মতঙ্গ মুনি ও শবরী – (রামায়নী প্রেমকথা) – সুধাংশরঞ্জন ঘোষ

September 4, 2021 | By Admin | Filed in: বিখ্যাত লেখকদের সাহিত্যে যৌনতা.

পম্পাসরােবরের জলের মতাে তার গায়ের রং। ঋজুশীর্ষ শকীতরুর মতাে তার সবল সুগঠিত দেহ। ঘনকৃষ্ণ কালসর্পের মতাে অ’বি’ন্যস্ত তার কুটিল কেশকলাপ। সে কখন মতঙ্গ বনে এসেছে তা এখানকার কেউ ঠিক বলতে পারবেন না। তাকে যদি আশ্রমের কেউ জিজ্ঞাসা করে, কোথায় তার ঘর, কোথা হতে সে এসেছে, তাহলে মতঙ্গবনের ফাকে ফাকে দুরে যে ঋষ্যমুক পাহা’ড় দেখা যায় যায়, সেই পাহা’ড়ের দিকে হা’ত বাড়িয়ে কী দেখায়।

তারপর বলতে থাকে, ওই পাহা’ড়টা’র ওপারে যে একটা’ ঝর্ণা আছে তার দু’পাশে বি’রাট চন্দন আর মহুয়ার বন। সেই বনের মধ্যে আমা’দের বাস। আমা’র বাবা হচ্ছে ব্যাধ ; আমরা জাতিতে শবর। সকালে উঠেই আমা’র বাবা তীর ধনুক নিয়ে শিকার করতে যায়। আর আমা’র মা’ সারাদিন ধরে মহুয়ার মদ তৈরি করে। সন্ধ্যে হলেই আগুন জ্বালায়।

বাবা শিকার থেকে ফিরে এলেই শিকারের মা’ংসগুলাে সেই আগুনে ঝলসানাে হয়। তারপর সেই ঝলসানাে মা’ংস আর মহুয়ার মদ খেয়ে নেশায় বি’ভাের হয়ে আমা’র বাবা ও মা’ দু’জনেই নাচতে শুরু করে। নাচতে নাচতে রাত গভীর হয়ে পড়ে। 

আমা’র কিন্তু ওসব কিছুই ভালাে লাগে না। ভালাে লাগত না বলেই বাবা মা’কে এড়িয়ে চলতাম আমি। খুব কম কথা বলতাম। সন্ধ্যে হলেই ওই পাহা’ড়টা’র একটা’ চূড়ার উপর একা একা বসে থাকতাম। ঝর্ণার গান শুনতে শুনতে একসময় ঘুমিয়ে পড়তাম আমি। আমা’র বাবা মা’ কোনাে খোঁজ করত না আমা’র। 

এমনি করে কোনাে এক চাঁদনী রাতে ওই পাহা’ড়ে উপর ঘুমিয়ে পড়লাম আমি। বাইরে তখন চাদের আলাে আর হা’ওয়ার হিল্লোলে মা’তাল হয়ে উঠেছে পম্পার জল আর মহুয়ার বন। রাত পর্যন্ত নাচতে নাচতে ক্লান্ত হয়ে উঠেছে আমা’র বাবা মা’। এমন সময় আমি সহসা ঘুমিয়ে পড়লাম। 

চাদের আলাে আমা’র কখনই ভালাে লাগে না। চাদের আলাে বড় চঞ্চল। কেমন যেন মত্ততা নিয়ে আসে মনের মধ্যে। মা’েহগ্রস্ত করে ফেলে সকল বস্তুকে। তার থেকে অ’ন্ধকার ঢের ভালাে। বড় শান্ত ও মধুর হচ্ছে অ’ন্ধকার। মনকে তা স্বাভাবি’কভাবেই আত্মস্থ ও মৌন করে তােলে। 

চাদের আলাে আমা’র ভালাে লাগে না বলেই হয়তাে একটু তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম সে রাত্রিতে। ঘুমা’েতে ঘুমা’েতে মা’ঝরাতে এক অ’দ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। এক মধুর আনন্দ উত্তেজনায় রােমা’ঞ্চিত হয়ে উঠল আমা’র সারা শরীর। আমা’র জীবনের একটি অ’তিগােপন ইচ্ছা মূর্ত হয়ে উঠল সে স্বপ্নের মধ্যে।

শুধু যে মদ খেয়ে আমা’র বাবা মা’ নাচত বলেই আমি তাদের দেখতে পারতাম না তা নয়। তাদের উপর আমা’র রাগের অ’ন্য একটা’ কারণ ছিল। আমি ছােট থেকে পাখির গান শুনতে ও হরিণের খেলা দেখতে ভালবাসতাম। আমা’র বাবা পাখি আর হরিণ দেখতে পেলেই তাদের নির্মমভাবে হত্যা করত। আমি ফুলও খুব ভালবাসতাম। এত ভালবাসতাম যে, গাছ থেকে কোনাে ফুল ছিড়তাম না। আপনা হতে যে ফুল গাছ হতে ঝরে পড়ত শুধু তাই নিয়ে খেলা করতাম আমি। কিন্তু আমা’র মা’ বড় নিষ্ঠুর। শুধুমহুয়া নয়, গাছ থেকে সবরকমের টা’টকা ফুলগলােকে ছিড়ে তাদের পিষে নিজেদের খাবার জন্য মদ তৈরি করত। আমি ভেবেই পেতাম না, এই সব সুন্দর সজীব জিনিসকে মা’নুষ কি করে তার ক্ষুধার খাদ্য হিসেবে ব্যবহা’র করতে পারে। মনের নিভৃতে যা খুঁজছিলাম স্বপ্নের মধ্যে তাই পেয়ে গেলাম। 

