পড়ার বইয়ের বাইরে পড়া – শ্রীপান্থ

November 16, 2021 | By Admin | Filed in: বিখ্যাত লেখকদের সাহিত্যে যৌনতা.

আল ওস্তাদ

“ওদের রীতির মধ্যে একটি হচ্ছে যে, ওরা শরীরের কোন কেশ ছেদন করে না। অ’ত্যধিক গ্রীষ্মের জন্য ওরা এককালে উলঙ্গ থাকত, তখন কেশ দিয়ে সূর্যের তাপ থেকে মস্তক রক্ষা করত। গুল্ফের শােভা বর্ধনের জন্য ওরা তাতে তাও দেয়। জননেন্দ্রিয়ের লােম ওরা গরিষ্কার করে না; কারণ ওদের বি’শ্বাস তা করলে যৌন উত্তেজনা ও সঙ্গমেচ্ছা প্রবল হয়। সুতরাং যারা সঙ্গমেচ্ছা প্রবলভাবে অ’নুভব করে তারা সে ইচ্ছা হ্রাস করার জন্য জননেন্দ্রিয়ের লােম কর্তন করে না। ওরা নখ বড় রাখে আর তার অ’ব্যবহা’রে গর্ব বােধ করে। নখ দিয়ে ওরা কোন কাজ করে না। কেবল আলস্যভরে মস্তক কন্ডুয়ন করে, আর কেশের উকুন বাছে। ওরা প্রত্যেকে পৃথকভাবে গােয় লি’প্ত স্থানে বসে ভোজন করে; উচ্ছিষ্টের সদ্ব্যবহা’র করে না এবং ভােজন পাত্রগুলি’ মা’টির হলে সেগুলি’কে আহা’রের পর ফেলে দেয়। ভােজনের পর পান ও চুনের সাথে এক চর্বণ করে বলে ওদের দাত লাল। আহা’রের পূর্বে ওরা সুরা পান করে। হিন্দুরা গোমূত্র পান করে, কিন্তু গােমা’ংস খায় না। ওরা কাঠ দিয়ে করতাল বাজায়। পাগড়ীর বস্তুকে ওরা পাজামা’র মত ব্যবহা’র করে। যারা অ’ল্প পরিচ্ছদে সস্তুষ্ট থাকে তারা দুই অ’ঙ্গুলি’ পরিমা’ণ বস্ত্র দিয়ে শুধু তাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে, আর যারা অ’ধিক বস্ত্রের পক্ষপাতী তারা পাজামা’র (…) জন্য এত বস্ত্র ব্যবহা’র করে যে তা দিয়ে অ’নেকগুলি’ উত্তরীয় ও ঘােড়ার জিনের অ’ন্তর্বাস তৈরি করা চলে। এ পাজামা’র কোন ছিদ্র (opening) থাকে না। এবং এগুলি’ এত দীর্ঘ যে পায়ের পাল দেখা যায় না। এর বন্ধনটি (ইজারল) পিছনে থাকে। উপরের জামা’ও পাজামা’র মত পিঠের দিকে কাপড়ের বুটির সঙ্গে সুতা দিয়ে আটকান থাকে। স্ত্রীলােকের জামা’র কুর্তক নীচের দিকে, দক্ষিণে ও বামে চেরা থাকে। পায়ের সঙ্গে আটসাট করে ওরা পাদুকা পরে এবং তার অ’গ্রভাগ উপরের দিকে ঈষৎ উল্টা’ন থাকে। স্নান করার সময় ওরা প্রথমে পা ধােয়, পরে মুখ। স্ত্রী সহবাসের পূর্বে ওরা স্নান করে। দণ্ডায়মা’ন অ’বস্থায় স্বাক্ষশাখার মত পরম্পরকে জড়াজড়ি করে ওরা সহবাস করে।…”

বাবরের আত্মজীবনীর কোনও খুজে পাওয়া নতুন পাতা কি? না কি একালের, একালেরই নতুন কোনও নর্দমা’-পরিদর্শকের বি’বরণী। স্বভাব-নিন্দুক কোনও পরদেশি, ওয়াকিয়ানবি’শের ভারত-বৰ্ণনা বলেও সন্দেহ হতে পারে বইকী! কিন্তু যদি বলি’ এই বি’বরণ শুরু করার আগে খুঁত-ধরা ওই দর্শক বন্ধু ভাবে বি’স্তারিত ভুমিকাও রচনা করে নিয়েছিলেন, তা হলে হয়তাে থমকে দাড়াবেন অ’নেকেই। না দাড়িয়ে উপায় নেই। কারণ, পাঠকদের তিনি আগেই শুনিয়ে রেখেছিলেন তার বক্তব্য: একের চোখে যা অ’দ্ভুত ঠেকে অ’ন্যের কাছে কিন্তু তা স্বাভাবি’ক। সুতরাং চমকিত হওয়ার কিছু নেই। কেননা, যা কদাচিৎ ঘটে, কিংবা যা দেখার সুযােগ অ’ল্প দর্শকদের কাছে তাই অ’দ্ভুত। শুধু তাই নয়, এই প্রসঙ্গ শেষ করেছিলেন তিনি এমন কয়টি বাক্য দিয়ে নিন্দুক বা শত্রুর কাছ থেকে যা আশা করা যায় না। তিনি লি’খছেন—এই সব বি’কৃতির জন্য আমি অ’বশ্য হিন্দুদিগকে দোষ দিই না। আরবদেরও ওই রকম বহু কদাচার কুরীতি ছিল। তারা রজঃস্বলা ও গর্ভিণী স্ত্রীগমন করত, নিজ স্ত্রী বা কন্যার গর্ভে অ’ন্যব্যক্তির বা অ’তিথির সন্তানকে তারা নিজ সন্তান বলে গ্রহণ করত। তাদের পূজা পদ্ধতিতে হা’ত ও মুখ দিয়ে শীষ দেওয়া, এবং নােংরা ও মৃ’ত পশুর মা’ংস ভক্ষণ করার মতো কদর্যতার কথা না হয় বাদই দিলাম।…” সুতরাং, শেষ পর্যন্ত বুঝতে অ’সুবি’ধা হয় না, ভিন্ন পালকের পাখি বটে, তবু এ-চিড়িয়ার সুর অ’ন্যরকম। কর্কশ তাে অ’বশ্যই নয়। কড়া হয়তো। তবে মিঠেকড়া।।
এখনও যারা অ’নুমা’ন করতে পারেননি, তাঁদের অ’বগতির জন্য জানাই, এই ছত্রগুলাে আলবেরুণীর।

 

দেবদাসী

“আমা’দের দেশের লােকদের ধারণা যে, বেশ্যাবৃত্তিকে হিন্দুরা অ’বৈধ মনে করে না। যেমন মুসলমা’নেরা কাবুল জয় করার পর সেখানকার ‘ইশ্পাহবাদ’ (…) ইসলাম গ্রহণ করে শর্ত করেছিল যে তাকে গােমা’ংস ভক্ষণ ও পুরুষ অ’ভিগমন করতে যেন বাধ্য করা না হয়। হিন্দুদের সম্বন্ধে লােকদের এ ধারণা কিন্তু ভ্রান্ত। আসল ব্যাপার হচ্ছে যে, হিন্দুরা পরদারগমন বা যৌন ব্যভিচারের তেমন কঠিন শাস্তি দেয় না। প্রকৃ৩ দোষ কিন্তু হিন্দু জাতির নয়, তাদের রাজাদের। রাজাদের উৎসাহ না থাকলে ব্রাহ্মণ বা পুরােহিত কখনও কোনও নারীকে দেবালয়ে নৃত্য-গীত বা অ’ভিনয় করার অ’নুমতি দিত না। কিন্তু রাজারা এইসব নারীকে তাদের নগরের আকর্ষণ হিসাবে প্রজাদের চিত্তবি’নােদনের জন্য মন্দিরে স্থান দেয়। তাদের আসল উদ্দেশ’ অ’বশ্য রাজর্ষের অ’র্থ সংগ্রহ, এই সব বারাঙ্গণা পালন করে অ’র্থদণ্ড ও কর থেকে যা আয় হবে তা দিয়ে সৈন্যের ব্যয় নির্বাহ করা। বুয়ায়হিদ সুলতান আদুদওলা (Azuccluddoulah) ও তা-ই করেছিলেন তাঁর আর এক উদ্দেশ্যও ছিল: কামা’েন্মত্ত সৈন্যদের উৎপীড়ন থেকে গৃহস্থকে রক্ষা করা।”

 

নারীর স্তন: উত্থান ও পতন

“নারীর প্রাণের প্রেম মধুর কোমল,
বি’কশিত যৌবনের বসন্তসমীরে
কুসুমিত হয়ে ওই ফুটিছে বাহিরে,
সৌরভুসুধায় করে পরান পাগল।
মরমের কোমলতা তরঙ্গ তরল।
উথলি’ উঠেছে যেন হৃদয়ের তীরে।
কী যেন বাঁশির ডাকে জগতের প্রেমে
বাহিরিয়া আসিতেছে সলাজ হৃদয়,
সহসা আলোতে এসে গেছে যেন থেমে-
শরমে মরিতে চায় অ’ঞ্জল-আড়ালে।
প্রেমের সংগীত যেন বি’কশিয়া রয়,
উঠিছে পড়িছে ধীরে হৃদয়ের তালে।
হেরাে গাে কমলাসন জননী লক্ষ্মীর-
হেরাে নারীহৃদয়ের পবি’ত্র মন্দির।..”

স্তন, কড়ি ও কোমল, রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথ এই পবি’ত্ৰমন্দিরকে কবি’তার্টিতে অ’ন্য স্তরে উত্তীর্ণ করেছেন। মা’নবীর স্তনকে তিনি পবি’ত্ৰসুমেরু’, ‘দেবতাবি’হা’রভূমি কনক-অ’চল’, ‘পবি’ত্র দুটি বি’জন শিখর’ বলেই ক্ষান্ত হননি, বলেছেন এই স্তন ‘চিরস্নেহ-উৎসধারে অ’মৃ’ত-নির্ঝরে/সিক্ত করি তুলি’তেছে বি’শ্বের আধর।’ শেষ দুটি ছত্রে তার স্তন-বন্দনা- ‘ধরণীর মা’ঝে থাকি স্বর্গ আছে। চুমি,/ দেবশিশু মা’নবের ওই জন্মভূমি।’ এই কবি’তা অ’তএব শুধু বাসনাতাড়িত যৌবনের বন্দনা নয়, মা’তৃত্বেরও জয়গান। কিন্তু আমা’দের চার পাশে যে পৃথিবী, নিত্য আমরা সেখানে যে নারীকে দেখি তিনি কি এই কবি’তার প্রতিমা’? অ’বশ্যই নয়। তিনি লুব্ধ পুরুষের চোখে মূর্তিমা’ন কামনা-বাসনা যেন! ভারতীয় পুরাণের রতির মতাে তিনি কামদীপিকা। তাঁর অ’ন্য কোনও পরিচয় নেই, নিজের লজ্জাহীন দেহকে সর্বজনের সামনে তুলে ধরা ছাড়া অ’ন্য কোনও ভূমিকা নেই। দিকে দিকে চলেছে তথাকথিত সৌন্দর্য প্রতিযােগিতা। অ’ধুনা রূপের সঙ্গে নাকি বুদ্ধিও পরিমা’প করা হয়, কিন্তু লক্ষ করলেই বােঝা যায় এই রূপ অ’াসালে পরিমা’প করা হয় ফিতে দিয়ে, ইঞ্চি বা সেন্টিমিটা’রে। চলচ্চিত্রের নায়িকা, বি’জ্ঞাপনের মডেল, আদর্শ নারীশরীর নির্মা’ণের জন্য বি’ভিন্ন জিমনাসিয়াম, বি’উটি পার্লার থেকে শুরু করে অ’ন্তর্বাস, প্রসাধনী, শল্যশাস্ত্র— নারীদেহ আজ সর্বত্র এক পর্ণবি’শেষ। আর এই নব্য সৌন্দর্যতত্বে নারীর স্তন যেন এক যৌন-অ’লংকার, নারীত্বের সংজ্ঞায় এবং বি’বৃতিতে শ্রেষ্ঠ ভূষণ। সূতরাং, সর্বত্র তার প্রকাশ এবং সমা’দর।

দেখে দেখে মনে প্রশ্ন জাগে- নারীর স্তন কি এই বৈশ্যযুগে এখনও তার শরীরের অ’পরিহা’র্য অ’ংশ, তাঁর নিজস্ব অ’ঙ্গ। নারীর স্তন কি শিশুর নাকি কামকাতর পুরুষের সম্পত্তি? তা না হলে নারীর স্তন নিয়ে কেন এই নির্লজ্জ পুরুষালি’ খেলা? এমন অ’নেক পণ্যের বি’জ্ঞাপনেই রূপসী নারীর ছবি’ দেখা যায় যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরােক্ষভাবে নারীর কোনও সম্পর্ক নেই। আর সেই সব বি’জ্ঞাপনে রূপবত’র উওমা’ঙ্গ প্রায় সর্বক্ষেত্রেই বি’জ্ঞাপিত। স্তন কি তবে শিল্পী বা ভাস্করের ইচ্ছাধীন? কিংবা ফ্যাশন-বি’ধাতাদের? প্রশ্ন জাগে তবে কি স্তন নিয়ে কী করা হবে সেটা’ ধার্য করার অ’ধিকার নীতিবাগীশ, ধর্মবেত্তা আর মোল্লা-পুরােহিতদের? অ’ন্য নৈতিক প্রহরীর দলও রয়েছেন আসরে। তারা প্রয়ােজনে অ’শ্লীলতার কথা তুলে নারীর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেন। রয়েছেন শল্য চিকিৎসকদের দল, যারা পুরুষের নির্ধারিত নকশা-মা’ফিক নারীর স্তন পুননির্মা’ণ করেন, রয়েছেন পর্নোগ্রাফাররাও যাদের অ’ন্যতম পশরা নারীর এই অ’ঙ্গ। নানাভাবে তা তারা পরিবেশন করেন বইয়ে এবং পত্র-পত্রিকায়। বস্তুত আজকের দুনিয়ায় এই একবি’ংশ শতকে সংস্কৃত কবি’ যাকে বলেছেন হেমকুম্ভ, ধনতন্ত্রের এই সুবর্ণযুগে ঘটসদৃশ সেই নারীস্তন বােধহয় সর্বার্থেই পিতৃতন্ত্রের শাসন এবং অ’ন্তহীন লালসার এক অ’নন্য নিদর্শন।

স্বভাবতই নারী-স্তন নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বই প্রকাশিত হয়েছে শুনে প্রথমে দ্বি’ধাগ্রস্ত হয়েছিলাম। হয়তাে ইতিহা’সের নামে আবার হা’টে ছাড়া হচ্ছে এমন এক পশরা যা এ যুগের ওই বি’শেষ পণ্য আরও বেশি খদ্দেরকে প্রলুব্ধ করবে অ’সহা’য় নারীকে উদ্দাম যৌনতার সঙ্গী করতে, তাকে, তার নিজস্ব শরীরকে আরও অ’পমা’নে জর্জরিত করতে। তবু কৌতূহল দমন করতে পারিনি, লেখকের নামটি জানার পর। মনে পড়ল এই ভদ্রমহিলা আমা’র পরিচিত। পরিচিত মা’নে মা’রিলি’ন ইয়ালুম-এর লেখা একটি বই আমি পড়েছি। তার বি’ষয় ছিল ফরাসি বি’প্লবে নারী। বইটির নাম ‘ব্লাড সিস্টা’রস’/‘দ্য ফ্রেঞ্চ রেভলি’উশন ইন উইমেনস মেমরি’। ভদ্রমহিলা যদিও বি’প্লব সম্পর্কে উৎসাহী নন, কিন্তু বি’প্লবের সময়ে ফরাসি মেয়েরা যে অ’ভিজ্ঞতার কথা তাদের জার্নালে, ডায়েরিতে, চিঠিপত্রে রেখে গেছে নিষ্ঠা এবং সহা’নুভূতির সঙ্গে তা ভাষান্তরিত করে পরিবেশন করেছিলেন। মনে পড়ে তার জন্য ফরাসি সরকার তাঁকে বি’শেষভাবে সম্মা’নিতও করেছিলেন। আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড বি’শ্ববি’দ্যালয়ের উইমেন অ’্যান্ড জেন্ডার স্টা’ডিজ’-এ ‘সিনিয়ার ফেলাে’ নিশ্চয়ই ইতিহা’সের নামে নারীর উন্মুক্ত উত্তমা’ঙ্গের কোনও প্রদর্শনী সাজাননি এই গবেষক। সুতরাং, শেষ পর্যন্ত সাগ্রহে সংগ্রহ করতে হয় বইটিকে। প্রায় সাড়ে তিনশাে পৃষ্ঠার এই বি’শাল ও অ’সংখ্য দুষ্প্রাপ্য ছবি’তে বােঝাই বইটি আদ্যোপান্ত পড়ার পর নিঃসংকোচে স্বীকার করব, কদাচিৎ এমন একটি বই পড়ার সুযােগ পাওয়া যায়। আফসােস একটা’ই, বইটি পশ্চিমি দুনিয়ার চৌহদ্দিতেই যুগযুগান্তর ধরে পরিক্রমা’ করেছে। আমা’দের পূর্ব পৃথিবী সেখানে বলতে গেলে পুরােপুরি অ’স্তিত্বহীন, উহ্য। অ’থচ ভারতের ভাস্কর্য, চিত্রকলা, প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্য, সর্বত্র নারীর স্তন কতভাবেই না বর্ণিত ও বন্দিত। মেঘদূত’-এ কালি’দাসের নায়িকা বর্ণনার কথা মনে পড়ে,- ‘শ্রোণীভারাদলসগনা স্তোকনম্রা, স্তনভ্যাং/যা তএ স্যঃসযুবতি বি’ষয়ে দৃষ্টিরাদ্যেৰ ধাতুঃ।’ কুমা’রসম্ভব-এ আবার দেখি একই ভঙ্গিতে পার্বতীর রূপের বর্ণনা- ‘অ’ন্যোন্য মুৎপীড়য় দুপেলাক্ষ্যঃ স্তনদ্বয়ং পাণ্ডু তথা বৃদ্ধম। মধ্যে যথা শ্যামমুখ্য তস্য/ মঙ্গলসূত্রাপ্তপলাভাম।’ অ’র্থাৎ, শৈলসুতার পাণ্ডুবর্ণ স্তনদ্বয় উপমদর্ন করে সেইভাবে প্রবৃদ্ধ হয়েছিল যে, তার মধ্যে মৃ’ণালজাত সুক্ষ্মসুত্রও স্থান পেত না। সেই ঐতিহ্যর ধারাবাহিকতা পরবর্তী লেখক কবি’দের কল্পনাও। মা’ইকেলের তিলােত্তমা’র উক্তমা’ঙ্গর বর্ণনা— ‘দাড়িম্ব কলম্বে হৈল বি’ষম বি’বাদ,উভয়ে চাহিল আসি বাস করিবারে উরস-আনন্দ-বনে; সে বি’বাদ দেখি/দেবশিল্পী গড়িলেন মেরু শৃঙ্গাকার। কুচযোগ। ‘… ‘উর্বশী’ কবি’তায় রবীন্দ্রনাথ ‘তব স্তনহা’র হতে নভস্তলে খসি পড়ে তারা,অ’কস্মা’ৎ পুরুষের বক্ষমা’ঝে চিত্ত আত্মহা’রা;/ নাচে রক্তধারা।’ দৃষ্টা’ন্ত আর বাড়ানাের প্রয়োজন নেই’ ভারতীয় সাহিত্য-শিল্পে অ’সংখ্য দৃষ্টা’ন্ত এবং দৃষ্টিভঙ্গির বি’ভিন্নতার কথা ভাবলে মনে হয় না কি এমন একটি পূর্ণাঙ্গ ইতিবৃত্তে প্রাচ্য, বি’শেষ করে ভারতের অ’নুপস্থিতি একধরনের বঞ্চনা?

