ আমা’কে কিছু বললো না। কারণ বকাবি’কি করতে গেলে লোক জানাজানি হয়ে যাবে। তা ছাড়া মেয়েটা’র বাবা ছিলো ভীষণ কড়া লোক। হয়তো আমা’র সঙ্গে তার মেয়েকেও কেটে ফেলবে। ওর মা’ শাদীর পাত্র খুঁজতে লাগলো। একটা’ নাপিতের ছেলের সঙ্গে অ’নেক আগে থেকেই কথাবার্তা হয়েছিলো। এবার পাকাপাকি। শাদীর তারিখ ঠিক হয়ে গেলো।

মেয়ে বায়না ধরলো, আমি সঙ্গে না গেলে সে শাদী করবে না। তখন ঠিক করা হলো আমা’কে খোজা করে মেয়ের সঙ্গে পাঠানো হবে। একদিন নাপিত ডেকে আমা’কে খোজা করা হলো। এর মা’সখানেকের মধ্যেই শাদী হয়ে গেলো তার। ওর দেখাশুনা করার জন্যে আমিও গেলাম ওর শ্বশুর বাড়ি। সেইখানেই আমা’র জীবনের বেশী সময় কেটে গেছে। তারপর একে একে মেয়েটির মা’ বাবা এবং স্বামী মা’রা গেলো। আমি চাকরী পেলাম সুলতানের প্রাসাদে। সেই থেকে ওখানেই আছি। এই হলো আমা’র খোজা হওয়ার কাহিনী। এবার কাফুর, তুমি শোনাও তোমা’র কিসসা।

নিগ্রো কাফুর খোজা হওয়ার কিস্সা

কাফুর বলতে থাকে :

আমা’র বয়স তখন সবে আট। ঐ বয়সেই আমি মহা’ ধডিবাজ হয়ে উঠেছিলাম। আমা’র মতো অ’সৎ এবং মিথ্যেবাদী সে তল্লাটে ছিলো না কেউ। এমন কায়দা করে সাজিয়ে গুছিয়ে মিথ্যে কথা বলতাম, শুনে লোকের আক্কেল গুড়ুম হয়ে যেতো। তবে একটা’ গুণ ছিলো আমা’র। আমি যখন তখন মিথ্যা কথা বলতাম না। বছরে মা’ত্র একটা’ই মিথ্যে বলতাম। এবং সেইটে বড় জব্বর। তার জন্যে আমা’র কতো মা’লি’কের কতো যে ক্ষয়ক্ষতি হয়ে গেছে তার ইয়াণ্ডা নাই। এইভাবে একবার এক মা’লি’কের সঙ্গে মিথ্যে রসিকতা করতে গিয়ে আমি আমা’র পুরুষ অ’ঙ্গ হা’রিয়ে খোজা হয়েছিলাম। সেই কাহিনীই এখানে সংক্ষেপে শোনাচ্ছি। তোমা’দের।

তখন আমি এক সওদাগরের হেপাজতে। ক্রীতদাস কেনাবেচাই তার ব্যবসা। আমা’র আগের মা’লি’ক তার কাছে বি’ক্রি করে গেছে। এবার সে আমা’কে নীলামে তুললো। দাম উঠলো ছয়শে দিরহা’ম। আমা’র নতুন মা’লি’ক সওদাগরের হা’তে গুণে গুণে ছয়শ্যে কুড়ি দিরহা’ম দিলো। কুড়ি দিরহা’ম দালালী। সওদাগর আগেই বলে দিয়েছিলেন, কাজে কর্মে আমি দারুণ চৌকস। শুধু একটা’ই দোষ আমা’র, বছরে মা’ত্র একবার মিথ্যে কথা বলা। এই দোষের কথা জেনেশুনেই আমা’র মা’লি’ক আমা’কে কিনে নিয়ে এলো। নতুন জামা’কাপড় দিলো। ভালো দেখে শোবার আস্তাবলী দিলো। মোট কথা খাওয়া পরার ব্যবস্থা বেশ ভালোই করেছিলো। মা’লি’ক আমা’কে ভালোভাবে কাজ করার জন্যে অ’নেক বোঝালো। মিথ্যে কথা বলা মহা’পাপ, দোজকে যেতে হয়। সুতরাং কোন কারণেই যেন আমি মিথ্যে কথা না বলি’। কিন্তু ওদের ভালো কথা কি আর আমা’র ভালো লাগে। মুখে বললাম, না না, আর কখনো মিথ্যে বলবো না, কিন্তু মনে মনে শয়তানী পাঁচ খুঁজতে থাকলাম। এই ভাবে ছ’ মা’স কেটে গেলো। মা’লি’ক ভাবলো তার উপদেশে কাজ হয়েছে। আমি সুবোধ বালক হয়ে গেছি।

একদিন সকালে মা’লি’ক বললো, কাফুর, চল আজ এক জায়গায় যাবো। অ’নেক লোক আসবে। খানাপিনা, নাচ, গান খুব হবে সেখানে।

মা’লি’ক আমা’কে শহরের বাইরে, অ’নেক দূরে এক বাগানবাড়িতে নিয়ে গেলো! এক এক করে মা’লি’কের বন্ধুবান্ধব আসতে শুরু করলো। মা’লি’ক আমা’কে বললো, কাফুর, একটা’ মস্ত ভুল হয়ে গেছে রে। এখন কী করা যায়?

আমি বললাম, কী করতে হবে বলুন?

—তুই আমা’র খচ্চরটা’ নিয়েবাড়ি চলে যা। আলমা’রীর মা’থায় দশ জোড়া তাস কিনে রেখেছি। ওগুলো জলদি নিয়ে আয়। তা না হলে, আসর জমবে না।

আমি ঘাড় নেড়ে বললাম, আপনি কিছু ভাববেন না। আমি ছুটে যাবো। আর ছুটিয়ে আসবো।

খচ্চরটা’ ছুটিয়েই বাড়ি চলে এলাম। হা’উ মা’উ করে কাঁদতে কাঁদতে  বাড়ির ভিতরে ঢুকলাম। মা’লকিন, তার দুই মেয়ে, দুই ছেলে সবাই ছুটে এলো।

-কী ব্যাপার কাঁদছিস কেন?

আমি কোন জবাব দিই না। আরও জোরে ইনিয়ে বি’নিয়ে কাঁদতে থাকি।

ওরে বাবারে, কি হবে রে, কি করে আমি সে কথা বলবো রে।

এবার আমা’র মা’লকিন, চিৎকার করে উঠলো-কাফুর! কি হয়েছে বল।

–মা’লি’ক মা’রা গেছে।

–মা’লি’ক মা’রা গেছে—!

—হ্যাঁ মা’লকিন, মা’লি’ক মা’রা গেছে।

ছেলে মেয়ে বউ সবাই এক সঙ্গে কঁকিয়ে উঠলো, কি হয়েছিলো? কি করে মা’রা গেলো?

আমি তখন বানিয়ে বললাম।-বাগান বাড়ির পাঁচিলের ওপর উঠে একটা’ সরবতী লেবুর ডাল থেকে লেবু পাড়তে উঠেছিলো মা’লি’ক। হঠাৎ বেসামা’ল হয়ে নিচে পড়ে যায়। আর সঙ্গে সঙ্গেই সব শেষ। এখন কি হবে, মা’লকিন?

কাদতে লাগলো সবাই। ঘরের দামী দামী বাসনপত্র ছুঁড়ে ছুঁড়ে ভাঙ্গতে লাগলো। চেয়ার, টেবি’ল, আলমা’রী সব বাইরে বের করে পিটিয়ে পিটিয়ে ভাঙ্গা হলো। খাট পালঙ্ক লেপ তোষকে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলো। দেওয়ালে। আলকাতরা লেপে দেওয়া হলো। মোট কথা, বাড়ির মা’লি’ক মা’রা গেলে যা যা করে শোকপ্রকাশ করতে হয় তার কিছুই বাদ রাখা হলো না।

এর পর চিরাচরিত প্রথা অ’নুসারে বোেরখা খুলে, মা’থার চুল এলোমেলো করে কাঁদতে কাঁদতে রাস্তায় ছুটতে থাকলো। দু’ পাশের বাড়ির লোকজন বেরিয়ে এসে সমবেদনা সান্ত্বনা জানাতে লাগলো।–কি করবে বাছা, সবই আল্লাহর খেলা। তার বি’ধান মেনে নিতেই হবে।

মা’লকিন বললো, ওরে কাফুর আমা’কে সেই বাগানবাড়িতে নিয়ে চলরে বাবা। গোর দেবার আগে তাকে একবার শেষ দেখা দেখে আসি।

পাড়া পড়াশীরা বললো, অ’পঘাতে মা’রা গেছে। কোতোয়ালীতে খবর পাঠানো দরকার। কোতোয়াল সাহেব না যাওয়া পর্যন্ত কবর দেওয়া যাবে না।

মা’লকিনকে সঙ্গে নিয়ে তারা কোতোয়ালের উদ্দেশে রওনা হলো। আর সেই ফাঁকে আমি গোলাম বাগান বাড়িতে।

শাহরাজাদ দেখলো রজনী অ’তিক্রান্ত। গল্প থামিয়ে সে চুপ করে বসে রইলো।

 

উনচল্লি’শতম রজনীতে আবার সে শুরু করে :

খোজা কাফুর তার কাহিনী বলছে :

মা’লকিন যখন কোতোয়ালের উদ্দেশে রওনা হলো আমি তখন চলে গেলাম বাগানে। সারা গায়ে কাদামা’টি মেখে কিম্ভুতকিমা’কারের মতো সাজলাম। হা’উমা’উ করে কাঁদতে কাঁদতে গিয়ে হা’জির হলাম মা’লি’ক-এর সামনে।

—ও মা’গো, ও বাবাগো, আমা’র কি হলো গো? আমা’র মা’লকিন, আমা’র ছোট্ট দুই মা’লকিন, আমা’র ছোট দুই মা’লি’ক-ও বাবা গো, কি করে বলবো এসব কথা—

আমা’র মা’লি’ক কিছুই বুঝতে পারে না। ছোড়াটা’ কি বলে?-কীরে কি হয়েছে কেঁদেছিস কেন?

–সব শেষ হয়ে গেছে মা’লি’ক, সব খতম

—কী সব শেষ হয়ে গেছে রে? কী সব যাতা বলছিস? তোর কি মা’থাটা’থা সব খারাপ হয়ে গেলো নাকি?

–হয়নি। কিন্তু এবার হয়ে যাবে। ওরে বাবা, একসাথে অ’তোগুলো মা’নুষ-? না না, আমি বলতে পারবো না, আমি বলতে পারবো না—

আমি মা’টিতে শুয়ে গড়াগড়ি খেতে লাগলাম।

মা’লি’কের এবার ভয় হলো।–কাফুর! কি হয়েছে বাবা, তাড়াতাডি বল।

মা’লি’ক, আমি এখান থেকেবাড়ি ফিরে দেখি আমা’দের বাড়ির সামনে হা’জার হা’জার লোক। এমন সব চেচামেচি—কিছুতেই বুঝতে পারছি না। কাউকে জিজ্ঞেস করলেও কেউ কিছু জবাব দেয় না।

মা’লি’ক অ’ধৈৰ্য হয়ে ওঠেন, কাফুর? মোদ্দা কথাটা’ কি-তাই আগে বল, বাঁদর। তারপর শুনবো তোর ভ্যানতারা।

মা’লি’ক, লোকজন দেখে আমি ভ্যাবাচক খেয়ে গেছি তখন। লক্ষ্যই করিনি যে আমা’দের গোটা’ বাড়িটা’ই ধসে পড়ে গেছে।

–বলি’স কিরে? কারো লাগে টা’গে নি তো?

—না তেমন কিছু না, তবে মরে গেছে।

—মরে গেছে? কে মরে গেছে? তোর মা’লকিন?

–জী হ্যাঁ।

–তো ছোট দুই মা’লকিন? তারা?

–জী, তারাও মা’রা গেছেন।

এবার বি’কট এক চিৎকার দিয়ে ওঠে মা’লি’ক। –তোর ছোট দুই মা’লি’ক? তারা বেঁচে আছে তো?

—জী না। তারাও চাপা পড়ে মা’রা গেছে। বাড়ির একটা’ জনপ্রাণী বঁচেনি। গরু, ছাগল, মুরগী সব-সব দেওয়াল চাপা পড়ে শেষ হয়ে গেছে।

মা’লি’ক এবার দু’হা’তে মুখ ঢেকে ধপাস করে মা’টির উপর বসে পড়লো। ছোট ছেলের মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো। দাড়ি উপড়াতে থাকলো। জামা’কাপড় ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেললো।

—হা’য় আল্লাহ আমি কি পাপ করেছিলাম, এইভাবে আমা’কে সাজা দিলে? আমা’র বি’বি’ আমা’র আদরের মেয়ে আমা’র জানের কলি’জা ছেলে–সব তুমি কেড়ে নিলে? এই কি তোমা’র বি’চার মা’লি’ক?

উপস্থিত বন্ধুবান্ধব অ’ভ্যাগতরা মা’লি’ককে সান্ত্বনা দিতে থাকে, কি করবে বলো, কপালের লি’খন কেউ খণ্ডাতে পারে না। ওঠি, চলো, ঘরে যাই! তাদের ইস্তাকালের কাজ কাম সমা’ধা করতে হবে তো। বি’পদের দিনে ভেঙে পড়লে তো চলবে না, ভাই। নিজেকে শক্ত করো। খোদা যা করে, তাকে মেনে নিতেই হবে।

মা’লি’ককে টেনে তোলে তারা। মদ খাওয়া মা’তালের মতো টলতে থাকে সে। সবাই মিলে ধরাধরি করে তাকে বাড়ির দিকে নিয়ে আসতে থাকে। এমন সময় অ’দূরে শোনা গেলো কান্নার রোল। মনে হলো বি’রাট একটা’ শোক মিছিল এগিয়ে আসছে বাগানবাড়ির দিকে। মিছিল আরো কাছে এলে দেখা গেলো তার পুরোভাগে রোরুদ্যমা’না মা’লকিন। বোেরখা নাই। এলোমেলো অ’বি’ন্যস্ত চুল। ঠিক একটা’ পাগলীর মতোন।

মা’লি’ক অ’বাক বি’স্ময়ে দেখতে থাকে। মা’লকিনের পিছনে তার দুই মেয়ে আর দুই ছেলে। সবাই হা’হুতাশ করে কেঁদে ভাসিয়ে দিচ্ছে। সবারই সাজপোশাক ছিন্ন ভিন্ন। চুল উস্কো খুসকো। মা’লকিন এসে তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো।—ওগো, তুমি বেঁচে আছো?

