সহস্র এক আরব্য রজনী – ১৩ (উমর অল-নুমান, তার পুত্র সারকান ও দু-অল মাকানের কিস্সা ১)

September 4, 2021 | By Admin | Filed in: বিখ্যাত লেখকদের সাহিত্যে যৌনতা.

শাহরাজাদ উমর অ’ল-নুমা’ন আর তার পুত্র দু-আল-মা’কান-এর কাহিনী শুরু করে :

খলি’ফাদের রাজত্ব শেষে বাগদাদে শহরে এক সময়ে উমর অ’ল-নুমা’ন নামে এক বাদশাহ সিংহা’সনে অ’ধিরূঢ় ছিলো। যুদ্ধবি’দ্যায় তার সমকক্ষ সে সময়ে আর দ্বি’তীয় ছিলো না। তার বি’ক্রমের সামনে কোনও সুলতান বাদশাই মা’থা তুলে দাঁড়াতে পারতো না। এমন কি সম্রাট সীজারকেও তার বশ্যতা স্বীকার করতে হয়েছিলো। সুদূর প্রাচ্যের সমস্ত ভূখণ্ড তার পদানত ছিলো। দুনিয়ার প্রায় সব রাজা বাদশাহর কাছ থেকে নানারকম উপহা’র উপটৌকন আসতো। কারণ তারা সদসর্বদা তার ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে থাকতো।

উমর অ’ল-নুমা’নের একমা’ত্র পুত্র, সারকান মা’ত্র বি’শ বছর বয়সে তার বি’স্ময়কর শৌর্যবীর্য দেখিয়ে দুনিয়ার সব সুলতান বাদশাহদের তাক লাগিয়ে দিয়েছিলো। উমর তাকে প্ৰাণাধিক ভালোবাসতো। তার মৃ’ত্যুর পর পুত্র সারকানই সিংহা’সনে বসবে এই ছিলো তার একান্ত বাসনা।

উমর-এর চারটি বেগম। তার মধ্যে তিন বেগমের কোন সন্তানাদি হয়নি। সারকানই একমা’ত্র সন্তান। এই চার বেগম ছাড়াও উমরের তিনশো যাটটি রক্ষিতা ছিলো। নানা দেশের, নানা জাতের নানা ধর্মের মেয়ে তারা। সবাই পরম সুন্দরী যুবতী। উমর প্রত্যেক রক্ষিতার জন্যে খোজা দাসী পরিবৃত আলাদা আলাদা সুসজ্জিত কক্ষের ব্যবস্থা করেছিলো। প্রাসাদের হা’রেমে তিনশো ষাটটি কক্ষে এই রক্ষিতাদের বসবাসের ব্যবস্থা হয়েছিলো। প্রতি দিন উমর এক একজন রক্ষিতার ঘরে রাত কাটা’তো। তার হা’রেম বি’ভক্ত ছিলো বারোটি মহলে। প্রতি মহলে তিরিশটি রক্ষিতার ঘর। প্রতিটি রক্ষিতার ঘরে একটি মা’ত্র রাত্র অ’তিবাহিত করতেই এক মা’স কাল সময় কেটে যেতো। এইভাবে সে পুরো এক বছরে সমগ্র হা’রেমের প্রতিটি মেয়ের সঙ্গে একবার মা’ত্র সহবাস করতো। কোন রক্ষিতাই এক বছরের আগে দ্বি’তীয়বার উমরের দর্শন পেতো না। তার এই ন্যায় বি’চারে সব রক্ষিতাই খুব খুশি। দেশের আপামর জনসাধারণ শাহেনশাহর এই অ’লৌকিক বীর্যবত্তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলো।

একদিন উমরের কাছে খবর এলো, তার অ’ন্যতম রক্ষিতা সফিয়া অ’ন্তঃসত্ত্বা হয়েছে। বাদশাহ তো আনন্দে আত্মহা’রা। বহুকাল বাদে তার আবার সন্তান হবে। উমর-এর দৃঢ় প্রত্যয়, পুত্র সন্তানই প্রসব করবে তার রক্ষিতা।

যথা সময়ে সফিয়া একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দিলো। উমর অ’ধীর আগ্রহে দরবার কক্ষে পায়চারি করছিলো। খোজা দূত এসে খবর দিলো, একটি কন্যা সন্তান হয়েছে। বাদশাহ ত্ৰিয়মা’ণ হয়ে পড়ে। কিন্তু উমরের পুত্র সারকান শুনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। যাক একটা’ মস্ত ফাঁড়া কাটলো। সে-ই একচ্ছত্র অ’ধিপতি হতে পারবে। আর কাউকে ভাগ দিতে হবে না।

সারকান ভাবলো, যাক বাঁচা গেলো, সেই একচ্ছত্র অ’ধিপতি হতে পারবে। আর কাউকে ভাগ দিতে হবে না। সারকান মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলো, যদি পুত্র সন্তানও হয় তবু সে-ই অ’দ্বি’তীয় শাহেনশাহ হবে। নব-জাতককে যেন তেন প্রকারেণ ধরাধাম থেকে সে সরিয়ে দেবেই।

কিছুক্ষণ বাদে আবার সেই খোজা দূত এসে সংবাদ দিলো, শাহেনশাহ, মা’লকিন আরও একটি সন্তান প্রসব করেছেন। এবারেরটি ছেলে।

উমর অ’ল-নুমা’ন আনন্দে লাফিয়ে উঠলো। আর ধৈর্য ধরতে পারলো না। খোজাকে সঙ্গে নিয়ে তখুনি সেই রক্ষিতার কক্ষে ছুটে এলো।

গ্ৰীক সম্রাট উমরকে উপহা’র হিসাবে পাঠিয়েছিলো এই বাঁদীটি। সুন্দর স্বাস্থ্যবতী সুঠামদেহী এই গ্ৰীক রমণী সফিয়া নাচে গানে শিক্ষায় দীক্ষায় বি’শেষ পটিয়সী। আচার ব্যবহা’রে কথাবার্তায় একেবারে চৌকস। বছরে একটি মা’ত্র রাত্রি উমর তার সঙ্গে সহবাস করতো। সেই একটি রাতই সে এমন মধুময় করে তুলতো, যার পুরস্কার স্বরূপ আজ লাভ করেছে জোড়া সন্তান। উমর দেখলো, ছেলেটি দেখতে অ’বি’কল তারই মতো হয়েছে। কিন্তু গায়ের রং রূপ হয়েছে তার মা’-এর মতো।

প্রাসাদে আনন্দের হা’ট বসলো। খানাপিনা নাচ গান হৈ হল্লায় মেতে উঠলো সবাই। উমর নামকরণ করলো। মেয়ের নাম রাখা হলো, নুজাত-আল-জামা’ন আর ছেলের নাম রাখলো দু-আল-মা’কান। সকলে ধন্য ধন্য করতে লাগলো। গুলাব জল, আন্তর, আগরবাতি, মৃ’গনাভী কস্তুরীর সুবাসে ভরে উঠলো প্রাসাদ। জনে জনে মিষ্টি বি’তরণ করা হলো। দীন দুঃখীদের পেট ভয়ে খাওয়ানো হলো। প্রত্যেককে উপহা’র দেওয়া হলো নতুন নতুন সাজ-পোশাক।

সমস্ত শহরটা’ আলোর মা’লায় সাজানো হলো। রাস্তার মোড়ে মোড়ে স্থাপন করা হলো তোরণা-দুর।

এর পর থেকে প্রতিদিন প্রতি ঘণ্টা’য় উমর খোজা দূতের মা’ধ্যমে সফিয়া আর তার সন্তানদের সংবাদে পেতে থাকে। উমর নিজে পছন্দ করে হিরে-জহরতের অ’লঙ্কার বানাতে দিতো। এবং প্রায়ই নিজে গিয়ে দিয়ে আসতো সফিয়ার হা’তে। এইভাবে চারটি বছর কেটে গেলো। এবারে সে ছেলেমেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থা করতে উদ্যোগী হলো। তার পরম বি’শ্বাসভাজন এক প্রাজ্ঞ শিক্ষককে নিযুক্ত করলে উমর।

সারকান কিন্তু এ সবের কিছুই জানতো না। বাবার এক রক্ষিতা গর্ভবতী শুনে সে প্রাসাদে অ’বস্থান করছিলো। তার মৎলব ছিলো খারাপ। যদি শোনে পুত্র হয়েছে, যে কোন উপায়ে তার প্ৰাণ সংহা’র করবে-এই ছিলো তার পণ। কিন্তু খোজা দূতের মুখে যখন দিয়েছে, তার তিলমা’ত্র অ’পেক্ষা না করে সৈন্যসামন্ত সমভিব্যাহা’রে পরদেশ আক্রমণে বেরিয়ে পড়েছিলো। দ্বি’তীয়বার খোজা এসে যখন খবর দিলো, শুধু কন্যা নয়, সফিয়া আর একটি পুত্র সন্তানেরও জননী হয়েছে, তখন সারকানের অ’শ্বক্ষুরধ্বনি বাগদাদ ছাড়িয়ে অ’নেক—অ’নেক দূর দেশের মা’নুষের বুকে আতঙ্ক জাগিয়েছিলো। তারপর পুরো চারটি বছর ধরে সে বহু দেশ জয় করেছে। বহু সম্রাট তার পদানত হয়েছে। বশ্যতা স্বীকার করেছে। কিন্তু এদিকে যে তার আর এক অ’ংশীদার গোকুলে বাড়ছে সে-কথা আর কানে পৌঁছলো না।

একদিন উমর অ’ল-নুমা’ন সিংহা’সনে বসে আছে, এমন সময় একদল আমীর ওমরাহ এবং বি’শিষ্ট ব্যক্তিবর্গ প্রবেশ করে যথাবি’হিত কুর্নিশ জানালো।

শাহেনশাহ, আমরা আসছি রোমের সম্রাট আফ্রিদুন-এর দূত হয়ে। যদি আপনি বি’রূপ হন, আমরা বি’দায় নিয়ে চলে যাবো। আর যদি আপনার আজ্ঞা হয়, আমরা আসন গ্রহণ করতে পারি। আমা’দের সম্রাট রোম, গ্রীস ও ইয়োনিয়ার অ’ধিপতি। কনসাঁতানতিনোপোল শহরে তার প্রাসাদ। সেখানেই তিনি সিংহা’সনে অ’ধিষ্ঠিত আছেন। আমরা তার আজ্ঞা-বহা’ দাস মা’ত্র। তিনি আপনার কাছে আমা’দের পাঠিয়েছেন। সিসারিয়ার দুর্ধর্ষ সম্রাট হা’রদুব-এর প্রচণ্ড আক্রমণে হা’জার হা’জার নিরীহ প্রজাবৃন্দ প্রাণ হা’রাচ্ছে।

উমর জানতে চাইলো, কেন, কি কারণে? ঝুট মুট সে আক্রমণই বা করবে কেন?

—কারণ যা তা হলো এই :

কিছুদিন আগে আমা’দের এক আরব সেনাপতি মরুপ্রান্তর অ’তিক্রম করার সময় এক জায়গায় এক রত্নভাণ্ডারের সন্ধান পায়। সম্রাট আলেকজান্দার সারা পৃথিবী জয় করে সমস্ত ধনরত্ন এনে লুকিয়ে রেখেছিলো এই জায়গায়। সেই বি’পুল বৈভব-এর পরিমা’ণ করা সম্ভব নয়। হীরা, জহরৎ, মণিমুক্তার পাহা’ড়। এর মধ্যে তিনটি গ্রহরত্ব ছিলো, যার অ’লৌকিক গুণে দুরারোগ্য ব্যাধি সারে। বি’শেষ করে শিশুদের অ’সুখে ধন্বন্তরী। আমা’দের সেই আরব সেনাপতি এইসব পাথরের গুণাগুণ সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহা’ল ছিলো। সুলতানকে ভেট দেবার জন্যে দু’টো জাহা’জ বোঝাই করে সে এই সব ধনরত্ন কনসাঁতানতিনোপোলে নিয়ে আসতে থাকে। কিন্তু এমনই বরাত, জাহা’জ সৈন্যবাহিনী নিয়ে অ’গ্রসর হচ্ছে। আমা’দের সেনাপতি হা’রদুবের প্রচণ্ড আক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে না। যাবতীয় ধনরত্ন লুণ্ঠপট করে নিয়ে যায়। সেই সঙ্গে ঐ তিনখানা অ’লৌকিক পাথরও তার হস্তগত হয়ে পড়ে। আমা’দের সম্রাট আফ্রিদুন এক বি’শাল সৈন্যবাহিনী পাঠালো। কিন্তু তাদের নিশ্চিহ্ন করে দিলো হা’রদুব। আরও এক জাহা’জ সৈন্য পাঠানো হলো। তারাও ফিরে এলো না। পরে আরও এক জাহা’জ সৈন্য তার দাপটের সামনে দাঁড়াতে না পেরে প্ৰাণ ভয়ে পশ্চাদপসরণ করে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছে।

আমা’দের সুলতান দারুণ ক্রুদ্ধ। কিন্তু নিরুপায়। হা’রদুবের মতো প্রবল পরাক্রান্ত সম্রাটকে দমন করার মতো শক্তি তার নাই। এখন আপনার কাছে এসেছি। আমা’দের প্রার্থনা-এই নিদারুণ সঙ্কটের দিনে আপনি আমা’দের সম্রাটকে সাহা’য্য করুন। আমা’দের দৃঢ় বি’শ্বাস, আপনার প্রবল পরাক্রম সে সহ্য করতে পারবে না। পরাজয় তাকে স্বীকার করতেই হবে। এই আমা’দের সম্রাটের বাসনা। তিনি আপনাকে নানা উপটৌকন পাঠিয়েছেন। আপনার আদেশ পেলেই আমরা জাহা’জ খালাস করার নির্দেশ দিতে পারি।

কনসতনতিনোপোলের সম্রাট আফ্রিদুনের প্রতিনিধিরা বললো, সম্রাট যে সব উপহা’র পাঠিয়েছেন তার মধ্যে আছে পঞ্চাশটি পরমা’ সুন্দরী গ্ৰীসের কুমা’রী কন্যা। আর পঞ্চাশটি গ্রীসের সুঠাম দেহী নওজোয়ান। সবাই রত্নালঙ্কারে এবং বাহা’রী সাজপোশাকে সুসজ্জিত।মণিমুক্তা ছাড়া তাদের স্বর্ণালঙ্কারের ওজনই হবে প্রায় এক হা’জার কিলো। মেয়েরাও তদনুরূপ রত্নালঙ্কারে ভূষিতা হয়ে এসেছে। এই দুই প্রধান উপহা’র ছাড়াও আরও সহস্ববি’ধ সামগ্ৰী সঙ্গে পাঠিয়েছে। মূল্যায়ন করলে সে সবের দামও কিছু কম নয়।

উমর খুশি হলো। বললো, আমি আপনাদের সম্রাটের উপহা’র গ্রহণ করলাম।

তারপর উজিরকে নির্দেশ দিলো, এদের যথাযোগ্য আদর আপ্যায়নের ব্যবস্থা করো। তারপর আমা’র কাছে একবার এসো, তোমা’র সঙ্গে কিছু গোপন পরামর্শ আছে।

অ’ভ্যাগত অ’তিথিদের সৎকারের ব্যবস্থা করে বৃদ্ধ উজির দানদান উমরের নিভৃত কক্ষে ফিরে এলে বাদশাহ বললো, কনসাঁতানতিনোপোলের সম্রাট আফ্রিদুন আমা’র সাহা’য্য চায়। এখন বলো, কি করা উচিত?

বৃদ্ধ উজির ধীর শান্তভাবে বলতে থাকে, কনসাঁতানতিনোপোলের সম্রাট বি’ধর্মী কাফের খ্ৰীষ্টা’ন। তার প্রজারাও সবাই কাফের। অ’বশ্য তার শত্রুপক্ষ তারই স্বজাতি। সেও কাফের, বি’ধমী খ্ৰীষ্টা’ন। সুতরাং সেদিক থেকে আমা’দের আপত্তির কিছু নাই। এর ফলে ইসলাম ধর্মের প্রতি কোনও আঘাত আসবে না। আমা’র পরামর্শ, আপনি আপনার যোগ্য পুত্র সারকানকে পাঠান। সে যুদ্ধবি’দ্যায় পরম বি’ক্রমশালী। তার হা’তে সিসারিয়া সম্রাটের পরাজয় অ’বশ্যম্ভাবী। আর তাছাড়া আপনার মতো বি’শ্ববি’জেতা শাহেনশাহকে যদি, সামা’ন্য এক সিসারিয়া সম্রাটকে পরাজিত করতে, বি’রাট সৈন্যবাহিনী নিয়ে আক্রমণ করতে হয়, মোটেও তা গৌরবের হবে না। লোকে বলবে, মশা মা’রতে কামা’ন দোগা। তবে সাহা’য্য আপনার পাঠানো দরকার। কারণ, তার প্রেরিত উপটৌকন আপনি গ্রহণ করেছেন। তার প্রতিনিধিদের শর্তই ছিলো, সব শুনে আপনি যদি সম্মত হন। তবেই তারা জাহা’জ খালাস করে উপটৌকন নিয়ে আসবে। নচেৎ ফিরে যাবে।

উমর অ’ল-নুমা’ন, ঘাড় নাড়লো, ঠিক-ঠিক বলেছে উজির। একবার যখন তার অ’হঙ্কার। আজ থেকে তোমা’কে আমি আমা’র সৈন্যবাহিনীর প্রধান নিযুক্ত করলাম। আমা’র পুত্র সারকানের কাছে দূত পাঠানো হলো। কয়েক দিনের মধ্যে পুত্র ফিরে এলে উমর জানালো, উজিরকে প্রধান হিসাবে সঙ্গে নিয়ে তুমি সিসারিয়া আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হও। আমা’র বাছাই করা দশ হা’জার ফৌজ আর তাদের খানাপিনা, প্রয়োজনীয় লটব্যুহর নিয়ে যত শীঘ্র পারো বেরিয়ে পড়ো।

সারকান পিতার আদেশ শিরোধার্য করে বললো, আমা’কে মা’ত্র তিন দিনের সময় দিন, শাহেনশাহ। আমি তার মধ্যে আমা’র সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করে নিচ্ছি।

তিনদিন পরে উমর অ’ল-নুদান দশ হা’জার কুর্নিশ গ্রহণ করে সৈন্যবাহিনী সহ পুত্র সারকান এবং বৃদ্ধ উজির দানাদানকে বি’দায় জানালো।

সারকান বাছাই করা সমর সম্ভার নিয়ে রওনা হলো। বি’শ দিনের পথ। সম্রাট আফ্রিদুন তার জন্যে এক বি’রাট ছাউনি তৈরি করে রেখেছে। প্রথমে যেখানে গিয়ে ডেরা গাড়তে হবে। বি’দায়কালে সুলতান উমর অ’ল-নুদান সাতটা’ বাক্স ভর্তি মোহর সঙ্গে দিয়েছে। উজির দানাদানকে বলে দিয়েছে, এগুলো সে যেন তার নিজের হেপাজতে রাখে।

একুশ দিনের মা’থায় সারকান তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে হা’জির হলো এক সুরম্য উপত্যকায়। এখানেই তার জন্যে ছাউনি প্রস্তুত করে রেখেছে। সম্রাট আফ্রিদুন। সারকান তার অ’ধীনস্থ সেনাপতিদের নির্দেশ দিলো, এই ছাউনিতে তিনদিন বি’শ্রাম নিতে হবে।

এই ছাউনির অ’দূরেই সম্রাট হা’রদুবের অ’ধিকৃত অ’ঞ্চলের সীমা’না। সারকান ঠিক করলো, গোপনে গোপনে সব পথঘাট আগে দেখে নিতে হবে। কোনদিক দিয়ে কিভাবে আক্রমণ চালাতে হবে তার জন্যেই এই গোপন অ’নুসন্ধান দরকার। নিজের দেহরক্ষীদের বি’দায় দিয়ে একাই সেই দুৰ্ভেদ্য জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়লো। যতদূর যায় শুধু গভীর জঙ্গল। কোন জনবসতির চিহ্ন নাই। এইভাবে রাত্রির প্রথম প্রহর অ’তিক্রান্ত হয়। সারকান-এর ক্লান্তি আসে। একটা’ বি’শাল বৃক্ষের নিচে ঘোড়াটা’কে দাঁড় করায়। গাছের গুড়িতে হেলান দিয়ে ঘোড়ার পিঠে চেপে থেকেই একটুক্ষণের জন্য সে ঘুমিয়ে নেয়। তারপর আবার এগোতে থাকে। চলতে চলতে এক জায়গায় এসে কান পেতে শোনে, অ’দূরে নারী কণ্ঠের কলহা’স্য। এত রাতে এই গভীর জঙ্গলে নারী কণ্ঠ আসে কোথা থেকে। সারকান ভাবে, নিশ্চয়ই অ’দূরে কোথাও লোকালয় আছে। কিন্তু না, আশে পাশে কোথাও কোন ঘর বাড়ির সন্ধান পাওয়া গেলো না। এবার কিন্তু সেই হা’সির শব্দ আরও উচ্চতর হতে থাকে। হোহো-হা’হা’—হিহি। এই ধরনের অ’ট্টহা’সিতে মুখর হয়ে ওঠে।

সারকান-এর ভয় হয়। নিশ্চয়ই কোন ভৌতিক ব্যাপার। এখন একমা’ত্র আল্লাহই ভরসা। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে এসে সেই হা’সির শব্দ অ’নুসরণ করে সারকান হা’ঁটতে থাকে। চলতে চলতে অ’বশেষে হা’জির হয় এক নদীর ধারে। কুলকুল করে বয়ে চলেছে স্রোতধ্বনি। তার তীরে গাছের ডালে পাখীরা কুলায় ফিরে মিষ্টি মধুর আওয়াজ তুলে গান ধরেছে। যেদিকে তাকায়, দেখে নানা বি’চিত্র রঙের ফুলের মেলা।

সারকান দেখলো নদীর ওপারে চাঁদ উঠেছে। সেই চাঁদের অ’স্পষ্ট আলোয় আবছা আবছা! দেখা গেলো বি’রাট উচু মিনারওয়ালা এক প্রাসাদ। একেবারে নদীর তীরে। নদীর শান্ত জলে তার ছায়া পড়েছে। মনে হলো ঐ প্রাসাদে মা’নুষের বসতি আছে। এবং ঐ অ’ট্টহা’সির আওয়াজ ওখান থেকেই ছড়িয়ে পড়ছে।

ক্রমশ চাঁদের আলো আরও উজজুল হয়। এবার পরিষ্কার দেখা যায়, প্রাসাদের সামনে একখণ্ড সবুজ প্রাঙ্গণ। তার মা’ঝখানে একটি অ’নিন্দ সুন্দরী তরুণীকে ঘিরে বৃত্তাকারে কলহা’স্যরত দশটি যুবতী। এই রূপসীর অ’ট্টহা’সিই সে দূর থেকে শুনতে পেয়েছিলো। এবারে তার কথাও শোনা গেলো। পরিষ্কার আরবীতে বলছেঃ তোদের দিয়ে কিছু হবে না। তোরা সব অ’পদার্থ। অ’মন ন্যাকাপনা করলে কুস্তি লড়া যায় না বুঝলি’! কুস্তির জন্যে দেহে তাগাদ দরকার। নে আয়, আমা’কে হা’রানো চাই।

একটা’ একটা’ করে মেয়ে এগিয়ে আসে। কিন্তু এক একটা’ প্যাচেই এক একজনকে কাত করে ফেলে দেয়। মেয়েগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। শুধুইজের আর কাঁচুলী পরা সেই তরুণী কিন্তু ছাড়বার পাত্রী নয়। দু’হা’তে নিজের জঙ্ঘা থ্যাবড়াতে থাবড়াতে আবার হুঙ্কার দিয়ে ওঠে, এই ওঠ–ওঠ শিগ্‌গির। আয় লড়বি’ আয়। কিন্তু কেউ আর সাহস করে না। তখন মেয়েটি ক্ষেপে যায়, কথা কানে যাচ্ছে না বুঝি। ওঠ বলছি, নইলে কিন্তু বেল্টেরবাড়ি দিয়ে পাছ ফাটিয়ে দেব। ভয়ে ভয়ে একটি মেয়ে উঠে আসে। কিন্তু পলকেই তাকে তুলে আছাড় দেয় সে। এইভাবে এক এক সব কটা’ মেয়েকেই অ’তি সহজেই কাবু করে ফেলে। এই সময় একটা’ ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে এক বয়স্ক রমণী।–মেয়েগুলোকে নিয়ে কি সব ছিনিমিনি খেলছো। ওরা কি কুস্তি জনে যে ওদের সঙ্গে কুস্তি লড়ছে? এই সব আনাড়ী মেয়েগুলোর ওপর তোমা’র কায়দা কসরৎ দেখিয়ে কি এমন মজা পাচ্ছে? তার চেয়ে যে কুস্তি জানে তার সঙ্গে লড়ে দেখাও তোমা’র হিম্মৎ, তবে বুঝি? সত্যিই তুমি যদি কুস্তিই লড়তে চাও এসো, আমা’র সঙ্গে লড়বে। আমি বুড়ো হয়েছি। তবু তোমা’কে একটু শিক্ষা দিতে পারবো।

তরুণীটি মনে মনে বি’রক্ত হয়। কিন্তু মুখে প্রকাশ করে না। বলে, বুড়িমা’ তামা’শা করছে, না সত্যি সত্যিই লড়তে চাও আমা’র সঙ্গে?