তবু যা পাওয়া গেল সে অ’বশ্যই সামা’ন্য প্রাপ্তি নয়। নারীর স্তনের পঁচিশ হা’জার বছরের ইতিহা’স, স্বভাবতই কাহিনী শুরু হচ্ছে প্রাগৈতিহা’সিক যুগ থেকে। প্রাচীন পৃথিবীতে নারী সামা’ন্য মা’নবী নন, দেবী। বৃক্ষের মতােই তিনি প্রাকৃতিক এক অ’স্তিত্ব। তিনি রহস্যময়। তিনি সৃষ্টির আদি, মা’নবের ধাত্রী। তার বুকে জীবনদায়ী অ’মৃ’তধারার উৎস। স্বভাবতই তার স্তন পবি’ত্র এবং পূজ্য। নারী এক দিকে যেমন উর্বরতার প্রতীক, অ’ন্য দিকে তেমনই মা’নবের ধাত্রী। সুতরাং প্রাচীন পৃথিবীর দেবীদের স্তন সম্ভ্রম ও শ্রদ্ধার উপলক্ষ। কৃষিকর্ম শুরু হওয়ার আগে ইউরােপের নানা অ’ঞ্চলে আগে যে নারী-প্রতিমা’র সন্ধান মিলেছে, তাদের স্তন শুধু অ’নাবৃত নয়, আজকের দর্শকের চোখে হয়তোবা ভীতিপ্রদ। ওঁরা কোনও পুরুষ দেবতার স্ত্রী বা সহচরী নন, এঁরা নিজেরাই ঈশ্বরী। তাদের স্তন শক্তির প্রতীক। ফলে ফ্রান্সের পর্বতগুহা’র দেওয়ালে স্তন বন্দিত। দশ হা’জার বছর পরে তুরস্কে দেখা যায় মৃ’ন্ময়ী স্তন সশ্রদ্ধায় পূঞ্জিত। লৌহযুগে পবি’ত্র পানপাত্র গড়া হয়েছে স্তনের আদলে। (একালে অ’বশ্য হলি’উডে এই বস্তু কখনও কখনও দেখা যায় যৌনতার প্রতীক হিসাবে, পুরুষের কামনার বার্তাবহ তৈজস হিসাবে।) শুধু দেবতা আইসিস নয়, প্রাচীন মিশরে নীলনদের দেবতা হা’পিও নারীর মতো স্তনধর। আদিম পৃথিবীর অ’ন্যত্রও স্তন নিয়ে কোনও লজ্জা বা সংস্কার নেই, স্তন দেবীর অ’ন্তর্নিহিত শক্তি এবং অ’তুলনীয় ঐশ্বর্যের প্রকাশ। অ’তএব, খ্রিস্টপূর্ব ১৫.১৬ শতকে ক্রিটে যদিও এক ধরনের স্কার্ট ও স্তনাংশুক ছিল তবু দেবীমুর্তির উধ্বাঙ্গ অ’নাবৃত। প্রাচীন গ্রিসেও দেখা যায় আর্টেমিস বহুস্তনে অ’লংকৃত। সুতরাং, নমস্য।

পরিস্থিতিতে পরিবর্তন ঘটে নারীকে স্থানচ্যুত করে বেদিতে পুরুষ দেবতাদের অ’ধিষ্ঠানের পর। নারীর এই ভাগপরিবর্তনের, পর্বটিকে লেখক বলেছেন—’রেইন অ’ব দ্য ফ্যালস।’ অ’র্থাৎ, প্রকৃতির বদলে পুরুষের যৌনাঙ্গের রাজত্ব। মা’উন্ট অ’লি’ম্পাসে প্রাচীন দেবী ওলি’ম্পিয়ার বদলে প্রতিষ্ঠিত হলেন জিউস। অ’তঃপর তিনিই দেবলােকে সর্বেসর্বা। তার স্ত্রী বা সঙ্গিনী হেরা যেন নর্মসহচরী মা’ত্র, একটি ভাস্কর্যে দেখা যায় তিনি হেরার স্তন ধরে আছেন। স্পষ্টতই স্তনমা’হা’ত্ম্য বি’লুপ্তির পথে। নারীর হা’তে বর্শা, মা’থায় শিরস্ত্রাণ, বুক আবৃত অ’লংকিত কঠিন বর্মে। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে প্রেমের দেবী আফরােড়াইট বা ভেনাস নগ্নিকা মা’ত্র। তিনি যেন দেহসর্বস্ব। ধ্রুপদী সাহিত্যের সঙ্গে তাল মিলি’য়ে শিল্পী তাকে গড়েছেন। তার বুক ‘আপেলের মতাে। ভেনাস যেন ক্রমে পরিণত একালে পশ্চিমে যাকে বলা হয় ‘পিনআপ’। কামদীপিকা ক্যালেন্ডার-সুন্দরী! খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে একটি ভেনাস প্রতিমূর্তিকে বলা হয় লজ্জাশীল ভেনাস’, তিনি এক হা’তে তার একটি সুপুষ্ট স্তন ধরে আছেন, অ’ন্য হা’তে ঢেকে রেখেছেন তাঁর যৌনাঙ্গ। এথেন্স-এর নারী খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের মধ্যেই পুরুষের বশ্যতা মেনে নিতে বাধ্য হন। তাদের শরীর আবৃত, মুখ ও মা’থায় ঘােমটা’ বা চাদর। আর, তাদের স্তন পুরুষের কামনার উপলক্ষ। ট্রয়ের যুদ্ধের পর হেলেন যখন ঘরে ফেরেন তখন তিনি নাকি স্বামী মেনেলাউস এর মুখোমুখি হওয়া মা’ত্র তার ‘আপেলতুল্য স্তন’ সামনে মেলে ধরেছিলেন। ক্রুদ্ধ স্বামীর হা’তের তলোয়ার খসে পড়েছিল মা’টিতে। এই দৃশ্যের পর স্ত্রীকে হত্যা করতে পারেননি তিনি ক্ষমা’ করেছিলেন। নারীর স্তনের আরাধনা, সন্দেহ কী, অ’ন্য মোড় নিয়েছে!

স্তনের প্রাচীন জাদুকরি মা’হা’ত্ম্যর রেশ তবু যেন থেকেই যায়। দেবরাজ জিউসের এক পুত্র ছিল। সে কোনও দেবী নয়, মর্তে মা’নবীর সন্তান। এই শিশু একদিন ঘুমন্ত দেবরাজপত্নী হেরার স্তন্য পান করছিল। হেরা হঠাৎ জেগে উঠে সরোষে তাকে বুক থেকে সরিয়ে দেন। তার বুকের এবং শিশুর মুখের দুধ ছড়িয়ে পড়ে আকাশে, সেই বি’ন্দু বি’ন্দু পীযূষেই রচিত হয় মিল্কি ওয়ে’— তারাপথ!

প্রসঙ্গত, আমা’জনদের কথাও উল্লেখযােগ্য। তারা বাস্তবে ছিলেন কি না প্রমা’ণ করা দুঃসাধ্য। খ্রিস্টপূর্ব অ’ষ্টম শতকে তাদের অ’স্তিত্বের কথা শােনা যায়। সন্তান (কন্যা সন্তান) লালনের জন্য তারা একটি স্তন রক্ষা করতেন, অ’ন্যটি বাদ দিতেন পুরুষের সঙ্গে লড়াইয়ে স্বচ্ছন্দে ধনুর্বাণ ব্যবহা’রের জন্য। একজন আধুনিক গবেষক আটশো তথ্যসুত্র যাচাই করে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন– নারী-পুরুষের প্রাধানাের জন্য যে লড়াই ওঁরা তারই প্রতীক। ‘আর্কেটা’ইপ অ’ব দা ব্যাটল অ’ব সেক্সেস’। উল্লেখ্য, আমা’জনদের হত্যা করা হত ‘বুকে আঘাত হেনে। খ্রিস্টপূর্ব অ’ষ্টম শতকে ধর্মবেত্তা ইজাকিয়েল পুরুষালি’ বি’ক্রমের জীবন্ত বি’গ্রহ যেন তার চোখে জেরুজালেম আর সামা’রিয়া এই দুই নগরী লাস্যময়ী নারীর দুই স্তন। মিশরের উপভােগ্য বারবনিতা তারা! অ’থচ ইহুদিদের কাছেও আদিতে নারীর স্তন ছিল কিন্তু পবি’ত্র, তারা এমনকী দেবগণেরও ধাত্রী’।

রােমেও দেখি প্রাচীন ধারণার প্রতিধ্বনি। অ’ন্য ধরনের স্তনমা’হা’ত্ম্য। খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকের কাহিনী। নিজের গর্ভধারিণী কারারুদ্ধ। তাঁর কাছে বাইরে থেকে খাদ্যদ্রব্য নিয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ। প্রহরীরা প্রত্যেক দর্শনার্থীকে পরীক্ষা করে দেখতেন। কন্যাকেও স্বভাবতই বাদ দেওয়া হয়নি। মা’কে দেখে কন্যা বি’চলি’ত। খাদ্যাভাবে তিনি রুগণ। মা’য়ের ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য কন্য তাকে স্তন্যদান করেন। সে-কাহিনী শেষ পর্যন্ত গােপন রইল না। এই অ’ভুতপুর্ব কাণ্ড দেখে কর্তৃপক্ষ মা’রে মুক্তি দিলেন। শুধু তাই নয়, মা’ এবং মেয়ের সারা জীবনের দায়িত্ব গ্রহণ করে রাষ্ট্র। এই ‘রােমা’ন দানশীলতা’ থেকেই, “ক্রিশ্চিয়ান চ্যারিটি’ বা খ্রিস্টা’নদের দানের মা’হা’ত্ম্যের ধারণার জন্ম। এই কন্যার স্মরণে নাকি এক মন্দিরও গড়া হয়। পরবর্তীকালে অ’বশ্য মা’য়ের বদলে কারাগারে বসানাে হয়েছে বাবাকে। স্পষ্টতই পবি’ত্র ঘটনাটিকে অ’ন্য, বি’কৃত রূপ দেওয়ার বাসনায়। শুধু যৌনতা নয়, অ’তঃপর তার সঙ্গে যুক্ত করা হয় অ’জাচারের কলঙ্ক।

বাইবেলে দেখা মেলে দু’জন মেরির। একজন মেরিমা’তা বা কুমা’রী মেরি, অ’না জন মেরি ম্যাগডালেন। প্রথম জন পবি’ত্রতার প্রতিমূর্তি। তিনি পুরুষের সাহচর্য ছাড়াই সন্তানের জননী। স্বয়ং ঈশ্বরপুত্র তার সন্তান। অ’থচ তার দেহ কলুষিত নয়। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে অ’তএব ‘নিউ টেস্টা’মেন্ট’-এর আহ্বান রক্তমা’ংসের দেহকে জয় করে। অ’ন্য মেরির পক্ষে সে-ধরনের মা’হা’ত্ম্য দাবি’ করা সম্ভব নয়। খ্রিস্টা’ন সাধক-সাধিকাদের কাছে আদর্শ কুমা’রী মা’ মেরি। তারা দেহের দাবি’কে দমন করতে বদ্ধপরিকর। সুতরাং প্রথম দিকের খ্রিস্টীয় ছবি’তে দেখা যায় নারীর উত্তমা’ঙ্গ পুরুষের মতো। লেখক বলেছেন স্তনের প্রাচীন পবি’ত্রতা আর নেই, খ্রিস্টীয় চিত্রকলায় স্তনহীনতাই পবি’ত্রতার অ’ভ্রান্ত লক্ষণ। একমা’ত্র পাপী মেয়েরাই স্তন প্রকাশ করেন। তার জন্য নরকে কী শাস্তি জুটত অ’নেক ছবি’তে তা দেখানাে হয়েছে। (এ-ধরনের ছবি’ ছাপাখানার যুগে আমা’দের দেশেও প্রচারিত হয়েছে।) দৈহিক কামনা-বাসনা ঘৃণ্য পাপ— আর তার অ’ন্যতম নিবাস স্তন। সুতরাং পাপী মেয়ে বাধ্য হচ্ছে শলাকাসহযােগে নিজের স্তন ছিন্নভিন্ন করতে। অ’ন্যদিকে শহিদ খ্রিস্টা’ন সাধিকারা যখন অ’ত্যাচারিত হয়েছেন, তখন ও মধাযুগের খ্রীস্টীয় চিত্রকলায় দেখানাে হয়েছে নৃশংসভাবে তাঁদের স্তন কেটে ফেলা হচ্ছে। এইসব সহিদ ক্যাথলি’ক ধর্মা’লম্বী মেয়েদের পূজ্য। তারা মা’য়ের পুষ্ট স্তনের জন্য আশীর্বাদ করেন। খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতক থেকে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত বেশকিছু অ’ত্যাচারিত শহিদ সন্ন্যাসিনী এভাবে সম্মা’নিত হয়েছেন। এইসব ছবি’ দেখে ফরাসি কবি’ পল ভ্যলেরি লি’খেছিলেন—‘প্লেজার অ’ব টর্চার’। অ’ত্যাচারী ও অ’ত্যাচারিতের আনন্দের অ’নুভূতি। লেখক মন্তব্য করেছেন এইসব ছবি’তে শিল্পীরা নারীর স্তনকে পরিণত করেছেন নিজেদের ধর্যকাম প্রবৃত্তিতে!

দর্শক পুরুষের কাছে নারীস্তনের আবেদন অ’ন্যভাবে স্বপ্রকাশ। সে আর-এক হেলেনের উপাখ্যান। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে গ্রিসে ফাইরিন নামে এক সুন্দরী গণিকা ছিলেন। তার প্রেমিকেরা তার বি’রুদ্ধে দেব-নিন্দার অ’ভিযােগ আনেন। রীতি অ’নুযায়ী মেয়েটি নিজের পক্ষে সওয়াল করার জন্য হা’ইপেরাইডস নামে এক বাগী বা উকিলকে নিয়োগ করেন। ফাইরিন যখন দেখলেন তার উকিল ঠিকমতাে যুক্তিতর্ক করতে পারছেন না, তখন তিনি তার উর্ধাঙ্গের আবরণ খুলে নিজেকে প্রকাশ করেন। বি’চারকরা যুগপৎ স্তম্ভিত ও অ’ভিভূত। তারা এই সুন্দরীকে বেকসুর মুক্তি দিয়ে দিলেন। তখন দেশে নতুন আইন তৈরি করা হয়, কোনও অ’ভিযুক্ত, তিনি পুরুষ বা নারী যা-ই হন-না-কেন, আদালতে তাদের গােপন অ’ঙ্গ প্রকাশ করতে পারবেন না।

এবার মা’ মেরির দিকে তাকানাে যাক। খ্রিস্টীয় ধর্মশাস্ত্র অ’নুসারে মা’নুষের আদি জননী ইভ। আবার তিনিই দায়ী মা’নুষের পতনের জন্য। কামনার তিনি আদি উৎস। যে নিষিদ্ধ ফলটি তিনি আদমের হা’তে তুলে দিয়েছিলেন সেটি আসলে আপেল। আর ‘আপেলের সঙ্গে স্তনের সাদৃশ্য তাে স্বপ্রকাশ। সুতরাং, মেরির ক্ষেত্রে স্তন বন্দিত হলেও ‘ইভের বেলায় তা নিন্দিত, পাপ ও পতনের নিমিত্ত । সুতরাং, খ্রিস্টা’নি শিল্পে প্রথম দিকে মা’ মেরির স্তন ছিল অ’প্রকাশ। মধ্যযুগে আঁকা সাফক-এর এক গির্জার দেওয়ালে যে মেরি-মূর্তি দেখা যায় তার উওমা’ঙ্গে আঁটোসাঁটো বডিস বা জামা’। অ’ন্যত্র দেখা যায় মেরিমা’তার স্তন বি’মুর্ত— চৌকো। কিন্তু ধীরে ধীরে দৃষ্টিভঙ্গি পালটা’তে শুরু করে। খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতকে টা’কানিতে আঁকা একটা’ ছবি’তে দেখা যায় মা’ মেরি শিশু যিশুকে স্তন্যদান করছেন। হয়তাে শত শত বছর আগেও কোথাও-না-কোথাও আঁকা হয়েছে স্তন্যদায়িনী মেরির প্রতিমা’, কিন্তু রেনেসাঁসের ইউরােপে তার চর্চা এমন বেড়ে যায় যে, ঐতিহা’সিক তার পিছনে কার্য-করণ সম্পর্ক নির্ণয়ের চেষ্টা’ না করে পারেন না। এতকাল মেরি ছিলেন বাইজেনটা’ই সম্রাজ্ঞীর মতাে। তার মুখমণ্ডলে স্বর্ণের আভা, আলােয় উদ্ভাসিত পট। তাকে ঘিরে স্বর্গের সাধক আর দেবদুতদের নম্র আনন্দ আবি’র্ভাব। সেই স্বর্গীয় রমণী প্রতিমা’ কেন শেষ পর্যন্ত মর্ত্যের নারীর ভূমিকায়— প্রশ্ন সেটা’ই।

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে গবেষক দুটি প্রাসঙ্গিক তথ্য স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। প্রথমত, সেই মধ্যযুগেই ইউরােপে ছিলেন মা’য়ের মতো ধাই-মা’ বা তথাকথিত ‘ওয়েট নার্স ‘রা! গরিব মা’য়েরা হয়তো নিজেদের সন্তান লালন করেন গােরুর দুধে। আর তাদের বুকের দুধে লালি’ত হয় সম্পন্নের সন্তান। কারণ ততদিনে মধ্যবি’ত্ত, উচ্চবি’ত্ত এবং অ’ভিজাতদের কাছে নারীর স্তন অ’ন্য মর্যাদা লাভ করেছে, এই অ’ঙ্গ যৌবন ও যৌনতার অ’ভিজ্ঞান। দ্বাদশ শতকের ফ্রান্সে নারীর সৌন্দর্য বি’লাসীদের মুখে অ’তএব অ’হরহ আপেলের উপমা’। তা ছাড়া আমা’দের সংস্কৃত বা বৈষ্ণসাহিত্যের মতাে নানা উপমা’র ছড়াছড়ি। দ্বি’তীয়ত, মধ্যযুগের অ’পরাহ্ণেই পরিবর্তি হতে থাকে নারী ও পুরুষের পােশাক। আগে বলতে গেলে দুই তরফেরই পােশ ছিল পায়ের গােড়ালি’ পর্যন্ত লম্বা একটা’ টিউনিক বা আলখাল্লা। কিন্তু চতুর্দশ শতকের প্রথম দিকে দেখা যায় পুরুষের পােশাক খাটো হয়ে উঠে এসেছে হা’ঁটু বরাবর, আর মেয়েদের পােশাক উর্ধাঙ্গে শুধু যে নেমে এসেছে তাই নয়, ফুটিয়ে তুলছে দেহের গড়ন; যাজক, পুরােহিত এবং নীতিবাগীশরা যথারীতি নিন্দাবাদে মুখর হয়েছিলেন, কিন্তু কালের হা’ওয়ায় সে-সব সুভাষিতালি’ ভেসে যায়। এল নারীদেহ উন্মা’েচনের যুগ। শুরু চতুর্দশ শতকে, কিন্তু পরবর্তী চারশাে বছর ধরে ইতালি’য়ান, ফরাসি, জার্মা’ন, ডাচ ছবি’তে ম্যাডোনার স্তন উন্মুক্ত। তার খােলা স্তনে শিশু যিশুর মুখ। কখনও শিশু নিরুত্তাপ, স্তনের সৌন্দর্য প্রদর্শনই মুখ্য। ছবি’তে প্রতিফলি’ত কমলালেবু, আপেল, ডালি’মের প্রতিরূপ। সাধারণ ইতালি’য়ান কি এই মা’তৃমূর্তি দেখে আহত, আতঙ্কে শিহরিত, না আবেগ উত্তেজনায় কম্পমা’ন? ইনি কি স্বর্গীয় জননী, না চিরচেনা ধাই-মা’? ১৩০০ সাল থেকে উচ্চকোটির মেয়েদের, মা’য়েদের স্তন যেন সংরক্ষিত পুরুষের আদর ও আমা’েদের জন্য। শিশুরা ধাই-মা’ নির্ভর। বলতে গেলে অ’নেক গরিবঘরের মা’য়েদের রােজগারের উপায় আপন স্তনের পীযুষ। যাজকেরা আধ্যাত্মিকতাকে প্রচার করতেন মনের পুষ্টি বলে। তবু সত্যকারের পুষ্টির জন্য মা’য়ের বুকের দুধের বি’কল্প কোথায়? ভক্ত খ্রিস্টা’নদের কাছে খ্রিস্টের রক্ত যেমন পবি’ত্র তেমনই পবি’ত্র মা’তৃদুগ্ধ। মধ্যযুগে অ’নেক গির্জায় সযত্নে সঞ্চিত থাকত মা’ মেরির বুকের দুধ! ভক্ত সেখান থেকে শ্রদ্ধাভরে হিন্দুর কাছে পবি’ত্র চরণামতের মতে দু’-চার ফোটা’ সংগ্রহ করে নিজেদের স্তনের দুধ বাড়াবার চেষ্টা’ করতেন। ষােড়শ শতকে এক প্রােটেস্ট্যান্ট যাজক প্রশ্ন তুলেছিলেন— কুমা’রী মা’তা গাভীর মতাে এমন দুধ সরবরাহ করে চলেছেন কেমন করে? তিনি সারা জীবন ধরে পৃথিবীকে লালন করে থাকলেও আমা’দের কাল পর্যন্ত সে-দুধের ভাণ্ডার গড়ে তােলা কি সম্ভব? কেমন করেই বা এতকাল ধরে সম্ভব হল তার সংরক্ষণ? এই বুজরুকি তবু চলেছিল অ’নেক কাল ধরে। সেইসঙ্গে চলেছিল আরও একটি অ’নুষ্ঠান। স্তন্যদায়িনী মেরিমূর্তির প্রতিমা’ এবং নানা ‘স্মা’রক’ ঘিরে পুজো ও প্রার্থনা। বুঝতে অ’সুবি’ধা নেই, উচ্চবর্গের স্তনের মতােই সাধারণ নারীর স্তন তৎকালে অ’তিশয় গুরুত্বপুর্ণ বলে বি’বেচিত। প্রথম দলের কাছে স্তন যদি নারীর অ’ঙ্গভূষণ, দ্বি’তীয় দলের কাছে তবে তা রুজিরােজগারের উপকরণ। সেদিনের গরিব স্তন্যদায়িনীর একটি গান ইংরেজিতে তর্জমা’ করলে তার বক্তব্য: ‘উইথ লটস অ’ব গুড ফাইন মিঙ্ক আওয়ার ব্রেস্টস আর ফুল।} টু অ’্যাভয়েড অ’ল সাসপিশান, লেট দ্য ডক্টরস সি ইট’ ইত্যাদি। এইসব স্তন্যদায়িনীর সঙ্গে নব্য মেরি, স্তন্যদায়িনী নগ্নিকা’ মেরির কি সম্পর্ক নেই? রেনেসাঁসের প্রথম একশাে বছর ধরে ফ্লোরেন্সের শিল্পীদের আঁকা ‘অ’সংখ্য মা’-মেরির প্রতিমা’ দেখে গবেষকরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, তৎকালের চিত্রকর এবং ভাস্করেরা অ’ধিকাংশই ছিলেন মধ্যবি’ত্ত ঘরের সন্তান। তারা মা’তৃস্তন্য থেকে বঞ্চিত, লালি’ত ‘ওয়েট-নার্স বা ধাই-মা’দের বুকের দুধে। এই স্তন্যদায়িনী মেরি তাদের স্বপ্নের ‘জননী, যাদের পরিপূর্ণ পীযুষভাণ্ড থেকে তাঁরা তাঁদের প্রাপ্য পাননি। এই মা’ তাদের পূর্ণ আকাঙ্খার প্রতিকৃতি, তাদের ‘ড্রিম মম’! তা ছাড়া চতুর্দশ শতকের ইটা’লি’র পরিবেশ-পরিস্থিতিও প্রভাবি’ত করেছে শিল্পীদের। ক্ষুধা, অ’পুষ্টি, মহা’মা’রির মধ্যে এই স্তনে আশ্বাস খুঁজেছিলেন হয়তাে সে-দিনের অ’সহা’য় মা’নুষ। তার ওপর নবাকালের নারীর নব-আঁটোসাঁটো পােশাক, জাগতিক অ’ভিজ্ঞতা, শিল্পে বাস্তবতার উদবােধন সব মিলি’য়েই এই নব মা’তৃমূর্তি। মেরির এই রূপান্তরের তথানির্ভর বি’স্তারিত আলোচনার পর লেখকের সিদ্ধান্ত— এই মেরি জন্মা’ন্তরে প্রাগৈতিহা’কি সেই মা’তৃস্বরূপিণী দেবীরই নবা অ’বতার। পার্থক্য শুধু এই, তিনি স্তন্যদান করেন শুধু আপন সন্তান যিশুকে। সেই সন্তান শুধু যে পুরুষ তা-ই নয়, মা’য়ের চেয়েও শক্তিধর। খ্রিস্ট না থাকলে মেরি হতেন অ’পরিচিত এক রমণী। তার প্রতিষ্ঠা অ’তএব সম্পূর্ণ পুরুষনির্ভর।

সেই শুরু। ক্রমে স্তন্যদায়িনী জননী মেরি দেখতে দেখতে পরিণত হলেন স্তনগৌরবে গরবি’নী সামা’ন্য রমণীতে। এই উন্মা’েচনের উদ্যোক্তা রাজা, আমির-ওমরাহ ও অ’ভিজাতবর্গ। ইতালি’তে যখন মা’তৃপ্রতিমা’ ম্যাডোনার ছড়াছড়ি, তার মা’েটা’মুটি একশাে বছর পরে ক্যানভাস আলাে করে আত্মপ্রকাশ, তথা আবরণহীন উত্তমা’ঙ্গ প্রকাশ করে আবি’র্ভূত হলেন অ’ন্য ম্যাডোনা। তাঁর সামনে একটি শিশু আছে বটে, কিন্তু মা’তৃদুগ্ধের জন্য তার কোনও ব্যাকুলতা নেই। নিঃস্পৃহ সেই শিশু স্বতন্ত্র একটি টুলে বসে আছে। নকল ম্যাডোনার একটি বুক সম্পূর্ণ অ’নাবৃত। ছবি’টি আসলে ফ্রান্সের রাজা সপ্তম চার্লসের রক্ষিতার। এ-প্রতিকৃতি পনেরাে শতকের দ্বি’তীয়ার্ধে আঁকা। লেখকের মন্তব্য পবি’ত্র স্তন পুননির্মা’ণ করছে সমা’জ, নিউ সােশ্যাল কনস্ট্রাকশান অ’ব দ্য ব্রেস্ট’। স্তনে তখন শিশুর অ’ধিকার নেই, গির্জার খবরদারি থেকে মুক্ত নারীর উত্তমঙ্গ, নারীর স্তনের উপর প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে পুরুষের, বি’শেষ করে ক্ষমতাবান পুরুষের আধিপত্য। নারীর এই অ’ঙ্গ তাদের কাছে বি’শেষভাবে কামা’েদ্দীপক। উল্লেখ করা প্রয়ােজন, মেয়েদের নতুন পােশাক, বুক-পিঠের অ’নেকখানি যাতে উন্মোচিত তা-ও দরকারি অ’বদান। রাজা সপ্তম চার্লসের মা’ নিজেই নাকি চালু করেছিলেন সেই ব্লাউজ। গির্জা অ’বশ্য আপত্তি তুলেছিল। যাজকরা এই অ’ঙ্গাভরণকে আখ্যা দিয়েছিলেন- নরকের প্রবেশদ্বার ‘দ্য গেটস অ’ব হেল’। আঁটোসাটো করসেট-এর ব্যবহা’রের বি’রুদ্ধেও আপত্তি তুলেছিলেন তারা। তার ব্যবহা’রের ফলে যেভাবে বুক ঠেলে ফাঁপিয়ে তােলা হয় এবং বুককে দর্শনীয় করা হয় তাকে তারা বলেছেন- পাপের প্রেরণাস্বরূপ। যেন মেছুনি বাজারে তার পশরা ফিরি করতে বের হয়েছেন!