স্বপ্নে দেখলাম, আমি ঘুরতে ঘুরতে এমন এক তপােবনে এসে পড়েছি যে তপােবনের শান্তি কখনাে কোনােভাবে ক্ষুন্ন হয় না। কোনাে হিংসা, বি’রোেধ বা বি’ষমতা প্রবেশ করতে পারে না তার ত্রিসীমা’নার মধ্যে। যেখানে ফুল কখনাে শুকিয়ে ঝরে পড়ে না। পাখির গান যেখানে বন্ধ হয় না কখনাে। 

সেই তপােবনের মধ্যে ইতস্তত ঘুরতে ঘুরতে এক মহা’তেজস্বী ঋষির দেখা পেলাম আমি। তাকে দেখেই ভয় পেলাম। কিন্তু তিনি আমা’র প্রতি সস্নেহ দৃষ্টিতে তাকিয়ে অ’ভয় দান করলেন আমা’য়। 

এমনি করে সেই তপােবনের মধ্যে আমা’র জীবনের ঈপ্সিত আনন্দ খুঁজে পেলাম আমি। কিন্তু পরক্ষণেই স্বপ্নটা’ টুটে গেল আমা’র।

সে রাত্রিতে আর ঘুম হলাে না আমা’র। শুনেছি, ওই পাহা’ড়টা’ ব্রহ্মা’র তৈরি। ওই পাহা’ড়ের উপর ঘুমিয়ে কোনাে স্বপ্ন দেখলে সে স্বপ্ন সার্থক হয় অ’চিরে।

এজন্য সকাল হতেই আমা’র বাবা মা’কে কিছু না বলেই আমা’র স্বপ্নে দেখা সেই তপােবনের খোঁজে বেরিয়ে পড়লাম। সেদিন হতে কত পাহা’ড়ে জঙ্গলে কত ঘুরে বেড়ালাম তার জন্য। অ’বশেষে এখানে এসে উঠলাম।

এখানে আসার পর থেকে মতঙ্গ মুনির শিষ্যরা তাকে ভয় দেখিয়েছিল। বলেছিল তুই অ’স্পৃশ্য। এখানকার কোন জিনিস তুই ছুঁবি’ না। কোনাে দৌরাত্ম্য করবি’ না। তাহলে মুনি রেগে গিয়ে তােকে শাপ দেবে।

ও বলত, মুনিকে দেখবার জন্যই এখানে এসেছি। ওরা জবাব দিল, মুনির সঙ্গে দেখা হবে না।

ঝর্ণার জলের মতাে খিল খিল শব্দে হেসে উঠেছিল শবরী। হা’সতে হা’সতে বলেছিল, তাহলে আমি এখান থেকে যাব না। মুনির সঙ্গে দেখা না করে আমি এ বন ছেড়ে কোনােদিন যাব না। 

শবরী আরও বলেছিল, আমি ব্যাধের মেয়ে। আমা’র গায়ে ভীষণ জোর। আমি তােমা’দের এ আশ্রম লণ্ডভণ্ড করে দেব। 

শবরীকে ঠকাবার জন্য শিষ্যরা একদিন তাদের মধ্যে একজনকে মতঙ্গ মুনি বলে উপস্থাপিত করল তার কাছে। 

রাগে চীৎকার করে উঠল শবরী, না, না, ও সে মুনি নয়। তােমরা মিছে কথা বলছ। তােমা’দের কথা আমি বি’শ্বাস করি না। তােমা’দের কাউকে চাই না। আমি নিজে গিয়েই দেখা করব তার সঙ্গে।

অ’বশেষে একদিন মনােবাঞ্ছা পূর্ণ হলাে শবরীর। দেখা হলাে মতঙ্গ মুনির সঙ্গে। তিনি তখন ছিলেন ধ্যানমৌন। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি যেন অ’বৃষ্টিসংরদ্ধ মেঘের মতাে গম্ভীর, নিবাতনিষ্কম্প প্রদীপের মতাে স্থির, তরঙ্গসংঘাতবি’হীন সমুদ্রের মতাে শান্ত।

আশ্চর্য হয়ে দেখতে লাগল শবরী। কেমন যেন ভয় হতে লাগল তার। ভাবল, এই সেই মতঙ্গ মুনি আগুন জ্বলে যার ক্রোধে। হা’সিতে যার মুক্তা ঝরে। ফুল হয়ে ফুটে ওঠে যার মুক্তানিভ স্বেদবি’ন্দু। | ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালেন মতঙ্গ মুনি। হয়তাে ধ্যানের মধ্যেই বুঝতে পেরেছিলেন শবরীর মনের কথা। তার অ’খণ্ড হৃদয়ের আকুতি।

মতঙ্গ মুনির পায়ের উপর ছুটে গিয়ে লুটিয়ে পড়ল শবরী। কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমা’র অ’পরাধ নেবেন না ঠাকুর, সাধন ভজন কিছুই জানি না আমি। আমি শুধু একমা’ত্র আপনাকে জানি। স্বপ্নে আপনাকে দেখার পর হতে আপনাকেই প্রাণ মন সমর্পণ করেছি আমি। 

শবরীর উপর স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ করে চেয়ে রইলেন মতঙ্গ মুনি। তার সে দৃষ্টির অ’র্থ কিছু বুঝতে পারল না শবরী। | শবরী করুণ কণ্ঠে বলল, এখানকার সবাই বলছিল, আমি অ’স্পৃশ্য। বলছিল, আমা’র দ্বারা এ আশ্রমের কোনাে কাজ হবে না। বলছিল, আপনি নাকি আমা’য় কোনােদিন দেখা দেবেন না।

