প্রসঙ্গ দেবদাসী – আরতি গঙ্গোপাধ্যায়

February 22, 2021 | By Admin | Filed in: বিখ্যাত লেখকদের সাহিত্যে যৌনতা.

সূচনা/১

দাসপ্রথারই একটা’ বি’শিষ্ট দিক দেবদাসী প্রথা। দাসপ্রথার সূচনা আদিম সভ্যতার বি’বর্তনের প্রাথমিক স্তর থেকেই; বি’জয়ী জাতি বি’জিত জাতিকে দাসে পরিণত করেছে। কিন্তু দেবদাসী প্রথার উদ্ভব আরাে ঘৃণিত, কারণ এরা সবসময়ই নিতান্ত ভােগসুখের উপকরণ হিসাবে ব্যবহৃত। মনােরঞ্জনই ছিলো এই দেবদাসীদের অ’বশ্য কর্তব্য। এই মনােরঞ্জন রাজার, রাজপুরুষদের এবং পুরােহিতদের। প্রধানতঃ পুরােহিতবর্গের চেষ্টা’য় এবং সহা’য়তায়ই এই প্রথা চলে এসেছে যুগযুগান্ত ধরে। অ’দ্যাবধি মন্দিরেয় আশ্রয়ে, দেবতার নামে চলে আসছে এই নিলজ নারীমা’ংসের ভােগ। অ’বশ্য মা’ঝে মা’ঝে কোনো কোনো সমা’জতত্ত্ববি’দ এক ঝলক আলো ফেলেছেন এই সমস্যার দিকে, তবে তা নিতান্ত বৈচিত্র্যের সন্ধানে যতটা’, ততটা’ এর ভীষণতার উৎস সন্ধানে নয়। ইতিহা’সের রূপরেখা রচনার সময় ঐতিহা’সিকেরা অ’ধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই কুপ্রথা সম্বন্ধে একান্ত উদাসীন। অ’থচ এই প্রথা আজও চলে আসছে জনজীবনের অ’ন্তরালে।….

….নারীপণ্যের একটা’ বড়ো হট মন্দির প্রাঙ্গণ। দেবদাসপ্রথা এই হা’টের শর্ত। এ প্রথা নতুন নয়, যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। ভারতবর্ষে এই দেবদাসী প্রথা সম্ভবত সবচেয়ে ব্যাপক। ভারতীয় নারী সমা’জ বহুযুগ ধরে এই প্রথার প্রভাবে অ’ত্যাচারিত।….

বি’শ্ব পটভূমি

….এই ইতিহা’সকে দেবদাসী প্রথার প্রাচীন ইতিহা’স হিসেবে উল্লেখ করা যায়। সমা’জের উচ্চ কোটির রমণীরা এবং ক্রীতদাসীর, উভয়েই মন্দিরের দেবদাসী পর্যায়ে পরিগণিত, তবে এই দাসীত্বের শ্রেণীভেদটিও লক্ষ্য করার মতো। এর পর আসীরিয় সভ্যতা ও ব্যাবি’লোনিয়ার সভাতার ইতিহা’সেও এই ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। এ যুগের সমস্ত সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলই ধর্মের প্রভাবে প্রভাবি’ত। ব্যাবি’লনীয় সভ্যতার সবচেয়ে ক্ষমতাশালী দেবতারা ছিলেন মা’রডুক, শামা’শ, তাম্বুজ ও ইশতার। দেবী ইশতারের সঙ্গিনীরূপে নারীগণকে মন্দিরে দেবদাসী রূপে নিযুক্ত করা হতো। প্রাচীন ব্যাবি’লােনে এ নিয়মও ছিল, প্রতিটি বি’বাহবােগা মীলােক দেবী ‘ইশতার’-এর মন্দিরে বসে থাকবেন এবং প্রথম যে পুরুষ এসে তার কোলে একটি রৌপ্যমুদ্রা ফেলে দেবেন তার সঙ্গেই তিনি মিলি’ত হবেন। প্রাক-বি’বাহ বেশ্যাবৃত্তি এভাবে ব্যাবি’লােনে মন্দিরকে সাক্ষী করেই শুরু হয়। মন্দির দাসীদের পক্ষে বাধ্যতমূলক বেশ্যাবৃত্তির ইতিহা’স প্রাচীন ব্যাবি’লােনে এভাবেই পাওয়া যায়।….

….গ্রীসের ইতিহা’সে আমরা দেবদাসীর উল্লেখ পাই নানা ভাবে। চিরতরুণ সূর্যদেবতা এপােলাের মন্দিরে সর্বত্রই দেবদাসী নিযুক্ত। লক্ষ্য করলে দেখা যায় এর পূর্বে ও পরেও সর্বত্র সূর্যদেবের দেবদাসী নিযুক্ত করা হয়েছে। গ্রীসের মন্দিরবালাদের বলা হতো Hierodule। এদের দেখা যেতাে গ্রীসের প্রতিটি দেবমন্দিরেই। এদের কাজ ছিল দেশসম্মুখে নৃত্যগীত প্রদর্শন এবং বাধ্যতামূলক বেশ্যাবৃত্তি। প্রাচীন ব্যাবি’লােনের ‘ইশতার’-এর মন্দিরের দেবদাসীদের মতােই এদের কাজ ছিল প্রধানতঃ পুরােহিতদের এবং পরে রাজাদের ও ক্ষমতাশালী বীয়দের মনােরঞ্জন করা।
এই দাসদাসী কারা ? দিগ্বি’জয়ী রাজন্যবর্গের পদানত দেশ থেকে নিয়ে আসা কৃতদাসবর্গ এই দাসদাসীদের প্রধান অ’ংশ। এদেরই কেউ কেউ মন্দিরে নিয়ােজিত হতো দাসীরূপে। এরা ছাড়া কাঞ্চনমূল্যে কিনে বা বল প্রয়ােগে এদের wগ্রহ করা হতো। অ’থবা রাজয়ে গৃহহুয়া মেয়েদের দাসীরূপে নিবেদন করত মন্দিরে। ইতিহা’স এ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ নীরব। আর্টেমিরে মন্দিরের দাসীরা বাধ্য হ’তে এক বি’চিত্র জীবনযাপনে। পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কহীন এক অ’বাভাবি’ক জীবন ছিল তাদের। মদিরা দেব Bachhus-এর মন্দিরের দেবদাসীদের একটা’ বি’শেষ শ্রেণীতে ফেলা হতো। এদের বলা হতো Macnad—এদের সম্পর্কেও ইতিহা’স নীরব। বালি’কা অ’বস্থায় দেবদাসীদের তালি’ম দিয়ে তৈরী করা হতো এই Maenad হবার জন্য। এর সঙ্গে আমরা জানতে পারি Amazon-দের কথা। এই Amazon মর্মীরা ছিল যুদ্ধ বি’দ্যায় পারদর্শনী। ডান কাধে তুণ রাখার অ’সুবি’ধা ঘটা’য় ডান দিকের শুনটিকে কেটে ফেলে বা শক্ত করে বেধে রাখতে বলে নাকি এদের নাম হয়েছিল Amazon বা এনী। এদের সন্তান হতো, তবে কেবল কন্যাসন্তানকেই বাঁচিয়ে রাখা হতো। প্রজননের জন্য পুরুষ ধরে এনে সন্তান উৎপাদনের পর হয় তাকে বি’তাড়িত করা হতো, নয় বধ করা হতাে। কিন্তু এই Amazon-দেয় অ’স্বাভাবি’ক জীবনযাত্রারও কোনাে সামা’জিক কারণ খুজে পান্না যায় না। নারীমুক্তির আদর্শ বলে এদের মনে করাও অ’র্থহীন, কারণ যৌন অ’স্বাভাবি’কতা কখনো মুক্তির প্রেরণা আনতে পারে না। যে সমস্ত বালি’কাদের তালি’ম দিয়ে এই অ’স্বাভাবি’ক জীবনে নিয়ে আসা হতো, তারাও দাসীই ছিল। Maenad বা Amazon-দের উৎপত্তি সম্বন্ধে ঐতিহা’সিক তথ্য প্রায় নেই, বু একথা মনে না করায় কোন বাধা নেই, যে দেবমন্দিরের সম্মা’ন, যা তারা সে যুগে পেতেন, তার আড়ালে এই ‘দেবদাসীদের অ’সুস্থ জীবন মনােবি’কারের শিকার হয়ে উঠেছিল।…..

