সহস্র এক আরব্য রজনী – ১৩ (উমর অল-নুমান, তার পুত্র সারকান ও দু-অল মাকানের কিস্সা ২)

September 4, 2021 | By Admin | Filed in: বিখ্যাত লেখকদের সাহিত্যে যৌনতা.

চুয়ান্নতম রজনীর দ্বি’তীয় যামে আবার কাহিনী শুরু হয়।

বৃদ্ধের বি’বি’র সেবা যত্নে মা’কান বি’ছানায় উঠে বসে। হা’মা’ম থেকে ফিরে এসে বৃদ্ধ খুশি হয়ে বলে, বাঃ এই তো দিব্যি চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। আল্লা মেহেরবান, আমি তো ভেবেছিলাম তোমা’কে আর বাঁচানো যাবে না।

আরও তিন দিন পরে মা’কান মোটা’মুটি ভালো হয়ে ওঠে। বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করে এখন কেমন মনে করছে, বাবা?

-একটু একটু গায়ে জোর পাচ্ছি।

বৃদ্ধ দু’হা’ত তুলে আল্লাহর উদ্দেশে প্রণাম জানায়।-সবই তাঁরই দয়ায়।

বাজারে গিয়ে গোটা’ দশেক মুরগীর ছানা নিয়ে আসে। বি’বি’কে বলে, রোজ সকাল বি’কাল একটা’ করে মুরগীর ঝোল করে দেবে। বাছার আমা’র শরীরে কিছু নাই।

বৃদ্ধের বৌ নিজে হা’তে মুরগী মেরে দু-বেলা ঝোল রোধে খাওয়াতে থাকে। এই ভাবে আরও কয়েকদিন পরে বৃদ্ধ মা’কানকে জিজ্ঞেস করে, এখন কেমন লাগছে, বাবা?

মা’কান বলে, বেশ ভালো। আমি তো প্রায় আগের মতোই সুস্থ হয়ে উঠেছি। এখন আর আমা’র জন্যে আলাদা খানাপিনার কি দরকার। আপনারা যা খান, এবার থেকে তা-ই খাবো।

—কেন বাবা, একথা বলছে? আমরা গরীব বলে? কথাটা’ ঠিকই। সারাদিন হা’ড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে মা’ত্র পাঁচ দিরহা’ম রোজগার করি। চার দিরহা’ম খরচ করে রোজ একটা’ করে দিরহা’ম সঞ্চয় করেছি। সেই থেকে তোমা’র সেবা যত্ন চলছে। ভেবো না লোকের কাছে ধারকাজ করছি। তোমা’র জন্য খরচ করতে পেরে আমা’র সারা জীবনের সঞ্চয় করা আজ সার্থক হয়েছে, বাবা।

বৃদ্ধ তার বি’বি’কে বলে, এবার ছেলেটা’কে ভালো করে গোসল করানো দরকার। আমি একটা’ গাধা ভাড়া করে নিয়ে আসছি। ওকে আজ সরকারী হা’মা’মে নিয়ে যাবো।

প্রায় মা’সখানেক মা’কানের সুস্নান হয়নি। গায়ে এক পর্যদা ময়লা জমে গিয়েছিলো। সাবান-ছোবড়া দিয়ে খুব ভালো করে ঘসে মেজে বৃদ্ধ মা’কানের সর্বাঙ্গ পরিষ্কার করলো। কঁচা সোনার মতো গায়ের রঙ। বৃদ্ধ দেখে অ’বাক হয়। ভাবে, এমন হা’ত-পায়ের গড়ন, চাঁদপনা মুখের আদল, এই চাপার মতো রঙ এ পেলো কোথায়? স্নান শেষ হলে নতুন দামী পোশাক পর্যালো তাকে। দেখে মনে হতে লাগলো যেন কোন সুলতান বাদশাহর ছেলে।

মা’কানকে বাড়িতে নিয়ে এসে প্রথমে গোলাপের সরবৎ খাওয়ালো। তারপর মুরগীর ঝোল দিয়ে রুটি, শাহী হা’লওয়া, আঙুর বেদোনা প্রভৃতি নানা পুষ্টিকর খানা সাজিয়ে দিলো। মা’কান লজ্জিত হয়ে বলে, আপনাদের কাছে আমা’র ঋণের আর অ’ন্ত রইলো না।

বৃদ্ধ বলে, ওসব কথা বলে আমা’কে আঘাত দিও না, বাবা। তুমি বি’দেশী মুসাফির। তায় অ’সুস্থ। আল্লাহর নির্দেশ মুসাফিরকে সাধ্যাতীত আদর যত্ন করবে। কিন্তু আমি আর কি করতে পারছি তোমা’র জন্যে। একটা’ কথা বাবা কয়েকদিন ধরেই ভাবছি, কিন্তু তোমা’কে জিজ্ঞেস করতে ভরসা হচ্ছে না।

–কী কথা?

—তোমা’র আদবাকায়দা চেহা’রা চরিত্র দেখে মনে হয়, তুমি কোনো বড় ঘরের ছেলে। যদি তোমা’র আপত্তি না থাকে, তোমা’র পরিচয় জানতে ইচ্ছে করে।

মা’কান বলে, সবই আপনাকে বলবো। তার আগে আপনি বলুন, কোথায় এবং কবে আমা’কে পেয়েছেন?

বৃদ্ধ বলে, একটা’ হা’মা’মের কাঠগুদামের পাশে তোমা’কে কে বা কারা ফেলে রেখে গিয়েছিলো। আমি সেই হা’মা’মে চাকরী করি। প্রথমে ভেবেছিলাম, তুমি বেঁচে নাই। পরে বুঝতে পারলাম, প্ৰাণটা’ তখনও ধিক ধিক করছে। তাই কাঁধে তুলেবাড়ি নিয়ে এলাম। তারপর আমা’র বি’বি’র চেষ্টা’য় তুমি আবার সুস্থ হয়ে উঠেছে। সবই আল্লাহর দোয়ায়।

মা’কান বলে, আল্লাহ। আপনাদের ভালো করবেন। আচ্ছা, এই জাগায়টা’র নাম কী?

–জেরুজালেম।

মা’কান গম্ভীর হয়ে যায়। এই শহরেরই একটা’ সরাইখানায় তাকে অ’সুস্থ অ’বস্থায় ফেলে রেখে তার দিদি একদিন কাজের সন্ধানে বেরিয়েছিলো, আর ফিরে আসেনি। ভাবতে ভাবতে মা’কানের চোখে জল আসে। সুলতান উমর অ’ল-নুমা’ন যে তার জন্মদাতা শুধু এইটুকু গোপন করে আর সব কাহিনীই সে বৃদ্ধর কাছে বলে।

বৃদ্ধ সান্ত্বনা দেয়। দুঃখ করো না বাবা। নসীবের লি’খন। কেউ তা খণ্ডাতে পারে না।

মা’কান জিজ্ঞেস করে, এখান থেকে দামা’সকাস কতদূর।

—পুরো ছদিনের পথ। কিন্তু কেন, বাবা?

মা’কান বলে, ঠিক করেছি। এখান থেকে দামা’সকাসেই যাবো।

না, বাবা, না। তোমা’র এই শরীরে এক সেখানে যাওয়া হবে না। যদি যেতেই চাও, আমি সঙ্গে যাবো। হয়তো আমা’র বি’বি’ও যেতে চাইবে। যাওয়ার পথটা’ বড় খারাপ কিন্তু শহরটা’ বড় সুন্দর। একপাশে কুলকুল করে নদী বয়ে চলেছে। আর সারা শহরটা’ ফল ফুলের গাছে ভরা-যেন একটা’ সুন্দর বাগিচা।

এমন সময় বৃদ্ধের বি’বি’ ঘরে এলো।— ওগো চাচার মেয়ে, শুনেছো, ছেলে আমা’র দামা’সকাস যেতে চায়। তা ওকে তো আর একা ছাড়তে পারি না। আমি সঙ্গে যাবো। তুমিও যাবে। নাকি আমা’দের সঙ্গে?

শেখ-গৃহিণী বলে, ওমা’, আমি যাবো না? না গেলে ছেলের দেখ-ভাল কে করবো? শুনেছি, ওখানকার চ্যাংড়া ছোড়াগুলো ভীষণ বজাত। ওদের সঙ্গদোষে পড়লে বাছার আমা’র সর্বনাশ হয়ে যাবে।

বৃদ্ধ বলে, নাও, তাহলে আর দেরি করে লাভ কী? জামা’কাপড় বি’ছানাপত্ব সব গোছগাছ করে নাও। আর চাল ডাল অ’্যাটা’ ময়দা যা নেবার সব বাধা-ছাঁদ করে ফেলো; আজকালই রওনা হয়ে যাবো। ছ’দিনের পথ।

বৃদ্ধের বি’বি’ নৃত্যুনতম প্রয়োজনীয় সামগ্ৰী রেখে বাকী সব সামা’নপত্র পঞ্চশ দিরহা’মে বি’ক্ৰী করে দিলো। তার কিছু টা’কায় বৃদ্ধ একটা’ গাধা কিনে আনলো। তারপর দিনক্ষণ দেখে আল্লাহর নাম নিয়ে পথে বেরিয়ে পড়লো। ওরা তিনজন।

দু-আল-মা’কানকে গাধার পিঠে চাপিয়ে বৃদ্ধ আর তার বি’বি’ পিছনে পিছনে হেঁটে চলে। চলতে চলতে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, কোথাও থেমে একটু জিরিয়ে নেয়। এইভাবে কয়েকদিন চলার পর এক সন্ধ্যায় দামা’সকাসে পৌঁছে গেলো তারা। একটা’ সরাইখানায় দু’জনকে বসিয়ে বৃদ্ধ বাজারে যায়, কিছু খানাপিনার সন্ধানে।

সেদিন রাতেই বৃদ্ধের বি’বি’র কাঁপয়ে জ্বর আসে। প্রথমে মনে হয়েছিলো পথশ্রমের ক্লান্তি আর গায়ের ব্যথার জুর। কিন্তু পরে বোঝা গেলো, না, এ কালব্যাধি। পাঁচদিনের দিন ওদের দু’জনকে কান্নার সায়রে ভাসিয়ে সে আল্লাহর দরবারে চলে গেলো! মা’কান শোকে মুহ্যমা’ন হয়ে পড়ে। এই সেবি’কার সেবা-যত্নেই। সে তার প্রাণ ফিরে পেলো, কিন্তু তার প্রাণটা’ আর কেউ-ই ধরে রাখতে পারলো না। কিশোর মা’কান বৃদ্ধকে সান্ত্বনা দেয়, মৃ’তের জন্য শোক করলে মৃ’ত ফিরে আসে না। তার জন্যে চোখের জল ফেলে তার আত্মা’র অ’মঙ্গল কামনা করো না, বাবা। আমা’দের সবাইকে একদিন সেখানেই যেতে হবে। কেউ দুদিন আগে, আর কেউ দুদিন পরে–এই যা তফাৎ।

তোমা’র এত জ্ঞান, বাবা। আল্লাহ তোমা’র সঙ্গে আছেন। আমরা একদিন সকল শোকতাপ ভুলে তার পায়ের তলায় আশ্রয় নেব। তুমি যা বললে তাই তো একমা’ত্র সত্য। আমা’দের সবাইকে একদিন সেখানেই যেতে হবে। বাঃ, কি সুন্দর কথা। তোমা’র কথায় মনের দুঃখ অ’নেকটা’ হা’ল্কা হয়ে গেলো, বাবা। আল্লাহ যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন। আর শোক করবো না। চলো, শহরটা’ একটু ঘুরে দেখি। এই কটা’ দিন কি উদ্বেগেই কেটেছে! একভাবে ঘরের মধ্যে বন্দী হয়ে আছো। চলো, তোমা’কে একটু বাইরে ঘুরিয়ে নিয়ে আসি।

বৃদ্ধের হা’ত ধরে শহরের পথে পথে ঘুরতে থাকে মা’কান। এই কোতোয়ালীর সামনে এসে দেখে অ’নেক লোক জমা’য়েত হয়ে কি যেন দেখছে। কাছে আসতে চোখে পড়ে অ’নেকগুলো উট, গাধা, ঘোড়া খচ্চর-এর পিঠে বোঝাই করা বাক্স প্যাটরা, গালি’চা এবং আর নানা রকম সওদাগরী সামা’ন পত্র। এক জনকে জিজ্ঞেস করলো, এত জিনিসপত্র সব কার? কোথায় যাবে?

লোকটা’ জবাব দেয়, এখানকার কোতোয়াল বাগদাদে বাদশাহ উমর-আল-নুমা’নের কাছে বাৎসরিক ভেট পাঠাচ্ছেন।

মা’কানের চোখে জল আসে। কান্না চাপতে পারে না। বৃদ্ধ সান্তুনা দেয়, নিজেকে শান্ত করো বাবা। সদ্য তুমি অ’ত বড় কঠিন অ’সুখ থেকে উঠেছে! আবার শরীর খারাপ হতে পারে। আমি বুঝতে পারছি দেশের নাম শুনে তোমা’র মন বড় অ’স্থির হয়ে উঠেছে। শান্ত হও, ধৈর্য ধর। আল্লাহ একদিন তোমা’কে সেখানে নিয়ে যাবেনই।

মা’কান কাঁদতে কাঁদিতে বলে, না, আমি এদের সঙ্গেই বাগদাদে যাবো। দেশের জন্যে আমা’র ভীষণ মন খারাপ করছে। আর এক মুহূর্তও এখানে ভালো লাগছে না। আপনি আমা’কে বি’দায় দিন, বাবা। আমি এদের পিছনে পিছনে একদিন বাগদাদে পৌঁছে যাবো।

বৃদ্ধ বললো, তা হয় না, বাবা! তোমা’কে আমি এক ছাড়তে পারি না। ঠিক আছে, আমা’র আর পিছনের কি টা’ন, আমিও তোমা’র সঙ্গেই যাবো।

মা’কান আনন্দে নেচে ওঠে। —খুব ভালো হবে। আপনি সঙ্গে থাকলে আমা’র আর কি চিন্তা।

মা’কানকে গাধার পিঠে চাপিয়ে বৃদ্ধ পিছনে পিছনে হেঁটে চলে। মা’কান আপত্তি করেছিলো, আমি তো এখন বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠেছি। বরং আপনি, বুড়োমা’নুষ, গাধার পিঠে আপনি চাপুন, আমি হেঁটে যাবো।

কিন্তু তার সে আপত্তি টিকে নি। বৃদ্ধ বলেছিলো, পাগল ছেলের কথা শোনো। আমি বুড়ো হলে কি হবে, এখনও সাত জোয়ানের ঘাড় মটকাতে পারি। তুমি এখন চাপে। তারপর তোমা’র যখন ভালো লাগবে না, নেমে খানিকটা’ হেঁটে পায়ের জড় ভেঙে নিও। তখন না হয়। আমি খানিকক্ষণ চাপবো।

মা’কান বলেছিলো, আপনি যা আমা’র জন্যে করছেন, কোন ভাই-এর জন্যে ভাই তা করে না।

এবার আমরা দু-আল-মা’কানের দিদির কথা বলবো।

সুন্দরী কিশোরী নুজাৎ অ’সুস্থ ভাই মা’কানকে সরাইখানায় রেখে কাজের সন্ধানে রাস্তায় বেরিয়ে আসে। কিন্তু কে তাকে কাজ দেবে, কোথায় যেতে হবে, কিছুই সে বুঝে উঠতে পারে না। উদ্দেশ্যবি’হীনভাবে এদিক ওদিক ঘুরতে থাকে। এমন সময় সে এক বাদাবী সর্দারের নজরে পরে তার সঙ্গে ছিলো আরও পাঁচজন সাগরেদ।

তাদের একজনকে ফিসফিস করে সর্দারটা’ বলে, মনে হচ্ছে, নয়া চিড়িয়া।

সাগরেদটা’ বলে, হা’ঁ উস্তাদ, উমর বহুৎ কম, আর দেখতে ভী খুবসুরৎ মা’লুম হচ্ছে। এই তো দেখুন না, এই দিকেই আসছে। মনে হচ্ছে, কী যেন খুঁজছে। জিজ্ঞেস করুন না, উস্তাদ।

বাদাবীরা কুখ্যাত ডাকাত। মরুভূমির বাদাবী অ’ঞ্চলে এদের বাস। চুরি-ডাকাতি রাহা’জানি ছিনতাই এদের একমা’ত্র পেশা।

নুজাৎ কাছে আসতে সর্দার জিজ্ঞেস করে হ্যাঁ, ভালো মা’নুষের মেয়ে, তুমি কি কারো বাড়িতে বাধা না, যখন যেখানে পাও, ফুরনের কাজ করো?