-কেন, তামা’শা করবো কেন? এসো, সত্যিই একবার দেখে নিই, কতখানি প্যাঁচ পয়জার তুমি শিখেছে।

তখন সেই তরুণী হুঙ্কার ছাড়ে, তবে এসো, কেমন করে তোমা’র ঘাড় মটকাই একবার দেখে যাও।

এই বলে রাগে। কাঁপতে কাঁপতে বয়স্কার সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

তখন বয়স্ক রমণীটি বলে, দাঁড়াও, কুস্তি লড়তে গেলে তো আর এই জবুথুবু সাজপোশাকে লড়া যাবে না। পোশাক আশাক আগে খুলে ফেলি’। তারপর দেখবো, তোমা’র কত হিম্মৎ।

এই বলে সেই বি’শাল বপুকুৎসিৎ রমণী তার সব সাজপোশাক খুলে ছুঁড়ে ফেলে। এমন কি ইজেরটা’ পর্যন্ত। তরুণীকে উদ্দেশ করে বলে, তুমিই বা কঁচুলী ইজের পরে রইলে কেন? ওটা’ ধরে টা’ন দিলে তো এখুনি কুপোকাৎ হয়ে যাবে।

এক মুহূর্ত কি চিন্তা করলো মেয়েটি। সেও খুলে ফেললো তার কীচুলী আর ইজের। বি’বস্ত্রা যুবতীটি সারকারের দিকে মুখ করে দাড়িয়ে। সারকান তার অ’নন্য রূপ-সৌন্দর্য আর যৌবনভরা দেহ, বড় বড় সুগঠিত স্তন, উরু আর যৌনকেশে ভরা উরুসন্ধিস্থলের দিকে বি’স্ফোরিত চোখে তাকিয়ে রইল। কোন মা’নবীর দেহে এমন সৌন্দর্য থাকতে পারে এ যেন তার কল্পনার অ’তীত। সেই চন্দ্রলোকে সারকান পরিষ্কার প্রত্যক্ষ করতে পারলো, শ্বেত পাথরে খোদাই করা এক অ’ন্সরী মূর্তি। আর তার সামনে বীভৎস-দর্শন কালো কুৎসিত ভালুকীর মতো এক মধ্যবয়স্ক রমণী। দুই কুস্তিগীর তাক করে গুটি গুটি মুখোমুখি এগোতে থাকে। দুজনেই নিজের নিজের জঙ্ঘা থ্যাবড়াতে শুরু করে। সারকান আর হা’সি রুখতে পারে না। মনে হয় সে বুঝি অ’জ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে!

প্রথম প্যাঁচ থেকে পিছলে বেরিয়ে আসে তরুণী। বয়স্কার ঘাড়টা’ বাঁ হা’তে চেপে ধরে ডান হা’তটা’ চালি’য়ে দেয় তার দুই জঙ্ঘার মা’ঝখান দিয়ে। তারপর একটা’ ঝাকি দিয়ে ঐ বি’শাল বপুটা’ মা’থার উপরে তুলে ছুঁড়ে দেয় সাত হা’ত দূরে! বয়স্কটি কোনরকমে উঠে দাঁড়িয়ে তেড়ে আসে তরুণীর দিকে। আবার তাকে অ’তি সহজেই তুলে আর এক আছাড় দেয়। এবার আর সে উঠে দাঁড়াতে পারে না। তরুণী এগিয়ে আসে। তার পোশাক-আশাক এগিয়ে দিয়ে বলে, বুড়ি মা’, আমা’র কিন্তু কোনও দোষ নাই। আমি চাইনি। কিন্তু তুমি আমা’কে চটিয়ে দিলে, তাই তোমা’র সঙ্গে লড়তে নেমেছিলাম। যাই হোক, যীশুর দয়ায় তোমা’র তেমন কোন চোট-ফোট লাগেনি তো! নাও ওঠ।

বয়স্ক কোন কথা বললো না। সাজপোশাক নিয়ে বাগান ছেড়ে ওপাশে চলে গেলো।

সারকান দেখলো তরুণীটি একা পায়চারী করছে। তার দশটি বাদী সরাবের নেশায় বুদ হয়ে ঘাসের উপর পড়ে আছে। সারকান ঘোড়ার পিঠে চাবুক মেরে এক লাফে নদী পেরিয়ে প্রাসাদ প্রাঙ্গণের দিকে এগিয়ে যায়। মেয়েটি তখন আনমনে অ’স্তমিত চাঁদের দিকে চেয়ে কি যেন ভাবছিলো। সারকান পিছনে এসে দাঁড়ায়। আচমকা চিৎকার করে ওঠে, আল্লাহ সৰ্ব্ব-শক্তিমা’ন।

তরুণীটি হতচকিত হয়ে ছিটকে সরে যায় খানিকটা’। তারপর সারকানের দিকে নজর পড়তেই নদীর দিকে দৌড়ে পালায়। ঋক্ত নদীটি চওড়ায় মা’ত্র ছ সাত হা’ত। এক লাফে ওপারে গিয়ে দাঁড়ায়। সুললি’ত; কণ্ঠে প্রশ্ন করে, কে তুমি, আমা’দের এই নিরালা নির্জন প্রাঙ্গণে এসে তলোয়ার উক্ত হা’তে দাঁড়ালে? এমন ভাব করে এসেছো, যেন কোনও বীরপুরুষ, সৈন্যবাহিনী পুঁঠি-কেণ্ঠ আক্রমণ করতে এসেছে। তুমি আসছে। কোথা থেকে, আর যাবেই বা কোথায়? ইহঁত সাফ সাফ সত্যি কথা বলে। না হলে ভেবো না। এখান থেকে পালি’য়ে রেহা’ই পাবে। আমা’র এক ডাকে চার হা’জার খ্ৰীষ্টা’ন সৈন্যসামন্ত বেরিয়ে আসবে। পদুম আমা’র নির্দেশেই তারা চলে। এখনও সত্যি করে বলো, তুমি কি চাও? যদি এই অ’রণ্যে পথ হা’রিয়ে এখানে এসে থাকে, আমি তোমা’কে আবার পথের নিশানা বাৎলে দেব।

—আমি এক বি’দেশী মুসলমা’ন মুসাফির, সারকান বলে, না, আমি পথ হা’রিয়ে আসেনি এখানে। আজ রাতের সঙ্গী হিসাবে গোটা’ কয়েক তাগড়াই মেয়েছেলে খুঁজতেই বেরিয়েছি। তোমা’র এই দশটা’ বাদী আমা’দের সে-ক্ষুধা মেটা’তে পারবে, আশা করি। যদি তোমা’র অ’মত না থাকে। তবে আমা’র সঙ্গীসাথীদের আস্তানায় এদের নিয়ে যেতে পারি।

—তুমি একটা’ মিথ্যেবাদী ভণ্ড সৈনিক। তোমা’র এসব কথা আমি আদৌ বি’শ্বাস করতে পারছি না। আমা’র ধারণা, তোমা’র অ’ন্য কোনও বদ মৎলব আছে।

ওগো সুন্দরী, যে আল্লাহর কাছে মিজেকে সঁপে দিতে পারে সেই প্রকৃত সুখ পায়। আর কোনও সুখই সুখ নয়-যার সঙ্গে আল্লাহর নামগান জডিত থাকে না।

তরুণী তখন বলে, তোমা’র এসব ভণ্ডামী। আসল কথা চেপে যাচ্ছে। আমি কিন্তু আমা’র সৈন্যবাহিনী তলব করতে বাধ্য হবো। এখনও সত্যি কথা বলো। তুমি যদি প্রকৃত মুসাফির হও, আমা’র দ্বারা তোমা’র কোনও ক্ষতি হবে না। বি’শেষ করে তুমি যখন দেখতে শুনতে সুন্দর সুপুরষ। তোমা’দের রাত্রি সহবাসের জন্যে এই বাদীগুলোকে যদি প্রয়োজন হয়। স্বচ্ছন্দে দিতে পারি। কিন্তু একটা’ শর্ত আছে। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে পড়ে। তোমা’র অ’স্ত্রশস্ত্র রেখে দাও। আমি যেমন খালি’ হা’তে তেমনি খালি’ হা’তে এগিয়ে এসো আমা’র কাছে। আমা’র সঙ্গে এক হা’ত লড়তে হবে। আমা’কে যদি তোমা’র পিঠে তুলে নিতে পারো, এই সব বাদী তোমা’র হবে। আমা’কেও যেখানে খুশি নিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু যদি না পারো? লড়াইয়ে যদি আমা’র হা’তে হেরে যাও? তাহলে তোমা’কে আমা’র গোলাম হয়ে থাকতে হবে।

সারকান ভাবে, মেয়েটা’ পাগল? সে জানে না। কার সামনে দাঁড়িয়ে এই সব হা’ম বড়াই বাত ছাড়ছে। বললো, আমি রাজী। কোনও অ’স্ত্রশস্ত্ব নেবো না। শুধু হা’তে তোমা’র সঙ্গে আজ কুস্তি লড়বো, এসো। যেভাবে চাও সেইভাবেই লড়বো। চলে এসো। আমি যদি হেরে যাই, তবে মুক্তি পণ হিসাবে যত টা’কা চাও আমি দেব। আর তুমি যদি হা’রো তুমি হবে আমা’র সুলতানের উপহা’রের পাত্রী। আল্লাহর পয়গম্বরের নামে হলফ করে বলছি—আমা’র কথার নড়চড় হবে না।

মেয়েটি বললো, আবার পয়গম্বর কেন, যিনি তোমা’কে সৃষ্টি করেছেন, যাঁর দৌলতে বেঁচে আছো তার নামে কসম খেয়ে বলো, কথার কোনও এদিক ওদিক করবে না।

সারকান সেইভাবেই হলফ করলো।

তরুণীটি তখন এক লাফে আবার নদীটা’ পেরিয়ে আসে। উচ্চ হা’সিতে ফেটে পড়ে। বলে, এখনও বলছি, ভালো মা’নুষের ছেলে, মা’নে মা’নে কেটে পড়ে। সকাল হতে আর বেশি দেরি নাই। এখনই আমা’র বাদীরা সব জেগে উঠবে। ওদের মধ্যে সবচেয়ে যে রোগা পটকা সে-ই তোমা’কে তুলে আছাড় দেবে।

এই বলে সে সারকানকে পাশ কাটিয়ে বাগিচার অ’পর প্রান্তে চলে যায়। সারকান দেখে, মেয়েটি কুস্তির কথাটা’ বেমা’লুম চেপে যেতে চাইছে। একটু আগেই সে যে তাকে মল্লযুদ্ধে আহ্বান করেছিলো। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে। ও-সব তার বাহা’না।

সারকান অ’বাক হয়ে প্রশ্ন করে, এই না, পঁয়তারা করলে তুমি আমা’র সঙ্গে কুস্তি লড়বে? কই, কি হলো? এখন সুড় সুড় করে কেটে পড়ছে। কেন?

মেয়েটি মুচকি হেসে বলে, তুমি কি চাও, আমা’র হা’তে মা’ন ইজ্জত খোয়াবো? ঠিক আছে, আমা’র কোনও আপত্তি নাই।

সারকান বলে তোমা’র দরবারে যখন এসেই পড়েছি, তোমা’কে একটু সেবা যত্ন না করে। যাবো না। আমি তো তোমা’র দাসানুদাস।

—তা কথাটা’ নেহা’ৎ মিথ্যে বলেনি। আচ্ছা, ঘোড়া থেকে নামো। তুমি আমা’র মেহেমা’ন।

সারকান পুলকিত হয়। ঘোড়া থেকে নেমে পড়ে। মেয়েটি তার ঘোড়াটা’কে একটা’ বাঁদীর হা’তে তুলে দিয়ে বলে, ভালো করে দানাপানি খাওয়াবার ব্যবস্থা কর।

সারকান বলে, সুন্দরী, তোমা’র রূপে যেমন মোহিত হয়েছি, তেমনি তোমা’র আদর আপ্যায়নও আমা’কে মুগ্ধ করেছে। তোমা’র মতো সুন্দরী মেয়ে—এই বনবাদাড়ে পড়ে থেকে জীবনটা’কে নষ্ট করছে কেন? চলো, আমা’দের বাগদাদ শহরে নিয়ে যাবো তোমা’কে! দেখবে কত মজা পাবে। কত সুন্দর শহর, চোখ জুড়িয়ে যাবে। আর দেখতে পাবে দুনিয়ার সেরা সব বীরপুরুষ। আর দেখবে, আমা’র কি খাতির। চলো সুন্দরী, একবার সেই মনভোলানো দেশ বাগদাদেই চলো আমা’র সঙ্গে।

—হা’ ঈশ্বর, আমি ভেবেছিলাম, তুমি একজন জ্ঞানীগুণী মা’নুষ। এখন বুঝলাম তোমা’র মা’থার ইসকুরুপ কিছু নড়বড়ে আছে।

—কেন, কেন?

—তা না হলে অ’সভ্য বর্বরদের আস্তাবল বাগদাদে নিয়ে যেতে চাও আমা’কে। ওখানে শুনেছি বাদশাহ উমর অ’ল-নুমা’নের হা’রেমে তিনশো ষাটটি রক্ষিতা আছে। লোকটা’ নাকি প্রত্যেক রাতে একটা’ রক্ষিতাকে নিয়ে শোয়। আর সারা রাত ধরে মেয়েটা’র মা’ংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়। জানোয়ার কোথাকার। তুমি আমা’কে সেই লোকটা’র থাবার মধ্যে ছুঁড়ে দিতে চাইছো? সারা বছরের মধ্যে একটা’ রাত সে আমা’র ঘরে আসবে। পশুর মতো অ’ত্যাচার করে চলে যাবে। তারপর আবার একটা’ বছর ধরে তার পথ চেয়ে ভিখিরির মতো বসে থাকবো। ঈশ্বর রক্ষা করুন, মরে গেলেও ঐ শয়তানের খপ্পরে পড়তে রাজী নই। আর কখনো ওসব কথা বলে আমা’কে লোভ দেখাবার চেষ্টা’ করো না। এমন কি তুমি যদি স্বয়ং সারকানও হও, তবু তোমা’র সঙ্গে যাবো না।

–সারকান কে, তুমি জানো?

—জানবো না কেন? বাগদাদের বাদশাহ উমর অ’ল-নুমা’নের পুত্র। জাঁদরেল যোদ্ধা। তার দাপটে সবাই নাকি থর থর কম্পমা’ন। দশ হা’জার সৈন্য নিয়ে সে এসেছে। ছাউনি ফেলেছে আমা’দের দেশের সীমা’ন্তে। সম্রাট আফ্রিদুনের সঙ্গে হা’ত মিলি’য়ে লড়াই করবে আমা’দের সম্রাট হা’রদুবের বি’রুদ্ধে। আমা’র ইচ্ছে হচ্ছে, একাই আমি চলে যাই ওর ছাউনিতে। শয়তানের বাচ্চার মুণ্ডুটা’ কেটে নিয়ে আসি। সে আমা’দের পরম শত্রু। যাক, ওসব কথা, এখন এসো, আমা’র সঙ্গে এসো।

সারকান বুঝতে পারলো মেয়েটি তার এবং তার সৈন্যদলের ওপর কি রকমটা’ চটা’। ভাগ্যে সে নিজের পরিচয় দিয়ে ফেলেনি। তা হলে তো এতক্ষণে তাকে সাবাড়ি করে দিতো। তরুণীর পিছনে পিছনে অ’নুসরণ করে চলে সারকান।

একটা’ বি’রাট ফটকের সামনে এসে দাঁড়ায়। মেয়েটি বলে, চলো, ভেতরে চলো।

একটা’ সুসজ্জিত সুরম্য কক্ষে তারা প্রবেশ করে। মূল্যবান আসবাবপত্রে সাজানো গোছানো ঝকঝকে তকতকে। কডিকাঠ থেকে ঝুলছে অ’নেকগুলো ঝাড়বাতি। সারা ঘরময় মোমের মিষ্টি মধুর নরম আলো আতর আর আগরবাতির সুবাসে মন মেতে ওঠে। সারকান ভাবে সে এক স্বপ্ন পুরীতে এসে পড়েছে। ঘরের এক পাশে একটি বি’শাল শয্যা।

মেয়েটি বলে, এখানে শুয়ে বি’শ্রাম করো।

সারকান বি’ছানায় গা এলি’য়ে দেয়। দাসী বাদীরা এসে তার চারপাশে বসে পড়ে। মেয়েটি অ’ন্য ঘুরে চলে যায়।

অ’নেকক্ষণ এক একা শুয়ে থাকে। কিন্তু মেয়েটি আর ফিরে আসে না। সারকান বাদীদের জিজ্ঞেস করে, তোমা’দের মা’লকিন কোথায় গেলো, আর আসবে না?

–না। তিনি ঘুমুতে গেলেন—

সারকান উঠে বসে। ভাবে, কি করা যায়। মেয়েটি তাকে একা ফেলে চলে গেলো?

দাসী বাদীরা নানারকম খানাপিনা নিয়ে এলো। সারা রাত কিছু খাওয়া হয়নি। সারকান অ’নুভব করে, দারুণ ক্ষিদে পেয়েছে তার।

বাঁদীরা সোনার থালায় খানা সাজিয়ে দিয়ে বলে, মেহেরবানী করে একটু কিছু খেয়ে নিন।

সারকান আর অ’পেক্ষা না করে গোগ্রাসে খেতে থাকে। অ’পূর্ব স্বাদ। এমন খানা সে বহুকাল খায়নি। বাদীরা গোলাপ জল দিয়ে তার হা’ত মুখ ধুইয়ে দেয়। কেউ তোয়ালে এনে মুছিয়ে দেয় মুখ।

সারকান এবার আবার সৈন্যদের কথা ভেবে চিন্তিত হয়। সেই পাহা’ড়ী উপত্যকায় ছাউনিতে তাদের ফেলে রেখে চলে এসেছে। নতুন জায়গা। বি’দেশ বি’ভূঁই। যদি কোন অ’তর্কিত আক্রমণ হয়? তার বাবার সতর্কবাণী মনে পড়ে। নিজের সৈন্যসামন্ত ছেড়ে কোথাও যাবে না। তাদের সুখেই তোমা’র সুখ। তাদের দুঃখেই তোমা’র দুঃখ-এই তোমা’র একমা’ত্র ধ্যানজ্ঞান হবে। অ’থচ বাবার সে-নির্দেশ উপেক্ষা করে আজ সে বি’লাসব্যসনের মধ্যে নিজেকে ডুবি’য়ে দিয়েছে! ক্রমশই সে অ’ধীর চঞ্চল হয়ে ওঠে। আরও খারাপ লাগে মেয়েটা’র এই রহস্যজনক অ’নুপস্থিতি। না বলে কয়ে তাকে এক ফেলে রেখে মেয়েটা’ এইভাবে হা’ওয়া হয়ে যাবে ভাবতে পারেনি। তাছাড়া মেয়েটা’র কোনও পরিচয়ই সে জানে না। আর এই সুরম্য-প্রাসাদই বা কোন সুলতান বাদশাহর তাও তার কাছে অ’জ্ঞাত। এ অ’বস্থায়, এখানে এইভাবে থাকা কি তার পক্ষে নিরাপদ? এই সব ভাবতে ভাবতে কখন এক সময় সে ঘুমিয়ে পড়ে।

সকালবেলা চোখ খুলতে দেখতে পায়, ঘরের ঠিক মা’ঝখানে গোটা’ কুড়ি দাসী বাঁদী পরিবেষ্টিত হয়ে সেই সুন্দরী। চোখ ধাঁধানো জমকালো সজে সজ্জিতা। তার সেই মনোমোহিনী রূপ দেখে সারকগনের সব কিছু ওলোট পালোট হয়ে যায়। ভুলে যায়, কোথায় তার সৈন্যসামন্ত কোথায় তার ছাউনি, কেনই বা এই দূর দেশে সে এসেছে। ভুলে যায় তার বাবার উপদেশ।

মেয়েটি নিতম্ব নাচিয়ে বক্ষ দুলি’য়ে অ’পরূপ লাস্যময়ী ভঙ্গীতে তার পাশে এগিয়ে আসে।

—তুমিই সারকান? উমর অ’ল-নুমা’নের পুত্র? তবে আমা’র কাছে চেপে গেছে কেন? কেন নিজের পরিচয় দাওনি? তুমি না প্রবল পরাক্রান্ত বাদশার ছেলে? তোমা’র পক্ষে এই ধরনের কাপুরুষের মতো আচরণ কি শোভা পায়?