মা’লি’ক কিছুই বুঝতে পারে না। বোকার মতো ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে।-কেন, লাগবে কেন? কি হয়েছে আমা’র?

মা’লকিন বলে, সে কি? তুমি নাকি পাচিলের উপর থেকে পড়ে মরে গেছ?

—মরে গেছি? আমি? আমি তো শুনলাম বাড়ি ধসে পড়ে তোমরা সবাই মা’রা পড়েছে?

—বাড়ি ধসে পড়ে? আমরা সবাই মা’রা গেছি? কে? কে? তোমা’কে এসব ডাহা’ মিথ্যে খবর দিয়েছে, বলো তো?

—কেন? তোমা’র গুণধর চাকর কাফুর। সেই তো কাঁদতে কাঁদতে  এসে বললো, তোমরা কেউই বেঁচে নাই।

মা’লকিন এবার বুঝতে পারলো, সব আমা’র শয়তানী।—ব্যাটা’, শয়তান, ছুঁচো এত বড় বদমা’ইশ! এইরকম ডাহা’ মিথ্যে কথা কেমন নিখুঁত করে সাজিয়ে বলেছে। অ’বি’শ্বাস করার উপায় ছিলো না।

মা’লি’ক এসে আমা’কে এক ঘুষি মেরে নিচে ফেলে দিলো। পাশে একটা’ শাবল পড়েছিলো, সেটা’ তুলে নিয়ে তেড়ে এলো আমা’র দিকে, হা’রামী বাচ্চাটা’কে আজ মেরেই ফেলবো।

আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, আপনি আমা’কে মা’রছেন কেন?

—মা’রবো না তো কি সোহা’গ করবো, বাঁদর কোথাকার।

কিন্তু সওদাগরের কাছ থেকে যখন আমা’কে কিনে আনেন তখন একটা’ শর্তের কাগজে আপনি সই করে এসেছেন, মা’লি’ক। সওদাগর আপনাকে সব খুলেই বলেছিলো। কাজে কামে আমা’র কোন গাফিলতি নাই। দোষের মধ্যে একটা’ই বছরে একটা’ শুধু মিথ্যে বলা। আপনি সব শুনেও আমা’কে কিনে নিলেন। সওদাগরের সঙ্গে আপনার চুক্তি হয়েছে। কাজ কাম ঠিক মতো না করলে আপনি আমা’কে সাজা দিতে পারেন। কিন্তু মিথ্যে কথা বললে বছরে প্রথমবার আমা’কে কোনও সাজা দিতে পারবেন না। প্রত্যেক বছরে একবার মা’ত্র আমি মিথ্যা কথা বলবো এবং তার জন্যে আপনার যা-ই ক্ষয়ক্ষতি হোক, আপনাকে মেনে নিতে হবে। এই ছিলো আপনার শর্ত।

কাফুর-এর কথা শুনে মা’লি’ক শাবলটা’ নামিয়ে রাখে।—তা বলে এই রকম মিথ্যে রসিকতা? এতে তো মা’নুষের জীবন সংশয় ঘটতে পারে।

ঘটতে পারে ঘটবে। আপনাকে তো কিছু গোপন করা হয়নি। আর তাছাড়া আমা’র মিথ্যে কথাটা’ তো এখনও পুরো বলা হয়নি মা’লি’ক। সবে অ’র্ধেক হয়েছে। আরও অ’র্ধেক এখনও বাকী।

মা’লকিন চোখ বড় বড় করে বলে, ওরে বান্দর, এই তোর আধখানা রসিকতা। তা হলে পুরোটা’ কি, সোনার চাঁদ? দাঁড়াও তোমা’র বাকী রসিকতাটা’ আমি দেখিয়ে দিচ্ছি।

কোতোয়াল পাশেই দাঁড়িয়েছিলো। তার হুকুমে সিপাই আমা’কে সপাং সপাং করে বেতের চাবুক চালাতে থাকলো। এর পর আমা’র আর জ্ঞান নাই। যখন জ্ঞান ফিরলো দেখি আমা’র পুরুষাঙ্গটা’ কাটা’। ওষুধ লাগিয়ে তুলো কাপড় দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

মা’লকিন বললো, বাকী অ’র্ধেক রসিকতাটা’ এ-ই—বুঝলে বাঁদর। আমা’র শখের ঘরদোর, খাট, পালঙ্ক, আসবাবপত্র সব তুমি নষ্ট করে দিয়েছ। সেই কারণে আমিও তোমা’র জীবনের আসল জিনিসটা’ই ছেটে বাদ করে দিয়েছি।

এর পর মা’লি’ক আমা’কে বাজারে নিয়ে গিয়ে চড়া দামে বি’ক্রি করে দিলো। সাধারণ নফর চাকরীদের চেয়ে খোজাদের বাজার দর অ’নেক বেশী। এইভাবে দু’ বছর চার বছর বাদ বাদ আমি নানা মা’লি’কের হা’ত বদল হতে হতে একদিন খলি’ফার হা’রেমে এসে পড়লাম। তারপর থেকে এখানেই রয়ে গেছি!

কাফুর বললো, এই হলো আমা’র খোজা হওয়ার ইতিবৃত্তান্ত।

অ’ন্য দুজনে কাফুরের পিঠে গাঁটা’ বসিয়ে দিয়ে বললো, -শালা মা’ইরি, এক্কেবারে হা’ড়ে হা’রামজাদা। এমন রসিকতা-জান কয়লা করে ছেড়ে দেবে!

নিগ্রো বুখাইতের খোজা হওয়ার কিস্সা

এবার বুখাইতের পালা।

বুখাইত বললো, শোনো ভাই, আমা’র দুঃখের কাহিনী বলতে গেলে রাত কাবার হয়ে যাবে। কিন্তু রাতের অ’ন্ধকার থাকতে থাকতে কাজ হা’সিল করে এখান থেকে কেটে পড়তে হবে। তাই আজ আর তোমা’দের সে কাহিনী শোনাবার সময় নাই। ভালোয় ভালোয় কাজ কাম শেষ করে। নাও। তারপর ফিরে গিয়ে বলবো।

অ’ল্প কথায় বলছি। আমি এক বাড়ি ক্রীতদাসরূপে থাকতাম। আমা’র মা’লকিনটির বয়স ছিল কম। ছিমছাম চেহা’রা। যাকে বলে একেবারে ডাসা পেয়াধার মত আমি কাজের ফাকে তার দিকে আড় চোখে তাকিয়ে থাকতাম। চেষ্টা’ করতাম তার মনের খবর নিতে। সে তার শরীরের যৌবনচিহ্নগুলাে ঢেকেঢুকে রাখলেও মা’ঝে মধ্যে তার কাপড় চোপড় কেমন বেসামা’ল হয়ে পড়ত। তার নিটোল স্তনদুটোর এক বি’রাট ভগ্নাংশই কামিজের ফাঁক দিয়ে উকি মা’রত। আসলে সে দুটো ছিল এতই বড় যে কামিজের তলায় বন্দী হয়ে থাকতে চাইত না। বি’দ্রোহ করত। আমা’র সুযােগ সন্ধানী চোখ দুটো সে-সুযােগের প্রতীক্ষায় সর্বদা ছোঁক ছোঁক করত। আর থেকে থেকে আমা’র খুনে ধরে যেত মা’থায়। নিজেকে আর সংযত রাখা আমা’র পক্ষে অ’সম্ভব হয়ে পড়ত।

একদিন আমা’র মা’লি’ক এক জরুরী কাজে বাইরে গিয়েছিলেন। আমরা দুটোমা’ত্র প্রাণী বাড়িতে। আমা’র মা’থার দুষ্ট পােকাগুলাে কিলবি’লি’য়ে উঠল। আমা’র কুড়ি বছরের যৌবনকে আর নিজের হা’তের মুঠোর মধ্যে রাখতে পারলাম না। অ’তর্কিতে ঝাপিয়ে পড়লাম মা’লকিনের ওপর। তার জামা’ একটা’নে ছিড়ে ফেললাম। তার বড় বড় স্তনদুটোকে চোখের সামনে দেখে পাগল হয়ে গেলাম। দুহা’তে ইচ্ছামত দলাই মলাই করলাম, চুষলাম। তারপর কি হ’ল আশাকরি আর খুলে বলার দরকার নেই। সেদিনের সে সাময়িক আনন্দানুভূতিই আমা’র কপাল পােড়ার একমা’ত্র কারণ।

আমা’র মা’লি’ক বাড়ি এসে সবকিছু শুনলেন। আমা’কে নিয়ে ছােট্ট এক কামরায় তালাবন্ধ করে রেখে দিলেন। পরদিন সকালে নাপিত এসে পুরুষের যা অ’মূল্য সম্পদ সেটি ছেদন করে আমা’কে সারা জীবনের মত খােজা করে দিল।

যাক, ওসব কথ্য পরে শুনো, এখন এসো গর্ত খুঁড়ি।

কোদাল দিয়ে মা’টি কেটে বাক্সটা’র মা’পে একটা’ বেশ বড় সড় গর্ত খুঁড়লো ওরা। তারপর দু’জনে ধরে বাক্সটা’ নিচে নামিয়ে দিলো। আর একজন উচু করে আলো ধরে রাখলো। এর পর তিনজনে মিলে মা’টি চাপা দিয়ে, গোরস্থান থেকে বেরিয়ে হন হন করে হেঁটে নিমেষে অ’দৃশ্য হয়ে গেলো।

ঘানিম নারকেল গাছ থেকে নেমে এলো। হা’ত দিয়ে মা’টি সরিয়ে সরিয়ে বাক্সটা’কে টেনে উপরে তুললো। একটা’ পাথরের চাই দিয়েবাড়ি মেরে মেরে তালাটা’ ভেঙে ফেললো! ডালাটা’ তুলতেই মা’থাটা’ বোঁ করে ঘুরে গেলো। ফুটফুটে ফর্সা ডানাকাটা’ পরীর মতো সুন্দরী এক যুবতী ঘুমিয়ে আছে। তার পরণে সূক্ষ্ম কারুকার্য করা দামী সিঙ্কের সাজপোশাক। গলায় সাতনরী জড়োয় হা’র। নাকে হীরের নাকছবি’। মা’থায় টা’য়রা। বাহুতে তাগা। বাজুতে বাজীবনধ। কোমরে বি’ছা। পায়ে মল। আগাগোড়া শরীরটা’ সোনা হীরা জহরতে মোড়া। ঘানিম ভাবে এতো কোনও সাধারণ ঘরের মেয়ে নয়। নিশ্চয়ই কোনও সুলতান বাদশাহর শাহজাদী! বুকে হা’ত রেখে অ’নুভব করলো, মরা নয় জীবন্ত। ঘুমিয়ে আছে। মা’নে নাকে ওষুধ ধরে ঘুম পাডিয়ে রাখা হয়েছে। একটা’ বি’শ্ৰী ওষুধের আরাক এসে ঘানিমের নাকে লাগে, মা’থাটা’ ঝিম ঝিম করে ওঠে। ঘুম ঘুম আমেজ আসে। কিন্তু নাকে কাঠি দিয়ে জোরে জোরে হেঁচে নিজেকে ঠিক করে নেয়। মেয়েটা’র গায়ে নাড়া দেয়। কিন্তু অ’ঘোর ঘুমে সে কাতর। ঘানিম ভাবে, কি করে ওর ঘুম ভাঙ্গানো যায়—নাকের ফুটোর ভিতরে সুড়সুডি দিতে থাকে। মা’থাটা’ এদিক ওদিক নাডিয়ে নাকটা’ সরিয়ে নিতে চায়। তারপর জোরে জোরে হা’ঁচতে থাকে। ঘানিম দেখলো, একটা’ বড় ডেলা নাক থেকে ছিটকে বেরিয়ে এলো। অ’জ্ঞান করার ওষুধ। এইবার ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো মেয়েটি। ওষুধের বডিটা’ কুড়িয়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলো ঘানিম। ওরে বাস, একটা’ হা’তীর নাকে গুজেও দিলেও তা বি’শঘণ্টা’ ঘুমিয়ে থাকবে।

চোখ মেলে তাকালো বটে, কিন্তু তখনও তন্ময়ভােব কাটলো না, স্বগতভাবে বি’ড়বি’ড় করে কি সব বলতে থাকে। সব কথা বোঝা যায় না। দু-একটা’র অ’র্থ উদ্ধার করতে পারে ঘানিম। ওঃ কি গরম, একটু ঠাণ্ডা হা’ওয়া করো, আমা’কে একটু পানি দাও। কোথায় রে, কোথায় গেলি’ সব? কাছে আয় ও সীতারা, ও বাজিয়া, কাছে আয়, হা’ওয়া করা। কইরে, তোরা সব গেলি’ কোথায়? কথা বলি’স না কেন?

কিন্তু কেউ জবাব দিলো না। জবাব দেবার মতো একমা’ত্র ঘানিম ছাড়া তো সেই গোরস্থানে দ্বি’তীয় কোন মা’নুষ নাই। এবার বড় বড় চোখ মেলে তাকালো সে। এপোশ ওপোশ উপরে নিচে সব ভালো করে দেখে চিৎকার করে উঠলো।—এখানে, এই গোরস্থানে আমা’কে কে নিয়ে এলো? আমা’র প্রাসাদের হা’রেম? আমা’র খাট পালঙ্ক, দাসী, খোজা তারা সব কোথায় গেলো? হা’য় আল্লাহ কে আমা’র এই সর্বনাশ করলো?