অ’জানা অ’চেনা এক মেয়ের সঙ্গে এ ধরনের গায়ে পড়ে কথা বলতে আসায় নুজাৎ বি’রক্ত হয়। পাশ কাটা’বার জন্যে বলে, আমি বড় শোকে তাপে কাহিল হয়ে আছি, আপনারা আমা’কে বি’রক্ত করবেন না।

সর্দারটা’ গলায় মধু ঢেলে বলে, কিছু মনে ক’রো না, মা’ জননী। তোমা’র মতো আমা’র ছটা’ মেয়ে ছিলো। আল্লাহ পাঁচটা’ই কেড়ে নিয়েছেন। এখন মা’ত্র একটি। একেবারেই নাবালি’কা, বাড়িতে এক একা থাকে। দেখাশোনার কোনও লোক নাই! তাই একটি ভালো বংশের আয়া খুঁজতে বেরিয়েছি। তা বাছা, তোমা’কে দেখে মনে হলো, তুমি খানদানী ঘরের মেয়ে। হয়তো অ’ভাবের তাগিদে পথে বেরুতে হয়েছে। তা মা’, যদি কাজ কামের সন্ধানেই বেরিয়ে থাকে, আমি বলি’ কি, আমা’র মেয়েটা’কে দেখা শোনার ভার নিয়ে আমা’কে একটু নিশ্চিন্ত কর। পারিশ্রমিক যা চাও, দেব। যদি তুমি অ’ন্য কোনও ঘরে কাজে না লেগে থাকে, আমা’র বাসায় চলো। মা’-হা’রা মেয়েটা’ আমা’র বাঁচবে।

নুজাৎ দ্বি’ধাজডিত কণ্ঠে বলে, শেখসাহেব, আমি এখানে বি’দেশী। আর তাছাড়া, ঘরে আমা’র একটি অ’সুস্থ ভাই আছে। আপনার কাজ আমি নিতে পারি, কিন্তু সন্ধ্যার আগে আমা’কে ছেড়ে দিতে হবে। ভাইকে ছেড়ে রাতে কোথাও থাকতে পারবো না আমি।

সর্দার বলে, তাই হবে মা’, সন্ধ্যার আগেই আমি ঘরে ফিরি। তখন তুমি চলে যেও। আর যদি তোমা’র আপত্তি না থাকে, তোমা’র ভাইকেও আমা’র বাড়িতে এনে রাখতে পারি।

নুজাৎ ভাবে, দুনিয়াতে এত সহৃদয় মা’নুষও আছে? এই বি’পদের মুহুর্তে স্বয়ং আল্লাহই বুঝি ছদ্মবেশে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। নূজাৎ বলে, চলুন।

এইভাবে শিশু-প্ৰাণ নুজাৎ এক বাদামী দাসুর কবলি’ত হয়। এমন নিখুঁত অ’ভিনয় করে সে তাকে ধাপ্পা দিলো বুঝতেও পারে না। তার ঘর, তার নাবালি’কা মা’তৃহা’রা কন্যা-সবই তার ধাপ্পা। নুজাৎকে উটের পিঠে চাপিয়ে নিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলে। পিছনে পিছনে আসে তার সাগরেদরা। এবার নুজাৎ বুঝতে পারে, লোকটা’ একটা’ ঠগ। চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। যদি কেউ সাহা’য্য করতে ছুটে আসে। কিন্তু বাদাবী সর্দারের উট তখন শহরে ছাড়িয়ে নির্জন প্রান্তরে ছুটে চলেছে। সর্দার হুঙ্কার ছাড়ে, এই হা’রামজাদী চুপ কর-চুপ কর বলছি।

কিন্তু শাহজাদী নুজাৎ চুপ না করে আরও জোরে চিৎকার করতে থাকে, কে আছো, বাঁচাও, বাঁচাও। ডাকাত আমা’কে ছেনতাই করে নিয়ে যাচ্ছে

অ’ট্টহা’সিতে ফেটে পড়ে সর্দার। তোর ডাকে কেউ সাড়া দেবে না রে, শয়তানী। চুপ কর। ভালো চাসতো চুপ কর।

নুজাৎ ফুসে ওঠে। শয়তান আমি না তুমি? ভালো মা’নুষ পেয়ে আমা’কে ধাপ্পা দিয়ে ভুলি’য়ে নিয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ তোমা’কে দোজকে পুডিয়ে মা’রবেন।

—হা’—হা’-হা’। আমা’কে না হয় দোজকের আগুনে পুডিয়ে মা’রবে, কিন্তু তোকে রক্ষা করুক দেখি, তোর আল্লাহর কত ক্ষমতা। নেচুপ করবি’ তো কর। তা না হলে এই দেখছিস ছুরি, একবার চোঁচালে টেনে জিভটা’ কেটে নেব।

নুজাৎ ভয় পায়। কি চকচকে ধারালো ছুরি। লোকটা’র অ’সাধ্য কিছুই নাই। সত্যিই যদি তার জিভটা’ কেটে নেয়? আর তাছাড়া এই নিরালা নির্জন মা’ঠের মধ্যে কেই বা তাকে উদ্ধার করতে আসবে। চিৎকার করে লাভ হবে না ভেবে নুজাৎ চুপ করে যায়। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে।

একটু পরে লোকটা’ বলে, আমি যখন রেগে যাবো, তখন আমা’র কোনও কথায় না’ করো না। তা হলে রাগের মা’থায় হয়তো তোমা’কেই খুন করে ফেলবো। কিন্তু তাই বলে ভেবো না, মা’নুষটা’ আমি খুব খারাপ। তোমা’কে ধোঁকা দিয়ে ভাগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, ঠিক। কিন্তু কি করবো, এই আমা’দের ব্যবসা। এইভাবেই নানা ছলে বলে কৌশলে মেয়েদের জোগাড় করে আনতে হয়। ভেবো না তোমা’কে ভোগ করার জন্যে নিয়ে যাচ্ছি। ভোগ আমি করবো না, তবে করবে: একজন। এবং সে-জন বড় খানদানী আদমী। তোমা’কে বহুৎ আদর যত্নে রাখবে। অ’নেক দাসী বাঁদী থাকবে তোমা’র। তার ঘরের বি’বি’র মতোই তোমা’কে হীরে জহরতে মুড়ে রাখবে। তবে বি’বি’র ইজ্জত দেবে না। তার পেয়ারের রক্ষিতা হয়ে থাকবে। আর আমি? আমি কিছু নগদ বি’দায় নিয়ে চলে যাবো। আবার কোনও নতুন মেয়ের সন্ধানে। দামা’সকাসের বাঁদী হা’টে তোমা’কে নিলামে তুলবো। দেশ-বি’দেশের সুলতান বাদশাহ আমির ওমরাহ সওদাগরের দালাল আসে। সেখানে। তারা তোমা’র দর হা’ঁকবে। যার দর চড়া হবে তার কাছেই তোমকে বেচে দেব, এই আমা’দের কারবার। সুতরাং ভয় পাওয়ার মতো কিছুই নাই। তোমা’কে জলেও ফেলে দেব না। শূলেও চাপবো না। এমনকি তোমা’র গায়ে কেউ হা’তও ছোঁয়াবে না। সব শুনলে তো? এবার ভালো মা’নুষের মেয়ের মতো কান্না থামিয়ে চুপ কর। আমি তোমা’কে কথা দিচ্ছি, সুলতান উমর অ’ল নুমা’নের দালালের কাছেই তোমা’কে বেচে দেব। তুমি হবে বাগদাদের সুলতানের রক্ষিতা। এমন সৌভাগ্য কাটা’ মেয়ের হয়, বলে? শুধু তোমা’র রূপ আছে বলেই বলছি, সুলতানের অ’পছন্দ হবে না। আর যদি আমা’র কথা না শুনে নাকে কাদতেই থাক তবে একটা’ হা’ড়ে বজাৎ সওদাগরের হা’তে তুলে দেব। সে আবার কোথায় চালান করে দেবে তোমা’কে, আমি বলতে পারবো না।

নুজাৎ ভাবলো, লোকটা’ মহা’ শয়তান। রাগলে একেবারে চণ্ডাল হয়ে যায়। তখন ও সবকিছু করতে পারে। সুতরাং চুপ করে নিজের বি’ড়ম্বি’ত ভাগ্যের কথা ভাবতে লাগলো।

সর্দার বলে, খিদে পায়নি? এই নাও রুটি শব্জী খাও।

লোকটা’ দু’খানা যবের রুটি আর একটু শব্জী এগিয়ে দেয় নুজাতের দিকে। গতকাল থেকে কিছুই খাওয়া হয়নি। খিদেয় পেট চো চো করছিলো। হা’ত বাড়িয়ে রুটি দু:খানা গোগ্রাসে খেতে থাকলো।

সর্দার হা’সে। খিদের বড় জ্বালা! বলে, আর একখানা নেবে?

নুজাৎ মা’থা নাড়ে। না। আর সে নেবে না। ভাই মা’কনের মুখখানা ভেসে ওঠে। খিদের জুলায় হয়তো আর সে বেঁচে থাকবে না। দু’চোেখ নেমে আসে জলের ধারা।

এক সময়ে সর্দার বলে, আমরা দামা’সকাসে এসে গেছি।

দামা’সকাসে পৌঁছে সর্দার নুজাৎকে নিয়ে গিয়ে তুললো এক সরকারী সরাইখানায়। মহা’মা’ন্য সুলতান উমর-অ’ল-নুমা’ন বি’দেশী মুসাফিরদের আশ্রমের জন্য বাব-অ’ল মা’লি’কে বানিয়ে দিয়েছে এই সরাইখানা। নুজাৎ আবার কান্নায় ভেঙে পড়ে। সর্দার ধমকায়। ফের যদি কঁদিস, মেরে মুখের আদল পালটে দেব। চুপ কর মা’গী, চুপ কর। না হলে কিন্তু একটা’ বদমা’ইশ ইহুদীর কাছে বেচে দেব, বলছি।

নুজাৎকে সরাইখানার একটা’ খুপরীতে পুরে শিকল তুলে দিলো লোকটা’। বাঁদীহা’টে গিয়ে হা’ঁকিতে থাকলো, কই গো কে আছো, এদিকে এসো। জেরুজালেম থেকে একটা’ ডাগর ছুঁড়ি নিয়ে এসেছি। কে নেবে এসো।

দালাল, সওদাগররা এগিয়ে আসে, কী রকম মা’ল?

সর্দার বলে, দেখতে খুব-সুরৎ। কিন্তু একটা’ ঝামেলা আছে। জেরুজালেমে সে তার রুগী ভাইকে ছেড়ে এসেছে। যার কিনতে ইচ্ছে, আগে থেকে শর্ত দিচ্ছি, তার ভাই-এর দায়-দায়িত্বও নিতে হবে তাকে। যদি তোমরা কেউ এই শর্তে রাজি থাকে, আমি খুব সস্তায় ছেড়ে দেব।

একজন সওদাগর জিজ্ঞেস করে, উমর কত?

—একেবারে আনকোরা কুমা’রী। বি’য়ের যুগ্য, ডাগর। বয়স খুব বেশি হলেও পনের। দেখছনা এর উন্নত বক্ষ কেমন কামিজ ফেটে বাইরে আসতে চাইছে? বি’দ্যায় বুদ্ধিতে একেবারে চৌকস। দেখতে শুনতে যেমন খুবসুরৎ তেমনি তার খানদানী আদব-কায়দা। ভাইটা’র অ’সুখের চিন্তায় কেঁদে কেঁদে শরীরটা’ এখন কহিল হয়ে পড়েছে। কিন্তু বড়ঘরের আদর যত্ন পেলে আবার চেহা’রা খোলতাই হয়ে উঠবে।

সওদাগর বলে, চলো, দেখাও দেখি। যদি পছন্দ না হয় নেব না। কিন্তু। আর যদি তোমা’র কথামতো সব ঠিক ঠিক মিলে যায়, তবে ন্যায্য দাম পাবে। সুলতান উমর-আল-নুমা’নের জন্যে কিনবো। তার ছেলে শাহজাদা সারকান এখন এখানকার সুবাদার। আগে তাকে দেখাবো। তার পছন্দ হলে তার কাছ থেকে একটা’ চিঠি করে নিয়ে বাগদাদে যাবো সুলতানের কাছে। সুন্দরী কুমা’রী মেয়ের উপর সুলতানের ভরি লোভ। তার যদি মনে ধরে তা হলে ভালো ইনাম পাবে।

বাদাবী সর্দার বলে, ঠিক আছে, আপনার শর্তে আমি রাজি। চলুন, সরাইখানায় দেখবেন চলুন।

নুজাতের দরজার সামনে এসে শিকল খুলে সর্দার ডাকে, নুজায়া, ও নুজায়া?

নুজাতের নামটা’ বি’কৃত করে উচ্চারণ করে সে। নুজাৎ কাঁদতে থাকে। কোনও জবাব দেয় না। সওদাগরকে বলে, বেটি রা কাড়ছে না। যান ভিতরে গিয়ে দেখুন। একটু ভুলি’য়ে ভালি’য়ে কথা বের করুন।

সওদাগর ভিতরে ঢুকে নুজাৎকে বলে, আল্লাহ তোমা’র ভালো করবেন, বাছা।

কোকিল-কণ্ঠী নুজাৎ ধীরে ধীরে বলে, আল্লাহ আমা’দের মতো হতভগীদের দিকে মুখ ফিরে চায় না। আপনারাই তার কৃপা পেতে থাকুন।

নুজাতের জবাব শুনে সওদাগর মুগ্ধ হয়। বাঃ কি সুন্দর কথা। আর কি পরিশুদ্ধ মা’র্জিত উচ্চারণ!

নাকাবের জাফর দিয়ে নূজাৎ দেখে বৃদ্ধ সওদাগরকে। মনে হয়, অ’মা’য়িক সদাশয় মা’নুষ। তাকে, ডাকাতটা’র হা’ত থেকে রক্ষা পেতে হবে। তার বদলে যদি এই সওদাগরের বাদী হয়ে থাকতে হয় সে-ও অ’নেক ভালো। আমা’র রূপ যৌবন, আমা’র শিক্ষাদীক্ষা এর নিশ্চয়ই ভালো লাগবে।

সওদাগর জানতে চাইলো, তুমি কে? কি তোমা’র পরিচয়, মেয়ে?

নুজাৎ মৃ’দু কণ্ঠে উত্তর দেয়, আপনি জানতে চাইছেন, আমি কে? এইটুকু জেনে রাখুন, আমি আপনার শত্রু নই, কোনও ক্ষতি করবো না। বি’ধিলি’পি অ’খণ্ডনীয়। আমা’র কপালে যা লি’খে দিয়েছেন, হা’জার চেষ্টা’ করলেও তা এড়াতে পারবো না। আমা’কে তা মেনে নিতেই হবে। আপনি হয়তো ভাবতে পারেন, আপনি আমা’র ভাগ্য নিয়ন্তা। কিন্তু আমি মনে করি, আপনি উপলক্ষ্য মা’ত্র।

নুজাতের এই দার্শনিক তত্ত্বকথায় সওদাগর বি’স্ময়ে বি’মূঢ় হয়। ভাবে তার চেহা’রা এখনও দেখিনি, কিন্তু মুখের কথা শুনেই আমি অ’নুমা’ন করতে পারছি, বড়ঘরের মেয়ে সে। বাদশাহ উমর-আল-নুমা’ন-এর সামনে হা’জির করলে লুফে নেবেন তিনি। মোটা’ বকশিস মিলবে। বাদাবী সর্দারকে জিজ্ঞেস করলো, সর্দর সাহেব তোমা’র মেয়েটা’ বড় ভালো, কি সুন্দর তার কথাবার্তা, আর নম্র-ভদ্র ব্যবহা’র। তা কি দাম নেবে ভাই?

কী বললে? নম্র-ভদ্র? ওর মতো দজাল মেয়েছেলে তুমি আর দুটি পাবেনা, সওদাগর। ওর হা’ড়ে হা’ড়ে শয়তানী বুদ্ধি। ওকে কিনলে তোমা’র হা’ড়মা’স জ্বলি’য়ে শেষ করবে। বলছে কিনা নম্র-ভদ্র। যাও, আগে বাড়ো, তোমা’র সঙ্গে আমি সওদাই করবো না।

সওদাগর বুঝলো সর্দারটা’ ক্ষেপে বোম হয়ে আছে। মেয়েটির প্রশংসা সে আদৌ বরদাস্ত করবে না। বললো, ঠিক আছে, তোমা’র কথাই মেনে নিলাম, মেয়েটা’ ভীষণ বজ্জাৎ; মুখরা। আমি ওই বজাত মুখরা মেয়েটা’কেই কিনতে চাই। এখন বলো, কি দাম নেবে?

বাদাবী সর্দার নিজে কোনও দাম বলে না। উল্টে জিজ্ঞেস করে, তুমিই বলো, কি দাম দেবে?

সওদাগর বলে, তোমা’র ছেলের তুমি নামকরণ করবে না করবে। পাড়াপাড়শী? তোমা’র মা’লের তুমি দাম বলবে। আমা’র পোষায় নেব, না পোষায় কেটে পড়ব। তোমা’র বি’বেচনা যা হয় বলো, তারপর আমি যা পারবো বলবো।

কিন্তু বাদাবী-দস্যু দাম বলতে পারে না। আসলে দাম সম্বন্ধে তার কোনও ধারণাই নাই। বলবে কি করে? এ যাবৎকাল যত ছেলে মেয়ে সে চুরি করে এনে বেচেছে তাদের কেউই এমনটি ছিলো না। দেখতে মোটা’মুটি সুন্দর হলে নেহা’ৎ খারাপ দাম পাওয়া যায় না। কিন্তু এ মেয়ের মতো এমন বি’দ্যাধরী তো একটা’ও সে কখনও চোখে দেখেনি। বাদী রক্ষিতার রূপ যৌবন দরকার এটা’ সে ভালো করেই জানে, কিন্তু লেখাপড়া কি কামে লাগে! আর তার কদরই বুঝবে কোন আমির সুলতান? সুতরাং ওগুলো তার গুণ না হয়ে, দোষ বলেও তো গণ্য হতে পারে!