ফ্রান্সের রাজা সপ্তম চার্লসের সমসাময়িক ইংল্যান্ডের রাজা সপ্তম হেনরি তার দরবারে মেয়েদের এই পােশাক পরা নিষিদ্ধ করেছিলেন। তাকে সমর্থন করেছিলেন দেশের নীতিবাগীশরাও। বস্তুত নারী ও পুরুষের পােশাক নিয়ন্ত্রণের জনা আইনও চালু করা হয়েছিল। তবু ইউরােপের নব্য-ফ্যাশনের ঢেউ আটকানো যায়নি।

ইউরােপের নানা দেশে চিত্রকলার মতাে সাহিত্যেও শুরু হয় নারীর উন্মা’েচিত স্তনের বন্দনা। মধ্যযুগের অ’ন্তকাল থেকে রেনেসাঁস পর্যন্ত নারী এক আদর্শ- ‘দে শুড় বি’ স্মল, হা’েয়াইট, রাউন্ড লাইক অ’্যাপেলস, ফার্ম অ’্যান্ড ওয়াইড অ’্যাপার্ট। ‘সংস্কৃত সাহিত্যের রূপের মা’ন যেভাবে নির্দিষ্ট হয়েছিল সেই ঢঙে নির্দিষ্ট হল আদর্শ রূপের সংজ্ঞা। শুধু স্তন নয়, নারীর সম্পূর্ণ দেহই পুরুষের চোখে পুনর্নির্মিত সেদিন। একজন ফরাসি কবি’ রূপবতীর কায়া-কল্পনা করে লি’খেছিলেন— ‘দোজ সুইট লি’টলশোল্ডারস, দোজ লং আর্মস অ’্যান্ড নিম্বল হ্যান্ডস, লি’টল ব্রেস্টস অ’্যান্ড ফ্লেশলি’ হিপ ইতালি’তে নারীদেহের অ’নুপুঙ্খ বর্ণনা। শুরু করেছিলেন কবি’ পেত্রার্ক, চতুর্দশ শতকের পর সে ধারা টেনে নিয়ে যান পরবর্তী কবি’ ও লেখকরা। রেনেসাঁসের ইউরোপে নারীর স্তন পরিণত হয় নব যৌন স্বাধীনতার বি’জ্ঞপ্তি হিসাবে। শিল্পী-সাহিত্যিকদের প্রশস্তি প্রভাবি’ত করে মেয়েদেরও। তারাও অ’নেকে গ্রহণ করেন প্রদর্শিকার ভূমিকা। গণিকারা উত্তমা’ঙ্গের পােশাক খুলে প্রকাশ্যে বের হয়ে আসেন। প্রাসাদে এবং অ’ভিজাতদের ঘরের দেওয়ালে রাজা-রানির প্রতিকৃতির পাশে ঠাই পেতে লাগে তাদের নগ্ন প্রতিকৃতি। তবে অ’ন্য পরিচয়ে। কেউ ফ্লোরা, কেউ ভেনাস, কেউ ডায়না। ভাস্কর্য এবং চিত্রে গ্রিক রােমা’ন দেবীর মতো নকল দেবী এইসব রূপােপঞ্জীবি’নী। তারা যেন কামদেবী। পুরুষের বাসনার প্রতিচ্ছবি’। রেনেসাঁসের নগ্নিকারী নারীর নতুন রূপের প্রতিবি’ম্ব। ওর স্তন মুখশ্রীরই অ’ংশ, অ’তএব চোখ মেলে উপভোগ করতে কোনও দোষ নেই। বস্তুত ষােড়শ শতকের ফ্রান্সে ‘ব্লাঁজ’ (Blazon) নামে এক কাব্যধারাই সুচিত হয়। নারীর রূপ তথা পায়ের নখ থেকে মা’থা পর্যন্ত অ’ঙ্গের অ’নুপুঙ্খ বর্ণনা করে। একটি পদে স্তনের বর্ণনা থেকে কয়টি ছত্র: ‘আ লি’টল বল অ’ব আইভরি, ইন দা মিডল অ’ব হুইচ সিটস আ স্ট্রবেরি অ’র চেরি!’ এই রূপ যে অ’ন্যভাবে পুরুষনির্ভর তাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন এক কবি’: ‘ফর এভরি রিজন, হা’পি ইজ হি’হু উইল ফিল ইউ উইথ মিল্ক !

রেনেসাঁস যুগের দুইজন মহিলার কথাও উল্লেখ করেছেন গবেষক যারা নিজেদের বুক নিয়ে কবি’তা লি’খেছেন। তারা দুজনই ষােড়শ শতকে লি’য়র মেয়ে। একজনের কাব্যে নব্য-প্লেটোনিক প্রেম। তিনি চান দেহের বাধাবম্বন থেকে আত্মা’র মুক্তি। কিন্তু শরীরকে, শরীরের দাবি’কে দমন করতে চাইলেও তার অ’স্তিত্ব অ’স্বীকার করতে পারেননি। অ’ন্যজনের কবি’তায় নিষ্ঠুর প্রেমের পীড়নের কথা অ’বেগের সঙ্গে উচ্চারিত। —আই লি’ভ, আই ডাই, আই অ’্যাম বার্নিং, আই অ’্যাম ড্রাউনিং। তার বুক, তার স্তন, তার হৃদয় প্রেমের যন্ত্রণা অ’ধীর, বি’ষাক্ত, প্রলি’ত, অ’ত্যাচারিত। রেনেসাঁসের ইতালি’ ও ফ্রান্সে নারীর স্তন প্রতিষ্ঠিত হয় এলি’ট বা উচ্চবর্গের সংস্কৃতির নব্য যৌনতার কেন্দ্রে : নারীর এই অ’ঙ্গ স্বয়ং কামদেবী যেন। অ’বশ্য তখনও ইউরােপের শতকরা নব্বই জন নারীই স্বাভাবি’ক জননী তথা স্তনাদায়িনী। রেনেসাঁস-পর্বেও ধাই-মা’ ছিলেন বটে, কিন্তু মেয়েদের মধ্যে গরিষ্ঠ অ’ংশই উচ্চবর্গের সন্তানকে স্তন্য দেওয়ার পাশাপাশি নিজেদের সন্তানদের লালন করতেন। শতকরা দশ ভাগ মেয়ে ছিলেন প্রদর্শিকা। তাদের স্তন সযত্নে রক্ষিত, সন্তান নয়, স্বামী অ’থবা প্রেমিকের জন্য। সাধারণ মেয়েরা এই বি’বি’য়ানার বি’শেষ উৎসাহী ছিলেন না। তারা শীত এবং লুব্ধ পুরুষের দৃষ্টি থেকে নিজেদের বাঁচাবার জন্য শরীর ঢেকে রাখতেন। তারা বুকের দুধ বি’ক্রি করতেন নিতান্তই আর্থিক প্রয়ােজনে।

উল্লেখ করা প্রয়ােজন এই রেনেসাঁস-পর্বেই দু’শাে থেকে তিনশাে বছরের মধ্যে ষাট হা’জার থেকে দেড় লক্ষ মেয়েকে ডাইনি হিসাবে পুড়িয়ে মা’রা হয়েছে ইউরােপে। ডাইনি চিহ্নিত করার একটি প্রক্রিয়া ছিল তার স্তন পরীক্ষা করা। পিন ফোটা’লে সে কষ্ট পাবে না, বাধা দেবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। আঘাতে আঘাতে তার বুক ক্ষতবি’ক্ষত করা হত বাড়তি স্তন-বৃন্ত সন্ধানের নামে চরম অ’সভ্যতা করা হত। এমনকী অ’ষ্টম হেনরির দুর্ভাগা স্ত্রী আনি বােলেনের বি’রুদ্ধে ব্যভিচার ছাড়াও অ’ভিযােগ ছিল একটি বাড়তি স্তনাঙ্কুর। মা’র্গারেট কিং নামে একজন গবেষককে উদ্ধৃত করে লেখক বল্লো পুরুষের মতাে নবজাগরণের শরিক হননি রেনেসাসের নারী : নবচেতনা তাদের জন্য নয়। তাদের স্বাধীনতা সীমা’বদ্ধ ছিল যৌনতায়। অ’ন্য দিকে ডাইনি হিসাবে অ’সংখ্য নারীকে পুড়িয়ে মা’রার ঘটনা প্রমা’ণ করে এই নিগ্রহ ছিল নারীর বি’রুদ্ধে তথাকথিমুক্ত পুরুষের যুদ্ধ’– ‘ট্যান্টা’মা’উন্ট টু আ ওয়র ওয়েজভ বাই মেন আপন উইমেন’স।

রেনেসাঁসে স্তনের সৌন্দর্য ঘিরে যে যৌনতা তা মূলত নব্য স্বাধীনতা বােধেরই এক প্রকাশ। ইহুদি-খ্রিস্টা’ন জগতে প্রথমবারে দেবতা নয়, মা’নুষই সব-কিছুর কেন্দ্রে। মা’নুষই সবকিছুর পরিমা’প। কোনও স্বর্গীয় অ’স্তিত্ব নয়, মা’নবসমা’জ সেদিন অ’র্জন করে নতুন মর্যাদা। শারীরিক আনন্দানুভূতি, শরীরের দাবি’ বি’শ্বমা’নবের অ’ধিকার হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে এই অ’ধিকার ছিল অ’বশ্য খণ্ডিত, নিতান্তই সীমা’বদ্ধ। শুধু তা-ই নয়, সেদিনের অ’ভিযাত্রী মা’নুষ, নব নব অ’ঞ্চলের আবি’ষ্কারকদের কাছে নারীদেহ ছিল নব যুগের প্রতীক। লেখক প্রসঙ্গত ক্রিস্টোফার কলম্বাসের ডায়েরির উল্লেখ করেছেন। ১৪৯৮ সালে দক্ষিণ আমেরিকার তটরেখার দিকে তাকিয়ে তিনি লি’খেছিলেন, যেন কোনও স্তনের বৃন্তু। কখনও বলেছেন তার চোখে ধরিত্রী পিয়ারশেপড মেয়েদের স্তনের মতো। লেখক মন্তব্য করেছেন— “রেনেসাঁস যুগে মেয়েরা সাক্ষাৎ প্রকৃতি। নতুন পৃথিবী, আমেরিকা তাদের কাছে কুমা’রী জমি, পুরুষের প্রতীক্ষায়। ‘ (স্মরণীয় ভারতে কৃষিক্ষেত্রের সঙ্গে নারীদেহের কল্পনা। লাঙ্গল থেকে লি’ঙ্গের ব্যবহা’র।) তাকে উন্মোচিত করতে হবে, কর্ষণ করতে হবে, মা’নুষের বি’জয়াভিযান যেন সেই লক্ষ্যে।

লক্ষণীয়, রেনেসাঁস-পর্বে ইতালি’ এবং ফ্রান্সের শিল্পী ও লেখকরা যেভাবে নারীস্তনের বদনা করেছেন, নারীর উর্ধাঙ্গকে পরিণত করেছেন যৌনতার প্রতীক, ইংলি’শ চ্যানেলের ওপারে প্রথম এলি’জাবেথের আমলে (১৫৫৮-১৬০৩) কিন্তু সেই উন্মা’দনা দেখা যায়নি। এলি’জাবেথের বাবা অ’ষ্টম হেনরির রাজত্বকালে যে যৌনতার বাড়াবাড়ি দেখা গেছে উচ্চবর্গের মধ্যে তার কন্যার শাসনকালে তা বহুলাংশে স্তিমিত। লেখক বলেছেন তার কারণ ভূমধ্যসাগরীয় অ’ঞ্চলের ইহুদি-খ্রিস্টা’ন ভাবধারার বদলে ইংল্যান্ডে তখন নর্ডিক-খ্রিস্টতন্ত্রের প্রভাব বেশি। ওই অ’ঞ্চলের মা’নুষের কাছে দৈহিক ভােগবাদ ছিল নিন্দনীয়, সুতরাং ত্যাজ্য প্রােটেস্ট্যান্ট ধর্ম এবং পিউরিটা’নদের অ’নুশাসনে যৌনতা ছিল বলতে গেলে অ’বদমিত। এলি’জাবেথ তাঁর রাজত্বের প্রথম পর্বেই চেষ্টা’ করেছেন কি পােশাকে, কি আচার-আচরণে সহজ সরল অ’নাড়ম্বর জীবনের আদর্শ জনমা’নসে প্রতিষ্ঠা করতে। অ’্যানি বােলেনের কন্যা এলি’জাবেথ সিংহা’সনে বসেন পচিশ বছর বয়সে। এই কুমা’রী-রানি যেন না-পুরুষ, না নারী। নারীর কোমলতায় তার আগ্রহ নেই, আবার পুরুষের কঠোরতাও তার নেই। হা’ত আর মুখখানা ছাড়া তার সর্বাঙ্গ আবৃত। স্প্যানিশদের আদলে এক বর্মের মতাে পােশাক পরতেন তিনি। তৎকালের উচ্চবর্গের ইংরেজ মেয়েদের কাছে করসেট অ’জানা ছিল না। বডিসও ছিল। অ’বশ্য সেটিকে বলা হত ‘বডি’ বা ‘আ পেয়ার অ’ব বডি। কিন্তু বর্মা’বৃত রানিকে দেখলে মনে হয় বুঝি-বা তিনি এক লৌহমা’নবী, ‘আয়রন লেডি’।

সত্যি বলতে কী, অ’নেকের মধ্যে সেদিন দেখা গেছে নারীর স্তন সম্পর্কে এক নঞর্থক মনােভঙ্গি। এলি’জাবেথের কালে অ’ধিকাংশ ইংরেজ শিশুই লালি’ত হত মা’য়ের দুধে। এমন নয় যে, ইংল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ডে ধাই-মা’ সম্পূর্ণ গরহা’জির ছিলেন। কিন্তু তারা একমা’ত্র বড়মা’নুষের সন্তানকেই লালন করার দায়িত্ব পেতেন। সম্পন্নদের ঘরে তারা ছিলেন ‘স্টেটা’স-সিম্বল’ বা নিজেদের অ’র্থকৌলীন্যের ঐ একটি স্মা’রক। কিন্তু সমা’জের অ’ন্য শ্রেণীর মধ্যে তাদের বি’শেষ কদর ছিল না। যাজকেরা ধাই-মা’ নিয়ােগ না করতে পরামর্শ দিতেন। তারা বাইবেলের একাধিক মা’য়ে উদাহরণ তুলে ধরে প্রচার করতেন। ফলে এমন দৃশ্যও সে দেশে দেখা গেছে যে জর্জ প্রথম জেমসের (১৫৬৬-১৬২৫) রানি অ’্যান ধাই-মা’দের সঙ্গে এক পংক্তিতে দাড়িয়ে আছেন!

কিন্তু শেষরক্ষা হল কই? ষােড়শ শতকের শেষ দিকে দেশে ছাপাখানা চালু হওয়ার পর কবি’-লেখকরা মহিলা-পাঠকদের কথাও মা’থায় রেখে কলম ধরেন। এলি’জাবেথের আমলে কবি’রা নারীর স্তনকে বন্দনার বদলে কখনও কখনও আক্রমণও করেছেন। শেক্সপিয়ার পর্যন্ত তার নায়কদের দিয়ে আঘাত হেনেছেন নারীর স্তনে। কিন্তু ক্রমে শুরু হয় ইউরােপের অ’ন্যান্য দেশের মতাে কুচ-যুগের বন্দনা, যদিও ইংল্যান্ডের চিত্রশিল্পে নগ্ন নারী সেদিন প্রায় অ’নুপস্থিত, কিন্তু সাহিত্যে তথা কাব্যে স্তনের কত না উপমা’। এক কবি’ লি’খেছেন- ‘হা’র পাপস আর সেন্টা’র অ’ব ডিলাইটহা’র ব্রেস্ট আর অ’র্বস অ’ব হেভেনলি’ ফ্রেম’। ইতালি’-ফ্রান্সের হা’ওয়া শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যায় ইংলি’শ চ্যানেলের ওপারে। এলি’জাবেথ নিজেও স্তন নিয়ে কবি’তা লি’খেছেন। কিন্তু সে উরসিজ জাগতিক কামনার বস্তু নয়, নারীর অ’ন্তরস্থিত হৃদয়ের আবেগের প্রকাশ মা’ত্র। শুধু তা-ই নয়, একটি কবি’তায় বেদনা ও অ’নুশােচনার আসন বুক। কিন্তু অ’ন্য কবি’র, এমনকী কোনও কোনও মহিলা তাদের কবি’তায় খােলাখুলি’ভাবে প্রকাশ করেছেন যৌনতা। বি’শেষত সপ্তদশ শতকের দুজন কবি’ নায়ক-নায়িকার আলি’ঙ্গন বর্ণনা করতে গিয়ে একজন লি’খেছেন— ‘হিজ প্যানটিং ব্রেস্ট, টু হা’র নাউ জয়েনড়”। (প্রতি অ’ঙ্গ লাগি কঁাদে প্রতি অ’ঙ্গ মা’ের।) আর-একজন লি’খেছেন তার প্রেমিকের রূপ তঁার ‘হা’র্ট’ বা হৃদয়কে উত্তাল করে তােলে প্রেমের দেবতার কাছে তার প্রার্থনা—তার শীতল জমা’ট-বাঁধা বুককে আমা’র মতাে তপ্ত করে দাও।’

এই পরিবেশে জননী-প্রতিমা’ কিন্তু পুরোপুরি হা’রিয়ে যায়নি সেদিনের ইংল্যান্ডে। লেখক জানাচ্ছেন সাসেক্স-এর একটি কবরখানায় রয়েছে একজন মহিলার সমা’ধি (১৬৫৮)। ছয়টি পুত্র এবং দুটি কন্যার জননী এই মহিলা ছিলেন আর্ল অ’ব ম্যাঞ্চেস্টা’রের স্ত্রী। তার স্মা’রকলি’পিতে অ’ন্যান্য পরিচয়ের সঙ্গে তৎকালের বানানে লেখা রয়েছে এই বাক্য, ‘সি নার্সড উইথ হা’র ওন ব্রেস্টস’।

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা প্রয়োজন তৎকালে নারীর মা’তৃরূপের যে-প্ৰকাশ যােড়শ-সপ্তদশ শতকের হল্যান্ডে দেখা গেছে ইউরােপে তার তুলনা খুঁজে পাওয়া ভার। লেখক ডাচ মেয়েদের স্তন বি’ষয়ক আলােচনার অ’ধ্যায়টির নাম দিয়েছেন— ‘দ্য ডােমেসিস্টক ব্রেস্ট, গার্হস্থ্য স্তন। ষােড়শ শতকের শেষ দিকে স্বতন্ত্র ডাচ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সে-দেশের গির্জা তাে বটেই, চিকিৎসক, ভাবুক সকলেই মা’য়ের বুকের দুধে শিশুপালনের জন্য ব্যাপক প্রচার চালি’য়েছেন। এমনকী মেয়েরা নিজেরাও। ফলে সমকালের ডাচ চিত্রকলায় স্তন্যদায়িনীর চিত্রের ছড়াছড়ি। নিজেদের ঘরে, গির্জায়, সর্বত্র তারা। এমনকী একজন ডাচেসও তার তিন সন্তানকে নিয়ে ছবি’ আঁকিয়েছেন শিল্পীকে দিয়ে। তার একটি স্তন খােলা। এ স্তন পবি’ত্র। পানশালা এবং আমেদকেন্দ্রে হয়তাে যৌনতাও দেখা যেত, কিন্তু অ’ন্যত্র, সর্বত্র নারী কল্যাণী পুরুষের হা’ত যখন তার বুকে, তখনও কামনার বদলে সেখানে যেন স্নেহস্পর্শ। ডাচ্ চিত্রশিল্প, সন্দেহ কী, তৎকালের ইউরােপে উজ্জল ব্যাতিক্রম।

নারীর স্তন আবার রাজনৈতিক অ’ভিজ্ঞানও বটে। অ’ষ্টা’দশ শতক থেকে তার সঙ্গে জাতীয়তার নিবি’ড় সম্পর্ক। অ’ষ্টা’দশ শতকে পঞ্চদশ লুইয়ের রাজত্বকালে (১৭১৫-৭৪) ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ডে চালু হয় স্তনের যৌনতাকরণের প্রক্রিয়া হিসাবে করসেট। স্ফীত উত্তমা’ঙ্গ একই সঙ্গে হয়ে ওঠে দর্শনীয় ও কামা’েৰ্দীপক। এই ক্ষীণকটি-পীনপয়ােধর মূর্তির বাসনা ক্রমে সঞ্চারিত হয় অ’ন্য শ্রেণীর মধ্যেও। সেইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে যায় ধাই মা’’দের কদর। অ’নেকেই প্রচার করেছেন তার বি’রুদ্ধে। অ’ষ্টা’দশ শতকের একজন সুইডিস বি’জ্ঞানী প্রথম মা’নুষকে আখ্যা দেন মা’ম্মা’লি’য়া। কেউ কেউ আপত্তি করেন। কারণ মেয়েদের মতাে পুরুষদের স্তন নেই। কিন্তু ম্যামা’ল’ বা ‘স্তন্যপায়ী শব্দটি শেষ পর্যন্ত থেকেই যায়। মা’তৃদুগ্ধের পক্ষে বি’শিষ্টদের সওয়াল অ’তএব পুরাে বি’ফলে যায়নি, মা’রি আঁতােয়াতে (Antoinett) নাকি মা’য়ের দুধকে উৎসাহিত করার জন্য বি’শিষ্ট কারুশিল্পীদের নিয়ে স্তনের মতাে একজোড়া চিনামা’টির পানপাত্র গড়িয়েছিলেন। কেউ কেউ বলেন- সেই পাত্র দুটি আসলে নিজের স্তনের প্রতিরূপ: (হেলেনের মতাে?)!

