বাংলা সাহিত্যে নারী সমকামিতা

December 23, 2020 | By Admin | Filed in: বিখ্যাত লেখকদের সাহিত্যে যৌনতা.

শঙ্করী মুখােপাধ্যায়

33638377-UY630-SR1200630-218x300
………যে দিন থেকে মানবসভ্যতা প্রজননকে গুরুত্ব দিতে শুরু করল, নারীর যৌনতাকে শৃঙ্খলিত করা হল প্রজননের ক্ষেত্রে সীমিত রেখে। বিবাহ-প্রথার মাধ্যমে নারীকে নির্দিষ্ট স্বামীর (পুরুষের) সম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হল। নারী নিজের সহজাত স্বাভাবিক যৌনসম্ভোগের স্বাধীনতা হারাল। সেই প্রাচীন প্রস্তরযুগের সমাপ্তির পর থেকে আজ অবধি চলে আসছে নারীর স্বাভাবিক যৌন কামনাকে বেঁধে রাখার ইতিহাস।

অথচ বৈষ্ণব ধর্ম বলে; “পুরুষসঙ্গী নির্বাচনের স্বাধীনতা চেয়েছিলেন রাধা। রাধা | ও গােপীদের শর্তেই পরিচালিত হত দেহ-মিলন। নারীর সেবা ও সুখবিধান ছিল এ মিলনের উদ্দেশ্য। নারীদেহের সুখবােধ সুখ-অনুভবের কেন্দ্র ও অঙ্গ ভিন্ন। নারীরা পুরুষকে শেখাত এই তত্ত্ব। দেহমিলনে বৈদিক স্বামীর অধিকার বা কর্তৃত্ব ছিল না। পুরুষের সন্তান উৎপাদনের বা জাত সন্তানের অধিকারও ছিল না পুরুষের। চৈতন্যলীলায় ব্যাস, বৃন্দাবন দাস ছিলেন শ্রীনিবাস পরিবারের বিধবা নারায়ণীর সন্তান, পিতা অজ্ঞাত।…পুরুষতন্ত্র নারীকে কামিনী ও কামের প্রতিমূর্তি বলে প্রচার করেছিল।” (অন্য এক রাধা, শক্তিনাথ ঝা) পুরুষতান্ত্রিক সমাজ পুরুষকে দিল অগাধ স্বাধীনতা। সেখানে রাধা হল প্রেমিকা অন্যদিকে তারা কৃষ্ণকে কাম স্বরূপ বললেন। কৃষ্ণলীলায় কাম ও বহুগামিতা পুরুষ-কৃষ্ণের বৈশিষ্ট্য ধার্য হল।……..

……..এ নিশ্চিন্ত নিঃশঙ্ক ভবন যে বহু ক্ষেত্রেই আরেক সমব্যাথী নারীর মনে হতে পারে, এতে আর সন্দেহ কোথায়। ষােড়শ শতাব্দীর কবি কর্ণপুর যাকে বলেছেন ‘মৈত্রী’ । এই মৈত্রীকে কর্ণপুর বলেছেন অসমপ্রয়ােগ বিষয়া রতি এবং স্পর্শ দিকোচিতা’। এই বিশ্লেষণে টীকাকার বিশ্বনাথ বলেছেন ‘স্ত্রীনাং পরস্পর যথেষ্ট স্পর্শাদি ব্যবহারে দোষ নাস্তি। তাই নারীতে-নারীতে হয়; যে গােপন কথা, সখ্যতা, প্রেম, ভালােবাসা। তাকে বিজ্ঞান নাম দিল ‘নারী সমকামিতা’।……

……..যেহেতু আমাদের আলােচ্য বিষয় হিসেবে আমরা নারী সমকামিতা, (লেসবিয়ানিজম) ক্ষেত্রকে বেছে নিয়েছি সেহেতু ইতিহাসের প্রথম সমকামী রমণী; গ্রিক মহিলা কবি ‘স্যাফো’ কে (জন্ম খ্রি: পূর্ব ৬৫০) আলােচনায় অগ্রগণ্য বলে মনে করি। তাঁর জন্ম ঈজিয়ান শহরের লেসবস দ্বীপে হয়েছিল। কবি স্যাফোর জন্মস্থান থেকেই ইংরেজি ভাষায় রচয়িত হয় একটি শব্দ; Lesbian; যার অর্থ ‘সমকামী স্ত্রীলােক এবং সমকামী স্ত্রী বলতে সমস্ত ভাষাতেই আজও লেসবিয়ান’ শব্দটির ব্যবহার হয়ে থাকে।…….