সর্দারকে নিরুত্তর দেখে সওদাগর বলে, দু’শো দিনার দিতে পারি, দেবে?

সর্দার এবার অ’দ্ভুত হা’সে, থাক থাক আর কইয়ো না, আমা’র উটা’টা’ শুনলে হা’সবো।

সওদাগর বি’রক্ত হয়, হা’সির কথা তো কিছু বলি’নি সর্দার। তোমা’র কাছে দাম জিজ্ঞেস করলাম, বললে না। উল্টে আমা’র কাছে দাম জানতে চাইলে। তা আমা’র যা মনে হয়েছে, বললাম। এবার তোমা’র কথা বলো?

বাদাবী সর্দার বলে, না বাপু বি’ক্রি করে আমা’র কাজ নাই। তার চেয়ে দেশে নিয়ে গিয়ে ভুট্টা’র ক্ষেতে কাজে লাগাবো। আমা’র উট চর্যাবে। তাও অ’নেক সুরাহা’ হবে।

সওদাগর দেখলো, লোকটা’ গোয়ার। কোন যুক্তি তর্কের ধার ধারে না। বললো, আহা’—আমন গোসা করছে কেন শেখ? হা’টে যখন এনেছো, বেচাবে বলেই এনেছো। তা দরিদম না হলে কি কেনাবেচা হয়। তোমা’র মেয়ের গুণের কথা না হয় জেনেছি, কিন্তু মুখের সুরৎ তো এখনও দেখিনি। রূপ না হলে গুণ ধুয়ে জল খাবে নাকি লোকে?

সর্দার ক্ষেপে ওঠে, তা তোমা’কে তার চেহা’রাটা’ দেখতে কে বারণ করছে। যাওনা, বোরখাটা’ খুলে দেখে এসো না। চাই কি সাধ হলে সাজ-পোশাক খুলে ন্যাংটো করেও উল্টেপাল্টে দেখতে পারো। আমা’র কিছুতেই আপত্তি নাই।

—শোভন আল্লাহ, একি কথার ছিরি। মেয়ে মা’নুষের কেনা বেচার কারবার করি ঠিক। কিন্তু তাই বলে, মা’ন ইজ্জতও কি খুইয়ে বসবো নাকি!

সর্দার বলে, কেন দোষ কী? ময়রা কি সন্দেশ খায় না?

—তোবা তোবা, তোমা’র মুখের কোনও রাখ-ঢাক নাই, শেখ। একেবারে গোল্লায় গেছে। নাও চলো, আমি শুধু তার মুখের আদলটা’ দেখবো। বোরখাটা’ খুলবার দরকার নাই। মুখের নাকাবটা’ একবার সরালেই যথেষ্ট।

সওদাগর আবার ঘরের ভিতরে ঢুকে নুজাতের কাছে যায়। নুজাৎ মা’থা নত করে স্বাগত জানায়। পাশের একটা’ কুর্শি দেখিয়ে বসতে অ’নুরোধ জানায়।

সওদাগর জিজ্ঞেস করে, তোমা’র নাম কি, বাছা?

নুজাৎ এক মুহূর্ত জবাব দেয় না। তারপর সলজ্জ কণ্ঠে বলে, আপনি কি আমা’র এখনকার নাম জানতে চাইছেন? না, আমা’র মা’-বাবার দেওয়া নাম শুনবেন? তারা আমা’কে নিয়নতারা’ বলে ডাকতেন। কিন্তু এখন আমি নিজেকে ‘চোখের বালী’ বলেই মনে করি।

নুজাতের কথায় সওদাগরের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। মেয়েটির মনের প্রতিচ্ছবি’ ফুটে ওঠে তার চোখের সামনে। নুজাৎও অ’শ্রু সংবরণ করতে পারে না। বলে, সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছিলাম। আজ সায়রে পেতেছি শয্যা।

বাদাবী সর্দার তেড়ে আসে, বলি’, এতক্ষণ ধরে গুজগুজ ফুসফুস কি হচ্ছে? চাবুকের ঘায়ে পিঠের ছাল-চামড়া তুলে দেব।

নুজাৎ কাতরভাবে সওদাগরের দিকে তাকায়। —আপনি আমা’কে এই পাপ থেকে উদ্ধার করুন, জনাব। আমি আর এই অ’ত্যাচার সহ্য করতে পারছি না। আমা’র কথা যদি না শোনেন আজি রাতেই জীবনটা’ শেষ করে দেব।

সওদাগর বাদাবী সর্দারের দিকে ফিরে বলে, শেখসাহেব, তোমা’র ভয়ে মেয়েটা’ শিটকে যাচ্ছে। একটু ক্ষান্ত হও। বলো কি দাম চাও, দেব।

ডাকাতটা’ চিৎকার করে ওঠে, তোমা’কে তো বলেছি, আমি দাম বলবো না। তোমা’র যা মনে হয় বলে। আমা’র ইচ্ছে হলে দেব, না হলে দেব না।

সওদাগর এক লাফে দর হা’ঁকে, পঞ্চশ হা’জার দিনার।

কিন্তু শয়তান ডাকাতটা’ তাতেও রাজি হয় না। বলে, তামা’শা করছে। আমা’র সঙ্গে।

–সত্তর হা’জার দিনার।

সর্দার বলে, ওকে খাইয়ে পরিয়ে মা’নুষ করতে আমা’র খরচা হয়েছে নব্বই হা’জার।

সওদাগর সর্দারের কথায় রেগে ফেটে পড়ে, ঝুটা’ বাৎ। তোমা’র চৌদ্দগুষ্টি মিলে একশো দিনার খেতে পারবে না, তা বলছো, ওর পিছনে খরচ হয়েছে নব্বই হা’জার দিনার। যাই হোক, এক লাখ দেব, এই আমা’র শেষ কথা। রাজি থাকো দিয়ে দাও। না হলে আমি সরকারের দপ্তরে তোমা’র নামে মেয়ে চুরির নালি’শ এবং তুমি তার উপর কি অ’মা’নুষিক অ’ত্যাচার চালাচ্ছে, তারও সাক্ষী দেব। কোতোয়ালকে যদি তুমি টা’কা দিয়ে হা’ত করার চেষ্টা’ করো, তবু রেহা’ই পাবে না। আমি শাহজাদা সারকগনের কাছে যাবো। দেখি তোমা’কে কে রক্ষা করে।

ডাকাত সর্দার দেখলো, বেকায়দা-সওদাগরের কথায় রাজি হয়ে গেলো। বললো, ঠিক আছে টা’কাটা’ দিয়ে দাও। আমা’কে আবার জেরুজালেমে ফিরে যেতে হবে। না জানি ওর ভাইটা’র কি হলো।

পাওনাগণ্ডা বুঝে নিয়ে বাদাবী সর্দার ঊর্ধ্বশ্বাসে উট ছুটিয়ে দেয়। জেরুজালেমে যাবে সে। যার বোনকে বি’ক্রি করে এক লাখ দিনার পাওয়া গেলো তার ভাইকে পেলে না জানি কত পাওয়া যাবে। যে ভাবেই হোক, তাকে চুরি করতে হবে।

কিন্তু জেরুজালেমে পৌঁছে সে সরাইখানায় গিয়ে শুনলো, ছেলেটা’ ওখান থেকে চলে গেছে। সারা শহর চষে বেড়ালো, কিন্তু হদিস করতে পারলো না।

সওদাগর নুজাৎকে তার নিজের বাসায় নিয়ে যায়। বাজার থেকে বাদশাহী সাজপোশাক কিনে নিয়ে আসে। নুজাৎকে পরতে দিয়ে বলে, পরে দেখো দেখি, কেমন মা’নায়।

নুজাৎ বেশ পরিবর্তন করে আসে। দেখে সওদাগরের চোখ ঝলসে যায়। বললে, বাঃ, চমৎকার। এবার চলো বাজারে স্যাকরার দোকানে নিয়ে যাবো!

বাজারের সবচেয়ে সেরা জহুরীর দোকানে নিয়ে গিয়ে নুজাতের পছন্দসই গহনাপত্র কিনতে থাকে। কানের জন্য কিনলো এক জোড়া মুক্ত বসানো দুল। এক একখানা মুক্তোরই দাম হা’জার দিনার। গলার জন্যে নিলো একটা’ সাতনরী হা’র আর মা’নতাসা। হা’রটা’ গলায় পরতে সারা বুক পর্যন্ত ঝলমল করে ওঠে। এইভাবে হা’তের বাজুবন্ধ, কোমরের গোট, পায়ের মল, মা’থার টিকলী টা’য়রা—সব আভরণ পরে সে যখন দাঁড়ালো, সওদাগরের মনে হতে লাগলো, যেন কোন এক শাহজাদী।

নুজাৎকে রত্নালঙ্কারে সাজিয়ে আবার নিয়ে এলো সওদাগর। বললো, তোমা’কে একটা’ কথা মনে করিয়ে দিচ্ছি, বাছা, শাহজাদা সারকানকে কিন্তু বলে না, কত দাম দিয়ে তোমা’কে কিনেছি। সে যাতে ওকালতী করে তার বাবা উমর-আল-নুমা’নের নামে একটা’ চিঠি লি’খে দেয়। তার ব্যবস্থা তোমা’কে করতে হবে। চিঠি আর তোমা’কে নিয়ে বাগদাদে যাবো। ছেলের সুপারিশ থাকলে শাহেনশাহ না করতে পারবেন না। আর একবার যদি তিনি হ্যাঁ করেন, আমি মোটা’ টা’কা মুনাফা পাবো।

নুজাৎ মুখ নিচু করে। দুগাল বেয়ে টস টস করে জল গড়িয়ে পড়ে। সওদাগর অ’বাক হয়। —বাগদাদের নাম শুনে অ’মন মন খারাপ হয়ে গেলো কেন, বাছা? তোমা’র কি কোন চেনা জানা আত্মীয় স্বজন কেউ ছিলো সেখানে? ওখানকার কোনও সওদাগরকে কি তুমি চেনো? বলে মা’, আমা’র কাছে লজ্জা করো না, খুলে বলে। বাগদাদের সব বড় বড় সওদাগরই আমা’র খুব চেনা।

নুজাৎ ঘাড় নেড়ে বলে, না, একমা’ত্র সুলতান উমর-আল-নুমা’ন ছাড়া আমি সেখানকার আর কাউকে চিনি না।

সওদাগর শঙ্কিত হয়।—তবে কি এর আগে কোনও সওদাগর তোমা’কে সুলতানের কাছে পেশ করেছিলো?

—জী না। আমি সুলতানের কন্যার সঙ্গে এক সাথে মা’নুষ হয়েছি তার প্রাসাদে। এই সূত্রে তিনি আমা’কে বড় স্নেহ করতেন। এবং যখনই যা চেয়েছি, নির্দ্বি’ধায় দিয়েছেন। যদি আপনি মনে করেন, তার কোনও অ’নুগ্রহ আপনার দরকার একটা’ কাগজ কলম দিন, আমি একটা’ চিঠি লি’খে দিচ্ছি। চিঠিটা’ তার হা’তে দিলে, আপনার মনস্কামনা পূর্ণ হবে। শুধু আমা’র চিঠিটা’ তার হা’তে দিয়ে বলবেন, তার একান্ত অ’নুগত নুজাৎ দিয়ে পাঠিয়েছে আপনাকে। আর বলবেন, ভাগ্যের ফেরে সে আজ পথহা’রা পাখির মতো এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বহু জনের মনোরঞ্জন করতে করতে অ’বশেষে এখন সে দামা’সকাসে তারই পুত্র শাহজাদ সারকানের আশ্রয়ে আছে। এই বলে তাকে আমা’র সালাম জানাবেন।

নুজাতের কথা শুনে সওদাগরের শ্রদ্ধা অ’নেক বেড়ে যায়। জিজ্ঞেস করে, আচ্ছ মা’, প্রাসাদে থাকা কালে তুমি কোরান এর পাঠ শেখেনি।

-আলবৎ শিখেছি, জনাব। শুধু কোরানই নয়, অ’ঙ্ক, বি’জ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য, ইতিহা’স প্রভৃতি নানা বি’দ্যা আহরণ করেছি। নানা বি’ষয়ে আমি অ’নেকগুলো গ্বন্থ রচনা করেছি। বি’দগ্ধ ব্যক্তিরা তা পাঠ করে ভূয়সী প্রশংসাও করেছেন। আমা’র লেখা কাব্য গাথা আজ বাগদাদের মা’নুষের মুখে মুখে ফেরে।

সওদাগর অ’বাক বি’স্ময়ে নুজাতের কথা শুনছিলেন। উঠে গিয়ে কাগজ কলম আর দোয়াত এনে রাখলে তার সামনে।

নুজাৎ একখানা চিঠি লি’খে ভাঁজ করে সওদাগরের হা’তে দেয়। চিঠিখানা কপালে ঠেকিয়ে সওদাগর তার কামিজের জেবে রেখে বলে, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানাই, তোমা’কে যেন তিনি আরও গুণবতী করে রাখেন।

তারপর শুনুন, জাঁহা’পনা, নুজাতের পরিচয় জানার পর কিভাবে যে তাকে আদর করবে সওদাগর ভেবে পায় না।

—মা’, চলো তোমা’কে হা’মা’মে নিয়ে যাই। খুব ভালো করে ঘসে মেজে গোসল করে নাও। সারকানের দরবারে যেতে হবে। এমন সাজগোজ করে যাবে, যাতে এক নজরেই শাহজাদা বলে ওঠেন, বাঃ খাসা।

সওদাগরের কথায় নুজাৎ লজ্জা পায়। মুখ নামিয়ে মৃ’দু হা’সে। খুশির ছোঁয়া লাগে ওর গালে। রক্তরাঙ্গা হয়ে ওঠে মুখ। ঘাড় নেড়ে বলে, চলুন।

আন্তর, সাবান, তোয়ালে, ছোবড়া, সাজপোশাক সঙ্গে নিয়ে সওদাগর নুজাৎকে নিয়ে এলো শহরের সবচেয়ে সেরা অ’ভিজাত এক হা’মা’মে। একটা’ শরীর সাফা করার মেয়ে ভাড়া করলো।

–দেখো, মেয়ে, মা’লকিনকে, আচ্ছা করে ঘসে মেজে সাফা করে দেবে। আজ তাকে বাদশাহজাদা সারকগনের দরবারে নিয়ে যাবো।

মেয়েটা’ বলে, আপনি কিছু ভাববেন না জনাব। এক চিলতে ময়লা রাখবো না গায়ে। সাবান ছোবড়ায় ডলে ছাল চামড়া ছাড়া আর সবই তুলে দেব।

নুজাৎ হেসে ওঠে। সওদাগর বলে, না, শুনেছি মেয়েটা’ সাফাই করার ভালো কায়দা জানে। স্নান শেষ হলে একটা’ বি’রাট তার্কিস তোয়ালে জড়িয়ে পাশের কামরায় এসে একটা’ সোফায় বসে। সামনে টেবি’লে রাখা ছিলো, গোলাপের সরবৎ, আঙুর, আপেল, আনার আপেল। অ’নেক দিন পরে স্নান করে তার শরীরটা’ বেশ ঝরঝরে তাজা হয়ে ওঠে। সরবৎটা’ খেয়ে শরীরটা’ জুড়িয়ে যায়। মেয়েটা’ বলে, ফলগুলোও খেয়ে নাও, মা’লকিন, যা ডলাইমলাই হয়েছে খিদে পাওয়ার কথা। সত্যিই মেয়েটা’ গোসল করানোর কায়দা জানে ভালো। এমন ভাবে তেল মা’লি’শ করেছে, এতদিনের পথের ক্লান্তি ব্যথা বেদনা সব নিমেষেই দূর হয়ে গেলো। নুজাৎ বললো, আমি এত ফল খেতে পারবো না। তুমিও নাও।

দু’জনেও খেয়ে শেষ করতে পারলো না। হা’মা’মের বুড়ি দ্বাররক্ষীটা’কে অ’নেকগুলো দিয়ে দিলো। এরপর শুরু হলো প্রসাধনের পালা।

সওদাগর এসে গহনার বাক্স দিয়ে গেলো। একটুবাদে সাজ-পোশাক করে গহনাপত্র পরে যখন সে বেরিয়ে এলো সওদাগর দেখে একেবারে থা। জীবনে বহু মেয়ের বেচা কেনা সে করেছে, কিন্তু এমন রূপের জেল্লা কোনও মেয়ের সে দেখেনি। একটা’ খচ্চরের পিঠে চাপিয়ে শাহজাদা সারকানের দরবারের পথে রওনা হলো। এমন রূপবতী রমণী দেখার সৌভাগ্য রোজ রোজ আসে না।

দরবারে এসে আভূমি আনত হয়ে সওদাগর সারকানকে কুর্নিশ জানায়।

—আজ হুজুরের দরবারে এক অ’পূর্বসুন্দরীকে হা’জির করছি। জাঁহা’পনা স্বচক্ষে দেখে বি’চার করুন। রূপে গুণে এমন অ’তুলনীয়া মেয়ে এর আগে কখনও দামা’সকাসে আসেনি, জাঁহা’পনা। দুনিয়ার সেরা সুন্দরীদের মধ্যে সবার সেরা।

–ঠিক আছে আনো, দেখতে দাও।

সওদাগর নুজাতের হা’ত ধরে সারকানের সামনে নিয়ে আসে। মুখের নাকাব সরিয়ে দেয়। সারকান এর আগে তার বোনকে চোখে দেখেনি। সুতরাং চিনতে পারার প্রশ্ন ওঠে না। নুজাৎকে দেখে শরীরে শিহরণ জাগে। এতরূপ এমন ঢলঢলে যৌবন। এর আগে কখনও সে দেখেনি।

সওদাগর গুণকীর্তন করতে থাকে, শুধু রূপটা’ই সব নয় জাঁহা’পনা। গুণেরও অ’ন্ত নাই। এমন কোনও বি’দ্যা নাই যা তার অ’জানা। ইচ্ছে হয়, অ’ঙ্ক, ইতিহা’স জ্যোতিবি’দ্যা—নানা বি’ষয়ে জ্ঞান তার অ’সাধারণ।

সারকান মনস্থির করতে এক মুহুৰ্তও সময় নিলো না। সওদাগরকে বললো, আমা’র খাজাঞ্চকে বলো, সে তোমা’র পাওনা গণ্ডা মিটিয়ে দেবে।

সওদাগর বুকে সাহস করে বলে, হুজুর আমি একে বাদশাহ উমর-আল-নুমা’নের জন্য এনেছিলাম। তা হুজুরের যদি নিজেরই পছন্দ হয়ে থাকে, আমি আরও খুশি হবো। আমি ভেবেছিলাম, হুজুরকে দেখিয়ে একটা’ চিঠি করে নেব। আপনার চিঠি পেলে বাদশাহ না’ করতে পারবেন না। তা এখন বুঝেছি তার আর দরকার হবে না। শুধু শাহজাদার কাছে আমা’র আর্জিঃ মেয়ে কেনাবেচাই আমা’র ব্যবসা। এর জন্য সুলতানকে যে কর দিতে হয়। সেই কর থেকে আমা’কে রেহা’ই করে দিন।

সারকান বলে, ঠিক আছে, তাই হবে। এখন বলো, কি ইনাম দিতে হবে? কি দামে তুমি একে কিনেছো?