দরবারি রূপসীর স্তন নয়, ফরাসি বি’প্লবের সময়কার অ’নেক ছবি’তে স্তন্যদায়িনীর যে প্রতিকৃতি, তা সাধারণ নারীর। অ’ভিজাতদের স্তন ক্রূর, বি’ষভাণ্ড। সাধারণের স্তন পবি’ত্র, কারণ তা সন্তানকে লালন করে। এই স্তন সাধারণতন্ত্রের বার্তাবহ। লেখক বলছেন— নিজের সন্তানকে বুকের দুধে লালন বলতে গেলে একটি রাজনৈতিক ঘােষণা। পিতৃভুমিকে সেদিন কল্পনা করা হয় এমন এক জননীরূপে যিনি আপন সন্তানদের নিজের বুকের দুধে পুষ্টিদান করেন। এমনকী ফরাসি উপনিবেশের কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েরা স্তনাদায়িনী শ্বেতাঙ্গ বােনদের মতাে সম্মা’নিত। বি’প্লবের ছবি’তে নতুন প্রজাতন্ত্র কখনও কখনও এথেনার মতাে শিরস্ত্রাণে শােভিত, হা’তে তার বর্শা, একটি স্তন উন্মুক্ত। অ’গণিত ছবি’তে, ভাস্কর্যে, মেডেলে—স্তন পরিবর্তিত হয় জাতীয় বি’গ্রহে। অ’থচ বি’প্লব মেয়েদের অ’ধিকার মেনে নেয়নি। ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং ক্রীতদাসদেরও যে স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, দুঃখ, যন্ত্রণা এবং ত্যাগের বি’নিময়েও ফরাসি মেয়েরা তা পাননি। তারা যার জন্য লড়াই করেছেন সেই সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতার বৃত্তের বাইরে তাদের অ’বস্থান। কে জানে, ওই সব ছবি’, মুর্তি, প্রতীক সান্ত্বনা পুরস্কার কি না!

ফ্রান্সে উনিশ, এমনকী বি’শ শতকেও প্রজাতন্ত্রের প্রতীক হিসাবে দেখা গেছে বুক খােলা নারীপ্রতিমা’। ডেলাক্রোয়ার (Delacroix) পতাকাধারী বি’খ্যাত উন্মুক্তবক্ষ লি’বার্টি’ নামক নাটকীয় নারীমূর্তিটি অ’নেকেরই দেখা। সেটা’ কিন্তু ১৭৮৯ সলের ফরাসি বি’প্লবের কোনও বীরাঙ্গনার ছবি’ নয়, এটি আসলে ১৮৩০ সালের রক্তাক্ত অ’ভূত্থানের সময় আঁকা। এ-ছবি’ও, দর্শকরা জানেন, রাজনৈতিক, তাদের দৈহিক উত্তেজনা সৃষ্টির জন্য রচিত নয়। তারও একশাে বছর পরে, প্যারিসের মুক্তির পর জনপ্রিয় একজন ফরাসি গায়িকা হঠাৎ লাফিয়ে একটি গাড়িতে উঠে সেই ছবি’র নায়িকার মতাে তার বুক উন্মোচন করে গাইতে শুরু করেন ফ্রান্সের জাতীয় সংগীত। লেখকের বক্তব্য, লাইফ, টেকিং ইটস কিউ ফ্রম আর্ট, হ্যাভ নাে বেটা’র সিম্বল ফ্রম ফ্রিডম দ্যান দি অ’নফেটা’র ব্রেস্ট’। বাধাবন্ধহীন উন্মুক্ত স্তনের মতাে স্বাধীনতার প্রতীক আর কী হতে পারে!

১৮৫০ সাল নাগাদ ফরাসি প্রজাতন্ত্রের প্রতীক হন— ‘মা’রিয়ানি’ (Marianne)। যুবতীর মতাে মুখ তার, বুক খােলা, মা’থায় টুপি। এই নারীর অ’সংখ্য ছবি’ আঁকা হয়, মূর্তি গড়া হয়। সৌন্দর্য, সাহস, শক্তি, চরিত্রবল ফরাসি চরিত্রের গরিমা’য় গরবি’নী এই কন্যা। অ’ন্য দেশেও জাতীয় চরিত্রের প্রতীক হয়েছেন নারী। ব্রিটেনে ব্রিটা’নিকা, জার্মা’নিতে — জার্মা’নিয়া, আমেরিকায় কলম্বি’য়া। কিন্তু তাদের উওমা’ঙ্গ আবৃত, ফ্রান্সই একমা’ত্র দেশ যেখানে তাদের জাতীয় প্রতিমা’র স্তন খোলা।

ইতিমধ্যে ইউরােপে মেয়েদের পােশাকে রকমা’রি পরিবর্তন ঘটে গেছে। মা’ ও ধাই-মা’’র দুধ নিয়ে বি’তর্ক নব নব মা’েড় নিয়েছে। সে-প্রসঙ্গ বাদ দিচ্ছি। রাজনৈতিক স্তনের কাহিনীই বরং শােনা যাক। অ’বশ্য মা’তৃস্তনেও রাজনীতি ছিল। প্রজা বৃদ্ধি, জাতির জন্য সুস্থ সন্তান, শ্রমশক্তির উৎপাদন, স্তনের রাষ্ট্রীয় ও সামা’জিক ভূমিকাও ছিল বটে। আপাতত যে স্তন সরাসরি জাতীয় রাজনীতির সেবায় নিযুক্ত তার কথা। প্রথম মহা’যুদ্ধের ফরাসি পােস্টা’রে জাতীয়তার সেই প্রতীক ফরাসি রমণীমূর্তি মা’রিয়ানিকে দেখা গেল প্রুশিয়ান ঈগলকে প্রতিহত করতে নাগরিক যুদ্ধের ঋণপত্র কিনতে আবেদন করছেন। এর উওমা’ঙ্গ অ’নাবৃত। অ’ন্যান্য যুদ্ধ-সংক্রান্ত পােস্টা’রে তিনি আরও খােলামেলা। ১৭৮৯-এর বি’প্লবের দিনগুলি’ বুঝি বা ফিরে এসেছিল সেদিন। জার্মা’নরা অ’বশ্য এইসব ছবি’কে প্রচার করে ফরাসিদের সাংস্কৃতিক অ’বক্ষয়ে দৃষ্টা’ন্ত হিসাবে। তাদের যুদ্ধ-উদযােগে যুবতী মেয়েদের ছবি’র অ’ভাব ছিল না। কিন্তু তারা নতদৃষ্টি, তাদের পুষ্ট দেহ আবৃত। আমেরিকানরা তাদের পােস্টা’রে জার্মা’ননের চিত্রিত করে বন্য গেরিলার মতাে, তার রােমশ পুরুষ হা’তে একটি উলঙ্গপ্রায় মেয়ে! ছবি’র নিচে উচ্চকণ্ঠে আহ্বান ডেস্ট্রয় দিস ম্যাড় ব্রুট! বাইশ বছর পরে দ্বি’তীয় মহা’যুদ্ধের সময় গােয়েবলস এই ছবি’টিই পুনর্মুদ্রণ করে নাতসিদের রণবাদ্যকে আরও উচ্চকিত করেন। জার্মা’নদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় আমেরিকানরা অ’তীতে কীভাবে এই গর্বি’ত জাতিকে অ’পমা’ন করেছিল। নাে সেকেন্ড টা’ইম!!!’, তাঁর হুংকার। যুদ্ধে আমেরিকানরা তাদের ‘মিস লি’বার্টি’কে বলতে গেলে নগ্নিকা হিসাবে চিত্রিত করেছিল।
বক্তব্য ছিল: “তােমরাই ভরসা, জাতির সম্মা’নকে রক্ষা করাে!’ ব্রিটেন, ইতালি’, রাশিয়া, যুদ্ধকালে সকলেই নারী-প্রতিমা’ ব্যবহা’র করেছে। কিন্তু ব্রিটা’নিকা বর্মা’বৃত। ইতালি’ পীনােত মেয়েদের এমনভাবে বি’জ্ঞাপনে ব্যবহা’র করেছে যেন তারা শক্তির মতো যৌনতারও বি’জ্ঞাপন। রাশিয়ান মেয়েদের কথা অ’বশ্য স্বতন্ত্র। একমা’ত্র রুশ মেয়েরাই সেদিন অ’স্ত্রধারী। ১৯১৫ সালে জার্মা’ন হা’নাদারদের বি’রুদ্ধে লড়াইয়ে তারা অ’ংশ নিয়েছেন, উত্তর রণাঙ্গনে মেয়েদের একটি ব্যাটেলি’য়ান পর্যন্ত সক্রিয় ছিল। নভেম্বর বি’প্লবের দিনগুলােতে বলশেভিকরা নিজেদের প্রচারে এই নতুন নারীর কথা সগর্বে বি’শ্ব-মা’নুষের গােচরে এনেছেন। তারই মধ্যে কিন্তু কোনও কোনও কাগজে তাদের নিয়ে আদিরসাত্মক কার্টুন ছাপা হয়েছিল।

দ্বি’তীয় মহা’যুদ্ধে আমেরিকায় যুদ্ধোদ্যোগে মেয়েদের নানাভাবে কাজে লাগানো হয়। সৈন্যদের সেবা থেকে আনন্দদান এবং আরও নানা ভূমিকায়। আর নগ্নতা? তা দেখা যায় বােমা’রু বি’মা’নের মুখপাতের ছবি’তে, যার তলায় সতর্কবাণী— ‘ফ্লাইটলি’ ডেনজারাস’! কিংবা মুক্তদেহী নারীকে বলা হয়েছে—‘মিস লেইড’! তা ছাড়া লক্ষ লক্ষ ‘পিন-আপ’ ঝকঝকে কাগজে ছাপিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে রণাঙ্গনে সৈন্যদের উৎসাহিত করার জন্য। নামী আলােকচিত্রীদের সহযােগিতায় অ’ভিনেত্রীদের পীনপয়োধর এবং লাস্য ও হা’স্যময় দেহবল্লরী ক্যামেরাবন্দি করে পাঠানাে হয়েছে ছেলের জন্য, ‘ফর আওয়ার বয়েজ’! ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে শুধু এস্কোয়ামা’গাজিন থেকে সুন্দরী পিন-আপ’দের যাট লক্ষ ছবি’ পুনর্মুদ্রণ করে দেশে দেশে বি’লি’ করা হয়েছিল মা’র্কিন সৈন্যদের মধ্যে। লেখক বলেন- ‘আমেরিকানদের স্তন নিয়ে বাড়াবাড়ি, নারীর উর্বাঙ্গের প্রতি গভীর ও ব্যাপক আসক্তির একদিক থেকে সেদিনই এক যুদ্ধের পর ঘরে-ফেরা সৈন্যরা রুপােলি’ পর্দায় দেখা পেলেন যেমন মেরিলি’ন মনরাে, জিনা লােলেব্রিজিড়া, জেনি ম্যানসফিল্ড, আনিটা’ এবার্গের, তেমনই সঙ্গিনী হিসাবে পেতে চাইলেন তাঁদের মতাে নতুন নারীকে।

একসময় নানা সমা’জে দেখা গেছে নারীদেহে আকর্ষণীয় ছিল নানা অ’ঙ্গ। চিনে সুন্দরীর লক্ষণ খোঁজা হত পায়ে, জাপানে গ্রীবায়, আফ্রিকায় নিতম্বে। অ’নেক সমা’জে গোপনীয়তাই ছিল বি’শেষ আকর্ষণের হেতু; কিন্তু ইউরােপ-আমেরিকায় সুন্দরীদের উত্তমা’ঙ্গ যদি কখনও উত্তূঙ্গ, তবে কখনও বা সমতল। কিন্তু দ্বি’তীয় মহা’যুদ্ধের পর বি’শেষ করে আমেরিকায় যাকে বলে ‘ম্যামা’রি গ্ল্যান্ড তার স্ফীতি যেন ক্রমেই বর্ধমা’ন। কেন, সে কি মেয়েরা নিজেদের আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে চেয়েছেন বলে? লেখক বলেন– ‘সেটা’ সম্পূর্ণ সত্য নয়। এই নির্মা’ণ আসলে পুরুষের কারিগরি মেয়েরা তার শিকার মা’ত্র। এই নব্য তিলােত্তমা’ পুরুষের উদযােগে তিল তিল করে রচিত। এই স্তন আসলে পণ্য’। সরকার, শ্রেষ্ঠীকুল, ধর্মীয় নেতা, স্বাস্থ্যের প্রহরী চিকিৎসকদল, সকলেরই কমবেশি অ’বদান রয়েছে এই সৃষ্টিতে। তারা কিন্তু বলতে গেলে সকলেই পুরুষ। এই স্তন নারীদেহে পিতৃতন্ত্রের অ’ধিকারকে প্রতিষ্ঠা করার আর-এক উদযােগ।

এমন একটা’ সময় ছিল যখন মা’য়ের বি’কল্প হিসাবে ধাই-মা’ নিয়ােগের বি’রুদ্ধে ইউরােপের অ’নেক দেশে বি’শিষ্ট প্রতিবাদীদের দেখা গেছে। অ’নেক স্বনামধন্য লেখক ও | চিন্তাবি’দ মা’তৃদুগ্ধের সপক্ষে সওয়াল করেছেন। এমনকী কখনও কখনও রাজরানিরাও সানন্দে স্বীকার করে নিয়েছেন সে দায়িত্ব। ইংল্যান্ডের এক রানির কথা আগে বলা হয়েছে।

ইংল্যান্ডে এমনও দেখা গেছে বাচ্ছাদের দুধ খাওয়াবার বােতল দেখতে কৌতুহলী সাধারণ মেয়েদের ভিড় জমে গেছে। রাশিয়ার সম্রাজ্ঞী, অ’স্ট্রিয়ার রানি— বড়ঘরের মেয়েরাও আদর্শ-জননী হিসাবে নিজেদের তুলে ধরেছেন। আমেরিকায় ধাই-মা’, এমনকী শ্বেতাঙ্গ শিশুর জন্য কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েও নিয়ােগ করেছেন কেউ কেউ। লুই পাস্তারের কৃতিত্বের ফলে ১৮৮০ সাল নাগাদ গোরুর দুধ বােতলে পুরে শিশুকে পান করাবার চিন্তুা অ’নেকের মা’থায়। আসে। কিন্তু লেখক বলছেন— ১৯৩০ সাল পর্যন্ত আমেরিকায় ধাই-মা’ নিয়ােগ খুব জনপ্রিয় ছিল না। মা’য়েরা নিজেরাই সন্তানের পুষ্টির দায়িত্ব গ্রহণ করতে পছন্দ করতেন। কিন্তু ১৯৪০ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে দেখা যায় স্তনদায়িনী মা’য়ের সংখ্যা অ’ত্যন্ত কমে গেছে। কেননা, বি’কল্প হিসাবে বােতলের দুধের মা’হা’ত্ম্য এমনভাবে প্রচার করা হয়েছে যেন। বােতলই শিশুর প্রকৃত মা’ এর জন্য দায়ী শুধু মুনাফালােভী ব্যবসায়ীরা নন, তাদের সহযােগী চিকিৎসকরাও। এই বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত কোটি কোটি ডলারের প্রশ্ন। আর তার পিছনে চালি’কাশক্তি মুনাফা! আর মুনাফা ।

স্তন নিয়ে বাণিজ্যের তথ্যবহুল আলােচনার আগে লেখক একটি মূল্যবান অ’ধ্যায় ব্যয় করেছেন মনস্তাত্ত্বি’কদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্ররােচনা নিয়ে। পরের অ’ধ্যায়ের বি’ষয় চিকিৎসকদের ভূমিকা। নারীস্তনে ক্যান্সার নিয়ে কীসব কাণ্ড চলেছিল তার ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে ওই অ’ধ্যায়টিতে। এখানে তা নিয়ে পর্যালােচনার সুযোগ নেই। মনস্তাত্ত্বি’কদের মধ্যে কুলগুরু ফ্রয়েডের একটি উক্তি এখানে বি’শেষ্ণু করে স্মরণীয়। তিনি বলেন- “স্তন্যপান শিশুর প্রথম একটি ‘ক্রিয়া, এবং তার প্রথম যৌন অ’ভিজ্ঞতা।’ স্তনকে যৌনতার কেন্দ্রে স্থাপনের নব্য স্থাপত্যে এই সিদ্ধান্ত’-একভাব সহজেই অ’নুমা’ন করা যায়।

স্তন যৌনাঙ্গ হিসাবে বি’জ্ঞানে স্বৰ্ত হওয়ার পর, পুরুষ যেমন তা অ’ধিকার এবং রক্ষায় তৎপর হন, মেয়েরাও অ’নেকেই নিজেদের সুরসুন্দরী হিসাবে গড়ে তুলতে আগ্রহী হবেন, সেটা’ অ’স্বাভাবি’ক কিছু নয়।

উনিশ শতকে এমনকী ফ্রান্সেও করসেট ছাড়া অ’ন্য কিছু ছিল না। ঘুমের সময়, হা’টা’ চলা, ঘােড়া কিংবা সাইকেলে চড়া, স্নান করা, এমনকী গর্ভাবস্থায় মেয়েরা অ’ন্তর্বাস হিসাবে করসেটই পরতেন। বি’শ শতকের প্রথম দিকে (১৯০৭) ফ্রান্সে উদ্ভাবি’ত হল অ’ন্য স্তনাবরণ— ব্রেসিয়ার। ১৯১৪ সালে আমেরিকায় এক ভদ্রমহিলা আকস্মিকভাবে ফ্রান্সের সেই নব-অ’ন্তর্বাসের সঙ্গে তুলনীয় একটি নতুন পােশাক তৈরি করেন। পরবর্তীকালে তার বি’নিময়ে তিনি পনেরাে লক্ষ ডলার সেলামি পান। ব্রোসিয়ার (Brassicrc) শব্দটি আমেরিকায় প্রথম ব্যবহা’র করা হয় ১৯০৭ সালে ‘ভােগ’ (Vogue) ম্যাগাজিনের পাতায়। অ’ক্সফোর্ড ডিকশনারি তা গ্রহণ করে ১৯১২ সালে। ১৯২৬ সালে দু’জন আমেরিকান ভদ্রমহিলা স্তনের স্বাভাবি’ক গড়ন এবং স্বচ্ছন্দ আন্দোলন বজায় রাখার জন্য তৈরি করেন পরবর্তীকালে বহুবি’দিত ‘মেইডেন ফর্ম। ১৯০০ সাল নাগাদ আবি’ষ্কৃত হয়েছিল কৃত্রিম তন্তু রেয়ন, দ্বি’তীয় মহা’যুদ্ধের সময় উদ্ভাবি’ত হয়, নাইলন। ১৯৩০ সালেই ব্রেসিয়ার ‘ব্রা’ হয়ে গেছে। অ’তঃপর শুধু মহা’যুদ্ধ শেষ হওয়ার অ’পেক্ষা। ১৯৪৯ সালে সওদাগররা শিল্পীর মতাে নারীদেহ গড়ে তুলতে যত্নবান হলেন সোৎসাহে। মেইডেন ফর্ম’ নির্মা’তারা স্বপ্নবি’ক্রেতা হিসাবে শুরু করলেন তাদের ব্যাপক অ’ভিযান। দীর্ঘ দুই দশক সেই তরঙ্গ ছিল বাধা-বন্ধনহীন। মেয়েরা তার তােড়ে ভেসে যেতে লাগলেন। বি’শেষত পঞ্চাশের দশকে
টিভির ব্যাপক প্রচলনের পর। তা পর ‘ওয়ান্ডার-ব্রা’, ‘টর্পেডাে-ব্রা’, ‘বুলেট-ব্রা’, আরও কত কী। এমনকী কিশােরীদের জন্যও বাজারে ছাড়া হয়—’ট্রেনিং ব্রা’!