মতঙ্গ মুনির পা দুটোকে ধরে এবার নাড়া দিল শবরী। 

কিন্তু কেন? কি পাপ আমি করেছি? আমা’র বাবা যদি পাখি মা’রে, আমা’র মা’ যদি ফুল থেকে মদ তৈরি করে তবে সে দোষ কি আমা’র? আমা’র জ্ঞান হওয়ার পর থেকে আমি তাে কোনােদিন কারাে প্রাণে কষ্ট দিইনি। নিজের প্রাণকে যেমন ভালবাসি তেমনি সকল পশু পাখি, কীটপতঙ্গ, তরুলতা ও ফুল ফলকে ভালবেসে এসেছি আমি ছােট থেকে। যে ফুল আপনা হতে ঝরে পড়ে তাই নিয়ে খেলা করেছি, যে ফল পেকে নিজের থেকে ঝরে পড়েছে তাই খেয়েছি। যে জলধারা আপনা হতে বয়ে চলেছে সেই স্বতঃপ্রবাহিত জল পান করেছি।

তবে কেন আমি অ’স্পৃশ্য হলাম, আপনি আমা’য় বুঝিয়ে দিন ঠাকুর। যারা পাপ করে একমা’ত্র তাদেরই তাে অ’স্পৃশ্য বলা উচিত। কিন্তু আমি তাে কোনাে পাপ করিনি।

এতক্ষণে স্নেহতরল এক স্নিগ্ধতা স্পষ্ট ফুটে উঠল মতঙ্গ মুনির দৃষ্টিতে। তিনি শান্তকণ্ঠে বললেন তুমি কি চাও?

শবরী আশ্বস্ত হয়ে বলল, আমি শুধু তপােবনে থেকে আপনার সেবা করতে চাই। ধর্ম, ঈশ্বর, সাধন ভজন আমি কিছুই জানি না। আমি শুধু জানি আপনাকে। আপনি যা বলবেন আমি তাই করব। চোখ থাকতে আমি অ’ন্ধ। আপনি হবেন আমা’র অ’ন্ধের যষ্ঠি। আপনি স্বর্গে যেতে বললে স্বর্গে যাব, নরকে যেতে বললে তাই যাব। পাপ পুণ্য ভালাে মন্দ কিছুই বি’চার করব না। 

মতঙ্গ মুনি স্নেহসিক্ত কণ্ঠে বললেন, তথাস্তু। তােমা’র মনােবাঞ্ছা পূর্ণ হবে শবরী। তুমি এই আশ্রমে থেকে আমরা যা করব তাই করবে। তুমি ভগবানকে না জানলেও তুমি ভগবানকে একদিন এইখানে থেকেই পাবে। তুমি সম্পূর্ণরূপে অ’পাপবি’দ্ধা। আমা’দের থেকেও পবি’ত্র তুমি অ’ন্তরে। তুমিই প্রকৃত সত্যসাধিকা।

অ’পার আনন্দে চোখে জল এলাে শবরীর। মতঙ্গ মুনি বললেন, তােমা’কে পেয়ে আমি ধন্য হয়েছি শবরী।

একজন প্রবীণ শিষ্য মৃ’দু প্রতিবাদ করে বলল, আপনি ওকে এখানে অ’বস্থানের অ’নুমতি দিলেন কেন মুনিবর? শবরীর মতাে যুবতী নারী সাধনা ও সমা’ধির পথে ঘাের প্রতিবন্ধক।

মতঙ্গ মুনি মৃ’দু হেসে বললেন, ভােগের বস্তু নিকটে উপস্থিত থাকলে যাদের চিত্ত বৈকল্য ঘটে, যারা হৃদয়কে সংযত রাখতে পারে না তারা কখনই প্রকৃত যােগী নয়। সংযম শিক্ষার

এক মহা’পরীক্ষা হবে এই নারী।

মতঙ্গ মুনির কথামতাে মনের আনন্দে সপ্তসমুদ্রে স্নান করে এলাে শবরী।

মতঙ্গ বনের শেষপ্রান্তে বড় মনােরম একটি বি’রাট জলাশয় হচ্ছে এই সপ্তসমুদ্র। সবাই বলে সত্যসত্যই সাতটি সমুদ্র হতে আনীত জল মিশ্রিত আছে এই জলাশয়ে। এই সপ্তসমুদ্রের জল বড় স্বচ্ছ, শীতল আর শান্ত। নিয়তবায়ুতাড়িত হয়েও কখনাে বি’ক্ষুব্ধ হয় না এর বক্ষস্থল। প্রখর সৌরতাপেও তপ্ত হয় না যার চিরশীতল অ’ঙ্গ। 

এই সপ্তসমুদ্রে স্নান করে ত্রিতাপজ্বালা একেবারে জুড়িয়ে গেল শবরীর। স্নিগ্ধ হলাে তার তাপিত দেহ। নবজীবন লাভ করল সে।

ধীরে ধীরে তাপসীর বেশ ধারণ করল শবরী। তার যৌবনসুলভ সুললি’ত লাবণ্য লতিকায় এলাে ম্লান রুক্ষতা। শবরী নিজে কিন্তু কিছুতেই তপস্যায় বসে না। সে শুধু তাপসীর বেশে সেবা করে যায় মতঙ্গ মুনির।

পূজা ও অ’ভিষেকের জন্য জল নিয়ে আসে সপ্তসমুদ্র হতে। ফুল ও পদ্মবীজ তুলে নিয়ে আসে মন্দাকিনীর জল হতে। যজ্ঞের কাষ্ঠ ও কুশাদি সংগ্রহ করে নিয়ে আসে বি’ভিন্ন স্থান হতে। আসন বেদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে প্রতিদিন সকালে। অ’পরাহে বৃক্ষের আলবােলাগুলি’তে ভৃঙ্গারক হা’তে জল দেয়। সন্ধ্যা হলে সন্ধ্যা দীপ জ্বালে সমা’ধি কুটিরে।

