ইন্দ্র ও অহল্যা – (রামায়নী প্রেমকথা) – সুধাংশরঞ্জন ঘোষ

September 4, 2021 | By Admin | Filed in: বিখ্যাত লেখকদের সাহিত্যে যৌনতা.

মর্ত্যের শুচিশুভ্র কুকলি’ অ’থবা স্বর্গের নন্দন কাননের পারিজাত—সকল কুসুমের মধ্যেই কীট আছে। কিরণােজ্জ্বল পূর্ণচন্দ্রের মধ্যে আছে কলঙ্ক। অ’নিন্দ্যসুন্দর নরনারীর রূপেরও বি’রূপতা আছে। যে-কোনাে মহৎ চরিত্রের মধ্যে আছে কালি’মা’ কিন্তু আমি এমন এক নারী সৃষ্টি করেছি। যার মধ্যে কোনাে দিক থেকে কোনাে হল’ বা বি’রুপতা নেই। সে হচ্ছে আমা’র অ’হল্যা।

স্বর্গের দেবতাদের সভায় একথা একদিন গর্বের সঙ্গে ঘােষণা করলেন পিতামহ ব্রহ্মা’। একজন দেবতা জিজ্ঞাসা করলেন, কিন্তু তাকে দেবী না করে মা’নবী করলেন কেন পিতামহ ? ব্রহ্মা’ বললেন, নারীজাতির মধ্যে আদর্শ স্থাপন করবার জন্যই আমি তাকে মা’নবী রূপে সৃষ্টি করেছি। কারণ মতের মা’নবীরা স্বর্গের দেবীকে শ্রদ্ধা করতে পারে; কিন্তু আদর্শ রপে কখনাে তাকে গণ্য করবে না। মা’নুষ মা’নুষের মধ্যেই একজনকে আদর্শ রূপে দেখতে চায়।

অ’হল্যাকে চোখে না দেখেই তাকে ভালবেসে ফেললেন ইন্দ্র। ইন্দ্রের মনােভাব বুঝতে পেরে ব্রহ্মা’ তাকে বললেন, স্বর্গের দেবরাজ হয়ে মর্ত্যের কোনাে নারীরূপের মা’েহে এমন ভাবে বি’চলি’ত হওয়া তােমা’র উচিত নয় বৎস।

ইন্দ্র বললেন, এ মা’েহ নয় পিতামহ। এ হচ্ছে আমা’র প্রেম। সমগ্র দেহ মন হতে উৎসারিত স্বচ্ছ সুন্দর একটি কামনা। তার কথা আপনার কাছে কানে শুনেই তার প্রতি প্রণয়াসক্ত হয়েছি আমি। এ শুধু পূর্বরাগ নয়, এ আমা’র প্রগাঢ় প্রেম। অ’হল্যাকে আমা’য় আপনি দান করুন। তাকে পেয়ে আমি সুখী হব। | ব্ৰহ্ম বললেন, নারীসঙ্গ কামনায় চিত্ত তােমা’র চঞ্চল। তুমি কামা’বি’ষ্ট। রুপলাবণ্য দ্বারা যে চিত্ত বি’মা’েহিত, কামনার দ্বারা যে চিত্ত সংক্ষুব্ধ, সে চিত্তে কখনাে কোনাে মহৎ প্রেম জন্মগ্রহণ করতে পারে না। আর যে প্রেমে মহত্ত্ব নেই, সে প্রেমে মঙ্গল নেই। যে মিলনে প্রকৃত প্রেম নেই, সে মিলনে সুখ নেই। সুতরাং আমা’র মা’নসপ্রতিমা’ অ’হল্যাকে তােমা’র হা’তে সম্প্রদান করতে পারি না দেবরাজ।

এক কুটিল ভুভঙ্গরেখায় কুঞ্চিত হয়ে উঠল দেবরাজের অ’ক্ষিযুগল। পিতামহ ব্রহ্মর কথায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল তার মন। এক তীব্র অ’সন্তোষ ফুটে উঠলাে তার আয়ত মুখমণ্ডলে। কিন্তু কণ্ঠে কোনােরূপ অ’সন্তোষ প্রকাশ না করে তিনি বললেন, জানতে পারি কি পিতামহ, কে সেই ভাগ্যবান পুরুষ যার হা’তে আপনি অ’হল্যাকে সমর্পণ করে সুখী হবেন?

ব্রহ্মা’ বললেন, মহর্ষি গৌতম কোশল রাজ্যে গঙ্গার তীরে এক মনােরম পােবন তপস্যা করছেন। তিনি মহর্ষি ; কিন্তু দেবর্ষি ও পরে ব্রহ্মর্ষি হবার জন্য দুস্তর ও সুকঠোর তপস্যায় মগ্ন। তিনি জিতেন্দ্রিয় এবং সমস্ত প্রকারের রিপুপারবশ্য হতে মুক্ত। আমি তাই স্থির করেছি, সেই মহা’ত্মা’ গৌতমের হা’তেই অ’হল্যাকে সম্প্রদান করব।

ব্রহ্মা’র কথার উপর আর কোন প্রতিবাদ করলেন না দেবরাজ ইন্দ্র। কিন্তু এক তীব্র অ’পমা’নের জ্বালায় মনে মনে জ্বলতে লাগলেন। তিনি স্থির করলেন, পিতামহ ব্রহ্ম যাই বলুন, তিনি নিজে গিয়ে একবার অ’হল্যার সঙ্গে দেখা করবেন।

সত্যিই অ’পূর্ব। অ’হল্যাকে দেখে বি’স্ময় বি’স্ফারিত দৃষ্টিতে বহুক্ষণ তার দিকে চেয়ে রইলেন দেবরাজ ইন্দ্র। কিছুতেই চোখ ফিরিয়ে নিতে পারলেন না। কোনাে কিছু বলতেও পারলেন না।

শ্বেতমর্মরের মতাে শুভ্র মসৃণ দেহ নিটোল স্বাস্থ্যে উজ্জ্বল। উন্নত পীনস্তন। আজানুলম্বি’ত ঘনকৃষ্ণ আলুলায়িত কুন্তল। আকর্ণ বি’স্তৃত লীলায়িত বি’ন্যাসে সমৃ’দ্ধ আয়ত উজ্জ্বল অ’ক্ষিযুগল। মন্দগতি মেঘের মতােই গাম্ভীর্যপূর্ণ তার গতিভঙ্গী। পূর্ণচন্দ্রে প্রদীপ্ত মা’ধুর্য তার মুখমণ্ডলে। সুগন্ধি মুকুলভারে অ’বনত আম্রশাখার মতাে তার স্নিগ্ধমেদুর কুমা’রীমনের সুবাসিত কমনীয়তা। ইন্দ্রকে স্তম্ভিত ও হতবাক দেখে আশ্চর্য অ’হল্যা। অ’হল্যাকে অ’নুঢ়া দেখে আশ্বস্ত হলেন ইন্দ্র।

অ’তিথি ভেবে ইন্দ্রকে পাদ্যার্ঘ দান করে শান্ত কণ্ঠে অ’হল্যা প্রশ্ন করলেন তাকে, আপনি কে এবং কি হেতু আপনার এখানে আগমন তা জানতে পারি কি আর্য?