শুধু কি অ’ন্তর্বাস? স্বপ্নের তিলােত্তমা’ হওয়ার বাসনা জাগিয়ে তােলার আগে ও পরে বাজারে আসে আদর্শ দেহবল্লরী গড়ে তােলার জন্য হা’জার প্রসাধনী। মধ্যযুগে, হয়তাে প্রাচীন যুগেও স্তনের পুষ্টি সুস্থতা ও শিশুর প্রয়ােজনের কথা ভেবে মা’য়েরা রকমা’রি ভেষজ ও টোটকা ব্যবহা’র করতেন। কিন্তু এবার এল মনােলােভা আধারে, বর্ণাঢ্য লেবেল পরে, বি’জ্ঞানের জয়গান গাইতে গাইতে। তা ছাড়া দেহ-ভাষ্কর্য গড়ার নামে যন্ত্রপাতি, শল্য চিকিৎসকদের সৌজন্যে খােদার উপর খােদকারি, প্লাস্টিক সার্জারি, এমনকী স্তন বৃদ্ধির জন্য ‘সিলি’কন’ প্রয়ােগ। (এই বি’পজ্জনক খেলা আইনবলে বন্ধ করা হয় ১৯৮৮ সালে।) নারীর উত্তমা’ঙ্গ পশ্চিমে পরিণত হয় বৃহৎ শিল্পে। মেয়েরা সেখানে যেমন তাে, তেমনই বি’ক্রেতাও বটে। ম্যাগাজিনের মলাটে এবং মলাটের ভেতরে পর্নোগ্রাফির পাতায়, মডেলের বেশে, পানশালায়, বি’ভিন্ন নিশিবাসরে, সিনেমা’ এবং সৌন্দর্য প্রতিযােগিতা, তারা অ’নেকে নিজেদের স্তনকে তুলে ধরেন অ’র্থের বি’নিময়ে।
এই নবহুল্লড়ে ষাটের দশকে শােনা গেল অ’ন্য এক শিহরনকারী সংবাদ ‘ব্রা-বার্নিং’। সেটা’ অ’বশ্য গুজবমা’ত্র। কিন্তু সেদিন যা ঘটছিল তা অ’ন্তর্বাস-পােড়ানোর চেয়েও অ’নেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। ‘দ্য লি’বারের্টেড ব্রেস্ট’ শীর্ষক অ’ধ্যায়টি এই বইয়ে অ’ত্যন্ত জরুরি-পাঠ্য। কারণ, ষাট এবং সত্তরের দশকের নারীবাদীদের ঐতিহা’সিক আন্দোলনে শুধু সংক্ষিপ্ত অ’থচ সুস্পষ্ট পটভূমিই রচনা করেননি গবেষক বি’শ্বময় নারীচেতনায় তার প্রভাব এবং পুরুষতন্ত্রের প্রতিক্রিয়ারও একটি বুদ্ধিদীপ্ত দলি’ল এটি। আমেরিকায় একটি সভায় মেয়েরা সেদিন নিজেদের ব্রা খুলে হলের এককোণে রাখা আবর্জনার বাক্সেই ছুড়ে দেননি, আরও অ’নেক কাণ্ডই করেছেন। শুধু আমেরিকায় নয়, ফ্রান্সে, জার্মা’নিতে, ইতালি’তে, উন্মুক্ত উত্তমা’ঙ্গ নিয়ে মিছিল, নগ্ন হয়ে প্রতিবাদ জানানাে, বুক খুলে সমুদ্রসৈকতে রােদ পােহা’নো, অ’বি’শ্বাস্য নানা কাণ্ড । এখানে সে-কাহিনী সবি’স্তারে নতুন করে শোনাবার সুযােগ নেই। বোধহয় তার প্রয়ােজনও নেই। জগৎ-কাপানাে নারীবাদী আন্দোলনের কাহিনী কে না জানেন? লেখক তার বি’বরণ দিতে গিয়ে সবি’নয়ে জানিয়েছেন- তথাকথিত এই ‘ব্রা-বার্নিং’ ‘ব্রা’ পােড়ানাের এক লক্ষ্য ছিল— মেয়েদের যৌনতা নিয়ে পুরুষের বাড়াবাড়ি, তাদের হা’জার সমস্যা এড়িয়ে স্তন নিয়ে মা’তামা’তির বি’রুদ্ধে স্পষ্টভাষায় প্রতিবাদ জানানাে। এমন প্রতিবাদ যা সমা’জকে শিহরিত করে, আহত করে, এবং ভাবি’ত হতে বাধ্য করে। ওঁরা নিজেদের শরীরের উপর নিজেদের অ’ধিকার দাবি’ করতে যেমন সেদিন লড়াইয়ে অ’বতীর্ণ, তেমনই বৃহত্তর লক্ষ্যও ছিল তাদের সামনে। নারীর নানা দাবি’কে সরবে উত্থাপন করেছিলেন ওঁরা সেদিন বধির শাসক এবং পুরুষতন্ত্রের অ’ন্য ধ্বজাধারীদের সামনে। সে প্রশ্নের মধ্যে ছিল পর্নোগ্রাফি, যৌনতা (সেক্সইজম), মেয়েদের স্বাস্থ্য, রুজি-রােজগারের সমস্যা, নিরাপদ যৌনৰ্জীবনের প্রয়ােজনীয়তা অ’ন্যভাবে বললে পুরুষের অ’ধিকারের সমা’ন অ’ধিকার। সত্য ওঁদের এক উচ্চারণ ‘উই রিক্রেম আওয়ার ইনহেরেন্ট রাইট টু গভর্ন আওয়ার ওন বডিজ’ কিংবা অ’ন্য আওয়াজ– আওয়ার ব্রেস্টস আর ফর দ্য নিউবর্ন, নট ফর মেন্স পর্নো’। কিন্তু আসল লড়াই— একই তুলাদণ্ডে নারী আর পুরুষের মূল্যায়ন। নরনারীর স্বীকৃতি।

ওঁদের আন্দোলন, বলাই বাহুল্য, বি’ফলে যায়নি। ইউরােপ-আমেরিকায় রাষ্ট্র ও সমা’জপতিরা নতুনভাবে চিন্তা করতে বাধ্য হয়েছেন। কোনও কোনও ক্ষেত্রে অ’ধিকারের স্বীকৃতিও দিতে হয়েছে। কিন্তু লেখক স্বীকার করেছেন আশির দশকে স্তনের মহিমা’ আবার প্রতিষ্ঠা খুঁজে পায় আমেরিকায়। সত্য, অ’নেক মেয়েই নিজেদের শরীর মন, এমনকী নিজেদের যৌনতার উপর সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করতে সমর্থ নন। তারা আর কারও অ’ঙ্গুলি’হেলনে নিজেদের পছন্দের জীবনভঙ্গি বদলাতে সম্মত নন। বি’বাহবন্ধনের বাইরে দাম্পত্য, সংসারে নারী-পুরুষের সদায়িত্ব ও মর্যাদা, সন্তান চাওয়া না-চাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, কর্মক্ষেত্রে সমা’ন সুযােগ ও বেতন আদায় করা, প্রয়ােজনে এক সন্তানের দায়িত্ব গ্রহণ, এমনকী সমকামিতাকে স্বাভাবি’ক বলে প্রকাশ্যে স্বীকার করে নেওয়া— কী নয়? তা ছাড়া নতুন ভাষাও আয়ত্ত করেছেন ওঁরা। তারা নিজেদের কবি’তা, উপন্যাস, প্রবন্ধে খােলাখুলি’ নিজেদের যৌনতা নিয়ে আলােচনা করতে আর লজ্জিত বা দ্বি’ধাগ্রস্ত নন। বেশকিছু নারী নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছেন লেখক, চিত্রকর, ভাস্কর এবং আলােকচিত্রী হিসাবে। সৃজনশীলতার এই বি’স্ফোরণও অ’বশ্যই বি’রাট প্রাপ্তি।

তবু লেখক স্বীকার করেন ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ যখন সদর্পে ঘােষণা করে ব্রেস্টস আর ব্যাক ইন স্টা’ইল। তখন ওঁরা মিথ্যা বলেননি। আমেরিকা কিছুদিনের জন্য থমকে দাড়ালেও অ’বার যেন বাঁধা পড়ছে নারীর বুকের মা’য়ায়। এ কি ‘ব্যাকল্যাশ, বা ক্রিয়ার পর প্রতিক্রিয়া? প্রত্যাঘাত লেখক বলছেন— “তার পটভূমি রচনা করেছে আমেরিকায় সমকালের সনাতন দক্ষিণপন্থী রাজনীতি, নবলব্ধ পৌরুষের আস্ফালন, অ’র্থনৈতিক কার্যকারণ, বি’শেষ করে শিবাণিজ্যে ধনতন্ত্রের নব অ’ভিযান। তবে তিনি দৃশ্যাবলি’ দেখে নৈরাশ্য-পীড়িত ন আশা প্রকাশ করেছেন— এই শুনমা’হা’ত্ম চিরস্থায়ী হবে না। কোনও ফ্যাশনই চিরজীবী নয়। তার প্রত্যাশা— হয়তাে আমা’দের নাতনিরা ইচ্ছা করলে তাদের স্তন অ’নাবৃত রাখতে পারবে। তাদের তার জন্য নিন্দিত বা ধিকৃত হতে হবে না, আদালতের কাঠগড়ায় দাড়াতে হবে না, এই প্রদর্শনের জন্য কোনও কামা’র্ত পুরুষ তার দিকে হা’ত বাড়াতে সাহস পাবে না। হয়তো সেদিন স্তনের আবেদন অ’নেক কমে যাবে, তার বদলে আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে হা’টু কিংবা উরু। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন একদিন শুধু নারীর নয়, এমনকী টেবি’লের পা পর্যন্ত ঢেকে রাখা হত। কোথায় গেল সেই কুসংস্কার? সুতরাং, স্তন নিয়ে এই পাগলামিও থাকবে না। যদি কেউ জিজ্ঞাসা করেন কবে সেই সুদিন আসবে, তবে এই চিন্তাশীল গবেষকের উত্তর একুশ শতকের প্রথম দিকে। কেননা, ইউরােপ-আমেরিকায় নারীস্তনের ইতিহা’স পর্যালােচনা করে তিনি দেখেছেন কুচগিরি শান্ত সমতল উপত্যকায় পরিণত হয় মা’েটা’মুটি প্রতি চার দশক অ’ন্তর। সুতরাং তিনি অ’পেক্ষায় আছেন।

ওঁর সঙ্গে পাঠকেরাও নিশ্চয় সম্মত হবেন প্রতীক্ষা করতে। কারণ, তথ্যের সঙ্গে তত্ত্ব, যুক্তির সঙ্গে আবেগের অ’পূর্ব সমন্বয়, এই ইতিহা’সের পাঠকের পক্ষে সম্ভব নয় অ’ন্য কিছু ভাবা।


ঔপনিবেশিক লালসার আগুনে

এখন আমি নিয়মিত দেশীয় নারীর সঙ্গে সহবাস করি। ওরা ভালবাসার সব কলাকৌশল জানে। জানে যে-কোনও রুচির মা’নুষকে তৃপ্ত করতে। তাদের মুখের ছাদ এবং শরীরের গঠন পৃথিবীর যে-কোনও নারীর চেয়ে সুন্দর। এই অ’প্সরাদের বাহুবন্ধনে আমি যে আনন্দ উপভােগ করেছি তা বর্ণনা করা সম্ভব নয়।—এই জবানবন্দি এভেয়ার্ড সেলােন নামে একজন ব্রিটিশ অ’ফিসারের। ১৮৪০ সালের কথা। সেলেন তখন ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর একজন উচ্চপদস্থ সৈনিক। তিনি একজন বি’শিষ্ট নৃতাত্ত্বি’কও। ভারতীয় নারীর রূপ এবং যৌনতা তার অ’ন্যতম চর্চার বি’ষয় উপভোগেরও।

—সাদা মা’নুষেরা নাকি কখনও মিথ্যে বলেন না। কিন্তু গােপন সম্পর্ককে তারা গােপন রাখতে পারে। খুব চেষ্টা’ করলেও কেউ সাদা পুরুষ মা’নুষদের গোপন জীবনের কথা জানতে পারবে না। তবে একবার তাদের বি’শ্বাস অ’র্জন করতে পারলে হয়তো পারা যাবে। আমি এক সাহেবকুঠিতে আয়ার কাজ করতাম। বি’বাহিত সাহেব। ঘরে বি’বি’-বাচ্চা আছে। বি’বি’র চোখে ধুলো দিয়ে সাহেব গাড়িতে আমা’র সঙ্গে মিলি’ত হতেন। মা’লি’কের সঙ্গে কাজের মেয়েদের হা’মেশাই এ ধরনের সংসর্গ ঘটে। হয়তো অ’ন্য কোনও আয়া সাহেবের নজরে পড়েছে। তিনি আমা’কে আড়ালে জিজ্ঞাসা করতেন, মেয়েটি কি ভাল? আমি বললাম, হ্যা। তখন তিনি বলবেন, তবে একটা’ ব্যবস্থা করো। আমিও রাজি হয়ে যেতাম।–এই স্বীকারােক্তি কেনিয়ার একজন কৃষ্ণাঙ্গ আয়ার। একজন না বলে দু’জন বলাই ঠিক। কারণ, মেয়ে সংগ্রহ করার দায়িত্বটি যে নিয়েছিল সে জন্য একটু আয়া।

টোনি ফ্রিথ ছিলেন সিয়ারালেন-এ বনবি’ভাগের একজন কর্মী। তিনি লি’খছেন, মেয়েটি ছিল ইউরাে-আফ্রিকান সে ছবি’ আঁকত তার সঙ্গেই আমা’র প্রথম যৌন অ’ভিজ্ঞতা। পশ্চিম আফ্রিকা যাওয়ার আগে তামা’র সে-অ’ভিজ্ঞতা ছিল না। আমা’র বয়স তখন সবে একুশ বছর। তরুণী সােনিয়া ছিল পেশায় নার্স। আমি তখন ফ্রি টা’উনে আছি। সােনিয়া তখন একটি স্থানীয় হা’সপাতালে কাজ করে। একদিন সে আমা’র কুঠিতে এসে দরজায় টোকা দেয়। আমি ভেতরে আসতে বলি’। সােনিয়ার প্রশ্ন, তোমা’র কোনও বান্ধবী নেই? আমি বলি’, না। সে বলে, তবে আমিই তােমা’র মেয়েমা’নুষ। আমা’র জীবনে সেই প্রথম সুযােগ। সােনিয়া বলে, আমি একজন নার্স। সুতরাং আমা’কে নিয়ে ভাবনার কিছু নেই। আমি জানি কী করতে হয়। আমি প্রতিবার ওকে এক পাউন্ড করে দিতাম।

এইসব কাহিনী ঔপনিবেশিক আমলের। সাম্রাজ্যের ইতিহা’স শুধু দূর দূর দেশে নতুন নতুন জনগােষ্ঠী, তাদের সম্পদ ও সম্পত্তি, সভ্যতা ও সংস্কৃতির ওপর আধিপত্যের ইতিহা’স নয়, সেই কাহিনী অ’নেকখানিই বি’জেতা এবং বি’জিত জাতির মধ্যে সম্পর্কের টা’নাপােড়েনের কাহিনী। আর তার আড়ালে রয়েছে নর-নারীর সম্পর্কের বি’শেষ কাহিনী।

ইদানীংকালে সাম্রাজ্যের মতো এই সম্পর্কের ইতিহা’সও আলােচ্যের তালি’কায় ঠাই করে নিয়েছে। প্রায় এক যুগ আগে আমরা হা’তে পেয়েছিলাম কেনেথ বালহ্যাচেট-এর বি’স্ময়কর বই, ‘রেস, সেক্স অ’্যান্ড ক্লাস আন্ডার দ্য রাজ’। তার পর আটলান্টিকের এপারে ম্যাঞ্চেস্টা’র বি’শ্ববি’দ্যালয় এবং ওপারে ইন্ডিয়ানা বি’শ্ববি’দ্যালয় থেকে এই দশকেই বেরিয়েছে দু’-দুটি বই। ঔপনিবেশিক আমলে উপনিবেশগুলােতে সাম্রাজ্যনির্মা’তাদের যৌন জীবন নিয়ে বি’স্তারিত আলােচনা করা হয়েছে এইসব বইয়ে : সর্বশেষ হা’তে এল নতুন আর একটি বই, অ’্যান্টন জিল-এর ‘রুলি’ং প্যাশনস’ বা সেক্স রেস অ’্যাও এম্পায়ার। এই বইটি অ’বশ্য সেই অ’র্থে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা-পুস্তক নয়। রুলি’ং পশনস’ আসলে রজার বণ্টন প্রােডাকশনস-এর একটি টিভি সিরিয়াল। চলতি বছরেও বি’বি’সি-তে দেখানাে হয়েছে সেটি। দৃশকাহিনীর সঙ্গে তাল মিলি’য়ে চলতেই প্রায় দু’শো পৃষ্ঠার এই সচিত্রপাঠ্য। এমন খােলামেলা আলােচনা, বি’শেষত প্রয়ােজনীদৃশ্য সহযােগে বােধহয় বি’বি’সি-র পক্ষেই সম্ভব। উল্লেখ্য, লেডি চ্যাটা’র্লি’জ লাভর এর উপলক্ষে ও বেইলি’ থেকে ছাড়া পাওয়ার পর একদা নিষিদ্ধ চার অ’ক্ষরের সেই শব্দটি এ-বইয়ের যত্রতত্র। সুতরাং বাংলা মতে বলতে গিয়ে কিছু রাখঢাক করতে হচ্ছে। তাতে অ’বশ্য মূল বক্তব্যের কোনও হেরফের ঘটা’র সম্ভাবনা নেই। লক্ষণীয় শুধু এটা’ই যে, ভিক্টোরীয় ইংল্যান্ডের রুচিশীলতা, শুচিবাইয়ের পর্যায়ে চলে গেলেও সেদিনের অ’নেক ইংরেজের জীবনে তাে বটেই, ডায়েরি, চিঠিপত্র, এমনকী গোপন লেখালি’খিতেও অ’বি’শ্বাস্য অ’কটপতা। ভিক্টোরীয় ইংল্যান্ডের প্রকাশ্য মুখাবয়ব-এর আড়ালে যে একটি মুখােশ ছিল, লি’টন স্ক্র্যাচির বি’খ্যাত ভিক্টোরিয়ানরাই যে সে-যুগে একমা’ত্র ভিক্টোরিয়ান ছিলেন না সে-কথা আজ আর গােপন নেই। জানা গেছে, সুরভিত প্রস্ফুটিত কুসুমে কীট ছিল। আন্টিন জিল-এর এই কাহিনী পর্দায় সরাসরি দেখিয়ে দিল কীট যেমন পেছনের বাগানে ছিল, তেমনি ছিল ঘরের বাইরেও দূর-দূরান্তে— নগরে, বন্দরে, ছাউনিতে, বাগিচায় এবং এখানে-সেখানে সর্বত্র। এমনকী, শীর্ষ শাসকদের অ’ট্টা’লি’কাগুলি’তে পর্যন্ত। লর্ড ওয়েলেসলি’র মতাে জঁদরেল গভর্নর জেনারেলকেও যৌন ক্ষুধা মেটা’তে হা’না দিতে হয়েছে এই কলকাতায় আনন্দের হা’টে ! ভাবা যায় !

ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এক অ’ত্যাশ্চর্য ঘটনা। পৃথিবীর বি’স্তীর্ণ জমি ও সম্পদ সেদিন সামা’ন্য এক দ্বীপপুঞ্জের অ’ধিকারে। দরিয়ায়ও তাদেরই দাপট। সাম্রাজোর মধ্যাহ্নে ৩৭০০ লক্ষ মা’নুষ মা’নচিত্রে রক্তবর্ণে লাঞ্ছিত দেশগুলােতে বাস করেন। তার মধ্যে ৫০ লক্ষ মা’ত্র শ্বেতাঙ্গ। এই সাম্রাজ্যের সামগ্রিক উৎপাদন মা’র্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অ’বশিষ্ট দুনিয়ার চেয়ে বেশি। সত্য, সেখানে নির্মম বলপ্রয়ােগ ছিল, নিষ্ঠুরতা ছিল, বর্ণবি’দ্বেষ ছিল, অ’বি’চার-অ’ত্যাচার ছিল, সর্বোপরি ছিল লুণ্ঠন! তবু ইংরেজের কৃতিত্ব কোনও বি’চারেই অ’স্বীকার করার উপায় নেই।

বি’শাল ভারতীয় উপমহা’দেশে শ্বেতাঙ্গ পুলি’শবাহিনীতে যত মা’নুষ ছিলেন, বলতে গেলে তা ব্রিটেনের পুলি’শবাহিনীর সমা’ন। ব্রিটিশ বাহিনীতে শ্বেতাঙ্গের সংখ্যা কখনও নাকি এক লক্ষের বেশি ছিল না। তা সত্ত্বেও সাম্রাজ্যের রথ চলেছে মা’েটা’মুটি মসৃণভাবে। বি’রােধ, বি’দ্রোহ, বি’স্ফোরণ— সবই ঘটেছে; তবু উনিশ শতকের অ’নেকখানি জুড়ে সাম্রাজ্য-নির্মা’তা এবং সেবকে ছিলেন তৃপ্ত? কোথায় বা এই সাফলাের চাবি’কাঠি! কেনই বা এমন প্রশান্তি। অ’্যান্টন জিল লি’খেছেন, ১৭৫০ থেকে ১৮৫০-এর মধ্যে যে ইংরেজ সন্তান তরুণ ছিলেন, যার সামা’ন্য শিক্ষাদীক্ষা ছিল, তিনি রীতিমতাে ভাগ্যবান। সাত সমুদ্র তেরাে নদীর তরঙ্গকে শাসন করছে ব্রিটা’নিয়া, পাউন্ড স্টা’র্লি’ং শাসন করছে বি’শ্বের অ’র্থনীতি। ব্রিটিশ তরুণের সামনে অ’্যাডভেঞ্চারের অ’পূর্ব সুযােগ! শুধু আত্মিক উন্নতি নয়, অ’র্থ বি’ত্ত উপার্জনের জন্যও সামনে ছড়িয়ে রয়েছে বি’ন্তীর্ণ জগৎ। অ’ধিকাংশ পশ্চিমি মা’নুষের কাছে দেশ ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার তাড়না ছিল, এক দিকে অ’্যাডভেঞ্চারের হা’তছানি, অ’ন্য দিকে ধনদৌলতের স্বপ্ন। স্বদেশের জীবনযাপন সহজ ছিল না। রুজি-রােজগারের পথে অ’সুবি’ধা ছিল; তা ছাড়া শ্রেণী-বি’ভক্ত ব্রিটিশ সমা’জে সচলতার সুযােগও ছিল কম। তবে নতুন স্বপ্নের পথেও বাধাবি’ঘ্ন ছিল। প্রথমত, দূরত্ব। গন্তিকর দুর্গম সমুদ্রযাত্রা! নিরাপদে পৌঁছতে পারলে সেখানে অ’পেক্ষা করে আছে অ’চেনা পৃথিবীর বি’পরীত পরিবেশ। অ’পরিচিত সমা’জ এবং সংস্কৃতি। অ’পরিচিত মা’নুষজন, অ’জানা ভাষা, অ’চেন্নাদ্য, জল-হা’ওয়া, ব্যাধি, কীটপতঙ্গ। তবু সাম্রাজ্যের হা’তছানি যেন অ’প্রতিঞ্জে অ’্যান্টন জিল বলছেন, বি’পরীত পরিবেশ-পরিস্থিতিতেও অ’ভিযাত্রী ব্রিটিশ গুণের সামনে সেদিন খােলা অ’জস্র সহস্রবি’ধ পথে চরিতার্থতার পথ। সে-পথে আরও অ’নেক কিছু প্রাপ্তির মতাে যৌনতারও মুক্তি। লেখক তন্য’ন্য কারণের মধ্যে এক স্থান নিতে চান গুরুত্বের সঙ্গে। তার ভাষায়, ‘অ’্যানাদার ভেরি অ’বভিয়াস, ইভন সেন্ট্রাল অ’্যাট্রাকশন ওয়াজ— সেক্স।

ভিক্টোরিয়ান ব্রিটেনে সবচেয়ে গুরুতর পাপ যেন যৌনতা। যৌনতাকে অ’বদমন করা বলতে গেলে সেদিন জাতীয় নেশা। যতভাবে পারা যায়, যেভাবে পারা যায়, ওই অ’পরিহা’র্য, অ’প্রতিরােধ্য অ’থচ নীচ ও অ’শুদ্ধ প্রবণতাকে দমন করতে হবে। সর্বশক্তি দিয়ে করতে হবে গোপন। শুচিবায়ুগ্রস্ত ওই সমা’জে তরুণ-তরুণীদের পক্ষে সুস্থ স্বাভাবি’ক জীবনযাপন করা বলতে গেলে প্রায় দুঃসাধ্য। বি’দেশে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অ’ন্যরকম। সেখানে নৈতিকতার বি’ধিনিষেধ মা’নুষকে পঙ্গু করে রাখে না। সেখানে মুক্ত হা’ওয়া, অ’বাধ স্বাধীনতা। সুতরাং ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়া বাইরে!
ইংল্যান্ডের পরিবেশ-পরিস্থিতি কতখানি কঠোর ছিল, দু’-একটি তথ্য থেকেই তা বােঝা যায়। ১৮৭৫ সালে মেয়েদের বি’য়ের বয়স যখন বারাে থেকে বাড়িয়ে তেরাে করা হয়, তখন দেশ জুড়ে প্রবল প্রতিবাদ। এই বয়স পনেরাে-য় টেনে নিতে সময় লেগেছিল দশ বছর। সেবারও তুমুল প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যায়। ইউরােপের কোনও কোনও দেশে সমকামিতা তথন অ’নুমা’েদন লাভ করেছে। কিন্তু ইংল!ন্ডে শব্দটি উচ্চারণযােগ্য নয়। মেয়েদের মধ্যে বি’শেষ সম্পর্ক তাে স্বপ্নেও চিন্তা করা চুড়ান্ত অ’নৈতিকতা। দিকে দিকে নিষেধের কুটি রকমা’রি ট্যাবু’। বাংলা পঞ্জিকার মতো কি সিদ্ধ কি অ’সিন্ধ, নীতিবাগীশদের মুখে সততার ফতােয়া। অ’ন্য দিকে ভারত কি মুক্ত দুনিয়া নয়? সেখানে রয়েছে খাজুরাহো, কামসূত্র এবং তাম্রবর্ণ নর্তকীর দল—’নচগর্লস’। সেখানে বি’য়ের বয়স নিয়ে যেমন কারও মা’থাব্যথা নেই, তেমন কার ঘরে ক’টি বি’বি’ তা নিয়েও কোনও গুঞ্জন নেই। ফলত, উনিশ শতকের অ’ভিযাত্রী ইংরেজ যুবকের কাছে ভারত এক সব-পেয়েছির দেশ যেন।

উনিশ শতকের তুলনায় অ’ষ্টা’দশ শতকের ব্রিটেনের নৈতিকতা অ’বশ্য অ’ন্যান্য ইউরােপীয় সাম্রাজ্যবাদী সমা’জের মতােই অ’নেক ঢিলেঢালা ছিল। ওলন্দাজ, ফরাসি, পর্তুগিজ এমনকী জার্মা’নরা ছিলেন নর-নারীর সম্পর্ক বি’ষয়ে উপনিবেশগুলােতে বেশ উদার। ইংরেজের কাছেও তখনও কোম্পানির কর্মচারীদের নৈতিকতা বা ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়ে বি’শেষ দুর্ভাবনা ছিল না বলেই মনে হয়। পরিস্থিতি পালটে যায় উনিশ শতকে, ভিন দেশের মা’টিতে সাম্রাজ্যের পতাকাদণ্ডটি ঠিকঠাক স্থাপন করার পর। অ’ষ্টা’দশ শতকের ভারতে একবার উকি দিলেই সেটা’ বোঝা যায়।

বলতে গেলে ভারতীয় সেই ‘বি’বি’’দের যুগ। সে যুগের কথা এর আগে মিলড্রেড আর্চার চিত্রসহযােগে কিছু আলােচনা করেছেন। আলােচনা করেছেন অ’ন্যরাও। অ’্যাণ্টন জিল তদুপরি কিছু নতুন সংবাদ দিয়েছেন। ডিউক অ’ব ওয়েলি’ংটনের বড় ভাই রিচার্ড ওয়েলেসলি’ ভারতে গভর্নর জেনারেল ছিলেন ১৭৯৮ থেকে ১৮০৫ সাল পর্যন্ত। কলকাতার এই রাবন তার আমলেই গড়া। তার আমলেই বি’শাল ভারতের তিন ভাগের দু’ ভাগ এলাকায় কোম্পানির আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর প্রথম স্ত্রী ছিলেন ইংরেজ-কন্যা। বি’য়ের আগেই ওয়েলেসলি’ তাকে পাঁচটি সন্তান উপহা’র দিয়েছিলেন। সে মহিলা স্বামীর সঙ্গে ভারতে আসতে রাজি হননি। সুতরাং কলকাতায় ওয়েলেসলি’র প্রথম দু বছর কাটে নিঃসঙ্গ অ’বস্থায়, রাজকার্যের ব্যস্ততায়। কিন্তু বরাবর নয়। ওয়েলেসলি’ নাকি শহরের লাল আলাের বৃত্তে ছায়ার মতো ঘুরে বেড়ান। তাঁর আরও একবার বি’য়ে হয়েছিল বটে, রক্ষিতাও ছিল বেশ কয়েকজন। সফল তৃপ্ত জীবনের ছেদ পড়ে তিরাশি বছর বয়সে। ১৮১২ সালে ভারতীয় বি’বি’ নিয়ে ঘর করেছেন, দিল্লি’তে কোম্পানির রেসিডেন্ট সুশিক্ষিত চার্লস মেটকাফ। আট বছর ধরে এই ঘরকন্নার ফলে ভারতীয় জননীর গর্ভে তিনটি পুত্রসন্তান লাভ করেন তিনি। তাঁর উত্তরসুরি দিল্লি’র আর-এক রেসিডেন্ট উইলি’য়াম ফ্রেজারও ছিলেন বি’বি’বি’লাসী ইংরেজ। তার ছয়-সাতজন ভারতীয় বি’বি’ ছিলেন। তিনি তাদের নিয়ে নবাব-বাদশার মতাে হা’রেম সাজিয়ে বসেছিলেন। একজন সমসাময়িক ইউরােপীয় পর্যটক তার ঘরকন্না দেখে লি’খেছিলেন, পারস্যরাজের মতােই অ’গণিত সন্তান ছিল মেটকাফের।

এ-ধরনের আরও অ’নেক ইউরােপীয়ের কাহিনী রয়েছে ইতিহা’সে, যারা অ’ষ্টা’দশ শতকে দেশীয় বি’বি’ নিয়ে সানন্দে ঘর করে গেছেন। এবং প্রকাশ্যে লজ্জা ঘৃণা ভয় (অ’র্থাৎ, পাপ-ভয়) কিছুই ছিল না তাদের। আমরা কলকাতায় অ’্যাটর্নি উইলি’য়াম হিকির কাহিনী।জানি। তাঁর বন্ধু মুর্শিদাবাদে কোম্পানির রেসিডেন্ট বব পটও ছিলেন বি’বি’বি’লাসী। মা’রাঠা দরবারে ইংরেজ প্রতিনিধি উইলি’য়াম পামা’র, নিজাম দরবারে কর্নেল কাকপ্যাট্রিক, লখনউ-এ লা মা’র্টিন সাহেব ছাড়াও অ’্যাস্টনি পােলি’য়ের, শিল্পী টিলি’ কিটল এবং আরও অ’নেকেই ছিলেন তাম্রবর্ণা ভারতীয় সুন্দরীদের অ’নুরাগী। কিপলি’ংয়ের কবি’তায় পরামর্শ ছিল, ‘অ’্যা ম্যান শুড, হা’েয়াটএভার হ্যাপেনস, কিপ টু হিস ওন কাস্ট, রেস অ’্যান্ড ব্রিড! লেট দ্য হা’েয়াইট, গাে টু দ্য হা’েয়াইট, অ’্যান্ড দ্য ব্ল্যাক টু দ্য ব্ল্যাক। এ-সব উনিশ শতরে সাহেবি’ কানমন্ত্র। আগের শতকে সাহেবটোলায় স্লোগান-‘অ’্যান্ড দ্যাট উই আর যার ফ্রম দ্য লি’পস উই লাভ উই মেক লাভ টু পিপলস দ্যাট আর নিয়ার!

ধীরে ধীরে সেই বন্ধনহীন স্বাধীনতার দিন ফুরিয়ে এল। এক কারণ, পরদেশে আধিপত্য কায়েম হয়েছে। সাম্রাজ্যের ভিত মা’েটা’মুটি। শাসক এবং শাসিতের, বি’জেতা এবং বি’জিতের মধ্যে ভেদরেখা স্পষ্ট। এমন সময়ে রাজা আর প্রজার মধ্যে অ’বাধ মেলামেশা ক্ষতিকর। তাতে অ’হমিকাবােধ খর্ব হয়। প্রজাদের মধ্যে এই ধারণা সঞ্চারিত করা দরকার যে, ভিনদেশি শাসকেরা অ’ন্য মা’নুষ। তাদের গায়ের রং আলাদা, ধর্ম আলাদা, ভাষা আলাদা, সভ্যতা-সংস্কৃতিও আলাদা। তাদের নৈতিকতা, মূল্যবােধ, দৈনন্দিন জীবনযাত্রাপ্রণালী সবই নেটিভদের থেকে স্বতন্ত্র। এই স্বাতন্ত্র্য এমনকী যৌন জীবনেও। সুয়েজ জাহা’জ চলাচল শুরু হওয়ার পরে এই ধারণাটি বি’শেষভাবে শাসক মহলে দানা বেঁধে ওঠে। খাল বেয়ে ইংরেজ মেয়েদের ভারত অ’ভিযান শুরু হয়। সুয়েজ দিয়ে প্রথম জাহা’জ চলতে শুরু করে ১৮৩০ সালে। অ’বশ্য ‘পি অ’্যান্ড ও’-র জাহা’জের আসা-যাওয়া শুরু হয় চার দশক পরে, ১৮৭০ সালে। এই জলপথে ঝক ঝক অ’বি’বাহিত ইংরেজ মেয়ে পৌছয় ভারতের উপকুলে। তারা স্বপ্নের পৃথিবীতে সহল ইংরেজ যুবাদের বি’য়ে করে সুখে সংসার করতে চান। পূর্ববঙ্গে কুলীন বরের সন্ধানে বেরিয়ে পড়া ব্রাহ্মণ কন্যাদের নাকি এসময়ে বলা হত ‘ভরার মেয়ে’। কনে-বোঝাই পশ্চিমি জাহা’জগুলােকে তেমনই বলা হত ‘ফিশিং ফ্লি’ট’– জেলে ডিঙির বহর। স্বভাবতই নেলি’ মেয়েদের নিয়ে ঘরকন্না তখন খুবই অ’সামা’জিক এবং অ’ভব্য ব্যাপার। যারা পরিবর্তিতপরিস্থিতিতেও এদেশের মেয়েদের কাছে সমর্পিতপ্রাণ, তাদের বলা হত ওরা ‘নেটিভহয়ে গেছে, ‘গন-নেটিভ’। স্বভাবতই “স্লি’পিং ডিকশেনারি’ বা দেশি বি’বি’র আড়ালেল যেতে থায়েন, সাহেবের ঘর আলাে করতে পটের বি’বি’ হয়ে বসেন ইংরেজ মেলেৰী।

কেমন মেয়ে তারা? ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতায় লালি’ত পুরুষদের মতােই তারাও একই সমা’জ-সংস্কৃতির অ’বদান। পুরুষেরা সযত্নে তাদের গড়ে তুলেছিলেন বি’শুদ্ধতার প্রতীক হিসাবে! ইংরেজ মেয়ে মা’নে শুধু সদাচারী বােন, মা’ অ’থবা স্ত্রী। বি’বাহিত মেয়েরা সন্তানের অ’ভিভাবক, স্বামীর নৰ্মসহচরী। তিনি পবি’ত্রতার প্রতিমা’। ইংরেজি গেলােপ’ও বলা চলে তাদের। সুতরাং বি’পরীত জলহা’ওয়া থেকে যেমন করে হা’েক তাঁদের রং, রূপ, সৌরভ বাঁচাতে হবে। অ’সংখ্য দাসদাসী-পরিবৃত এই গোলাপের তবু সবসময়ে অ’মলি’ন রাখতে পারেননি নিজেদের। তাদের অ’নেকেই ছিলেন মা’নসিকভাবে স্বদেশ থেকে নির্বাসিত, বি’চ্ছিন্ন, বি’ষ; নিঃস্পৃহ এবং উদাসীন; কেউ কেউ কুচুটে এবং খিটখিটে। অ’নেকেই বাড়ির কাজের লােকেদের সঙ্গে দুর্ব্যবহা’র করেন, অ’নেকেই উন্নাসিক, জাতিবি’দ্বেষে ভরপুর এবং সংকীর্ণতার কবলে। তারই মধ্যে কোনও কোনও ইংরেজ নারী রীতিমতো সাহসী জীবনযাপন করেছেন অ’বশ্য। উপনিবেশের মা’নুষদের প্রতি তারা ছিলেন সহা’নুভূতিশীল। তাদের জীবন সম্পর্কে কৌতুহলী। স্থানীয় মা’নুষজনের ভালমন্দের সঙ্গেও জড়িয়ে গিয়েছিলেন কেউ কেউ। তবে বেশির ভাগ ইংরেজ মেয়েই মনের চার পাশে দেওয়াল তােলার চেষ্টা’ করেছেন। নিদেনপক্ষে বি’চ্ছিন্নতার লাল পর্দা টেনে তার আড়ালে বাস করতে চাইতেন। সকলের নৈতিকতাও প্রশ্নাতীত ছিল না। | বায়রন লি’খেছিলেন ‘হা’েয়ট ম্যান কল গ্যালানট্রি, অ’্যান্ড গডস অ’্যাড়ালটা’রি/ইজ মা’চ মা’ের কমন হা’ের দ্য ক্লাইমেট ইজ সালট্রি উপনিবেশগুলি’তেও স্বভাবতই পরকীয়া অ’জানা ছিল না। বড় ঘরের দুই বড় মা’নুষের কথাই ধরা যাক। একজন সুপরিচিত লর্ড কার্জন। তিনি ভারতের ভাইসরয় ছিলেন ১৮৯৯ থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত। দ্বি’তীয়জন স্যার আলড়ে মিলনার। ১৮৯৭ থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকা। ব্রিটিশ হা’ই কমিশনার। ওঁরা দু’জনই ইলি’নর গ্লি’ন নামে এক রােম্যান্টির ঔপন্যাসিকের প্রেমে পড়েছিলেন। তাই নিয়ে সেদিন অ’জ্ঞাতনামা’ কবি’র ছড়া— ‘উড ইউ লাইক টু সিন অ’ন আর টা’ইগার জিন/উইথ ইলি’নর নি?? টু অ’র উইথ হা’র আপন সাম আদার কাইন্ড অ’ব যার?’ পরবর্তীকালে মিলনার এক বি’বাহিত মহিলার প্রেমে পড়েন। কে বি’য়ে করার জন্য মিলনাকে দীর্ঘকাল অ’পেক্ষা করতে হয়েছিল। তিনি পরস্ত্রীকে নিজের ঘরে তােলেন ৬৭ বছর বয়সে; কার্জনকেও আর-একজনের প্রেমে পড়ার পর বি’য়ের জন্য অ’পেক্ষা করতে হয়েছিল অ’ন্তত পাঁচ বছর। অ’্যাস্টন জিল বলছেন, “বােথ মেন হ্যাড অ’, নাম্বার অ’ব অ’্যাফেয়ার্স, দো নট উইথ লে’কাল উইমেন।

উনিশ শতকে উপনিবেশগুলি’তে সাহেবদের আর-এক চিন্তা ছিল কালাে মা’নুষদের হা’ত থেকে শেতাঙ্গ বি’বি’দের রক্ষা করা। আর-এক দুশ্চিন্তা শ্বেতাঙ্গদের হা’ত থেকে শ্বেতাঙ্গ বউদের রক্ষা করা। ভিক্টোরিয়ান যুগে শ্বেতাঙ্গ কিছু নৃতাত্ত্বি’ক রটিয়েছিলেন কৃষ্ণাঙ্গদের যৌনতা এবং ক্ষমতা দুই-ই বেশি। আফ্রিকার উত্তমদে বসনহীন কৃষ্ণাঙ্গ ভেনাসদের দেখে আকর্ষণ বােধ করার সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্কে আঁতকে উঠছিলেন কেউ কেউ। কেননা, তাদের ধারণা, সুযােগ পেলে শ্বেতাঙ্গ মেয়েরও হয়তােক এভাবে উদ্দাম প্রকৃতির সন্তানে পরিণত হবেন ! আফ্রিকায় ধর্ষণ, এমনকী ধর্ষণের পর অ’ভিযােগে কৃষ্ণাঙ্গদের জন্যে মৃ’ত্যুদণ্ডের বি’ধান ছিল। ধর্ষণ শব্দটা’ পরাজয়সুচকনও মেমসাহেব বা তার রক্ষাকর্তা প্রকাশাে ‘তা স্বীকার করতে রাজি হবেন না সুলুক ধর্ষণের চেষ্টা’ ধর্ষণেরই শামিল। ঐতিহা’সিক বলেন, না জানি কত নিরপরাধ কৃষ্ণাঙ্গকে এই অ’ভিযােগে যুঠাসি দেওয়া হয়েছে! ভারতেও ইংরেজ মহিলালের ভাবমূর্তি অ’ম্লান রাখার জনা সে কী প্রাণপণ চেষ্টা’ : ১৯২৬ সালেও দেখি একজন ইংরেজ বি’শপ বছেন, ভারতে আমেরিকান চলচ্চিত্র দেখানাে উচিত নয়, তাতে চাঞ্চল্যকর গুন ছাড়াও রকমা’রি অ’পরাধ, প্রেম এবং বি’বাহবি’চ্ছেদ ইত্যাদি থাকে। ফলে, ভারতীয় দর্শকদের চোখে শ্বেতাঙ্গ নারীর ভাবমুর্তি বি’নষ্ট হয়। তার দু’ বছর আগে লন্ডনের ‘দ্য টা’ইমস’ কাগজে একই বি’ষয়ে এক আলােচনা প্রকাশিত হয়েছিল। বলা হয় একজন শ্বেতাঙ্গ অ’ফিসারের স্ত্রীকে নেটিভরা অ’পহরণ করে। সেটি আমেরিকান চলচ্চিত্র দেখারই ফল। তারও আগে একই বি’ষয়ে ‘ওয়েস্ট মিনিস্টা’র গেজেট’-এ তুমুল আলােচনা হয়ে গেছে। তাতেও জনৈক লেখক সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন, পশ্চিমের রীতিনীতি, নৈতিকতা, মেয়েদের পােশাক-আশাক, সর্বোপরি অ’বি’শ্বস্ত স্ত্রী এবং নৈতিকতাবর্জিত স্বামীকে কাণ্ডকারখানা চলচ্চিত্রে দেখানাে হলে নেটিভরা কী ভাববে! বি’শেষত, ওদের শরীর যত পুষ্টই হা’েক, মস্তিষ্ক যখন বি’চারবুদ্ধিহীন। ১৯১০ সালে শরীরী নৃত্যে পটু মট অ’্যালেন-এর ভারতে আগমন উপলক্ষে অ’তএব রীতিমতো কোলাহল! ‘তরুণ ভারতীয়রাও নিশ্চয় টিকিট কাটবে এই কাম-নৃত্য দেখার জন্য। শেষ পর্যন্ত নর্তকীর তার এদেশে আসা হয়নি।