এতক্ষণ ঘানিম চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলো। ওকে। বললো, সুন্দরী, আমা’র নাম–ঘানিম ইবন আয়ুব। তোমা’র কোনও ভয় নাই। যদিও তুমি তোমা’র প্রাসাদের অ’ন্দরমহল থেকে এই গোরস্থানে এসে পড়েছে, তবু ভরসা রাখো, তোমা’র কোন ক্ষতি আর কেউ করতে পারবে না। আমা’কে বি’শ্বাস করো, আমি তোমা’র ভালো-বই মন্দ করবো না। আল্লাহর অ’পার মহিমা’, তা না হলে আজ রাতে আমিই বা এখানে আসবো কেন? তিনি আমা’কে এখানে নিয়ে এসেছেন। তোমা’কে বাঁচাতে-উদ্ধার করতে। আমি আল্লাহর বান্দা। তোমা’রও গোলাম। তুমি যা হুকুম করবে। আমি তাই তালি’ম করবো।

মেয়েটি দু’হা’ত দিয়ে চোখ রাগড়াতে লাগলো। ভাবলো, বুঝি বা খোয়ার। কিন্তু না, সে তো জেগেই আছে।

—আমি কি করে এখানে এলাম, বলো তো।

তখন ঘানিম আদ্যোপোন্ত সব খুলে বললো। মেয়েটি বললো, ঠিক আছে, আমি যেমন বাক্সের মধ্যে ছিলাম সেইভাবেই আমা’কে শুইয়ে রেখে ডালা বন্ধ করে দাও। একটা’ খচ্চর ভাড়া করে। নিয়ে এসে তোমা’র ঘরে নিয়ে চলো। আমি তোমা’কে আমা’র সব কাহিনী খুলে বলবো সেখানে।

তখন সবে সূর্য উঠছে। ঘানিম মেয়েটিকে বাক্সে ভরে গোরস্থান থেকে বেরিয়ে পড়ে। একটু পরে একটা’ খচ্চর ভাড়া করে নিয়ে আসে। চালকাঁটা’র সঙ্গে ধরাধরি করে বাক্সটা’ চাপিয়ে দেয়। খচ্চরের পিঠে।

সারাটা’ পথ ঘনিম ভাবতে ভাবতে আসে, নিশ্চয়ই কোনও সুলতান বাদশাহর পরিবারের মেয়ে সে। তার গায়ে খুব কম করে হলেও দশ হা’জার দিনারের গহনা আছে। নানারকম কল্পনার জাল বুনতে বুনতে এক সময় তার বাসার দরজায় এসে হা’জির হয়।

এইসময় রাত্রি শেষ হয়ে আসে। শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে যায়।

 

চল্লি’শতম রজনীতে আবার গল্প শুরু হয়।

তারপর শুনুন জাঁহা’পনা, খচ্চরের পিঠ থেকে বাক্সটা’ নামিয়ে ঘানিম ঘরে নিয়ে যায়। ডালা তুলে মেয়েটিকে বেরিয়ে আসতে সাহা’য্য করে। ঘরের চারপাশ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে থাকে সে। মেজেট দামী গালি’চায় মোড়া। দরজা জানলায় সিস্কের কাজ করা পর্দা। পালঙ্কে মখমলের শয্যা। কুর্নিশ কেদারায় ঘরটা’ বেশ সাজানো গোছানো। পালঙ্কের একপাশে বসে বলে, শোনো ঘানিম, আমা’র বড় খিদে পেয়েছে। একটু কিছু খেতে দাও।

ঘানিম বাজারে গিয়ে দুম্বার চাপ, শাহী হা’লওয়া, পেস্তার বরফী, বাগদাদী লাড্ডু, কিছু আঙ্গুর আপেল কলা, আর এক ঝারি মদ নিয়ে এলো। আর নিয়ে এলো কিছু সুগন্ধী ফুল। খানাপিনার এই আয়োজন দেখে মেয়েটির চোখ খুশিতে নেচে ওঠে। রেকবী করে সাজিয়ে দিলো ঘানিম, নাও, খাও।

—বারে, আমি এক খাবো নাকি? তুমিও বসো।

ঘানিম বলে, বেশ বসছি।

অ’নেকটা’ দূরত্ব বজায় রেখে ঘানিম বসলো ওর পাশে। মেয়েটির কিন্তু মোটেই পছন্দ হলো না। একেবারে ঘানিমের গা ঘেসে এসে বসলো সে। —অ’ত দূরে দূরে বসছো কেন? খিদে পেয়েছে বলে তোমা’কে সুদ্ধ খেয়ে ফেলবো নাকি?

ঘানিম মা’থা নিচু করে হা’সে। জবাব দিতে পারে না-না, মা’নে—মা’নে–

—আর মা’নে মা’নে করতে হবে না। নাও, খাও! একটা’ মা’ংসের টুকরো ছিঁড়ে নিয়ে ঘানিমের মুখে পুরে দেয়।

মেয়েটির চাপার কলি’র মতো আঙ্গুলগুলোর ছোঁয়া ওর ঠোঁটে লাগে। পলকে সারা শরীরে কি যেন এক শিহরণ খেলে যায়। নিজের মা’ বোন ছাড়া এই প্রথম সে এক অ’চেনা অ’ন্য মেয়ের এত কাছে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসেছে।

মেয়েটি এবার ওর মুখটা’ তুলে ধরে। আহা’ লজ্জা কেন তোমা’র!

ঘানিম কোনও কথা বলে না। ওর চোখ দুটো হা’সে।

—বারে, আমি তো আজ তোমা’র ঘরে মেহেমা’ন। আমা’কে আদর যত্ন করো।

–আলবৎ হয়েছে, খানাপিনা এনে সামনে ধরলেই সব হয়ে গেলো? খাইয়ে দেবে না-?

ঘানিম তাড়াতাডি রেকবী থেকে এক টুকরো মা’ংস তুলে ওর মুখে পুরে দিতে যায়। কিন্তু অ’নভ্যাসের ফলেই হোক, বা হা’তটা’ কেঁপে ওঠার জন্যেই হোক, মেয়েটির কমিজের ওপর পড়ে যায়।

—দিলে তো? দিলে তো মা’টি করে! এখন আমি কি করি? তোমা’র ঘরে আছে নাকি বাড়তি কামিজ?

–আমা’র ঘরে? আমা’র ঘরে মেয়েদের কামিজ আসবে কি করে?

–আচ্ছা, কি করে আসে তাও বুঝি জানো না?

–না তো–

শাদী করলেই আসে। খালি’ কামিজ কুর্তাই আসে না, ঝোলের সঙ্গে মা’ংসও এসে পড়ে।

ঘানিম-এর সারা মুখ লাল হয়ে ওঠে।—না, এখনও আমি শাদী করিনি! তুমি আমা’র জীবনে প্রথম নারী। এর আগে পর্যনারীর সামনে দাঁড়াইনি কখনও।

আহা’-হা’-হা’, চুক চুক। তা হলে তো দারুণ গোস্তাকি করে ফেলেছি। তোমা’কে আমি ছুঁয়ে দিয়েছি। না বাবা, তা হলে সরেই বসি।

মেয়েটি সরে যাবার ভান করে। ঘানিম এবার ওর একখানা হা’ত চেপে ধরে বলে, আমি কি তাই বলেছি নাকি?

মেয়েটি ঠোঁট টিপে হা’সে।–তবে কি বলেছে, চাঁদ?

সে-কথার জবাব না দিয়ে একটা’ তোয়ালে ভিজিয়ে এনে কামিজটা’য় ঘসে ঘসে ঝোলের দাগ তুলতে চেষ্টা’ করে। কিন্তু তেল-হলুদের দাগ শুধু জলে ওঠে না।

মেয়েটি বলে, ছাড়ো তো। থাক দাগ। একটু আধটু দাগফাগ থাকা ভালো, বুঝলে। তোমা’র মতো অ’তি সফেদ হলে আরও বি’পদ।

এর পর ওরা দুজনে খানাপিনা সারে। মৌজ করে মদ খায়। মদের নেশায় মন্দির হয়ে আসে মেয়েটির চোখ। ঘানিমের কোলে মা’থা রেখে শুয়ে পড়ে। ছেলেটির সারা শরীরে এক অ’পূর্ব পুলক জাগে। এ অ’নুভূতি তার জীবনে এই প্রথম। অ’পলক চোখে মেয়েটিকে দেখে! কি তার রূপ! কি তার যৌবন!

মেয়েটি হা’সে। অ’পূর্ব সে হা’সি। বলে, কী? কি দেখছ?

—তোমা’কে। কি সুন্দর তুমি। আকাশের চাঁদ তোমা’র মতো এত সুন্দর না।

–ও বাবা, এ যে কবি’তা গো।

—তোমা’কে দেখলে, কবি’তা আপনা থেকেই আসে।

–তা শোনাও না একটা’।

—পরে শোনাবো। এখন বাঁশী বাজাবো, শুনবে।

–শোনাও।

নেশায় মেয়েটির চোখ ঢুলু ঢুলু হয়ে আসে। আর নিবি’ড় করে ঘানিমের কোলের মধ্যে মা’থাটা’ গুঁজে দেয়।

—একটু ছাড়ো। বাঁশীটা’ বের করে নিয়ে আসি। আমা’র বাক্সে আছে।

—না থাক, এখন ছাড়বো না তোমা’কে। বাঁশী পরে শুনবো। তুমি আমা’র মা’থায় একটু হা’ত বুলি’য়ে দাও। বড্ডো ঘুম পাচ্ছে।

ঘানিম ওর কপালে হা’ত রাখে। চুলের মধ্যে আঙুল চালি’য়ে বি’লি’ কাটতে থাকে। আর একভাবে চেয়ে চেয়ে দেখতে থাকে তার নিটোল নিখুঁত রূপলাবণ্য। কি সুন্দর টা’নাটা’না হরিণ কালো চোখ। আপেলের মতোটুকটুকে গাল, পাকা আঙুরের মতো ঠোঁট। ওর সারা মুখে হা’ত বুলি’য়ে অ’নুভব করতে থাকে কোমল মসৃণতা। মেয়েটি খিলখিল করে হেসে উঠে বসে।–এই বুঝি তোমা’র মা’থায় হা’ত বুলানো হচ্ছে-সাহেব?

ঘানিম লজ্জা পায়। নিজের অ’জান্তে কখন হা’তটা’ নেমে এসেছিলো ওর গালে ঠোঁটে। মেয়েটি বলে, আর একটু সরাব দাও, সব নেশা কেটে গেছে।

ঘানিম আবার দু পেয়ালা সরাব ঢালে। এক পেয়ালা তুলে দেয় মেয়েটির হা’তে। নিজে নেয় এক পেয়ালা। এইভাবে সারাটা’ দিন মদ খেয়ে গান গেয়ে, খুশির বন্যায় দু’জনে গা ভাসিয়ে দেয়। দুপুর গড়িয়ে বি’কেল হয়। আবার বি’কেলও ফুরিয়ে রাত্রি নেমে আসে। মোমের আলোয় এক অ’পূর্ব মা’দকতা আছে। ঘানিম আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে। আরও কাছে! দু’হা’তে জড়িয়ে ধরে ওকে চুমু খেতে চায়। কিন্তু মেয়েটি খিলখিল করে হেসে দু-হা’ত পিছিয়ে সরে যায়।-এখনি নয়গো বন্ধু, এখনি নয়। আরও কিছু ধৈর্য ধরে। রজনী গভীর হোক। আজ সারা রাত তোমা’কে আমি অ’মৃ’তসায়রে ভাসিয়ে রাখবো। এখনি নয়, আমা’কে আরও একটু নেশা করতে দাও। তুমিও আরও উদাম হও। তোমা’র চোখে এখনও দেখতে পাচ্ছি না সিংহের বি’ক্রম। নাও, আরও একটু সরাব খাও।

নিজের পেয়ালাটা’ ঘানিমের মুখে তুলে ধরে। এক চুমুকে সবটুকু টেনে নিয়ে বলে, কেন, আমা’কে কি পুরুষ বলে মনে হচ্ছে না।

–সারাদিন হয়নি। এখন একটু হচ্ছে। অ’তো শান্তশিষ্ট হয়ে লজ্জায় লাল হয়ে বসে থাকলে কি কোনও মেয়ের ভালো লাগে। পুরুষ পুরুষের মতো হবে। তোমা’র দাঁতের দংশনে আমা’র ঠোঁটে রক্ত ঝরবে, তোমা’র হা’তের থাবায় আমা’র যৌবন জর্জরিত হবে, তবে না তুমি সার্থক পুরুষ! তুমি আমা’কে জাগাবে, না, মেয়ে হয়ে আমি তোমা’কে সারাদিন ধরে জাগালাম।

ঘানিম বলে, জীবনে এই প্রথম তুমি আমা’র যৌবনে রং ধারালে। প্রথম প্রথম একটু শরম হবে না?

-ও, তাই বুঝি! পরে তা হলে একেবারে বে-শরম বেহা’য়া হয়ে যাবে?

—কি যে বলো!

–বুঝেছি। বুঝেছি। দেখতে মনে হচ্ছে, ভাজা মা’ছ উল্টে খেতে জানো না। আসলে তুমি একটা’ জাগুয়ার।

ধীরে ধীরে রাত্রি গভীরতর হয়। দুজনেই তখন মদের নেশায় বি’ভোর। ঘানিমকে নিবি’ড় করে জড়িয়ে ধরে মেয়েটি। ঘানিমও তার ডাকে সাড়া দেয়। দুজনে আলি’ঙ্গনাবদ্ধ হয়ে শুয়ে থাকে অ’নেকক্ষণ। মেয়েটি এবার হিংস্র হয়ে ওঠে। কিন্তু ঘানিম শঙ্কিত হয়। না না, এই ভালো। এর বেশী আর কিছু চাই না আমি। আজকের রাতটা’ তোমা’কে বুকে নিয়েই কাটা’তে চাই।

—কিন্তু, সোনার চাঁদ, এত অ’ল্পে তো আমি তুষ্ট হবে না।–আজি আমা’কে ক্ষমা’ করো। আজ আর এর বেশী না। মেয়েটি আদর করে ঘানিমকে ঠোনা মা’রে, বোরখা পরে থেকে। ঘানিম ওর বুকের মধ্যে মুখ লুকায়।–দিন কি শেষ হয়ে যাচ্ছে নাকি? তুমি তো আমা’রই আছো। আমা’রই থাকবে।

–কি করে বুঝলে?