সারকান বুঝতে পারে, আর লুকিয়ে লাভ নাই। মিথ্যা দিয়ে মিথ্যাকে ঢাকা যায় না। তাতে পরিণামে আরও খারাপ হবে।

—তুমি ঠিকই ধরেছে। সুন্দরী। আমি সারকান। উমর অ’ল-নুমা’ন আমা’র বাবা। আমা’র আর কিছু বলার নাই। এখন তোমা’র যা অ’ভিরুচি করতে পারো। যদি কিছু সাজা দিতে চাও, মা’থা পেতে নেবো।

মেয়েটি এক মুহূর্ত কোনও কথা বলতে পারে না। মা’থা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। একটু পরে সারকানের চোখে চোখ রেখে বলে, তোমা’র ভয় পাওয়ার কিছু নাই। সারকান, আমি তোমা’র কোনও ক্ষতি করবো না। তুমি আমা’র মহা’মা’ন্য মেহেমা’ন। ঐ নুন আর রুটি সাক্ষী রেখে বলছি, আমি তোমা’র কোনও ক্ষতি তো করবোই না, বরং অ’ন্য কেউ যদি তোমা’র অ’নিষ্ট করতে আসে, আমা’কে না মেরে তা করতে পারবে না। তোমা’কে রক্ষা করার সব দায়দায়িত্ব আমা’র।

মেয়েটি এসে সারকানের পাশে বসে। একটা’ গ্রীক বাদীকে উদ্দেশ করে কি যেন বলে। সারকান গ্ৰীক ভাষা জানে না। একটু পরে বাঁদীটা’ একটা’ বারকোষে সাজিয়ে নিয়ে আসে নানা ধরনের খানাপিনা। সারকনের সামনে রাখে। মেয়েটি বলে, নাও, নাস্তা করো।

কিন্তু সারকান ইতস্তত করে। কি জানি যদি কিছু বি’ষটিস খাইয়ে মা’রে। মেয়েটি বুঝতে পারে। হা’সে। বলে, ভয় নাই, জহির খাওয়াবো না। মা’রলে তোমা’কে অ’নেক আগেই খতম করতে পারতাম। আমা’র ডেরায় যখন এসে পড়েছে, তুমি যত বড় বীরপুরুষই হও, নিজেকে রক্ষণ করতে পারতে না। কিন্তু তা আমি করিনি, করবো না। কারণ তুমি আমা’র মেহেমা’ন। একবার যখন সে-সম্মা’ন তোমা’কে দিয়েছি, নিশিচন্তে থাকতে পারো, এখানে তুমি নিরাপদ।

এই বলে প্রত্যেক রেকর্ণবী থেকে একটু একটু খাবার তুলে নিয়ে মেয়েটি মুখে পুরে।—এবার তো বি’শ্বাস হচ্ছে, কোনও বি’ষ মিশিয়ে দিইনি?

সারকান লজিত হয়। সত্যিই তো সে ঐরকম সন্দেহই করেছিলো? এর পর আর কোনও দ্বি’ধা থাকে না। দু’জনে একসঙ্গে বসে আহরপর্ব শেষ করে! নাস্তা শেষে সোনার পেয়ালায় সরাব ঢালে সাকী। বলে, এবার মৌজ করে।

মেয়েটি প্রথমে মদের পেয়ালায় চুমুক দেয়। সারকান লজিত হয়। পেয়ালাটা’ তুলে নিয়ে এক চুমুকে টেনে নেয়। সুন্দরী বলে, জীবনটা’কে জটিল করে না দেখে সহজ সরল করে দেখতে পারলে অ’নেক যন্ত্রণার হা’ত থেকে রেহা’ই পাওয়া যায় জানো, মুসলমা’ন। বি’শ্বাস করে ঠকা ভালো, কিন্তু অ’বি’শ্বাসের আগুনে দগ্ধ হতে নাই।

সারকান আর সেই মৃ’গনয়না সুন্দরী মৌজ করতে করতে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে আসে। একের পর এক পেয়ালা শূন্য হতে থাকে। নেশা বেশ জমে উঠেছে। একটি বঁর্দী উঠে পাশের ঘরে চলে যায়। একটু পরে চারটি মেয়েকে সঙ্গে করে ফিরে আসে। একজনের হা’তে দামা’সকাসের বাঁশী, একজনের হা’তে পারসীয় বীণ আর একজনের হা’তে তাতারের চিখারা এবং অ’ন্য মেয়েটির হা’তে ছিলো মিশরের গীটা’র। মৃ’গনয়না সুন্দরী বাঁশীটা’ নিজের হা’তে নিয়ে মিষ্টি সুরে বাজাতে থাকে। তার সঙ্গে তাল রেখে অ’ন্য মেয়েরা বাজিয়ে চলে বীণ, গীটা’র আর চিখারা। অ’পূর্ব এক সুরের ইন্দ্রজাল সৃষ্টি হয়। সারকান সব ভুলে যায়। ভেসে চলে অ’জানা অ’চেনা এক দেশে, যেখানে, আশা, আকাঙ্ক্ষা, লোভ, মোহ, হিংসা দ্বেষ, হা’নাহা’নি কাটা’কাটি কিছু নাই। শুধু আছে অ’মৃ’ত, আর আছে ভালোবাসা।

এক সময়ে বাঁশী থেমে যায়। সুরের রেশ কিছু লেগেই থাকে। সারকান চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকে। এমন সুরের মুচ্ছনা। সে শোনেনি কখনও। মনটা’ কেমন উদাস বাউল হয়ে যায়।

এর পর একটি মেয়ে গ্ৰীক-সঙ্গীত গায়। গানের ভাষা সারকান বুঝতে পারে না। কিন্তু সুরের ভাষা বুঝতে অ’সুবি’ধা হয় না। ভিন্ন ভিন্ন দেশে মা’নুষের মুখের ভাষা আলাদা হলেও সুরের ভাষা সর্বত্রই এক।

এর পর মৃ’গনয়না গান ধরে। তার সুললি’ত কণ্ঠ সারকানের মনে বসন্ত জাগায়। পৃথিবীতে, এত সুন্দর সুন্দর ফুল আছে, গন্ধ আছে, রং আছে, রূপ আছে, পাখীর কাকলী আর ঝরনার কলতান আছে, এমন প্রাণ মা’তানো গান আছে, এত সুর আছে তার এর আগে কখনও দুর্ধর্ষ যোদ্ধা সারকান চোখ মেলে দেখেনি, প্ৰাণ ভরে আত্মা’ণ করেনি, কান পেতে শোনেনি।

ষোড়শী গান থামিয়ে জিজ্ঞেস করে, কিছু বুঝলে?

সারকান বলে, গানের ভাষা জানি না, সুরের ভাষা বুঝেছি! আমা’র সমস্ত সত্ত্বা তোমা’র গানের মধ্যে হা’রিয়ে গেছে, সুন্দরী। এমন গান আগে কখনও শুনিনি।

মেয়েটি বললো, এবার আরবী ভাষায় গাইছি, শোনো।

সরাবের নেশা জমে উঠেছিলো বেশ।। গান শুনতে শুনতে এক সময় গভীর আবেশে ঘুমিয়ে পড়ে সারকান।

সারা দিন রাতে আর তার ঘুম ভাঙ্গে না। পরদিন সকালে জেগে দেখে চারপাশে দাসী বাদীরা বসে আছে কিন্তু সেই হরিণী সেখানে নাই। মতিয়া বললো, আপনার ঘুমে যাতে কোনও ব্যাঘাত না ঘটে। সেই জন্যে সারারাত আমরা বসে পাহা’রা দিয়েছি।

সারকান জিজ্ঞেস করে তোমা’দের মা’লকিন কোথায়?

—তার শোবার ঘরে। তিনি বলেছেন, আপনার ঘুম ভাঙ্গলে তার ঘরে যেন আপনাকে নিয়ে যাই। যাবেন?

—চল যাই।

মতিয়া সারকানকে সঙ্গে নিয়ে মা’লকিনের ঘরে আসে। সোনার পালঙ্কে মখমলের শয্যায় শুয়ে ছিলো সে। সারকান যেতেই এগিয়ে এসে হা’ত ধরে নিয়ে গিয়ে বসায়। মতিয়া এনে দেয় কস্তুরী সরবৎ। মৃ’গনয়না গান ধরে। সারকান সবরৎ-এ চুমুক দেয়। তার পাগল করা গানের সুরে মনে রং ধরে। গানের পর বাজনা, বাজনার পর আবার গান, তারপর আবার বাজনা-নিরবচ্ছিন্ন সুরের লহরী চলতে থাকে।

এক সময়ে গান বাজনা শেষ হয়। ষোড়শী সুন্দরী কাছে সরে আসে।–কাল রাতটা’ কেমন কাটলো?

সারকান বলে, খানাপিনা তো খুব ভালেই হয়েছিলো। তারপরে তোমা’দের অ’মন সুন্দর গানবাজনা। একেবারে বেহেস্তের দরজায় পৌঁছে গিয়েছিলাম। এক ঘুমে কোথা দিয়ে কি করে রাতটা’ কেটে গেছে, বুঝতে পারিনি।

সেদিনও খানাপিনা গান বাজনার এলাহী ব্যবস্থা হলো। সারকান সব ভুলে মেতে রইলো সেখানে। এর পর আরও একটা’ দিন কোথা দিয়ে কেটে যায় বুঝতে পারে না সে। মধুর মুহূর্তগুলো বড় তাড়াতাডি ফুরিয়ে যায়।

মৃ’গনয়না বলে, সারকান, তুমি তো যুদ্ধবাজ। তা নিশ্চয়ই দাবা খেলতে জানো?

সারকান বলে, খুব জানি!

দাবার ছক বি’ছানো হয়। কিন্তু সারকানের আনাড়ীচাল দেখে মেয়েটি হেসে ফেলে। এই বুদ্ধি নিয়ে তুমি লড়াই করো। যেখানে বড়ে চালতে হবে সেখানে চালাচ্ছে ঘোড়া। যেখানে দরকার মন্ত্রী সেখানে পাঠাচ্ছে সেনাপতি? এতে তো এক লহমা’তেই মা’ৎ হয়ে যাবে, সাহেব?

সারকান লজ্জিত হয়। ভুল স্বীকার করে। অ’নেকদিন অ’ভ্যাস নাই। তাছাড়া এই প্রথমবারআচ্ছা, এসো, এবারে তোমা’কে হা’রাবো।

কিন্তু একবার দুবার না, পর পর পাঁচবার সারকানকে হা’রালো সে।

সারকান হা’সে।–তোমা’র কাছে হেরে যে কি সুখ তুমি কি করে বুঝবে পিয়ারী।

–আহা’, না পারলেই ওই বাহা’না। এখন খাবে এসো।

টেবি’লে খাবার সাজানো হয়েছে। সারকান আর সুন্দরী খেতে বসে। মেয়েরা কেউ বাঁশী, কেউ বীণ, কেউ গীটা’র আবার কেউবা চিখারা বাজিয়ে এক মনোরম পরিবেশ সৃষ্টি করে।

খানাপিনা শেষ করে মৃ’গনয়নাও গান ধরে। সরাবের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে সারকান তন্ময় হয়ে শুনতে থাকে।

একটু বা তন্দ্ৰা এসেছিলো। এমন সময় একদল লোকের হুড়পাড় শব্দে সারকানের চৈতন্য ফিরে আসে। উন্মুক্ত তলোয়ার হা’তে দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে এক বর্ম-শিরস্ত্ৰাণ পরা জাঁদরেল সেনাপতি। তার হুঙ্কারে সারাঘর কেঁপে ওঠে, সারকান! সারকানকে আমরা হা’তের

মুঠোয় পেয়েছি। হা’-হা’-হা’-

সারকান ভাবলো, শমন সম্মুখে, পালাবার পথ নাই। তবে কি মেয়েটা’ তার সঙ্গে বি’শ্বাসঘাতকতা করলো? এই যে এত আদর যত্ন খাতির-সবই তার ছলনা? মেয়েটির দিকে তাকালে দেখলো, ভয়ে তার মুখ শুকিয়ে গেছে। নিজেকে সামলে নিয়ে প্রশ্ন করলো, কি চাও? কেন এসেছে। এখানে? কে তুমি?

সারকান বুঝতে পারে না, কোনও ষড়যন্ত্র নয়। টুক করে উঠে গিয়ে একটা’ থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে পড়ে।

খ্ৰীষ্টা’ন সেনাপতি জবাব দেয়, মহা’মা’ন্য রাজকুমা’রী, ইরবি’জ, আপনি কি এই যুবকের পরিচয় জানেন? ও হচ্ছে সারকান, বাগদাদের বাদশাহ উমর অ’ল-নুমা’নের পুত্র। দুর্ধর্ষ যুদ্ধবাজ। ছদ্মবেশে নিজের নাম ভাঁডিয়ে সে আমা’দের এই দুর্গে প্রবেশ করেছে। উদ্দেশ্য গোপন সংবাদ সংগ্রহ করা।

–কার কথা তুমি বলছে?

—আমি এই যুবকের কথাই বলছি, মহা’মা’ন্য রাজকুমা’রী। ওর নাম সারকান।

–মিথ্যা কথা। ও একজন বি’দেশী মুসাফির। আর তাছাড়া ছদ্মবেশে সে এখানে ঢোকেনি। আমি তাকে ডেকে নিয়েছি। সে আমা’র মা’ননীয় মেহেমা’ন। কে তোমা’কে বলেছে এসব বাজে কথা।

সেনাপতি সবি’নয়ে বলতে থাকে, আপনি আমা’র ওপর রুষ্ট হবেন না, রাজকুমা’রী। আমি আপনার বাবার আজ্ঞাবহ দাস। তারই আদেশে সারকানকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যেতে এসেছি।

রাজকুমা’রী ইরবি’জা প্রশ্ন করে, তাকে এই মিথ্যে খবরটা’ কে দিলো?

–আমা’দের বাদী সর্দারণী।

–ওঃ, সেই ধুমসো বুড়ি বাঁদরোটা’! বুঝেছি, কাল ওকে তুলে আছাড় মেরেছিলাম বলে আমা’র নামে লাগিয়েছে।

সেনাপতি বলে, না সে ভুল কথা বলেনি। ও যে সারকান তার প্রমা’ণও আমরা পেয়েছি। আপনি ওকে আমা’র হা’তে তুলে দিন, এই আমা’র প্রার্থনা। আপনার বাবা হা’রদুবের হা’তে তুলে দেব তাকে, এই আমা’র একমা’ত্র কর্তব্য। সারকানকে খতম করা মা’নেই আফ্রিদুনকে খতম করা। সম্রাট আফ্রিদুনের ক্ষমতা নাই, সম্রাট হা’রদুবের একগাছি চুল ছিঁড়তে পারে। তাই সে উমর অ’ল-নুমা’নের কাছে হা’ঁটু গাড়তে বাধ্য হয়েছে। এখন সারকানই তার একমা’ত্র জোর। আমরা যদি সারকানকে শেষ করতে পারি, এ যুদ্ধে জয় আমা’দের কেউ আটকাতে পারবে না। তাই আপনার কাছে আমা’র একমা’ত্র অ’নুরোধ, আপনি সরে দাঁড়ান। সারকানকে গ্রেপ্তার করতে দিন।

সিসারিয়া সম্রাট হা’রদুবের কন্যা ইরবি’জার চোখ ক্ৰোধে রক্তবর্ণ হয়।—কি তোমা’র নাম আর পরিচয়?

—আমি আপনার আজ্ঞাবহ দাস, আমা’র নাম মা’সুরা, আমা’র বাবার নাম মা’উসুরা, তার বাবার নাম কাসিরদা! আমি আপনার বাবার পদাতিক সেনাবাহিনীর প্রধান।

ইরবি’জা চিৎকার করে ওঠে, শোনো অ’বাধ্য মা’সুরা, কে তোমা’কে এখানে আসতে দিলো। আমা’র নিভৃত মহলে ঢোকার অ’ধিকার কে দিলো তোমা’কে? কেন ঢুকেছো? কার হুকুমে ঢুকেছো, জানতে চাই।

—আজ্ঞে, আমা’কে তো কেউ প্রতিরোধ করেনি। কেউ বাধা দেয়নি। —বাধা দেয়নি বলেই তুমি আমা’র অ’ন্দর মহলে ঢুকে পড়বে? এতবড় স্পর্ধা তোমা’র কি করে হলো? তুমি জান, এর পরিণাম কী?

মা’সুরা বলে, জানি হয়তো আমা’র প্রাণদণ্ড হবে। তবু আমি সম্রাটের আজ্ঞাবহ দাস। তাঁর আদেশ পালন করাই আমা’র এখন একমা’ত্র লক্ষ্য। আপনি এই যুবককে আমা’র হা’তে তুলে দিন, রাজকুমা’রী।

রাজকুমা’রী ইরবি’জা টেবি’লে একটা’ প্রচণ্ড ঘুষি মেরে বলে, ওই মিথ্যেবাদী শয়তানের জাসু হা’ড়ে হা’রামজাদী ধূমসো বুড়ি মা’গীটা’র কথা তোমরা বি’শ্বাস করলে? ওতো বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে বলতে ওস্তাদ। একথা একশোবার সত্যি আমা’দের এই দুর্গপ্রাকারে একজন অ’চেনা মা’নুষকে আমি আশ্রয় দিয়েছি। সে বি’দেশী মুসাফির। সে আমা’র মেহেমা’ন। তার সঙ্গে সারকগনের কি সম্পর্ক? আর যদি সারকানও হয় তবু সে এখন আমা’র মা’ননীয় অ’তিথি। অ’তিথির অ’বমা’ননা কিছুতেই আমি সহ্য করবো না। দুনিয়াতে এমন কোনও শক্তি নাই তাকে আমা’র কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যেতে পারে। আমা’র কথা যদি তোমরা না শোনো, তবে আগে আমা’কে মেরে ওকে ছুঁতে পারবে, এই বলে দিলাম। এটা’ জেনে রেখো, ইরবি’জা কখনও মেহেমা’নের অ’সম্মা’ন বরদাস্ত করে না। যার সঙ্গে বসে নুন রুটি খেয়েছি, তার সঙ্গে আমি বি’শ্বাসঘাতকতা করি না। ব্যস, এর বেশী আর আমা’র কিছু বলার নাই মা’সুরা, এবার তুমি আমা’র বাবার কাছে গিয়ে যা খুশি নালি’শ করতে পারো। তার জবাব আমি তাকেই দেব। দয়া করে এই কথাটা’ তাকে বলো, ঐ বুড়ি বাঁদী সর্দািরণীটা’ ডাহা’ মিথ্যে কথা বলেছে।

মা’সুরা হা’ত জোড় করে প্রার্থনা জানায়, আপনি আমা’কে ক্ষমা’ করবেন, রাজকুমা’রী। আমি খালি’ হা’তে ফিরে যেতে পারবো না। আপনার বাবা সম্রাট হা’রদুবের হুকুম, সারকানকে নিয়ে যেতেই হবে।

—মা’সুরা, তুমি তোমা’র অ’ধিকারের সীমা’ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তুমি আমা’র মা’ইনে করা চাকর। তোমা’কে রাখা হয়েছে লড়াই করার জন্যে। যখন লড়াই করতে হুকুম করা হবে, তখন জািন কবুল করেও তোমা’কে তা করতে হবে। কিন্তু এটা’ লড়াই-এর ক্ষেত্র নয়। এ-সব তর্কসাপেক্ষ ব্যাপারের মধ্যে তোমা’র নাক না গলানোই ভালো। আর আমা’র কথা যদি তোমা’র অ’মা’ন্য করতেই সাধ হয়, তার ফলও হা’তে হা’তেই পাবে। আমা’র এই মহা’মা’ন্য অ’তিথিকে যদি তোমা’র সারকান বলেই সন্দেহ হয়, এবং আমা’র নির্দেশ অ’গ্রাহ্য করে তাকে যদি বন্দী করতেই চাও, সম্পূর্ণ নিজের দায়িত্বেই করবে। এর পরিণতির জন্যে আমা’কে দোষারোপ করবে না। আমি তার হা’তে এই ঢাল তলোয়ার তুলে দিচ্ছি, তোমা’রা একে একে এসো, লড়াই করো, হিম্মৎ দেখাও, তারপর ক্ষমতা থাকে তাকে জ্যান্ত অ’থবা মৃ’ত অ’বস্থায় সম্রাটের কাছে নিয়ে যাও—আমা’র কোন আপত্তি থাকবে। না। কিন্তু একটা’ কথা সাবধান করে দিচ্ছি। একসঙ্গে একজনের বেশী আসবে না। সেটা’ কোনও বীরের কাজ নয়। বীরত্ব যদি দেখাতেই চাও, যদি প্রমা’ণ করতে চাও তুমি আমা’র বাবা সম্রাট হা’রদুবের যোগ্য প্রধান সেনাপতি তবে দলবল না নিয়ে তার সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধে এসো। দেখবো কার কতটা’ হিম্মৎ।

মা’সুরা বি’নীতভাবে বলে, একদিকে আপনার বাবা ক্রুদ্ধ হয়েছেন অ’ন্যদিকে আপনিও ক্রোধান্বি’ত। এখন আমি উভয় সংকটে পড়েছি কাকে তুষ্ট করি। যাই হোক, আপনার প্রস্তাবই শিরোধার্য করে নিলাম। এক এক করেই হবে। আমা’দের অ’সির লড়াই। আমি সেনাদলের প্রধান। আমিই প্রথম লড়বো।

মা’সুরা বললো, আপনি উপযুক্ত কথাই বলেছেন, রাজকুমা’রী। বীর বীরের সঙ্গে সম্মুখ সমরে লড়বো। আমি সেনা দলের প্রধান, আমিই প্রথমে লড়তে চাই।

ইরবি’জা সতর্ক করে দেয়, কিন্তু তোমা’র পিছনে ধারা আছে তাদের সবাইকে জানিয়ে দাও আমা’র শর্তের কথা। মনে রেখো, তোমা’দের কেউ যদি এই শর্ত ভঙ্গ করে আমি আমা’র মেহেমা’নকে রক্ষা করার যথাযোগ্য ব্যবস্থা করবো।

মা’সুরা বলে, আপনার শর্তে আমরা রাজি, রাজকুমা’রী।

ইরবি’জা একটু হা’সলো, বললো, তোমা’দের লজ্জা হওয়া উচিত ছিলো, মা’সুরা। এক নিরস্ত্ব যুবককে বন্দী করতে একশোজন-এর এক বাহিনী আনতে হয়েছে? ছিছি, কি লজ্জা।

ইরবি’জা থামের পাশে গিয়ে সারকানকে তার প্রস্তাব জানালো। সারকান বললো, কিন্তু সুন্দরী, একজনের সঙ্গে লড়াই করা আমা’দের রীতি বি’রুদ্ধ। এক সাথে অ’ন্তত জনাদশেক লডিয়ে না পেলে হা’তের সুখ হয় না। যাইহোক, তুমি যখন প্রস্তাব দিয়েছে, তাই হবে।

এই বলে সে ঢাল তলোয়ার হা’তে হা’রদুবের প্রধান সেনাপতির দিকে রুখে আসে। সারকানের প্রথম ঘা সে সামলে নিয়ে বসে পড়ে। মা’থার উপর দিয়ে তলোয়ারখানা বেঁা করে ঘুরে আসে। এবার সারকান ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।ক্ষিপ্রগতিতে আবার এক কোপ মা’রে। এবারে আর মা’সুরা এড়াতে পারে না। ধড় আর মুণ্ডু আলাদা হয়ে যায়। প্রচণ্ড এক আর্তনাদ করে মা’সুরার ধড়টা’ মেজের উপরে লুটিয়ে পড়ে।

ইরবি’জা সারকানের এই বি’ক্রম দেখে মুগ্ধ হয়। লোক মুখে তার শৌর্য বীরত্বের অ’নেক গল্প গাথাই সে শুনেছিলো, মনে মনে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করতো তাকে। কিন্তু আজ নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করে সে-শ্রদ্ধা সহস্বগুণ বেড়ে গেলো। মনে মনে ভাবতে লাগলো, কি তার স্পর্ধা, এই মা’নুষটা’কে কাল সে মল্লযুদ্ধে আহ্বান করেছিলো? এবার ইরবি’জা চিৎকার করে ওঠে, কই আর কে আছো, এগিয়ে এসো।

মা’সুরার এক ভাই আসে। দৈত্যের মতো চেহা’রা। দাঁত কড়মড় করতে থাকে। একমুহূর্ত। সাঁই করে চালি’য়ে দেয় তলোয়ার। কিন্তু সারকানের এক স্বা, ঘায়ে তার হা’তের বঁটি হা’তেই ধরা রইলো দ্বি’খণ্ডিত তলোয়ার-এর টুকরো নিচে পড়ে গেলো। সারকান–এক কোপেই শেষ করে দিতে পারতো। কিন্তু নিরস্তুকে আঘাত করা তার ধর্ম নয়। বললো, ওকে একখানা তলোয়ার দাও।

ইরবি’জা অ’বাক হয়। দেওয়ালে টা’ঙানো একখানা তলোয়ার খুলে এনে মা’সুরার ভাই-এর হা’তে দেয়। কিন্তু তাক বুঝে একটা’ কোপ মা’রতে যায়। কিন্তু তার আগে সারকগনের তলোয়ার প্রচণ্ড বেগে গেঁথে যায়। তার তলপেটে।

এইভাবে একের পর এক আসে। আর সারকানের এক এক কোপে খতম হতে থাকে। এইভাবে জনা পঞ্চশ শেষ হয়ে গেলো। এবার আর কেউ শর্তের কথা মা’নলো না। সারকানকে খতম করতে এক সঙ্গে বাকী সবাই বাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু সারকানের বি’ক্রমের কাছে ইহা’ তুচ্ছ। সব কচুকাটা’ করে শেষ করে দিলো।

বাঁদীরা বললো, না, মা’লকিন আর কেউ নাই। সব শেষে গুণে দেখা গেলো মোট আশীটা’ লাশ। বাকী জনা কুড়ি আহত হয়ে চৌ-দৌড় দিয়ে পালি’য়ে গেছে।

সারকান তলোয়ারের রক্ত পুছে নামিয়ে রাখলো। ইরবি’জা এসে গভীর আলি’ঙ্গনে বেঁধে সারকানের অ’ধরে ছোট্ট একটি চুম্বন একে দেয়। তারপর ওর হা’ত ধরে ঘরের মা’ঝখানে এনে দাঁড় করায়। নিজের গায়ের শালখানা খুলে বাদীর হা’তে দেয়। সারকান দেখে অ’বাক হয়, ইরবি’জ, রাণ-সাজে সজিতা। কোমরে ঝোলানো তরবারীখানা দেখিয়ে বলে, একেবারে খাঁটি ভারতীয় ইস্পাতে তৈরি। তুমি যখন লড়াই করছে, আমি পাশের ঘরে গিয়ে নিজেকে তৈরি করে এলাম। যদি তোমা’র কোন সাহা’য্য দরকার হয়। তা তুমি তো একাই একশো। তোমা’র আবার সাহা’য্য দরকার হবে কিসে!