ইন্দ্র বললেন, আমি দেবরাজ ইন্দ্র। সুদুর স্বর্গ হতে তােমা’র কাছে অ’ন্তরের এক আকুল কামনা নিয়ে এসেছি ঋষিকন্যা! যদি তুমি প্রসন্ন হয়ে অ’ভয় দাও, তবেই সে কামনার কথাকে প্রকাশ করব অ’সঙ্কোচে।

প্রথমটা’য় বি’স্ময়ে অ’ভিভূত হয়ে গেলেন অ’হল্যা। তারপর আস্তে আস্তে অ’বি’শ্বাসের সুরে বললেন, আপনি আমা’র সঙ্গে উপহা’স করছেন কেন দেবরাজ? মত্যের এক সামা’ন্য মা’নবী কিনা কামনা পূরণ করবে স্বর্গের দেবরাজের? আমা’র ধৃষ্টতা মা’প করবেন, এ আমি কিছুতেই বি’শ্বাস করতে পারছিনা। স্বৰ্গই হচ্ছে সমস্ত নরনারীর চরম এবং পরম লক্ষ্যস্থল। বি’রামহীন বাসনার দ্বারা চিরচঞ্চল ও বি’ক্ষুব্ধ এই মতলােক। এখানে মরণশীল প্রতিটি মা’নুষের অ’ন্তরে কামনার কখনাে অ’ন্ত নেই, তৃষ্ণার তৃপ্তি নেই। বুভুক্ষার নিবৃত্তি নেই। তাই তারা স্বর্গ চায়। স্বর্গ হচ্ছে তাদের কাছে এমন এক স্থান যেখানে গেলে তাদের সমস্ত কামনা বাসনা এক পরমা’শ্চর্য পরিতৃপ্তি লাভ করে ধন্য হয় ; চিরশান্ত এক অ’তিমা’নস চেতনায় লীন হয়ে যায় চিত্তের সমস্ত চঞ্চলতা ; মরণশীল প্রতিটি ক্ষুদ্র প্রাণ অ’মরত্বের এক সুমহা’ন ঐশ্বর্যে মণ্ডিত হয়ে ওঠে। সেই স্বর্গরাজ্যের অ’ধিপতি হয়ে হীন কামনার ক্রীতদাসরূপে কেন আপনি এই মর্ত্যলােকে নেমে এলেন প্রভু?

নতজানু হয়ে হা’তজোড় করে ইন্দ্রের মুখপানে সকরুণ নয়নে চেয়ে রইলেন অ’হল্যা।

ইন্দ্র বললেন, আমি দেবতা হলেও আমা’র দেহমন আছে এবং কোনাে প্রাণীর মধ্যে দেহমন সংযুক্ত হলেই তার মধ্যে কামনা জাগবে। দেহের ধর্ম হচ্ছে অ’ন্য একটি পরিপূর্ণ দেহের সঙ্গ চাওয়া। মনের ধর্ম হচ্ছে অ’ন্য একটি দরদী মনের সাহচর্য কামনা করা। পিতামহ ব্রহ্মা’র কাছে তােমা’র দেহের অ’ফুরন্ত রুপের ঐশ্বর্য ও গুণের মহত্ত্ব শুনে আমা’র সমগ্র দেহমন। তােমা’র জন্য এক অ’দম্য কামনায় উদগ্রীব হয়ে উঠেছে অ’হল্যা। তােমা’কে না পেলে আমা’র সে কামনার শাস্তি হবে না কোনােদিন।

এক অ’পরিসীম লজ্জার শিহরণে মুহূর্তে সঙ্কুচিত হয়ে উঠল অ’হল্যার সারা অ’ঙ্গ। নম্রনত মুখখানা যথাসম্ভব নীচু করে অ’হল্যা বললেন, আপনি হয়ত জানেন না দেবরাজ, পিতামহ ব্রহ্মা’ আমা’য় মহর্ষি গৌতমের হা’তে সম্প্রদান করবেন বলে স্থির করেছেন।

ইন্দ্র বললেন, তা আমি জানি।

অ’হল্যা বললেন স্রষ্টা’র দ্বারা যা পূর্বনির্দিষ্ট বা পূর্বপরিকল্পিত, সৃষ্টির কাছে তাই হচ্ছে ভাগ্য। এই ভাগ্যের সীমা’রেখাকে লঙ্ঘন করবার কোন অ’ধিকার বা ক্ষমতাই সৃষ্টির নেই। আপনি তা জেনে আমা’র সঙ্গে কেন ছলনা করতে এসেছেন দেবরাজ?

ছলনা নয় অ’হল্যা । আমি আমা’র অ’ন্তরের অ’নুভূত সত্যকে ব্যক্ত করতে এসেছি তােমা’র কাছে। এ সত্য হচ্ছে আমা’র প্রেম। আমা’র সমগ্র দেহমন হতে উদ্ভূত এক নিবি’ড় আসক্তি। নির্মম অ’বহেলায় এ সত্য তুমি পায়ে ঠেলে দিও না।

অ’হল্যা একটুখানি হা’সলেন। বি’দ্যুদ্দামস্ফুরিত চকিত আলােকরেখার মতাে সে হা’সি তার গম্ভীর মুখখানার উপর ফুটে উঠতেই মিলি’য়ে গেল মুহূর্তে।

গম্ভীরমুখে অ’হল্যা বললেন, কিন্তু দেবরাজ আপনি যাকে অ’ন্তরের সত্য বলছেন তা আপনার দেহগত এক জৈবি’ক ক্ষুধা ছাড়া আর কিছুই নয়। আপনি যাকে প্রেম বলছেন তা আমা’র দেহের প্রতি আপনার এক উচ্ছসিত কামা’বেগ। আপনার প্রেমকে স্বীকার করছি। কিন্তু তাকে শ্রদ্ধা করতে পারছি না। এ প্রেমের হয়ত বেগ আছে ; গভীরতাও আছে; কিন্তু মহত্ত্ব নেই।

অ’বাক বি’স্ময়ে অ’হল্যার পানে চাইলেন ইন্দ্র। চেয়ে বললে, তােমা’র কথা ঠিক বুঝতে পারলাম না অ’হল্যা।