—কেন, তুমি চলে যাবে?

—ইচ্ছে না থাকলেও যেতে হবে। ওরা আমা’কে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে।

ঘানিম উঠে বসে।—দুনিয়াতে এমন কোনও শক্তি নাই আমা’র কাছ থেকে তোমা’কে ছিনিয়ে নিতে পারে।

—আহা’, কি আমা’র বীর পুরুষ গো! একটা’ মেয়ের সামনে মুখ তুলে তাকাতে পারে না, তা আবার বড়াই।—চলো, অ’নেক রাত হলো। এবার খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়া যাক। শুয়ে শুয়ে আজ আমা’র সব কাহিনী বলবো। তখন জানবে। আমা’র পরিচয়।

খানাপিনা সেরে দু’জনে দুজনকে গভীরভাবে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ে। ঘানিম বলে, কই, বলবে বলেছিলে? বল তোমা’র কাহিনী?

মেয়েটি বলতে থাকে- খলি’ফা হা’রুন-অ’ল-রাসিদের আমি খুব পেয়ারের বাদী। তিনি আমা’কে সোহা’গ করে কুৎ-আল-কুলুব বলে ডাকেন। খুব ছোট থেকে খলি’ফার প্রাসাদে আমি মা’নুষ হয়েছি। খলি’ফার যত বাদী রক্ষিতা আছে আমি তাদের সকলের সেরা। আমা’কে খুশি রাখার জন্যে খলি’ফার চেষ্টা’র অ’ন্ত নাই। আমা’র জন্যে গোটা’ একটা’ মহল তিনি ছেড়ে দিয়েছেন। সুন্দর সুন্দর বারোটা’ দাসী আমা’র পরিচর্যায় দিন রাত ব্যস্ত থাকে। হীরে জহরৎ আর দামী দামী সাজপোশাকে সাজিয়ে তিনি আমা’কে পটের বি’বি’ বানিয়ে রেখেছিলেন। প্রায় প্রতি রাতেই তিনি আমা’র ঘরে আসতেন। তাঁর খাস বেগম জুবেদার এটা’ সহ্য হতো না। হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরতো। অ’নেক দিন থেকে আমা’কে দুনিয়া থেকে সরাবার তাকে খুঁজছিলো সে। কাল রাতে সেই মউকা মিলেগেছে। খলি’ফা আজ দুদিন হলো বাইরে গেছেন। একটা’ কুবায়তার গেছেন বি’দ্রোহিদের দমন করতে।

আমা’র বারোজন দাসীর মধ্যে দু-একজন জুবেদার প্রিয় পাত্রী ছিলো। মোটা’ টা’কা ঘুষ দিয়ে তাদের হা’ত করেছিলো। কাল রাতে শোবার আগে অ’ভ্যাস মতো এক গেলাস সরবৎ খেয়েছিলাম। একটু পরেই আমা’র মা’থাটা’ কেমন ঝিমঝিম করতে লাগলো। দাসীটা’কে বলেছিলাম, এমন কেন হলো?

সে আমা’কে বোঝালো, ও কিছু নয়, ঘুমিয়ে পড়ো মা’লকিন। সব ঠিক হয়ে যাবে।

আমা’র মনে কেমন সন্দেহ ঘনিয়ে এলো। নিজেকে শক্ত করে বসে রইলাম! কিন্তু ওষুধের ক্রিয়া এড়াবো কি করে? মা’থাটা’ ঢলে পড়তে থাকে। জোর করে নিজেকে সোজা রাখার চেষ্টা’ করি। একটু পরে ঐ দাসীটা’ এসে আমা’র মুখটা’ তুলে ধরে বললো, কই চলুন মা’লকিন, শোবেন চলুন।

আমি আর প্রতিবাদ করতে পারলাম না। মন্ত্রমুগ্ধের মতো পালঙ্কে শুয়ে পড়লাম। কেমন একটা’ বি’শ্ৰী গন্ধে সারা শরীর গুলি’য়ে যেতে লাগলো। তখনও আমা’র চৈতন্য লুপ্ত হয়নি। সবই শুনতে পাচ্ছি। সবই বুঝতে পারছি। অ’থচ হা’ত-পা নাড়তে পারছি না। কোনও কথা বলতে পারছি না। মনে হতে লাগলো, আমি মরে যাচ্ছি।

শুনতে পেলাম, জুবেদা আমা’র ঘরে এসে ঐ দাসীটা’কে বলছে, সবাব, কাফুর আর বুখাইৎকে বলে রেখেছি। ওদের কাঠের বাক্সটা’ নিয়ে এখানে আসতে বল।

বুঝতে পারলাম, একটু পরে ঐ তিন খোজা আমা’কে ধরাধরি করে একটা’ বাক্সের মধ্যে শুইয়ে দিলো। জুবেদা বললো, যা নিয়ে যা। আমা’দের গোরস্থানে কবর দিয়ে রাত থাকতে থাকতে ফিরে আসবি’।

আমি সবই শুনতে পেলাম, সবই বুঝতে পারলাম। কিন্তু আমা’র আচ্ছন্নভাব কাটিয়ে কথা বলতে পারলাম না। পারিনি, একদিক থেকে ভালোই হয়েছে। জুবেদা যদি বুঝতে পারতো ওষুধে কাজ হয়নি, হয়তো আমা’র বৃকে ছুরি বসিয়ে দিতে।

এর পরের ঘটনা তো তোমা’র সবই জানা। আল্লাহ তোমা’কে পাঠিয়েছিলেন। তা না হলে, তুমি এক বি’দেশী, নিশি রাতে মা’নুষের অ’গম্য ওই গোরস্থানেই বা যাবে কেন? আর আমা’কেই বা উদ্ধার করবে। কেন?

এখন আমি ভাবছি, খলি’ফা লড়াই থেকে ফিরে এসে যখন দেখবেন আমি নাই, তখন কি কেলেঙ্কারী কাণ্ড হবে!

কুৎ-আল-কুলুবের কাহিনী শুনে ঘানিম ঘামতে থাকে। সর্বনাশ! এ কাকে নিয়ে এসে সে ঘরে তুলেছে? ধর্মা’বতার খলি’ফার রক্ষিতা! তাকে ছোঁয়াও তো মহা’পাপ! ঘরের এক প্রান্তে গিয়ে একটা’ টুলের উপর বসে থাকে। কুৎ-আল-কুলুব বুঝতে পারে না। ডাকে, তুমি দূরে সরে গেলে কেন, সোনা?

–না না, সে হয় না। তুমি খলি’ফার বাঁদী। তোমা’র দিকে হা’ত বাড়ালে সে হা’ত আমা’র পঙ্গু হয়ে যাবে। খলি’ফা সাক্ষাৎ আল্লাহর পয়গম্বর।

কুৎ-আল-কুলুব উঠে এসে ঘানিমের হা’ত ধরে। দূর বোকা ছেলে, ভয় পাচ্ছে কেন? আমি তো আছি। চলো, শোবে চলো।

ঘানিম। কিন্তু সত্যিই শঙ্কিত হয়েছে। বাদশাহর রোষানলে দগ্ধ হতে পারে সে। সামা’ন্য এক সওদাগর হয়ে সে চাঁদের দিকে হা’ত বাড়িয়েছে। কুৎ-অ’ল-কুলুবের ডাকে আর সাড়া দিতে পারে। না ঘানিম। হা’ত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে। নেশা কেটে যায়। খলি’ফার প্রিয় পাত্রীকে সে তার অ’ঙ্কশায়িনী করতে চেয়েছিলো।

—না, না, তুমি পালঙ্কে শুয়ে পড়ে। আমি নিচে শোবো।

—তাই হয় নাকি চলো, এক সাথে শোবো।

কিন্তু ঘানিম রাজী হতে পারে না। সারারাত একরকম বসেই কেটে যায়।

ভোর না হতেই ঘানিম বাজারে বেরিয়ে গেলো। কুৎ-আল-কুলুব তখনও নিদ্রামগ্ন। বাজার গিয়ে নানারকম দামী দামী খাবারদাবার কিনলো। সুলতান বাদশাহরা যে সব দুষ্প্রাপ্য সরাব খায় তারই একটা’ কিনলো কুৎ-আল-কুলুবের জন্য। তার ঘরে আজ মহা’মা’ন্য অ’তিথি-তার মনোরঞ্জনের জন্য দামী আন্তর, বাহা’রী ফুল, সুগন্ধী আগরবাতি প্রভৃতি নানা শৌখিন জিনিসপত্র কিনে যখন বাসায় ফিরলো, বেশ বেলা হয়ে গেছে। কুৎ-অ’ল ঘরের মধ্যে অ’স্থির হয়ে পায়চারি করছে। ঘানিমকে দেখে ছুটে এলো, কখন তুমি কোথায় গেলে, আমি ভেবে আকুল, এতে দেরি হলো কেন?

–এই একটু বাজারে গিয়েছিলাম। কুলি’র মা’থা থেকে সামা’নপত্র নামা’তে নামা’তে বলে, আমা’র ঘরে সুলতানের খাস বাদী-এমন সৌভাগ্য ক’জনের হয়? আদর যত্নের ত্রুটি হলে যে গর্দান যাবে।

কুৎ-অ’ল রাগ করে।—তুমি আমা’কে এত পর পর ভাবো?

ঘানিম টেবি’লে নাস্ত সাজাতে থাকে। কুৎ-আল সামনে এসে রুখে দাঁড়ায়!-ওসব রাখো বলছি, আগে আমা’র কাছে এসো। না হলে সব ছুঁড়ে ফেলে দেব বলছি। আমি কি তোমা’র এখানে খানাপিনা করতে এসেছি? যে কটা’ দিন থাকবো, আমি আর তুমি এক হয়ে থাকবো। কোথাও যেতে পারবে না।

ঘানিমকে জোর করে বি’ছানায় শুইয়ে দিতে চায়। কিন্তু ঘানিম উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে। আমি তোমা’র আজ্ঞাবহ দাসানুদাস। তুমি খলি’ফার ‘ভালোবাসা’। ওসব ভাবাও আমা’র পাপ।

—কি বললে? দাসানুদাস? আজ্ঞাবহ। তা হলে আমি আদেশই করছি—আমা’র বুকে এসো।

ঘানিম মা’থা হোঁট করে দাঁড়িয়ে থাকে।–দেখো, ঘানিম, আমি খলি’ফার খাস বাঁদী-আমা’র হুকুম, কাছে এসো। তা না হলে তোমা’র গর্দান যাবে।

—গর্দান তো বাড়িয়েই আছি। ইচ্ছে হয় নিতে পারো। কিন্তু ওকথা বলে না। আমি পারবো।

কুৎ-অ’ল উঠে এসে, দু’হা’তে জড়িয়ে ধরে, ঘানিমের ঠোঁটে দাঁত বসিয়ে দেয়। রক্ত ঝরে পড়ে। কুৎ-অ’ল উম্মা’দিনীর মত ঘানিমকে আকড়ে ধরে। নিজের বুকের ওপর তার সুপ্রশস্ত বড় বড় স্তনগুলো সজোরে চেপে ধরে। -ওগো সাধু মহা’পুরুষ, এবার তোমা’র খোলসটা’ ছাড়ো। আমি যে আর সইতে পারছি না। সিংহের মতো একবার ঝাঁপিয়ে পড়ো, সোনা।

ঘানিম বলে, প্রভুভক্ত কুকুর কখনও সিংহ হতে পারে না, কুৎ-আল। আমা’কে ক্ষমা’ করো।

আমা’র কথা না শুনলে তো তোমা’র ক্ষমা’ নাই, ঘানিম। আমা’কে চটিও না, বলছি। তোমা’র ভালো হবে না।

ঘরের এক প্রান্তে গিয়ে গালে হা’ত দিয়ে বসে পড়ে ঘানিম। কুৎ-অ’ল এগিয়ে আসে। মা’থায় হা’ত বুলায়।–রাগ করলো? ঠিক আছে, চলো, নাস্তা সেরে নিই।

ঘানিমের হা’ত ধরে দু’জনে টেবি’লে এসে বসে। আর একটা’ও কথা হয় না। নীরবে আহা’র পর্ব শেষ হয়। ঘানিম কেমন মনমরা হয়ে যায়। বাঁশীতে করুণ সুর বাজাতে থাকে। কুৎ-অ’ল অ’বাক হয়। এমন বেহা’গের সুর অ’নেককাল সে শোনেনি। শ্রদ্ধায় মা’থা নুইয়ে আসে। আস্তে আস্তে উঠে এসে ঘানিমের কাঁধে হা’ত রাখে।-কোথায় শিখেছ?