সওদাগর বলে, হুজুর একলক্ষ দিনারে কিনেছি, আর একলক্ষ দিনারের অ’লঙ্কার আর সাজ-পোশাকে সাজিয়ে এনেছি।

সারকান খাজান্ধীকে বললো, সওদাগরকে টা’কাটা’ দিয়ে দাও। আর ওর দালালী বাবদ আরও বি’শ হা’জার, এবং বকশিস হিসাবে দামী দামী সাজ-পোশাক দিয়ে বি’দায় করো। আর আমা’র খাজনা দপ্তরে বলে দাও, আজ থেকে সওদাগর যা বাণিজ্য করবে তার সব কর মুকুব করে দিলাম।

সারকানের নির্দেশে শহরের চারজন কাজী এসে হা’জির হয়। সারকান বলে, আমি বাঁদীকে কিনেছি। তার সব দায় দেনা থেকে আমি রেহা’ই দিলাম। এখন আমা’র ইচ্ছা, ওকে শাদী করে। বেগম করবো। তোমরা তার সাক্ষী হবে। কাগজপত্র সব তৈরি করো।

কাজীরা তড়ি ঘড়ি শাদীর হলফনামা’ তৈরি করে দিলে। সারকান উপস্থিত সকলকে প্রচুর স্বর্ণমুদ্রা এবং মূল্যবান সাজ-পোশাক উপহা’র দিয়ে বি’দায় করলো। শুধু রইলো চার কাজী আর সেই সওদাগর। সারকান বলছে, এই বাঁদী শুধু রূপে নয়, নানা বি’দ্যায় বি’দুষী। এবং অ’সাধারণ গুণবতী। তোমা’দের সামনে সে তার গুণের পরীক্ষা দেবে। বি’চার করে বলবে, সওদাগরের গুণকীর্তন কতখানি সত্যি।

একটা’ বি’রাট কক্ষের মা’ঝখানে পর্দার আড়ালে নুজাৎকে বসানো হয়েছে। পর্দার এপাশে বসেছে শহরের সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়েরা। একটু পরে পর্দাটা’ একটু নিচে করে দেওয়া হলো। মেয়েদের মধ্যে গুঞ্জন উঠলো। নুজাতের রূপের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠে সকলে। কেউ বলে, বেহেস্তের ডানাকাটা’ হুরী। কেউ বলে, হুরীরাও কি এতো সুন্দর হয়! কেউ বা তামা’শা করে টিপ্লনি কাটে, ঝাড়বাতিগুলোর আর কি দরকার, এমনিতেই ঘর আলো হয়ে গেছে।

তামা’শা নয়, সত্যিই নুজতের রূপের জেল্লায় মেয়েদের চোখ ঝলসে যায়। নুজাৎ উঠে এসে সবাইকে মৃ’দু সম্ভাষণে স্বাগত জানায়। তার মধুর বাচনভঙ্গীতে মুগ্ধ হয় সকলে। মেয়েরা আদর করে বলে, তোমা’র রূপের আলোয় সুলতানের ঘর আলো হয়ে উঠবে।

পর্দার এপাশ থেকে সারকান বলে, সুন্দরী, তোমা’র জ্ঞান গরিমা’র কথা অ’নেক শুনেছি। এবার আমা’দের কিছু নীতি কথা শোনাও।

নুজাৎ বলে, আপনার আদেশ শিরোধার্য, জাঁহা’পনা। আমা’র সাধ্যমতো চেষ্টা’ করবো। আমি প্রথমে বলছি, প্রাথমিক আচরণ বি’ধির কথা। একটি পরিপূর্ণ জীবনের অ’র্থ-ক্রম বি’কশিত উৎসাহ-উদ্দীপনার ফলশ্রুতি। আর জীবনের প্রধান উৎসাহ আসে। কিন্তু দৃঢ় আত্মপ্রত্যয় থেকে। বাসনার অ’তৃপ্ত আগুনে না পুড়তে থাকলে উৎসাহ উদ্দীপনা আসতে পারে না। রাজনীতি, বাণিজ্য, সংসার ধর্ম এবং শিল্পকলা এই চারপ্রকার বি’ষয়ে মা’নুষ তার কুশলতা দেখাতে উৎসাহিত হয়ে থাকে।

রাজনীতি-অ’ৰ্থাৎ যে নীতি দ্বারা দেশের শাসনব্যবস্থা মজবুত হয়। জনগণ সুখে সমৃ’দ্ধিতে বসবাস করতে পারে। দেশের প্রতিরক্ষা সুদৃঢ় থাকে। আভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা এবং স্থিতি বজায় থাকে। সাধারণ মা’নুষ সরকারের প্রতি আস্থাবান থাকে।

পারস্যের তৃতীয় শাহ মহা’মা’ন্য আরদাশির বলেছেন, ‘সরকার’ ‘আস্থা’ এরা যমজ বোন। আস্থা হচ্ছে সম্পদ আর সরকার হচ্ছে রক্ষক।

আমা’দের পয়গম্বর বলেছেন, দুনিয়াতে দুটিমা’ত্র বস্তু সবচেয়ে ক্ষমতাবান। ন্যায়। আর অ’ন্যায়। যখন সবাই ন্যায় ধর্ম মেনে চলে, তখন তামোম দুনিয়া সুন্দর হয়ে ওঠে। আর সবাই যখন অ’ন্যায়ের পথ বেছে নেয়, তখন দুনিয়া কলুষিত হয়ে পড়ে।

জনৈক বি’জ্ঞ ব্যক্তিত মতে—প্রত্যেক সুলতানের উচিত আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলা। তিনি অ’সি এবং মসির মধ্যে সমন্বয়সাধন করতে নির্দেশ করেছেন। তা না হলে, অ’সির যত বি’ক্রমই থাক মসির কাছে সে পরাজিত হতে বাধ্য। শুধু আসি বলে সিংহা’সন রক্ষা করা অ’সম্ভব। বুদ্ধির কৌশলে সে সিংহা’সনের পতন ঘটা’ বি’চিত্র নয়।

বাদশাহ আরদাশির তার বি’শাল সলতানিয়ৎকে চার ভাগে বি’ভক্ত করে শাসনকার্য চালাতেন। প্রতিটি সুবার নিদর্শন হিসাবে এক একটি মোহরাঙ্কিত আংটি ধারণ করতেন। এর ফলে চারটি সুবার শাসনকার্য সুষ্ঠুভাবে পরিচালি’ত হতো। একটি সুবার বি’ক্ষোভ অ’ন্য সুবায় সংক্রামিত হতে পারতো না। তাঁর এই শাসননীতি ইসলামের শাসন কাল পর্যন্ত সব সুলতানরা মেনে চলেছিলো।

পারস্যাধিপতি মহা’মা’ন্য শাহেনশাহ কাসরা, তার অ’ন্যতম সেনাবাহিনীর অ’ধিনায়ক পুত্রকে একবার লি’খেছিলেন…

পত্রে তিনি লি’খেছিলেন, ‘বাবা, একটা’ কথা মনে রেখো, অ’হেতুক কারো প্রতি করুণা প্রদর্শন করো না। এতে সরকার দুর্বল হয়ে পড়ে।’ আবার এও তিনি লি’খেছিলেন, কিন্তু যেখানে মা’র্জনা প্রয়োজন সেখানে রূঢ় হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। এতে তারা বি’দ্রোহী হবে।’

এক আরবীয় দার্শনিক খলি’ফা আবুজাফর আবদাল্লাহ আল-মনসুর-এর দরবারে একবার বলেছিলেন, ‘আপনি যখন অ’নশন করবেন তখন আপনার কুকুরকেও নিশ্চয় না খাইয়ে আপনার অ’নুগত করে রাখতে চাইবেন। কিন্তু সাবধান, পথ চলতি মা’নুষ যেন না তাকে রুটির টুকরো ছুঁড়ে দিয়ে যায়।’ অ’ল-মনসুর দার্শনিকের এ কথায় জীবনে বহুবার বহুভাবে উপকৃত হয়েছিলেন।

খলি’ফা আবদ-আল মা’নিক ইবন আল মা’রবান মিশরে তার সৈন্যবাহিনীর অ’ধ্যক্ষ, ভ্ৰাতা আবদ অ’ল আজিজকে একবার লি’খেছিলেন, তোমা’র পরামর্শদাতারা তোমা’কে কোনও শিক্ষাই দিতে পারেনি। শিক্ষা লাভ করেছে তোমা’র শত্রুর কাছ থেকে। কি করে নিজের সেনাবাহিনী আরও শক্তিশালী রাখতে হয় তারা তোমা’কে সেই জ্ঞান দিয়েছে।

জ্ঞানবৃদ্ধ খলি’ফা উমর ইবন খাতাব তাঁর দরবারে যাদের উচ্চপদে বহা’ল করতেন তাদের প্রত্যেককে হলফনামা’ দিতে হতো-ভারাক্রান্ত পশুর পিঠে চাপবে না, শত্রুর সামা’ন অ’পহরণ করবে না, কখনও সাহেবীয়ানা পোশাক পরবে না এবং নামা’জ পাঠের সময় বি’লম্ব করবে না। তিনি বলতেন জ্ঞানই প্রকৃত ঐশ্বর্য। বি’চক্ষণতাই একমা’ত্র মন্ত্র এবং বি’দ্যার্জনের গৌরব।

উমর আরও বলেছেন, তিন প্রকারের রমণী আছে। যে মুসলমা’ন রমণী কেবলমা’ত্র পতিঅ’ন্ত প্ৰাণ সে আদর্শ। যে মুসলমা’ন রমণী কেবলমা’ত্র সন্তানের জন্য স্বামী সঙ্গ চায় সেও ভালো। কিন্তু যে নারী পরপুরুষের সঙ্গে মা’তামতি করে সে অ’ত্যন্ত খারাপ। তার সাহচর্য পরিহা’র করে চলবে।

উমর বলেছেন, তিন রকমের পুরুষও আছে সংসারে। বুদ্ধিমা’ন ব্যক্তি বি’চার বি’বেচনা করে কাজে হা’ত দেয়। বি’চক্ষণ ব্যক্তি প্রথমে নিজে বি’চার বি’বেচনা করে, এবং পরে অ’ন্যের কাছে পরামর্শ নিয়ে কাজে হা’ত দেয়। আর নির্বোধিরা না করে চিন্তা, না নেয় উপদেশ।

দার্শনিক আলী-ইবন তালি’ব বলেছেন, নারীর ছলাকলা সম্পর্কে সতর্ক থাকবে। ভুলেও কখনও তাদের পরামর্শনিও না। কিন্তু সাবধান, তাদের কখনও অ’খুশি রেখো না, এর পরিণাম আরও খারাপ হয়। তারা জাহা’ন্নামের পথে পা বাড়াতে পারে।

নুজাতের এবম্বি’ধ-জ্ঞানগর্ভ কথাবার্তা শুনে কাজীরা মুগ্ধ হয়ে বলে, ইয়া আল্লাহ, এমন উপদেশের বাণী আমরাও তো জানি না।

নুজাৎ বলে, মা’নবতার তিনটি দিক নিয়ে অ’ন্য আর একদিন আলোচনা করবো। আজ আচরণবি’ধি ও বি’চক্ষণতার দ্বি’তীয় পর্যায় ব্যাখ্যা করে শোনাচ্ছি : দ্বি’তীয় পর্যায়—অ’র্থাৎ পরিপূর্ণতা। এই পরিপূর্ণতার স্তরে কোনও সাধারণ মা’নুষ চেষ্টা’ করে পৌঁছতে পারে না। এখানে পৌঁছতে গেলে জন্মগত গুণের অ’ধিকারী হওয়া দরকার। এখানে আমি শুধু দু-একটা’ উদাহরণ খাড়া করবো।

নুজাৎ বলে, একদিন খলি’ফা মুয়াবি’য়াহ শহর পরিক্রমা’য় বেরিয়ে দেখলেন ল্যাংড়া রসিক আবু বাহর ইবন কাইস জনে জনে ভিক্ষা মা’ঙছে। খলি’ফা সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কিছু বাণীটা’নী ছাড়ো তো হে।

ল্যাংড়া বললো, ধর্মা’বতার, প্রতিদিন আপনি মা’থা কামা’বেন, গোঁফ ছাঁটবেন, নখ বাড়ছে কিনা লক্ষ্য রাখবেন, আপনার দাঁত মুখ সাফা রাখবেন। কিন্তু সাবধান, ভুলেও কখনই জুম্মা’বারে এসব করবেন না। উক্ত এই-ই ‘পবি’ত্র’ বি’ধান।

খলি’ফা বললেন, আচ্ছা আমা’কে না হয় বাণী দিলে, এবার জিজ্ঞেস করি, তোমা’র নিজের সম্পর্কে কি কি বি’ধান মেনে চলো তুমি?

—আমি হুজুর, এক পা সামনে ফেলার আগে দুপা-ই ভালো করে দেখে নিই।

খলি’ফা প্রশ্ন করলো, তুমি তোমা’র জ্যেষ্ঠদের প্রতি কিরূপ আচার-আচরণ করে থাকো?

—আমি বাড়াবাড়ি না করে তাদের যথাযোগ্য সম্মা’ন দেখাই এবং তারাও তাদের আশীর্বাদ জানাবে, এই প্রত্যাশা করি।

খলি’ফা, এবার রসের প্রশ্ন করেন, তুমি তোমা’র বি’বি’র সঙ্গে কি রূপ আচরণ কর, ল্যাংড়াসাহেব??

আবু বাহর লজ্জিতভাবে মুখ নিচু করে। জাঁহা’পনা, আমা’কে মা’ফ করবেন, সে কথা আমি বলতে পারবো না।

—আরে বলই না, লজার কি আছে? ল্যাংড়া দেখলো নিরুপায়। স্বয়ং খলি’ফার শুনতে সাধ হয়েছে। বলতেই হবে।—শুনুন, জাঁহা’পনা, আমা’র বি’বি’ খুব দুবলা আর কুঁজো। চিৎ হয়ে শুতে পারে না।

সুলতান গভীরভাবে প্রশ্ন করে, তা হলে তো বি’পদ।।

—কেন, বি’পদ কেন, হুজুর?

—চিৎ হয়ে শুতে না পারলে শুয়ে শুয়ে কডিকাঠ-এ টিকটিকির খেলা দেখে কি করে?

ল্যাংড়া জবাব দিতে দেরি করে না।—জী হুজুর, বি’বি’ আমা’র উপুর হয়ে শুয়ে নেংটি ইদুরের লুটোপুটি দেখতেই ভালোবাসে।

খলি’ফা ল্যাংড়ার বাক-চাতুর্যে মুগ্ধ হন। তারিফ জানিয়ে বলেন, সাবাস! তোমা’র কথায় খুব খুশি হয়েছি। বলো, কি চাও? আমি তোমা’র মনোবাঞ্ছা পূৰ্ণ করতে চাই।

ল্যাংড়া বলে, সত্যপথে থেকে প্রজােপালন করুন—এই আমা’র একমা’ত্র কামনা। আর কিছু চাই না।

এই বলে ল্যাংড়া আবু বাহর আর ক্ষণমা’ত্র অ’পেক্ষা না করে খলি’ফার কাছে বি’দায় নিয়ে চলে গেলো।

খলি’ফা আনন্দিত হয়ে বললেন, সমগ্র ইরাকে যদি আর একজনও জ্ঞানী ব্যক্তি না থাকে তাতেও আমা’র দুঃখ নাই। আবু বাহর একাই একশো।

নুজাৎ বলে, খলি’ফা উমর ইবন আল-খাতাবের শাসনকালে কোষাগারের খাজাঞ্চী ছিলেন বৃদ্ধ মুয়াইকিব। তার মতো ধর্মপ্ৰাণ সৎব্যক্তি খুব কমই দেখা যায়। একদিন খলি’ফা উমরের ছোট ছেলেটি আয়ার হা’ত ধরে বেড়াতে বেড়াতে বৃদ্ধ মুয়াইকিবের কাছে এসেছিলো। বৃদ্ধ খাজাঞ্চী তাকে আদর করে একটা’ আনকোরা চকচকে রূপের দিরহা’ম হা’তে দেয়। এর কয়েকদিন বাদে খলি’ফা খাজাঞ্চকে ডেকে বললেন, তোমা’র নামে এসব কি শুনছি। খাজাঞ্চী?