কিন্তু যার জন্য এত কিছু করছে শবরী, যাকে ছাড়া আর কোনাে কিছু জানে না সে, তার কিন্তু সেদিকে কোনাে লক্ষ্য নেই। সম্পূর্ণ উদাসীন তিনি তার প্রতি। আপন মা’েক্ষের জন্য সতত ধ্যানমগ্ন তিনি।

অ’বশ্য শবরী কিছুই চায় না তার কাছে। সে শুধু দিয়ে যেতে চায়। দিয়েই খুশি। কোনদিন কিছুই পেতে চায় না তার কাছে। পাবার জন্য সে দেয় না। 

তাই ফুটকুসুমের সুবাসের মতাে জ্বলন্ত ধূপে সুগন্ধিতনু শিখার মতাে সে শুধু আপনাকে তিলে তিলে ক্ষয় করেই আনন্দ পায়। 

তাই সে অ’কাতরে দান করে যায় তার অ’ক্লান্ত দেহের সমস্ত শ্রম, তার অ’খণ্ড অ’ন্তরের অ’ফুরন্ত ভক্তি। এমনি এক আত্মঘাতী অ’থচ আধ্যাত্মিক আনন্দে মা’তােয়ারা হয়ে ওঠে শবরী। 

সারাদিন আশ্রমের কাজকর্ম নিয়েই থাকে শবরী। কিন্তু মা’ঝে মা’ঝে ফাক পেলেই ধানমগ্ন মতঙ্গ মুনির কাছে বসে একদৃষ্টে তার পানে চেয়ে থাকে। চেয়ে চেয়ে দেখে, কিভাবে তিনি প্রাণবায়ুকে প্রাণায়ামের মধ্যে ধারণ করে, কিভাবে তিনি যজ্ঞে আহুতি দান করেন। দেখে কেমন করে তিনি মা’থার উপর সমস্ত রােদ বৃষ্টি সহ্য করেন। | আজকাল শবরীও মা’থার উপর রােদবৃষ্টি সব সহ্য করে। কুটিরের মধ্যে আশ্রয় নেয় না। মতঙ্গ মুনির দেখাদেখি সেও বৃষ্টি এলে দাঁড়িয়ে ভেজে। প্রখর রৌদ্রে স্থির হয়ে বসে থেকে পুড়তে থাকে।

কিন্তু তার এই কৃসাধনের কোনাে আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য নেই। মা’েক্ষলাভের জন্য কোনাে তৃপশ্চর্যার অ’ঙ্গ হিসাবে এসব করে না সে। মতঙ্গ মুনির প্রতি তার অ’ন্তরের গভীর ভক্তি ও ভালবাসার তাড়নাতেই এত সব কষ্ট স্বীকার তার।

সমা’ধিকালে মতঙ্গ মুনির দেহে যে সব ক্লেশ অ’নুভূত হয় সে সব ক্লেশ অ’পনােদন করতে পারে না শবরী। পারে না বলেই নিজের দেহ দিয়ে সেই সব ক্লেশের তীব্রতাকে অ’নুভব করে দেখতে চায়।

হা’েমা’গ্নির তাপে অ’থবা প্রখর সূর্যকিরণে মতঙ্গ মুনির সারা দেহ স্বোক্ত হয়ে ওঠে যখন শবরী তখন নিজের পরিধেয় বস্ত্রাঞ্চল দ্বারা সে স্বেদ মুছিয়ে দেয়। ব্যাকুল হয়ে ওঠে তাকে। কোনাে বৃক্ষপত্র দ্বারা ব্যজন করবার জন্য। যখন তীব্র শৈত্য পীড়িত বা প্রবল বৃষ্টিধারায় সিক্ত হয় মতঙ্গ মুনির শরীর তখন শবরীর মনে হয় কোনাে বস্তু দ্বারা আচ্ছাদিত করে রাখে তার মস্তক। কিন্তু এসব নিষিদ্ধ বলে করতে পারে না শবরী।

তাই দেখে মনে কষ্ট পায়। কষ্ট পেয়ে নিজেকে সান্ত্বনা দেয়। নিজেকে বােঝায়, তার ভক্তি ও ভালবাসার যিনি শ্রেষ্ঠ ধন তিনি যখন রৌদ্রে তাপিত হন, তখন সে নিজে কোনােমতে কোনাে স্নিগ্ধচ্ছায়া উপভােগ করতে পারে না। তিনি যখন বৃষ্টিসিক্ত হন তখন সে নিজে কখনাে শুষ্ক কুটিরের আরামঘন মুহূর্ত যাপন করতে পারে না।

সারাদিনের ক্লান্তির পর মতঙ্গ মুনি সারারাত্রি বেশ গভীর নিদ্রাসুখ উপভােগ করেন তার কুটির মধ্যে। তার শিষ্যরাও যথাস্থানে ঘুমিয়ে পড়ে সকলে।

এদিকে একা শুধু শবরীরই ঘুম আসে না চোখে।

এক একদিন গভীর রাত্রিতে কুটিরের পর্ণশয্যা ছেড়ে বাইরে এসে বসে শবরী। গাছের পাতার ফাকে ফাকে দূর আকাশের নক্ষত্রদলের দিকে তাকিয়ে থাকে। যখনি কোনাে ক্লান্তি আসে তখনি প্রকৃতি জীবনের কথা ভাবে। ভাবে, সারারাত্রির মধ্যে একটিবারের জন্যও তাে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ছে না প্রকৃতির কোনাে বস্তু, একটি মুহূর্তের জন্যও স্তিমিত হয়ে পড়ছে না।