শমীশাখার ফাক দিয়ে হঠাৎ এক ঝলক সূর্যরশ্মি এসে রাঙিয়ে দিল অ’হল্যার লজ্জার মুখখানাকে। মৃ’দু হা’ওয়ায় ঈষৎ দুলে উঠল তার আলুলায়িত কেশপাশের দুটি চুর্ণ কুন্তল।

অ’হল্যা বললেন, আমা’র কথার অ’র্থ অ’তি সরল এবং স্পষ্ট দেবরাজ। পিতামহের কাছে আমা’র রূপের কথা শুনেই আমা’র রুপের প্রতি অ’দম্য লালসা জন্মে আপনার মনে। এই হীন রূপলালসা হতেই আপনার প্রেমের উৎপত্তি। আমা’র প্রতি আপনার যে আসঙ্গলি’প্সা তা হচ্ছে রুপগত আকর্ষণ। তার সঙ্গে গুণগত পরিচয়ের কোনাে সম্বন্ধ নেই। কিন্তু রুপলালসাজনিত ক্ষণিকের চিত্তবি’ভ্রম হতে যে প্রেমের জন্ম তা একান্তভাবে ক্ষণকালীন দেবরাজ। তা কখনই চিত্তের স্থায়ীভাবে পরিণত হতে পারে না। তাকে প্রেম না বলে কামজ মা’েহ বলাই শ্রেয়। তা রতি নয়, রাগ। দীর্ঘকাল ধরে কারাে বি’ভিন্ন সদগুণের নিবি’ড় পরিচয় থেকে তার প্রতি যে আসক্তি জন্মে, সেই আসক্তিই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ রতি। এই রতি নিষ্কাম ভক্তির সমা’ন, যে ভক্তি দিয়ে আমরা দেবতার পূজা করি।

মনে মনে ক্ষুন্ন ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন দেবরাজ ইন্দ্র। সামা’ন্য একজন মা’নবীর কাছ থেকে এমনভাবে অ’পমা’নিত হতে হবে তাকে তা তিনি ভাবতেই পারেননি। কিন্তু বাইরে কোনাে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন না তিনি। ভাবলেন, হয়ত তার রুপের গর্ব করছে অ’হল্যা। মৃ’গনাভির গন্ধে ব্যাকুল বনহরিণীর মতাে আপন সৌন্দর্যচেতনার সুরভিতে মগ্ন ও মা’তােয়ারা হয়ে উঠেছে অ’হল্যা। রুপের মদগর্ব এমনি প্রবল হয়ে উঠেছে তার মধ্যে যে নিজেকে ছাড়া সে আর কোনদিন কাউকে ভালবাসতে পারবে না, অ’পরের প্রেমের কোনাে গুরুত্বকে উপলব্ধি করতে পারবে না। আত্মরতি ছাড়া যে অ’ন্য কোনাে রতির কথাই জানে না, সত্যিকারের প্রেম কি জিনিস তা অ’ন্তরে যে অ’নুভব করেনি কোনােদিন, সে অ’পরের প্রেমের সত্যাসত্য বি’চার করতে যায় কোন সাহসে।

অ’নেকক্ষণ পর অ’হল্যা বললেন, এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন, সামা’ন্য একজন মা’নবী হয়েও আপনার মতাে দেবতার প্রেম নিবেদনে সন্তুষ্ট হতে পারলাম না কেন।

শান্ত অ’থচ দৃঢ়কণ্ঠে উত্তর দিলেন, ইন্দ্র, না বুঝতে পারলাম না, কেন তুমি পরীক্ষা না করেই আমা’র প্রেমকে অ’প্রকৃত ও প্রকারান্তরে অ’সত্য বলে প্রতিপন্ন করতে চাইছ। যথাযথ পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা, বি’শ্লেষণ ও বি’চারের মধ্য দিয়েই কোনাে বস্তুর সত্যাসত্য সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে থাকি আমরা। কিন্তু জ্ঞানলাভের এই সাধারণ রীতিটিকে তুমি লঙঘন করছ অ’হল্যা।

অ’হল্যা বললেন, প্রেম হচ্ছে অ’পার্থিব বস্তু দেবরাজ। বাইরের কোনাে জাগতিক বস্তু বা ঘটনার মধ্য দিয়ে তার সত্যাসত্য প্রমা’ণ করা সম্ভব নয়। তবু যদি আপনি ইচ্ছা করেন, আপনার প্রেমের সত্যতা সম্পর্কে যথাযোেগ্য প্রমা’ণ উপস্থাপিত করতে পারেন।

প্রথমে একটু ইতস্ততঃ করলেন ইন্দ্র। তারপর বললেন, আমি মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করছি অ’হল্যা, আমি আমা’র এই প্রেমের খাতিরে প্রয়ােজন হলে ইন্দ্ৰত্ব ও দেবত্ব ত্যাগ করতে পারি। তােমা’র অ’ন্তরের সিংহা’সনে স্থান পেলে আমি স্বর্গের রাজসিংহা’সনকে ত্যাগ করে এই মর্তের মা’টিতে এসে ঘর বাঁধতে পারি।

সহসা এক বেদনার্ত বি’স্ময়ে চমকে উঠলেন অ’হল্যা। ইন্দ্রের প্রেম এতখানি খাঁটি হবে ভাবতেই পারেননি তিনি। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, আপনার প্রেমের সত্যতাকে প্রমা’ণ করে কোনাে ফল হবে না দেবরাজ। কারণ আপনি জানেন, আমা’দের মিলন সম্ভব নয়। আপনার প্রেম যত খাটিই হা’েক আমি পিতামহ ব্রহ্মা’র অ’বাধ্য হতে পারি না।

ইন্দ্র বললেন, স্রষ্টা’র কাছে সৃষ্টি চিরঋণী একথা স্বীকার করি। কিন্তু তাই বলে তার সারাজীবনের সুখ এবং ইচ্ছার স্বাধীনতা স্রষ্টা’র কাছে চিরবি’ক্রীত একথা কিছুতেই স্বীকার করব না আমি। | অ’হল্যার পানে একবার চাইলেন ইন্দ্র। অ’হল্যাকে নীরব দেখে আবার বলতে শুরু করলেন, প্রকৃতি জগতে একবার চেয়ে দেখ অ’হল্যা, ধূলি’কণা হতে নীহা’রিকা পর্যন্ত প্রতিটি বস্তুর একটি করে নিজস্ব গতি আছে, আছে এক একটি বি’শিষ্ট লক্ষ্য। প্রতিটি বস্তু ও প্রাণীর প্রতিটি কর্মপ্রয়াসে মূর্ত হয়ে ওঠে এক স্বাধীন ইচ্ছা।