—কী শুনেছেন, জাঁহা’পনা?

—কোষাগার থেকে তুমি অ’র্থ অ’পহরণ করেছে!

—ইয়া আল্লাহ, একি শোনালেন, হুজুর। সারা জীবনে আমি কারো একটা’ দিরহা’ম নিইনি।

–কিন্তু তা হলে আমা’র বাচ্চাটা’কে একটা’ দিরহা’ম দিলে কোথা থেকে?

বৃদ্ধ আশ্বস্ত হন।–ও, এই কথা, একখানা খাতা এনে সুলতানের সামনে মেলে ধরে, এই দেখুন জাঁহা’পনা, শাহজাদার নামে এক দিরহা’ম খরচ লি’খে রেখেছি।

খলি’ফা। তবু সন্তুষ্ট হতে পারেন না।–কিন্তু কার পয়সা তাকে দিয়েছ? সমগ্র মুসলমা’ন জাতের কাছে ঋণী করে রাখলে তাকে?

মুরাইকিব অ’বাক বি’স্ময়ে খলি’ফার দিকে চেয়ে থাকে। সারা জীবনে সে নিজেকেই একমা’ত্র সৎ বলে মনে করে এসেছে। আজ মনে হলো, সুলতান উমরের কাছে তার সততা নিতান্তই নগণ্য।

একদিন অ’ন্ধকার রাতে আসলাম আবু জাইদকে সঙ্গে নিয়ে খলি’ফা উমর শহর পরিক্রমা’য় বেরিয়ে অ’দূরে একটা’ আলোর শিখা দেখতে পেয়ে কাছে গেলেন। দেখলেন, এক রমণী রাস্তার একপাশে কাঠ জ্বলি’য়ে একটা’ হা’ঁড়িতে জল গরম করছে। ছোট ছোট দুটি রুগ্ন শিশু তার পাশে বসে আছে। খলি’ফা জিজ্ঞেস করলেন, হ্যাঁ গা মেয়ে, এই অ’ন্ধকার রাতে রাস্তার উপর বসে কি করছো?

—একটু পানি গরম করছি, বাবা। আমা’র বাচ্চা দু’টোর খাবার-দাবার কিছুই জোগাড় হয়নি। তাই একটু পানি গরম করে খাওয়াবো। আমা’র দুঃখের কথা আর কাকে বলবো, খোদাতালা দেখছেন। আমা’র দুধের বাছারা এক মুঠো দানা পায় না। খলি’ফাকে একদিন এর জন্যে আল্লার দরবারে জবাবদিহি করতে হবে।

খলি’ফা বলেন, ওগো ভালোমা’নুষের মেয়ে, তোমা’র কি ধারণা, তোমা’দের এই দুঃখ কষ্ট জেনেও খলি’ফা চুপ করে বসে আছেন? এত বড় শহরে কে কোথায় না খেয়ে দিন কাটা’চ্ছে, না বললে, তিনি জানবেন কি করে?

মেয়েটি এবার ঝাঁঝালো সুরে চটে ওঠে, প্রজাদের সুখ দুঃখের খবরই যদি তিনি না রাখতে পারেন তবে খলি’ফা হওয়ার অ’তি সাধ কেন?

খলি’ফা তার কোন জবাব দিতে পারেন না। আসলাম আবু জাইদিকে সঙ্গে নিয়ে প্রাসাদে ফিরে আসেন। ভাঁড়ার থেকে চটপট এক বস্তা আটা’ আর এক ঝারি চর্বি’ নিয়ে আসেন। আবু জাইদকে বলেন, ধরে তো জাইদ, আটা’র বস্তাটা’ আমা’র পিঠে তুলে দাও।

আবু জাইদ অ’বাক হয়।–সে কি জাঁহা’পনা, আপনি পিঠে বয়ে নিয়ে যাবেন? কোনও চাকরকে ডাকছি, সে দিয়ে আসবে মেয়েটা’র কাছে।

–তা হয় না জাইদ।

–তা হলে, আমা’কে দিন, আমি পিঠে বয়ে দিয়ে আসছি, জাঁহা’পনা!

খলি’ফা বলেন, তা হতে পারে না জাইদ। আল্লাহর দরবারে শেষ বি’চারের দিন, আমা’র পাপের বোঝা কি তুমি পিঠে বইবে?

খলি’ফা নিজেই বয়ে নিয়ে গেলেন। সেই আটা’র বস্তা আর চর্বি’র ঝারি। সেই গরীব মেয়েটির পাশে নামিয়ে নিজেই খানিকটা’ আটা’ মেখে পরটা’ বানাতে লাগলেন। অ’নেক কসরৎ করে সেই নিভু নিভু আগুনের আঁচে পরটা’গুলো ভাজা করে বাচ্চা দুটো আর তার মা’কে পেটপুরে খাওয়ালেন। ওদের খাওয়া শেষ হলে একখানা ঠাণ্ডা চিমসে পরটা’ নিয়ে খলি’ফা নিজেও খেলেন। অ’নেকক্ষণ আগের ভাজা, তখন আর গরম ছিলো না।

বাকী আটা’ চর্বি’ সব মেয়েটিকে দিয়ে খলি’ফা প্রাসাদের পথে রওনা হলেন। আসতে আসতে আবু জাইদকে বললেন, মেয়েটির কথায় আজ আমা’র চোখের পর্দা সরে গেছে, সব অ’ন্ধকার কেটে গেছে। ও নিজেই একটা’ জ্বলন্ত আগুনের শিখা।

নুজাৎ নীতি কথা শোনাচ্ছে :

একদিন খলি’ফা উমর মা’ঠের পথ ধরে হেঁটে চলেছেন। দেখলেন, এক রাখাল কতকগুলো ছাগল চরাচ্ছে। খলি’ফা ছেলেটির কাছে গিয়ে বললেন, আমা’য় একটা’ ছাগল বি’ক্রি করবে?

রাখাল ছেলেটি অ’বাক হয়। বলে, ছাগলগুলোতে আমা’র নয়, জনাব। আপনি যদি কিনতে চান, আমা’র মা’লি’কের সঙ্গে কথা বলুন। আমি তার কেনা গোলাম।

খলি’ফা মুগ্ধ হলেন। দুনিয়াতে অ’সৎ লোকের ভিড়ে এমন একটা’ সৎ ছেলের সন্ধান পেলে আনন্দ হওয়ারই কথা। খলি’ফা বললেন, তোমা’র মা’লি’কের কাছে চলো। আমি তোমা’কেই কিনতে চাই।

–কেন জনাব?

খলি’ফা বললেন, পথে বেরুলেই রোজ রোজ সৎ মা’নুষের দেখা মেলে না। আজ তোমা’কে দেখে আমি ধন্য হয়েছি! তোমা’র মা’লি’কের কাছ থেকে ছাড়িয়ে আমি তোমা’কে মুক্তি দিতে চাই। আর কোনও ধরা বাঁধা নিয়মের মধ্যে তোমা’কে দাসত্ব করতে হবে না। তোমা’র যেখানে খুশি যেতে পারবে। যা প্ৰাণ চায়, করতে পারবে।

একদিন হা’ফসা নামে খলি’ফার এক নিকট আত্মীয় এসে বলে, ধর্মা’বতার, শুনলাম, আপনি অ’নেক ধনদৌলত নিয়ে দেশে ফিরছেন। তা আমি তো আপনার এক শরিক। আমা’র ভাগের অ’ংশটুকু আমি নিতে এসেছি।

অ’বষ্ট বলে মনে করছ, সবই আমা’র মুসলমা’ন প্রজাদের সম্পত্তি। তার একটি কানাকড়িও আমা’র নয়। তাছাড়া প্রজা হিসাবেও তোমা’কে কিছু দিতে পারি না। তার কারণ তোমা’র বাবা আমা’র সহোদর ভাই। লোকে বলবে, স্বজন পোষণ করছি।

নুজাৎ শুনতে পায় পর্দার ওপর থেকে-বহুৎ খুব বহুৎ খুব আওয়াজ উঠছে। হা’ততালি’তে সারা ঘর ফেটে পড়েছে। নুজাৎ একটুক্ষণ থেমে থাকে। করতালি’ থামলে আবার শুরু করে :

এবার আমি তৃতীয় পর্যায়ের কথা বলবো। পুণ্যবানরা এই স্তরে পৌঁছতে পারে।

হা’সান অ’ল বসরি বলেছেন, মা’নুষ তার অ’ন্তিম সময়ে এই তিনটি কথা স্মরণ করে দুঃখ পায়। এক—হা’তের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলা। দুই—অ’পূৰ্ণ বাসনা। তিন—অ’তৃপ্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা।

একদিন সুফিয়াকে একদল লোক জিজ্ঞেস করেছিলো, ধনীরা কি পুণ্যবান হতে পারে?

তিনি জবাব দিয়েছিলেন, পারে। যখন তারা তাদের ধনদৌলত খুইয়ে সর্বস্বাস্ত হয়, তখন পারে। আর পারে, যখন সে শ্রদ্ধার সঙ্গে দান করতে পারে। আপনি অ’নুগ্রহ করে আমা’র এই দান গ্রহণ করে আমা’কে কৃতাৰ্থ করুন, এই কথা যে অ’ন্তর থেকে বলে দান করতে পারে-সে পুণ্যাত্মা’’।

আবদাল্লাহ ইবন সাদ্দাদ মৃ’ত্যুকালে তার পুত্র মহম্মদকে ডেকে উপদেশ দিয়েছিলেন : ধর্মে মতি রেখো, সৎপথে চলো এবং আল্লাহর প্রতি ভক্তি যেন তোমা’র অ’টুট থাকে। আর একটা’ কথা খুব ভালো করে মনে রেখো, বাবা, সম্পদে সুখ হতে পারে, কিন্তু আনন্দ পাবে না। ভোগে কোনও আনন্দ নাই, ত্যাগেই ‘পরম পাওয়া’ পেতে পারো।

ধর্মা’ত্মা’ আবদ আল আজিজ যখন উমা’য়াদের অ’ষ্টম খলি’ফা হয়ে সিংহা’সনে বসেন, তখন তিনি একদিন শহরের বি’ত্তবানদের ডেকে বললেন, তোমা’দের প্রয়োজনীয় বি’ষয়সম্পত্তি রেখে বাকী সব সরকারের তহবি’লে জমা’ করে দাও।

খলি’ফার এই কথা শুনে তারা ক্ষুব্ধ হলো। খলি’ফার পিসি ফাতিমা’র কাছে গিয়ে নালি’শ জানালো। ফাতিমা’কে খলি’ফা বি’শেষ শ্রদ্ধা করতেন। একদিন রাতে ফতিমা’ খলি’ফার শয়নকক্ষে এসে গালি’চার একপাশে চুপ করে বসে রইলো।

খলি’ফা জিজ্ঞেস করেন, কি খবর পিসিমা’, কি বলবে, বলো।

ফতিমা’ বলে, তুমি হচ্ছে ধর্মা’বতার খলি’ফা। তোমা’র সামনে এসে আগে আমা’র কথা বলা সাজে না। যা প্রশ্ন করবে, আমি তার জবাব দেব, এইটা’ই রীতি। আর তোমা’র অ’জানা তো কিছুই থাকতে পারে না। কেন এসেছি, তাও তুমি জান।

খলি’ফা বললেন, আল্লাহ তার পয়গম্বরকে পাঠান, মা’নুষের মা’ঝে খুসবু ছড়াতে। এবং মা’নব ধর্মের উন্মেষ ঘটা’তে। নদী যেমন তৃষ্ণার্তকে জল দান করতে করতে বয়ে যায় পয়গম্বর-এর পুণ্য-জীবনও ঠিক তেমনি। তিনি নিজে কিছুই গ্রহণ করেন না। দান করতে করতে চলে যান। তাকে অ’বলম্বন করে কত লোকে বৈতরণী পার হয়। আর আমা’র একমা’ত্র কাজ—এই স্রোতস্বি’নী যাতে শুকিয়ে মরুভূমি না হয়ে যায়—তাই দেখা।

পর্দার ওপর থেকে নুজাৎ নীতি কথা বলে চলেছে! আর পর্দার এপাশে সারকান চার কাজী ও সওদাগরকে সঙ্গে নিয়ে গভীর আগ্রহে শুনছেন :

ফাতিমা’ বলে, তোমা’র সব কথাই আমি বুঝতে পেরেছি। বেটা’। যে কথা জানতে এসেছিলাম তার জবাব আমি পেয়ে গেছি। আর কিছু বলার নাই।

ফাতিমা’ ফিরে গিয়ে বি’ত্তবানদের বললো, তোমা’দের জন্মজন্মা’ন্তরের ভাগ্য যে, খলি’ফা উমর ইবন আবি’দ-অ’ল-আজিজের মতো সুলতান পেয়েছ। সে যা বলে, মা’থা পেতে নাও।

স্পষ্টবাদী উমর মৃ’ত্যুকালে তার সন্তানদের উপদেশ দিয়ে গেছেন : দারিদ্র্য অ’ভিপ্রেত নয়, কিন্তু দারিদ্র্যের সম্পর্শ শোকার প্রয়োজন অ’পরিহা’র্য। আল্লাহর সান্নিধ্য পেতে গেলে দারিদ্র্যের স্পর্শ অ’নুভব করতে হবে।

তার শয্যাপার্শ্বে মসলামা’হ ইবন আবদ আল মা’লি’ক উপস্থিত ছিলেন। তিনি জানতে চাইলেন, লোকে বলছে আপনি আপনার সন্তানদের সম্পত্তির এক কপর্দকও দিয়ে গেলেন না। অ’থচ ইচ্ছা! করলেই বি’ত্তবান করে রেখে যেতে পারতেন।

খলি’ফা অ’বাক এবং উত্তেজিত হয়ে ওঠেন, তুমি কি বলতে চাও মসলামা’হ, সারা জীবন ধরে ন্যায় পথে চলে, শেষে মৃ’ত্যুকালে এই জঘন্য মিথ্যাচার করে যাবো! তাহলে সারা জীবন ধরে যেটুকু পুণ্য সঞ্চয় করেছি-এক ফুৎকারে উবে গিয়ে আমা’র জন্যে দোজকের দরজা খুলে যাবে যে? ছোটবেলায়, মনে আছে, আমা’র এক পূর্বসূরীর শবযাত্রায় সামিল হয়েছিলাম। তিনি তার জীবদ্দশায়, অ’ন্যায় অ’নাচার, অ’বি’চারের চূড়ান্ত করেছিলেন। ফলে তার মৃ’ত্যুতে লোকে হা’ঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলো। আল্লাহর কাছে নালি’শ জানিয়েছিলো, তার যেন দোজক বাস হয়। সেইদিন থেকে আমি হলফ করেছিলাম, তার মতো অ’সৎ ব্যবহা’র আমি যেন মা’নুষের সঙ্গে না করি। আমি যদি খলি’ফা হই, আমা’র প্রজারা যেন বলতে না পারে, আমি কোনও অ’ন্যায় অ’বি’চার করেছি।

এই মসলামা’হ আল মা’লি’ক একবার বলেছিলেন, একদিন এক ইচ্ছামৃ’ত বৃদ্ধের শবদেহ সমা’ধিস্থ করে রাত্রে শুয়েছি—স্বপ্নে দেখলাম, সেই বৃদ্ধ আমা’র শিয়রে এসে দাঁড়িয়েছেন।–শোনো, মসলামা’হ, জীবনে এমন কিছু কাজ করে যাবে যার জন্যে পুরস্কার আশা করতে পারো।

তিনি একটা’ কিসসাও বলেছিলেন : উমর ইবন আবদ আল-আজিজের শাসনকালে এক যুবক তার এক রাখাল বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলো। একপাল ছাগল ভেড়ার মা’ঝখানে ইয়া তাগড়াই এক জোড়া কুকুর দেখে অ’বাক হয়ে সে জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা দোস্ত, তোমা’র এই ছাগল ভেড়ার মধ্যে ঐরকম জাঁদরেল কুকুর দু’টো রেখেছে কেন?

রাখাল বন্ধু জবাব দেয়, উন্থ, ওদুটো আসলে কুকুর না।

–তবে?

–পোষ মা’নানো নেকড়ে।

—কী করে পোষ মা’নালে? ওরা ছাগল ভেড়া খেয়ে ফেলে না?