এরপর দুর্গ প্রাকারের দ্বার-রক্ষীদের ডেকে ইরবি’জা কৈফিয়ৎ তলব করে, আমা’র হুকুম ছাড়া অ’ন্য লোককে ঢুকতে দিয়েছিলে কেন?

দ্বার-রক্ষীরা জবাব দেয়, সম্রাটের প্রধান সেনাপতিকে বাধা দেবার সাহস পাবো কি করে? সম্রাট যেখানে নিজে তাদের পাঠিয়েছেন, আমরা কি করতে পারি? আপনি আমা’দের মা’লকিন ঠিক; কিন্তু আপনার ওপরে তো তিনি।

ইরবি’জা দ্বার-রক্ষীদের এই উদ্ধত জবাবে ক্রুদ্ধ হয়ে বলে, কার ওপরে কে, আমি দেখাচ্ছি।

সারকানকে বললো, এই অ’বাধ্য প্রহরীদের কোনও প্রয়োজন নাই। ওদের তুমি খতম করো।

সারকগনের তলোয়ারের কোপে তারা ধরাশায়ী হয়।

ইরবি’জা বলে, এবার তোমা’কে আমা’র নিজের কথা শোনাবো। আমা’র নাম ইরবি’জা সে তো তুমি শুনেছো। আমা’র বাবা সিসারিয়া সম্রাট হা’রদুব। আর ঐ যে ধূমসো বুড়িটা’-ও হচ্ছে আমা’র বাবার পুরোনো বাঁদী। একসময় বাবার খুব অ’সুখ হয়েছিলো, সেই সময় ওর সেবাযত্নে বাবা সুস্থ হয়ে ওঠেন। সেই থেকে সে বাবার নেক-নজরে আসে। এই দুর্গের দেখাশুনার কর্তৃত্ব ছেড়ে দেওয়া হয় তার উপর। কিন্তু আমা’র সঙ্গে তার কোন দিনও বনিবনাও ছিলো না। আজকের এই ঘটনা সে বাবার কাছে চতুগুণ করে লাগাবে, আমি জানি। বাবার মনটা’ বি’ষিয়ে দেবার চেষ্টা’ করবে। হয়তো বলবে, আমি খ্ৰীষ্টা’ন ধর্ম পরিত্যাগ করে মুসলমা’ন হয়ে গেছি। এখন আমা’র একমা’ত্র রক্ষণ আমি যদি দেশের বাড়িতে চলে যাই। এ ব্যাপারে তোমা’কে একটু সাহা’য্য করতে হবে।

সারকান ভাবে, এই মেয়েটির দৌলতেই আজ সে এতটা’ বি’পদ কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। তার নিজের বি’পদ জেনেও তাকে বাঁচাবার জন্যে এগিয়ে এসেছে। এখন তার কর্তব্য তাকে রক্ষা করা। সারকান বলে, আমা’র ধড়ে যতক্ষণ প্ৰাণ আছে, তোমা’র কেউ ক্ষতি করতে পারবে না, ইরবি’জা। কিন্তু তুমি কি তোমা’র বাবার সঙ্গে সব সম্পর্ক চুকিয়ে দিতে চাও?

ইরবি’জা বলে, এখন তা ছাড়া আর কোনও পথ নাই, সারকান। কারণ এর পরিণাম যা ঘটতে পারে, আমি অ’নুমা’ন করতে পারি। আমা’র বাবাকে আমি জানি, তার ক্ৰোধ বড় মা’রাত্মক। সেখানে সন্তান-স্নেহ তুচ্ছ। তোমা’কে আমা’র একটা’ কথা বলার আছে, আশা করি আমা’র অ’বস্থা বি’বেচনা করে কথাটা’ তুমি শুনবে।

সারকান বলে, কি কথা বলো, তোমা’র কথা না শোনার মতো স্পর্ধা আমা’র নাই, ইরবি’জা।

–তুমি আমা’র কথা শোনো, তোমা’র সৈন্য-সামন্ত নিয়ে বাগদাদে ফিরে যাও।

—কিন্তু ইরবি’জ, আমা’র বাবা উমর-আল-নুমা’ন আমা’কে পাঠিয়েছেন তোমা’র বাবার সঙ্গে যুদ্ধ করতে। কনসাঁতানতিনোপল-এর সম্রাট আফ্রিদুন আমা’র বাবার সাহা’য্য প্রার্থনা করেছিলেন। তোমা’র বাবা সম্রাট হা’রদুব তীর জাহা’জ আক্রমণ করে সব লুঠপাঠ করে নিয়ে যান। সেই জাহা’জে অ’নেক ধনরত্ন বোঝাই ছিলো। এবং তার মধ্যে ছিলো অ’লৌকিক দৈব-শক্তি সম্পন্ন তিনখানা পাথর।

ইরবি’জা বাধা দিয়ে বলে, তাহলে আসল ব্যাপারটা’ খুলে বলি’ শোনো। তোমরা তো একতরফাই শুনেছো। এবার আমা’র কথা শুনলে, সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।

প্রতি বছর বড়দিনের সময় আমা’দের-খ্ৰীষ্টা’নদের বি’রাট উৎসব হয়। আমরা এই দুর্গে ফি বছর বছরের শেষ সাতটা’ দিন খুব জাঁকজমক করে আনন্দ উৎসব পালন করে থাকি। নানা দেশের সম্রাটদের নিমন্ত্রণ করা হয়। সপরিবারে তঁরা আসেন। খুব হৈ-হল্লা, আমোদ প্রমোদ করে তারা আবার দেশে ফিরে যান। একবার এই উৎসবে সম্রাট আফ্রিদুন তার কন্যা সফিয়াকে উপহা’র স্বরূপ আমা’র বাবার হা’তে সমর্পণ করে যান। তুমি নিশ্চয়ই জানো, সেই সফিয়া এখন তোমা’র বাবার অ’ন্যতম রক্ষিতা হয়ে বাগদাদের প্রাসাদে রয়েছে। এবং সম্প্রতি সে একটি সন্তানের জননী হয়েছে।

আমা’র বাবার সঙ্গে তখন তোমা’র বাবার খুব সদ্ভাব ছিলো। তিনি সফিয়াসহ আর পাঁচটি সুন্দরী গ্ৰীক কুমা’রীকে উপহা’র হিসাবে পাঠিয়েছিলেন তোমা’র বাবার কাছে। সেই থেকে সে তোমা’র বাবার প্রাসাদেই আছে।

কিন্তু এদিকে বি’পত্তি ঘটে। সম্রাট আফ্রিদুন ভাবলেন, আমা’র বাবার্তাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্যে তার কন্যাকে অ’ন্যত্র চালান করে দিয়েছেন। কিছুদিনের মধ্যেই দারুণ অ’পমা’ন করে বাবাকে পত্র দিলেন তিনি। চিঠিখানার বয়ান মোটা’মুটি এই রকম :

বছর দুই আগে তোমা’র হা’তে আমা’র কন্যা সফিয়াকে সমর্পণ করে এসেছিলাম। আমা’র আশা ছিলো, যথাযোগ্য রাজসিক মর্যাদায় সে তোমা’র কাছে থাকবে। কিন্তু সম্প্রতি খবর পেলাম, তুমি আমা’র উপহা’রের প্রতি অ’সৌজন্য প্রকাশ করেছে। এখন সে তোমা’র কাছে নাই। এক স্লেচ্ছ যবন সুলতানের হা’রেমে সে এখন নগণ্য বাঁদী। আমি মনে করি, এ তোমা’র ঔদ্ধত্য। এবং আমা’কে অ’পমা’ন করার কৌশল মা’ত্র। আমা’র পত্র পাওয়া মা’ত্র আমা’র কন্যা সফিয়াকে সসম্মা’নে আমা’র রাজধানীতে ফেরৎ দিয়ে যাবে। নচেৎ সমুচিত শাস্তি পেতে হবে। আমা’র এই পত্রের জবাব যদি না দাও, তার পরিণাম আরও খারাপ হবে।

চিঠি পড়ার পর বাবা চিন্তিত হলেন। অ’হেতুক যুদ্ধ-বি’গ্রহ তিনি পছন্দ করেন না। কিন্তু তাই বলে, হত-বীৰ্য, কাপুরুষ তিনি নন। বাবা দেখলেন, এ ক্ষেত্রে আফ্রিদুনের সঙ্গে কলহ এড়ানো কঠিন। কারণ সফিয়াকে এখন ফেরৎ আনা সম্ভব নয়। সে সম্প্রতি উমর-আল-নুমা’নের সন্তানের জননী হয়েছে।

আমা’র বাবা বুঝলেন, ঝামেলা এড়ানো শক্ত। তবু শেষ চেষ্টা’ করলেন। আফ্রিদুনকে বুঝিয়ে সুজিয়ে চিঠি দিলেন। লি’খলেন : সফিয়াকে তিনি ইচ্ছে করে সেখানে পাঠাননি। বাগদাদসুলতানকে উপহা’র পাঠানো হয়েছিলো, পাঁচটি সুন্দরী কুমা’রী কন্যা। তাদের মধ্যে সফিয়া ভুল করে চলে গেছে। এটা’ কোনও ইচ্ছাকৃত ব্যাপার নয়। তবুও তাকে ফেরৎ হয়তো আনা যেতো, কিন্তু এখন সে উমর-আল-নুমা’নের সস্তানের জননী হয়েছে, আর তা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে আফ্রিদুন যেন ব্যাপারটা’কে অ’হেতুক জটিল না করে সহজ স্বাভাবি’কভাবে মেনে নেন।

কিন্তু এর ফলে আফ্রিদুন শান্ত তো হলেনই না, বরং আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন, কী, এত বড় স্পর্ধা, আমা’র মেয়ে মুসলমা’নের হা’রেমে তিনশো ষাটজনের একজন হয়ে পাশবি’ক অ’ত্যাচারের শিকার হচ্ছে। আমা’র বাবার উপর প্রতিশোধ নেবার পায়তারা ভাজতে লাগলেন। কিন্তু নামে সম্রাট হলে হবে কি, তালপুকুরে ঘটি ডোবে না। না আছে ধনদৌলতের জোর, না আছে সেনা বল। অ’থচ ফুকো-আভিজাত্য আর দম্ভ আছে। ষোল আনা। যাদের ভেতরটা’ ফাঁপা, অ’থচ বড়ফট্টই বেশী তারা কিন্তু শয়তানের জাসু হয়। যত সব বন্দবুদ্ধির প্যাঁচ মা’থায় ঘুরতে থাকে। আফ্রিদুন ফন্দী করলেন, কীটা’ দিয়ে কাঁটা’ তুলতে হবে। তাই তিনি নানারকম উপহা’র উপটৌকনের ঘুষ পাঠালেন। আপনার বাবার কাছে। আর সেই সঙ্গে বলে পাঠালেন এক আষাঢ়ে গল্প, তার তিনখানা ধনদৌলতে ঠাসা জাহা’জ নাকি আমা’র বাবা লুঠপাঠ করে নিয়ে গেছেন। এবং তার হা’জার হা’জার সৈন্যসামন্ত মেরে শেষ করে ফেলেছেন। কিন্তু আফ্রিদুনের রাজত্বের হা’ল যাদের জানা আছে তারা একথা কি করে বি’শ্বাস করবে। তার এমন কোনও ধনদৌলত নাই যা একটা’ জাহা’জও বোঝাই হতে পারে। আর হা’জার হা’জার সৈন্য? সে তো তার স্বপ্ন লোকের কল্পনা। তার গোটা’ রাজ্যের সৈন্যসংখ্যা সাকুল্যে হা’জারখানেক হবে কিনা সন্দেহ। তার মধ্যে হা’জার সৈন্য যদি মা’রাই গিয়ে থাকে। তবে নিজের সুরক্ষা ঠিক রাখবে কি করে?

তোমা’র বাবা অ’ত ঘোর প্যাচের মা’নুষ নন। তিনি আফ্রিদুনের এই চাল বুঝতে পারেননি। ভেবেছেন, বি’পদের সময় সাহা’য্য চাইলে এগিয়ে যাওয়াই বীরের ধর্ম। কিন্তু বীরত্ব আর রাজনীতি তো এক বস্তু নয়, সারকান। তোমা’র বাবা বি’শ্ববি’জেতা যোদ্ধা। রাজ্য জয় করতে গেলে বীরত্ব বি’ক্রমই প্রধান, কিন্তু রাজ্য পরিচালনা করতে গেলে রাজনীতিজ্ঞ হতে হবে।

আফ্রিদুন তোমা’র দশ হা’জার সৈন্য এনে ফেলেছে তার কোজায়। এমন ফাঁদে তোমা’কে তিনি ফেলবেন, তুমি আর বেরুতে পারবে না। জানো তো বুদ্ধির বলের কাছে দেহের বল তুচ্ছ। আবার সে বুদ্ধি যদি শয়তানের বুদ্ধি হয়। কি ভাবে কেমন করে তোমা’র সব সৈন্য তিনি রাতারাতি খতম করে দেবেন, তুমি টেরও পাবে না।

তুমি বলছিলে না? তিনটি দৈব শক্তিসম্পন্ন গ্বহরত্ন ছিলো সেই জাহা’জে? আসলে ঐ গ্বহরত্ন তিনটি তার কন্যা সফিয়ার কাছেই ছিলো। গ্ৰীসে যাওয়ার পর সেগুলো সে আমা’র বাবার হা’তে তুলে দেয়। সত্যিই, অ’বাক হতে হয়, পাথর তিনটির অ’লৌকিক ক্ষমতা আছে। ধারণ করলে দুরারোগ্য ব্যাধি নিরাময় হতে পারে। বাবার অ’লক্ষ্যে আমি ঐ পাথরগুলো চুরি করে নিয়েছি। সময় মতো তোমা’কে দেখাবো একদিন। সে যাকগে, তুমি আর এক মুহূর্ত দেরি করো না। ছাউনিতে ফিরে যাও। সৈন্যসামন্ত নিয়ে বাগদাদের পথে রওনা হয়ে পড়ে।

সারকান বলে, তুমি আমা’র চোখ খুলে দিলে, ইরবি’জা। আমি আর কাল-বি’লম্ব করতে চাই না। তোমা’র এই মূল্যবান উপদেশ না পেলে কী সর্বনাশই যে ঘটতো, ভাবতে শিউড়ে উঠছি। কিন্তু সুন্দরী, তোমা’কে এখানে ফেলে রেখে কিছুতেই যাবো না আমি। আজ যা ঘটে গেছে তার পরিণতি বড়ই মা’রাত্মক। তোমা’কে এখানে রেখে গেলে আর আস্ত রাখবে না তোমা’র বাবা। তুমিও আমা’র সঙ্গে চলো। আজই আমরা বাগদাদে রওনা হয়ে যাই।

ইরবি’জা এক মুহূর্ত কি ভাবলো।–ঠিক আছে, তুমি তোমা’র ছাউনি গোটা’তে থাকে। লোকলস্কর রওনা করে দাও। আমি তিনদিনের মধ্যেই তোমা’র কাছে যাচ্ছি। তারপর দু’জনে বাগদাদে রওনা হবে।

ইরবি’জ, সারকানের বুকে মা’থা রেখে কীদলো। সারকানের চোখেও জল আসে। বাদী ঘোড়া এনে দেয়। সারকানকে। বি’দায় নিয়ে অ’দৃশ্য হয়ে যায়।

কিছু দূরে যেতেই সারকান দেখে, তিনজন ঘোড়সওয়ার তার দিকে ছুটে আসছে। শত্রুর আক্বমণ আশঙ্কায় সে তলোয়ার খুলে বাগিয়ে ধরে। কিন্তু না, কাছে আসতে দেখা গেলো, তার উজির দানদান আর দুই বি’শ্বস্ত আমীর। যথারীতি আদব কায়দা দেখিয়ে তারা কাছে এসে দাঁড়ালো। উজির দানাদান বললে, কী ব্যাপার। আজ তিনদিন ধরে তোমা’র কোনও খোঁজ খবর পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা তো দুশ্চিন্তায় ভেবে ভেবে সারা হচ্ছি। না জানি কী বি’পদ হলো। সৈন্যদের মধ্যেও দারুণ আতঙ্ক। তারা বুঝতে পারছে না, তোমা’র কী হলো।

সারকান তখন আফ্রিদুনের ষড়যন্ত্রের কাহিনী বললো। আফ্রিদুন ফাদ পেতেছে। উদ্দেশ্য, তার সৈন্যবাহিনী সাবাড়ি করা। এই সময়ে ছাউনি ছেড়ে বেরিয়ে আসা ঠিক হয়নি। সারকান ঐটা’ বলে, আর দেরি নয়, এখুনি আমা’দের ছাউনিতে পৌঁছতে হবে।

তীর বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে তারা ছাউনিতে এসে পৌছয়। না, সব ঠিকই আছে। কোনও বি’পদ আপদ ঘটেনি। সারকগনের হুকুমে তখুনি তাবু উঠানো হলো। উজির দানাদানকে বললে, আপনি এদের নিয়ে বাগদাদের পথে রওনা হয়ে পড়ুন। আমি এখানে আরও তিন দিন থাকবো। আমা’র সঙ্গে থাকবে শুধু একশোজন সেনাপতি। বাকী সব আপনি নিয়ে যান।

সৈন্যসামন্তরা খানাপিনা শেষ করে নিলো। ঘোড়া, উট, গাধা, খচ্চরদের দানাপানি খাওয়ানো হলো। তারপর মা’ত্র একশোজন সেনাপতি রেখে সমস্ত সেনাবাহিনী সঙ্গে নিয়ে দানদান রওনা হলো।

সারকান দাঁড়িয়ে দূরে পাহা’ড় শীর্ষে প্রত্যক্ষ করে শখানেক ঘোড়সওয়ার তার দিকেই ধাবমা’ন। শত্রুশঙ্কায় সেও তার সেনাপতিদের সঙ্গে নিয়ে প্রস্তুত হয়ে রইলো। কাছে আসতে দেখা গেলো, সারকানের আশঙ্কা অ’মূলক নয়, সত্যিই একশো যোদ্ধার এক অ’শ্বারোহী বাহিনী। দূর থেকে হুঙ্কার ছাড়লো তারা, শোনো মুসলমা’নের ছেলেরা, শান্ত সুবোধ বালকের মতো তোমা’দের অ’স্ত্রশস্ত্র ফেলে দিয়ে ঘোড়া থেকে নেমে পড়ে। না হলে, মেরী আর জোনের নাম বলছি, একেবারে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলবো।

সারকান অ’বাক বি’স্ময়ে শোনে। ক্ৰোধে চোখ লাল হয়ে ওঠে। দাঁতে দাঁত চেপে। চোয়াল কঠিন হতে থাকে।-ওরে খ্ৰীষ্টা’নের বাচ্চা, কুকুর, তোদের এত বড় দুঃসাহস, আমা’রই এলাকায় এসে আমা’কেই ধমকাচ্ছিস। ঘাড়ে কটা’ করে মা’থা আছে রে? দাঁড়া এখুনি মজা টের পাইয়ে দিচ্ছি। এখনও ভালোয় ভালোয় বলছি ভালোয় ভালোয় মা’য়ের ছেলে মা’য়ের কাছে ফিরে যা। তা না হলে জন্মের সাধ মিটিয়ে দেব এখুনি।

তারপর সারকান তার সেনাপতিদের উদ্দেশ করে বলে, আল্লাহর নাম করে ঝাঁপিয়ে পড়ো। শয়তানগুলোকে সমুচিৎ শিক্ষা দিয়ে দাও।

নিমেষে দুই দলে প্রচণ্ড লড়াই বেঁধে গেলো। ঘোড়ার সঙ্গে ঘোড়ার, অ’সির সঙ্গে অ’সির, মা’নুষের সঙ্গে মা’নুষের আঘাত প্রত্যাঘাতে কেঁপে উঠলো সারা পাহা’ড় উপত্যকা। ধূলী বালীতে অ’ন্ধকার হয়ে এলো চতুর্দিক। এইভাবে সন্ধ্যা নেমে আসে। অ’ন্ধকার ছেয়ে যায়। হঠাৎ দেখা গেলো, হা’নাদাররা অ’ন্তহিত হয়ে গেছে। সারকান শুনে খুশি হলো, তার দলের কেউই হতাহত হয়নি।

সারকান তার সেনাপতিদের উদ্দেশ করে বলে, বন্ধুগণ, আজ আমরা অ’তর্কিত আক্রান্ত হয়েছিলাম, যাক আল্লাহর দোয়ায় কারুরই তেমন কোন আঘাত লাগেনি। কিন্তু যারা এসেছিলো রাতের অ’ন্ধকারে ফিরে গেলেও কাল সকালে যে আবার হা’না দেবে না তার কোনও ভরসা নাই। সুতরাং সর্বদা প্রস্তুত থাকবে। তাঁবুর বাইরে পালা করে পাহা’রায় থাকে। বাকী সবাই রাতের মতো ঘুমিয়ে শরীরকে চাঙ্গা করে নাও। কাল সকালে আরও বীরবি’ক্রমে লড়াই করতে হবে। নিজেদের শক্তি সম্বন্ধে ওয়াকিবহা’ল থাকা খুবই ভালো; কিন্তু তার চেয়ে আরও বেশি ভালো, শত্রুর শক্তি খাটো করে না দেখা। আমরা একশোজন, তারাও মা’ত্র একশোজনই ছিলো, তা সত্ত্বেও আমরা তাদের ঘায়েল করতে পারলাম না। সুতরাং মনে হচ্ছে, তারাও কিছু কম বাহা’দুর নয়। যাই হোক, খানাপিনা সেরে রাতের মতো ঘুমিয়ে নাও।

এদিকে খ্ৰীষ্টা’ন যোদ্ধারা তাদের সেনাপতিকে ঘিরে বলে, আজ তো আমরা কিছু করতে পারলাম না। মনে হচ্ছে অ’ত সহজে ওদের কাবু করা যাবে না।

সেনাপতি বলে, ঠিক আছে, ঘাবড়াচ্ছে কেন? কাল সকালে আবার নতুন কায়দায় আক্রমণু চালাতে হবে। এখন আর ও নিয়ে মা’থা ঘামা’নোর দরকার নাই। ঘুমিয়ে পড়ো।

পরদিন সকালে সারকান সেনাপতিদের সঙ্গে নিয়ে সামনের পাহা’ড়ের পথে এগোতে থাকে।—মনে হচ্ছে, বাছাধনরা কাহিল হয়ে পড়েছে! তা না হলে এতটা’ বেলা হয়ে গেলো কারো পাত্তা নাই কেন?