আশ্চর্য হয়ে শুনতে লাগলেন অ’হল্যা। বেলা তখন দ্বি’প্রহর। ছায়াঘেরা নির্জন বনভূমির শান্ত অ’বকাশে মা’থার উপর শমীগাছের শাখায় দুটি কপােত কূজন করছে মনের নিবি’ড় আনন্দে। স্বপ্নবি’ষ্টের মতাে স্থির হয়ে ইন্দ্রের দিকে দাঁড়িয়ে রইলেন অ’হল্যা।

ইন্দ্র বললেন, স্রষ্টা’ কখনাে বলে দেয় না কোন্ কপােতী কোন্ কপােতকে সাথী করে বাসা বাঁধবে, কোন্ লতা কোন্ গাছকে জীবনে একমা’ত্র অ’বলম্বন করে জড়িয়ে ধরবে, কোন্ ফুলের গর্ভকেশর কোন ফুলের পরাগরেণুকে ধারণ করবে। | তাছাড়া আমা’দের প্রতিটি কর্মপ্রয়াসের পিছনে যদি ইচ্ছার স্বাধীনতা না থাকে, তাহলে ন্যায় বা অ’ন্যায় কোনাে কর্মের জন্যই আমা’দের দায়ী করা চলবে না। ইচ্ছার স্বাধীনতা আছে বলেই বি’শ্ব সংসারে আছে পাপ ও পুণ্যের অ’স্তিত্ব, আছে ন্যায় ও নীতির বি’ধান।

ইন্দ্রকে থামিয়ে দিয়ে সহসা করুণকণ্ঠে চীৎকার করে উঠলেন অ’হল্যা, এমন করে জটিল যুক্তিজাল বি’স্তার করে আমা’র চিত্তকে দুর্বল করে দেবেন না দেবরাজ। আমা’র পিতামা’তাকে আমি কোনদিন দেখিনি। জন্মের পর হতে পিতামহ ব্রহ্মা’র তত্ত্বাবধানেই এই নির্জন পােবনে মা’নুষ হয়েছি। পিতামহ আমা’য় মহর্ষি গৌতমের হা’তে সম্প্রদান করবেন এ কথা জানার পর হতে আমি মনে মনে তাকেই পতিত্বে বরণ করেছি দেবরাজ। এরপর দ্বি’চারিণী হওয়া আমা’র পক্ষে সম্ভব নয়। | তবু একবার শেষ চেষ্টা’ করে দেখতে ছাড়লেন না ইন্দ্র। বললেন, আর একবার ভেবে দেখ অ’হল্যা। মহর্ষি গৌতমের পত্নী হয়ে তুমি সৌভাগ্য ও সম্মা’ন লাভ করবে একথা ঠিক; কিন্তু সুখ পাবে না জীবনে। গৌতম একজন মহা’তপস্বী ; জিতেন্দ্রিয়, মিতবাক ও নিয়ত ধ্যানগম্ভীর। সত্য ও অ’মৃ’তের উপাসক গৌতমের কাছে পারিবারিক সুখ হচ্ছে তুচ্ছ চিন্তাবি’লাস, প্রেম হচ্ছে দুর্বলতা। অ’নলপ্ৰভ ব্যক্তিত্বের জ্যোতি তার মুখমণ্ডলে। সূর্যসন্নিভ তাঁর তেজ। ভূমি হতে ভূমা’র প্রতি দৃষ্টি তার ঊধ্বায়িত। অ’ধ্যাত্মসাধনার অ’নির্বাণ আগুনে তার অ’ন্তরের যে ধূসর আকাশখানা নিয়ত জ্বলছে, সকাম অ’নুরাগের কোনাে বর্ণচ্ছটা’ জাগতে পাবে সেখানে কোনােদিন। তিনি হবেন তােমা’র ভর্তা, স্বামী, তুমি হবে তার ভার্যা, সেবাদাসী। অ’ণুমা’ত্র প্রণয়ের কোনাে মা’ধুরিমা’ থাকবে না তােমা’দের দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যে। 

কোনাে উত্তর দিলেন না অ’হল্যা। দু’হা’ত দিয়ে মুখখানাকে কে মৃ’দু কান্নায় ভেঙে পড়লেন। 

কিছুক্ষণ পর মুখ তুলে দেখলেন, তার সামনে থেকে কখন অ’ন্তর্হিত হয়েছেন দেবরাজ

অ’হল্যার মনে হলাে, সমগ্র পৃথিবীটা’ই যেন কাঁদছে। এক নির্জন কান্নার সকরুণ সমা’রােহ চলেছে জলে স্থলে অ’ন্তরীক্ষে। এক বি’গলি’ত অ’ন্তর্বেদনার অ’ব্যক্ত মূৰ্ছনা অ’নুরণিত হয়ে উঠেছে চারিদিকের অ’শান্ত বনমর্মরে, কামা’র্ত পাখির কুজনে আর অ’শান্ত নদীর কলতানে।

তবু গৌতমকে পেয়ে ইন্দ্রকে একেবারে ভুলে যাবার চেষ্টা’ করতে লাগলেন অ’হল্যা। নিজেকে বােঝাতে লাগলেন, বি’ধির বি’ধানের সঙ্গে ব্যক্তিজীবনের বাসনাকে খাপ খাইয়ে নিয়ে চলাই হলাে মা’নব জীবনের প্রকৃত ধর্ম। জীবনে যে সত্য অ’নাগত, যে বস্তু অ’নায়ত্ত তা শত আকাক্ষিত হলেও তার প্রতি হতাশ্বাস ফেলে লাভ নেই। তার চেয়ে অ’বাঞ্ছিত হলেও যে সত্য সহজভাবে জীবনে এসে ধরা দিয়েছে তাকেই সমস্ত অ’ন্তরাত্মা’ দিয়ে গ্রহণ করে নেবেন অ’হল্যা। এই সত্যের নীরস আবর্তের মধ্যেই তৃপ্তির ফুল ফোটা’বেন তিনি।

জাহ্নবী তীরে মিথিলার একটি উপবনে মহর্ষি গৌতমের তপােবনটি বড় চমৎকার। দিনরাত জপ তপ আর যাগ যজ্ঞ নিয়ে থাকেন মহর্ষি গৌতম। আর অ’হল্যা থাকেন সংসারের কাজকর্ম নিয়ে। | তবু মা’ঝে মা’ঝে কোনাে উতল বসন্তপ্রভাবে কোনাে অ’বগুণ্ঠিত ফুলের মুখে মধুগন্ধী হা’সি ফোটা’বার জন্য গুঞ্জন করতে থাকে যখন কোনাে মদোম্মত্ত অ’লি’, অ’থবা কোনাে অ’লস দ্বি’প্রহরে এক শান্ত শমীশাখায় কৃজন করতে থাকে কোনাে কামা’র্ত কপােতদম্পতী অ’থবা কোনাে বর্ণগন্ধমদির অ’পরাহে যখন দক্ষিণের মলয় বাতাসে মৃ’দুশিহরিত জাহ্নবীর বুকে জলকেলি’ করতে করতে কোনাে চক্রবাক তার সাথীকে চুম্বন করতে থাকে, তখন দেবরাজ ইন্দ্রের কথা মনে পড়ে অ’হল্যার। সঙ্গে সঙ্গে তার শান্ত বুকের অ’তলে এক গােপন দ্বন্দ্বের শিহর জাগে।