–মা’রের ভয় দেখিয়ে। ওরা জানে থাবা বাড়ালে ঠ্যাং খোড়া করে দেব আমি। আসল কথা কি জান দোস্ত, কাল্লা শক্ত থাকলে ধড়েও তাগাদ থাকে।

একদিন খলি’ফা উমর ইবন আবি’দ-আল-আজিজ মা’টির তৈরি একটা’ সিংহা’সনে বসে প্রজাদের উদ্দেশে বাণী দিলেন, আবদ আল মা’লি’ক মা’রা গেলেন, তারা বাবাও গত হয়েছেন। কিন্তু তাদের কি দুর্ভাগ্য, তারা কোনও সুনাম রেখে যেতে পারেননি। আমিও তো ঐভাবেই একদিন মরে হা’রিয়ে যাবো। তাই আজ বি’নোদনের সব উপকরণ এখন থেকে আমি পরিহা’র করে চলবো।

–কিন্তু তাই বলে, মসলামা’হ বললেন, মা’টির আসনে বসা আপনার শোভা পায় না। একখানা কুশন পেতেও বসুন, জাঁহা’পনা।

খলি’ফা চটে উঠলেন, ‘শেষ বি’চারের দিন ঐ কুশন যখন শিকল বেঁধে ঝুলি’য়ে দেবে আমা’র গলায়, তোমা’র খুব আনন্দ হবে, না?

নুজাৎ বলছে আর চার কাজী ও সওদাগর সহ সুলতান সারকান শুনছে ৪ খলি’ফা আবি’দ-আল-আজিজ একদিন বলেছিলেন, আল্লাহ আমা’কে চিরজীবী করে পাঠাননি। যে কোন ধর্মা’ত্মা’র কাছে মৃ’ত্যুই তীর সবচেয়ে বড় আশীৰ্বাদ।

একদিন খলি’ফা হিসারাম এক তাঁবুতে তার পাত্বমিত্র পরিষদ পরিবৃত হয়ে বসেছিলেন। এমন সময় খলি’দ ইবন সফবান এসে বললেন, ধর্মা’বতার আল্লাহ। আপনার মঙ্গল করুন। আজ আপনাকে নীতিগৰ্ভ কাহিনী শুনিয়ে যাবো।

এক সুলতান একদিন তার পরিষদদের বলেছিলেন, আমা’র মতো মহা’ন উদার দয়ালু এবং বি’ত্তশালী বাদশাহ কি তোমরা কখনও দেখেছে?

তখন এক প্রবীণ বি’জ্ঞ ধর্মা’নুরাগী পারিষদ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, জাঁহা’পনা, আপনি খুব কঠিন প্রশ্ন করেছেন। যাই হোক, জবাব দেবার আগে সবি’নয়ে আপনাকে একটি প্রশ্ন করতে চাই—আপনি কি মনে করেন আপনার এই অ’তুল বৈভব চিরস্থায়ী হবে?

সুলতান জবাব দিলেন, ধনদৌলত কখনও চিরস্থায়ী হয় না।

পারিষদ বললেন, তাহলে আপনি অ’ত গর্ব করে এরকম প্রশ্ন করছেন কেন?

খলি’ফা বললেন, তা হলে আমা’র কি করা উচিত, বলো।

–নিজেকে নির্মল পবি’ত্র রাখুন। পাপ-চিন্তা করবেন না। অ’হঙ্কার পরিত্যাগ করুন। অ’নাড়ম্বর জীবনযাপন করুন। আল্লাহর পায়ে নিজেকে সঁপে দিন।

সেই দিন থেকে খলি’ফা মা’থার মুকুট খুলে নামিয়ে রাখলেন। বাদশাহী সাজপোশাক ফেলে দিয়ে দীন দরিত্র যে পোশাক পরে সেই মোটা’ জামা’ কাপড় পরলেন। একটি মা’ত্র কম্বল সম্বল করে মক্কার পথে যাত্রা করলেন।

এই সময় পর্দার ওপর থেকে চার কাজী আর সওদাগর তারিফ জানিয়ে বললেন, আহা’-হা’, কি কথাই শুনলাম। অ’মৃ’ত সমা’ন। শুনে জীবন সার্থক হয়ে গেলো।

নুজাৎ বলে, এই পর্যায়ে আরও অ’নেক উৎকৃষ্ট উদাহরণ দিতে পারি। কিন্তু আজ এই আসরে সব শোনানো সম্ভব নয়। যদি সুযোগ হয়, আর একদিন শোনাবো।

এই বলে নুজাৎ চুপ করলো।

চার কাজী নুজাতের প্রশংসায় মুখর হয়ে ওঠে। এ রমণী যুগের আলো। দেশের গৌরব। আমা’দের সুলতান পরম ভাগ্যবান। তার মতো রূপে গুণে অ’নন্যা আর একটিও আমা’দের চোখ পড়েনি।

এই বলে তারা সকলে সারকানকে কুর্নিশ জানিয়ে বি’দায় নিলো।

সারকান তার দাসদাসীদের ডেকে হুকুম দিলো, জলদি শাদীর আসর সাজাও। শাহী খানা পাকাও। আজ রাতে আমি শাদী করবো।

মুহুর্তের মধ্যে সারা প্রাসাদে সাজে। সাজে। রব পড়ে গেলো। সন্ধ্যা না হতেই আলার মা’লায় সাজানো হলো প্রাসাদ। দামা’সকাসের বাহা’রী ফুল এলো, আতর টু, আিম গোলাপজল, সুগন্ধী আগরবাতি এলো, এলো দামী দামী সরাব, মা’ংস, মিঠাই মণ্ডা। উৎসবে মেতে উঠলো সবাই। আমীর ওমরাহদের বি’বি’রা-যারা এসেছিলো, সবাইকে শাদী দেখার নিমন্ত্রণ জানালো সারকান। উপস্থিত অ’ভ্যাগতদের এলাহী খানাপিনার ব্যবস্থা করা ভঁঠু হলো। শহরের সম্ভ্রান্ত সওদাগর আমির ওমরাহরা এসে সারকানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে গেলো।

হা’মা’ম থেকে গোসল সেরে শাদীর আসরে এসে বসলো শাহজাদা সারকান। মেয়েরা দুই ভাগে বি’ভক্ত হয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে অ’ভিবাদন জানালো। কুমা’রী মেয়েরা নুজাৎকে অ’পরূপ সাজে সাজিয়ে নিয়ে এসে বাসর কক্ষ প্রদক্ষিণ করিয়ে সারকানের সামনে দাঁড় করাতে লাগলো। প্রতিবার নতুন নতুন সাজে সজ্জিত করে পরপর সাতবার নুজাৎকে এইভাবে বাসর কক্ষ প্রদক্ষিণ করানো হলো। শাদীর এই চিরাচরিত প্রথা। সপ্তপদী শেষ হলে নুজাৎকে আবার তারা পাশের ঘরে নিয়ে যায়। এবার রীতি অ’নুযায়ী তাকে বি’বস্ত্রা করা হয়। একজন বৃদ্ধ পরিচারিকা পাত্রীর সর্বাঙ্গ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখে। পাত্রীর দেহ পাত্রের সঙ্গে সহবাসের উপযুক্ত হয়েছে কিনা—পরীক্ষা করার একমা’ত্র উদ্দেশ্য তাই। বৃদ্ধা দেখলো পাত্রী একেবারে তৈরি। শুভেচ্ছা জানিয়ে সে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো।

সারকান এবার নুজাতের পাশে বসে। ভাবতেও পারে না, পাত্রী তার নিজেরই বোন। শাদীর প্রথম রাতেই নুজাৎ অ’ন্তঃসত্ত্বা হলো। মিলনের আনন্দে নুজাৎ সারকানের হৃদয় কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে।

সারকান তার একান্ত সচিবকে ডেকে বললো, বাগদাদে খলি’ফা উমর অ’ল নুমা’নকে চিঠি পাঠাতে হবে।

সচিব কাগজ কলম নিয়ে এলো। সারকান চিঠির বয়ান বলে যায় : আমি এক পরমা’ সুন্দরী গুণবতী বাঁদীকে কিনে মুক্ত করে দিয়েছি। এবং পরে তাকে শাদী করে আমা’র বেগম করে নিয়েছি। প্রথম রাতেই আপনার পুত্রবধু গৰ্ভবতী হয়েছে। আপনার আশীর্বাদ নেবার জন্য অ’তি শীঘ্র তাকে বাগদাদে পাঠাবো। সে তার ননদ নুজাৎ এবং দেবর দু-আল-মা’কানকেও দেখে আসবে।

একজন দ্রুতগামী অ’শ্বারোহীর হা’তে চিঠিখানা পাঠানো হলো। আটদিন পরে সে জবাব নিয়ে ফিরে আসে।

সুলতান উমর অ’ল নুমা’ন-এর চিঠির বক্তব্য মোটা’মুটি এইরকম :

প্ৰাণাধিক পুত্র সারকানের প্রতি শোক দুঃখ জর্জরিত হতভাগ্য পিতা উমর-আল-নুমা’নের পত্র।

শোন বাবা, তুমি এখান থেকে যাওয়ার পরে নানাভাবে আমা’র ভাগ্য বি’ড়ম্বি’ত হয়েছে। আমি আজ শোকে তাপে জর্জরিত। আমা’র প্রিয় পুত্র দু-আল-মা’কান এবং নয়নের মণি নুজাৎ আর প্রাসাদ নাই। কাজের তাগিদে বাগদাদ ছেড়ে যেতে হয়েছিলো আমা’কে। মা’সাধিককাল পরে অ’ষ্টম ফিরে এসে শুনলাম, তোমা’র ভাই মা’কান আর বোন নুজাৎ তীর্থযাত্রীদের দলে ভিড়ে মক্কায় চলে গেছে। মা’কান আমা’র কাছে বায়না ধরেছিলো, সে মক্কা যাবে। কিন্তু তার এই নাবালক বয়স-এই বয়সে কি কেউ তীর্থধর্ম করতে যায়? আমি তাকে অ’নেক বোঝাবার চেষ্টা’ করেছিলাম। এও বলেছিলাম, সামনের বারে আমি তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবো। কিন্তু সে-কথা তার মনঃপুত হয়নি। আমা’কে লুকিয়ে তার দিদির সঙ্গে সে পালি’য়ে চলে গেছে। সেই থেকে অ’নেক সন্ধান করেছি, মক্কায় লোক পাঠিয়েছি, কিন্তু কোন হদিস করতে পারিনি। শোকে দুঃখে। আমি বড় কাতর হয়ে পড়েছি। বি’শেষ আর কি লি’খি। আগামীতে তোমা’র কুশল জানাবে।

এর কিছুদিন পরে নুজাৎকে আসন্ন প্রসবা রেখেও সারকান বাগদাদে যেতে বাধ্য হয়। তার কারণ বাবার অ’সুস্থতা। বাবাকে দেখে সে যখন ফিরে আসে, নুজাৎ তার সাতদিন আগে একটি ফুটফুটে সুন্দর কন্যার জন্ম দিয়েছে।

নুজাৎ বললো, আজ সাতদিনের দিন মেয়ের নামকরণ করতে হয়।

সারকান মেয়েকে কোলে তুলে আদর করতে থাকে। মেয়ের গলার হা’রে একটা’ লকেটে তার চোখ আটকে যায়। একি। এতো সেই পাথর! সারকান চিৎকার করে ওঠে, তুমি এ পাথর পেলে কোথায়? এতো সেই তিন দৈব-পাথরের একখানা। হতভাগী ইরাবি’জা বাবাকে দিয়েছিলো? শিগগির বল বাঁদী, কোথায় পেলি’ তুই এ পাথর?

সারকানের মুখে এই ‘বাঁদী’ ডাক শুনে নুজাৎ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।–মুখ সামলে কথা বলে। আমি তোমা’র শাদী করা বেগম। বাদী বলতে লজ্জা করলো না? তুমি আমা’কে সওদাগরের কাছ থেকে পয়সা দিয়ে কিনেছিলে বলেই ভেবেছো আমি নাম গোত্রহীন একটা’ বেজন্মা’ মেয়েমা’নুষ। তবে শোনো, তুমি যেমন শাহজাদা, আমিও তেমনি শাহজাদী। এতদিন গোপন করে রেখেছিলাম, কিন্তু আজ আমা’র ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। আমা’র বাবা বাগদাদের উমর অ’ল-নুমা’ন। আমা’র আসল নাম নুজাৎ-আল-জামা’ন।

এক নিশ্বাসে এতগুলো কথা বলে নুজাৎ হা’ঁপাতে থাকে।

নুজাতের কথা শুনে সারকান নিশ্চল পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। একি নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহা’স। তার নিজের বোন তার অ’ঙ্কশায়িনী বেগম। ছিছিছি!লজায় মা’থা কাটা’ গেলো? হা’য় আল্লাহ, একি শাস্তি আমা’কে দিলে! জীবনে এমন কি পাপ আমি করেছি!

অ’নুতাপ অ’নুশোচনায় দগ্ধ হতে লাগলো তার হৃদয়। সারকানের এখনও বি’শ্বাস করতে ইচ্ছা! করে না, এই সেই নুজাৎ—উমর-আল-নুমা’নের কন্যা। সারকান ঠিক ঠিক শুনেছে তো?

নুজাৎও কাঁদতে  থাকে, হা’য় আল্লাহ, এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত কি দিয়ে হবে?

সারকান বলে, না জেনে যা করেছি। তার জন্যে আমরা কেন দায়ী হবো। যাই হোক, এখন যখন জানতে পারলাম, তোমা’র আমা’র এ সম্পর্ক আর থাকা উচিৎ না। আজই আমি আমা’র দরবারের এক পদস্থ সচিবের সঙ্গে তোমা’র শাদীর ব্যবস্থা করছি। আমি বললে সে না’ করতে পারবে না। আমা’দের মেয়েও তার কাছেই মা’নুষ হবে।

নুজাৎও সারকানের প্রস্তাবে সম্মতি জানায়। বলে, সেই ভালো, যত তাড়াতাডি হয় ব্যবস্থা কর।

সেইদিনই অ’নাড়ম্বরভাবে নুজাতের শাদী হয়ে গেলো এক উচ্চপদস্থ কর্মচারীর সঙ্গে। বাচ্চাটা’র দেখাশুনা করার জন্য সারকান আয় চাকরের ব্যবস্থা করে দিলো।

এর কয়েকদিন পরে বাগদাদ থেকে দূত এলো উমর-আল-নুমা’নের বার্তা নিয়ে। সুলতান উমর লি’খেছে, এখনও নুজাৎ-মা’কানের কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি। সন্তান শোকে সে মুহ্যমা’ন। কনসন্তানতিনোপল থেকে এক বুড়ি এসেছে। সঙ্গে এনেছে পাঁচটি পরমা’সুন্দরী যুবতী। বুড়ি বলেছে, শুধু রূপ নয় গুণেও নাকি তাদের জুড়ি মেলা ভার। নানা শাস্ত্ৰে সুপণ্ডিত, বি’দূষী। মেয়ে পাঁচটি উমরের কাছে সে বি’ক্রি করতে এসেছে। কিন্তু দাম হিসাবে নগদ অ’র্থ সে চায় না। এখানকার বাহা’রী জিনিসপত্রে দাম মিটিয়ে দিলেই সে খুশি হবে। বাগদাদের নামজাদা জিনিসপত্র সব জোগাড় করা হয়েছে। এখন সারকান যেন দামা’সকাসের নামজাদা সামা’নপত্ব পাঠিয়ে দেয় এখানে। সেই সঙ্গে তার সদ্য-বি’বাহিত বি’বি’কেও পাঠাবার নির্দেশ দিয়েছে সে। উমর শুনেছিলো, সারকানের স্ত্রী বি’দূষী। বুড়ির ঐ মেয়ে, পাঁচটিকে যাচাই করে নিতে গেলে পুত্রবধূকে নিতান্তই দরকার। তাই সারকান যেন আর বি’লম্ব না করে জিনিসপত্রের সঙ্গে তাকেও সত্বর পাঠিয়ে দেয়।

উমর-আল-নুমা’নের চিঠিখানা পড়ে সারকান চিন্তিত হয়। কি করা উচিৎ কিছুই ঠিক করতে পারে না। নুজাৎকে ডেকে পাঠায়। সে লেখাপড়া জানা বুদ্ধিমতী মেয়ে। তার সঙ্গে একবার পরামর্শ করা দরকার।

নুজাৎ এসে সব শুনে বলে, আমি আর কি বলবো, তুমিই এ ব্যাপারে ভালো বুঝবে। তবে আমা’র মনে হয়, আমা’কে বাগদাদে পাঠিয়ে দেওয়াই ভালো। গোড়া থেকে সব বৃত্তান্ত বাবাকে খুলে বলা দরকার। তুমি একটা’ চিঠিতে লি’খে দাও, কিভাবে আমি বাদাবী সর্দারের হা’তে গিয়ে পড়ি। তারপর সওদাগরের হা’ত ঘুরে তোমা’র হা’তেই বা কি করে এলাম, সব লি’খে দাও। তুমি আমা’কে না জেনে শাদী করেছিলে, তাও লি’খবো। শুধু লি’খবে না, তুমি আমা’র সঙ্গে সহবাস করেছো। আমা’র পরিচয় জানার পর তুমি তোমা’র দরবারের এক পদস্থ কর্মচারীর সঙ্গে আমা’র আবার শাদী করিয়ে দিয়েছ।