ওই আকাশের নক্ষত্রদল। যেতে যেতে একবার ভুলেও থমকে দাঁড়াচ্ছে না নদীজলধারা। ফুল ফোটা’নাের যে নীরব প্রস্তুতি চলছে গাছে গাছে সে প্রস্তুতি বি’রাম নিচ্ছে না একটি বারের জন্যও।

অ’থচ এরা তাে প্রতিদানে কিছুই চাইছে না। প্রতিদানে শবরীও কিছুই চায় না। তবু মা’ঝে মা’ঝে অ’ভিমা’ন জাগে শবরীর মনে।

তার সবচেয়ে বড় অ’ভিমা’ন, যার জন্য জীবনের সব সুখ ত্যাগ করেছে সে, তিনি তার অ’ন্তরের আসল দুঃখটা’ কোথায় তা একবারও দেখলেন না। যার প্রতি সততনিবদ্ধ তার সযত্নসাধিত দৃষ্টি, তিনি একবার তার প্রতি ভালাে করে ফিরে তাকালেনও না। শবরীর মনে হলাে, মতঙ্গ মুনি শুধু তাকে আশ্রমের বাইরে বাইরে থেকে কাজ করবার অ’নুমতি দিয়েছেন, তার কুটিরের মধ্যে প্রবেশাধিকার দেননি। তার দেহ স্পর্শ করবার অ’নুমতি দেননি। তা যদি হবে কেন তবে রাত্রিতে তার কুটিরের মধ্যে থাকতে দেন না তাকে। এই সময় কাছে থাকলে সে তার পদসেবা করতে পারত, কোনাে তৈল দ্বারা গা মা’র্জনা করে দিতে পারত তাঁর। 

কিন্তু একদিন অ’নুমতি মিলল।

একদিন সন্ধ্যায় মতঙ্গ মুনির কুটিরে ডাক পড়ল শবরীর। যে দিনটির জন্য দিনের পর দিন ধৈর্য ধরে প্রতীক্ষা করে এসেছে সে, অ’বশেষে সেই বহুপ্রতীক্ষিত বহুমূল্য দিনটি আপনা হতে এলে তার জীবনে। আনন্দে আত্মহা’রা হয়ে উঠল শবরী।

সেদিন সহসা একটু অ’সুস্থ হয়ে পড়েছিলেন মতঙ্গ মুনি। শরীরের তাপমা’ত্রা অ’নেকখানি বেড়ে গিয়েছিল। ব্যথা অ’নুভব করেছিলেন সর্বাঙ্গে।

কম্পিত পায়ে কুটির মধ্যে প্রবেশ করল শবরী। মতঙ্গ মুনির নির্দেশমতাে কিছু বি’ন্দু ও শেফালি’কাপত্রনিঃসৃত রস খাইয়ে দিল তাকে।

মতঙ্গ মুনি তাকে কাছে বসতে বললেন। ইতস্ততঃ করতে লাগল শবরী। সঙ্গে সঙ্গে অ’ভিমা’নে ফুলে উঠতে লাগল শবরী মনে মনে। এ অ’ধিকার তাকে আরও আগে দেওয়া হয়নি কেন?

কাছে গিয়ে প্রথমে প্রণাম করল মুনিকে। হা’ত তুলে নীরবে আশীর্বাদ করলেন মতঙ্গ মুনি।

শবরী প্রণাম করে দাঁড়িয়ে রইল স্থির হয়ে। মতঙ্গ মুনি আবার তাকে তার কাছে বসবার জন্য ইশারায় জানালেন।

এবার কাছে গিয়ে বসল শবরী। মতঙ্গ মুনিকে স্পর্শ করল না। শক্ত কাঠের মতাে হা’ত গুটিয়ে বসে রইল। মতঙ্গ মুনি এবার তার অ’ঙ্গমর্দন করে দেবার জন্য স্পষ্ট অ’নুরােধ করলেন শবরীকে।

স্পষ্ট অ’ভিমা’ন ফুটে উঠল শবরীর কণ্ঠে, না না, আমি আপনাকে স্পর্শ করব না। শবরীর মনের কথা বুঝতে পেরে মৃ’দু হা’সলেন মতঙ্গ মুনি। হা’সিমুখেই বললেন, আমা’র সেবা করবার লােকের অ’ভাব নেই। তবু আজ তােমা’য় কেন ডেকেছি তা জান শবরী?

শবরী লজ্জারক্ত কণ্ঠে উত্তর করল, আপনি আমা’কে দয়া করেন তাই।

ব্যস্ত হয়ে মতঙ্গ মুনি বললেন, না শবরী তােমা’কে দয়া করবার আমা’র কোনাে অ’ধিকার নেই। আমি আশ্চর্য হয়ে গিয়েছি শবরী, আমা’র প্রতি তােমা’র ভক্তি ও নিষ্ঠা দেখে।

এই ভক্তি ও নিষ্ঠার দ্বারা মা’নুষ ভগবানকে লাভ করতে পারে।

মা’থা নত করে শান্তকণ্ঠে বলল শবরী, আমি ভগবান কাকে বলে জানি না। আপনিই আমা’র কাছে ভগবান। ভক্তি ও ভালবাসাই হচ্ছে আমা’র একমা’ত্র সাধনা। 

মতঙ্গ মুনি বললেন, তােমা’র সেই ভক্তি ও ভালবাসা দিয়ে আমা’র হৃদয়ের যথাসর্বস্ব কেড়ে নিয়েছ শবরী। তােমা’কে দেবার আর আমা’র কিছুই নেই। তুমি তােমা’র নিজের জোরেই সব কিছু নিয়ে নিয়েছ। 

মৃ’দু কান্নায় কণ্ঠ সহসা ঈষৎ বুদ্ধ হলাে শবরীর। বলল, না না, ওকথা বলবেন না। বি’শ্বাস করুন, আমি আপনার কাছে থেকে কিছুই চাই না। আমি শুধু আপনার সেবা করে যেতে চাই। সেই সেবা করবার অ’ধিকারও আমি সব সময় পাই না, তাই আমা’র দুঃখ। 