…..বেশ্যাবৃত্তিকে স্বাধীনবৃত্তিরূপে প্রতিষ্ঠা করার পিছনে দেবদাসীবৃত্তিই সবপ্রথম প্রচেষ্টা’। মন্দিরদাসীরা যে কার্যতঃ পুরােহিতদের মনােরঞ্জন করতেন সে সম্বন্ধে ইতিহা’সে বহুবি’ধ তথ্যপ্রমা’ণ আছে। তবে এই দেবদাসীদের পাশাপাশি রাজনটী ও নগরনটীদের আবি’র্ভাব ঘটেছে। সম্ভবতঃ দেবতার ভােগ এবং রাজা ও রাজপুরুষদের ভােগ সমপর্যায়ের হবে, এ ধারণাই ছিল এই প্রথার পিছনে। দেবদাসী ও নগরনটীরা সকলেই যে ক্রীতদাসী ছিলেন না, এ অ’নুমা’নের পশ্চাতে যে কারণটি দেখানো যায়, তা হ’ল ক্রীতদাসী এবং কৃতদাসী (যাকে যুদ্ধের ফলে দাসী করা হয়েছে দের কোনাে রকম সামা’জিক অ’ধিকার ছিল না। কিন্তু নগরনটীদের সম্মা’ন ছিল যথেষ্ট। এই নগয়নটীদের খ্রীসে Hataera বলা হতো। এদের গৃহে দেশের আনীগুণীরা আসতেন, নানা বি’ষয়ে আলাপ আলোচনা করতেন এবং এদের মতামতও সাগছে শুনতে।
থিওড়ােয়া নামে বাইজেন্টিয়ান সম্রাটের পত্নী নিজে একজন Hataera ছিলেন। দেবদাসীদের সম্মা’নিত অ’তিফের প্রমা’ণও আছে, তবে তা Hataera-দের সমতুল্য নয়, কারণ তাদের কেন্দ্র করে ছিল ধর্মের পরিমণ্ডল।….

….ইনকা সম্রাটরা সকলেই সূর্যের সন্তান’ বলে পরিচিত ছিলেন। এদের ক্ষমতা ছিল অ’পরিসীম। এরাও মিশরের ফারাও দের মতাে সহা’েদরা ভগিনীকে বি’বাহ করতেন। ইনকা রাজ্যে সূর্যের মন্দিয় তত্ত্বাবধানের কাজ করতেন পুরােহিতগণ। সুন্দরী মেয়েদের অ’ল্প বয়সেই বেছে নিয়ে Cuzco বা শিক্ষালয়ে নিয়ে যাওয়া হতো শিক্ষা দেওক্সার জন্য। তারা বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে পরে হয় স্বয়ং রাজার উপপত্নী হিসাবে রাজাবরােধে প্রেরিত হতে অ’থবা সূর্যকুমা’রী’ বা ‘Virgins at the Sun’ রূপে মন্দিরবাসিনী হতো। মন্দিরবাসিনী এই কন্যাদের কাজ ছিল পুরােহিত, রাজা বা রাজবংশীয় পুরুষদের মনােরঞ্জন এবং অ’ন্যান্য শিল্পকাজ।…

প্রাচীন ভারতে দেবদাসী প্রথা

….উর্বশীর মুখের এই কথাগুলি’ শুনলে বােঝা যায় যে বেশ্যাদের অ’বস্থাও ছিল ক্ষণিক সুখ ও আনন্দের বি’লাসদ্রব্য স্বরূপ মা’ত্র। দেবগণ এবং দেবপ্রসাদ প্রাপ্ত রাজগণ এই স্বর্বেশ্যাদের সঙ্গ পেতেন এবং এই অ’প্সরাসঙ্গ যথেষ্ট সম্মা’নজনক বলেই বি’বেচিত হতাে। মহা’ভারতে শকুন্তলার উপাখ্যানে আমরা দেখি যে, অ’প্সরা কন্যা শকুন্তলা রাজেন্দ্র দুষ্মন্তের মহিষী হয়েছেন। অ’ন্যত, অ’র্জুনের আনন্দ বি’ধানের জন্য দেবরাজ ইন্দ্র ঊর্বশীকে তার কাছে প্রেরণ করেছেন, যদিও অ’র্জুন তাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। সামা’জিক বি’ধিবি’ধান অ’নুযায়ী বেশ্যা অ’প্সরাদের সঙ্গলাভে কোনো stigma বা কলঙ্ক আরােপ করা হয় নি। দেবদাসী প্রথায়ও এই ধারণাটিই স্পষ্ট দেখা যায়। মহা’ভারতে বারে বারেই অ’প্সরাবৃত্তিকে ন্যায়সঙ্গত করার কাহিনী দেখানাে হয়েছে। শকুন্তলার কাহিনী সর্বজনবি’দিত। ঊর্বশীর পুত্র আয়ু পুরুরবার ঔরসজাত এবং রাজ্যাভিষিক্ত। অ’ঙ্গরাগণ বি’ভিন্ন সময়ে মুনিদের ধ্যান ভাঙানাের জন্য নিয়ােজিত হয়েছেন, তার জন্য কোন সামা’জিক বাধা নেই। বরং এই ক্ষণমিলনজাত সন্তানরাও সমা’জে সগৌরবে গৃহীত হয়েছে। দেবদাসীগণ দেবমূতির পত্নীস্বরুপ, সুতরাং তাঁদের সন্তানগণও সমা’জে স্বীকৃত।…..

….দেবদাসীদের মর্যাদা অ’ন্যান্য দাসদাসীদের চেয়ে তাে বটেই, সুশিক্ষিতা বারমুখাদের চেয়েও বেশী ছিল। এদের নিয়ােগ করা হতে কেবলমা’ত্র কলাবি’দ্যা শেখানাের জন্যই। কঠোর পরিশ্রমে তাদের অ’ধিগত করতে হতো নৃত্য, গীত, বাদ্য ও অ’ভিনয়। বয়ঃপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে আপ্রাণ পরিশ্রমে অ’ধিগত শিক্ষার পর তাদের উপস্থিত করা হতো নাটমন্দিরে দেবতার সামনে, যেখানে অ’ন্যান্য রসিকজনেরাও উপস্থিত থাকত। এখানে নৃত্যপ্রদর্শনের পর বি’চারক স্থির করতেন কে রুদ্ৰগণিকা হবে, এবং কে রাজগণিকা হবে। রুদগণিকা বা দেবদাসী হিসাবে যারা মনােনীত হতেন, তাদের মর্যাদা ছিল বেশী। শিল্পী হিসাবে তো বটেই, সামা’জিক মর্যাদাও তাদের অ’লভ্য ছিল না। স্বয়ং রাজাও এদের প্রতি কামনার দৃষ্টি ক্ষেপণ করতে পারতেন না। সে অ’ধিকার ছিল একমা’ত্র প্রধান পুরােহিতের।….