—আমা’র বাবা খুব গুণী লোক ছিলেন। দামা’সকাস শহরে গাইয়ে বাজিয়ে মহলে তার বেশ নাম ছিলো। সেই সুবাদে অ’নেক নামজাদ ওস্তাদের আনাগোনা ছিলো আমা’দের বাসায়। যা কিছু শিখেছি, তাদের কল্যাণেই।

গান বাজনার মধ্য দিয়ে সারা দিন কেটে যায়। রাতের আহা’র শেষ করে ঘানিম নিজের জন্য নিচে আলাদা বি’ছানা করে নেয়। এবার কুৎ-অ’ল চিৎকার করে ওঠে, তোমা’র এই ফালতু গোড়ামী রাখো তো। যতক্ষণ তোমা’র ঘরে আছি, আমি তোমা’র! তুমিও আমা’র। এর মধ্যে খলি’ফার কথা মনে রেখে না। এসো, আমা’র কাছে এসো। এক সাথে শোবো আমরা। আজকের রাত হবে, আমা’দের মধুযামিনী।

ঘানিম রাজী হয় না।–না, তা হতে পারে না, কুৎ-আল।

কুৎ-অ’ল মিনতি করে, তোমা’র দু’টো পায়ে পড়ি, ঘানিম আমা’র কথা শোনো। তোমা’কে না পেলে আমি এক ফেঁটা’ ঘুমুতে পারবো না।

ঘানিম রাজী হয় না, সে হয় না, কুৎ-অ’ল।

কৃৎ-অ’ল কেঁদে ফেলে, আমন করে না’ করো না, সোনা। আমা’র দেহ-মন তোমা’কে চাইছে। এসো, কাছে এসো। শুধু একটা’ চুমু। আর কিছু চাই না।

কুৎ-অ’ল অ’ঝোর নয়নেকাঁদতে  থাকে।কাঁদতে কাঁদতে  এক সময়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

এইভাবে একটা’ মা’স কেটে যায়। খায় দায় আর বি’রহ বেদনার গান গায়। কুৎ-অ’ল-এর আসল পরিচয় জানার পর থেকে ঘানিম নিজেকে দূরে দূরে সরিয়ে রাখে।

এদিকে খলি’ফার খাস বেগম জুবেদা খবর পায়, লড়াই শেষ করে খলি’ফা বাগদাদে ফিরে আসছেন। প্রাসাদের সবচেয়ে পুরনো এক বুড়ি দাসী ছিলো জুবেদার প্রিয় পাত্রী। কুমন্ত্রণা দিতে তার জুডি নাই। জুবেদা তাকে জিজ্ঞেস করে, খলি’ফা তো ফিরে আসছেন। এখন কি হবে?

—কিছু ভেবো না মা’, আমি তোমা’কে ফিকির বাৎলে দিচ্ছি। ছুতোরকে দিয়ে একটা’ কাঠের পুতুল বানিয়ে নাও। আমা’দের প্রাসাদে একজন ভালো কারিগর আছে। খুব সুন্দর সুন্দর পুতুল বানাতে পারে। তাকে ডেকে তুমি বলে দাও, সে ঠিক কৃৎ-আলোর মতো দেখতে একটা’ পুতুল বানিয়ে দেবে। প্রাসাদের চত্বরে একটা’ কবর খুঁড়ে পুতুলটা’কে গোর দিয়ে রাখো। হ্যাঁ, একটা’ কথা, কুৎ-আল যে সব দামী দামী হীরে জহরৎ পরে থাকতো সেইভাবে সাজাতে হবে তাকে। খলি’ফার যদি সন্দেহ হয়, যদি বলেন, কবর খোলো, আমি তাকে দেখবো। সেই জন্যে পুতুলটা’কে দামী দামী রত্নালঙ্কারে সাজাতে হবে। খলি’ফা। যদি কবর খুলে দেখেনও, ঐ সব মূল্যবান অ’লঙ্কারাদি দেখে তার আর কোন সন্দেহ থাকবে না।

জুবেদা বলে, আর যদি খলি’ফা বলেন, আমি ওর গায়ে হা’ত দিয়ে দেখবো, তখন?

—তখন তুমি বলবে, কুৎ-আল-এর মৃ’তদেহ বি’বস্ত্র করে কবর দেওয়া হয়েছে। শাস্ত্ৰে আছে, নিজের বি’বি’ হলেও ন্যাংটো করা মেয়েছেলের মৃ’তদেহ কোনও পুরুষ স্পর্শ করতে পারে না।

–সাব্বাস! তোমা’র কি বুদ্ধি!

জুবেদা সেই বুড়ি দাসীকে দামী দামী সাজপোশাক এবং স্বর্ণমুদ্রায় পুরস্কৃত করলো। বুড়ির কথা মতো কাঠের তৈরি নকল কুৎ-আল-কুলুবকে প্রাসাদ-প্রাঙ্গণে সমা’হিত করা হলো।

এর দুদিন পরে খলি’ফা ফিরে এলেন। প্রাসাদে ঢুকতে গিয়েই দেখলেন, প্রাঙ্গণের ঠিক মা’ঝখানে এক বি’রাট সমা’ধি। প্রাসাদের কর্মচারী নফর। চাকর খোজা দাসদাসী সকলের পরনেই কালো পোশাক। অ’ন্দরমহলে গেলেন। খাস বেগম জুবেদাও শোকের পোশাকে সজ্জিতা। সারা প্রাসাদে থমথমে ভাব। কারো মুখে কথা নাই। কুৎ-আল-কুলুবের মহলে গেলেন। দাসী পরিচারিকারা অ’ধোবদনে দাঁড়িয়ে রইলো। কুৎ-অ’ল নাই। সারা মহল ধূপ আর আতরের গন্ধে ভরপুর। চারপাশে সারিবদ্ধভাবে সাজানো মোমের বাতি গলছে। জুবেদা কাঁদতেকাঁদতে  বলে, কুৎ-অ’ল আমা’দের ছেড়ে চলে গেছে।

খলি’ফাকে সঙ্গে করে সমা’ধির পাশে নিয়ে গেলো জুবেদা–আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কবর খুঁডিয়ে বাদশাহী মর্যাদায় তাকে গোর দিয়েছি।

খলি’ফা কোনও কথা বলতে পারলেন না। কুৎ-অ’ল-এর এই আকস্মিক মৃ’ত্যু তাকে মুহ্যমা’ন করে ফেলেছে। পথশ্রমে ক্লান্ত অ’বসন্ন দেহ। তার উপর এই গভীর শোকসংবাদ। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না। ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে শয্যা নিলেন।

সারা দিন সারা রাত মড়ার মতো পড়ে রইলেন। কারো সঙ্গে দেখা করলেন না। খানাপিনা কিছুই খেলেন না। শুধু ভাবতে লাগলেন, আমন সুন্দর সুস্থ কুৎ-অ’ল হঠাৎ মা’রা গেলো কি করে। যতই ভাবেন, সন্দেহ ঘনীভূত হয়। সকালে উঠে জাফরকে ডেকে বললেন, কবর খোলার ব্যবস্থা করো, আমি একবার কুৎ-অ’লকে শেষবারের মতো দেখতে চাই।

জুবেদার বুক কেঁপে উঠলো। বুড়ি দাসী তাকে অ’ভয় দেয়, কিছু ভেবো না, মা’। নিজেকে শক্ত করো। খলি’ফার পাশে গিয়ে দাড়াও; যা বলেছি, মনে থাকে যেন।

খলি’ফার নির্দেশে কবর উন্মুক্ত করা হলো। মা’থা ঝুঁকিয়ে তিনি দেখলেন, প্রায় স্বচ্ছ দামী কফিনে মোড়া কুৎ-আল-কুলুবের মৃ’তদেহ। দেখলেন তার সারা অ’ঙ্গে সেই সব হীরে জহরতের অ’লঙ্কার। পলকে সকল দ্বন্দ্ব ঘুচে গেলো। বললেন, ঠিক আছে, কবর ঠিক করে রাখো।

জাফরকে নির্দেশ দিলেন, সাত দিন সাত রাতব্যাপী কবরের সামনে কোরান পাঠ হবে। ব্যবস্থা করে।

এই সময় রাত্রি শেষ হয়ে আসে। শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপচাপ বসে রইলো।

 

একচেল্লি’শতম রজনী।

আবার কাহিনী শুরু হয়। শাহরাজাদ বলতে থাকে :

খলি’ফার ইচ্ছানুসারে কুৎ-আল-কুলুবের নকল সমা’ধির পাশে সাত দিন সাত রাতব্যাপী কোরান পাঠ হতে থাকলো। সব কাজকাম মুলতুবি’ রেখে খলি’ফা দরবার কক্ষের একখানা সাধারণ চৌকির ওপর মা’দুর বি’ছিয়ে শুয়ে রইলেন। জাফরকে বলে রাখলেন, কেউ যেনো তাকে বি’রক্ত না করে।

খলি’ফার মা’থা ও পায়ের কাছে বসে দুই পরিচারিকা পরিচর্যা করতে থাকে। পানাহা’র পরিত্যাগ করে তন্দ্ৰাচ্ছন্ন অ’বস্থায় পড়ে থাকেন। খলি’ফা। কোরানের পবি’ত্র বাণী শুনতে শুনতে পার্থিব সুখ দুঃখের অ’নেক উপরে অ’ন্য এক জগতে বি’চরণ করতে থাকেন।

হঠাৎ তার কানে আসে, দুই পরিচারিকার একজন বলছে,

ছিঃ ছিঃ কি কেলেঙ্কারী কাণ্ড ভাই শুভিয়া।

শুভিয়া অ’বাক হয়, কেন, কেলেঙ্কারী কিসের ভাই নুজা?

—আমা’দের খলি’ফা একটা’ মিথ্যে কবরের সামনে কোরান পাঠের আসর বসিয়েছেন। আসলে ওটা’ কুৎ-অ’ল-এর কবর না ছাই।

—তবে? কুৎ-আল গেলো কোথায়?

—তাকে তো বেগম সাহেবা জুবেদাহ ঔষুধ দিয়ে অ’জ্ঞান করে মা’রার ফন্দী করেছিলেন। সবাব, কাফুর আর বুখাইৎ এই তিনটি খোজা জুবেদা বেগমের খুব পেয়ারের। কুৎ-অ’লকে অ’জ্ঞান করে, একটা’ কাঠের বাক্সে পুরে ঐ তিন খোজাকে দিয়ে সুলতানের খাস কবরখানায় পুতে রেখে এসেছিলো। শুভিয়া অ’বাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, তাহলে প্রাসাদের চত্বরে এই কবরখানা কার?

—নকল কুৎ-আল-এর। একটা’ কাঠের পুতুলকে সাজিয়ে-গুজিয়ে শুইয়ে রেখেছে। জুবেদা বেগম।

—তা হলে কুৎ-অ’লকে জ্যান্ত কবর দিয়ে মেরে ফেলেছে?

–আল্লাহ যাকে রাখেন, তাকে কেউ মা’রতে পারে? শুনেছি, কুৎ-আল বেঁচেই আছে।

–কোথায়?

–এই বাগদাদ শহরেই এক নওজোয়ান সওদাগরের ঘরে। তার নাম নাকি ঘানিমা’ ইবন আয়ুব।

—তোমা’কে এসব কথা কে বললো ভাই, নুজা?

ওই যে বুড়ি দাসীটা’। জুবেদা বেগমের পেয়ারের দাসী গো। ওই বুড়িটা’ই বলছিলো আমা’কে। তা ভাই অ’নেক দিব্যি করিয়ে নিয়েছে। তুমি যেন আমা’র বলো না কাউকে। বড় ঘরের বড় বড় ব্যাপার। ওসব নিয়ে আমা’দের মা’থা ঘামা’নোর কি দরকার?

খলি’ফা লাফিয়ে উঠে বসলেন। দরবার কাঁপিয়ে হুঙ্কার ছাড়লেন, জাফর?

কোরবানীর খাসির মতো জাফর এসে দাঁড়ালো।— ফৌজদারকে বোলাও। এক্ষুণি যত লোক-লস্কর দরকার নিয়ে বেরিয়ে পড়। কে এক ঘানিম ইবন আয়ুব আছে এই শহরে, তাকে ধরে নিয়ে এসো। যেমন করে পারো।

সঙ্গে সঙ্গে জাফর সব কোতোয়ালদের ডেকে পাঠালো। বললো, তোমা’দের নিজের নিজের এলাকায় সন্ধান করে দেখো, ঘানিম ইবন আয়ুব নামে এক ছোকরা সওদাগর এই শহরেই কোথাও বাসা ভাড়া করে আছে। গোপনে তার বাসার ঠিকানা সংগ্রহ করে এক্ষুণি আমা’কে জানাবে।

কিছুক্ষণের মধ্যে ঘানিমের ঠিকানা সংগ্রহ হলো। আর তিল মা’ত্র দেরি না করে জাফর-অ’ল-বারমা’কী চল্লি’শজনের এক ফৌজী বাহিনী নিয়ে ঘানিমের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ে।

তখন টেবি’লে নাস্তা সাজিয়ে ঘানিম। আর কুৎ-আল সবে আহা’রে বসেছে। হঠাৎ চারদিক জনরবে মুখর হয়ে উঠলো। কুৎ-আল কান খাড়া করে শুনলো অ’শ্বক্ষুরধ্বনি। খট খট খটা’খট!—ঘানিম! সর্বনাশ হয়েছে। খলি’ফার সৈন্যবাড়ি ঘিরে ফেলেছে। তুমি পালাও! পালাও।

—কিন্তু তুমি?

–আমা’র জন্যে কোনও চিন্তা করো না, ঘানিম। যেমন করো পারো, পালাও! তোমা’কে ধরতে পারলে আর অ’স্ত রাখবে না।

ঘানিম কি করবে কিছুই ভাবতে পারে না। বোকার মতো হা’ঁ করে দাঁড়িয়ে থাকে।

–কিন্তু পালাবো কি করে? ফৌজ তোবাড়ি ঘেরাও করে ফেলছে।

ক্ষিপ্র হা’তে কুৎ-অ’ল টেবি’ল-মোছা ন্যাকড়াটা’ ফালা ফালা করেছিড়ে ঘানিমের মা’থায় ফেটি বেঁধে দেয়। রসুইখানা থেকে এটোকাটা’র বালতী আর নর্দমা’ পরিষ্কার করার একটা’ ঝাড়ু নিয়ে আসে। বলে, শিগ্‌গির জামা’ পাতলুন খুলে ফেলো। শুধু ইজেরটা’ থােক। এই নাও এটোকাটা’র বালতি-মা’থায় তোেল। আর হা’তে ধরে এই ঝাড়খানা। যাও গভীর-সে বেরিয়ে হন হন করে কেটে উধাও হয়ে পালাও। ওরা কেউ সন্দেহ করবে না। ভাববে, মেথর। নোংরা পরিষ্কার করতে এসেছিলো। আমা’র কথা বি’লকুল তুমি ভেবো না। আমা’র কোনও অ’নিষ্ট করতে পারবে না। ওরা। খলি’ফার সামনে হা’জির হতে পারলে আমা’র কোনও ভয় নাই। তাকে বশ করার যাদু আমা’র জানা আছে।

জাফর ঘরে ঢুকে দেখে, কুৎ-অ’ল পালঙ্কে বসে আছে একা। তার সারা দেহ হীরে জহরতের অ’লঙ্কারে মোড়া। আভূমি আনত হয়ে কুর্নিশ জানালো জাফর।

কুৎ-অ’ল বলে, নিয়তিই আমা’কে এখানে নিয়ে এসেছে। এখন আপনি আমা’কে যেখানে নিয়ে যেতে চান, আমি প্রস্তুত।

জাফর বলে, আমা’র ওপরে হুকুম হয়েছে, ঘানিব-ইবন আয়ুব নামের এক ছোকরা সওদাগরকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যেতে হবে। আপনি কি বলতে পারেন, মা’লকিন, সে কোথায়?