শবরীকে কাছে টেনে নিয়ে নিজের হা’তে তার চোখের জল মুছিয়ে দিলেন। তারপর বললেন, এবার হতে তােমা’র আর সে দুঃখ থাকবে না শবরী। তুমি ইচ্ছামত যখন যা খুশি করবে। আজ হতে তােমা’র আমা’র দুজনের দেহ মনের মধ্যে কোন পার্থক্য রইল না। তুমি হলে আমা’র অ’র্ধাঙ্গিনী।

আনন্দের চাপে অ’শুর বেগ আরও বেড়ে গেল শবরীর। কোনাে কথা বলতে পারল না সে। 

মতঙ্গ মুনি বললেন, এবার হতে তুমি আমা’য় স্পর্শ করলে আর আমা’র সমা’ধি ভঙ্গ হবে না, ক্ষুন্ন বা ব্যাহত হবে না আমা’র ব্রহ্মচর্য সাধন। | কথা শেষ করে শবরীকে চুম্বন করলেন মতঙ্গ মুনি।

জীবনে প্রথম পুরুষস্পর্শ পেয়ে অ’ধরােষ্ঠটা’ একটুখানি কেঁপে উঠল শবরীর। অ’বাক বি’স্ময়ে সে কিছুক্ষণের জন্য তাকিয়ে রইল মতঙ্গ মুনির মুখপানে।

মতঙ্গ মুনির অ’ঙ্গমর্দন ও পদসেবা করে তার কুটির হতে বেরিয়ে এলাে যখন শবরী, রাত্রি তখন গভীর। ঘন ঘাের অ’ন্ধকারে একাকার হয়ে গেছে সপ্তসমুদ্রের জল ও মতবনের সমস্ত তরুলতা। 

শবরীর কিন্তু মনে হলাে জীবনে বা জগতে কোথাও কোনাে অ’ন্ধকার বা জটিলতা নেই। মনে হলাে, নক্ষত্রখচিত এক বি’রাট আকাশ নেমে এসেছে তার অ’ন্তরে। অ’রণ্য, ভূধর ও নদীসমুদ্র-সমম্বি’ত এক মহা’পৃথিবী এসে বাসা বেঁধেছে তার প্রসারিত বুকে। মনে হলাে, জীবনে যা চেয়েছিল তার থেকে অ’নেক বেশি পেয়েছে। এত তাে কোনাে দিন চায়নি। চাইবার স্পর্ধা হয়নি।

আপন কুটীরে গিয়ে প্রবেশ করল শবরী। আনন্দে চোখে একবারও ঘুম এলাে না শবরীর সারারাতের মধ্যে। 

এই মতবনে আসার পর থেকে কত বসন্ত চলে গেছে তার চোখের সামনে দিয়ে। কোনােদিন একবার ফিরে তাকায়নি শবরী। কিন্তু আজ সকাল হতেই বসন্তসজ্জিত বনপ্রকৃতির সমস্ত রুপসম্ভার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বি’হুল দৃষ্টিতে দেখতে লাগল। শুধু দেখল নয়, নিজেও সাজল। 

আশ্রমের প্রাতঃকালের কাজকর্ম সব সেরে তৈলদ্বারা অ’ঙ্গরাগ করে সপ্তসমুদ্রে স্নান করে এলাে শবরী। তারপর আরক্ত বলবসন পরিধান করে নানারকমের ফুলের অ’লঙ্কার তৈরি করে তাই দিয়ে শােভিত করল সারা অ’ঙ্গ। 

আজ আর তপস্যামগ্ন মতঙ্গ মুনির কাছে বসে রইল না শবরী। বনে মধ্যে চারিদিকে ঘুরে বেড়াল ইচ্ছামত।

সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে গেলে মতঙ্গ মুনি যথারীতি আহ্নিক ও সামগান শেষ হলে কুটিরে গিয়ে মুনিকে প্রণাম করল শবরী। প্রণামকালে মা’থা নত করতেই ঘনকৃষ্ণ বি’ন্যস্ত কেশপাশ হতে পদ্মরাগমণিতুল্য অ’রুণ অ’শােক পুষ্পগুচ্ছ খসে পড়ল।

আজ বসন্তপুষ্পভরণা শবরীকে প্রথম এভাবে দেখে বি’স্মিত হয়ে উঠলেন মতঙ্গ মুনি।

এদিকে তখন মতঙ্গবনের বাইরে অ’ফুরান জ্যোৎস্নাধারায় প্লাবি’ত হয়ে উঠেছে সমগ্র পৃথিবী। ছায়াচ্ছন্ন তরুশ্রেণীর ফাকে ফাকে সেই জ্যোৎস্নার ছটা’ পড়েছে বনের ভিতর। দেখে মনে হচ্ছে, শুভ্রধবল অ’জস্র প্রস্ফুটিত সিন্ধুবার কুসুম ছড়িয়ে দিয়েছে কে যেন সারা বনভূমির উপর। 

মতঙ্গ মুনি ভাবলেন, বসন্তজ্যোৎস্নার এই মা’য়াময় প্রভাবে ও মা’রুত হিল্লোলের স্পর্শে কামা’বি’ষ্ট হয়ে তার কাছে সঙ্গম প্রার্থনা করছে শবরী। কিন্তু স্পষ্ট করে মুখ ফুটে বলতে পারছে না তার কাছে। 

তাকে পরীক্ষা করবার জন্য মতঙ্গ মুনি বললেন, তােমা’র যৌবনকাল পূর্ণ হয়েছে। মা’ঝে মা’ঝে কোনাে পুরুষে সঙ্গলি’প্সা বা কোনাে সঙ্গম লালসা অ’নুভব কর না শবরী? 