করে স্থির দাড়িয়ে থাকতে পারেন। ভারতীয় রাজা-মহা’রাজ’রা হা’মেশাই ব্রিটেন থেকে রূপসী ইংরেজ দুহিতাকে নিয়ে ঘরে ফিরতেন। ১৮৯৩ সালে পাতিয়ালার মহা’রাজা যখন
একজন ইংরেজ মেয়েকে বি’য়ে করেন, তখন লর্ড ল্যান্সডাউন সরাসরি জানিয়ে দেন আপনার মতাে একজন মহা’রাজার পক্ষে এ-মেয়ে অ’বশ্যই যােগ্য স্ত্রী নয়। তা ছাড়া ইউরােপিয়ানরা একটি ইংরেজ মেয়েকে একজন দেশীয় রাজার অ’নেক স্ত্রীর একজন হিসাবে দেখে নি খুশি হবেন না। কয়েক বছর পরে লর্ড কার্জন যখন শুনতে পেলেন যে, ঝিন্দের রাজ: একটি শ্বেতাঙ্গ মেয়েকে বি’য়ে করেছেন, তখন তিনি রীতিমতাে আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন। দেশীয় রাজা-রাজড়ারা ইংল্যান্ডে গেলে শ্বেতাঙ্গ সমা’জে তাদের খাতির-যত্ন দেশে কার্জন বি’পন্ন বােধ করতেন। তিনি ফতােয়া জারি করেন, ভারতীয় রাজা-রাজড়ারা শুধু বি’শেষ কারণেই কালাপানি পার হতে পারবেন এবং দেখেশুনে বাছাই করে তাদের ছাড়পত্র দেওয়া হবে। কার্জন সেক্রেটা’রি অ’ব স্টেট লর্ড হ্যামিলটনকে বলেন, এ বড়ই অ’দ্ভুত যে, শুধু বাড়ির কাজের মেয়েরাই নয়, এমনকী উচ্চবর্গীয় মেয়েরাও ভারতীয়দের কাছে নিজেদের সমর্পণ করছে। হয়তাে তাদের দীর্থ দেহ, ইউনিফর্ম ইত্যাদি দেখে তারা ভাবছে, এই সৈনিকের আছে; মুশকিল আমা’দের তো মেয়েদের নিয়েই। অ’দ্ভুত ঘটনা এই, ‘দ্য তেজ অ’ব হা’েয়াইট উওমেন রানিং আফটা’র ব্ল্যাক মেন!’ কখনও কখনও এই ছােটা’ছুটি কোনও বধাবন্ধই মা’নত না। এমনকী, উচ্চনীচ ভেদাভেদ পর্যন্ত লােপ পেয়ে যেত। জিল কলকাতার একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন। ঘটনাটি ঘটে ১৯৮৩ সালের মা’ঝামা’ঝি। চাঞ্চল্যকর ঘটনা। একজন সরকারি আইনজীবীর স্ত্রী মিসেজেমস হিউমকে তার বাড়ির ঝাড়ুদার হরাে মেটা’ (সম্ভবত হরি মেথর) ধর্ষণ করেছে স্বামী দুজনকে স্নানঘরে একসঙ্গে দেখতে পান। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মেটা’র ওপর বঁ পড়ে প্রতিশােধ নেন। মেটা’ ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যায়। আদালতে মা’মলা হয়। তো মহিলাকে ধর্ষণের চেষ্টা’র অ’ভিযােগে লােকটির আট বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়। কি বেচারা আসলে ছিল নির্দোষ। মিসেস হিউমের সঙ্গে ছয় মা’স ধরে তার গােপন সম্পর্ক চলছিল। নিজের সম্মা’ন বাঁচাতেই হিউম মা’মলা দায়ের করেছিলেন। দু’ বছর পরে তিনি নিজেই লর্ড ডাফরিনের কাছে এই স্বীকারােক্তি করেন।

নেটিভদের কাছ থেকে তাে মেয়েদের ইজ্জত সব সময়ে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। অ’নধিকারী শ্বেতাঙ্গদের শরনিক্ষেপও প্রতিহত করা সম্ভব ছিল না। বাবসায়ী, বাগিচামলি’ক, সরকারি কর্মচারী এবং অ’ন্যান্য ইউরােপীয়রা তথ্যগতভাবে উপনিবেশগুলােতে বি’য়ে করার অ’ধিকারী ছিলেন। কিন্তু ক’জন আর বি’য়ে করতে পারতেন? সাধারণভাবে সৈন্যবাহিনীতে নিয়ম ছিল সাব-অ’লটা’র্নরা বি’য়ে করতে পারবেন না, ক্যাপ্টেনরা ইচ্ছে করলে বি’য়ে করতে পারবেন। মেজরদের বি’য়ে করা উচিত এবং কর্নেলদের অ’বশ্যই বি’য়ে করতে হবে। কিন্তু বলাই বাহুল্য, অ’নেকেরই বি’য়ের ফুল ফুটত না। ১৮৭১ সালে ব্রিটিশ অ’ফিসারদের মধ্যে শতকরা ত্রিশজন মা’ত্র ছিলেন বি’বাহিত। আর চব্বি’শ বছরের নীচে যাঁদের বয়স তাদের মধ্যে শতরা মা’ত্র দুই ভাগের ঘরে ছিল বউ। সুতরাং এদিক-সেদিক উকি-ঝুকি দেওয়া ছাড়া গতি কী? নৈতিকতার মা’ন ক্রমে সিঁড়ি ভেঙে নীচের দিকে যাচ্ছে দেখে কেউ কেউ পরামর্শ দিয়েছিলেন, শ্বেতাঙ্গদের সকলেরই বি’য়ের ব্যবস্থা করা উচিত। সি ই ট্র্যাভেলি’য়ন তাই শুনে মন্তব্য করেছিলেন। বাট হা’েয়ার ওয়ার ওয়াইস টু বি’ ফাউণ্ড ফর সাকসেসিভ রিলেস অ’ব ৭০,০০০ মেন! স্বভাবতই ক্যান্টনমেন্টগুলি’তে ব্যাচেলরই থাকতেন বেশি, বউ কম। আর সে-কারণেই শহরে বা ছাউনিতে সুদর্শনা শ্বেতাঙ্গিনীটি হয়ে দাড়াতেন সকলের চোখের মণি। জীবনে তাদের রােমা’ঞ্চ ছিল বইকী! ছিল কিঞ্চিৎ ঝুকিও। স্বামীরা নানাবি’ধ বি’ধিনিষেধ দিয়ে তাদের বেঁধে রাখতে চাইতেন, তবু মা’ঝেমধ্যেই অ’ন্যরকম ঘটে যেত। ভারত জুড়েও সেদিন অ’নেক সেজো মেজো ছােট মা’পের ইংরেজ যুবাও যেন এক-একজন লর্ড কার্জন কি আলফ্রেড মিনার। পাটি, ক্লাব, অ’্যামেচার থিয়েটা’র এবং সামা’জিকতার। নানা সূত্রে গোৱা বি’বি’রা অ’ন্য পুরুষদের সঙ্গে মেলামেশার যে সুযােগটুকু পেতেন তার অ’ন্যরকম সদব্যবহা’রও তারা কখনও-সখনও করতেন বইকী। এলাহা’বাদের ‘দ্য পাইওনিয়ার’ কাগজ ১৮৮২ সালে লি’খেছিল ভ’রতে ইংরেজ সাজ অ’নেক বেশি খােলামেলা। এখানে শ্বেতাঙ্গ নারীপুরু ব্রিটেনের তুলনায় অ’নেক বেশি একসঙ্গে মেলামেশার সুযােগ পান, ফলে এখানে প্রেমপ্রণয় তথা ফস্টিনষ্টি এক উপভােগ্য ক্রীড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। অ’বশ্য কখনও কখনও অ’ন্যরকমও ঘটে। মেয়েটি যদি নির্বোধ হয়, এবং যুবক অ’নভিজ্ঞ, তবে পরিণাম যে খারাপ হবে, তাতে আর অ’বাক হওয়ার কী আছে? সিমলায় অ’নেক কাণ্ডই হত। স্বামীরা হয়তাে রােদে পুড়ে ঘেমে-নেয়ে দূরে সতলে কোথাও সাম্রাজ্য গড়ার কাজ করছেন, বউ তখন শীতের সিমলায় আনন্দ উপভােগ করছেন। দা ট্রাক টা’র্ট’! ‘বেটি-বেড আন-ব্রেকফাস্ট’ এ-সব নাকি কোনও কোনও হিল স্টেশনের বাের্ডিং হা’উসের ডাকনাম। কলকাতার একজন যৌন ক্ষ্মীকে কে যেন প্রশ্ন করেছিলেন, তুমি সিমলায় গেলে না? তার সহা’স্য উত্তর, ‘উই শুভ হা’তনাে চান্স উইথ দা অ’্যামেচার! | ওঁরা স্বজাতির মেয়ে। খাঁটি ইংরেজ কন্যা। ভারতের আংলাে-ইন্ডিয়ার তাে হলেও রক্তে খাটি ইংরেজা নয়। সুতরাং তাদের সঙ্কেমলামেশা মা’খামা’খি যতই চলুক, বি’য়ের প্রশ্ন ওঠে না। যদি বা বি’য়ে হয়, অ’ধিকাংশ স্বাক্ষর সন্তানসন্ততিসহ তাদের ফেলে রেখে নিজের দেশে ফিরে যান। ঔপনিবেশিক যুসের নারীর সম্পর্কের ইতিহা’সে অ’ংলাে-ইণ্ডিয়ানসের কাহিনী বি’শেষ করে করুণ। ওঁরা সর্ব দিয়েও বলতে গেলে কিছুই পাননি। সেকালে যদি বা পেয়েছেন, একালে কিছুই নয়। | মা’র্টিন শ’ খাটি ইংরেজ। এই শতকের প্রথম দিকে তিনি এদেশে এক বড় সওদাগরি অ’ফিসে কাজ করতেন। অ’ন্যান্য অ’ফিসারদের সঙ্গে বাস করতেন বোম্বাইয়ের এক বাড়িতে। মা’টিন শ’ একসময়ে সেখান থেকে উঠে এসে এক অ’ংলাে ইন্ডিয়ান পরিবারে পেয়িং গেস্ট হিসাবে বাস করতে শুরু করেন। পলি’ন সে-বাড়ির রূপবতী অ’ষ্টা’দশী মেয়ে তার মা’থায় সোনালি’ চুল। যদিও জন্ম তার ভারতে। সে লেখাপড়া শিখেছে ইংল্যান্ডে। তার বাবা টেলি’ফোন কোম্পানিতে কাজ করেন। মা’ ছিলেন আধা গ্রিক। মা’র্টিন শ’ দেশে ফেরার সময় পলি’নের আঙুলে আংটি পরিয়ে দিয়ে যান। সে বাগদত্তা। কিন্তু আরও অ’নেক খাটি ইংরেজের মতাে মা’র্টিনের মনে প্রশ্ন—পলি’ন কি খাঁটি ইংরেজ? ভাবতে ভাবতে একসময়ে তিনি মরিয়া হয়ে ওঠেন। পলি’নের বাবাকে প্রশ্ন করেন—আপনাদের মধ্যে কি ইউরােপিয়ান রও আছে? ভদ্রলােক প্রথমে চুপ করে থাকেন মা’র্টিন সাহেব ধরে নেন, অ’নিশ্চয়তার দিন শেষ। শেষ হয়ে গেল তার সুখের দিনও। পলি’নের বাবা হঠাৎ ফেটে পড়লেন, আমা’র মধ্যে কালাে-সাদা-হলুদ পীত বা অ’ন্য শেনও রক্ত আছে কি না আমি তা নিয়ে তােমা’র সঙ্গে কথা বলতে চাই না। তুমি এখান থেকে বেরিয়ে যাও। তিনি পলি’নকে বললেন, আংটি ফিরিয়ে দিতে। হঠকারী মা’টিন শ’ তার পরও পলি’নকে প্রশ্ন করেন, তুমি কি খাটি শ্বেতাঙ্গ? সে কোনও উত্তর দেয় না। শুধু বলে তুমি আমা’দের গোটা’ পরিবারকে অ’পমা’ন করলে মা’টিন দেশে ফিরে যান। সেখানেই তিনি বি’য়ে করেন। ভারতে তার অ’ভিজ্ঞতার প্রতিটি ঘটনা সবি’স্তারে তিনি চিঠি লি’খে জানিয়েছিলেন দেশে তার মা’-বাবাকে। কন্যার সূত্রে সেই পত্রাবলি’ আজ ঔপনিবেশিকতার ইতিহা’সে দরকারি দলি’ল। কনা বলছেন, বাবার উচিত ছিল সেই মেয়েটিকে বি’য়ে করে দেশে নিয়ে আসা। কিন্তু উচিত-অ’নুচিত নিয়ে ভাববার সময় কোথায় খাটি ইংরেজদের দ্বি’তীয় মহা’যুদ্ধের সময়কার স্মৃ’তিচারণ করেছেন একজন অ’্যাংলাে-ইন্ডিয়ান মহিলা। তিনি তখন লখনউতে। বলছেন, হজরতগঞ্জে নাচের হলে ইংরেজ সৈন্যরা অ’্যাংলাে-ইন্ডিয়ান মেয়েদের নিয়ে যা-তা করত। টা’নাহ্যাচড়া তাে বটেই, এমনকী শারীণিকভাবে নির্যাতন পর্যন্ত। যাকে বলে যৌন পীড়ন। এজন্য আমি ওদের ঘৃণা করতাম। শেষ পর্যন্ত ওরা যখন চলে যেত, তখন এই মেয়েরা বি’শেষ করে বাচ্চা কোলে বউ কাদতে কাদতে তাদের বি’দায় জানাতেন। বলতেন, বি’ল তুমি ফিরে এসাে, ফিরে এতাে কিন্তু। এবং সৈন্যরা উত্তর দিত— হঁ্যা, জেন, অ’মরা ফিরে আসব। কিন্তু কোনওদিন ওঁরা ফেরেননি।
“I naturally prefer to satisfy myself with a woman, a friend and a lady of my own class, but in the absence of the best I gladly take the next best available, down the scale from a lady for whom I do not care, to prosititutes of all classes and colours, men, boys and animals, melons, and masturbation – 3 tie 3 শতকের একজন ইংরেজ ঔপনিবেশিকের। সুতরাং শুধু খাঁটি ইংরেজি গােলাপ বা আংলাে-ইন্ডিয়ান সুন্দরীদের চার পাশে ঘুরপাক খেয়ে হয়রান হবেন কেন! সথায় থাক ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতা। চুলােয় যাকুরেঅ’লাদের নীতিকথা। অ’্যান্টন জিল বলছেন, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আপত্তি সত্ত্বেও কউ কেউ নেটিভ মেয়েদের নিয়ে বসবাস করতেন। যথা— উত্তর রোডেশিয়’র ‘নেটিভ কমিশনার পাক্কা সাহেব জে ই চিরুপেলে স্টিভেনসন। তার একটি স্থানীয় ‘স্লি’পিং-ডিকশেনারি’ বা বি’বি’ ছিল। সরকারের তরফে প্রশ্ন তােলা হলে তিনি চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে নিজের মতাে করে থাকতে শুরু করেন। তিনি জীবনাচারে খাঁটি ইংরেজ ছিলেন। পােশাক-আশাক চাল-চলনে, সভ্যতা-সংস্কৃতিতে যাকে বলে যােলাে আনা অ’্যাংলাে-স্যাক্সন। ব্যতিক্রম শুধু নারী-রুচিতে। তিনি নাকি বেশ কয়েকজন স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েকে বি’য়ে করেন। আটজন কন্যাসন্তানের গর্বি’ত পিতা তিনি। কেনিয়ায় ক্যাপ্টেন ডবলি’উ আ সি হিউজেস নামে এক ইংরেজের নামই হয়ে গিয়েছিল ব্ল্যাক হিউজেস’। তিনি প্রগশােই একটি কালাে মেয়েকে নিয়ে বাস করতেন। তার চেয়েও অ’বাক করা ঘটনা ঘটেছে আফ্রিকায়। কেমব্রিজে পড়া একটি ইংরেজ মেয়ে তার প্রেমিক স্বামীর সঙ্গে পাের্ট হে পেীছে শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারেন ভালবাসার সম্পর্ক হলেও তার সঙ্গে ঘর করা যায় না। শিক্ষিত স্ত্রী যা-ই করতে চান, স্বামীর তা না-পছন্দ। এমনকী শােওয়ার ঘরেও তিনি যেন কালাে মেয়ে পেলেই খুশি হন বেশি। পরিস্থিতি দেখে অ’সহা’য় মেয়েটিকে একজন ওপরঅ’লা সাহেব কিছুদিনের জন্য দূরে সরিয়ে নিয়ে যান। মা’স-দুই পারে আবার স্বামী-স্ত্রীর দেখা। স্বামী বলেন, স্থানীয় রীতি অ’নুযায়ী একটি আফ্রিকান মেয়েকে তিনি বি’য়ে করেছেন এবং তাকে নিয়ে বেশ সুখেই আছেন। ১৯০৫ সালে কেনিয়ায় আরও একটি ঘটনা ঘটে। স্থানীয় একজুন পুলি’শ অ’ফিসারের স্ত্রীর সঙ্গে পরঅ’লার এক সাহেবের ভাবভালবাসা হয়। তাই দেখে আঃ-এক সাহেব কর্তৃপক্ষের কাছে নালি’শ করেন। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ পার্লামেন্টে
নেটিভ নারীর সঙ্গে শ্বেতাঙ্গ কর্তৃপক্ষের বি’য়েশাদি নিয়ে জোর এক পশলা বি’তর্ক হয়ে যায়। সেক্রেটা’রি অ’ব স্টেটস লর্ড কেরু ১৯০৯ সালে উপনিবেশগুলি’তে ব্রিটিশ নাগরিকদের নৈতিকতা রক্ষার লক্ষ্যে এক ফতােয়া জারি করেন। কী করা উচিত, কী নয়, নিয়ম ভঙ্গ করলে সাজা কী, সবই বলা হয়েছিল সেই সর্বজনীন হুকুমনামা’য়। কিন্তু কাজ খুব হয়েছিল বলে মনে হয় না। কেননা, তার পরেই দেখি ভারতের ঔরঙ্গাবাদে নিযুক্ত এক সাহেব রীতিমতো বড়াই করে বলছেন, ‘মহকুমা’ শহর সীতামা’রি চমৎকার জায়গা। আমি দিনভর সেখানে কাজ করেছি, রাতভর আমা’েদ।’ অ’ান্টন জিল ভারতে আরও দুই সাহেবের বি’বি’-বি’লাসের একটি কাহিনী শুনিয়েছেন। এ-ঘটনা উনিশ শতকের মা’ঝামা’ঝি সময়ের। ক্যাপ্টেন ওয়াল্টা’রস এবং ডক্টর নেল দুই বন্ধু। ডা. লেন-এর একজন দিশি বি’বি’ ছিল। ছুটিতে দেশে যাওয়ার সময়ে তাকে দেখাশোনার ভার তিনি দিয়ে যান ক্যাপ্টেন ওয়াল্টা’রসকে। এই বি’বি’র সঙ্গে তারও পরিচয় ছিল। কিন্তু নেল-এর অ’নুপস্থিতিতে সে-পরিচয় অ’ন্য মা’েড় নেয়। বি’বি’ বলে, নেল তাকে মা’রধর করেন, সে আর তাঁর কাছে যাবে না। ফলে, নেল ফিরে আসার পর এক বি’বি’কে নিয়ে দুই বন্ধুর মধ্যে রীতিমতাে মা’রামা’রি। সাহেবপাড়ায় স্ক্যান্ডাল। শেষ পর্যন্ত দু’জনের জীবনই ওপরঅ’লাদের হস্তক্ষেপে কার্যত বরবাদ। অ’্যান্টন লি’ ইচ্ছে করলে এ-ধরনের আরও কাহিনী শােনাতে পারতেন। মা’র্গারেট ম্যাকমিলান-এর লেখা “উওমেন অ’ব দ্য জাজ’-এর কথা মনে পড়ছে। তিনি । লি’খেছিলেন, সরকারি নির্দেশ যাই হা’েক, বি’শ্বের্য চা-বাগানে শ্বেতাঙ্গরা তার খুব একটা’ তােয়াক্কা করতেন না। বুদ্ধিমতী ইউরােপিয়ান মেয়েরা এদেশে স্বামীর ঘর করতে এসে বি’বি’র সন্ধান পেলে পেনশন দিয়ে তুলে বি’দায় করতেন। একবার একটি মেয়ে এসে দেখেন তার পতিদেবতার ছয়-ছয়টি সন্তান রয়েছে বাগানের এক মেয়ের ঘরে। তিনি বি’বাহবি’চ্ছেদ ছাড়া এই নেশা কাটা’বার আর কোনও পথ খুঁজে পাননি। আর-একটি মেয়ে নববধু হয়ে ভারতে স্বামীর এই পরিচয় পেয়ে লজ্জায়, অ’পমা’নে, ক্ষোভে, দুঃখে আত্মহত্যা করেন।