….দাসীবৃত্তি দুই ভাবে হতো। রঙ্গভােগ’ ও ‘অ’ঙ্গভােগ। রঙ্গভােগের অ’ধিকারিণী যারা তারা ছিলেন নৃত্যগীতে দেবতার মনােরঞ্জনকারিনী। ‘অ’ঙ্গভােগ’-এর অ’ধিকারিণীয়া দেবমূতির অ’ঙ্গসেবা করতেন। এই দ্বি’তীয় স্তরের দেবদাসীরা নিতান্তই ‘ভূত্যা’ শ্রেণীর। কালক্রমে এই ‘ভৃত্যা’ শ্রেণীর মেয়েরাই হয়ে পড়তেন বেশী অ’ত্যাচারিত, কারণ দেবমূতির ‘ভৃত্যার’ পক্ষে পুরােহিতবর্গের ‘ভূত’ হয়ে পড়াটা’ অ’নিবার্য হয়ে উঠতো।

দেবদাসীদের আবার শ্রেণীবি’ভাগ ছিল। কীভাবে এবং সমা’জের কোন স্তর থেকে এরা আহরিত হতো তার একটা’ ইঙ্গিত এই শ্রেণীবি’ভাগে পাওয়া যায়। দেবদাসাঁদের মধ্যে ছিল –

সত্তা—কোনাে পুণ্যলােভী গৃহস্থ স্বেচ্ছায় মন্দিরে কন্যা দান করলে সে হতো ‘দত্তা’ দেবদাসী । উদাহরণ স্বরূপ, কবি’ জয়দেব-গৃহিণী পদ্মা’বতীর কথা উল্লেখ করা যায়। পদ্মা’বতী নৃত্যগীতে সুনিপুণা ছিলেন বলে তার পিতামা’তা তাকে জগন্নাথদেবের মন্দিরে দেবদাসীরুপে দান করেন।

হৃতা- যেসব মেয়েকে হরণ করে নিয়ে এসে মন্দিরে উপহা’র দেওয়া হতো। এই হরণ কার্য কার দ্বারা বা কার সহা’য়তায় (রাজা অ’থবা পুরােহিত) ঘটত তার সঠিক উত্তর পাওয়া যায় না।

বি’ক্রীত-মন্দিরের কর্তৃপক্ষের কাছে নিদিষ্ট অ’র্থের বি’নিময়ে কন্যাকে বি’ক্রয় করলে সে বি’ক্রীতা দেবদাসীরূপে গণ্য হতো।

ভৃত্যা -যে দেবদাসী মন্দিরের কাজে ভূত্যারূপে আত্মোৎসর্গ করার জন্য সেচ্ছেয় মন্দিরবাসিনী হতো সে ভূতা।

ভক্তা- সেচ্ছায় আত্মসমর্পণকারিণী স্ন্যাসিনীকে ভক্তা দেবদাসী বলা হতো।

অ’লংকারা-নৃত্যগীত ও কলাবি’দ্যা শিক্ষা সমা’প্ত হবার পর যে নারীকে অ’লংকৃত করে দেবমন্দিরে অ’র্পণ করা হতো, সে অ’লংকারা। রাজকন্যারাও
এভাবে মন্দিরে অ’পিতা হতেন।

গােপিকা বা রুদগণিকা—এর নিদিষ্ট সময়ে নৃত্যগীত করার জন্য মন্দিরের বেতনভােগিনী দেবদাসী সম্প্রদায় রূপে পরিচিত।

……অ’বশ্য নৃত্যকলা বি’শেষজ্ঞ নর্তক-নর্তকীদের কথাও বলা হয়েছে রায়পসে নীয় সূত্রে মহা’বীরের সম্মুখে নৃত্যের জন্য আহূত হয়ে নট ও নটীরা বত্রিশ রকমের ভঙ্গীতে নৃত্য প্রদর্শন করেছিল। সুপুরুষ তরুণ নর্তকগণ একদিক থেকে রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করছে, তাদের পরিধানে অ’যথােবাস, কটিদেশে বি’চিত্রবর্ণ পটিক, উত্তরবাস হিসাবে কেবল উত্তরীয় এবং কষ্ঠেমা’ল্য ও অ’ন্যান্য অ’লংকার। আর এক দিক থেকে নর্তকীর প্রবেশ করছে, তাদের ললাটে তিলকরেখা, সর্বাঙ্গ অ’লংকারভূষিত, শিবরাদেশে রত্নহা’র এবং বক্ষে বি’চিত্র স্তনপট্র।…

…..অ’নুমা’ন করা যায়, নিম্নশ্রেণীর সুন্দরী মেয়েদের যে কোনো উপায়ে গ্রহ করে তাদের দেবদাসীরূপে উৎসর্গ করে উচ্চবর্ণের প্রয়ােজন মেটা’নাের ব্যবস্থা করা হতো।
দেবদাসীদের শ্রেণীবি’ন্যাসের মধ্যে রয়েছে দেবদাসী সংগ্রহের রূপরেখা। রাজশক্তি ও পুরােহিততন্তু কীভাবে ধর্মের ব্যাখ্যা ও শক্তিকে কাজে লাগিয়েছে, তার প্রমা’ণ যথাক্রমে, ‘হৃতা’ ও ‘দত্তী পর্যায়ে পাওয়া যায়। সমা’জ-ব্যবস্থায় রাজশক্তির এই প্রয়ােগ এবং পুরোহিততন্ত্রের কঠোর শাসন দেবদাসীদের কীভাবে সাক্ষাৎ প্রহরাধীনে রাখতে, তার টুকরো টুকরো বর্ণনাও পাওয়া যায়। সাধারণ বারাঙ্গনার ছিলেন জনসাধারণের যথেচ্ছ ব্যবহা’র্য সম্পত্তি, কিন্তু দেবদাসীরা ছিলেন সুরক্ষিতা, সাধারণ লােকের ধরাছোঁয়ার বাইরে।….

অ’র্থনৈতিক ও সামা’জিক পশ্চাদপট

মদ চোয়ানো, সাকো গড়া, নৃত্যগীত, ইত্যাদি সব রকমের পেশাতেই লোেকদের স্থান ছিল। এই নিন্মশ্রেণী থেকে মেয়েদের যে অ’সাধনায় নেওয়া হতো, তারও প্রমা’ণ আছে। যতঃ বর্ণের লােকের নারীসংগ লালসা মেটা’বার জন্য দৃঢ়যৌবনা নিন্মশ্রেণীর মেয়েদের নিয়ে ধর্মীয় আচারের সাহা’য্যে শােধন করে নিয়ে যােগিনী, অ’বধূতী ক দেবদাসী বানাতেন, অ’দ্যাবধি এই প্রথাই চলে আসছে ভারতের বহু জায়গায়।….
….স্বামী বি’বেকানন্দের এই তীব্র সমা’লােচনা তৎকালীন ভারতের ধর্মজীবনের দিকে একটা’ বি’শেষ আলোকপাত করেছে। সমা’জ-ব্যবস্থায় এই পুরােহিত সমা’জের সহা’য়তায় যে সমস্ত ঘৃণ্য প্রথার সৃষ্টি হয়েছে তার মধ্যে প্রধান হল দেবদাসী প্রথা।….

….দেবদাসী প্রথার পশ্চাৎপট রচনায় এই ধর্মীয় পটভূমি উনিশ শতকের ফুরােপীয় চিন্তানায়কদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায় নি। Karl Marx-এর The British Rule in India’ নামক রচনায় স্পষ্ট উল্লেখ আছে,
“…in a social point of view, Hindoostan is not Italy, but the Ireland of East. And this strange combination of Italy and Ireland, of a world of voluptousness and of a world of woes, is anticipated in the ancient traditions in the religion of Hindoostan. That religion is at once a religion of sensualist exuberance and a self-torturing ascoticism : a religion of the Lingam and of the Juggernaut ; the religion of the Mook and of the Bayadere.” | সমা’জে ‘দেববং পূজিত এই পুরোহিত শর্থ সমা’জ গঠনে নেতৃ করতেন। তাঁদের নির্দেশ অ’নুযায়ী নারীভােগের উপচার সংগ্রহ করা হতাে।
দেবদাসী প্রথার আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা এখনও চালু আছে অ’নেক জায়গায়। পতিতাবৃত্তিতে মেয়েদের নিয়ােজিত করার উদ্দেশ্যেই দেবদাসী প্রথার সুযােগ নেওয়া হচ্ছে।….