নুজাতের পরামর্শ সারকানের খুব পছন্দ হয়। দামা’সকাসের বাজার থেকে দামী দামী বাহা’রী বি’লাস সামগ্ৰী সংগ্রহ করে উটের পিঠে বোঝাই করা হলো। নুজাতের সঙ্গে বাগদাদে পাঠাবে। প্রতি বছরই বাগদাদে ভেট পাঠানো হয়। এবারে তার বহরটা’ কিছু বেশি। তার কারণ, স্বয়ং সুলতান নিজে থেকে খৎ পাঠিয়েছে। বাছাই করা দামী দামী জিনিসপত্র পাঠাতে হবে। পাঁচটি গ্ৰীক সুন্দরীর মূল্য হিসাবে এই সব বি’লাস সামগ্ৰী বুড়িকে দিতে হবে। একটা’ উটের পিঠে দোলা বাঁধা হলো। এই দোলায় চেপে যাবে নুজাৎ। আর বাকী উটগুলোর পিঠে বাঁধা-ছাঁদা হতে  লাগলো জিনিসপত্র। এই সব বাদশাহী ভেটের সামা’নপত্র দেখার জন্য শহরের কৌতূহলী মা’নুষ ভিড় করে এলো।

এই সময় দু-আল-মা’কান আর তার সঙ্গী সেই বৃদ্ধ শহরের নানা পথ ঘুরতে ঘুরতে সেখানে এসে দাঁড়ায়। একজন কর্মচারীকে জিজ্ঞেস করে। মা’কান জানতে পারে, এই সব লাট-বহর যাবে বাগদাদে। সুলতান উমর-আল-নুমা’নের ভেট। মা’কান-এর চোখ জলে ভরে আসে। বৃদ্ধকে বলে, সে-ও যাবে। এদের সঙ্গে। কতদিন হলো বাগদাদ ছেড়ে এসেছে সে। এদের পিছনে পিছনে গেলে একদিন সে বাগদাদে পৌঁছে যাবে। এ সুযোগ সে হা’রাতে চায় না। বৃদ্ধ বলে, মা’কানকে সে একা ছেড়ে দিতে পারে না। সে যদি একান্তই যেতে চায়, বৃদ্ধ তার সঙ্গে যাবে।

গাধাটা’র পিঠে মা’কানকে চাপিয়ে সে বলে, চলতে চলতে তোমা’র যখন কোমর ধরে যাবে, তখন না হয়, নেমে একটু হেঁটে যেও। হা’ত পায়ের আড় ভাঙ্গবে। আমি সেই সময় গাধার পিঠে চাপবো।

তিন দিন চলার পর যাত্রীদল এক শহরের মুখে এসে থামে। এইখানে বি’শ্রাম নেওয়া হবে। তিন দিন। পথের শ্রান্তি কাটিয়ে আবার তারা রওনা হবে। মা’কানও গাধার পিঠ থেকে নামে। বৃদ্ধ গাধাকে দানাপানি খাওয়ায়। নিজেরাও খানাপিনা সারে। একটা’ সরাইখানায় শোবার জায়গা করে নেয়। চাঁদনী রাত। দক্ষিণা হা’ওয়া বইছে। দু-আল-মা’কানের মন উদাস বাউল হয়ে ওঠে। গুণ গুণ করে গান ধরে। মা’কানের গলা বড় মিষ্টি।

ওপাশে নুজাৎরা তাঁবু গেড়েছে। তার সদ্য-বি’বাহিত স্বামী পাশে শুয়ে ঘুমুচ্ছে। অ’ন্য তাঁবুগুলোতে সরকারী কর্মচারী, চাকর নফর দাস দাসীরাও ঘুমিয়ে পড়েছে। পথশ্রমে ক্লান্ত উট, ঘোড়া, গাধা, খচ্চরগুলোও জিরিয়ে নিচ্ছে। শুধু জেগে আছে প্রহরীরা। আর জেগে আছে নুজাৎ। তার চোখে ঘুম আসে না। কতকাল পরে দেশে ফিরছে—অ’থচ একা। প্রাসাদ থেকে তারা দুই ভাইবোন একসঙ্গে পথে বেরিয়েছিলো। তারপর পথের মধ্যেই ভাইকে সে হা’রালো। এখন বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে কি করে? কি জবাবা-দিহি করবে। তার কাছে? কি সান্ত্বনা তাকে দেবে? এই নিদারুণ পুত্রশোক কি করে সহ্য করবেন। তিনি। নুজাতের দু’ গাল বেয়ে অ’শ্রুধারা নামে। হঠাৎ মিষ্টি একটা’ গানের কলি’ ভেসে আসে তার কানে। নির্জন নিশুতি রাত।

নুজাৎ পিছন হা’তড়াতে থাকে। এই গান, এই সুর, এই গলা-এ সবই তো তার চেনা চেনা। মা’কানের গলাও ঠিক এমনি মিষ্টি মধুর ছিলো। তার এই গানের সুর-হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়ে—এই সুরে এই গান সে প্রায়ই গাইতো। দ্বাররক্ষী খোজাকে ডেকে বলে, দেখ তো, কে গান গায়?

খোজা ভাবে, গানের চিৎকারে মা’লকিন ঘুমোতে পারছে না। একটা’ বেতের ছডি ঘোরাতে ঘোরাতে এগিয়ে যায়। এদিক ওদিক খুঁজতে থাকে। কিন্তু সরাইখানার সামনে সেই বৃদ্ধ ছাড়া আর কাউকেই চোখে পড়ে না। বৃদ্ধের কাছে এসে খোজা কড়া মেজাজে জিজ্ঞেস করে—একটু আগে এখানে গান গাইছিলো কে?

সুলতানের শমন। বৃদ্ধ শঙ্কিত হয়।–কই না, কেউ তো গায়নি বাবা।

খোজা চটে ওঠে, গায়নি মা’নে? আলবৎ গেয়েছে। আমি নিজে কানে শুনেছি। গায়নি। বললেই হলো? আর যদি কেউ না থাকে, তুমিই গেয়েছে।

বৃদ্ধ হা’ত জোড় করে।-বি’শ্বাস করো বাবা, খোজা, আমি বুড়ো হা’বড়া মা’নুষ। আল্লাহর নাম জপতপ করি। কিন্তু গলায় বোমা’ মা’রলেও সা বেরুবে না।

খোজা সন্দিগ্ধ চোখে বৃদ্ধের আপাদমস্তক দেখতে থাকে। হুম, লোকটা’ নেহা’ত মিথ্যে বলেনি। চেহা’রাচরিত্র দেখে অ’বশ্য মনে হয় না। গান-ফান জানে।

—যাই হোক শোনো, শেখ, আমা’দের মা’লকিন-এর ঘুমের ব্যাঘাত হচ্ছে। যেই গ’ক, গান বন্ধ করো। তা না হলে খুব খারাপ হবে বলে দিচ্ছি।

ছডি ঘোরাতে ঘোরাতে খোজটা’ আবার তাঁবুতে ফিরে যায়।

বৃদ্ধ ভয়ে কাঁপতে কাঁিপতে মা’কানের কাছে গিয়ে বলে, সব্বোনাশ হয়ে গেছে, বাবা।

মা’কান ধড়মড় করে বি’ছানায় উঠে বসে।–কি সৰ্ব্বনাশ হলো, বাপ জান? চোর ডাকাত নাকি?

—আরে না। সুলতানের তাবু থেকে পেয়াদা এসেছিলো।

–কেন?

–তোমা’র গান শুনে আমিরের বি’বি’ চটে গেছে। তার ঘুম নষ্ট হচ্ছে। তোমা’কে পাকড়াও করতে এসেছিলো। তা আমি ভাগিয়ে দিয়েছি। বলেছি, এখানে কে গান গাইবে? শোনো, বাবা, তুমি আর গান টা’ন করো না। না হলে আবার ব্যাটা’ তেড়ে আসবে।

—আসুক। দেখি কে কি করতে পারে! আমি আমা’র গান গাইবো। গান গাই না গাই আমা’র খুশি। আমিরের বি’বি’র ভয়ে আমি গান বন্ধ করবো? কেন?

বৃদ্ধ বলে, বি’দেশ বি’ভূঁই জায়গা। এই সময়ে একটা’ কিছু বি’পদ আপদ ঘটলে কে রক্ষা করবে?

—কেন মা’থা কেটে নেবে নাকি? আমা’র যত খুশি গাইবো। কারো মা’না শুনবো না।

বৃদ্ধ কাঁদো কাঁদো হয়ে দরজার সামনে গিয়ে বসে পড়ে।

মা’কান আবার গান ধরে

খোজা গিয়ে বলেছিলো, মা’লকিন, আশে পাশে কাউকেই দেখলাম না। মনে হচ্ছে পথচলতি কোন মা’নুষ গাইতে গাইতে চলে গেছে।

নুজাৎ ভেবেছিলো, হতেও পারে। তারই হয়তো মনের ভুল। মা’কানের কথাই সে অ’হরহ চিন্তা করছে। তাই হয়তো অ’ন্য কোনও লোকের গান শুনে মা’কানের গলা বলে ভুল হয়েছে। কিন্তু একটু পরে যখন আবার শুনতে পেলো সেই একই গান, নুজাৎ খোজাকে ডেকে বললো, তুমি বোধ হয় ভালো করে তলাশ করে দেখনি। ওই শোনো, আবার গাইছে সেই গান—আর দেরি করো না। যাও দেখে এসো, কে গায়। নিয়ে এসো তাকে।

বৃদ্ধ দেখলো, খোজটা’ আবার হন হন করে ছুটে আসছে। মা’কান তখন আবার গান থামিয়ে দিয়েছে। খোজটা’ কাছে এসে বাজখাই গলায় হুঙ্কার দেয়, এই না বললে, এখানে কেউ গাইছে না। এই তো একটু আগে আবার শুনলাম সেই গান।

–তুমি ভুল শুনেছো, পেয়াদা সাহেব। এই নিশুতি রাতে এখানে কে গান গাইবে!

খোজা ঝঙ্কার দিয়ে ওঠে, ভুল শুনেছি। ন্যাকামী পেয়েছে? চলো, তোমা’কেই ধরে নিয়ে যাবে।

–রক্ষা কর বাবা খোজা সাহেব, আমি কেন আমা’র চৌদ্দ পুরুষ কেউ গান জানে না।

—তাহলে যে গাইছে তাকে দেখিয়ে দাও।

—কে গাইছে, কাকে দেখিয়ে দেব? আমা’র মনে হচ্ছে কি জান? মরুভূমির মা’য়া।

—মরুভূমির মা’য়া। বৃদ্ধ বলে, হ্যাঁ মরুভূমির মা’য়া। রাত্ৰিবেলায় মরুভূমিতে কত বি’চিত্র কাণ্ডকারখানা ঘটে তা শোনোনি? কখনও মনে হয়, বাচ্চা ছেলে কাঁদছে। আবার কখনও শুনবে কেউ গান গাইছে। আবার অ’নেকে বলে এইরকম চাঁদনী রাতে নাকি মরুভূমির মা’টিতে নেমে আসে হুরী পরীর দল।

খোজাটা’ অ’বাক হয়ে শোনে। —তাহলে তুমি বলছে, এ-ও সেইরকম কিছু?

–আমা’র তো তাই মনে হয়।

খোজা ফিরে গিয়ে নুজাৎকে বলে, ও কিছু না, মা’লকিন, রেতের বেলা মরুভূমিতে এরকম অ’নেক কিছুই শোনা যায়। আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন।

কিন্তু নুজাতের ঘুম আর আসে না। বার বারা মা’কানের মুখ ভেসে ওঠে।

একটুখানি তন্দ্ৰা লেগে এসেছিলো। আবার সেই সুর কানে বাজতেই উঠে বসে নুজাৎ। খোজাটা’কে ডেকে বলে, তুমি আবার যাও। আমা’র বি’শ্বাস, এ কোনও মা’য়া নয়। নিশ্চয়ই কোন মা’নুষই গাইছে। যেমন করে পারো তাকে নিয়ে এসো আমা’র কাছে। এমনিতে না আসলে-এই নিয়ে যাও এক হা’জার মোহর। টা’কার লোভ দেখালে সে নিশ্চয়ই আসবে।

খোজার ভুল ভাঙ্গে। সে ভেবেছিলো মা’লকিনের ঘুম নষ্ট হচ্ছে বলে তাকে ধরে বেঁধে আনতে বলেছিলো। কিন্তু তা তো না। কিছুই বুঝতে পারে না সে। ভাবে—বড়লোকের খেয়াল।

খোজা এবার আর বেতের লাঠিটা’ সঙ্গে নেয় না। বৃদ্ধের কাছে এগিয়ে গিয়ে বলে, ওগো, বুড়ো বাপজান, তোমা’র দু’টো পায়ে পড়ি, আমা’কে বলে দাও, কে গান গাইছে। না হলে আমা’র নোকরী থাকবে না। মা’লকিন একবার শুধু তার সঙ্গে দু’টো কথা বলতে চায়, একটু চোখের দেখা দেখতে চায়। তার জন্যে যদি সে পয়সাকডি চায়, তাও দিতে পারি। কথা দিচ্ছি, কোন ভয় নাই। তার কোন ক্ষতি তিনি করবেন না।

বৃদ্ধ কিছুই বুঝতে পারে না। এ আবার কি নতুন চাল! এমন সময় মা’কান উঠে আসে দরজার সামনে।

-কী? ব্যাপার কী?

খোজা মা’কানের সুপুরুষ বলি’ষ্ঠ চেহা’রা দেখে সেলাম ঠুকে বলে, এখানে কে গান গাইছিলো, জনাব?

-কেন, আমি।

খোজা যেন হা’তে স্বৰ্গ পায়।-মেহেরবানী করে আপনি যদি একবার তীবুতে আসেন— কোনও ভয় নাই আপনার। আমা’র মা’লকিন শুধু একটিবার আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান!

মা’কান চটে ওঠে, কে তোমা’র মা’লকিন? আমা’র সঙ্গে তার কি দরকার? আমি কি তার কেনা বান্দা, সে ডাকলেই যেতে হবে!

খোজা বলে, আপনি গোসা করবেন না, হুজুর। আপনি কেন তার গোলাম। হতে যাবেন। আমা’র ওপর হুকুম হয়েছে, যে গান গাইছে তাকে যেভাবে পারি তার কাছে নিয়ে যেতে হবে। তার জন্যে টা’কা পয়সা দিতেও তিনি রাজি।

মা’কানের অ’বাক লাগে। এমন আজগুবি’ কথাও তো সে শোনেনি কখনও।। তার গান শুনে পর্দানসীন আমিরের বি’বি’ তার সঙ্গে আলাপ করতে চায়। আবার–বলে কিনা টা’কািপয়সা চাইলেও দিয়ে নিয়ে আসবে। মনে মনে অ’পমা’নিত বোধ Tািব: করলেও মুখে প্রকাশ করে না। একটা’ অ’দম্য কৌতূহল মা’থা চাড়া দিয়ে ওঠে। [লি’ দেখাই যাক না, কি ব্যাপার। বলে, চলে যাবো।

বৃদ্ধ শিউড়ে ওঠে।—সে কি বাবা! ওর কথা তুমি বি’শ্বাস করলে? তোমা’কে। ভুলি’য়ে ভালি’য়ে নিয়ে গিয়ে আটকে ফেলবে?

মা’কান একটা’ ঝাঝের সঙ্গে বলে, কেন, আটকাবে কেন, আমি কি কারো পাকা ধানে মই দিয়েছি নাকি?

খোজাটা’ দু’হা’ত জোড় করে বলে, না, হুজুর, কোনও ভয় করবেন না। আমি আল্লাহর নামে কসম খেয়ে বলছি, আপনার কোনও ক্ষতি হবে না।

মা’কান বলে, হয় হোক, আমি পরোয়া করি না। চলো, যাবো তোমা’র মা’লকিনের কাছে।

খোজা তীবুর ভিতরে ঢুকে নুজাৎকে জানায়, সে এসেছে।

নুজাৎ বলে, তাকে আবার সেই গানটা’ গাইতে বলে। আর তার নাম ধাম জিজ্ঞেস কর।

খোজা বাইরে এসে বলে, জনাব, আমা’র মা’লকিন আপনার গান শুনতে চাইছেন। আর জানতে চাইছেন, আপনার নাম কি, দেশ কোথায়?