একজন বলে, জানের মা’য়া তো সকলেরই আছে, হুজুর। জেনে শুনে কে আর মা’থা এগিয়ে দিতে আসে। জানে তো আজ গেলে কচু কাটা’ হতে হবে। কাল ওরা হঠাৎ এসে হা’না মেরেছিলো, আজ তো আর তা হচ্ছে না। আমরা রীতিমতো তৈরি। আসুক না, মা’থা রেখে যেতে হবে।

—দাঁড়াও দাঁড়াও, তোমরা বড্ডো বেশী উৎফুল্ল হয়ে উঠেছে। কে জানে, হয়তো ওদের অ’ন্য কোনও প্যাঁচ আছে। তোমরা এক কাজ করো, এক এক করে এগিয়ে যাও। পাহা’ড়টা’র ওপারেই মনে হচ্ছে ওরা ডেরা গেড়েছে। একা পেয়ে হয়তো তেড়ে আসতে পারে। তখন তো আমরা পিছনেই আছি। এইভাবে ওদের ফাদে এনে ফেলতে হবে।

সারকানের নির্দেশ মতো একজন ঘোড়া ছুটিয়ে পাহা’ড়ের পথে উঠে যায়। চিৎকার করতে থাকে, কই হে কে আছো, নেকড়ের বাচ্চারা, বেরিয়ে এসো। তোমা’দের যম হা’জির।

মুখের কথা মুখেই রয়ে গেলো, একটা’ দডির ফাঁস এসে এটে গেলো তার গলায়। সারকান সেনাপতি দেখলো, অ’দূরে ঘোড়ার পিঠে এক বর্ম শিরস্ত্ৰাণ পরিহিত এক সুদৰ্শন যোদ্ধা। ফাসের দডিটা’ তার হা’তের মুঠোয় ধরা। এক ঝটিকায় নিয়ে ফেলে দিয়ে হিড়হিড় করে টা’নতে টা’নতে গুহা’র দিকে নিয়ে চললো।

এদিকে সারকান চিন্তিত হলো। আর একজনকে হুকুম করলো, যাও—দেখ, ওর কি হলো। তারও আসতে দেরি দেখে আরও একজন এগিয়ে যায়। এইভাবে সারাদিনে কুড়িজন সারকান সেনাপতি পাহা’ড়ের ওপারে গিয়ে আর ফিরে এলো না। সারকান অ’বাক হয়। কী ব্যাপার। তার সব দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। একটা’র পর একটা’ গেলো-আর ফিরলো না। দিন শেষ হয়ে এলো। এখনই রাত্রির কালো ছায়া নামবে। এ অ’বস্থায় আর এগোনো ঠিক হবে না মনে করে তাঁবুতে ফিরে আসে। ক্ৰোধে সারা শরীর জ্বলতে থাকে। মনে মনে ঠিক করে, কাল সকালে সে এর উপযুক্ত জবাব দেবে। আর অ’ন্য কাউকে নয় নিজেই যাবে পাহা’ড়ের ওপারে। দেখবে কত বড় লডিয়েরা সেখানে আছে। সেনাপতিদের উদ্দেশ করে বলে, তোমরা আজকের মতো বি’শ্রাম করো। ঘাবড়াবার কিছু নাই, কাল আমি নিজে লড়বো ওদের সবার সঙ্গে, দেখি কত বড় বীরপুরুষ তারা। কৈফিয়ৎ চাইবো, কেন তারা আমা’দের এলাকার মধ্যে ঢুকেছে। যদি ভালোয় ভালোয় মিটিয়ে নিতে চায় ভালো, না হলে, লড়াই করার শখ ঘুচিয়ে দেব জন্মের মতো।

পরদিন সকালে সারকান একই উঠে যায় পাহা’ড়ের পথে। ওপারে এক উপত্যকায় গিয়ে দাঁড়ায়। এদিক ওদিক তাকিয়ে শত্রু শিবি’রের সন্ধান করতে থাকে। হঠাৎ বুঝতে পারলো প্রায় পঞ্চাশজনের এক পদাতিক বাহিনী তাকে ঘিরে ফেলেছে। প্রত্যেকেই বর্ম-শিরস্ত্ৰাণ পরিহিত। উদ্যত তরবারী হা’তে নিয়ে তারা দাঁড়িয়ে পড়লো। দলের সামনে তাদের প্রধান। উন্মুক্ত তলোয়ার হা’তে। ঘোড়ার লাগাম টেনে সেও দাঁড়ালো। হুঙ্কার দিয়ে পরিষ্কার আরবী ভাষায় বললো, যুদ্ধবাজ সারকান, এবার তোমা’র মৌৎ হা’জির। লড়াই-এর জন্যে প্রস্তুত হও। আমরা দুজনেই দুই বাহিনীর প্রধান। সম্মুখ সমরে আমা’দের মধ্যে যে জিতবে, সব সৈন্যসামন্ত তার বশ্যতা স্বীকার করবে। নাও, আর দেরি কেন, এসো।

সারকানের রক্ত টগবগ করে ফুটতে থাকে। সিংহের মতো গর্জে ওঠে। তলোয়ারে তলোয়ারে লড়াই শুরু হয়। ইস্পাতে ইস্পাতে ঘর্ষণে ক্ষণে ক্ষণেই আগুনের ফুলকী ঠিকরে বেরুতে থাকে। যাকে বলে সেয়ানে সেয়ানে লড়াই। কেউই কাউকে কাবু করতে পারে না। এইভাবে দিনের আলো ফুরিয়ে আসে। সে দিনের মতো রণে ভঙ্গ দিয়ে যে যার ডেরায় ফিরে যায়।

সারকান অ’বাক হয়ে ভাবতে থাকে। তার সমকক্ষ বীরপুরুষ তামা’ম দুনিয়ায় তো কেউ নাই। তবে কেন সে তাকে কাবু করতে পারলো না? তার যে-সব মোক্ষম মা’র ডাকসাইটে জাদরেল যুদ্ধবাজরাও এড়াতে পারে না, মনে হলো, অ’তি সহজে সেগুলো পাশ কাটিয়ে গেলো সে।

পরদিনও সারাদিন ধরে চললো তাদের দ্বন্দ্ব যুদ্ধ। কিন্তু না, সারকান পরাস্ত করতে পারে না। আক্রোশে, উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁিপতে তাঁবুতে ফিরে যায়। পরদিন আবার তারা রণক্ষেত্রে হা’জির হয়। এইদিন খ্ৰীষ্টা’ন সেনাপতি এক সময় ঘোড়ার পিঠ থেকে নিচে পড়ে যায়। সারকান তলোয়ার বাগিয়ে ধরে। কোপ মা’রতে যাবে, এমন সময় হা’ত তুলে সে থামতে বলে, থামো, তুমি না বি’শ্ববি’জেতা উমর অ’ল-নুমা’নের পুত্র সারকান। তোমা’র মতো বি’ক্রম বীর নাকি সারা আরব দুনিয়ায় নাই। এই তোমা’র বীরত্ব! একটা’ অ’সহা’য় নিরস্ত্ব নারীর ওপর তলোয়ার চালাতে লজ্জা করে না তোমা’র।

সারকান হতভম্ব হয়ে পড়ে।

—ইরবি’জা—তুমি? আমি তো চিনতেই পারিনি, সোনা?

–হ্যাঁ, আমি তোমা’কে পরীক্ষা করতে এসেছিলাম। যার সঙ্গে আমি যাবো, চিরকাল যার কাছে থাকবো, তাকে একটু বাজিয়ে দেখে নেবো না? কতটা’ তার হিম্মৎ। এই যে আমা’র সৈন্যসামন্ত দেখছো, এরা সবাই নারী। এরাই তোমা’র বি’শজন সেনাপতিকে বন্দী করে নিয়ে গিয়ে আমা’র হা’ত তুলে দিয়েছে। ভয় নাই। তাদের কোনও ক্ষতি করিনি। বেশ আদর যত্নেই আমা’র শিবি’রে তারা রয়েছে।

সারকান ঘোড়া থেকে নেমে ইরবি’জাকে জড়িয়ে ধরে। চুমু খায়।—এইভাবে আমা’র সঙ্গে লড়াই করলে? যদি আমা’র একটা’ মা’রও ঠেকাতে তোমা’র পলকমা’ত্র দেরি হতো, আমি ভাবতে পারছি না সোনা, কি অ’ঘটনই না ঘটে যেতো। আল্লাহ মেহেরবান, তিনিই রক্ষা করেছেন।

ইরবি’জা একজনকে নির্দেশ করলো, সারকানের বন্দীদের এখানে নিয়ে এসো। দেখবে, কোনও অ’সম্মা’ন যেন না হয়।

এর পর তারা দুজনে দুশো সৈন্যসামস্তের বাহিনী নিয়ে বাগদাদের পথে রওনা হয়ে যায়।

সারকান ইরবি’জার সহচরীদের বলে, তোমরা রণসাজ খুলে ফেলো। নিজের নিজের পোশাকে সেজে নাও।

সারকান তার কয়েকজন সেনাপতিকে বললো, তোমরা তীরগতিতে বাগদাদের পথে পাডি দাও। সুলতান উমর অ’ল-নুমা’নকে সংবাদ দাও আমরা আসছি।

সে রাতটা’ তারা ওখানেই তাঁবুতে কাটা’লো। পরদিন সকালে উঠে গোসল এবং খানাপিনা। সেরে রওনা হলো।

বি’শ দিনের পথ অ’তিক্রম করে অ’বশেষে তারা বাগদাদে এসে পৌছয়। উজির দানদান তাদের যথাযোগ্য অ’ভ্যর্থনা করার জন্যে শহরের প্রবেশ মুখে এক হা’জার অ’শ্বারোহীর এক বাহিনী দাঁড় করিয়েছিলো। সারা শহর আর তোরণদ্বার আলোর মা’লায় সাজানো হয়েছিলো।

দরবারে ঢুকেই যথাবি’হিত কুর্নিশ জানায় সারকান। উমর অ’ল-নুমা’ন পুত্রকে পেয়ে খুশি হয়। ইরবি’জার সঙ্গে সারকানের বি’চিত্র অ’ভিজ্ঞতার কথা জানায় তার বাবাকে। ইরবি’জা সম্রাট হা’রদুবের কন্যা। তাকে বলতে গেলে, শয়তান আফ্রিদুনের ফাঁদ থেকে বঁচিয়েছে। তার নানা গুণের কথা বলতে বলতে সারকান-এর বুক গর্বে ফুলে ওঠে। ইরবি’জার মতো সর্বগুণসম্পন্না মেয়ে তামা’ম দুনিয়াতে কোথাও নাই। সারকানকে সে যেমন নিশ্চিত মৃ’ত্যুর হা’ত থেকে রক্ষা করেছে, তেমনি তার অ’সাধারণ রণকৌশল দেখেও সে বি’স্মিত হয়েছে। দুনিয়াতে এমন কোন যোদ্ধা নাই যে তার অ’ব্যৰ্থ অ’সির আঘাত প্রতিহত করতে পারে, কিন্তু ইরবি’জা এমনই দক্ষ যে, সে সব মা’রের প্যাঁচ অ’তি সহজেই সে পাশ কাটিয়ে দিয়েছে।

উমর অ’ল-নুমা’ন-এর মনে পাশবি’ক প্রবৃত্তি জেগে ওঠে। অ’নেক দিন সে নতুন মেয়ের স্বাদ পায়নি। সারকানের মুখেইরবি’জার অ’সাধারণ রূপ আর যৌবনের কথা শুনে ধৈর্য আর বাঁধ মা’নে

—তাকে একবার আমা’র কাছে নিয়ে এসো, আলাপ করতে চাই।

সারকান বাবার অ’ভিপ্রায় আঁচ করতে পারে না। বললো, এখুনি তাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি, জাঁহা’পনা।

একটু পরে ইরবি’জা এসে আভূমি আনত হয়ে উমরকে কুর্নিশ করে দাঁড়ালো। সুলতানের ইশারায় দরবার ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে গেলো সবাই। শুধু রইলো ইরবি’জ, খোজা আর উমর অ’ল-নুমা’ন?

উমর প্রশ্ন করে, তোমা’র নাম কী?

–ইরবি’জা।

–পরিষ্কার আরবী ভাষায় জবাব দিলো।

–তোমা’র বাবা?

—সিসারিয়া সম্রাট হা’রদুব।

—তা হলে তুমি তো খ্ৰীষ্টা’ন!

—জী হুজুর। এখানে এসেছে কি অ’ভিপ্ৰায়ে, সুন্দরী।

এই ‘সুন্দরী’ সম্বোধনে ইরবি’জা বি’স্মিত হয়।–আপনি আমা’কে ইরবি’জা বলেই ডাকবেন,

জাঁহা’পনা!

–কেন সুন্দরীকে সুন্দরী বলা কি অ’ন্যায়?

—আপনি মহা’নুভব শাহেনশাহ, আপনার ন্যায় অ’ন্যায়ের বি’চার কি আমি করতে পারি? তবে আমি আপনার মেয়ের তুল্য। তাই বলছিলাম—

উমর অ’ল-নুমা’ন-এর অ’ট্টহা’সিতে শূন্য দরবার মহল চকিত হয়ে ওঠে।—একই নারী কারো মা’, কারো কন্যা, আবার কারো বা ভগ্নী হতে পারে। তা আমা’র তোমা’র সম্পর্কটা’ না হয় পরেই ঠিক করা যাবে। থাক ওসব কথা, শুনলাম আমা’র ছেলে সারকানকে তুমি খুব সাহা’য্য করেছে। তোমা’র বুদ্ধির জোরেই সে আফ্রিদুনের ফাদ থেকে কেটে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। এবং এ-ও শুনলাম রণ-বি’দ্যায় তুমি নাকি পারদর্শ? তা শিখলে কার কাছে?

–আমা’র বাবা-তিনিই আমা’কে হা’তে ধরে ধরে সব শিখিয়েছেন। বাবার আমি একমা’ত্র সন্তান। ছেলে নাই বলে তিনি আমা’কে ছেলের মতো করেই মা’নুষ করেছেন।

উমর অ’ল-নুমা’ন ইরবি’জাকে ডেকে পাশে বসিয়ে জিজ্ঞাসা করে, আফ্রিদুনের সেই অ’লৌকিক পাথর তিনখানা নাকি তোমা’র কাছেই আছে?

–হ্যাঁ হুজুর, আমি সঙ্গে করেই এনেছি।

—একবার দেখাবে?

—নিশ্চয়ই। ওগুলো তো আপনাকে উপহা’র দেব বলেই নিয়ে এসেছি। আমি এক্ষুণি এনে দিচ্ছি।

খোজাটা’কে বললো, মতিয়াকে বলো, সে যেন আমা’র হা’ত বাক্সটা’ নিয়ে আসে।

মতিয়া একটা’ ছোট্ট রূপের বাক্স নিয়ে এসে ইরবি’জার হা’তে দেয়। বাক্সটা’ খুলে তার মধ্য থেকে আরও ছোট একটা’ সোনার বাক্স বের করলো ইরবি’জা। এই বাক্সে রাখা ছিলো সেই দৈব-শক্তিসম্পন্ন পাথর তিনখানা। বাক্সটা’ সুদ্ধ সে উমর আঁল-নুমা’নের দিকে এগিয়ে দেয়।—জাঁহা’পনা, এই আমা’র সেলামী–

উমর-এর চোখ নেচে ওঠে। এই মা’ণিক্যের কথা সে বহুকাল ধরে শুনে আসছে। আজ তার হা’তের মুঠোয় এসে গেলো। বাক্সটা’ সুদ্ধ ইরবি’জার হা’তখানা সে চেপে ধরে। ইরবি’জা অ’স্বস্তি বোধ করে। বাক্সটা’ হা’তে তুলে দিয়ে প্রায় জোর করেই হা’তটা’ ছিনিয়ে নেয়। উমরের মুখের হা’সি মিলি’য়ে যায়। কিন্তু সে মুহূর্ত মা’ত্র। নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, তলোয়ার-ধরা হলে কি হয়, হা’তটা’ তোমা’র ফুলের কলি’র মতো নরম।

ইরবি’জার এ-সব কথা ভালো লাগে না। উঠে পড়ে বলে, এবার যদি অ’নুমতি করেন। জাঁহা’পনা, আমি তবে আসি?

উমর বলে, তোমা’র এবং তোমা’র সহচরী দাসীদের জন্যে আমি প্রাসাদের একটা’ মহল সাজাতে বলে দিয়েছি। আজ থেকে ওখানেই তুমি থাকবে।

ইরবি’জা কুর্নিশ করে বলে, যো হুকুম, জাঁহা’পনা।

খোজা এবং মতিয়াকে সঙ্গে করে সে দরবার ত্যাগ করে নিজের মহলে চলে যায়।

উমর অ’ল-নুমা’ন সারকানকে ডেকে পাঠায়। সারকান এসে কুর্নিশ জানায়। একখানা পাথর এগিয়ে দিয়ে উমর বলে, এটা’ তোমা’র কাছে রাখে।

সারকান বলে, আর দু’খানা কি হলো জাঁহা’পনা?

উমর বলে, একখানা দেব তোমা’র বোন নুজাৎকে। আর একখানা রইলো তোমা’র ছোট ভাই দু-আল-মা’কান-এর জন্যে।

–দু-আল-মা’কান?

—হ্যাঁ, তোমা’র ছোট ভাই, নুজাতের সহোদর। তুমি জানো না?

সারকান বলে, জী না। আমি তো শুনেছিলাম, আমা’র একটা’ শুধু বোন হয়েছে।

উমর বললো, তুমি নুজাতের কথা শুনেই বাইরে চলে গেছে। কিন্তু তার পরেই সফিয়া আর একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেয়। মা’কান আর নুজাৎ যমজ ভাই বোন।

সারকানের মুখ কালো হয়ে যায়। এত বড় দুঃসংবাদ শুনবে, আশা করেনি। সারকানকে বি’ষণ্ণ দেখে উমর বলে, কিন্তু এতে তোমা’র মন খারাপ করার কি আছে, সারকান! আমি অ’নেক আগেই ফরমা’ন জারি করে দিয়েছি, তুমিই হবে আমা’র সিংহা’সনের উত্তরাধিকারী। সুতরাং তোমা’র তো মন খারাপ করার কোনও কারণ নাই।

সারকান নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, আল্লাহ ওদের সুখে রাখুন।

আবার কুর্নিশ জানিয়ে দরবার থেকে বেরিয়ে সে ইরবি’জার কাছে যায়। সারকানকে চিন্তিত দেখে ইরবি’জা জিজ্ঞেস করে, কী ব্যাপার, তোমা’র মুখ এত গভীর কেন, সারকান? কোনও খারাপ খবর আছে নাকি?

সারকান বলে, খারাপ কিনা জানিনা, তবে সুখবর নয়। এতদিন জানতাম আমা’র একটি ছোট বোন আছে! নুজাৎ। কনসন্তান্তিনোপোল-এর সম্রাট কন্যা সফিয়া তার মা’। কিন্তু আজ শুনলাম সফিয়া একটি পুত্র সন্তানেরও জন্ম দিয়েছে। সে এখন এই প্রাসাদেই সফিয়ার কাছে মা’নুষ হচ্ছে। কিন্তু এ-ই আমা’র মন খারাপের একমা’ত্র কারণ নয়, ইরাবি’জা। আসল কারণ-তোমা’কে বোধহয় হা’রাবো আমি!

-কী? কি বলছো তুমি সারকান? সব ছেড়েছুঁড়ে শুধু তোমা’র জন্যেই এখানে এসেছি। সেই তোমা’কেই যদি ছাড়তে হয়, তবে আর এখানে থাকবো কিসের জন্যে? কেন, কি হয়েছে?

সারকান ধীরে ধীরে বলে, তোমা’কে দেখে বাবার লোভ হয়েছে।

ইরবি’জা চমকে ওঠে। তাহলে তার আশঙ্কা মিথ্যা নয়। উমরের চোখে ইরবি’জা দেখেছিলো লালসারই আগুন–কিন্তু সারকান, এও শুনে রাখো, আমি সম্রাট হা’রদুবের কন্যা। যতক্ষণ ধড়ে প্রাণ আছে সজ্ঞানে আমা’র দেহ স্পর্শ করতে পারবে না সে। আমা’র যুযুৎসুর প্যােচ তুমি দেখেছে, আমা’র তলোয়ারের মা’র তোমা’র অ’জানা নাই। প্রয়োজন হলে, সে তোমা’র বাবাই হোক আর যেই হোক, তার সদ্ব্যবহা’র করতে কসুর করবো না। ও নিয়ে তুমি কোনও দুর্ভাবনা করো না সারকান। নিজেকে রক্ষা করার মতো ক্ষমতা আমা’র আছে। আমি তোমা’র বাবার তিনশ একষট্টিতম রক্ষিতা হয়ে আমা’র জীবন বরবাদ করে দেব না, এ বি’ষয়ে নিশ্চিন্ত থেকে। তাকে খুশি করার তো মেয়ের অ’ভাব নাই। তবু আমা’র দিকে তার এই লোভ কেন?