এতদিনে বুঝতে পারলেন অ’হল্যা, দেবরাজ ইন্দ্রের কথাই ঠিক। তার অ’তুলনীয় দেহসৌন্দর্যের কোনদিন কোনাে মূল্য দেবেন না মহা’তপস্বী মহর্ষী গৌতম। তার একনিষ্ঠ অ’বি’চল প্রেমের দেবেন না কোনাে মর্যাদা।

কতদিন কত মদির বসন্ত অ’পরাহ্তোর তিমিরকল্প কেশকলাপকে বি’ন্যস্ত করে মৃ’গ নাভির দ্বারা কপােলফলককে রঞ্জিত করে ও কাঞ্চীদাম দ্বারা পীনস্তনকে শােভিত করে মহর্ষি গৌতমের সামনে গিয়ে উপস্থিত হয়েছেন অ’হল্যা। কিন্তু কোনাে মদচঞ্চল কটা’ক্ষবি’ক্ষেপ দ্বারা তার সেই প্রসাধিত দেহসৌন্দর্যকে কোনাে স্বীকৃতি দেননি গৌতম।

আসলে সকল ঋষিই অ’ত্যন্ত স্বার্থপর। ব্রহ্মের ধ্যানে যাদের প্রাণমন নিঃশেষে সমর্পিত,

মা’েক্ষলাভের জন্য যারা নিয়ত যােগনিত, অ’পরের দেহমনের প্রতি তাকাবার অ’বকাশ কোথায় তাদের?

কিন্তু আশ্চর্য! গৌতমের এই নীরস ঔদাসীন্য রুক্ষ কঠিন এক প্রেমা’নুভূতি জাগিয়ে তুলল অ’হল্যার অ’ন্তরে। এক নির্মম প্রতিকূলতায় প্রতিহত না হয়ে দিনে দিনে তীব্র হয়ে বেড়ে উঠতে লাগল সে প্রেমা’নুভূতি। 

অ’হল্যা ভাবলেন, এই প্রেমা’নুভূতির উত্তাপ দিয়ে ধীরে ধীরে বি’গলি’ত করে তুলবেন গৌতমের হিমশীতল ঔদাসীন্যটা’কে। গৌতম তাকে ভালােবাসলেও বি’পরীতরতি সাধনার মধ্য দিয়ে তিনি ভালবেসে যাবেন গৌতমকে।

এমনি করে বহুদিন যাবার পর সহসা একদিন ফুল ফুটল মহর্ষি গৌতমের বুদ্র তপােবনে। ক্রমে সেই ফুল থেকে ফললাে ফল। গর্ভলক্ষণ দেখা দিল অ’হল্যার মধ্যে। মহর্ষি গৌতম কিন্তু নির্বি’কার। সুখে দুঃখে নির্বি’কার চিত্ত থেকে সংসারের সকল বস্তু ও ঘটনার মধ্যে এক অ’দ্বি’তীয় সত্যকে দেখাই তার ধর্ম। এদিকে অ’হল্যার কিন্তু উল্লাস চঞ্চলতার আর সীমা’ রইল ।

যথাসময়ে এক পুত্রসন্তান প্রসব করলেন অ’হল্যা। গৌতম তার নাম রাখলেন শানন্দ। এক বৎসর অ’তিক্রান্ত হতেই আবার সন্তান সম্ভবা হলেন অ’হল্যা। কিছুটা’ বি’রক্তিবােধ করলেন গৌতম। দ্বি’গুণ আনন্দ অ’নুভব করলেন অ’হল্যা। দেখতে দেখতে অ’হল্যা হয়ে উঠলেন যেন সম্পূর্ণ এক অ’ন্য মা’নুষ। অ’ন্য মন। চিত্তের সমস্ত চঞ্চলতা যৌবনের সমস্ত প্রগলভতা স্নিগ্ধগম্ভীর এক মা’তৃত্বের মধ্যে বি’লীন হয়ে গেল নিঃশেষে।

কিন্তু সূর্যের উত্তরায়ণ শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গে মলয়বাতাস বইতে থাকে যখন মৃ’দুমন্দ, প্রিয়সখা কন্দর্প সহ ঋতুরাজ বসন্ত এগিয়ে আসতে থাকেন যখন মদালস গতিতে, যেন শুধু অ’হল্যার নয়, সংযতচিত্ত যােগনিমগ্ন গৌতমের মনটা’ও কেমন যেন বি’চলি’ত হয়ে ওঠে ক্ষণিকের জন্য। শান্তস্নিগ্ধ তপােবনের হৃদয়ে দেখা দেয় এক মধুর উন্মা’দনা। বৈরাগ্যের মা’ঝে আসে ক্ষণবি’লাসের আবেগ। বি’বর্ণ রুক্ষতার মা’ঝে আসে সকাম বাসনার বর্ণচ্ছটা’। 

অ’হল্যা তখন নানারকমের গন্ধদ্রব্য দিয়ে অ’ঙ্গরাগ করেন। অ’বতংসরূপী নবপল্লব দ্বারা শোভিত করেন তার কর্ণযুগলকে; চন্দ্রহা’রতুল্য বকুলমা’লা পরেন পীনস্তনােত গলদেশে এবং সুবি’ন্যস্ত কেশকলাপে সংযুক্ত করেন স্বর্ণোজ্জ্বল কর্ণিকার কুসুম।

ঋষিকুমা’রদ্বয় ব্রহ্মচর্যাশ্রমে চলে গেলেন শিক্ষালাভের জন্য। মা’ঝে মা’ঝে মনের মধ্যে একটা’ শূন্যতা অ’নুভব করেন অ’হল্যা। প্রয়ােজন না হলে কোনাে কথা বলেন না। মিতবাক গৌতম।

সেদিন কিন্তু প্রভাতকাল হতেই লঘুপক্ষ বলাকার মতাে এক সুমধুর লীলাচপলতায় চঞ্চল হয়ে উঠল গৌতমের মন। যােগাসনে বসলেন না সেদিন, কারণ বুঝলেন আজ তপস্যায় নিবদ্ধ করা যাবে না এ মনকে। পরিহা’সচ্ছলে দুই একটি মধুর কথা বলে অ’হল্যাকে প্রীত করতে লাগলেন গৌতম। অ’হল্যাও বেশ উপভােগ করতে লাগলেন প্রণয়কলাপতুল্য সেই সব কথাগুলি’কে।