ধৰ্ম-বি’পর্যয়ের যুগ

….চৈতন্যদেবের ও তার সহচারীদের সাক্ষাৎ প্রভাবের অ’ন্তরালে আবার ধীরে ধীরে এই নারীলোলুপতা যে শিকড় মেলছিল তার প্রকাশ ঘটতে থাকে সপ্তদশ শতাব্দীর পরে। বি’ভিন্ন বৈষ্ণব আখড়াগুলি’তে আবার ধর্মের আবরণে নারী উপচার সংগ্রহের অ’পচেষ্টা’ ব্যাপক ভাবে শুরু হতে থাকে। এ সম্বন্ধে ঐতিহা’সিক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের উক্তি উদ্ধত করা অ’প্রাসঙ্গিক হবে না,
…তন্ত্রশাস্ত্রে তান্ত্রিক দিগকে বেদাচারী, বৈষ্ণবাচারী, শৈবচারী, দক্ষিণাচারী, বামা’চারী, সিদ্ধান্তচারী এবং কোলাচারী প্রভৃতি ক্রমোচ্চ নানা পর্যায়ে বি’ভক্ত করা হইয়াছে। ইহা’দেব মধ্যে কেলি’ইি সর্বশে। কেহ এই সম্প্রদায়ে প্রবেশ করতে ইচ্ছুক হইলে তাহা’কে ঐ সম্প্রদায়ভুক্ত একজনের নিকট দীক্ষা গ্রহণ করিতে হয় এবং দিবাভাগে নানাবি’ধ অ’নুষ্ঠানের পর ঘােষণা করিতে হয় যে সে পূর্বেকার ধর্মসংস্কার সমস্ত পবি’ত্যাগ করিল এবং ইহা’র প্রমা’ণস্বরূপ তাহা’র বন্ধি শ্ৰাদ্ব-কিয়া সম্পন্ন হয়। রাত্রিকালে গুরু ও শিষ্য ও আটজন বামা’চারী তান্ত্রিক পরষ এবং আটটি স্ত্রীলােক ( নর্তকী, তাবি’ কন্যা, গণিকা, ধােপানী, নাপিতের স্ত্রী বা কন্যা, ব্রাহ্মণী একজন ভূস্বামীর কন্যা ও গােয়ালি’নী)-সহ একটি অ’ন্ধকার কক্ষে প্রবেশ করে এবং প্রতি পুরুষের পাশে একটি স্ত্রালোক বসে। গুরু তখন শিষ্যকে নিম্নলি’খিতরূপ উপদেশ দেন। আজি হইতে লজ্জা, ঘৃণা, শুচি অ’শুচি জ্ঞান, জাতিভেদ প্রভৃতি সমস্ত ত্যাগ করিবে। মদ্য, মা’ংস, স্ত্রীসম্ভোগ প্রভৃতি দ্বারা ইন্দ্রিয় বৃত্তি চরিতার্থ করিবে কিন্তু সর্বদা ইষ্টদেবতা শিবকে স্মরণ করিবে। এবং মদ্য, মা’ংস, প্রভৃতি ব্রহ্মপদে লীন হইবার উপাদানস্বরূপ মনে করিবে। তান্ত্রিকেরা অ’নেক বীভৎ আচরণ করে যেমন মা’নুষের মৃ’তদেহের উপর বসিয়া মড়ার মা’থার খুলি’তে উলঙ্গ স্ত্রী-পুরুষের একত্র সুরাপান ইত্যাদি।
বৈষ্ণব সহজিয়াদেরও অ’নেক শাখা আছে। আউল, বাউল, সাই ইত্যাদি ছাড়াও কর্তাভজা, স্পষ্টদায়ক, সখী ভাবক, কিশােরী ভঞ্জনী, রামবল্লভ, জগম্মা’েহিনী প্রভৃতি নানা সম্প্রদায় সহজিয়া মতাবলম্বী। এই বি’ভিন্ন শাখার সহজিয়াদের মধ্যে সাধন প্রণালীর যথেষ্ট প্রভেদ থাকলেও গুরুবাদ, পুরুষের অ’বাধ মিলন ও পরকীয়া প্রেমের মা’হা’ত্ম্য সকলেই স্বীকার করে।
দুর্গাপূজার শররােৎসব নামে যে উৎসব প্রচলি’ত ছিল, তার প্রধান অ’ঙ্গ ছিল অ’শ্লীল অ’ঙ্গভঙ্গি সহকারে নৃত্যগীত। বৃহদ্ধর্ম পুরাণ ও কালবি’বেক গ্রন্থে এর উল্লেখ আছে। এই পূজা উপলক্ষে যে নৃত্যগীত হতো তার সম্বন্ধে ঐতিহা’সিকে, উল্লেখ,
“দিনের পূজা শেষ হইলে ধনী লােকের বাড়িতে একদল বেশ্যার নৃত্যগীত আরম্ভ হয়। তাহা’দের পরিধেয় বস্ত্র এত সূক্ষ যে তাহা’কে দেহের আবরণ বলা যায় না। গানগুলি’ অ’ত্যন্ত অ’শ্লীল ও নৃত্যভঙ্গী অ’তিশয় কুৎসিত।” সপ্তদশ শতাব্দীর পর থেকেই আমরা দেখতে পাই বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের আখড়াগুলি’তে ‘কিশােরী ভজনের নামে বালি’কা সংগ্রহ এবং তাদের নিয়ে এক নতুন দেবদাসীবৃত্তির সূচনা। নবদ্বীপ, কেন্দুলী ও অ’ন্যান্য বৈষ্ণবপ্রধান অ’ঞ্চলের মেলায় ‘সেবাদাসী’ সংগ্রহের নানা কৌতুককর প্রথা দেখা যায়। সাধারণ বৈষ্ণবগণ কঠী বদলের মা’ধ্যমে সঙ্গিনী সংগ্রহ করেন, আবার সেবাদাসী’ সংগ্রহ করাও হয় কৌতুককর একটি প্রথার মা’ধ্যমে। আপাদমস্তক আবৃত অ’বস্থায় হা’তের একটি আঙ্গুল বের করে মেয়েরা সারি সারি বসে থাকে এবং সংগ্রাহকেরা তাদের হা’ত ধরে নিয়ে যায়। ভাগ্যের হা’তে নিজেদের ছেড়ে দেবার ফলে কারুর জোটে সুন্দরী দাসী, কারুর বা অ’সুন্দরী। এই ‘সেবাদাসী’র দল অ’বশ্য অ’ধিকাংশ ক্ষেত্রেই গার্হস্থ্য জীবনের সঙ্গিনী। তবে অ’ন্যান্য ভাবেও যে ‘সেবাদাসী’দের সংগ্রহ করা হতো তারও যথেষ্ট প্রমা’ণ আছে। অ’র্থের বি’নিময়ে, কখনাে বা বলপ্রয়ােগে নিম্নশ্রেণীর বালি’কাদের নিয়ে ভেক দিয়ে তাদের বি’ভিন্ন আখড়ায় নিয়ােজিত করা হয়। এই সেবাদাসীর দল দেবদাসী প্রথারই বি’বতিত রূপ বললে খুব ভুল করা হয় না। বারাঙ্গনাদের তুলনায় এদের সামা’জিক মর্যাদা অ’ধিকতর ছিল। উপরন্তু এই সেবাদাসীরা কেবল আখড়ার প্রধান বৈষ্ণবেরই সেবাদাসী, সাধারণ লােকের ভােগ্য নয়। এদের সামা’জিক মর্যাদাও তাই তুলনামূলকভাবে অ’নেক বেশী।…..