……বাৎস্যায়নের কামসূত্রে নারীকে ভােগ্যপণ্যের সাথে তুলনা করা হয়েছে। ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির মহাভারতে বলেছেন, গাভী যেমন নতুন-নতুন তৃণ ভক্ষণ করতে অভিলাষ করে, দ্রুপ নারীরাও নিত্যনতুন পুরুষের সঙ্গে সংসর্গ করতে বাসনা করে থাকে। ভীষ্মের কথায় নারীর মতাে কামােন্মত্ত আর কেউই নয়। কাষ্ঠরাশি দিয়ে যেমন অগ্নির, অসংখ্য নদীর দ্বারা যেমন সমুদ্রের ও সর্বভূত সংহার দ্বারা যেমন অন্তরের তৃপ্তি হয় না, নারী একটা সত্তা যাকে ব্যবহার করা হয় বিষয় হিসেবে, ফলে তার যৌনক্ষুধা অনেক ক্ষেত্রেই যা পুরুষের দেহে তৃপ্ত হয় না, অতৃপ্ত থেকে যায়।…….

……নারীই প্রাকৃতিকভাবে সুপ্ত সমকামী প্রবণতাসম্পন্ন। নারীদেহ নারীকে শঙ্কিত করে না; | তার বােন ও মায়ের সঙ্গে তার প্রায়ই একটা অন্তরঙ্গ পরিচয় হয়। যাতে অবচেতনে স্নেহ-ভালােবাসা সূক্ষ্মভাবে যৌন অনুভূতিতে রঞ্জিত হয়। মেয়েদের মধ্যে পারস্পরিক স্পর্শ ও ঘনিষ্ঠতা তা সাধারণভাবে তথাকথিত শালীনতাকে লঘন করে না। তাদের আদর-সােহাগে কোনও কুমারীত্ব নাশের ভয় থাকে না। যৌন ভেদকরণও থাকে না অথচ কৈশােরের যৌন উত্তেজনাকে তৃপ্ত করে।……

…….এ-ও দেখা গেছে যে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক শরীরবৃত্তিসম্পন্ন নারীতেও কখনও কখনও ‘ভগাঙ্কুর’ ও ‘যােনিগত কারণে প্রকৃতি-প্রভেদ হয়ে থাকে। যেহেতু দেখা গেছে যে শৈশবের যৌনকামনাই ‘ভগাঙ্কুর সম্বন্ধীয়। অতএব নির্দিষ্টভাবে বলা যায় না যে এই লক্ষণ পরিণত তরুণীর ক্ষেত্রে কোন দিকে বাঁক নেবে। যে ক্ষেত্রে এই ভগাঙ্কুরজনিত যৌনতাই নির্দিষ্ট থেকে যায়, সেখানে সমকামিতার সম্ভাবনাকে নির্দিষ্ট বলে ধরা হয়।..

….নারীর যৌনতা ও কামােত্তেজনামূলক সমস্যাগুলাে যেসব বিষয়ের ওপর নির্ভর করে, তার মধ্যে ভগাঙ্কুরজনিত যৌন সুখানুভূতি ও বয়ঃসন্ধিক্ষণে কিছু উত্তেজনা সঞ্চারক এলাকা (erogenous zone) শরীরের বিভিন্ন স্থানে বিকাশ লাভ করে যযানিদেশে সংবেদন সঞ্চারের সঙ্গে সঙ্গে।……..

……ফ্রয়েড এই নারীর ভগাঙ্কুরজনিত যৌনতাকে বলেছেন যে, নারীর যৌনসুখ পুরুষের মতােই কামশক্তি (libidi) আত্মরতির পর্যায়ের মধ্য দিয়েই বিষয়ভূত (objective) হয় পুরুষের অভিমুখে এবং ভগাঙ্কুর পর্যায়ের সুখানুভব থেকে যৌন পর্যায়ে পৌঁছায়। অতএব এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া বা যৌন বিবর্তনের পরিণতিতে না পৌছলে, শিশুসুলভ স্তরে থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং ভবিষ্যতে স্নায়ুবিকারের প্রবণতা বহন করে।………

নতুন ভিডিও গল্প!


Tags: , ,

Comments are closed here.