একসময় মহর্ষি গৌতম বললেন, ইন্দ্রিয়দ্বার একটু মুক্ত হলেই সে পথে মন নিয়ত বহির্মুখী হয়ে ছুটে চলে। বস্তুজগতের অ’জস্র উদ্দীপন অ’নিবারণীয় বেগে আকর্ষণ করে মনকে। তাই সমস্ত ইন্দ্রিয়দ্বারকে রুদ্ধ করে উল্টো সাধনের দ্বারা সংহত করতে হয় আমা’দের মনকে। 

মহর্ষি একটুখানি মৃ’দু হা’সলেন। হেসে বললেন, অ’ন্য বস্তুর কথা ছেড়ে দিলেও তােমা’র অ’তুলনীয় দেহসৌন্দর্যের মা’েহবন্ধন থেকে মনকে মুক্ত করা খুবই কঠিন অ’হল্যা। তুমি হচ্ছ অ’য়স্কান্তমণি ; তােমা’র আকর্ষণকে প্রতিহত করা লৌহের মতাে কঠিনতম পদার্থেরও ক্ষমতা নেই।

কৃত্রিম অ’থচ নিবি’ড় এক অ’ভিমা’নে ফুলে উঠলেন অ’হল্যা। বললেন, আমা’কে আপনি দেখে শুনেই ধর্মপত্নীরূপে গ্রহণ করেছেন মহর্ষি। তা সত্ত্বেও আপনি যদি মনে করেন আমি আপনার ধর্মসাধনার পথে বি’ঘস্বরূপ তাহলে আপনি আমা’য় স্বচ্ছন্দে পরিত্যাগ করতে পারেন। আপনার মঙ্গলের জন্য পরম আনন্দে আমি মেনে নেব আপনার সে বি’ধানকে।

আবার একটু হা’সলেন মহর্ষি। তার তেজোদীপ্ত শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখমণ্ডলে ফুটে উঠল এক মধুর বর্ণরাগরেখা। হা’সিমুখেই বললেন, কামিনীকাঞ্চন উচ্চতর অ’ধ্যাত্ম সাধনার ক্ষেত্রে প্রবল প্রতিবন্ধক একথা জেনেও আমি তােমা’র মতাে রূপরম্যা ভাস্বরদেহিনী এক কামিনীকে গ্রহণ করেছি; তার কারণ এই যে চিত্তবি’কারের প্রভূত উপাদান কাছে থাকা সত্ত্বেও যার চিত্ত বি’কৃত হয় বা যিনি ধর্মপথ হতে বি’চ্যুত না হন, তিনিই হচ্ছেন প্রকৃত সাধক। 

তবু এ কথায় সন্তুষ্ট হতে পারলেন না অ’হল্যা। কারণ একথা বি’শুদ্ধ প্রণয়ের কথা নয়। মহর্ষি গৌতমের কাছে অ’হল্যার রুপগুণের কোনাে স্বকীয় মূল্য নেই। পুত্রসৃষ্টি ও আত্মশক্তির পরীক্ষা এই দুই আপন প্রয়ােজন সিদ্ধির জন্য তাকে শুধু এক হীন ব্যবহা’রিক মূল্য দান করে থাকেন মহর্ষি গৌতম। অ’হল্যার রূপযৌবন হচ্ছে তার কাছে এক নির্ভুল কষ্টিপাথর যার মা’ধ্যমে তার চিত্তের শক্তি ও শুচিতাকে কষিত করে নিচ্ছেন তিনি অ’হরহ। কিন্তু মহর্ষির কথায় কোনাে প্রতিবাদ করলেন না অ’হল্যা।

কথায় কথায় এমনিতেই বেলা দ্বি’প্রহর হয়ে যায়। আম্রমুকুলের গন্ধভরা বসন্তের মধ্যাহ্ন কেমন যেন অ’লস ও মন্থর হয়ে ওঠে ধীরে ধীরে। জাহ্নবীর জলে স্নান সেরে সমিধ আহরণ করে আনবার জন্য বেরিয়ে যান মহর্ষি। ভৃঙ্গারক হা’তে নিয়ে আশ্রম প্রাঙ্গণে রক্তাশােকমূলে জলসিঞ্চন করতে থাকেন অ’হল্যা।

অ’ল্প কিছুক্ষণের মধ্যে পােবন প্রাঙ্গণে মহর্ষি গৌতমের কণ্ঠস্বর শুনে বি’স্মিত হয়ে চাইলেন অ’হল্যা। এত শীঘ্র স্নান সেরে ফেরা কখনােই সম্ভব নয় মহর্ষির পক্ষে। 

আশিঞ্জিতপুর গজগামিনী অ’হল্যা ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন প্রাঙ্গণের দিকে। সহসা থমকে স্থাণুর মতাে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ভালাে করে নিরীক্ষণ করে দেখলেন, গৌতম নন, মহর্ষির ছদ্মবেশে দেবরাজ ইন্দ্র।

এক অ’জানা আশঙ্কায় মুহূর্তে পার হয়ে উঠল অ’হল্যার মুখখানা। সভয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি পরস্ত্রী, সন্তানের জননী, একথা জেনেও কেন ছলনার আশ্রয় নিয়ে আবার আমা’র সকাশে এসেছেন দেবরাজ? 

ইন্দ্র বললেন, চিনতে যদি পেরেছ তাে আমা’র মনের সবকথা শােনাে অ’হল্যা। তুমি সেবার আমা’য় প্রত্যাখ্যান করার পর হতে এক তীব্র মর্মজ্বালায় জ্বলছি আমি। অ’বশ্য যদিও আমা’দের এই দেহগত বি’রহ তােমা’র প্রতি আমা’র প্রেমের প্রগাঢ়তাকে ক্ষুন্ন করতে পারেনি কিছুমা’ত্র, যদিও শত যােজন দূরে থেকেও অ’চ্ছেদ্যভাবে বি’জড়িত হয়ে আছ তুমি আমা’র অ’ন্তরাত্মা’র সঙ্গে, যদিও মনে মনে আমা’দের চিরমিলন দূরত্বের সমস্ত ব্যবধানকে বি’লুপ্ত করে দিয়ে অ’ক্ষয় হয়ে বি’রাজ করছে আজও, তথাপি শুধু একটিবারের জন্য তােমা’র দেহের সুধাকে পান করবার জন্য চিত্ত আমা’র চন্দ্রিকাবি’হুল চকোরের মতােই উম্মত্ত হয়ে উঠেছে অ’হল্যা। 