দেবদাসী প্রথার বর্তমা’ন প্রেক্ষাপট

…বর্তমা’নে দেবদাসী প্রথা ব্যাপক ভাবে বেড়ে চলেছে বি’শেষ একটি ভূখণ্ডে। কর্ণাটক, কেরল, মহা’রাষ্ট্র, গােয়া, অ’ন্ধ্র ও তামিলনাডুতে এই প্রথার ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ার অ’ন্যতম প্রধান কারণ হলো শিল্পসমৃ’দ্ধ পশ্চিম উপকুলের শহরগুলি’তে বারবণিতার চাহিদা। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য এলাকায়ও যে-সমস্ত মেয়ে-চালানী কারবার চলছে, তার সঙ্গে এই অ’ঞ্চলের যােগ সবচেয়ে বেশী, অ’বশ্য ভারতের পূর্বাঞ্চলের উদ্বাস্তু পরিবারও তার বাইরে নয়। দক্ষিণ ও পশ্চিমা’ঞ্চলে এই প্রথার ব্যাপ্তি প্রধানতঃ নিম্নশ্রেণীর মধ্যে।
মহা’রাষ্ট্রের সাংলী জেলার গেজেটিয়ারটি কৌতুহলোদ্দীপক। এই গেজেটিয়ারে দেবদাসী প্রথার উল্লেখ কোথাও নেই। কিন্তু মহা’রাষ্ট্রের বি’চিত্র জাতিবি’ন্যাসের বর্ণনায় বলা হয়েছে কতকগুলি’ তপশীলভুক্ত নিম্নজাতির মধ্যে ‘মা’’ জাতি, ‘মা’হা’র’ জাতি ও চামা’র’ জাতির অ’ন্যতম বৈশিষ্ট্য, এরা নাচগানে পারদর্শী। বর্তমা’নে মহা’রাষ্ট্র অ’ঞ্চলের এই সাংলী জেলাতেই মা’ঙ্গ জাতির উপাস্য দেবী ইয়ালাম্মা’’কে কেন্দ্র করে দেবদাসী প্রথা চালু আছে।

বি’ভক্ত বাসবি’ সম্প্রদায়ের উদ্ভবের কারণ হিসাবে যা জানা গেছে, তা নিম্নলি’খিতরূপ :

ক. এই মেয়েরা নৃত্যগীতবাদ্যে পারদশনী ও সুন্দরী। কারণ সুন্দরী মেয়েদেরই উৎসর্গ করা হয়। উদ্দেশ্য সহজেই অ’নুমেয়, পুরােহিত ও মা’জার মনােরঞ্জন।
খ. স্থানীয় রাজন্যবর্গের পৃষ্ঠপােষকতা স্থায়ী ছিল না। মেয়েদের নিজস্ব উপার্জনের ক্ষেত্রও ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছিল। জীবি’কার জন্য বাধ্য হয়ে তারা বারবণিতা বৃত্তির সহজ আশ্রয় নিয়েছে।
গ. দাক্ষিণাত্যের ছােটো ছােটো রাজাদের আন্তঃকলহ এবং যুদ্ধবি’গ্রহ লেগেই থাকত। রাজা বদল হয়েছে অ’নেকবার, ধর্মেরও বদল ঘটেছে। ফলে মন্দিরের সাক্ষাৎ রক্ষণাবেক্ষণে থাকার সুবি’ধা মন্দিরদাসীদের ভাগ্যে ঘটে নি। রাজকোষে রত্নবাজি, মন্দিরের বি’গ্রহের রত্নরাজি এবং রাজঅ’ন্তঃপুর ও মন্দিরঅ’ন্তঃপুরে স্ত্রী-রত্নরাজি বার বার লুষ্ঠিত হয়েছে। ফলে কেবা নিত্য নতুন রাজাদেরই নয়, এই মন্দির-দাসীরা নিত্য নতুন ক্ষমতাশালী পুরুষদেরও ভােগের সামগ্রী হয়ে গেছে।

এই অ’বস্থাটা’ কিছু বৃত্তিসন্ধানী সুযােগকামীদের কাছে একটা’ নতুন মত্তকা হিসাবে এসেছে। সাধারণ মা’নুষের অ’ন্তনিহিত ধর্মবােধের সুযােগ নিয়ে অ’র্থোপার্জনের একটা’ সহজ উপায় হিসেবে এই বৃত্তি স্বীকৃত হয়ে গেলাে। এই বৃত্তির স্তরভেদ আছে নানা রকম। তা হল
১. বালাগাডা বাসবি’-কোনো পরিবারের একটি বি’শেষ শাখা বা তার আত্মীয়দের পরিচর্যায় নিযুক্ত থাকত। সমা’জের উচ্চতম শ্রেণীর ক্ষিতা হিসাবেই এরা থাকত। মন্দিরের পুরােহিত, কোনো বি’শেষ নৃত্যশিক্ষক, বা কেবলমা’ত্র গ্রামেব প্রধান মোড়ল, এরাই এই শ্রেণীর বাসবি’’দের পরিচর্যা পেত। এই শ্রেণীর বাসবি’রা সামা’জিক মর্যাদাবও আধিকারী ছিল। এদের সন্তানাদির উপরও কোনো কলঙ্কচিহ্ন বা Social Stigma আরােপিত হতে না। বাসবি’’ শ্রেণীর মেয়েদের জাতিগত বৈশিষ্ট্যও উপেক্ষিত হত, কাৰণ দেবতার নির্মা’ল্য হিসাবে তাদের কোন জাতি থাকত না।
২. মনে বাসবি’-একটি পরিবারের যুবকদের উপপত্নী হিসাবে এর। থাকে। ব্যবস্থাটি সম্ভবত এজন্যই, যাতে যুবকরা স্থানীয় পতিতা পল্লীতে না গিয়ে ঘরেই বৈচিত্র্যের স্বাদ পায়। উত্তর ভারতেও এরকম পারিবারিক দাসী থাকে, যারা গৃহকর্মের সঙ্গে সঙ্গে মনিবের শয্য।ভাগিনীও হতে বাধ্য। মুসলমা’ন পরিবারে বাদীদের অ’খস্থাও একই রকম। দক্ষিণ ভারতের বি’ভিন্ন অ’ঞ্চলের বি’ভিন্ন পরিবারে জীবনযাত্রা বি’চিত্র। এই গৃহরক্ষিত উপবণিতারা ধর্মা’শ্রিত বলে। গৃহিণীর পক্ষে সান্ত্বনা সূচক এবং বহুভােগী পুরুষদের পক্ষেও বি’না খরচে কেবল সামা’ন্য খাওয়া-পরার বি’নিময়ে নারীসঙ্গ লাভের সুবি’ধা। পারিবারিক দায়িত্ব তাদের প্রতি নেই এই মেয়েরা আর্থিক স্থিতির দিক থেকে সবচেয়ে অ’বহেলি’ত, তাড়িয়ে দিলেও তাদের যাবার জায়গা কোথায় ?
৩. জাতি বাসবি’-কোনো বি’শেষ একটি জাতিরই সেবা করবে। অ’ন্য জাতির নয়। এ ক্ষেত্রে সম্ভবতঃ ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ই এ সুযােগের অ’ধিকারী। অ’থবা অ’ন্য নিম্নজাতিও হতে পারে। এ সম্বন্ধে ব্যবহা’রিক বাস্তব উদাহরণ পাওয়া কঠিন।
৪. বি’ডি বাসবি’-বি’ডি অ’র্থাৎ পথ। পথে যারা দাড়িয়ে বেশ্যাবৃত্তি করে, তারাই এই বি’ডি বাসবি’। বর্তমা’নে বাসবি’’ কথাটা’ এ ভাবেই পতিতাবৃত্তির পরিভাষা হিসাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করেছে।