অ’ষ্টা’দশ শতকে ইংরেজ অ’ভিযাত্রীর সঙ্গে উনিশ শতকের ভিক্টোরিয়ান ইংরেজ অ’ভিযাত্রীর নৈতিকতার পার্থক্য বােঝাতে একজন ঐতিহা’সিক লি’খেছেন, অ’ষ্টা’দশ শতকে কোনও ইংরেজ সৈন্য ফরাসিদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে যাওয়ার সময়ে পাঠ্য হিসাবে অ’নায়াসে যোনি হিল’ সঙ্গে নিয়ে যেতেন। সেই বি’খ্যাত বইটি, যাতে একজন ইংরেজ যৌন কর্মী সাধারণ আমা’েদিনী থেকে নিজেকে উন্নীত করেছিলেন সমা’জের ওপরতলার এক নায়িকা হিসাবে। আর উনিশ শতকে সেই সৈনিকই বুয়র যুদ্ধে ‘ফেনি হিল’ সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে পারতেন না। তার থলি’তে থাকত ‘থ্রি মেন ইন আ বােট। দেশপ্রেমের আদর্শবান ধর্মপ্রাণ কর্তব্যপরায়ণ ইংরেজ যুবকের কাছে উনিশ শতকে এমনটিই প্রত্যাশা করত তার স্বদেশ ও সমা’জ। কিন্তু ভারত তথা বি’শ্বব্যাপী সাম্রাজ্যের খােলা হা’ওয়ায় বি’পুল বৈচিত্রে এবং রকমা’রি প্রলােভনের হা’তছানিতে পড়ে সে যুবকের পক্ষে নিজের আদর্শ ভাবমূর্তিটি অ’টুট রাখা শক্ত ছিল বইশ। বি’শেষত, ভারত এমন এক দেশ যেখানে কামনা-বাসনা নিন্দিত নয়, জীবনের পক্ষে বাঞ্ছিত বলে গণ্য। ধর্ম, অ’র্থ, কাম এবং মা’েক্ষ ভারতীয় হিন্দুর কাছে ধর্মতুল্য। সুতরাং ইংরেঞ্জ ৩রুণের পায়ের তলা থেকে মা’টি ধীরে ধীরে সরে যেতে থাকে, সে বুঝি বা ডুবে যায় আনন্দ সাগরে। পদারে তার উৎসাহে ঘাটতি নেই, আপত্তি নেই অ’সবর্ণ। দেশি বি’বি’, অ’্যাংলাে-ইণ্ডিয়ান বান্ধব৷ এবং দেশীয় প্রেমিকা যদি না জোটে তা হলে উবেগের কিছু নেই। উনিশ শতকের ইংরেজ অ’ভিযাত্রীদের কাছে আয়া, দুধওয়ালি’, ঘেসডে, জেলেনি, ফেরিওয়ালি’, ঝাড়ুদারনি, তাঁতি কোনও মেয়েই অ’চ্ছুৎ নয়। কেউ কেউ তো ভারতীয় ঘেসুড়ে নারীর রূপ বর্ণনা করতে গিয়ে উচ্ছ্বসিত। সাহেবকুঠির আয় বা খিদমতগার বাবুর্চিরা সাহেবের পছন্দমতাে মেয়েদের সংগ্রহ করে আনত। সাম্রাজ্যের অ’ন্যত্রও একই কাহিনী। কেনিয়’য় কেরুর সার্কুলারের পর গেভাঘ’ন নামে এক সাহেবের জবানব; একটি মেয়ের কথা সানন্দে আমি মনে রেখেছি। বেশ কয়েক বছর সম্পর্ক ছিল আমা’দের। সে তার নিজের গ্রামে নিজের পরিবারের সঙ্গে বাস করত, ‘আমি আমা’র কুঠিতে। এটা’ই ছিল নিয়ম। বােঝাপড়া ছিল সে কখনও সরাসরি আমা’র বাড়িতে এসে হা’জির হবে না। বি’শেষ করে বাড়িতে কোনও পাটি থাকলে তাে নয়ই। এক দিনের কথা মনে পড়ে, আমরা দুজনে একসঙ্গে আনলে সময় কাটা’চ্ছিলাম, তার পর আমি বলি’, অ’ত্যন্ত দুঃখিত, আমা’কে বাড়ির বাইরে খেতে যেতে হৃবে। অ’ন্য এক সাহেব-কুঠিতে নেমন্তন্ন আছে। সেখানে খেতে খেতে আমা’র হা’সি পাচ্ছিল। অ’ন্য অ’তিথিরা যনি জানতেন, আমি কাকে বাড়িতে রেখে এসেছি এবং কার কাছে ফিরে যেতে চাইছি, তবে তারা কী ভাবতেন? এই শ্বেতাঙ্গ ভদ্রলােকের সঙ্গে আফ্রিকায় আরও কিছু কৃষ্ণাঙ্গ মেয়ের ভাব ভালবাসা ছিল । অ’র-একটি মেয়ে সম্পর্কে তিনি লি’খছেন, সে তরুণটি ছিল খুব লম্বা, রং ছিল তার ঘাের কালাে শরীরে লম্বা পোশাক, মা’থায় সিল্কের গুঞ্জ। সে ‘অ’সত বাস্কেট’ ফিরি করতে।… তার সঙ্গ কী আনন্দদায়কই না ছিল! আমা’রূএখনও মনে আছে, তার হা’সি, তার কথাবার্তা, গল্পগুজব, তার অ’ন্তরঙ্গতার কথা। তার চুল তার অ’সাধারণ নজরকাড়া শরীর, এমনকী তার সামনের উচু দাঁতটি পর্যন্ত আমা’র মা’ আছে, যেন গতকালের কথা।

ওরা পেশাদার যৌন কর্মী নয়। বি’শেষ পরিবেশে ক্ষমতাবানের হা’তে অ’নেকেই ছিল সহা’য়তার শিকার। সাম্রাজ্য শুধু এদের দিয়ে লালনপালন করা যায় না। পৃথিবী জুড়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। সেখানে সূর্য অ’স্ত যায় না। ব্যবস;য়ে-বাণিজ্যে, রকমা’রি নির্মা’ণ কাজে, বাগ-বাগিচায়, খনিতে শহরে বন্দরে, লড়াইয়ের মা’ঠে, প্রশাসনের অ’নাসেকানাচে সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে অ’সংখ্য ব্রিটিশ নাগরিক। এক ভারতেই নাকি ২০ নৃক্ষ ইংরেজ সমা’ধিস্থ। এই সাম্রাজ্য গড়ার কারিগরদের অ’ধিকাংশই ছিলেন পরিবারইন নিঃসঙ্গ পুরুষ। স্বভাবতই টুকিটা’কি আয়োজনে তাদের তৃপ্ত করা সম্ভব ছিল না। তাদের সঙ্গদানের জন্য সেদিন গড়ে উঠেছিল আন্তর্জাতিক স্তরে যৌনতার বাণিজ্য। বি’শ্বরণ কথাটা’ ইদানীং খুব চালু হয়েছে। সারা পৃথিবীকে ৬া হচ্ছে অ’খণ্ড এক বাজার হিসাবে। ঠিক তেমনি সেদিন ঔপনিবেশিক পৃথিবীতেও মেয়েরা পরিণত হয় এক আন্তর্জাতিক বাজারের পণ্যে। হা’, পশ্চিমের শ্বেতাঙ্গ মেয়েরাও। তৎকালীন বাজারের ভাষায় এ বাণিজ্যের নাম ‘হা’েয়াইট সেভ ট্রাফিক’। হা’জার হা’জার শ্বেতাঙ্গ মেয়ে যােগ দেন সেই নিঃশব্দ অ’স্পষ্ট, অ’থচ জমজমা’ট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে। বাষ্পীয় পােত এবং রেলপথের দৌলতে এক দেশের নারী দ্রুত পণ্য হয়ে পৌছে যেতেন অ’ন্য দেশে, উপনিবেশের আমা’েদের হা’টে। কলকাতায়ও তাদের কথা শােনা গেছে। বার বার। উনিশ শতকের শেষ দিকে ফানি অ’্যাবস্টেন নামে একটি শ্বেতাঙ্গ তরুণীর কাহিনী শুনিয়েছে অ’্যান্টিন। লি’ । এই অ’ষ্টা’দশী তরুণী চৌত্রিশ বছরের আলেকজান্ডার কান নামে এক যুবকের সঙ্গে লন্ডন থেকে নিরুদ্দেশ হন। তার বাবা কোনও এক পতিতােদ্ধার সমিতির সহা’য়তায় মেয়েকে খুঁজে পান বােম্বাইয়ে। সেখানে তিনি অ’্যানি গুড় নামে আর-একটি সমবয়স্ক শ্বেতাঙ্গ মেয়ের সঙ্গে বাস করছিলেন। তারা দু’জনে শহরে একটি সেলুন বার চালাচ্ছিলেন। পুলি’শের কাছে মেয়েটি বলেন, বােম্বাই এসেছেন তিনি স্বেচ্ছায়, এবং তিনি দিব্যি সুখে আছেন। তবু কান-এর বি’রুদ্ধে নাবালি’কা হরণের মা’মলা দায়ের করা হয়। কিন্তু অ’ভিযােগ প্রমা’ণ করা সম্ভব হয়নি। শুধু কলকাতা বা বােম্বাই নয়, যেখানে ঔপনিবেশিকদের অ’ড়া সেখানেই সাদা, কালে’, বাদামি বা তাম্রবর্ণ মেয়েদের ভিড়। স্বভাবতই সাম্রাজ্যের অ’ন্যান্য ক্ষুধার মতে এই বি’শেষ ক্ষুধা মেটা’বার দায় বহন করতে হয় উপনিবেশগুলােরই। সুতরাং মা’নচিত্রে রক্ত-লাঞ্ছিত দেশগুলাের মতােই ঔপনিবেশিক শহরগুলােতেও সেদিন ‘লালবাজার’। একালে ‘রেড লাইট ডিস্ট্রিক্ট’ বলে শহরের বি’শেষ প্রমা’েদ এলাকাগুলি’কে চিহ্নিত করার মতােই ভারতে ঔপনিবেশিক আমলে শহরে শহরে সেই পল্লীগুলোকে সাহেবরা বললেন, ‘লালবাজার। কর্তৃপক্ষ সাধারণ ইংরেজ যুবকদের মতােই সৈন্যদেরও নৈতিক মন যারপরনাই সু-উচ্চ রাখায় যত্নবান ছিলেন। তাদের বলা হত, নিয়মিত ব্যায়াম করবে, স্বাস্থ্যসচেতন থাকবে, পুষ্টিকর খাদ্য খাবে, ঠান্ডা জলে স্নান করবে ইত্যাদি ইত্যাদি। নিষেধের মধ্যে ছিল— ব্যারাকে নিজেদের মধ্যে মা’রামা’রি বা দাঙ্গাহা’ঙ্গামা’ না করা। হুকুম ছিল-স্থানীয় মেয়েদের ওপর হা’মলা করবে না। এমনই আরও কিছু উপদেশামৃ’ত। কিন্তু তারা জানতেন, এই দূর দেশে সৈন্যদের পক্ষে এ-সুপরামর্শ মেনে চলা সম্ভব নাও হতে পারে। অ’থচ তাদের যদৃচ্ছ স্বাধীনতা দিলে যৌনকর্ধের কবলে পড়ার সম্ভাবনা। সুতরাং এই নিয়ন্ত্রিত আমা’েদশালা বা লালবাজারের বেস্ত। ভারতে যেখানেই সৈনা ছাউনি ছিল, সেখানেই গড়ে তােলা হত লালবাজার খাশােনার ভার থাকত বয়স্ক স্থানীয় মেয়েদের ওপর। বাহিনীর ক্যান্টিন থেকে তাই মা’সে গড়ে পাঁচ টা’কা বেতন দেওয়া হত। মিরাটে একবার নিয়মিত বেতন না পেয়ে এই মহিলারা চলে যান। ফলে তিন মা’সের মধ্যে যৌনব্যাধির প্রকোপ নাকি বেড়ে যায়। রােগীর সংখ্যা চার থেকে বাইশে পৌঁছয়। এইসব প্রমা’েদশালা নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ ছিল না। পুলি’শ কোনও অ’সুস্থ মেয়েকে শনাক্ত করলে সে ঘুষ দিয়ে দিব্যি থেকে যেত। তা ছাড়া লালবাজারের বাইরের মেয়েরাও এসে ইউরােপিয়ান ‘ ছাউনির আশপাশে আস্তানা গেড়ে বসে যেতেন। সৈনারা তাদের ঘরেও উকি দিত। কেননা, তুলনায় ওঁরা সন্ত’। তালি’কাভুক্ত মেয়েরা পয়সা নেয় বেশি।

অ’তিঙ্কিত কর্তৃপক্ষ সৈন্যদের মা’রাত্বক যৌনব্যাধি থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আরও একটি কৌশল চালু করেছিলেন। লালবাজারের মতােই তারা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘লক হসপিটা’ল’। অ’সুস্থ মেয়েদের ধরে এনে অ’ক্ষরিক অ’র্থে তালা বন্ধ করে রেখে তাদের চিকিৎসা করা হত। এখনও ও-স খ্যাধির যথার্থ চিকিৎসা মা’নুষের করায়ত্ত নয়। ফলে তথাকথিত সুস্থ মেয়েরা আবার ফিরে এসে রােগ ছড়াতেন। ১৮৬৬ সালে ব্রিটেনেও এ ধরনের উদ্যােগ শুরু হয়েছিল। সে বছরই চালু হয় সংক্রামক ব্যাধি সংক্রান্ত আইন ! ভারতে এই আইন চালু হয় দু’বছর পরে, ১৮৬৮ সালে। এই ‘লক হা’সপাতাল উপলক্ষে লন্ডনে বি’স্তর হট্টগােল শোনা গেছে। কলকাতায়ও রীতিমতাে আন্দোলন। চিকিৎসার নামে অ’সহা’য় ভারতীয় মেয়েদের ধরে এনে অ’ত্যাচার করা হচ্ছে। তাদের নানাভাবে অ’পমা’নি, এমনকী ধর্ষণ করা হচ্ছে, এই অ’ভিযােগও ওঠে। বস্তুত তাই নিয়ে কাতায় রীতিমতাে উত্তেজনা। বটতলা থেকেও কয়েকখানা প্রহসন বের হয়েছিল এই
উপলক্ষে। যতদূর মনে পড়ে তার একটির নাম ছিল- ‘বাহবা চৌদ্দ আইন,
আন্দোলনের ফলে ইংল্যান্ডে শেষ পর্যন্ত এই আইন তুলে নিতে হয়। তুলে নেওয়া হয় ভারত থেকেও। তার পর উনবি’ংশ শতাব্দীর শেষ দিকে চালু করা হয় ‘মিলি’টা’রি ক্যান্টনমেন্ট অ’্যাক্ট’। তারও উদ্দেশ্য যৌনব্যাধির কবল থেকে ব্রিটিশ সৈন্যদের রক্ষা করা। লালবাজারের মতাে প্রমা’েদের স্বতন্ত্র এলাকা এই আইনে নির্দিষ্ট করা হয়নি। ইউরােপীয়দের জন্য বেশি খরচের কিছু বাড়ি সংরক্ষিত করা ছিল এই যা। অ’বশ্য সৈনাদের জন্য অ’ন্যভাবেও প্রসােদকন্যা সংগ্রহ চলত। ১৮৮৬ সালে কাগজে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, আম্বালা ছাউনির প্যান্ডিং অ’ফিসার তার রেজিমেন্টের জন্য ছয়জন সুন্দরী নারী সংগ্রহের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। তার বাহিনীতে সৈন্যসংখ্যা চারশাে। হা’তের কাছে মেয়ে রয়েছেন মা’ত্র ছয় দেন। তিনি আরও জনা-ছরেক মেয়ে চান। শেষ পর্যন্ত অ’বশ্য সব ধরনের প্রমমশালা থেকেই আইন তুলে নেওয়া হয়। ঐতিহা’কিরা বলছেন, তাতে ব্রিটিশ বাহিনীর ক্ষতিই হয়েছিল। ফরাসি এবং জার্মা’নরা নিয়ন্ত্রিত আমা’েদশালার ব্যবস্থা রাখতেন। তাতে দেখা যায় ১৮৯৬ সালে ভারতে ব্রিটিশ সৈন্যদের মধ্যে যখন এক হা’জার জনের মধ্যে ৫৫২ জনই ব্যাধিগ্রস্ত, জার্মা’ন বাহিনীতে তখন তাদের অ’নুপাত মা’ত্র সাতাশ জন। ফরাসি বাহিনীতে পয়তাল্লি’শ জন। আইন অ’বশ্য আবার পালটা’নাে হয়েছিল। কিন্তু বলা নিষ্প্রয়ােজন, পৃথিবীর আদিমতম পেশা যেমন ছিলু ছিমনই রয়ে গেল। আমরা ব্যাধিগ্রস্ত ইংরেজ সৈন্যদের পরিসংখ্যান জানি, কিন্তু তৎকা দুরারােগ্য ব্যাধিতে তিলে তিলে ভুগে মরেছেন যে মেয়েরা, তাদের কোনও পরিনই আমা’দের জানা নেই। | বাইরে এক ভেতরে অ’ন্য। ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতা আজ উপকথা মা’ত্র। উপনিবেশগুলি’তেও ওদের আসল সুখ ছিল মুখােশের আড়ালে। সমকামিতার নামে ভিক্টোরিয়ান ইংল্যান্ড কনে আঙুল দিত, তথ্য লন্ডনের ক্লি’ভল্যান্ড স্ট্রিটে ১৮৮৯ সালে সমকামীরা নাকি রীতিমতো গড়ে তােলেন বাজার। সেখানে অ’নেক গণ্যমা’ন্য ইংরেজের আনাগােনা। অ’থচ এক দশক বা তার কাছাকাছি সময়ে অ’স্কার ওয়াইন্ডের বি’চার হয়ে গেল। ‘লাভ দ্যাট ডেয়ার নট স্পিক ইটস নেম বা পুরুষে পুরুষে সম্পর্ক খাস ইংল্যান্ডে যদি থাকতে পারে, তবে উপনিবেশগুলােতে যে আরও প্রস্ফুটিত হয়ে উঠবে তাতে আর বি’স্ময় কী? অ’বশ্য কেলেঙ্কারি জানাজানি হয়ে গেলে পতন ছিল তৎকালে অ’নিবার্য। স্যার হেক্টর ম্যাকডােনাল্ড উনপঞ্চাশ বছর বয়সে সিংহল তথা আজকের শ্রীলঙ্কার প্রধান সেনাপতি হয়েছিলেন। তিনি একজন বি’শিষ্ট সৈনিক। দুটি যুদ্ধে লড়াই করে সম্মা’ন পদক লাভ করেছেন, স্বদেশ স্কটল্যান্ডে বলতে গেলে তিনি জাতীয় বীর। একসময়ে বি’য়েও করেছিলেন। পরে অ’বশ্য বি’য়ে ভেঙে যায়। স্বদেশে তার অ’ন্য কোনওরকম আসক্তির কথা শােনা যায়নি। কিন্তু কান্ডিতে এক রেল-কামরায় চারজন সিংহলি’ তরুণের সঙ্গে ভ্রমণকালে তার আচরণে একজন বাগিচা-মা’লি’ক অ’স্বাভাবি’কতা লক্ষ করেন। অ’ভিযােগ ওঠে। তিনি প্রথমে অ’ভিযােগ অ’স্বীকার করেন, কিন্তু সে বছরই নিজ হা’তে নিজের জীবন কেড়ে নেন। আর-একজন স্যার রজার কেসমেন্ট। তিনি ছিলেন দাসবি’রােধী আন্দোলনের একজন নেতা। বেলজিয়াম কঙ্গো এবং পেরুতে দাসদের মুক্তির জন্য আন্দোলন করেছেন। ম্যাকডোনাল্ড যে বছরে মা’রা যান, সে বছরেই তার গােপন ডায়েরি লি’খতে শুরু করেন। সেই ডায়েরি পরবর্তীকালে আবি’ষ্কৃত হয়েছে তাতে দেখা যায়, তিনিও সমকামী ছিলেন।

পাতার পর পাতা জুড়ে তিনি লি’খে গেছেন তাঁর যৌনজীবনের কাহিনী। ১৯১৬ সালে ইংরেজরা তাকে গুলি’ করে মা’রে। কারণ, কেসমেন্ট আইরিশ বি’প্লবীদের প্রতি সহা’নুভূতিশীল ছিলেন। তিনি নাকি তাদের সঙ্গে হা’ত মিলি’য়েছিলেন। ওই গােপন ডায়েরিটি তখন কারও হা’তে পড়লে হয়তাে তাকেও আত্মঘাতী হতে হত সেদিন!

এই আবহা’ওয়ার মধ্যে কিন্তু ইংরেজরা চেষ্টা’ করেছেন সাম্রাজ্যের কর্মীদের শুদ্ধ ও পবি’ত্র রাখতে। এমনকী দখল-করা দেশগুলােতেও কিছু কিছু সংস্কার আন্দোলন চালাতে। তা। করতে গিয়ে কখনও কখনও সংস্কারকরা জাতীয় আবেগকে জাগিয়ে তুলেছেন। কিন্তু কিছু কিছু অ’নিষ্টকর প্রথা তাদের চেষ্টা’য় অ’বশ্যই লােপ পেয়েছে। তবে সাধারণভাবে যৌনজীবনে সদাচার বা নৈতিক বি’শুদ্ধতা যে তাদের পক্ষে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি, সে কাহিনী আজ আর গােপন নেই। শাসকদের হা’ত ধরে উপনিবেশগুলােতে হা’না দিয়েছিলেন পাদ্রিরা। শুধু বাণিজ্য নয়, মুনাফার সঙ্গে খ্রিস্টধর্ম প্রচার যােগ করা সম্ভব হলে এক ধরনের নৈতিকতা জন্মা’য়। তাতে অ’ন্য দেশের উপর হা’মলাবাজি অ’ন্তত কিছুটা’ এক ধরনের বৈধতা পায়। কিন্তু অ’্যান্টন জি-এর ইতিহা’স বলছে পাদ্রিরাও সব সময় উচ্চাদর্শ রক্ষা করতে পারেননি। বালহ্যাচেট রেভারেন্ড উইলি’য়াম হা’ন্তি এবং মা’রি পিগট-এর কাহিনী শুনিয়েছিলেন। অ’্যান্টন জিলও কলকাতার সে-কাহিনীটি আবার শুনিয়েছেন। সেইসঙ্গে আরও কিছু খ্রিস্টা’ন যাজকের কথাও। সেবার পপুয়া নিইগিনিতে অ’্যাকান চার্চ গােলমা’লে পড়ে। জানা যায় একজন পাদ্রি পপুয়ান যুবকদের নিয়ে পড়েছেন। তিনি তাদের শারীরিক সৌন্দর্যের প্রশংসায় মুখর। তারা নাকি চরিত্রে সেন্টইন, চেহা’রায় অ’্যাপােলাে। অ’রেঞ্জ ফ্রি-স্টেট থেকে উনিশ শতকের সত্তরের দশকে এলকর্ম যাজককে পালি’য়ে যেতে হয় ইংল্যান্ডে। তাঁর। বি’রুদ্ধে অ’ভিযােগ ছিল সমকামিতার প্রায় একই সময়ে দহমিতে এক যাজক ছিলেন, তিনি নাকি দুই দশক ধরে তার মিশ-বাড়িটিকে রীতিমতাে প্রমা’েদােলা করে রেখেছিলেন। এই যাজক ছিলেন অ’লস এবং মদ্যপ। তিনি তেলের ব্যাবসা করতেন। নিজের বড় মেয়েকে নাকি নামিয়েছিলেন শরীরের ব্যবসায়ে। আর-একজন ইংরেজ যাজক সাতটি কৃষ্ণাঙ্গ মেয়ের সঙ্গে সহবাস করার গৌরবে রীতিমতো গৌরবান্বি’ত। তার কথা ছিল খ্রিস্টা’নের সঙ্গে সহবাস না করলে কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েরা সত্যিকারের খ্রিস্টা’ন হবে কেমন করে?

রোনাল্ড হা’য়াম, ‘এম্পায়ার অ’্যান্ড সেলি’টি”, ম্যানচেস্টা’র, ১৯৯২
‘স্যান্টন ফ্রিল, “কলি’ং প্যাশনসেক্স, রেস অ’্যান্ড এমপায়ার’, বি’. বি’. সি. বুকস, লন্ডন, ১৯৯৫

Please follow and like us:

fb-share-icon

নতুন ভিডিও গল্প!


Tags: , , , , , ,

Comments are closed here.