কুৎ-অ’ল বলে, সে তো দিন কয়েক আগে তার দেশেরবাড়ি দামা’সকাসে চলে গেছে! এর বেশী কিছু আর আমি বলতে পারবো না।

জাফর বি’নীতভাবে বলে, আপনি যদি মেহেরবানী করে আমা’র সঙ্গে প্রাসাদে ফিরে চলেন—

নিশ্চয়ই যাবো। যাওয়ার জন্যেই তো আমি তৈরি হয়ে বসে আছি। চলুন।

প্রাসাদে ফিরে এসে জাফর জানায়, ঘানিম কয়েকদিন আগে বাগদাদ ছেড়ে দামা’সকাসে ফিরে গেছে। সেখানেই তার দেশ। নিজের বলতে তার মা’ আর এক বোন আছে।

খলি’ফা গম্ভীর হলেন। হুম, পালি’য়েছে। তা পালি’য়ে কোথায় সে যাবে। ধরা তাকে দিতেই হবে।

কুৎ-অ’ল-এর দিকে তাকিয়ে বললেন, ঘানিমের বয়স কত?

কুৎ-অ’ল বলে, তা মনে হয় চব্বি’শ পাঁচশ হবে।

–তা হলে তো ভালোই জন্মেছিলো, কি বলো?

কুৎ-অ’ল বলে, সে কোনও খারাপ কাজ করেনি।

— চোপ রহ, বেশরম—একটা’ জোয়ান ছেলের সাথে এক সঙ্গে এতদিন কাটা’লে, আর কিছু খারাপ কাজ করোনি? এও আমা’কে বি’শ্বাস করতে হবে।–আগুনে ঘি পড়লে জুলবে না? মসরুর; অ’ন্ধকার ঘরে কয়েদ করে রাখে।

—জো হুকুম, জাঁহা’পনা!

খলি’ফা এবার ঘানিমের অ’নুসন্ধানে মেতে উঠলেন। এক দল অ’শ্বারোহী ফৌজ পাঠিয়ে দিলেন দামা’সকাস শহরে। নিজে হা’তে একখানা খৎ লি’খে দিলেন।

দামা’সকাসের ভারপ্রাপ্ত সুলতান ইবন সুলেমা’ন অ’ল-জেনির প্রতি আব্বাসের পঞ্চম বংশধর। খলি’ফা হা’রুন-অ’ল-রসিদ-এর হুকুমনামা’।

।।এলাহী ভরসা।।

আশা করি তোমা’দের সর্বাঙ্গীন কুশল। মেহেরবান আল্লাহর দোয়ায় সুখে থাকো।

অ’তঃপর লি’খি :

প্রিয় বৎস, তোমা’র শহরে ঘানিম ইবন আয়ুব নামে এক তরুণ সওদাগর বাস করে। সম্প্রতি সে বাগদাদে এসেছিলো। আমা’র এক বাদীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠত হয়। এবং তার অ’বশ্যম্ভাবী ফল যা হওয়া সম্ভব তাই ঘটেছে। কয়েকদিন আগে সে এখান থেকে পালি’য়ে আবার দামা’সকাসে ফিরে গেছে। আমা’র বি’শ্বাস এখন সে তার মা’ ও বোনের কাছেই আছে। আমা’র এই পত্ব পাওয়ামা’ত্র তাকে গ্রেপ্তার করে পাঁচশো ঘা বেত লাগাবে। উটের পিঠে চাপিয়ে সারা শহর প্রদক্ষিণ করাবে। এবং ঘোষণা করে দেবে, খলি’ফার ব্যক্তিগত সম্পত্তি আত্মসাৎ করার অ’পরাধে এই সাজা তাকে দেওয়া হচ্ছে। এর পর বদমা’ইশটা’কে আমা’র কাছে পাঠিয়ে দেবে। তারপর আমি ওর উপযুক্ত শিক্ষার ব্যবস্থা করবো।

ওর বাড়ি-ঘরদের ভেঙে চুরে ধূলি’সাৎ করে দেবে। ওর মা’ আর বোনকে উলঙ্গ করে, চৌমা’থার মোড়ে তিন দিন তিন রাত্রি দাঁড় করিয়ে রাখবে। তারপর তোমা’র শহর থেকে বহিষ্কার করে দেবে।

আমা’র এই হুকুম যথাযথ পালন করবে। খোদা হা’ফেজ।

তীর বেগে ছুটে চললো অ’শ্ববাহিনী। বি’শদিনের পথ মা’ত্র আট দিনে পৌঁছে গেলো। সুলতান মহম্মদ খলি’ফার চিঠিখানা হা’তে নিয়ে সাতবার কপালে ছুঁইয়ে শ্রদ্ধা জানায়। তারপর খুলে পড়ে।

ক্ষণমা’ত্র দেরি না করে লোক লস্কর সঙ্গে নিয়ে ঘানিমেরবাড়ি চড়াও হলো সুলতান। দরজায় কড়া নাড়তেই ফিৎনা দরজা খুলে দেয়। তখন তার মা’ প্রার্থনায় বসেছিলো। ঘানিম আজ এক বছরের ওপরবাড়ি থেকে চলে গেছে। কিছুদিন আগে বাগদাদ থেকে এক দল সওদাগর ফিরে এসে খবর দিয়েছে ঘানিম নাকি মা’রা গেছে। সেই থেকে ঘানিমের মা’ শোকে দুঃখে মুহ্যমা’ন। উঠনের ঠিক মা’ঝখানে পুত্রের স্মৃ’তির উদ্দেশে একটা’ তাজিয়া বানিয়েছে। সারা দিন রাত সেই তাজিয়ার সামনে বসে ছেলের শোকে সে আকুল হয়ে কীদে, আল্লাহর কাছে দোয়া মা’ঙে।

-ঘানিম কোথায়?

ফিৎনা বলে, সে আজ এক সালের উপর হলো বাগদাদে গেছে। তারপর আর কোনও খবর পাওয়া যায়নি। লোকে বলছে, মা’রা গেছে।

পুত্রহা’রা মা’-এর অ’ন্তর-ব্যথা অ’নুভব করে সুলতান। কিন্তু কোনও উপায় নাই। খলি’ফার হুকুম। অ’ক্ষরে অ’ক্ষরে তামিল করাই তার একমা’ত্র কর্তব্য। তার ইশারায় কয়েক মুহুর্তের মধ্যে ঘানিমের বাড়ি-ঘর ভেঙে মা’টিতে মিশিয়ে দিলো। মা’ আর বোনকে উলঙ্গ করে সদর রাস্তার মোড়ে দাঁড় করিয়ে রাখলো। তিন দিন তিন রাত্রি। তারপর শহর থেকে তাড়িয়ে বের করে দিলো।

এবার ঘানিমের কাহিনী শুনুন জাঁহা’পনা। বাগদাদ শহর ছেড়ে বন জঙ্গল ভেঙে উধ্বশ্বাসে ছুটে চলে ঘানিম। খাওয়া নাই নাওয়া নাই অ’বি’শ্রান্ত একটা’না পথ চলে চলে ক্লান্ত অ’বসন্ন হয়ে পড়ে। উসকুখুসকু চুল, খালি’ পা, পরণে শুধু একটা’ ইজের মা’ত্র। পথে যারা দেখলো, ভাবলো পাগল। এইভাবে এক গ্রামের মসজিদে ঢুকে লুটিয়ে পড়লো। নামা’জ পড়তে এসে মৃ’ত-প্রায় যুবককে দেখে গ্রামবাসীদের দয়া হয়। কেউ বললো, ছেলেটা’র বোধহয় অ’সুখ করেছে। কেউ বলে, না না, না-খেতে পেয়ে ঐ অ’বস্থা হয়েছে। একজন দু’খানা রুটি আর মধু এনে খাওয়ালো। শরীর ঠকঠক করে কাঁপছিলো। জুরে গা পুড়ে যাচ্ছে। একজন একটা’ ছেড়া জামা’ এনে পর্যালো। একটু সুস্থ বোধ করলে গ্রামবাসীরা জিজ্ঞেস করলো, হ্যাঁ গো বাছা, কোথা থেকে আসছো?

ঘানিম কোনও জবাব দিলো না। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো। সবাই ভাবলো, জুরে বেৰ্ছশ হয়ে গেছে। তখনকার মতো আর কোন প্রশ্ন না করে যে যার কাজে চলে গেলো।

এইভাবে ঐ মসজিদের বারান্দায় একটা’ মা’স কেটে গেলো। গ্রামবাসীরা অ’নুগ্রহ করে কিছু খাবার দিয়ে যায়। তাই খেয়ে মসজিদের খোলা বারান্দায় পড়ে থাকে। দিনে মা’ছি আর রাতে মশার কামড়। সারা শরীর ক্ষতবি’ক্ষত হয়ে গেলো। এদিকে জুরও ছাড়ে না। অ’বশেষে গ্রামের মা’তব্বাররা ঠিক করলো, এইভাবে এখানে পড়ে থাকলে ছেলেটা’ মা’রা যাবে। ওকে হা’সপাতালে নিয়ে আসা দরকার।

একদল উট যাচ্ছিলো বাগদাদ শহরে। গ্রামবাসীদের অ’নুরোধে উটের মা’লি’ক রাজী হলো। বললো, ঠিক আছে, আমরা ওকে বাগদাদের সদর হা’সপাতালের ফটকে নামিয়ে দেব।

গ্রামবাসীরা ঘনিমকে উটের পিঠে ভালো করে বেঁধে দিলো। কিছু দূরে আসার পর উটের পিঠে বাধা ঘানিমকে দেখে বোেরখা ঢাকা দুটি পথচারী মেয়ে নিজেদের মধ্যে বলাবলি’ করে, আচ্ছা মা’, দেখো তো, উটের পিঠে ঐ ছেলেটা’—যদিও খুব গরীব সরীব, কিন্তু আমা’র ভাইজান ঘানিমের মতো দেখতে না?

মা’ বললো, কি জানি বাপু, কেঁদে কেঁদে চোখ আমা’র অ’ন্ধ হয়ে গেছে। অ’ত দূরে কি আর নজর যায়! তোর ওসব মনের ভুল ফিৎনা ঘানিম কি আমা’র বেঁচে আছে?

দামা’সকাসের সুলতান ওদের দু’জনকে শহর থেকে বহিষ্কার করে দিলে ওরা বাগদাদের পথ ধরে চলতে থাকে। মনে ক্ষীণ আশা, চলতে চলতে একদিন তারা বাগদাদে পৌছবে। ঘনিমকে খুঁজে পাবে আবার।

সারা রাত পথ চলার পর ভোরবেলা উটের দল শহরে পৌছয়। মা’লি’ক দেখলো, এখনও হা’সপাতালের দরজা খোলেনি। ঘানিমকে দরজার পাশে বসিয়ে দিয়ে চলে গেলো। ঘানিমের তখনও চৈতন্য নাই। কোথায় সে ছিলো, এখনই বা কোথায় এসেছে কিছুই বুঝতে পারে না। দেওয়ালে হেলান দিয়ে মরার মতো পড়ে থাকে।

রাত্রির আঁধার কেটে গেলো। সবে রাস্তাঘাটে লোকজন বেরুতে শুরু করেছে। পথচারীদের মধ্যে কেউ হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। লোকটা’র চেহা’রার সঙ্গে ঘানিমের কেমন মিল খুঁজে পায়? আবার ভাবে, দূর তা কি করে হবে? ঘানিম এখানে আসবে কি করে? একটু পরে বাজারের এক নামজাদা দোকানের মা’লি’ক ওকে দেখতে পায়। তার কিন্তু কোনও সংশয় হয় না। কতদিন তার দোকানো গেছে সে। কত আলাপ পরিচয়। কত সওদা করেছে। সে ভাবে, হা’য় আল্লাহ, ওকে যদি হা’সপাতালে ভর্তিও করা হয় রোগের হা’ত থেকে বাঁচলেও খলি’ফার রোষ থেকে রেহা’ই পাবে না। মৃ’ত্যু তার অ’নিবার্য। ওকে বাঁচাতে হবে। যেভাবেই হোক বাঁচাবার চেষ্টা’ করতে হবে। জেনে শুনে ওকে এইভাবে ফেলে রেখে গেলে আল্লাহর দরবারে সে কোনও কৈফিয়ৎ দিতে পারবে না। তার নিজের কাধে ঘানিমের দেহভার নিয়ে কোনরকমে আস্তে আস্তে বাড়িতে নিয়ে এলো দোকানী। বি’বি’কে ডেকে বললে, আজ থেকে এই মেহেমা’ন আমা’দের বাড়িতে থাকবে। খুব অ’সুস্থ। একে সুস্থ সবল করে তোলার দায়িত্ব তোমা’র।

দোকানী মা’লি’ক গরম জল করে ঘানিমের সারা শরীর মুছিয়ে দিলো। নতুন জামা’ কাপড় এনে পর্যালো। এক গেলাস দুধ এনে খাওয়ালো। এবার ঘানিম একটু সুস্থ বোধ করে। মনে হয় জুরের তোড়টা’ খানিক কমেছে। ধীরে ধীরে তার সব মনে পড়তে থাকে। বাগদাদ শহর। তার ব্যবসা। তার মা’ বোন ফিৎনা। তার কুৎ-আল-কুলুব—তার ভালোবাসা।

এই সময়ে রাত্রির অ’ন্ধকার কাটতে থাকে। শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে রইলো।

 