দাক্ষিণাত্যে এই বাসবি’দের পাশাপাশি একটি শ্রেণী দেখা যায়, তাদের ‘জোগতি’ বলে। এদের মধ্যে পুরুষদের বলা হয় ‘জোগত।। এরাও দেবদাসীই ছিল। তবে এরা ছিল সন্ন্যাসিনী। কোলাপুর অ’ঞ্চলে অ’বশ্য যযাগিনী’ ও ‘দেবদাসী’ সমা’র্থক ছিল। তবে প্রভেদ ছিল এই যে যযাগিনী’ বা ‘জোগতি’ দেবতার পূজারিণী, অ’ন্যের যৌনকামনা তৃপ্তির উপাদান নয়। দেবদাসী’র কর্তব্য যৌনকামনা তৃপ্তি সম্পাদন-পুরোহিরে এবং সমপর্যায়ের প্রভুদের। বর্তমা’নে অ’বসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধা ‘দেবদাসী’দের ‘জোগতি’ বলা হয়। এরা ‘জগ বা দেবমূতি বহন করে, ধর্মীয় অ’নুষ্ঠান পরিচালনা করে এবং দেবতার আদেশ ভরের মা’ধ্যমে প্রচার করে।

এরাই নতুন দেবদাসী সংগ্রহ ও তাদের ব্রত ধরণের আয়ােজন করে, কারণ উৎসর্গের সময়ে অ’ন্তত পাঁচজন দেবদাসীর উপস্থিতির প্রয়োজন হয়।
এ সবের সাধারণ উদ্দেশ্য ছিল মন্দিরের দাসীবৃত্তি। মন্দির পরিমা’র্জনা, পূজার উপকরণ সজ্জা, বি’গ্রহের সাজসজ্জা ইত্যাদি। কিন্তু আর্যপ্রভাবি’ত দেবদাসী প্রথার সর্বনাশা দিকটা’ই এখানেও প্রকট-ধর্মীয় আবরণের আড়ালে দেবদাসীদের উপভােগের সামগ্রীতে পরিণত করা।
‘বাসবি’’ ছাড়াও ভারতে পতিতাবৃত্তির ইতিহা’সে তিন রকমের পতিতাবৃত্তির নাম পাল্লা যায়।

১। ব্যক্তি সুলে—কোনাে ব্যক্তির রক্ষিতা উপপত্নী। অ’ষ্টা’দশ শতকের বি’দেশী বণিকর উপপত্নী প্রথাকে খুবই ব্যাপক করে দিয়ে ছিল। পতুগীজ, ফরাসী, ইংরেজ সকলেই স্থানীয় মেয়েদের উপপত্নী হিসেবে বাড়িতে রাখতে। এদের সন্তান-সন্ততিরা বর্তমা’নে ভারতীয় জাতিবি’ন্যাসে একটা’ বড়ো অ’ংশ। এদেরই দেখাদেখি স্থানীয় ধনী ব্যক্তিরা উপপত্নী গ্রহণ শুরু করে। বর্তমা’নে অ’বশ্য পরিবারভুক্ত উপপত্নী কম দেখা যায়।
২। সমা’জ সুলে—একটা’ সুনির্দিষ্ট পল্লীবাসিনী পতিতা। সর্বশ্রেণীর মা’নুষেরই তারা ভােগ্য।
৩। দেবদাসী-মন্দিরের পৃষ্ঠপোষকতায় এক বি’শেষ ধরনের বারবনিতা। সমা’জসলেদের সঙ্গে এদের প্রধান প্রভেদ হলো এই যে, এদের উপর সামা’জিক কলক আরােপিত হয় না। ব্যাপারটি নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পূর্ণ যৌন স্বাধীনতা যদি সমা’জে স্বীকৃত হয়, তবে তার একটা’ বি’শেষ মূল্য আছে। দেবদাসী প্রথার মূল্য সেখানেই। তবু এই দেবদাসীদের জীবন স্বাভাবি’ক নয় বলেই এই প্রথা নারীচেতনার উপর অ’ত্যাচার বলেই স্বীকৃত।

দেবদাসী সংগ্রহ ও সমা’জ-বি’ন্যাস

…মহা’রাষ্ট্রের ও কর্ণাটকের শিল্পসমৃ’দ্ধ অ’ঞ্চলের পতিতালয়গুলি’তে নিয়মিত ভাবে এই দেবদাসী সম্প্রদায় থেকে মেয়েদের পাঠানো হচ্ছে। কলকাতা, মা’দ্রাজ, দিল্লীও বাদ যাচ্ছে না। একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনা এর পশ্চাতে কাজ করে চলেছে। এই মেয়েরা ক্রমেই শহরের পতিতালয়গুলি’ ভরে তুলছে। আন্তর্জাতিক পণ্য হিসাবেও এরা ব্যবহৃত। মধ্যপ্রাচ্যের বহু অ’ঞ্চলে ভারতীয় শ্রমিকরা উপনিবেশ স্থাপন করেছে। তাদের এবং স্থানীয় নবধনিকবর্গের প্রয়ােজন মেটা’বার জন্য যে মেয়েরা ভারতবর্ষ থেকে চালান হয়ে যাচ্ছে তার একটি বড় অ’ংশ এই দেবদাসী সম্প্রদায়।

কুরুচিপূর্ণ যৌন-চিত্র ও যৌন-চলচ্চিত্রের একটা’ ঘৃণিত ব্যবসায় এই সমস্ত অ’ঞ্চল থেকে ভারতের পশ্চিমা’ঞ্চলে রীতিমত সার জমিয়েছে। কেরল অ’ঞ্চলের সমুদ্রবেলা কোভাল ও গােয়ার সমুদ্রবেলার ছােটবড় হা’েটেলে অ’াবৃত যৌনত্য ‘ক্যাবারে এখন প্রায় অ’ভাবি’ক ব্যাপার। এই ক্যাবারে আর্টিস্ট হিসাবে যে মেয়েরা নিযুত হয়, তাদের কাজ যৌন উদ্দীপনাময় নৃতপ্রদর্শন এবং সময়ে সময়ে বেশ্যাবৃত্তি। ধনদেবতা কুবেরের নব মন্দিরের এই নতুন দেবদাসীরা মহা’রাষ্ট্র, কর্ণাটক অ’ঞ্চলের বি’ভিন্ন গ্রাম থেকে সংগৃহীত।
দেবদাসী নিয়ােগের গৌণ কারণগুলি’র মধ্যে কতকগুলি’ হল নিম্নজাতীয়দের লােকাচার বা সংস্কারপ্রসূত।
প্রথমতঃ পরিবারে অ’নেকগুলি’ মেয়ে থাকলে অ’ন্ততঃ একটিকে দেবতার কাছে দিতে হবে, এটা’ প্রায় স্বতঃসিদ্ধ। এর জন্য মেয়েটির মা’-বাবাও বি’শেষ লখিত হন না। অ’বশ্য এর পিছনে একটা’ গুঢ় কারণ আছে। এতদঞ্চলে
মেয়েরা পৈতৃক সম্পত্তি বা বাড়ি ঘরের অ’ংশ পায়। মেয়ে দেবদাসী হলে সত্তি অ’ন্য পরিবারে না গিয়ে ঘরেই থাকে, তা ছাড়াও তার উপার্জনের ভাগও পরিবার পায়।
দ্বি’তীয়ত, কোনো দম্পতি সন্তানহীন হ’লে মা’নত করে প্রথম কন্যা সন্তানটিকে দেবতার কাছে উৎসর্গ করা ছিল প্রাচীন রীতি। সাত-আট বছর বয়সেই মধ্যেই তাকে উৎসর্গ করতে হতো।
তৃতীয়তঃ, এবং সবচেয়ে উল্লেখযােগ্য কারণ হ’ল দেবদাসী হিসাবে উৎসর্গীকৃত কন্যা পরিবারে পুত্রসন্তানের মর্যাদা পেয়ে থাকে। দেবদাসী উৎসর্গের সময় নিয়ম অ’নুযায়ী অ’ন্ততঃ পাঁচজন জোগতি’কে আহ্বান করতে হয়। তাদের ভিক্ষাপাত্রে যথেষ্ট টা’কা পয়সা ইত্যাদি ও অ’ন্যান্য উপহা’রদ্ৰব্য দেওয়া হয়, যা ঐ দেবদাসীর পরিবারের প্রাপ্য। সুe:ং স্বভাবতই দরিদ্র হরিজনদের উপর এই প্রথার প্রভাব ব্যাপক হতে বাধ্য।
পতিতাবৃত্তিলব্ধ অ’র্থ পরিবার প্রতিপনের কাজে লাগে বলে সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটিকে দেবদাসীর জন্যে বেছে নেওয়া হয়, যাতে যৌবনে সে যথেষ্ট আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
অ’বশ্য যে মেয়ের পাত্র জোটে না শারীরিক কোনাে তুটির ফলে, সে দেবদাসী হিসাবে উৎসর্গীকৃত হয়। অ’থবা কোনো দুরারােগ্য রােগের আরোগ্য কামনা করেও কন্যা-উৎসর্গ করা হয় দেবী মন্দিরে। এগুলি’র নানা চেহা’রা ভারতের নানা জায়গায়। কোথাও মা’নতের জট কামা’নাে হয়, কোথাও বা নাক বা কানে ফুটো করে দেওয়া হয়। কিন্তু কন্যা-উৎসর্গের এই প্রথাটি এতদঞ্চলের বৈশিষ্ট্য।