জলসম্ভত একখানি মেঘের মতাে গম্ভীর হয়ে উঠলেন অ’হল্যা। বৃঢ়ভাবে বললেন, ছিঃ দেবরাজ! একজন পরস্ত্রী সতীনারীর সঙ্গে আপনার এই হীন রমণেচ্ছাকে আপনি অ’কৃত্রিম প্রেমের পরকাষ্ঠা বলে অ’ভিহিত করছেন! | কুটিল ও নির্লজ্জ এক হা’সি ফুটে উঠল ইন্দ্রের মুখে। হেসে বললেন, সুন্দরী তুমি বড় নিষ্ঠুরা। তুমি বুঝতে পারছ না, আত্মিক বা দৈহিক যাই হা’েক, যে আসক্তির বশবর্তী হয়ে দেবতার অ’হঙ্কার ত্যাগ করে সুদূর স্বর্গ হতে মর্ত্যলােকে ছুটে এসেছি, সে আসক্তিহীন হতে পারে না কখনাে।

অ’হল্যাকে নীরব থাকতে দেখে ইন্দ্র বললেন, আয়তনয়না, তুমি দেখতে পাচ্ছ না, এখন বসন্তকাল। প্রেমা’স্পদের সঙ্গে মিলনের এই প্রশস্ত সময়। প্রিয়ামিলনের আনন্দে উন্মত্তপ্রায় চেতন অ’চেতন প্রতিটি বস্তু। ওই দেখ, একটি পুষ্পদ্রমের উপর কোনাে একটি ভ্রমরী মধুপান করার পর তার পরিভুক্ত পীতাবশিষ্ট মধুটুকুকে পান করছে তার প্রিয় ভ্রমর।

ওই দেখ, একটি ইঙ্গুদী গাছের তলে প্রেমা’লস একটি কৃষ্ণসার তার শৃঙ্গাগ্রভাগ দিয়ে নয়ন কণ্ডুয়ন করে দিচ্ছে তার প্রিয়তমা’র আর মদালসা মৃ’গীটি নিমীলি’তনেত্রে তার প্রিয়তমের চিরবাঞ্ছিত স্পর্শসুখ অ’নুভব করছে। আরও দেখ, আরক্ত নবপল্লবগুচ্ছমণ্ডিত তরুদল তাদের শাখাবাহু দ্বারা ললি’ততরুণ নবপুষ্পিত লতাদের আলি’ঙ্গন করতে গিয়ে নিজেরাই আবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে লতাজালে। 

অ’ভিমা’নিনী, তুমি হয়ত বলবে এ মিলন একান্তভাবে দৈহিক, এর সঙ্গে আত্মা’র কোনাে সম্বন্ধ নেই। কিন্তু আমি বলব, এই দেহমিলনই আত্মিক মিলনকে সম্পূর্ণতা দান করে। তুমি হয়ত বলবে এ মিলন অ’বৈধ। কিন্তু আমি বলব অ’বৈধ হলেও এ মিলন বি’শুদ্ধ। এর মধ্যে নেই কোনাে উদ্দেশ্যের আবি’লতা। আনন্দের আকাঙ্ক্ষাতে এর জন্ম, আনন্দলাভের মধ্যেই এর লয়।

তােমা’দের দাম্পত্য জীবনে স্বামীস্ত্রীর মধ্যে যে মিলন, সে মিলন বৈধ হলেও বি’শুদ্ধ নয় কখনই। কারণ তার মধ্যে আছে পরস্পরের কর্তব্যবােধ, নীতির শাসন, পুত্র সৃষ্টির উদ্দেশ্য। এ মিলনে তাই কেউ চরম ও পরম আনন্দ লাভ করতে পারে না। কিন্তু মনে রেখাে, এই আনন্দ দানের জন্যই বি’শ্বসংসারে সকল বস্তুর সৃষ্টি। আনন্দই হচ্ছে পরমা’র্থ ব্ৰহ্ম। আনন্দ দানের মধ্যেই নির্ভর করছে সকল বস্তুর চরম সার্থকতা। যে বস্তু যত আনন্দ দান করতে পারে সে বস্তু তত সার্থক। তাই একমা’ত্র নিবি’ড় আনন্দ উপভােগের মধ্য দিয়েই কোনাে বস্তুকে চরম মূল্য দান করতে পারি আমরা। একটি ফুলের জীবন একমা’ত্র তখনি হয়ে উঠবে সার্থক এবং স্বকীয় ও স্বতন্ত্রমূল্যে উজ্জ্বল যখন আমরা আমা’দের দর্শনেন্দ্রিয় দ্বারা তার সৌন্দর্যের সুষমা’কে উপভােগ করব, আমা’দের স্পর্শেন্দ্রিয় দ্বারা তার কোমলতাকে স্পর্শ করব, ঘ্রাণেন্দ্রিয় দ্বারা আস্বাদনে করব তার সৌগন্ধকে।

পদ্মমুখি, তুমি বি’রূপা হয়াে না। অ’নেক আশা নিয়ে এসেছি আমি। আজ আমি আমা’র সমস্ত ইন্দ্রিয় দ্বারা উপভােগ করতে চাই তােমা’র দেহসৌন্দর্যকে। এই উপভােগের মধ্য দিয়ে যে বি’শুদ্ধ আনন্দ আমি লাভ করব তা এক অ’পূর্ব সার্থকতা দান করবে আমা’দের দুজনের জীবনকে।

কারণ আমি বি’শ্বাস করি আজকের এই দেহসঙ্গমের ফলে তােমা’র দেহের সমস্ত নির্যাস এক সুরভিত স্মৃ’তি হয়ে চিরদিন মিশে থাকবে আমা’র আত্মা’র সঙ্গে। | আর আমি কোনােদিন সশরীরে আসব না তােমা’র কাছে, যদিও মনে মনে আমা’দের দেখা হবে প্রায়ই। তােমা’র কর্মহীন জাগরণের শান্তমধুর অ’বকাশে, নিভৃত স্বপ্নের বি’লাসকুঞ্জে, তােমা’র স্নিগ্ধগভীর হৃদয়ের তন্দ্রালস প্রদেশে দেখা হবে আমা’দের মা’ঝে মা’ঝে। আর আমি কোনােদিন তােমা’র কাছে এ ভিক্ষা চাইব না। 

সারাদিনের গৃহকর্মের পর প্রতিদিন অ’পরাহে কেশবি’ন্যাস করেন অ’হল্যা। কিন্তু গতকাল কেশপাশ মুক্ত থাকায় আরও সুন্দর দেখাচ্ছিল তাকে। আলুলায়িতকেশ অ’হল্যা এতক্ষণ পুষ্পস্তবকভারে অ’বনত কোনাে পল্লবদলের মতাে ব্রীড়াবনত মুখে মা’টির দিকে চেয়ে ইন্দ্রের কথা শুনছিলেন।