প্রথমে মতঙ্গ মুনির কথাটা’ ভালাে বুঝতে না পেরে অ’বি’শ্বাসের দৃষ্টিতে চেয়ে রইল তার মুখপানে।

তারপর ধীরে ধীরে উত্তর করল, এখানে আসবার আগে যখন ওই ঋষ্যমুক পাহা’ড়টা’র উপরে শুতাম, মা’ঝে মা’ঝে এক এক দিন আমা’র দেহের শিরায় শিরায় রক্তের মধ্যে একটা’ অ’সহ্য উত্তাপ অ’নুভব করতাম আমি। মনে হতাে, কোনাে বলি’ষ্ঠ পুরুষের নিবি’ড় স্পর্শ পেলে সে উত্তাপ যাবে আমা’র নিমেষে জুড়িয়ে। কিন্তু এখানে আসার পর থেকে সে উত্তাপ কোননা দিন কোনাে মুহূর্তে অ’নুভব করি না আমি। কোনােদিন কোনাে কামভাব জাগে না মনের মধ্যে।

মতঙ্গ মুনি তখন গম্ভীর হয়ে বললেন, তােমা’র কথা না হয় বুঝলাম। কিন্তু তুমি বুঝতে পারছ না শবরী, অ’যত্নসাধিত হলেও তােমা’র যৌবন সৌন্দর্য দিনে দিনে কেমনভাবে বেড়ে চলেছে এবং স্পর্শদোষশূন্য তােমা’র এই যৌবনসৌন্দর্য কতখানি কামবি’মা’েহিত করেছে আমা’য়।

সহসা এক অ’র্থপূর্ণ কটা’ক্ষ বি’চ্ছুরিত হলাে মতঙ্গ মুনির চোখের কোণ হতে। তিনি বললেন, যদি বলি’ শবরী তােমা’র এই যৌবন সুধা পান না করলে শান্ত হবে না আমা’র কামবি’ক্ষুব্ধ চিত্ত।

নিজেকে অ’পরাধীর মতাে মনে হলাে শবরীর। ব্যথাহত কণ্ঠে বলল, কিন্তু আপনি যে ব্রহ্মচারী ঋষি মুনিবর। কাম ক্রোধ প্রভৃতি রিপুকে প্রশ্রয় দিলে ব্যাহত হবে আপনার কৃচ্ছসাধিত এই ব্রহ্মচর্য। বি’নষ্ট হবে আপনার তপস্যার সমস্ত ফল।

ভুল কথা। তুমি ঠিক জান না।

এক সােচ্চার প্রতিবাদে ফেটে পড়লেন মতঙ্গ মুনি। বললেন, যদি কোনাে উর্দ্ধরেতা পুরুষ কোনাে রেতঃপাত না ঘটিয়ে ধর্মপরায়ণ কোনাে নারীসঙ্গলাভের মধ্য দিয়ে মা’ঝে মা’ঝে কামপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করে তাহলে তাতে তার ব্রহ্মচর্য সাধনায় কোনাে বি’ঘ্ন ঘটে না।

শবরীর একখানি হা’ত ধরে ঈষৎ একটু টা’ন দিলেন মতঙ্গ মুনি।

শবরী বলল, এ ধরনের কোনাে চিন্তা বা ভােগবাসনা আমা’র মধ্যে জাগে না। আমি তাদের প্রশ্রয় দিতেও চাই না। তবে আপনাকে আমি ভক্তি করি ও ভালবাসি। আপনাকে খুশি করবার জন্য আমি যে কোনাে কাজ করতে পারি। আমি স্বেচ্ছায় বি’ষ ভক্ষণ করতে পারি, নরকে পর্যন্ত যেতে পারি। আমা’র এই তুচ্ছ মরণশীল দেহদ্বারা যদি ক্ষণিকের জন্যও তৃপ্তি দান করতে পারি, তাহলে চিরদিনের মতাে নিজেকে আমি ধন্য মনে করব মুনিবর।

মত্ত মা’তঙ্গদ্বারা বি’চ্ছিন্ন ব্রততীর মতাে মতঙ্গ মুনির পায়ের উপর লুটিয়ে পড়ল শবরী। কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমি স্বর্গ নরক কিছুই জানি না, আপনি যেখানে বলবেন সেখানেই যাব। আমি পাপ পুণ্য জানি না, আপনি যা করতে বলবেন অ’কুণ্ঠভাবে তাই করব। 

শবরীর মা’থায় হা’ত দিয়ে সস্নেহে বললেন মতঙ্গ মুনি, ওঠ আর লজ্জা দিওনা শবরী। আমা’য় ক্ষমা’ করাে। আজ আমি তােমা’র কাছে হেরে গিয়েছি।। 

ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল শবরী। তারপর মতঙ্গ মুনিকে প্রণাম করে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল কুটির হতে।

কিন্তু বাইরে বেরিয়েই তার মনে হলাে, জ্যোৎস্নার প্লাবনে পৃথিবী ভাসছে না, বি’ষাদের গভীর অ’ন্ধকারে ডুবে গেছে সারা পৃথিবী। শুভ্রধবল সিন্ধুবার কুসুমে যেমন কীট আছে তেমনি চাদের আলােয় আছে অ’নপনেয় কলঙ্কের কালি’মা’। পৃথিবীতে বি’শুদ্ধভাবে সুন্দর বা মহৎ বলে কোনাে বস্তু নেই।

জিতেন্দ্রিয় যে আদর্শ পুরুষকে দেখে এতদিন সংযম শিক্ষা করে এসেছে শবরী, আজ তিনি এতবড় অ’সংযমের কথা কেমন করে বলতে পারলেন তাকে তা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারল না সে।