এ ছাড়াও কতকগুলি’ সংস্কার চালু আছে। শুকনো কূপে জল আমা’র জন্য দেবদাসী মা’নত করা হয়। আকস্মিক ভাবে মা’থার চুলে জট পড়লে সেট। দেবতার প্রত্যক্ষ ইঙ্গিত বলে বি’বেচনা করা হয়, ও জট যার মা’থায় পড়েছে, সেই বালি’কাটিকে দেবদাসী হিসাবে উৎসর্গ করা হয়।

এই সংস্কারগুলি’কে আরো বেশি বন্ধমূল করে তােলার পিছনে কিছু প্রয়াস থাকে। হঠাৎই চুলে জট পড়ে না, মা’ঝে মা’ঝে চিটচিটে পদার্থ (মধু, হলুদ জল) চুলে লাগিয়ে দেওয়া হয়। পিতামা’তা নিজেদের স্বার্থেই এই কাজ করেন। কারণ, বালি’কাটি দেবদাসী হলে তাদের লাভ দুই ভাবে। সম্পত্তি বাড়িতেই রইল, উপরন্তু দেবদাসীর প্রাপ্যও ভােগ করার অ’ধিকার রইল। গ্রামের প্রধান ব্যক্তির সহা’য়তাও লাভ করা গেল। একটি মেয়ের শরীরের বি’নিময়ে এতখানি লাভের আশা ছাড়া কঠিন।
পুরােহিত ও পণ্ডিতের এ প্রথাকে সমর্থন করে চলেছেন প্রায় প্রকাশ্যেই। কারণ, তাদের আর্থিক প্রাপ্যও এই উৎসর্গের মা’ধ্যমে যথেষ্ট। দেবদাসীর উপার্জনের একটা’ অ’ংশ নিয়মিত ভাবে এরা পান। তা ছাড়া ধর্মের আবরণে একাজ চালি’য়ে যেতে পারলে আইন নাগাল পায় না।
বেলগাও জেলায় তামা’ক উৎপাদন কেন্দ্র নিপানীতে শ্রমিক হিসাবে নিযুক্ত লােকের সংখ্যা ২০০০। এর মধ্যে একটা’ বড় অ’ংশ মেয়েরা। এদের মধ্যে
অ’ধিকাংশই হরিজন। এই অ’ঞ্চলটি প্রধানতঃ বােয্যই বাজারে পতিত সরবরাহের কেন্দ্রস্বরূপ। এই শহরের ৮০০ জন পতিতার মধ্যে ২০০ জনই দেবদাসী। এখানে নিম্নশ্রেণীর মেয়েরা তামা’কের কারখানায় কাজ করে। মেয়ে শ্রমিক যারা কারখানায় কাজ করে, তারা দৈনিক পাঁচ টা’কা হা’রে মজুরী পায়। রাত্রে তারাই আবার বেশ্যাবৃত্তি করে। দৈনিক দশ টা’কা হিসাবে তারা গড়ে উপার্জন করে।
বেলগাও জেলারই আঠানী বােম্বাই পতিতালয়ের নারী সরবরাহের আর একটি কেন্দ্র। তেরাদল-মা’ঙ্গসুলী-আঠানী, তিনটি অ’ঞ্চল এক ত্রিভুজাকৃতি ভৌগােলি’ক অ’ঞ্চল তৈরী করেছে। বেশ্যা চালানকেন্দ্র হিসাবে এই অ’ঞ্চলগুলি’ প্রসিদ্ধ।
আঠানীর লােকসংখ্যা ৩০,০০০। তার মধ্যে ৫০০০ হরিজন। ৫০০ পরিবারে এরা বি’ভক্ত। এই হরিজনদের মধ্যে শতকরা ৯৮টি পরিবারই পতিতাবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত। প্রতিটি পরিবারের অ’ন্তত তিনটি মেয়ে এই বৃত্তিতে নিযুক্ত। পতিতাদের মা’েট সংখ্যা প্রায় ১০০০। এই সংখ্যায় অ’ন্য সম্প্রদায়ভুক্ত পতিতাদের ধরা হয় নি। আঠানীর লােকসংখ্যা অ’নুযায়ী পতিতাবৃত্তিতে নিযুক্তদের হা’র অ’নেক বেশী।

হোনুসনুর জেলা দেবদাসী ও সাধারণ পতিতা সম্প্রদায়ের জন্য বি’খ্যাত। উত্তর কর্ণাটকের বি’ভিন্ন নাটকের দলে এখান থেকে মেয়ে সংগ্রহ করা হয় নৃত্যগীত ও অ’ভিনয়ের জন্য। গদাগ (Gadag) ও হা’ভেরি প্রভৃতি অ’ঞ্চলে অ’ভিনয় শিল্পের জন্য এই অ’ঞ্চলের মেয়েদেরই বেশী পছন্দ করা হয়।
এই সমস্ত অ’ঞ্চলগুলি’র অ’ধিকাংশ হরিজন সম্প্রদায়ের মধ্যে এই বেশ্যাবৃত্তির হা’র ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ার কয়েকটি কারণ আছে। প্রথমত—মহা’রাষ্ট্রের সীমা’ন্তবর্তী অ’ঞ্চল বলে, এবং বােম্বাই বাজারের কাছাকাছি বলে এই অ’ঞ্চলে মেয়ে চালানী ব্যবসায়ের সুবি’ধা অ’নেক বেশি।
দ্বি’তীয়ত-এতদঞ্চলের মেয়েদের স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্যের খ্যাতি।
তৃতীয়ত-গ্রামা’ঞ্চলে উচ্চবর্ণের অ’ত্যাচার ক্রমশঃ বেড়ে চলায় হরিজন। পতিতারা নগরপ্রান্তে আশ্রয় নিচ্ছে।
চতুর্থত-হরিজন যুবকদের কর্মসংস্থানের যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় পরিবারের মেয়েরা পতিতা বৃত্তি গ্রহণে বাধ্য হয়েছে।
দেবদাসী-উৎসর্গ প্রথার নিয়মা’বলী অ’দ্ভুত। সচরাচর আট থেকে দশ বৎসর বয়সের বালি’কাদের এ প্রথায় উৎসর্গ করা হয়। অ’বশ্য বি’বাহিত মেয়েরাও আসে, আবার ১৭১৮ বৎসর বয়সের মেয়েরাও আসে উৎসর্গীকৃত হতে। তবে শিশুকালে উৎসর্গ করাই বি’ধি। জোগতি’ বা অ’বসর প্রাপ্ত দেবদাসীরা
কোনো এক উৎসবের সময় ‘ভর প্রাপ্ত হয় এবং কোনাে একটি বি’শেষ পরি বারের নাম করে, যার থেকে একটি মেয়েকে দেবদাসী করা হবে। এমন কি, কোন মেয়েটিকে নেওয়া হবে, তাও সে বলে দেয়। বেশ বােঝা যায়, ক্ষমতাশালী ও সমৃ’দ্ধ ব্যক্তিরা আগে থেকেই জোগতি’ কে এ সম্বন্ধে শিখিয়ে পড়িয়ে রাখেন।