এবার ইন্দ্রের মুখপানে সকরুণ দৃষ্টিতে চাইলেন অ’হল্যা।

মনে মনে উৎসাহিত বােধ করলেন ইন্দ্র। বললেন, সুকেশিনি, তােমা’র ভ্রমরকৃষ্ণ কুন্তলরাশির মধ্যে রয়েছে রহস্যময় এক আরণ্যক কুটিলতা, ছলাে ছলাে এক তরল দুর্বলতা তােমা’র দৃষ্টিতে, এক উদ্ধত নিষ্ঠুরতা তােমা’র উত্তুঙ্গ ও কৃষ্ণবৃন্ত কুচাগ্রভাগে।

দেবরাজ ইন্দ্র যেন মা’য়াবি’শারদ। কে জানত তার কথায় এমন যাদু আছে। কে জানত তাঁর প্রতিটি কথার নির্মম আঘাতে অ’হল্যার সুকোমল প্রতিটি অ’ঙ্গের গ্রন্থি শিথিলি’ত হয়ে উঠবে এমন ভাবে।

অ’হল্যা অ’নুভব করলেন, ক্রমশ অ’বশ হয়ে আসছে তার সারা দেহ। আত্মসংযমের সমস্ত শক্তি হা’রিয়ে ফেলছেন তিনি একে একে। | ইন্দ্র বললেন, সুন্দরী তুমি পাষাণপ্রতিমা’। তােমা’র অ’ঙ্গে এত রূপ, কিন্তু অ’ন্তরে প্রাণ কোথায় ? তােমা’র বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ড আছে কিন্তু হৃদয় নেই। তা থাকলে এই সকরুণ অ’নুনয়ে নিশ্চয়ই তা বি’গলি’ত হতাে।

মনে রেখাে তৃষ্ণার্ত ভিক্ষুককে জল দান করে তৃষ্ণা নিবারণ করা প্রতিটি গৃহিণীর কর্তব্য। | দেবরাজ ইন্দ্র নই আমি। তােমা’র রুপের তৃষ্ণায় আর্ত ও আকুল এক ভিক্ষুক আমি। আমা’র তৃষ্ণাকে শান্ত ও নিবৃত্ত করা তােমা’র ধর্ম দয়াবতী। 

সতীত্বের অ’হঙ্কারে এই ধর্মে জলাঞ্জলি’ দিও না। মনে রেখাে মহীয়সী, সতীত্ব মা’নবহৃদয়ের একটি সামা’ন্য গুণ ছাড়া কিছুই নয়। কিন্তু যে ধর্ম নির্গুণ অ’রূপ ব্রহ্মের সঙ্গে যুক্ত করে দেয় মা’নুষকে, সে ধর্ম সমস্ত রূপগুণের থেকে বড়।

ইন্দ্রকে নিয়ে ধীরে ধীরে শয়নগৃহের দিকে এগিয়ে গেলেন অ’হল্যা।

দেখতে দেখতে পুরাে একটি দণ্ড কেটে গেল। অ’হল্যা ব্যস্ত হয়ে বললেন, মহর্ষির প্রত্যাগমনের সময় উপস্থিত। আমি আপনার সাহচর্যে কৃতার্থ হয়েছি দেবরাজ। এবার আপনি যান। এবার মহর্ষির কোপবহুি থেকে আমা’কে ও নিজেকে বাঁচান।

কিন্তু ঘর হতে বেরিয়ে বেশিদূরে যেতে পারলেন না দেবরাজ ইন্দ্র। সহসা মহর্ষি গৌতমকে সামনে উপস্থিত দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলেন ভয়ে। 

এদিকে গৌতমের কণ্ঠস্বর শুনে ব্যস্ত ও শশব্যস্ত হয়ে শয়নগৃহ হতে বেরিয়ে এলেন অ’হল্যা। একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে অ’হল্যার পানে চেয়েই তার সারা অ’ঙ্গে শৃঙ্গারলক্ষণ দেখতে পেলেন মহর্ষি।

অ’হল্যার অ’ঙ্গের বসন তখন বি’স্ত। কণ্ঠের বকুলমা’লা ছিন্ন ভিন্ন। নির্মম নখচিহ্ন তার কুচযুগের উপর। কপােলফলকের উপর নিবি’ড়তম চুম্বনের এক নির্ভুল অ’ভিজ্ঞান। 

আগুনের মতাে জ্বলতে লাগলেন মহর্ষি গৌতম। ভয়ে বি’বর্ণ হয়ে গেলেন ইন্দ্র ও অ’হল্যা দুজনেই।

রােষকষায়িত দৃষ্টিতে ইন্দ্রের দিকে চেয়ে অ’ভিশাপ দিলেন মহর্ষি। যে পুরুষত্বের দ্বারা অ’পরের ধর্মপত্নীকে ধর্ষণ করেছ তুমি, এখনি অ’ঙ্গচ্যুত হবে তােমা’র সে পুরুষত্ব।

কাতরকণ্ঠে ইন্দ্র বললেন, যত ইচ্ছা আমা’য় অ’ভিশাপ দিন মহর্ষি। কিন্তু অ’হল্যার কোনাে দোষ নেই। কারণ আমিই তাকে এ কর্মে প্ররােচিত করেছি। 

বজ্রগম্ভীর কণ্ঠে মহর্ষি বললেন, যে-কোনাে কারণেই হা’েক, যে নারী এই সব পাপকর্মে জড়িয়ে থাকে অ’র্ধপাপ তার মধ্যে সঞ্চারিত হবেই।

তারপর অ’হল্যার পানে চেয়ে অ’ভিশাপ দিলেন। সুরাসুরের দুর্নিরীক্ষ্য ও বায়ুভুক হয়ে সহস্র বৎসর তপস্যা করতে হবে তােমা’য় এই শূন্য তপােবনে। তারপর বি’ষ্ণুর অ’বতার রামের স্পর্শে পাপমুক্ত হয়ে আবার মিলি’ত হবে আমা’র সঙ্গে।

এই বলে কালবি’লম্ব না করে দূর হিমা’লয়ে নূতন করে তপস্যা শুরু করতে চলে গেলেন মহর্ষি গৌতম।

দেখতে দেখতে বেদনাবি’হুল ও হতবাক দেবরাজের দৃষ্টির সীমা’ হতে মুহূর্তে ধূমপরিবৃত এক দীপ্তশিখার মধ্যে নিঃশেষে বি’লীন হয়ে গেল অ’তুলনীয়া অ’হল্যার অ’নঙ্গবি’মা’েহন রুপাবয়ব।

Please follow and like us:

fb-share-icon

নতুন ভিডিও গল্প!


Tags: , , , , , ,

Comments are closed here.