–নেশা। নতুন নারী-সম্ভোগের নেশা তার রক্তের কণায় কণায়, যাই হোক, তুমি একটু সাবধানে থেকে।

এর পর ইরাবি’জা। আর সারকান খানাপিনা করলো। সারকান বললো, আমি দিন কয়েকের জন্যে বাইরে যাচ্ছি। ফিরে এসে আবার দেখা করবো।

সারকান প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার একটু পরেই উমর আসে। সফিয়ার কামরায়। সফিয়া তার দুই সন্তান নুজাৎ আর দু-আল-মা’কানকে নিয়ে প্রাসাদের এই কক্ষে বাস করে। সুলতানকে এই অ’সময়ে তার কামরায় আসতে দেখে সফিয়া অ’বাক হয়। যেমন, খুশি হয় তার চেয়েও বেশী।

জাঁহা’পনা এ-সময়ে বাদীকে মনে পড়লো।

উমর বলে, তুমি যে কনসতান্তিনোপল-এর সম্রাট আফ্রিদুনের কন্যা, সে কথা আমা’কে আগে বলো নি কেন সফিয়া?

— কেন, তাতে কী?

তুমি সম্রাটের কন্যা। তোমা’র যোগ্য সম্মা’ন আমি তোমা’কে দিতে পারিনি। রক্ষিতা করে রেখে তোমা’র উপর অ’বি’চার করেছি। বেগমের মর্যাদা তোমা’র প্রাপ্য ছিলো। কিন্তু তোমা’র পরিচয় আমি জানতে পারিনি, তাই বাঁদী করে রেখেছি।

—আপনি মহা’নুভব শাহেনশাহ। আমা’র তো কোনও অ’সম্মা’ন অ’মর্যাদাই আপনি করেন নি। বেগম যেইজৎ পায় আপনি কি তার চেয়ে কিছু কমইজৎ করেছেন আমা’কে? এই ফুলের মতো দু’টো সস্তান আমা’কে উপহা’র দিয়েছেন। একটা’ মেয়ের পক্ষে এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কি হতে পারে? আপনি মনে কোন ক্ষোভ রাখবেন না, জাঁহা’পনা। দুনিয়াতে আমা’র মতো সুখী, আমা’র মতো ভাগ্যবতী কজন আছে?

সফিয়ার কথায় উমর খুশি হয়। নুজাৎ আর দু-আল-মা’কানকে কাছে টেনে আদর করে। সফিয়ার হা’তে পাথর দু’খানা তুলে দিয়ে বলে, চিনতে পারছো?

পাথর দু’খানা হা’তে নিয়ে সফিয়া বলে, হ্যাঁ, কিন্তু আর আধখানা কোথায়, জাঁহা’পনা?

—সারকানকে দিয়েছি। এ দু’খানা নুজাৎ আর মা’কান-এর গলায় পরিয়ে দাও।

সফিয়া খুশি হয়ে বলে, খুব ভালোই করেছেন। ও পাথর কাছে থাকলে কোন অ’সুখবি’সুখ হয় না। এই পাথর তিনখানা আমা’র বাবা আমা’কে যৌতুক দিয়েছিলেন। আমি সম্রাট হা’রদুবের হা’তে তুলে দিয়েছিলাম। জানি না। আপনার হা’তে কি করে এলো?

—তোমা’র কি ধারণা, সম্রাট হা’রদুব আমা’কে উপহা’র পাঠিয়েছেন?

—অ’সম্ভব ছিলো না। কিন্তু শুনেছি, আমা’র বাবার সঙ্গে সম্রাট হা’রদুবের এখন শক্রভাব চলছে। আর জাঁহা’পনা নাকি আমা’র বাবাকে সাহা’য্য করতে সারকগনের সঙ্গে দশ হা’জার সৈন্যসামন্ত পাঠিয়েছিলেন। বুঝতে পারছি না, এই অ’বস্থায়, হা’রদুবের হা’ত থেকে পাথর তিনখানা আপনার হা’তে এলো কি করে? তবে কি সম্রাট হা’রদুব পরাজিত।

উমর জবাব দেয়, না, যুদ্ধ তার সঙ্গে হয় নি।

সফিয়া অ’বাক হয়, তবে?

–সম্রাট হা’রদুবের কন্যা ইরবি’জা এখন আমা’র হা’রেমে। এ পাথর তার কাছেই ছিলো। আমা’কে সে উপহা’র দিয়েছে।

–ইরবি’জা? সম্রাট হা’রদুবের একমা’ত্র সস্তান? সে আপনার হা’রেমের বাঁদী হয়েছে?

—একটু বাড়িয়ে বললে সফিয়া। সে আমা’র হা’রেমে অ’বস্থান করছে বটে, কিন্তু বাঁদী বা রক্ষিতা কিছুই সে এখনও হয়নি। হয়নি। তবে হবে। এ রকম সুরৎ আর যৌবনের সহা’বস্থান এর  আগে আর আমা’র নজরে পড়েনি। এমন উন্নত আর বড় বড় বক্ষ খুম কম লেড়কিরই দেখা যায়। আর চলার সময় নিতম্ব যে ভাবে দোল খায় আহ্ দেখলেই কলি’জা উথলি’য়ে উঠে।

—জাঁহা’পনা কি তাকে বেগম করে রাখবেন?

–তোমা’র আপত্তি আছে?

—না, আপত্তি কেন থাকবে! সে সম্রাট হা’রদুবের মেয়ে, বেগমের ইজৎই তার পাওনা।

–আর তোমা’র?

সফিয়া বলে, আমা’কে আপনি বাঁদী করেই রাখুন। আর রক্ষিতা করেই রাখুন, আমি যে ইজ্জৎ পেয়েছি তাতে আর আমা’র কোন ক্ষোভ নাই।

উমর বলে, ইরাবি’জাকে এখনও কোনও প্রস্তাব আমি দিইনি। হয়তো সে আমা’র প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানও করতে পারে।

সফিয়া বি’স্ফারিত চোখে তাকায়।-শাহেনশাহ উমর অ’ল-নুমা’নের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার দুঃসাহস তার হবে কি করে?

উমর বলে, তার মতো তেজস্বী মেয়ের পক্ষে কিছুই অ’সম্ভব নয়। কিন্তু সফিয়া, তাকে দেখা ইস্তক আমি অ’স্থির হয়ে উঠেছি। অ’মন রূপ হয়তো তোমা’দের অ’নেকেরই আছে, কিন্তু ঐরকম উদাম যৌবন আমি কোনও মেয়ের মধ্যে দেখিনি। যেভাবেই হোক তার দেহ আমা’র চাই-ই। সে যাক, আজ আমি তোমা’র কাছে এসেছি অ’ন্য একটা’ প্রস্তাব নিয়ে।

—হুকুম করুন জাঁহা’পনা।

–হুকুম নয় নয়। সফিয়া, আদর আর ভালোবাসার উপহা’র স্বরূপ তোমা’র জন্যে নতুন এক প্রাসাদের ব্যবস্থা করেছি। এই রক্ষিতামহলে আর তুমি থাকবে না। তুমি আমা’র নুজাৎ আর মা’কান-এর মা’। এখন থেকে তুমি আমা’র বেগম-তোমা’র যোগ্য মর্যাদায় তুমি থাকবে তোমা’র নিজের প্রাসাদে! দেওয়ানকে আমি বলে দিয়েছি, তোমা’র ঘরদের মন মতো করে সাজিয়ে দেবে। দাসী বাদী খোজা যা দরকার সব চাওয়া মা’ত্র পাবে। তোমা’র জন্যে দশ হা’জার দিনার মা’সোহা’রা মঞ্জুর করেছি।

আনন্দে সফিয়ার চোখ নেচে ওঠে। গর্বে ভরে ওঠে বুক। মুখে বলে, আপনার ভালোবাসা যখন পেয়েছি, প্রাসাদের বি’লাস বৈভবে। আর কি প্রয়োজন ছিলো জাঁহা’পনা! কিন্তু আপনি দিচ্ছেন, আপনার ভালোবাসার দান আমি মা’থা পেতে নেব।

সফিয়াকে প্রাসাদ থেকে অ’ন্য প্রাসাদে সরাবার একটা’ই উদ্দেশ্য, ইরাবি’জার সঙ্গে তার কি সম্পর্ক গড়ে উঠছে তা যাতে সফিয়া জানতে না পারে। প্রতিদিন সন্ধ্যা হতে না হতেই উমর এসে উপস্থিত হয় ইরবি’জার ঘরে। নানা কথায় তাকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা’ করে। বেগম করে রাখবে। সাতমহলা প্ৰাসাদ বানিয়ে দেবে। হীরে জহরতে ভরে দেবে তাকে। কিন্তু ইরাবি’জার মন গলাতে পারে না।

-আমি আপনার বেগম হতে আসিনি, জাঁহা’পনা। আপনার পুত্র সারকানের সঙ্গী হয়ে থাকতে এসেছি। এতে যদি আপনার অ’মত থাকে, আমি ফিরে যাবো। আমা’র বাবার কাছে।

উমর বি’মর্ষ হয়ে ফিরে যায়। কামনার আগুনে দগ্ধ হতে থাকে। শেষে একদিন উজির দানাদানকে বলে ইরবি’জার এই প্রত্যাখ্যান আমি তো আর সইতে পারছি না উজির। কিভাবে তাকে পাওয়া যায়। তার একটা’ মতলব বাৎলে দাও।

উজির বলে, সম্রাট হা’রদুবের রক্ত আছে ওর শরীরে। সহজে সে বশ্যতা স্বীকার করবে, মনে হয় না।

উমর বলে, তবে? তবে কি উপায়?

দানদান ভারিক্কি চালে মা’থা দোলায়, অ’ধৈর্য হবেন না জাঁহা’পনা। উপায় আমি বাৎলে দিচ্ছি। আজ সন্ধ্যায় যখন তার ঘরে যাবেন সঙ্গে নিয়ে যাবেন খানিকটা’ ঘুমের ওষুধ। কায়দা করে সরাবের সঙ্গে খাইয়ে দেবেন। তারপর একটু পরে সে যখন ঘুমে ঢলে পড়বে, আপনি ওর ইজ্জৎ নষ্ট করে দেবেন। তারপর পরদিন সকালে সে বুঝতে পারবে, তার কুমা’রীত্ব নষ্ট হয়ে গেছে। প্রথমে আপনার ওপর সে রুষ্ট হবে। কিন্তু দেখবেন, আস্তে আস্তে জড়তা কেটে যাবে। পরে সে নিজে থেকেই আপনাকে ডেকে পাঠাবে। কিন্তু একটা’ কথা, কাল থেকে আর তার ধারে কাছে ঘোষবেন না। অ’পেক্ষা করতে থাকবেন।-সে-ই আপনাকে ডাকবে।

—সাব-বা-স, উমর আনন্দে লাফিয়ে ওঠে, তোমা’র ফন্দী বেশ চমৎকার, উজির। আমা’র মনে হচ্ছে, এই চালেই বাজীমা’ৎ করে দেব।

সন্ধ্যেবেলা উমর এলো ইরবি’জার ঘরে। ইরবি’জা নিরাসক্তভাবে সুলতানকে স্বাগত জানায়। বলে, বসুন জাঁহা’পনা।

উমর বলে, আমি কাল বাইরে যাবো ইরবি’জ, তাই আজ তোমা’র ঘরে একটু বেশিক্ষণ কাটিয়ে যাবার সাধ।

–তা বেশ তো, থাকুন না, যতক্ষণ ইচ্ছে।

— শুধু শুধু আর কতক্ষণ কাটা’নো যায় বলো, একটু যদি খানাপিনার ব্যবস্থা কর, ভালো হয়।

–এ আর এমন বেশী কি কথা হুজুর। কি খাবেন বলুন, আমি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।

উমর বলে, তোমা’র যা খুশি, ভালো একটু সরাব দাও, তা হলেই হবে।

সোনার পেয়ালায় দামী সরাব ঢেলে দেয়া ইরবি’জা। কিন্তু উমর পেয়ালা হা’তে নেয় না।–না, না, সে হয় না। আমি একা একা খাবো না। তুমি না খেলে মৌজ হবে কি করে?

ইরবি’জা মৃ’দু আপত্তি জানায়, সরাব খাওয়া আমা’র তেমন অ’ভ্যোস নেই।

—সে কি? সম্রাট হা’রদুবের কন্যা, তায় আবার খ্ৰীষ্টা’ন, সরাব তোমা’র ভালো লাগে না?

–জী না, উৎসব অ’নুষ্ঠানে ছাড়া বড় একটা’ খাই না।

উমর বলে, তা মনে কর না কেন, আজ একটা’ বি’শেষ উৎসবের দিন। কাল আমি বাইরে চলে যাবো। আজ আমা’কে না হয় বি’দায় সম্বর্ধনাই জানালে।

ইরাবি’জা আর আপত্তি করে না।–বেশ, আপনি যখন বলছেন, আপনার সম্মা’নেই খাবো।

আরও একটা’ পেয়ালায় সরাব ঢেলে নেয় ইরবি’জা। নানা কথার ফাঁকে ফাঁকে টুকটুক করে তিন পেয়ালা সরাব শেষ হয়ে যায়।ইরাবি’জা বলে, আজ এই পর্যন্তই থাক জাঁহা’পনা, আবার যখন ফিরে আসবেন, আবার একদিন আপনার সঙ্গে খাবো।

উমর বলে, কিন্তু মদের আমেজ তো এখনও লাগেনি ইরবি’জা।

ইরবি’জা বলে, দামী মদ, নেশা ধরতে একটু সময় লাগবে জাঁহা’পনা, তা ছাড়া যত মন্দই খাই না। কেন, বেহেড মা’তাল আমি কোনও দিনই হই না। এই তো ভালো হা’ল্কাগুলাবী নেশা-এতেই তো বেশি আনন্দ পাওয়া যায়।

ইরবি’জা ভাবে, সুলতানের মা’থায় শয়তানী বুদ্ধি খেলা করছে। সরাবের নেশায় তাকে বেহ্শ করে দিতে চায়। কিন্তু ইরবি’জা হা’ঁদা-বোকা নয়। সবই বুঝতে পারে। এসব পুরোনো কায়দায় তাকে ঘায়েল করা যাবে না।

উমর আবদার ধরে, বেশ আর খাবে না। শুধু আমা’র অ’নুরোধে শেষবারের মতো আর এক পেয়ালা। তার অ’র্ধেকটা’ আমি খাবো। আর এ পেয়ালাটা’ আমি তুলে দেব তোমা’র মুখে। কেমন, রাজি?

অ’গত্যা ইরবি’জা সম্মত হয়। সুলতানের সাধ, তাকে নিজে হা’তে মদ ঢেলে মুখে তুলে দেবে।-ইরবি’জা মনে মনে ভাবে, তুমি আমা’কে যতই তোয়াজ কর, উমর, আমি তোমা’র খপ্পরে ধরা দিচ্ছি না। নিজে হা’তে মদ ঢেলে, মুখে ধরে খাওয়াবো ভাবছো, আমি বুঝি তোমা’র সোহা’গে গলে জল হয়ে যাবো। অ’ত সহজে জল গলবে না, সুলতান। বৃথাই সময় নষ্ট করছো। আর মা’দ! কত মদ তুমি খাওয়াতে চাও? সারারাত ধরে খেলেও আমা’র পাটি লড়বে না।

ঠিক আছে জাঁহা’পনা, এই-ই শেষবার। আপনি নিজে হা’তে ঢেলে দেবেন, শুধু সেই আনন্দেই না করতে পারলাম না।

সোনার ঝারি থেকে সোনার পেয়ালা পূর্ণ করে সরাব ঢাললো স্বয়ং সুলতান উমর অ’ল-নুমা’ন। নিজে আগে চুমুক দিয়ে খায় খানিকটা’। শেরওয়ানীর পকেট থেকে ঘুমের বডিটা’ বের করে ইরবি’জার অ’লক্ষ্যে টুক করে পেয়ালার মধ্যে ফেলে দেয়। তারপর পেয়ালাটা’ ইরবি’জার ঠোঁটে ধরে বলে,

—নাও, চুমুক দিয়ে খেয়ে ফেলো।

ইরবি’জা কোন আপত্তি করে না। উৎফুল্লও হয় না। নির্বি’কার ভাবে এক চুমুকে নিঃশেষ করে দেয়।

সুলতান-এর চোখে শয়তানীর হা’সি ঝিলি’ক দিয়ে ওঠে, বাঃ এই তো কেমন লক্ষী মেয়ে! নাও, চলো, এবার খানা সেরে নিই।

দু’জনে খাবার-এর টেবি’লে গিয়ে বসে। নানা রকম শাহী খানায় সারা টেবি’ল জোড়া। মতিয়া এগিয়ে এসে রেকল্পবী পেতে দেয়। সুলতান হা’তের ইশারায় তাকে বাইরে চলে যেতে বলে।, আজ আমি নিজে হা’তে ইরবি’জাকে পরিবেশন করবো। আরিরবি’জা খানা সাজিয়ে দেবে আমা’র রেকবী ভরে। তোমরা সব বাইরে চলে যাও। কেউ থাকবে না ঘরে।

ইরবি’জা দেখলো, সুলতান-এর কথা জড়িয়ে আসছে। মদের নেশা বেশ ধরেছে।–আপনি কিছু ভাববেন না, জাঁহা’পনা, সবাইকে আমি বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছি। ঘরে আছি এখন শুধু আমি আর আপনি। আমি আপনাকে খাওয়াবো, আর আপনি আমা’কে খাওয়াবেন। এর মধ্যে ওরা থাকবে কেন?

—তুমি ঠিক বলেছে, ইরবি’জা। তোমা’র আমা’র মধ্যে ওরা থাকবে কেন?

ইরবি’জা ভাবলো, মদের নেশায় তাকে বেহুঁস করতে এসে বাছাধন যে নিজেই নেশায় বুঁদ হয়ে পড়লো? কিন্তু নেশা হলে কি হবে, এখনও জ্ঞানের নাডি টনটনে। ঘর থেকে সবাইকে বি’দেয় করে দিতে চায়। অ’র্থাৎ একঘরে উদ্দোম নেশায় আমি তাকে জড়িয়ে ধরে বি’ছানায় ঢলে পড়বো, এই তার বাসনা। ইরবি’জার হা’সি পায়। মা’গীবাজ সুলতানের আশা কত? এক টুকরো মোরগমসাল্লাম ছিঁড়ে নিয়ে সুলতানের মুখে পুরে দেয় ইরবি’জা।

—বাঃ বেড়ে, মজাদার পাকিয়েছে তো? তুমি খাও? এই নাও, খাও।

সুলতান নিজে হা’তে একটু মা’ংস পুরে দেয় ইরবি’জার মুখে। কিন্তু মা’ংসটা’ আর মুখে রাখতে পারে না। মা’থাটা’ কেমন ঝিম ঝিম করে ওঠে। সুলতান দেখলো, বি’ষের ক্রিয়া শুরু হয়েছে। কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই ইরবি’জার মা’থাটা’ সামনে ঝুলে পড়ে। এবার হয়তো কুর্শি থেকে নিচে গড়িয়ে পড়ে যেতে পারে। পাঁজাকোলা করে ইরবি’জার দেহটা’ তুলে এনে শয্যায় শুইয়ে দেয় উমর।

খানিক পরে ঘর থেকে বেরিয়ে ঝড়ের বেগে প্রাসাদ ছেড়ে চলে যায় সুলতান। মতিয়া ঘরে ঢুকে দেখে, ইরবি’জা বি’বস্ত্ৰা। মড়ার মতো অ’সাড় নিস্পন্দ তার দেহটা’ এলোমেলো শয্যায় নেতিয়ে পড়ে আছে। ভীত সস্ত্বস্ত হয়ে কাছে আসে। বুকে হা’ত রেখে অ’নুভব করে—না, বুকের স্পন্দন ঠিকই আছে। তার কোনও হ্রস নাই। মুখ দিয়ে গ্যােজলা উঠছে। কি বি’শ্ৰী ওষুধ খাইয়ে সর্বনাশ করে গেছে। গায়ের জামা’কাপড় সংযত করে একখানা শাল চাপা দিয়ে দেয় মতিয়া।

সকালবেলা ঘুম ভেঙে গেলে ইরবি’জা বুঝতে পারে, কাল রাতে কি যেন ঘটে গেছে। তলপেটটা’য় বেশ ব্যথা হয়েছে। মতিয়া কাছে আসে। ওর চোখে জল।

–কি রে, মতিয়া, কাঁদছিস কেন?

মতিয়া কথা বলে না। ইরাবি’জাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। ইরবি’জা বুঝতে পারে না। অ’বাক হয়। উঠে বসে ওকে আরও কাছে টেনে নিয়ে জিজ্ঞেস করে, কি হয়েছে বলতো?

মতিয়া কথা বলতে পারে না। ইরবি’জার ছিন্নভিন্ন সেমিজটা’ আঙুল দিয়ে দেখায়—রক্তের দাগ।

চমকে ওঠে ইরবি’জা। দাঁতে দাঁত চেপে শুধু বলতে পারে, শয়তান—

তারপরই হা’উমা’উ করে কান্নায় ভেঙে পড়ে। মতিয়া বলে, গতকাল রাতে আপনাকে সরাবের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দিয়ে এই সর্বনাশ করে গেছে সুলতান।

ইরবি’জা ক্ৰোধে ফেটে পড়ে। পালঙ্কের বাজুতে মুষ্ঠ্যাঘাত করে বলে, এর বদলা চাই।

কিন্তু কি করে বদলা আপনি নেবেন, মা’লকিনা! সে সুলতান। আর আপনি তারই হা’রেমে আশ্রিতা।

—আশ্রিতা, কিন্তু আমি তার বাদী রক্ষিতা নাই। সে ভেবেছে, অ’ত সহজেই পার পেয়ে যাবে? আমা’র বাবা সম্রাট হা’রদুব। ওর সালতানিয়তে ঘুঘু চরিয়ে ছেড়ে দেবে সে।

মতিয়া শান্ত করার চেষ্টা’ করে।—আপনি চুপ করুন, রাজকুমা’রী। চারদিকে সুলতানের চর আছে। আমা’দের কথা শুনতে পেলে বি’পদ বাড়বে। তার চেয়ে আমি বলি’ কি, ঠাণ্ডা মা’থায় মতলব আঁটুন। সুলতানকে কি করে এর সমুচিত শিক্ষা দেওয়া যায় তার উপায় ভাবুন।

ইরবি’জা মা’থা নাড়ে, তুই ঠিকই বলেছিস মতিয়া। মা’থা গরম করলে সব ভেস্তে যাবে। ঠাণ্ডা মা’থায় ভাবতে হবে। আচ্ছ এক কাজ কর, দরবারে খবর পাঠিয়ে দে আমা’র শরীর খুব খারাপ। এখন আমি কিছুদিন সুলতানের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করবো না।

ইরবি’জা এক এক নিজের ঘরে দিন কটা’য়। একমা’ত্র মতিয়া তার সঙ্গী। আর কারো সঙ্গে দেখা করে না। মা’স দুই পরে ইরবি’জা বুঝতে পারে, সে সন্তান-সম্ভবা। কান্নায় ভেঙে পড়ে। মতিয়াকে বলে, এখন কি হবে মতিয়া? সারকান শহরে নাই। এখন কি করি আমি।

মতিয়া পরামর্শ দেয়, যেভাবেই হোক, এখান থেকে পালাতে হবে, রাজকুমা’রী।

–কোথায় যাবো?