যে সমস্ত অ’ঞ্চলে দেবদাসী প্রথার বি’রুদ্ধে জনমত বি’শেষ শক্তিশালী, সেখানে মেয়েটির আত্মীয়রা মেয়েটির গর্ভবতী হবার ব্যবস্থা করে। পরে তারা গ্রামের কর্তাদের কাছে দাবি’ জানায় যে, হয় তার বি’য়ের ব্যবস্থা করতে হবে, অ’থবা তাকে দেবদাসী হবার অ’নুমতি দিতে হবে। বলা বাহুল্য, এই বি’ষয়ে দায়ী লােকটি উচ্চবর্ণের, এবং বি’য়ের ব্যবস্থাও বেশ খরচ সাপেক্ষ। বরং দেবদাসী হবার অ’নুমতি দেওয়া সহজ, কারণ তার ফলে মেয়েটি কারাে ব্যক্তিগত সম্পত্তি না হয়ে সাধারণের ভােগ্যা হয়ে থাকবে।
দেবদাসী উৎসর্গ উৎসবের চেহা’রাটি প্রায় বি’বাহ উৎসবের মতো। এই উৎসর্গীকৃত মেয়েরা সচরাচর যৌবনারম্ভের পূর্বেই দীক্ষিত হয়। নির্দিষ্ট দিনে, (পূণিমা’ তিথিই প্রশস্ত বলে বি’বেচনা করা হয় ) হরিজন পল্লীতে অ’ন্য দেবদাসীরা উপস্থিত হয়। অ’ঙ্গে তৈললেপন করে ‘জোগতি’দের জন্য নির্দিষ্ট জগুলা বাভীতে (জোগতিদের কূপ) উৎসর্গ করার আগে ভাবী দেবদাসীকে স্নান করানো হয়। এই কৃপ যদি মন্দির প্রাঙ্গণে অ’বস্থিত হয় তবে তাকে সম্পূর্ণ বি’বস্ত্র হয়ে কেবলমা’ত্র নিমপাতার মা’লা ধারণ করে সেখানে যেতে হবে মা’ন করার জন্য। তারপর সমবেত দেবদাসীদের ভিক্ষাপাত্রে আহা’র্য পরিবেশন করতে হয়।
স্নানের পর নববস্ত্র পরিধান করে মন্দিরে যেতে হয়। পুরােহিত নির্দিষ্ট দক্ষিণার বি’নিময়ে দেবীর কাছে প্রার্থনা জানান। দেবতার পূজা নিবেদন করে প্রসাদমা’লস্বরুপ ‘তালী অ’থবা স্থানভেদে মঙ্গলসূত্র’ পুরােহিত নিজেই তাকে পরিয়ে দেন, অ’থবা তার হা’তে দেন। তখন সমগ্র পরিবার বাড়ি ফিরে আসে এবং পাঁচটি মুক্তাসদৃশ কাচের পুতি ঐ সূত্রে গেথে মেয়েটিকে পরিয়ে দেয়া হয়। এর পরে সমবেত মেয়েরা কন্যার মা’থায় অ’ক্ষত চাল ছুড়ে দিয়ে আশীবাদ করেন। বরের স্থান নেয় একটি ছোটো তরবারি। মন্দিরভেদে অ’নুষ্ঠানের বৈচিত্র্য বি’ভিন্ন।

এই সময়কার দৃশ্যটা’ এই, দূর-দূরান্তর থেকে দলে দলে যাত্রীরা আসছে। মা’ইলখানেক লম্বা গাড়ির সারি। সারি সারি নগ্নদেহ নিমপাতার মা’লা পরা ছােটো ছােটো মেয়ে দাড়িয়ে আছে উৎসগিত হবার জন্য, শুকনাে উপবাসখিন্ন মুখ, মা’ন করানন বলি’র ছাগশিশুর মতো! একবার দেবদাসী হয়ে গেলে তাদের বি’বাহ নিষিদ্ধ।

দেবদাসী-উৎসর্গ করা হয় ইয়েলেম্মা’র মন্দিরেই সবচেয়ে বেশি। তুলসী গেরির হনুমা’ন মন্দিরে, টিকেটা’র হনুমা’ন মন্দিরেও দেবদাসীদের উৎসর্গ করা হয়। এ ছাড়া জমদগ্নি মন্দিরে ও পরশুরামের মন্দিরেও দেবদাসী উৎসর্গ করা হয়। উৎসর্গের নিয়মা’বলী মা’েটা’মুটি একই, তবে হনুমা’ন মন্দিরে পুরোহিত দেবতার পূজা করে দেবদাসীর বাঁ হা’তে অ’থবা বা দিকের বুকে তপ্ত মুদ্রার ছাপ একে দেন।
এই উৎসর্গীকৃত দেবদাসীরা বয়ঃপ্রাপ্ত হলে স্থানীয় উচ্চশ্রেণীর লোকেরা যথােচিত (অ’র্থাৎ ১০০ টা’কা থেকে ৫০০ টা’কা) মূল্য দিয়ে তাদের সঙ্গে প্রথম সহবাসের সুযােগ পান।
এই দেবদাসী উৎসর্গ উৎসবটিকে অ’ত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে লক্ষ্য করে এবং তাতে অ’ংশগ্রহণ করে বােম্বাই অ’ঞ্চলের পতিতালয়ের মা’লি’করা, কর্ণাটকের
কৃতি প্রচার কেন্দ্রগুলি’, এবং বর্তমা’নে মধ্যপ্রাচ্যে মেয়ে কেনা-বেচার ব্যবসা যারা করে তারা। কারণ সহজেই অ’নুমেয়।
এই অ’ঞ্চলের মেয়েদের দেহসৌষ্ঠব, সৌন্দর্য ও নৃত্য-গীতবাদ্যে স্বাভাবি’ক পটুত্বের খ্যাতি আছে। সম্ভবত আদিলশাহী সাম্র জ্যের রাজধানী হিসাবে বি’জাপুরের সংস্কৃতি ও ভােগবি’লাসের ব্যাপক বি’স্তার এই মেয়েদের মধ্যে বহু যুগ ধরে প্রসারিত হয়ে এসেছে। হিন্দু-মুসলমা’ন নিবি’শেষে বারনারীরা তাদের নৃত্যগীত পটুত্বের ঐতিহ্য বজায় রেখেছে। ফলে একদিকে কর্মসংস্থানের সুযােগের অ’ভাবে ক্রমবর্ধমা’ন দারিদ্র্য, অ’পরদিকে মহা’নগরীর বি’লাসবহুল বর্ণাঢ্য জীবন যাত্রার হা’তছানি এই অ’ঞ্চলের মেয়েদের গভীর অ’ন্ধকারে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ।……..

Please follow and like us:

fb-share-icon

নতুন ভিডিও গল্প!


Tags: , , , , , ,

Comments are closed here.