অ’বশেষে নিজের যৌবনকে ধিক্কার দিল শবরী। স্থির করল, তার যে যৌবন প্রলােভিত করেছে মতঙ্গ মুনির মনকে সে যৌবনকে বি’নষ্ট করে দেবে সে। চিরতরে স্নান করে দেবে সে যৌবনের সকল সৌন্দর্য।

পরদিন বটগাছে আঠা আনিয়ে মা’থায় জটা’ তৈরি করল শবরী। সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিল কুসুম প্রসাধন ও অ’ঙ্গরাগ। শুধু আপন সেবাকার্য করে যায় নীরবে। কারাে সঙ্গে কোনাে কথা বলে না। মতঙ্গমুনির সঙ্গেও না। অ’থচ ভক্তি বা ভালাবাসার কোনাে তুটি নেই।

এদিকে মতঙ্গ মুনিও কঠোর সাধনায় নিমগ্ন হলেন সেদিন হতে।

শবরী তার চোখ খুলে দিয়েছে। তার লক্ষ্যভ্রষ্ট মৃ’তকল্প সাধনাকে সজীব করে লক্ষ্যের দিকে অ’গ্রসর করে দিয়েছে অ’নেকখানি। শবরী সত্যসত্যই তাঁর প্রকৃত সহধর্মিণী।

অ’বশেষে একদিন সে সাধনায় সিদ্ধিলাভ করলেন মতঙ্গ মুনি। স্বৰ্গৰ্যাত্রার আগে বি’দায় চাইলেন শবরীর কাছে।

কথাটা’ শুনেই অ’সহা’য় শিশুর মতাে কাঁদতে লাগল শবরী। বলল, আমি আমা’র বলতে কিছু না রেখে সব সঁপে দিয়েছি আপনাকে। আর আপনি আমা’কে ফেলে রেখে একা স্বর্গে চলে যাচ্ছেন! এতদূর নিষ্ঠুর ও স্বার্থপর আপনি! 

শবরীকে সান্ত্বনা দিয়ে মতঙ্গ মুনি বললেন, দুঃখ করাে না শবরী, তােমা’র কাল এখনাে পূর্ণ হয়নি। সময় হলে তুমিও সেখানে গিয়ে আমা’র সঙ্গে মিলি’ত হবে একদিন। মা’নব অ’বতাররূপী রামচন্দ্র ঘটনাক্রমে এই বনে এসে উপস্থিত হবে যেদিন সেদিন তুমি সশরীরে স্বর্গে যাবে শবরী। এবার হতে সেই ভগবানের ধ্যান করাে অ’হর্নিশি।

শবরী কেঁদে বলল, আমি আগেই বলেছি, আপনি ছাড়া আর কাউকে জানি না আমি। আপনিই আমা’র ভগবান। আপনি চলে গেলে আপনার দেহনিঃসৃত স্বেদবি’ন্দুজাত ওই সব ফুলগুলি’ দেখে ও তাদের আঘ্রাণ নিয়ে কাল কাটা’ব আমি। নিশিদিন আপনার ধ্যানেই নিমগ্ন থাকব। 

শবরী ভাবল, একদিন সে মতঙ্গ মুনিকে দেহ দান করতে কুষ্ঠিত হয়েছিল। তাই তার উপর রাগ করে অ’কালে স্বৰ্গযাত্রা করছেন তিনি। তাই তাকে পেয়েও পেল না সে।

মতঙ্গ মুনির পায়ের উপর লুটিয়ে পড়ে করুণ কণ্ঠে শবরী বলল, আপনি আমা’য় ক্ষমা’ করুন ঠাকুর। আমি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি। বুঝতে পেরেছি, দেহ মন নিঃশেষে অ’কুণ্ঠভাবে সমর্পণ করতে না পারলে আরাধ্য দেবতাকে কখনাে পাওয়া যায় না। দেহের অ’ভিমা’ন একান্তভাবে অ’ন্তরায় হয়ে ওঠে সে মিলনের পথে। 

মতঙ্গ মনি স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলেন শবরীর পানে। মতঙ্গ মনির পা দুটো ধরে নাড়া দিয়ে বলল, আজ আমা’র দেহ মন মা’ন অ’ভিমা’ন সব গ্রহণ করুন ঠাকুর। তার বি’নিময়ে শুধু আপনার এই দুটি চরণে মা’থা রাখবার একটুখানি স্থান দিন।

মতঙ্গ মুনি ব্যস্ত হয়ে বললেন, এইভাবে যদি আমা’য় বাধা দাও তাহলে আমা’র স্বর্গলাভ সার্থক হবে না শবরী। এইভাবে যদি আমা’দের প্রেমকে সংকীর্ণ করে তােলাে তাহলে তােমা’র আমা’র দুজনেরই মা’েক্ষলাভের পথে বাধা হয়ে উঠবে সে প্রেম। কিন্তু মনে রেখাে মহৎ প্রেম কখনাে মা’নুষকে মুক্তির পথে বাধা দেয় না। তার মুক্তির পথ পরিষ্কার করে তাকে ঠেলে দেয় সে পথে। তাই মহৎ প্রেমসাধনার সঙ্গে কোনাে পার্থক্যই নেই মুক্তিসাধনার।

মতঙ্গ মুনির কথামতাে সপ্তসমুদ্রের জলে শুদ্ধভাবে স্নান করে এলাে শবরী। তারপর তার কানে এক বীজমন্ত্র দীক্ষা দিলেন মতঙ্গ মুনি। সেদিন হতে দিবারাত্রি একমনে সে মন্ত্র জপ করতে লাগল শবরী।

Please follow and like us:

fb-share-icon

নতুন ভিডিও গল্প!


Tags: , , , , , ,

Comments are closed here.