—আমরা আবার সিসারিয়াতেই ফিরে যাবো।

কিন্তু বাবা যদি আমা’র প্রতি বি’রূপ থাকেন? তা হলে কি হবে?

মতিয়া বলে, তা থাকতে পারেন না। তিনি। আপনি তার একমা’ত্র সন্তান। মেয়ে বলতেও আপনি, ছেলে বলতেও আপনি। আপনাকে না দেখে তিনি কি সুখে দিন কাটা’চ্ছেন, আপনার ধারণা? আর তা ছাড়া সুলতান উমর আপনার উপর বলাৎকার করেছে শুনলে তিনি বাবা হয়ে কখনও চুপ করে থাকতে পারেন? তার ক্ৰোধে মেদিনী কঁপে-আপনি কি জানেন না? এই শয়তানীর সমুচিৎ সাজা তিনি উমরকে দিতে কসুর করবেন না।

–তুই ঠিকই বলেছিস, মতিয়া। বাবার রাগ বড় চণ্ডালী? তার প্রতিজ্ঞা বড় মা’রাত্মক। তিনি যদি একবার পণ করেন, উমর-এর সর্বনাশ করবেন, তা তিনি করবেনই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে—এই প্রাসাদপুরী থেকে পালাবো কি করে! কোনও পুরুষ মা’নুষের সাহা’য্য ছাড়া এতটা’ পথ যাবেই বা কি করে। লোকে সন্দেহ করবে না?

মতিয়া বলে, আপনি একটু ধৈর্য ধরুন রাজকুমা’রী, আমি ব্যবস্থা করছি। প্রাসাদের দ্বাররক্ষীদের একজন নিগ্রো। পয়সার উপর লোকটা’র খুব লোভ। ওকে যদি টোপ ফেলা যায় ও গিলবে। আর ও ব্যাটা’ যদি আমা’দের সঙ্গে থাকে, তাহলে পথে ঘাটে কেউ ধারে কাছে ঘেঁসতে পারবে না।

ইরবি’জা বলে ঠিক বলেছিস। নিগ্রো সঙ্গে থাকলে সাধারণ লোক সাত হা’ত দূরে দিয়ে চলবে। তুই ওকে ভজাবার চেষ্টা’ কর। বলবি’ নোকরীর জন্য কিছু ভেবো না। সারাজীবন সুলতানের প্রাসাদের দ্বাররক্ষী থেকে যা রোজগার করবে। তার দশগুণ টা’কা তোমা’কে একসঙ্গে দিয়ে দেব। শুধু তুমি সিসারিয়া পর্যন্ত পৌঁছে দেবে। তারপর তোমা’র পয়সা কডি নিয়ে দেশে গিয়ে বাস করবে। সুলতান উমর তোমা’র। একগাছি চুলও ছিঁড়তে পারবে না।

পরদিন মতিয়া এসে বলে, নিগ্রোটা’রাজি হয়েছে, রাজকুমা’রী। আগামী জুম্মা’বার নামা’জ শেষ করে সুলতান শিকারে যাবে। সেইদিন সন্ধ্যাবেলা আমরা দুজনে খিড়কীর দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাবো। নিগ্রোেটা’ ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে তিনটে খচ্চর নিয়ে। শুধু বলে দিয়েছে, তুমি খুব সাধারণ সাজ পোশাকে সাজবে লোকে দেখে যাতে মনে করে, একটা’ সাধারণ দাসী বাদী।

শুক্রবার দিন সন্ধ্যাবেল খিড়কীর দরজার পাশে তিনটি খচ্চর নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে নিগ্রোটা’। ভাবে; ভালো একটা’ মওকা পাওয়া গেছে। সম্রাট হা’রদুবের মেয়ে, খুবসুরৎ লেড়কী। হীরে জহরৎও অ’নেক পাওয়া যাবে। ভালো করে দেহের ক্ষিদেটা’ও মিটিয়ে নিতে পারবো।

কিছুদিন ধরেই ইরবি’জার শরীরটা’ একেবারে কাহিল হয়ে পড়েছে। কিছুই খেতে পারে না। যা খায় বমি হয়ে যায়। সারা শরীর গুলি’য়ে যেতে থাকে। মতিয়া বলে, ওতে ভয়ের কিছু নাই। এ সময় ও রকম হয়। আবার কয়েকদিন বাদেই দেখবেন, সব ঠিক হয়ে গেছে।

–কিন্তু মতিয়া, শরীরে আমি কোনও জোর পাচ্ছি না রে। মনে হচ্ছে ছ’মা’সের রুগী।

–এ কোনও অ’সুখ নয়, রাজকুমা’রী। পেটে বাচ্ছা এলে প্রথম প্রথম সব মেয়েরই এরকম হয়। নিন তৈরি হয়ে নিন, নিগ্রোটা’ বোধহয় এসে দাঁড়িয়ে আছে।

মতিয়া ওকে সাধারণ সাজ পোশাক পর্যায়। একটা’ মা’ঝারি গোছের অ’তি সাধারণ বাক্সে ভরে সব হীরে জহরতের গয়নাগাটি। সবারই অ’লক্ষে আস্তে আস্তে খিড়কীর দরজার কাছে চলে আসে। তিনটে খচ্চর নিয়ে দাঁড়িয়েছিলো নিগ্রোটা’। বলে, বহুৎ দেরি করলেন, লি’ন, চটপট উঠে। পড়ুন।

কৃষ্ণপক্ষের মা’ঝামা’ঝি। আকাশে তখনও চাঁদ ওঠেনি। অ’ন্ধকার পথ। গা ছমছম করে নিগ্রোটা’ বলে, কোন ভয় নাই, লাগামটা’ শক্ত করে চুপচাপ বসে থাকুন। কোনও শালা কাছে ঘেঁসিতে সাহস পাবে না। আর যদি কেউ হা’মলা করতে আসে, আমা’র এক এক কোপে সাবাড় করে দেব সব। মা’ঝরাত বরাবর আসমা’নে চাঁদ উঠবে। তখন আর পথ চলতে কষ্ট হবে না।

নিঝুম নিস্তব্ধ অ’ন্ধকার রাত্রি। খচ্চর তিনটের পায়ের শব্দ ছাড়া আর বি’শেষ কিছুই কানে আসে না। মা’ঝে মা’ঝে হয়তো বা কোনও রাত জাগা পাখির আওয়াজ, কিংবা শেয়ালের ডাক ভেসে আসছে। অ’নেক মা’ঠ ঘাট জঙ্গল পেরিয়ে চলতে থাকে ওরা। রাত্রি দ্বি’তীয় প্রহরের সময় আকাশে ভাঙ্গা চাঁদ দেখা গেলো। ইরাবি’জা বললো, মতিয়া, শরীরটা’ বড়ই খারাপ করছে রে, রাতের মতো কোথাও বি’শ্রাম করলে হয় না?

নিগ্রোটা’ বললো, এই বাঁকটা’ পেরোলেই একটা’ বাগান পাওয়া যাবে। ওখানে গাছের তলায় রাতটা’ কাটিয়ে লি’ন। তারপর আবার ভোরবেলা রওনা হওয়া যাবে।

মতিয়া বললো, তাই করো।

একটু পরেই নিগ্রোটা’ বললো, এইখানে নেমে পড়ুন আপনারা।

ইরাবি’জা আর মতিয়া নেমে পড়ে। একটা’ গাছের তলায় চাঁদর বি’ছিয়ে মতিয়া বলে, এখানে একটু শুয়ে ঘুমিয়ে নিন, রাজকুমা’রী। আমি জেগে আছি।

ইরবি’জার শরীর এলি’য়ে পড়েছিলো। আর দ্বি’রুক্তি না করে শুয়ে পড়লো। মতিয়াও পাশে বসে ঝিমা’তে লাগলো। হঠাৎ একটা’ বি’দঘুটে আওয়াজে দুজনেরই তন্দ্ৰা ছুটে যায়। ধড়মড় করে উঠে বসে ইরবি’জা। দেখে মতিয়া ভয়ে কাঁপছে।

সামনে দাঁড়িয়ে সেই নিগ্রোটা’। দৈত্যের মতো চেহা’রা। একেবারে উলঙ্গ। মুখে তার শয়তানের হা’সি। হা’তে শাণিত তলোয়ার।

একা একা শুয়ে শুয়ে রাত কাটবে। তাতো হবে না রাজকুমা’রী! আজি আমি তোমা’র লাগব হবে। কেন, আমা’কে দেখে কি পছন্দ লয়! নাকি সতীপনা করছে? তা বাবা সুলতান উমর তো তোমা’র সতীপনা খতম করে দিয়েছে।

—চোপ রাহ, বেয়াদপ!

ইরবি’জা গর্জে ওঠে। নিগ্রোটা’ কিন্তু চুপ করে না। ভয়ও পায় না। বলে আ–হা’, অ’ত চট্টছে। কেন, মা’লকিন। চটে কোনও লাভ নাই। এখানে তোমা’র কোনও বাপ বাঁচাতে আসবে না। যা বলছি ভালো মেয়ের মতো শোনো। তা না হলে এই যে দেখছে—

ইরাবি’জা রাগে থর থর করে বলে, শুয়ার কা বাচ্চা! ও দিয়ে আমা’কে কন্তুজায় আনতে পারবি’ না।

ইরবি’জা হা’ঁপাতে থাকে। একে অ’সুস্থ শরীর। তায় এই উত্তেজনা। মনে হয় এখুনি বুঝি টলে পড়ে যাবে সে। মতিয়া ওকে জাপটে ধরে। আপনি উত্তেজিত হবেন না, রাজকুমা’রী। শান্ত হোন। লোকটা’ যে এমন শয়তান তাতো ঘৃণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি।

নিগ্রোটা’ আবার হুঙ্কার দিয়ে ওঠে, কই কি হলো? সোজা আঙ্গুলে ঘি উঠবে না দেখছি।

ইরবি’জা উঠে দাঁড়ায়। সারা শরীর কাঁপতে থাকে। একটা’ পাথরের চাই পড়েছিলো পাশেই। তুলে নিয়ে ছুঁড়ে মা’রতে চেষ্টা’ করে।–শয়তান, ভেবেছিস, তলোয়ারের ভয় দেখিয়ে সর্বনাশ করবি’। তা কিছুতেই হবে না।

যে হা’তে একদিন গন্ধমা’দন পর্বত উপড়ে ফেলার ক্ষমতা ছিলো, সেই হা’তে আজ সে সামা’ন্য পাথরের ঢেলা ছুড়তে পারলো না। ব্যর্থতার আক্রোশে দিশেহা’রা হয়ে ঘুষি বাগিয়ে সে নিগ্রোটা’র দিকে ছুটে যায়।-মেরেই ফেলবো, হা’রামজাদাকে।

কিন্তু মা’রা আর হলো না। নিগ্রোর তলোয়ারের ফলা আমূল বি’দ্ধ হয়ে গেলো তার বুকে। সেই নিশুতি নিস্তব্ধ নির্জন রাতে ইরবি’জার রক্তাক্ত দেহ ধুলায় লুটিয়ে পড়লো। এইভাবে কুড়িতেই বি’নষ্ট হয়ে গেলো তার অ’মূল্য জীবন।

নৃশংস ভাবে নিহত হলো। এইভাবে অ’কালে বি’নষ্ট হয়ে গেলো, ফুলের মতো সুন্দর একটা’ জীবন।

ইরবি’জার যা কিছু ধনরত্ন ছিলো, সব নিয়ে নিগ্রোটা’ পাহা’ড়ের পথে উধাও হয়ে গেলো। মতিয়া বসে বসে কাঁদতে থাকে। এমন সময় দেখা গেলো, সারা আকাশবাতাস কাঁপিয়ে এক অ’শ্বারোহী বাহিনী ছুটে আসছে। আর একটু কাছে আসতেই মতিয়া সৈন্যবাহিনীর সাজ পোশাক দেখে বুঝতে পারলো, সিসারিয়া সম্ব্রাট হা’রদুনের বাহিনী। মনে কিছুটা’ ভরসা পায়। উঠে দাঁড়িয়ে হা’ত নেড়ে ইশারা করতে থাকে। হা’রদুব এসে থেমে পড়ে। ইরবি’জার রক্তাপুত দেহ দেখে ঘোড়া থেকে লাফ দিয়ে নেমে আসে।-কে? কে করলে আমা’র এই সর্বনাশ?

বাগদাদের সুলতান উমর-ইল-নুমা’নের ক্রীতদাস এক নিগ্রোর হা’তে কি ভাবে ইরবি’জা নিহত হয়েছে এবং সুলতান উমর তাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে কি জঘন্য উপায়ে তার উপর বলাৎকার করেছে, সব সবি’স্তারে বললো মতিয়া।

সম্রাট হা’রদুব রাগে গর্জে ওঠে, হুম। এতো বড় স্পর্ধা, তোমা’র উমর! আমা’র মেয়েকে বাদী রক্ষিতা পেয়েছে? এর প্রতিদান তোমা’কে পাই পাই করে করে মিটিয়ে দেব। কিন্তু তার আগে আমা’র আদরের দুলালীর শেষকৃত্য সমা’ধা করতে হবে।

সারকানের হা’তে হা’রদুবের একশত সৈন্যসামন্ত নিহত হওয়ার পর বাঁদী সর্দারনী সে বুড়িটা’র মুখ থেকে যখন হা’রদুব শুনলো, বাগদাদের সুলতান-এর পুত্র সারকান ইরবি’জাকে তুক তাক করে ভুলি’য়ে তার দেশে নিয়ে গিয়ে উমরের বাঁদী করে রেখেছে, হা’রদুব তখন এই অ’পমা’নের প্রতিশোধ নেবার জন্য এক বি’শাল অ’শ্ব বাহিনী নিয়ে বাগদাদের দিকে ধাবমা’ন হচ্ছিলো। পথিমধ্যে এই অ’ভাবনীয় দৃশ্য দেখে শোকে দুঃখে মুহ্যমা’ন হয়ে পড়লো সিসারিয়ার সম্রাট হা’রদুব তার সেনাপতিদের নির্দেশ দিলো, আগে রাজকুমা’রীর মৃ’তদেহ যথাযোগ্য মর্যাদায় সমা’হিত করতে হবে। তারপর শায়েস্তা করার ব্যবস্থা করা যাবে।

সুতরাং সম্রাট হা’রদুব আপাততঃ আক্রমণ স্থগিত রেখে কন্যার মৃ’তদেহ নিয়ে দুর্গে ফিরে এলো। বাদী সর্দারনী বুড়ি কেঁদে আকুল।—হা’য় হা’য়, আমা’র সোনার বাছার এই হা’ল কে করলো?

সম্রাট হা’রদুব বলে, কে আবার, সেই সাচ্চা মুসলমা’নের বাচ্চা-উমর। শয়তানটা’ আমা’র মেয়ের উপর বলাৎকার করেছে। আর তারই ক্রীতদাস দিয়ে হত্যা করিয়েছে। এও তোমা’কে বলে রাখছি, সর্দারনী, এর প্রতিশোধ আমি নিজে হা’তে নেবো। দেখবো, সুলতান উমর কত বড় শাহেনশাহ! বাদী সর্দারনী বলে, -সম্রাট আপনি অ’ধৈর্য হবেন না। উত্তেজিত হয়ে প্রতিশোধ নিতে গেলে কার্যসিদ্ধি হবে না। প্রতিশোধ নিতে হয়। ঠাণ্ডা মা’থায়। মুসলমা’নরা বলে, শত্রু যখন সব ভুলে নিজেকে অ’সতর্ক অ’রক্ষিত করে রাখবে সেই সুযোগে তাকে আক্রমণ করে কাজ হা’সিল করো। দরকার হলে এই সুযোগের জন্য চল্লি’শ বছর পর্যন্ত অ’পেক্ষা করতে হতে পারে। শয়তানটা’কে কি করে সমুচিত শিক্ষা দিতে হয় আমি আপনাকে দেখিয়ে দেব। সারা পৃথিবীর লোক অ’বাক হয়ে তারিফ করবে, হ্যাঁ এর নাম বদলা। আমি ওকে সবংশে নিধন করবো। শুধু আমি যা বলি’, ভালো করে শুনুন এবং আমা’কে সাহা’য্য করুন। প্রথমে আপনার সারা সাম্রাজ্য খুঁজে গোটা’ পাঁচেক সুন্দরী কিশোরী সংগ্রহ করুন। তাদের শিক্ষা দীক্ষার জন্যে সবচেয়ে সেরা জনা কয়েক মুসলমা’ন শিক্ষক দরকার। আপনার সাম্রাজ্যে তার অ’ভাব নাই। এই শিক্ষকগুলোর কাজ হবে এই মেয়েগুলোকে তালি’ম দিয়ে পাক্কা মুসলমা’নী আদব কায়দায় গড়ে তোলা। আরব ইতিহা’স তাদের নখদর্পনে থাকবে। খলি’ফাদের চৌদ্দ পুরুষের ঠিকুজি কুষ্ঠি মুখস্থ থাকবে। কথাবার্তা চালচলন আদিবাকায়দা নাচ-গান খানা-পিনা রীতি-নীতি আচার আচরণ সব এমন ভাবে তাদের রপ্ত করাতে হবে যাতে কেউ না সন্দেহ করতে পারে-তারা খানদানী মুসলমা’ন ঘরের মেয়ে নয়। এই সব শিক্ষা-দীক্ষা দিতে যদি দশ বছরও সময় লাগে, লাগবে। তবু চুল-চেরা নিখুত নিখাদ হওয়া চাই। কারণ এই মেয়েগুলোই আমা’র প্রতিশোধ নেবার একমা’ত্র হা’তিয়ার। আপনি বোধ হয় জানেন সম্রাট, ওই অ’সভ্য জংলী সুলতানটা’ দাসী বাঁদীদের সঙ্গে ব্যভিচার করে। শুনেছি, তার হা’রেমে নাকি বেগম ছাড়াও তিনশো ষাটটি রক্ষিতা আছে। সারা বছর ধরে প্রতি রাতে এই জানোয়ারটা’ এক একটি রক্ষিতার মা’ংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়। এখন আবার সোনায় সোহা’গা হয়েছে আমা’দের রাজকুমা’রী ইরবি’জ, সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলো একশোটা’ কুমা’রী। এখন তারাও ভোগের সামগ্ৰী হয়ে দাঁড়িয়েছে। জানোয়ারটা’র ভোগলালসার চরম নিবৃত্তি কেমন করে মেটা’তে হয় আপনি দেখবেন।

সম্রাট হা’রদুব-এর মনটা’ কিছু হা’ল্কা হয়। বাদী সর্দারনীকে সাবাস জানিয়ে বলে আজই তোমা’কে পাঁচটা’ স্বাস্থ্যবতী সুন্দরী কিশোরী পাঠিয়ে দিচ্ছি। এমন মেয়ে পাঠাবো, কালে যাতে তারা রগরগে যুবতী হতে পারে।

সম্রাট হা’রদুব পাঁচটি সুন্দরী মেয়ে আর তাদের মুসলমা’নী কেতায় মা’নুষ করার জন্যে পাঁচজন চৌকস মৌলভী পাঠিয়ে দিলো। বাদী সর্দারনীর তত্ত্বাবধানে থেকে মেয়েগুলোর শিক্ষাদীক্ষার কাজ শুরু হলো।

এদিকে সুলতান উমর-আল-নুমা’ন শিকার শেষে প্রাসাদে ফিরে শুনলো, ইরবি’জা নাই। এতো কড়া পাহা’রা ফাঁকি দিয়ে সে কিভাবে পালাতে পারলো ভাবা যায় না। সুলতান উমর-এর হুঙ্কারে প্রাসাদ কেঁপে ওঠে, আমা’র প্রাসাদ থেকে সে পালি’য়ে গেলো, আর তোমরা তা দেখতে পেলে না? আমি বাইরে বেরিয়ে যাওয়া মা’ত্র কি তোমরা সব নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে পড়! জবাব দাও। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলে কারো রেহা’ই নাই। এক এক করে সবগুলোকে আমি কোতল করবো। কোনদিন হয়তো এসে দেখবো, আমা’র সিংহা’সনটা’ই চুরি গেছে। আশ্চর্য।

দ্বার রক্ষীরা ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে। এই বুঝি গর্দান নেবার হুকুম হয়। একজন সাহস করে এগিয়ে আসে, জাঁহা’পনা, ইয়ে মা’নে—আমা’দের গিয়ে-ইয়ে মা’নে-মা’নে।

-ওরে হতভাগা যা বলবি’ চটপট বল, ‘ইয়ে মা’নে-ইয়ে মা’নে’ করছিস কেন?

—না মা’নে হুজুর মা’নে–আমা’দের মা’নে!

–থাম বেল্লি’ক, আর মা’নে মা’নে করে কাজ নাই! সোজা আরবী ভাষায় বল দিকিনি, কি বলতে চাস?

—মনে হুজুর নিগ্রো—

–কি বললি’, আমি নিগ্রো?

–না মা’নে হুজুর ঐ নিগ্রোটা’।

—কোন নিগ্রোটা’?

—ওই যে হুজুর, দ্বাররক্ষী নিগ্রোটা’—ওরই সঙ্গে সাট করে পালি’য়েছেন উনি। মা’নে—গিয়ে সরষের মধ্যেই ভূত।

উমর-আল-নুমা’ন বুঝলো, দ্বাররক্ষী নিগ্রোটা’র সঙ্গে যোগসাজস করে ইরবি’জা পালি’য়েছে।

সারকান শহরে ছিলো না। সে-ও ফিরে এসে শুনলো, ইরবি’জা নিরুদ্দেশ হয়েছে। সুলতান তার উপর বলাৎকার করেছে। বাবার এই ব্যবহা’রে সারকান ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়। মেয়েদের নিয়ে তার এই ছিনিমিনি খেলা কিছুতেই সহ্য করতে পারে না। ইরবি’জার জন্যে মনটা’ হু হু করতে থাকে। বেচারী মনের দুঃখে প্রাসাদ ছেড়ে কোথায় গেলো? তারই কথায় সে বাগদাদে এসেছিলো। উচিত ছিলো তাকে রক্ষা করা। কিন্তু পারেনি। নিজেকে বড় অ’পরাধী মনে হয়। ক্রমশই বাবার ওপর মনটা’ বি’ষিয়ে ওঠে। সারকান ঠিক করে, এখানে আর সে থাকবে না। এই প্রাসাদপুরী তার কাছে পাপপুরী বলে মনে হয়।

সুলতান উমর লক্ষ্য করে, সারকান আর সে-সারকান নাই। মুখের হা’সি মিলি’য়ে গেছে, কারো সঙ্গে ভালো করে কথাবার্তা বলে না। সব সময় কেমন মনমরা হয়ে থাকে। একদিন সারকানকে কাছে ডেকে উমর জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা বেটা’, তোমা’কে এমন বি’ষণ্ণ দেখছি কেন? সারকান বলে, আব্বাজান, আমি আর এই প্রাসাদে থাকতে চাই না। আপনি আমা’কে অ’ন্য কোথাও পাঠাবার ব্যবস্থা করুন।

— কোথায় যেতে চাও?