বি’য়াল্লি’শতম রজনীর দ্বি’তীয় যামে আবার গল্প শুরু হয়।

এক গেলাস গরম দুধ খাওয়ার পর ঘানিম কিছুটা’ সুস্থ বোধ করে। একে একে আবার সব মনে পড়তে থাকে। তার মা’ বোন। তার ভালোবাসা-কুৎ-আল-কুলুব।

এদিকে কুৎ-আল-কুলুবকে অ’ন্ধকার ঘরে বন্দী করে রেখেছেন খলি’ফা। দ্বারে প্রহরারত সেই বৃদ্ধ বুড়ি দাসী। প্রায় একটা’ মা’স কেটে গেছে। খলি’ফা নানা কাজের ঝামেলায় এসব ঘটনা একেবারেই ভুলে গেছেন। একদিন প্রাসাদে ঢুকছেন, এমন সময় করুণ কান্না ভেসে এলো তার কানে। খলি’ফার তখন স্মরণ হয়, প্রায় এক মা’স আগে কুৎ-অ’লকে তিনি অ’ন্ধকার ঘরে কারারুদ্ধ করে রেখেছেন। একেবারে ভুলে গেছেন। কেউ মনেও করিয়ে দেয়নি। ধীরপায়ে দরজার পাশে দাঁড়ান। কুৎ-আল-কাঁদছে, ঘানিম, তুমি আমা’র প্রাণ বাঁচালে কেন ঘানিম। না হয় আমি সুলতানের কবরখানায় মা’টি চাপা পড়েই মরে থাকতাম। এ জীবনে আজ বেঁচে থেকেই বাকি ফয়দা পেলাম। তুমি আমা’র সঙ্গে সহবাস করোনি সে কথা তো খলি’ফা বি’শ্বাস করলেন না। তবে কেন তুমি নিজেকে অ’ত সংযত করে রাখলে? আলাদা শয্যায় রাত কাটা’লে। জানি না তুমি বেঁচে আছো কিনা, বেঁচে থাকলেও তোমা’র রেহা’ই নাই। খলি’ফার চর সর্বত্র ঘুরে বেড়ায়। যেখানেই থাকো একদিন না একদিন তোমা’কে ধরে শূলে চড়াবেনই। তুমি তার মেয়েছেলের ইজ্জৎ রাখার জন্যে নিজেকে বঞ্চিত করে কি যে দারুণ সংযম দেখালে! আমি মেয়েমা’নুষ, আর কেউ বুকুক আর নাই বুকুক আমি বুঝি ঐভাবে অ’তগুলো নিঃসঙ্গ রাত্রি তোমা’র কি দুঃসহ যন্ত্রণায় কেটেছে। কিন্তু কি তার ইনাম পেলে ঘানিম? প্রাণদণ্ডের হুলি’য়া! আর তোমা’র মা’ বোনের বে-ইজৎ? এই তোমা’র পুরস্কার? তুমি দুঃখ করো না ঘানিম, তোমা’র সঙ্গে আর আমা’র কোনওদিন দেখা হবে না। তবে দেখা হবে। আর একবার আল্লাহর দরবারে। শেষ বি’চারের দিন। সেদিন তুমি এর যোগ্য পুরস্কার পাবে।

এই প্রথম খলি’ফা উপলব্ধি করলেন, ঘানিম নির্দোষ। নিজের ঘরে ফিরে এলেন। হুকুম করলেন, কুৎ-অ’লকে নিয়ে এসো।

রোরুদ্যমা’না কুৎ-অ’ল এসে দাঁড়ালে খলি’ফা অ’নুতপ্ত কণ্ঠে বললেন, আমা’কে মা’র্জনা করো সুন্দরী, অ’নেক মিথ্যা সন্দেহ করে তোমা’কে বহুৎ কষ্ট দিয়েছি। আমা’র মনে হচ্ছে, আল্লাহর দরবারে একটা’ বড় গুনাহ করে ফেলেছি। কুৎ-অ’ল, তুমি তখন কেঁদে কেঁদে কি সব বলছিলো? যে আমা’র মেয়েছেলের ইজ্জত রক্ষা করেছে। আমি তার ঘরের মা’-বোনের ইজৎ নষ্ট করেছি? কে সে?

–ধর্মা’বতার সে সে-ই ঘানিম। এক মা’সের ওপর আমা’র সঙ্গে সে এক ঘরে রাত কাটিয়েছে। শক্ত সমর্থ জোয়ান পুরুষ। আমা’র মতে রূপসী মেয়ের পাশে পাশে থেকে নিজেকে ঠিক রাখা কতটা’ শক্ত আপনি নিশ্চয় অ’নুমা’ন করতে পারেন হুজুর। কিন্তু একদিনের তরেও তার পদস্থালন হয়নি। সত্যি কথা বলতে কি আমিই তাকে প্রলুব্ধ করেছি নানাভাবে। কিন্তু যখনই সে শুনেছে আমি আপনার ভোগ্য, তারপর থেকে অ’সাধারণ সংযমে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে সে। আপনার প্রতি এই অ’সীম শ্রদ্ধার সে উপযুক্ত পুরস্কার পেয়েছে। তার মা’ বোনের ইজৎ আপনি ধূলায় লুটিয়ে দিয়েছেন। তাদের মা’থা গোঁজার আশ্রয়টুকু আপনি রাখেননি।

খলি’ফা কোনও জবাব দিতে পারেন না। মা’থা নিচু করে দু’হা’তে মুখ ঢাকেন।—সত্যি, কুৎ-অ’ল বড় মা’রাত্মক ভুল হয়ে গেছে। সব ক্ষতি অ’র্থ দিয়ে পূরণ করা যায়। কিন্তুইজৎ একবার খোয়া গেলে তার ক্ষতিপূরণ আর কিছুতেই হয় না। তবু বলো, কুৎ-অ’ল, যতটুকু পারি। আমি করবো। তোমরা যা চাও তাই আমি দেব।

আমা’র নিজের জন্যে কিছুই চাইবার নাই, জাঁহা’পনা। শুধু আর্জি, ঘানিম নির্দোষ। ওকে কোনও সাজা দেবেন না।

–কিন্তু সাজা দেব কাকে? সারা দামা’সকাসে সারা বাগদাদ-এ। তার কোন হদিশ পাওয়া যায়নি। আমি দেখছি, তাকে যদি খুঁজে পাই, যদিও তুমি আমা’র বড় আদরের বাঁদী, তার হা’তেই তোমা’কে তুলে দেব।

—জাঁহা’পনা, যদি অ’নুমতি করেন আমি তাকে একবার খুঁজে দেখতে পারি।

–আমা’র কোনও অ’মত নাই কুৎ-আল। আজ থেকে ঘানিম তোমা’র। তাকে যদি খুঁজে পাওয়া যায় আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তোমা’দের শাদী দিয়ে দেব।

খুশিতে কুৎ-অ’ল-এর মন নেচে ওঠে। সঙ্গে হা’জার খানেক দিনার নিয়ে ঘানিমের সন্ধানে বাগদাদের পথে বেরিয়ে পড়ে। প্রথম দিন সারা শহরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত জনে জনে জিজ্ঞেস করেও কোন সন্ধান পেলো না। পরের দিন সে বাজারের বড় বড় দোকানে ঢুকে খোজ করলো। এই সব দোকানে সে তার সওদা বি’ক্রি করতো। কিন্তু তারাও কেউ কিছু বলতে পারলো না। পরদিন সে গেলো জহুরীদের দোকানে। জনে জনে জিজ্ঞেস করতে করতে এক বৃদ্ধ জহুরী বললো, মা’, কয়েকদিন আগে এক বি’দেশীকে আমি অ’সুস্থ অ’বস্থায় সদর হা’সপাতালের ফটক থেকে তুলে নিয়ে এসেছি। এখন সে আমা’র বাড়িতে আছে। তবে খুব দুর্বল। খুলে কিছুই বলতে চায় না, তবে মনে হয় কোনও ভালোবাসার ব্যাপারে ঘা খেয়েছে। পয়সাকডি সব খুইয়ে সর্বস্বাস্ত হয়েছে। তবে দেখে মনে হয় খানদানী ঘরেরই ছেলে।

কুৎ-অ’ল অ’ধৈর্য হয়ে ওঠে। বলে, দেখুন, আপনার তো এখন কাজের সময়। দোকানপাট ফেলে যেতে পারবেন না। তা যদি আমা’র সঙ্গে কাউকে দেন—আপনার বাড়িটা’ সে চিনিয়ে দিতি

শেখসাহেব একটি ছোট্ট বাচ্চাকে সঙ্গে দিলো। ছেলেটি তারবাড়ি চেনে। কুৎ-অ’লকে সে পৌঁছে দিলো তার বাড়ি। দরজায় কড়া নাড়তেই শেখসাহেবের বি’বি’ দরজা খুলে দেয়। কুৎ-আল-কুলুবকে দেখে চিনতে পারে। মা’টি ছুঁয়ে সালাম জানায়। কুৎ-অ’ল তাকে দু’হা’ত বাড়িয়ে তুলে ধরে।–মা’, শুনলাম আপনার ঘরে এক অ’সুস্থ বি’দেশীকে আশ্রয় দিয়েছেন। আমি তাকে একবার দেখতে চাই।

—কিন্তু তাকে দেখেই বা কি করবে। মা’। জুরের ঘোরে বেন্থশ হয়ে পড়ে আছে। সাধ্য মতো চিকিৎসাপত্র করাচ্ছি। কিন্তু জ্বর ছাড়ে না। চেহা’রা একেবারে কঙ্কালসাড় হয়ে গেছে।

–তা হোক। তবু আমা’কে একবার নিয়ে চলুন, আমি দেখবো।

শেখ-এর বি’বি’ কুৎ-অ’লকে পাশের ঘরে নিয়ে যায়। একটা’ পালঙ্কে শুয়েছিলো ঘানিম। জুরে বেহুশ। প্রথম দর্শনে কুৎ-আল-এর সন্দেহ হয়। না না, এ কেমন করে হবে ঘানিম। ঘানিমের কি সুন্দর স্বাস্থ্য রূপ জৌলুস দেখেছে সে। তার সঙ্গে এর মিল কোথায়? যাই হোক, শেখের বি’বি’কে বলে, ওরা যেন কোন অ’যত্ন না হয় মা’। এই নিন রাখুন। এই টা’কাটা’। শহরের সবচেয়ে বড় হেকিমকে ডেকে দেখান। যত দামী ওষুধ দরকার হয় দিন। বাজারের সেরা ফল দুধ ওকে খেতে দেবেন। আরও টা’কা আমি দিয়ে যাবো।

কুৎ-অ’লের সঙ্গে ছিলো হা’জার খানেক দিনার। সবটা’ই সে শেখ-স্ত্রীর হা’তে তুলে দিয়ে সেদিনের মতো প্রাসাদে ফিরে যায়। সারা রাত ঘানিমের মুখটা’ কল্পনা করে, আর কল্পনা করে সেই রুগ্ন হা’ড় জিরজিরে যুবকের মুখ। দুজনের মুখ এক করে মেলাতে চেষ্টা’ করে। কিন্তু কোথায় যেন খেই হা’রিয়ে যায়। এক করতে পারে না। এই একটা’ মা’সের মধ্যে মা’নুষের চেহা’রা এত পাল্টে যেতে পারে?

পরদিন সকালে সে বাজারে যায়। সেই বৃদ্ধ জহুরীর সঙ্গে দেখা করে। উদ্দেশ্য ছেলেটি সম্পর্কে আরও যদি কিছু তথ্য সংগ্বহ করা যায়।

শেখ বললো, মা’জননী, গতকাল তুমি চলে যাওয়ার পর দুটি গরীব ভিখিরি মেয়েছেলে এসেছিলো আমা’র দোকানে। দেখেই মনে হলো বি’দেশী। নতুন এসেছে শহরে। তাই জিজ্ঞেস করেছিলাম, শুধু ভিক্ষে করার জন্যে এই বি’দেশে এসেছো? তা মা’, জবাবে যা বললো, শুনে মনে হলো, তুমিও যাকে খুঁজছো তারাও তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।

—কাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে তারা?

—ঐ যে বললে না? ঘানিম-ইবন-আয়ুব?

–হ্যাঁ হ্যাঁ, তারা কেন খুঁজে বেড়াচ্ছে? কোথায় তারা? কোথা থেকে এসেছে? শেখ বলে, কেন খুঁজছে তা তো বলতে পারবো না, মা’। তবে কোথায় আস্তানা গেড়েছে বলতে পারি। একটু এগুলেই তো ধরমশালা দেখতে পাবে, তারই দাওয়ায় আশ্রয় নিয়েছে। তারা এসেছে দামা’সকাস থেকে?

—দামা’সকাস থেকে। তবে তো ওরা ঘানিমের মা’ আর বোন ফিৎনা।

শেখ বললো, তা হতে পারে। তুমি যদি চাও, ডেকে দিতে পারি।

—একবার ডেকে পাঠালে ভালেই হয়।

শেখ ডাকলো, এই ফুলফুল! ফুলফুল!

সেই ছোট্ট বাচ্চাটা’ এসে দাঁড়ালো, দেখতো ঐ মুসাফিরখানার দাওয়ায় দুটি মেয়ে বসে আছে—ডেকে নিয়ে আয়।

বাচ্চাটা’ ছুটতে ছুটতে চলে গেলো। একটু পরে বোেরখা ঢাকা দুটি মেয়ে এসে দাঁড়ালো কুৎ-অ’ল-এর সামনে।

তাদের পরিচয়পত্র জেনে বুঝলো, তার অ’নুমা’ন ঠিকই। তারা দুজনে ঘানিমের মা’ আর বোনই বটে।

জহুরীর হা’তে দিনারের একটা’ থলে তুলে দিয়ে কুৎ-আল-কুলুব বললো, আমা’র অ’নুরোধ, এদের দু’জনকে আপনারবাড়ি নিয়ে এসে আব্দর যত্নে রাখুন। এই নিন। এতে হা’জার খানেক দিনার আছে। আরও যা লাগে সব খরচা আমি দেব। কিন্তু একটু লক্ষ্য রাখবেন, যেন কোনও অ’যত্ন না হয়।

জহুরী বি’গলি’ত হয়ে বলে, এ-তো আমা’র কাছে হুকুম। কিছু চিন্তা করো না, মা’। ওরা আদরে থাকবে।

এই সময় রজনী অ’তিক্রান্ত দেখে শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে রইলো।

 

পরদিন তেতাল্লি’শতম রজনী।

আবার গল্প শুরু করে শাহরাজাদ।

কুৎ-অ’ল জহুরীর হা’তে ধরে বললো, এই টা’কা পয়সা রইলো। আপনি মেহেরবানী করে ওদের খাওয়া পরার যথাযোগ্য ব্যবস্থা করবেন।

পরদিন স্বচক্ষে দেখবার জন্য কুৎ-আল-কুলুব সোজা জহুরীরবাড়ি গিয়ে হা’জির হলো। শেখের বি’বি’ তো তাকে মহা’ খাতির যত্ন করে অ’ভ্যর্থনা করলো। তারপর ঘানিমের মা’ আর বোনের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলো। ছিন্ন ময়লা বেশবাস পরিত্যাগ করে আজ তারা নতুন পোশাক পরেছে। গোসল করে বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়েছে। কুৎ-অ’ল লক্ষ্য করলে, ফিৎনা দেখতে বেশ সুন্দরী। দীর্ঘদিনের পথশ্বম, অ’নাহা’র অ’নিদ্রার ফলে ওর আসল চেহা’রা অ’নুমা’ন করতে পারেনি। এই কটা’ দিনেই কেমন সুন্দর চেকনাই লাবণ্য ফুটে উঠেছে।

প্রায় ঘণ্টা’খানেক ধরে তাদের সঙ্গে নানা কথা হলো। শেখ-গৃহিণী অ’বাক হয়। খলি’ফার পিয়ারী। অ’থচ এতটুকু অ’হংকার নাই। যাবার আগে কুৎ-আল জিজ্ঞেস করে, রুগী কেমন আছে?

—ঐ সেই একই রকম।

-কী খেতে দিচ্ছেন?

–হেকিম তো শক্ত কিছু খেতে দিচ্ছেন না। দুধ, মুরগীর ঝোল, আঙুরের, বেদোনার রস-এই সব।

—আর ওষুধপত্র?

-সে তো লম্বা ফিরিস্তি। ঘন্টা’য় ঘণ্টা’য় খাওয়াতে হচ্ছে। হেকিম বলেছে দিন কয়েকের মধ্যে বাছা আমা’র চাঙ্গা হয়ে উঠবে।

—তা চলুন, একবার দেখে যাই।

কুৎ-অ’ল ঘানিমের মা’ বোনকে সঙ্গে নিয়ে রুগীর ঘরে ঢোকে। ঘানিম চোখ বন্ধ করে পড়ে আছে। ঘরের এক পাশে বসে ওরা আবার নানা কথায় মশগুল হয়ে ওঠে। এক সময় ঘানিমের মা’ জিজ্ঞেস করে। কিছু মনে করে নামা’, আমি তোমা’র মা’য়ের মতো, কালকেও তোমা’কে দেখলাম; আজকেও এখানে দেখছি, কে মা’ তুমি? আমা’দের জন্যে এত করছে?

কুৎ-অ’ল হা’সে। শুধু বলে, আমা’র নাম কুৎ-আল-কুলুব।

এই একটিমা’ত্র নামেমা’চ্চারণে যাদুমন্ত্রের মতো কাজ হয়। পলকে উঠে বসে ঘানিম। তাকিয়ে

দেখে সামনে দাঁড়িয়ে তার ভালোবাসা।—আকুলভাবে দু’হা’ত বাড়িয়ে আর্তনাদ করে ওঠে, কুৎ-আল-কুলুব-?

ঘানিমের গলার আওয়াজ শুনে চমকে ওঠে কুৎ-আল। এ কণ্ঠ তার খুব চেনা।-ঘানিম, ঘানিম তুমি, সোনা?

—হ্যাঁ আমি ঘানিম।

কুৎ-আল আনন্দে আত্মহা’রা হয়ে পড়ে। অ’চৈতন্য হয়ে যায় ঘানিমের মা’ আর কোনও। একটু পরে কুৎ-অ’ল নিজেকে সংযত করে বলে, অ’বশেষে আল্লাহর দোয়ায় তোমা’কে ফিরে পেলাম! আর এই দেখো, তোমা’র পাশে তোমা’র মা’ বোনও এসে গেছেন।

তারপর কুৎ-অ’ল সব বৃত্তান্ত খুলে বললো। বললো, খলি’ফা আমা’র কথা বি’শ্বাস করেছেন। তোমা’র তিনি সন্ধান করেছেন। তিনি বলেছেন, তোমা’র সঙ্গে আমা’র শাদী দিয়ে দেবেন।

এ কথা ঘানিম বি’শ্বাস করতে পারে না। এত দিন সে দুঃখশোকে তাপে মৃ’ত-কল্প হয়েছিলো, এবারে আনন্দ সংবাদে আত্মহা’রা হয়ে বুঝি প্রাণ সংশয় ঘটবে। একি কথা শোনালো কুৎ-অ’ল। খলি’ফা তাকে ক্ষমা’ করে দিয়েছেন। কুৎ-আল-এর সঙ্গে তার শাদী হবে? কুং-আলোর হা’তে একটা’ চুমু দেয় ঘানিম।

কুৎ-অ’ল বলে, তোমরা একটুক্ষণ অ’পেক্ষা করো। আমি আসছি।

কুৎ-আল আর দাঁড়ায় না। সোজা চলে আসে প্রাসাদে। তার নিজের জমা’নো টা’কা থেকে একটা’ থলে ভর্তি করে নিয়ে এসে শেখ-এর হা’তে দেয়। বলে, মেহেরবানী করে ঘানিমের মা’ বোনের জন্যে চার পরস্ত জমকালো দামী পোশাক কিনে নিয়ে আসুন। যত দাম লাগে লাগুক। তার জন্যে ভাববেন না। সেই সঙ্গে নেবেন খানকুড়ি রেশমী রুমা’ল।

এর পর শেখেরবাড়ি ফিরে এসে ঘানিমের মা’ আর বোনকে ভালো করে গোসল সেরে নিতে বলে। শেখের বি’বি’র হা’তে একটা’ মুঠো মোহর গুজে দেয়।-চাকরকে বাজারে পাঠান। ভালো দেখে মুরগী, মা’ংসের চাপ, শব্জী, আঙুর, আপেল, বেদানা আর খানিকটা’ দামী সরাব নিয়ে আসতে বলুন। আজ আমি নিজে হা’তে খানা পাকাবো। আপনাদের সবাইকে খাওয়াবো।

চাকরটা’ বাজার করে নিয়ে এলো। নানারকম সুন্দর সুন্দর খানা বানালো কুৎ-অ’ল। সবাইকে নিজে হা’তে পরিবেশন করে খাওয়ালো। সারাটা’ দিন খুব হৈ হল্লা করে কাটিয়ে সন্ধ্যাবেলা প্রাসাদে ফিরে এলো। পরদিন সকালে উঠে আবার সে শেখেরবাড়ি এসে হা’জির। সারা দিন ধরে খানাপিনা করে আবার ফিরে যায় প্রাসাদে। এইভাবে পর পর চারটে দিন খুব আমোদ করে কাটে। ভালো ভালো খানাপিনা করে ঘানিমের মা’ আর বোন-এর যেমন চেকনীই খোলে, তেমনি ঘানিমও বেশ চাঙ্গা হয়ে ওঠে। পরদিন কুৎ-অ’ল নিজে হা’তে সাজিয়ে দেয়। ফিৎনা আর তার মা’কে। নতুন সাজপোশাক কিনে এনেছিলো শেখ। সেই দামী দামী পোশাক পরালো দুজনকে। ঘানিম তার মা’ আর সুন্দরী বোন ফিৎনাকে সঙ্গে নিয়ে কুৎ-আল খলি’ফার প্রাসাদে এসে হা’জির ठूश।

খলি’ফা তখন তার খাসমহলে বি’শ্রাম করছিলেন। ঘানিম, তার মা’ আর বোন ফিৎনাকে একটা’ ঘরে বসিয়ে রেখে কুৎ-অ’ল এলো খলি’ফার কাছে।

-জাঁহা’পনা, আমি ঘানিমের সন্ধান পেয়েছি। তার মা’ আর বোন ফিৎনাও এসেছে বাগদাদে। ওদের সবাইকে নিয়ে এসেছি।

খলি’ফা খুশি হন।—ঠিক আছে, ওদের নিয়ে এসে আমা’র কাছে।

ঘানিম, তার মা’ আর বোন এসে কুর্নিশ জানিয়ে দাঁড়ালো। খলি’ফা বললেন, তুমি ঘানিম?

–গোলাম হা’জির জাঁহা’পনা।

খলি’ফা বললেন, গোলাম কেন, তুমি আমা’র ভাই। কাছে এসো। ভুল করে আমি তোমা’দের অ’নেক দুঃখ কষ্ট দিয়েছি! তোমা’র মা’ বোনের ইজ্জৎ ধ্বংস করেছি। জানি না। এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত কি দিয়ে হবে?

ঘানিম বললো, ও কথা বলবেন না, হুজুর। আমি আপনার বান্দা। বান্দা কখনও মা’লি’কের ন্যায় অ’ন্যায় বি’চার করতে পারে না।

খলি’ফা অ’বাক হন। বাঃ চমৎকার কথা বলে তো ছেলেটি! আদর করে পাশে বসান। বলেন, আমি ঠিক করেছি ঘানিম, আমা’র পিয়ারের বাঁদী কুৎ-অ’ল-এর সঙ্গে তোমা’র শাদী দেব।

—হুজুরের হুকুম তামিল করার জন্য বান্দা সর্বদাই প্রস্তুত, জাঁহা’পনা।

খলি’ফা বলেন, আরও একটা’ প্রস্তাব আছে ঘানিম। একদিন তোমা’র মা’র আর এই বোন ফিৎনাকে আমি বে-ইজৎ করেছিলাম। টা’কা পয়সার বি’নিময়ে সবই পাওয়া যায়। কিন্তু ইজৎ একবার খোয়া গেলে আর ফেরৎ পাওয়া যায় না। সে দিক থেকে আমি অ’সহা’য়। কোনও ধন-দৌলত দিয়েই তার ক্ষতিপূরণ করতে পারবো না। সেই কারণে ভেবেছি, তোমা’র বোন ফিৎনাকে শাদী করে আমি তাকে বেগমের মর্যাদা দেব। হয়ত বা এতে কিছু সান্ত্বনা পাবো। এখন তুমি পাত্রী পক্ষ, তোমা’র কি অ’ভিপ্রায়, বলো।

হঠাৎ এইরকম একটা’ অ’ভাবনীয় প্রস্তাবে ঘানিম হতভম্ব হয়ে যায়। এক মুহূর্ত মুখে কথা সরে না। একটু পরে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, আপনার মতো মহা’প্ৰাণ মহা’পুরুষই একথা উচ্চারণ করতে পারেন। না হলে, যে কারণেই হোক, হা’জার হা’জার মা’নুষের কাছে যাকে একদিন বেইজিৎ করা হয়েছে, তাকে আজ। আপনার হা’রেমের বেগম করতে চান? এত বড় সম্মা’ন, এত বড় মর্যাদা পাওয়ার কি সে যোগ্যা?

খলি’ফা বলেন, আমা’র দোষে সে যে বস্তু একদিন হা’রিয়েছে তা তো আর তাকে ফেরৎ দিতে পারবো না ঘানিম। তাই আজ তাকে আমি বেগমের মর্যাদা দিয়ে সামা’ন্য একটু ক্ষতিপূরণের সান্তুনা পেতে চাই।

ঘানিম বলে, ফিৎনা আপনার বাদী হয়ে থাকবে, জাঁহা’পনা।

খলি’ফার হুকুমে তখুনি কাজীকে ডেকে এনে দু’খানা শাদীর কবুলনামা’ তৈরি করা হলো। একখানা ঘানিম। আর কুৎ-আল-কুলুব-এর আর একখানা খলি’ফা আর ফিৎনার জন্যে। দেন-মোহর হিসাবে খলি’ফা ফিৎনাকে দিলেন এক লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা। আর ঘানিম কুৎ-এর কানে কানে বললো, আমা’র দেন-মোহর বাকী রইলো। আজ রাতে দেব, কেমন?

কুৎ-অ’ল-এর সারা মুখ লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠে, অ’সভ্য কোথাকার।

সেই রাতে মহা’ ধুমধাম করে দুই জোড়ের শাদী হয়ে গেলো। সারা বাগদাদ শহর আলোর মা’লায় সাজানো হলো। নাচ গান, হৈ হল্লা, খানাপিনীয় মেতে উঠলো শহরবাসীরা। সেই রাতে প্রাসাদের দুই মহলে দুই বাসর শয্যায় খলি’ফা-ফিৎনা আর ঘানিম-কুৎ-অ’ল মধুযামিনী যাপন করলো।

ঘানিম-কুৎ-অ’লের জন্যে খলি’ফা একখানা সুরম্য ইমা’রাৎ বানিয়ে দিলেন। ঘানিম দরবারের এক উচ্চ পদে বহা’ল হলো। মা’ এবং বি’বি’ কুৎ-অ’লকে নিয়ে সুখে স্বচ্ছন্দে ঘরসংসার করতে থাকলো!

শাহরাজাদ বলে, জাঁহা’পনা, ঘানিম। আর কুৎ-আল-কুলুব-এর কাহিনী শুনলেন। যদি ইচ্ছা করেন, এবার আপনাকে শোনাতে পারি উমর অ’ল-নুমা’ন আর পুত্র দু-আল-মা’কান-এর এক বি’চিত্র কাহিনী।

বাদশাহ শারিয়ার বলে, বলো, আমি শুনবো।

Please follow and like us:

fb-share-icon

নতুন ভিডিও গল্প!


Tags: , , , , , ,

Comments are closed here.