—আপনার সালতানিয়তের যে-কোন একটা’ সুবায় আমা’কে পাঠিয়ে দিন। আমি সেখানেই গিয়ে থাকবো।

সুলতান উমর বললেন, আমা’র সুবার মধ্যে সবচেয়ে সেরা দামা’সকাস। নানাদিক থেকে দামা’সকাসের গুরুত্ব অ’নেক বেশি। তোমা’র যদি পছন্দ হয়, ওখানকার সুবাদার হয়ে তুমি যেতে পারো।

সারকগনের তখন এমন মা’নসিক অ’বস্থা, বাগদাদ ছেড়ে পালাতে পারলে বেঁচে যায়। বললো, আমি রাজি, জাঁহা’পনা। আপনি ব্যবস্থা করে দিন, আমি আর বি’লম্ব করতে চাই না।

সুলতান উজির দানাদানকে নির্দেশ দিলো, সারকান দামা’সকাসের সুবাদার হয়ে যাবে। তুমি তার যাত্রার আয়োজন কর।

সারকান দামা’সকাসে পৌঁছলে বি’পুল সম্বর্ধনা করে স্বাগত জানালো প্রজারা। শহরের বড় বড় রাস্তার মোড়ে তোরণদ্বার তৈরি করা হয়েছিলো। আলোর মা’লায় সাজানো হয়েছিলো সারা শহর। আনন্দ উৎসবে মুখর হয়ে উঠেছিলো দামা’সকাস।

সারকান বি’দায় নেবার পর উমর-আল-নুমা’ন তার কন্যা নুজাৎ আর পুত্র দু-আল-মা’কানের খোঁজ খবর নিয়ে জানিলো, তারা পড়াশুনা করে যথেষ্ট জ্ঞান সঞ্চয় করেছে। বৃদ্ধ মৌলভী সাহেব বললেন, জাঁহা’পনা, আমা’র যা কিছু শেখাবার ছিলো, সবই তাদের শিখিয়ে দিয়েছি। ধর্ম সাহিত্য দর্শন বি’জ্ঞানে তারা দুজনেই যথেষ্ট বুৎপত্তি লাভ করেছে। আমা’র বি’বেচনায় পুঁথিগত বি’দ্যার পাঠ তাদের শেষ হয়েছে।

সুলতান-উমর শুনে খুশি হয়ে মৌলভীকে মূল্যবান বস্ত্ৰাদি এবং প্রচুর অ’র্থ পুরস্কৃত করে বি’দায় দিলো।

এই সময় নুজাৎ আর দু-আল-মা’কান-এর বয়স চৌদ্দ বছর। তাদের বি’দ্যাবুদ্ধির কথা বাগদাদ শহরে ছড়িয়ে পড়লো। বহু জ্ঞানী গুণী ব্যক্তি প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতে লাগলো। গর্বে সুলতানের বুক ফুলে উঠলো।

একদিন কিশোর দু-আল-মা’কান প্রত্যক্ষ করলো, একদল হজ যাত্রী বাগদাদ শহরের ভিতর দিয়ে মিছিল করে চলেছে। পাশ্বচরকে জিজ্ঞেস করতে সে জানলো, ওরা সব ইরাক থেকে আসছে। যাবে মক্কায়। প্রতি বছর মক্কায় যে হা’জ মেলা হয়। সেই মেলায় গিয়ে আল্লাহর নাম গান করবে। তারপর ওরা যাবে মন্দিনায়-যেখানে পয়গম্বর মহম্মদের সমা’ধি ক্ষেত্র।

দু-আল-মা’কানের নিষ্পাপ কিশোর চিত্ত উদ্বেলি’ত হয়ে ওঠে। সে বলে, আমিও যাবো।

পার্শ্বচর বোঝায়, আপনি তো এখনও নাবালক, হুজুর। সাধারণত, মা’নুষ সব ভোগ-লালসা বি’সর্জন দিতে যায়। সেখানে। কিন্তু আপনার তো এখনও জীবনের শুরুই হয়নি। এখনই সেখানে যাবেন কেন?

দু-আল-মা’কান কিন্তু সে কথায় ভুলতে চায় না।–না, আমি যাবো। পার্শ্বচর বলে, আপনি সুলতানকে জানান, তিনি যদি মত দেন, গিয়ে দেখে আসবেন।

কিন্তু সুলতান উমরও সেই কথাই বলে, দূর বোকা ছেলে, ওখানে তুই যাবি’ কেন? সংসারের সবকিছু দেখা শোনা শেষ হলে, সব কামনা বাসনার পূর্ণ হলে তবে মা’নুষ যায় মক্কায়। সেখানে গেলে সংসার-এর মা’য়া বন্ধন আর মা’নুষকে আকৰ্ষণ করে না।

দু-আল-মা’কান তবু বায়না ধরে, না। আমি যাবো।

সুলতান দেখলো, ছেলেকে কিছুতেই ভোলানো যায় না। বললো, সেখানে তো তুমি এক একা যেতে পারবে না, বাবা। সামনের বছর আমি তোমা’কে সঙ্গে নিয়ে যাবো।

মা’কান আব্দার ধরে, না, আব্বাজান, তুমি এই বারেই চলো।

উমর-আল-নুমা’ন ছেলের মা’থায় হা’ত বুলি’য়ে বোঝাবার চেষ্টা’ করে, এখন আমা’র হা’তে অ’নেক জরুরী কাজ বাবা। এ বছর যাওয়া হবে না। আমি তোমা’কে কথা দিচ্ছি, সামনের বার নিয়ে यi(दां।

–আল্লাহর উদ্দেশে যাওয়ার চেয়ে আবার অ’ন্য কোনও জরুরী কাজ থাকতে পারে নাকি, আব্বাজান?

উমর-আল কি করে বোঝায়, পুঁথিতে যে-সব কথা লেখা থাকে তা-ই সব নয়। কিন্তু ছেলের কথার জুৎসই জবাবও দিতে পারে না। শুধু বলে, এখন তুমি মা’র কাছে যাও বাবা, আমি তোমা’কে পরে নিয়ে যাবো।

কিশোর মা’কান। কিন্তু শান্ত হয় না। তার মা’থায় তখন এক চিন্তা। মক্কা যেতে হবে। আল্লাহর পয়গম্বর মহম্মদের পবি’ত্ব পদধূলি’ মিশে আছে মক্কার পথে ঘাটে। সেই মা’টি মা’থায় ধরণ করে সার্থক হবে সে। সারা রাত বি’নিদ্র রজনী কাটে। যেভাবেই হোক-মক্কায় সে যাবেই। সকালে বোন নুজাৎকে বলে, আমা’র মন বড় চঞ্চল হয়েছে দিদি, আমি মক্কায় যাবো। কিন্তু কি করে যাবো রে!

নুজাৎ বলে, আমা’রও খুব যেতে ইচ্ছে ভাই। কিন্তু বাবা-মা’ কেউই রাজি হবে না।

মা’কান বলে, চল, পালি’য়ে যাই।

—পালি’য়ে যাবো? কেমন করে?

মা’কান বুদ্ধি বাৎলায়, তুই কিছু ভাবি’স নি, দিদি। আমি তোকে নিয়ে যাবো। তুই বরং এক কাজ কর। মা’র বাক্স থেকে কিছু টা’কা পয়সা আর কিছু সাজ-পোশাক হা’তিয়ে নে। দেখিস কেউ যেন না টের পায়। দু’টো উট ভাড়া করে আমরা হজ-যাত্রীদের মিছিলে সামিল হয়ে যাবো। তাহলেই দেখবি’ একদিন মক্কায় পৌঁছে গেছি।

নুজাৎ বলে, কিন্তু আমি মেয়েছেলে, সবে আমা’র যৌবন আসছে। এই সময় পথে ঘাটে অ’নেক বি’পদ-আপদ ঘটতে পারে।

মা’কান বলে, তোর মা’থায় কিছু বুদ্ধি নাই। তুই আমা’র সাজ-পোশাক পরে ছেলে সেজে নে। তাহলেই ল্যাঠা চুকে গেলো।

নুজাৎ বলে, ঠিক বলেছিস, ভাই। তোর বুদ্ধির তারিফ করতে হয়।

রাত্রে মা’কান এসে নুজাৎকে জানায়, কালকের ভোরে আমরা চুপি চুপি বেরিয়ে যাবো শহরে। ওখানে দুটো উট ভাড়া করে রাখবে আমা’র নফর। আমি সব ব্যবস্থা করেছি। ইরাক থেকে যে-সব হজ যাত্রীর দল কাল বাগদাদে আসবে তাদের সঙ্গে মিশে যাবো আমরা। কেমন, ঠিক আছে?

নুজাৎ বলে, বি’লকুল ঠিক আছে।

এইভাবে দুই কিশোর-কিশোরী একদিন মক্কায় এসে পৌছয়। পবি’ত্র আরাফৎ গিরিশৃঙ্গ এবং মদিনার পবি’ত্র সমা’ধি ক্ষেত্ব দৰ্শন করে ওদের মন আনন্দে ভরে যায়।

এবার ঘরে ফেরার পালা। তীর্থযাত্রীরা অ’নেকেই ফেরার পথে খ্ৰীষ্টা’নদের পবি’ত্র তীর্থক্ষেত্র, ষীশুর জন্মস্থান জেরুজালেম শহরটা’ দেখে যায়। মা’কান বললো, দিদি চল, আমরাও জেরুজালেম দেখে তারপরে দেশে ফিরবো।

কিন্তু তীর্থযাত্রীদের অ’নেকেই বারণ করেছিলো।

–এই বয়সে এতো ধকল কি তোমা’দের সহ্য হবে? পথ বড়ো খারাপ। মা’কান বলে, খারাপ তো কি হয়েছে? কত বুড়ো হা’বড়া যাচ্ছে, আর আমরা যেতে পারবো কিন্তু পথ চলতে চলতে মনে হতে লাগলো, না এলেই ভালো হতো। দুৰ্গমগিরি কান্তার মরু পেরিয়ে চলতে চলতে দু’জনেই অ’সুস্থ হয়ে পড়ে। জন্মা’বধি কোন কষ্ট সহ্য করার অ’ভ্যাস নাই। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছে। ওরা কেন সইতে পারবে এই দুঃসহ খরতাপের জ্বালা? নুজাতের জ্বর পথের মধ্যেই সেরে গেলো। কিন্তু দু-আল-মা’কান দিন দিন কাহিল হয়ে পড়তে থাকে। এইভাবে একদিন ওরা জেরুজালেমে এসে পৌছয়। মা’কান তখন জুরে অ’চৈতন্য। প্রলাপ বকে চলেছে।

শহরের উপান্তে একটা’ সরাইখানায় আশ্রয় নেয়। তারা। নুজাৎ-এর মনে ভয় ধরে। এই বি’দেশ বি’ভূঁই-এ অ’সুস্থ ভাইকে নিয়ে সে কিভাবে দেশে ফিরবে?

দিন যায় রাত্রি আসে। কিন্তু মা’কান-এর জ্বর বাড়তেই থাকে। হা’তে যা পয়সা কডি ছিলো ফুরিয়ে এলো। কিন্তু মা’কান-এর জ্বর কমে না। নুজাৎ চিন্তায় পড়লো। সাজপোশাক যা ছিলো এক এক করে বি’ক্রি করতে লাগলো। কিন্তু তাতে আর কতদিন চলতে পারে? একদিন নুজাৎ দেখলো, বি’ক্রি করার মতো আর কোন সাজ-পোশাকও অ’বশিষ্ট নাই। নুজাতের কান্না পায়। হা’য় আল্লাহ, এ কি বি’পদে ফেললো? এখন কি করি? কি করে আমা’র ভাই-এর মুখে ওষুধ পথ্য দিই? আর কি করেই বা দেশে ফিরবো?

আল্লাহ বোধহয় মুখ তুলে চাইলেন। মা’কানের জ্ঞান হলো।–দিদি কঁদিস নি। আমা’র জ্বর সেরে যাবে। আমরা শিগ্‌গিরই দেশে ফিরে যাবো। বডড ক্ষিদে পেয়েছে রে। কিছু খাবার দে।

সুলতানের ছেলে আজন্ম ঐশ্বর্যের প্রাচুর্যে লালি’ত হয়েছে। সে কি করে বুঝবে, খেতে চাইলেই সবাই খেতে পায় না। খাবার কিনতে পয়সার প্রয়োজন হয়। নুজাৎ বলে, কিন্তু ভাই, আমা’র কাছে তো পয়সাকডি কিছু নাই। কি করে তোকে খেতে দেব? লোকের কাছে ভিক্ষে মা’ঙবো, তাও পারছি না। যাই হোক, আজকের রাতটা’ একটু কষ্ট করে থােক। কাল আমি কোনও আমির সওদাগর-কারোবাড়ি গিয়ে ঝি-এর কাজ করেও কিছু খাবার-দাবার নিয়ে আসবো। সারাটা’ দিন তোকে ছেড়ে থাকতে আমা’র মন চাইছে না। কিন্তু কি করবো, ভাই, আল্লাহর বোধহয় এ রকমই ইচ্ছে। জানি না, তিনি কবে আমা’দের আবার বাগদাদে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন।

পরদিন সকালে নুজাৎ ভাই-এর কপালে চুমু দিয়ে পথে নেমে আসে। কিন্তু কোথায় যাবে, কার বাড়িতে কাজ পাবে কিছুই বুঝতে পারে না। উদ্দেশ্যবি’হীনভাবে এদিক-ওদিক ঘুরতে থাকে।

দু-আল-মা’কান সারাদিন অ’পেক্ষা করে থাকে। সন্ধ্যা হয়ে গেলো, কিন্তু নুজাৎ ফিরে আসে না। ক্ষিদের জ্বালায় পেটের নাডি জ্বলতে থাকে। সারাটা’ রাত ক্ষিদের দুশ্চিন্তায় বি’নিদ্রভাবে কাটে। কিন্তু নুজাৎ ফিরে এলো না। তার পর দিনও সেই ভাবে কেটে যায়। তারও পরের দিন অ’তিক্রান্ত হয়। কিন্তু নুজাতের কোনও সন্ধান পাওয়া গেলো না। আজ পুরো দু’টো দিন-রাত্রি মা’কান কিছু খায়নি। খিদের জ্বালায় চোখে অ’ন্ধকার দেখছে। কোন রকমেছেচড়ে ছেচড়ে দরজার চৌকাঠ অ’বধি আসে। সরাইখানার একটা’ চাকরকে বলে, আমা’কে একটু বাজারে নিয়ে যাবে, ভাই। আমি আজ দুদিন খাইনি। খিদের জ্বালা আর সইতে পারছি না।

চাকরটা’ বলে, কিন্তু সেখানে কে তোমা’কে খেতে দেবে?

—যদি কারো দয়া হয়। না হলে এখানে থেকেই বা কি করবো।

চাকরাটা’ ওকে কাঁধে করে নিয়ে গিয়ে বাজারের এক পাশে একটা’ পোড়ো বাড়ির বারান্দায় শুইয়ে দিয়ে চলে আসে। মুখে আওয়াজ তুলে কারো কাছে ভিক্ষে চাইবে, মা’কানের তখন সে অ’বস্থাও নাই। পথচারীদের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে। মুখে কিছু বলতে পারে না। শুধু হা’তের ইশারা করে জানায়, সে বড় ক্ষুধার্ত, একটু কিছু খেতে চায়।

মা’কানেরই সমবয়সী কয়েকটি ছেলে ওর আবেদনে সাড়া দেয়। বাজারের দোকানীদের কাছ থেকে চাঁদা করে পয়সা তুলে মা’টির থালা করে কিছু খাবার কিনে নিয়ে আসে। মা’কানকে খাওয়ানোর চেষ্টা’ করে। কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও পেটভরে খেতে পারে না সে। একটুখানি মুখে দিতেই বমি হয়ে যায়। আবার নেতিয়ে পড়ে। খাবার কেনার পর চাঁদর পয়সা তিরিশ দিরহা’ম বেঁচে ছিলো। অ’নেকেই বললো, একটা’ উট ভাড়া করে দামা’সকাসের হা’সপাতালে পৌঁছে দাও তোমরা। না হলে বাচ্চাটা’ মরে যাবে। সুলতান উমর-আল-নুমা’নের সরকারী হা’সপাতালে ভালো চিকিৎসার বন্দোবস্ত আছে। গরীব দুঃখীদের কোনও পয়সা লাগে না।

সবাই জল্পনা কল্পনা করলো অ’নেক। কিন্তু কেউই শেষ পর্যন্ত এগিয়ে এলো না। দামা’সকাস অ’নেক দূরের পথ। নিজের কাজকাম বন্ধ করে কে আর পরের উপকার করতে ছুটবে? শেষ পর্যন্ত এক এক করে সবাই কেটে পড়লো। শাহেনশাহ উমর অ’ল-নুমা’নের পুত্র শাহজাদা দু-আল-মা’কান সেই পোড়ো বাড়ির খোলা বারান্দার এক কোণে মরার মতো পড়ে থেকে রাত্রি কটা’লো। মা’টির বাসনে একটু রুটি আর এক ভীড় জল রেখে গেলো। ওরা। কিন্তু মা’কানের কোনও চৈতন্য নাই। কি করে সে খাবে?

পরদিন সকালে একটা’ লোক দোকানে দোকানে চাঁদা তুলতে লাগলো। সবাইকে বললো, একটা’ বাচ্চা, এখানে পড়ে থেকে বি’না চিকিৎসায় মা’রা যাবে—আপনারা যে যা পারেন সাহা’য্য করুন। আমি ওকে দামা’সকাসের সরকারী হা’সপাতালে নিয়ে যাবো।

দোকানীরা তো দিলোই। পথচলতি মা’নুষও দয়া পরবশ হয়ে যার যা সাধ্য সাহা’য্য করলো। লোকটা’র উদ্দেশ্য সাধু ছিলো না। একটা’ উট ভাড়া করে মা’কানকে নিয়ে রওনা হলো। বাজার ছাড়িয়ে শহরের শেষ প্রান্তে এসে চাঁদর পয়সাগুলো বের করে গুণে দেখলো। প্রায় দশ দিনারের মতো হবে। শয়তান লোকটা’ মা’কানকে একটা’ সরকারী হা’মা’ম-এর পাশে নামিয়ে দিয়ে স্বগতভাবে বলতে থাকে, এই মর্যাটা’কে হা’সপাতালে পৌঁছে দিয়ে আমা’র কি ফায়দা হবে। তার চেয়ে থাক, এখানেই মর। আল্লাহ, আমা’র কোনও দোষ নিও না। ছেলেটা’র যদি বাঁচার কোনও আশা থাকতো, তবে তোমা’র নামে কসম খেয়ে বলছি, ওকে আমি দামা’সকাসের হা’সপাতালে পৌঁছে দিতাম।

এই বলে বদমা’ইশটা’ অ’দৃশ্য হয়ে গেলো।

একটু পরে হা’মা’মের পাশে একটা’ লোক এসে দাঁড়ালো। বৃদ্ধ-দাড়ি গোঁফ সাদা হয়ে গেছে। এই হা’মা’মে সে চাকরী করে। যারা গোসল করতে আসে তাদের গরম জল জোগানই তার কাজ। একটা’ বি’রাট চুল্পী আছে হা’মা’মের একপাশে। আর আছে একটা’ চেলাকাঠের গুদাম। সারাদিন ধরে সে শুধু গরম জল করে যায়। পথচারীরা আসে গোসল করতে। যার দরকার তাকে গরম জল দেয়। এর জন্যে সে সরকারের কাছে বেতন পায়। অ’বশ্য সে বেতন অ’তি সামা’ন্য। স্বামী-স্ত্রীর কোন রকমে চলে যায়। কিন্তু বৃদ্ধ বড় সৎ। কোনো পথচারী স্নান সেরে খুশি হয়ে দু’পয়সা বকশিস করতে এলে নেয় না। বলে, আল্লাহর দোয়ায় আমা’র কোনও অ’ভাব নাই, জনাব। আমি নিতে পারবো না।

বৃদ্ধ ভাবে, এই সকালবেলা দরজার সামনে একটা’ মড়া ফেলে গেলো কে?

কিন্তু কিছুক্ষণ বাদেই তার ভুল ভাঙ্গে। না, ছেলেটা’ তো মরেনি। হা’ত পা নাড়ছে যেন মনে হচ্ছে। কাছে গিয়ে নাডি ধরে দেখে বৃদ্ধ বুঝতে পারে, এখনও ছেলেটা’ বেঁচে আছে! কিন্তু এ অ’বস্থায় থাকলে আর বেশিক্ষণ বাঁচবে না হয় তো বা। বৃদ্ধ ভাবে, ছেলেটা’ বোধ হয় খারাপ দলে পড়ে বেশি মা’ত্রায় হা’সিস খেয়েছে। কিন্তু ভালো করে দেখে বুঝতে পারলো, না, নেশা করে বেহেড হয়নি। অ’সুখে অ’সুখে দুর্বল হয়ে নেতিয়ে পড়েছে। বি’শেষ করে না খেতে পেয়েই তার এই মরণাপন্ন দশা। কিন্তু অ’বাক লাগে তার, এমন ফুলের মতোটুকটুকে সুন্দর ছেলে তো কোনও সাধারণ ঘরের নয়। নিশ্চয়ই কোনও খানদানী পরিবারের ধনীর দুলাল। কিন্তু এ অ’বস্থায় কে তাকে এখানে ফেলে গেলো? যাই হোক, আগে ওকে সুস্থ করে তোলা দরকার। তারপর জানা যাবে, কেমন করে কোথা থেকে এলো!

মা’কানকে বৃদ্ধ কাঁধে তুলে নিয়েবাড়ি আসে। বি’বি’কে বলে, দেখো, ছেলেটা’ বোধহয় না। খেতে পেয়ে নেতিয়ে পড়েছে। আগে একে খাইয়ে ধুইয়ে সুস্থ করে তোলো। মনে হচ্ছে খানদানী ঘরের ছেলে।

বি’বি’ আঁৎকে ওঠে, আহা’-হা’, এমন সোনার চাঁদ বাছা। একে পেলে কোথায়?

হা’মা’মের পাশে চেলা কাঠের গুদামের পাশে কে বা কারা ওকে ফেলে গিয়েছিলো। আমি ভেবেছিলাম। মড়া। পরে দেখলাম, না, বেঁচে আছে। কিন্তু ভালো করে আদর যত্ন না করলে বাঁচানো যাবে না। তুমি ওকে দেখো, আমি কাজে চললাম।

বৃদ্ধের বি’বি’ গরমজলি’ করে। মা’কানের গা হা’ত পা মুছিয়ে দেয়। এক গেলাস গরম দুধ এনে মুখে ধরে। দুধ টুকু খেয়ে মা’কান একটু সুস্থ বোধ করে। পরনের নোংরা সাজ-পোশাক খুলে ফেলে। বৃদ্ধের বৌ ওকে ধোয়া জামা’কাপড় পর্যায়। গোলাপ জলের পিচকারী করে মুখটা’ ধুয়ে দেয়। যুঁই-এর আতর এনে ছিটিয়ে দেয় পোশাকে। মা’কান ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে। প্রফুল্প হয়ে ওঠে!

এই সময় রজনী অ’বসান হয়ে আসে। শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে থাকে।

Please follow and like us:

fb-share-icon

নতুন ভিডিও গল্প!


Tags: , , , , , ,

Comments are closed here.