মা’কান বলে, গান শোনাচ্ছি। কিন্তু নাম ধাম বলতে চাই না। ভাগ্যের ফেরে আজ আমি পথে পথে ঘুরি। নাম ঠিকানা হা’রিয়ে ফেলেছি।

এই বলে মা’কান আবার সেই গান ধরে :

গান শুনে নুজাৎ উন্মা’দের মতো ছুটে বেরিয়ে আসে। এতো মা’কান-তার প্রাণের ভাই ছাড়া আর কেউ নয়। মা’কানকে দেখে চিৎকার করে ওঠে নুজাৎ, মা’কান-মা’কান।

আর কিছু বলতে পারে না। অ’চৈতন্য হয়ে লুটিয়ে পড়ে।

ছুটে তাবুর বাইরে এসে ভাইকে দেখে নুজাৎ, মা’কান, মা’কান বলে, চিৎকার করেই অ’জ্ঞান হয়ে লুটিয়ে পড়ে।

দু-আল-মা’কান দেখে আমির-বি’বি’ আর কেউ না।–তার দিদি নুজাৎ। ছুটে গিয়ে নুজাৎকে টেনে তোলে। আনন্দে উত্তেজনায় মা’কানও আত্মহা’রা হয়ে পড়ে। দুই ভাইবোন-এর এই কান্নাকাটি দেখে খোজা ব্যাচারী ভাবাচেকা খেয়ে যায়। নুজাৎ মা’কানের সারা শরীরে হা’ত বুলি’য়ে আদর করতে থাকে।

সে রাতে তারা দুজনে কেউই ঘুমুলো না। মা’কান বলে, দিদি, তোমা’র কাহিনী শোনাও। সেই যে আমা’কে জেরুজালেমের সরাইখানায় রেখে তুমি কাজের ধান্দায় বেরুলে, তারপর থেকে তো আমি কিছু জানি না।

নুজাৎ বলে, আমিও তো তোমা’র কোন কিছু জানি না, ভাই। আগে আমা’র কাহিনী শোনো। তারপর তোমা’র কাহিনী শুনবো।

নুজাৎ আগাগোড়া সব বৃত্তান্ত খুলে বলে। মা’কানও বললো। তার কাহিনী। বললো, ঐ মেহেরবান বৃদ্ধের দয়াতেই সে তার প্রাণ ফিরে পেয়েছে।

মা’ঝ রাতে নুজাতের স্বামীর ঘুম ভেঙে যায়। এই গভীর রাতে তার তাবুর মধ্যে এক অ’চেনা যুবককে নুজাতের পাশে দেখে অ’বাক হয়।

নুজাৎ হা’সতে হা’সতে বলে, কী? ভাবছো এই রাতে আমি আবার কার সঙ্গে বসে কথা বলছি? এ তো তোমা’র বড় কুটুম, গো। আমা’র সহোদর ভাই দু-আল-মা’কান। সুলতান উমর-আল-নুমা’নের ছোট ছেলে।

এই প্রথম নুজাৎ তার স্বামীর কাছে আসল পরিচয় প্রকাশ করলো। স্বামী ব্যাচারী সুলতানের কর্মচারী। নুজাতের কথায় আকাশের চাঁদ হা’তে পায়। আরব অ’ধিপতি শাহেনশাহ উমর অ’ল-নুমা’নের সে জামা’তা। গর্বোবুক ভরে ওঠে। শ্বশুর নিশ্চয়ই কোন সুবাদার করে দেবে তাকে। চাকর নফরদের ডেকে হুকুম করলো, আর একটা’ তাঁবু খোটা’ও। আমা’র বড় কুটুমের আদর যত্নের যেন ত্রুটি না হয়।

নুজাৎ বলে, তার আর কি দরকার। আমরা কাল সকালেই তাবু উঠিয়ে বাগদাদে রওনা হয়ে যাবো। আজকের রাতটুকু ভাই আমা’র তাঁবুতেই থাক। এতকাল বাদে আমরা আবার মিলেছি, আজ সারা রাত দু’টো সুখ-দুঃখের কথা বলে কাটা’বো।

নুজাতের স্বামী বলে, সেই ভালো, তোমরা ভাই বোন প্রাণের কথা বলো! আমি অ’ন্য তাঁবুতে যাচ্ছি। আর মিঠাই মণ্ডা, ফলমূল, খানাপিনা পাঠিয়ে দিচ্ছি। ভাইকে আদর যত্ন করে খাওয়াও।

নুজাৎ তার স্বামীকে বললে, সকাল হলেই সেই বুদ্ধকে এখানে.নিয়ে আসবে। তার দয়াতেই ভাই আমা’র জানে বেঁচে আছে। তার জন্যে একটা’ ভালো দেখে ঘোড়া এনে দামী জীবন লাগাম দিয়ে সাজাও! বাকী পথ সে আর হেঁটে যাবে না।

নুজাতের স্বামীর হুকুমে তখনই খোজা আরও কয়েকজন নফর চাকর সঙ্গে নিয়ে বৃদ্ধের খোঁজে চলে গেলো। বৃদ্ধ তখন ভয়ে জড়সড় হয়ে গাধাটা’কে নিয়ে একটা’ গাছের তলায় বসে থর থর করে কাঁপছে। খোজাকে দলবল নিয়ে আসতে দেখে তার আত্মা’রাম খাঁচাছাড়া হবার দাখিল। ভাবলো, এবার আর রক্ষা নাই। নিশ্চয়ই ধরে নিয়ে গিয়ে শূলে চড়াবে।

খোজাটা’ দলবল নিয়ে বৃদ্ধের সামনে এগিয়ে এসে কপট হুঙ্কার দেয়, ওহেমিথ্যের জাসু, তুমি না বলেছিলে, কে গাইছে জানো না? সে তো বললো, সে তোমা’র সঙ্গের লোক চলো, তোমা’কে আর ছাড়া হবে না। মা’লকিনের হুকুম, তোমা’কে বাগদাদে নিয়ে গিয়ে সমুচিত সাজা দেওয়া হবে। তোমা’র সঙ্গীর সঙ্গে তোমা’কেও শূলে চাপানো হবে। বুঝেছে? এবার ওঠ, চলে আমা’দের সঙ্গে। বৃদ্ধ ভাবলো, নিয়তি এড়ানো যায় না। এইভাবে মৃ’ত্যু লেখা ছিলো নসীবে। মরতেই হবে। কাঁদতে কান্দতে খোজার সঙ্গে চললো।

নুজাতের স্বামী খোজাদের বললো, এই বৃদ্ধকে ঘোড়ায় চাপিয়ে বাগদাদে নিয়ে চলো। দেখবে তার যেন কোন অ’সুবি’ধে না হয়। সব সময় তোমরা তাকে ঘিরে থাকবে।

খোজা সেলাম ঠুকে বললে, যে হুকুম, জনাব।

চাকর নফররা বৃদ্ধিকে ঘিরে নিয়ে চলে। বৃদ্ধ ভাবে, বাগদাদে পৌঁছতে যে কটা’ দিন বাকী, তার পরেই তার জীবনটা’ শেষ হয়ে যাবে। খোজাকে উদ্দেশ করে বলে, শুনছো কাপ্তেন সাহেব, যে ছেলেটা’ গান গেয়েছিলো সে কিন্তু আমা’র কোন আত্মীয়স্বজন কিছু না। জেরুজালেমে আমি একটা’ পানি গরম করার চাকরী করতাম। একদিন দেখি আমা’র কাঠগুদামের পাশে ছেলেটিকে আধমরা অ’বস্থায় কে বা কারা ফেলে গেছে। আমি তাকে ঘরে নিয়ে গিয়ে আদর যত্ন করে বঁচিয়েছি। তারপর থেকে এই দেড়খানা বছর সে আমা’র কাছেই আছে। আমি যা খাই সে-ও তাই খায়। আমি যখন যেভাবে থাকি সে-ও সেইভাবে থাকে। এর বেশি তার সঙ্গে আমা’র কোনও সম্পর্ক নাই। তা তোমরা যদি তার সঙ্গে আমা’কে দোষী সাব্যস্ত করতে চাও, কর। কি আর বলবো, বলো।

খোজা মজা করে বলে, ওসব কোনও অ’জুহা’ত শুনতে চাই না বুড়ো বাবা। তোমরা দুজনেই আমা’র মা’লকিনের ঘুম নষ্ট করেছ। সাজা দু’জনকে সমা’ন পেতে হবে।

চলার পথে যখনই খানাপিনার জন্যে থামে খোজা ভালো ভালো খানাপিনা এনে দেয় বৃদ্ধকে। বলে, যে কাঁটা’ দিন বঁচো, প্ৰাণ ভরে ভালো মন্দ খেয়ে নাও। যা খেতে ইচ্ছে, বলে। এনে দিচ্ছি।

বৃদ্ধ বলে, সামনে খাড়া ঝুলি’য়ে মিঠাই মণ্ডা দিচ্ছ? এসব কি আর গলা দিয়ে নামবে?

খোজা বলে কী আর হবে, অ’ত ভেবে লাভ কি বলো? যতক্ষণ বেঁচে আছ, পিও, জীও।

কিন্তু এসব কোনও কথাই বৃদ্ধর ভালো লাগে না। নানারকম মনগড়া দুর্ভাবনায় মুষড়ে পড়ে সে।

এইভাবে বৃদ্ধের সঙ্গে মজা করতে করতে খোজারা পথে হা’ঁটা’র ক্লান্তি ভুলে যায়। চলতে চলতে একদিন তারা বাগদাদের কাছাকাছি এসে পৌঁছয়। সেখান থেকে বাগদাদ মা’ত্র আর একদিনের পথ। নুজাৎ-মা’কান চঞ্চল হয়ে ওঠে। কতদিন পরে তারা আবার দেশের মা’টিতে পা দেবে। মা’ বাবাকে দেখতে পাবে। আবার হা’সি আনন্দে ভরে উঠবে প্রাসাদ।

কিন্তু এমন সময় কালো আঁধার হয়ে এলো সামনের পথ। অ’শ্বখুরের শব্দে চকিত হয়ে উঠলো। সকলে। নুজাতের স্বামী হুকুম জারি করলো, যে যেখানে আছো, দাঁড়িয়ে পড়। আর এক পাও এগোবে না।

কয়েক মুহূর্ত কাটা’র পর দেখা গেলো, এই বি’শাল অ’শ্ববাহিনী তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। তাদের হা’তে সুলতানের পতাকা। ক্রমশ আরও নিকটবর্তী হলো তারা। কাড়া নাকাড়ার শব্দে মুখরিত হতে থাকলো আকাশ বাতাস।

সেনাবাহিনীর পাঁচজন প্রধান এগিয়ে এসে বাজ কণ্ঠে প্রশ্ন করে, কে তোমরা? কোথা থেকে আসছো? কোথায় যাবে?

নুজাতের স্বামী এগিয়ে এসে বলে, আমি দামা’সকাসের দরবারের সচিব। শাহজাদা সারকানের দূত হয়ে যাচ্ছি। তার বাবার কাছে—বাগদাদে। আমা’র সঙ্গে আছে। সুলতানের বাৎসরিক ভেট।

সেনাপতিরা দু’হা’তে মুখ ঢেকে কাঁদতে থাকে। নুজাতের স্বামী বুঝতে পারে কোনও গভীর দুঃসংবাদ আছে। অ’বাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।

সেনাপতিদের প্রধান এগিয়ে এসে বলে, সুলতান উমর-আল-নুমা’ন আর এ জগতে নাই। বি’ষক্রিয়ায় তার মৃ’ত্যু ঘটেছে। আপনি আমা’দের সঙ্গে আসুন। উজির দানদান আমা’দের সেনাবাহিনীর প্রধান। তিনি সঙ্গে এসেছেন। তার সঙ্গে কথা বলবেন, চলুন। তিনি আপনাকে বি’স্তারিত সব বলবেন।

উজির দানদান গভীর দুঃখ প্রকাশ করে বললো, সুলতান বি’ষক্রিয়ায় মা’রা গেছেন। কিভাবে বি’ষক্রিয়া হলো, সেসব কাহিনী আপনাকে পরে বলবো। এখন আমা’দের একমা’ত্র কর্তব্য বাগদাদের সুলতান নির্বাচন করা। আমি বাগদাদের চারজন কাজীর সঙ্গে পরামর্শ করেছি। তাদের মতে শাহজাদা সারকানকেই সিংহা’সনে বসানো উচিৎ। তাই আমি দলবল নিয়ে চলেছি দামা’সকাসে। তঁকে নিয়ে এসে সুলতান উমর-আল-নুমা’নের উত্তরাধিকারী হিসাবে বাগদাদের সিংহা’সনে বসােনই এখন আমা’র একমা’ত্র কাজ। অ’বশ্য বাগদাদের বেশিরভাগ মা’নুষেরই ইচ্ছা—দু-আল-মা’কানকে সিংহা’সনে বসানো হোক। কিন্তু সমস্যা দাঁড়িয়েছে—আজ প্রায় দেড় বৎসর কাল দু-আল-মা’কান তার ভগ্নি নুজাতের সঙ্গে মক্কায় চলে গেছে। সেই থেকে অ’নেক অ’নুসন্ধান করা হয়েছে। কিন্তু কোনই হদিশ করা যায়নি।

উজির দানদানের উক্তি শুনে, সুলতানের শোকসংবাদ শোনা সত্ত্বেও নুজাতের স্বামীর প্রাণ আনন্দে নেচে ওঠে। দেশের মা’নুষ যখন চায়, দু-আল-মা’কানের সুলতান হতে কে আর আটকায়। আর মা’কান যদি সুলতান হয় তারও বরাত খুলে যাবে।

নুজাতের স্বামী দানদানকে বলে, শ্বশুর মশায়ের মৃ’ত্যু-সংবাদ বুকে শেলের মতো হেনেছে। কিন্তু এই নিদারুণ শোকের মধ্যেও একটি সুখবর আপনাকে শোনাচ্ছি। নুজাৎ-আল-জামা’ন এবং দু-আল-মা’কানের সন্ধান পাওয়া গেছে। তারা দু’জনেই আমা’র দলবলের সঙ্গে বাগদাদে চলেছে। নুজাৎ আজ আমা’র বেগম।

দানদান বি’স্ময় বি’স্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকে। বি’শ্বাস করতে পারে না, মা’কান, নুজাৎ ফিরে চলেছে বাগদাদে। নুজাতের স্বামী আদ্যোপোন্ত সব কাহিনী দানাদানকে বললো। কিভাবে তারা দুজনে মক্কা মদিনা দেখে জেরুজালেমে আসে। মা’কানের অ’সুস্থত। অ’র্থাভাব। নুজাতের অ’র্থ ধান্দায় বেরুনো। বাদাবী ডাকাতের খপ্পরে পড়া। তারপর সওদাগরের হা’ত ঘুরে সারকানের হা’তে আসা। তারপর শাদী। সব খুলে বললো সে। এদিকে মা’কান কিভাবে এক বৃদ্ধের দয়ায় জীবনরক্ষা করতে পেরেছে সে কাহিনীও সবি’স্তারে তাকে জানালো।

দানদান রুদ্ধশ্বাসে শুনলো সব। আনন্দে চিৎকার করে ডাকলো সেনাপতিদের।

–আল্লাহর দেয়ায় আমরা আবার সুলতানের হা’রানো ছেলেমেয়েদের ফিরে পেয়েছি। আপনারা আসুন। সবাই মিলে ঠিক করুন, সুলতান কে হবে।

সেই মা’ঠের মধ্যেই তাবু ফেলা হলো। দানদান সভা ডাকলো। সেনাবাহিনীর সেনাপতিরা ছাড়াও দরবারের বি’শিষ্ট আমির ওমরাহরা তার সঙ্গে এসেছিলো। উদ্দেশ্য ছিলো, সারকানকে সুলতান পদে অ’ভিষিক্ত করে বাগদাদে নিয়ে আসবে কিন্তু পালের হা’ওয়া ঘুরে গেছে। দু-আল-মা’কান ফিরে এসেছে। এ অ’বস্থায় নতুন করে চিন্তা করা দরকার। নতুন করে আলোচনায় বসা দরকার। কাকে তারা সুলতান করতে চায়, আজকের সভায় তা ঠিক করতে হবে।

অ’নেক আলাপ আলোচনার পর আমির ওমরাহ সেনাপতি কাজী একমত হলো, সুলতানের ছোট ছেলে দু-আল-মা’কানকেই তারা বাগদাদের সিংহা’সনে বসাবে। ঠিক হলো, সুলতান বি’হীন সালতানিয়ৎ চলতে পারে না। আর বি’লম্ব না করে এই মা’ঠের মধ্যেই দু-আল-মা’কনের অ’ভিষেক হবে।

নুজাতের স্বামী ফিরে আসে তার স্ত্রী আর শ্যালক দু-আল-মা’কানের কাছে। বাবার মৃ’ত্যু ংবাদে নুজাৎ, মা’কান হা’উ মা’উ করে কাঁদতে থাকে। সেই—দেশে তারা ফিরছে, অ’থচ বাবাকে দেখতে পাবে না। এ ব্যথা তারা কোথায় রাখবে?

নুজাতের স্বামী মা’কানকে বললো, উজির আমির ওমরাহ কাজী সেনাপতি—সবাই মিলে একমত হয়েছে, তোমা’কেই তারা বাগদাদের সিংহা’সনে বসাবে। এ বি’ষয়ে তোমা’র কি অ’ভিমত?

দু-আল-মা’কান বলে, কিন্তু বড় ভাই থাকতে সেটা’ কি সঙ্গত হবে? তার মনে দুঃখ দিয়ে কিছু করতে চাই না।

ভগ্নিপতি পরামর্শ দেয়, এক কাজ কর। এখন যথারীতি অ’ভিষেক হয়ে যাক। তুমিই সুলতান হও। তারপর সারকানকে ডেকে সলতানিয়ৎকে দু’টো ভাগে ভাগ করে একটা’ অ’ংশ তুমি শাসন কর, আর একটা’ অ’ংশ। সারকানকে ছেড়ে দাও। এতে, আমা’র মনে হয় ভায়ে ভায়ে সম্প্রীতি বজায় থাকবে।

দু-আল-মা’কান বলে, ঠিক আছে, তাই হবে।

এরপর দু-আল-মা’কানকে বাদশাহী সাজে সাজানো হলো। উজির দানদান এই অ’ভিষেকের পোশাক-আশাক সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলো। মা’কানকে সুলতান বেশে সাজিয়ে অ’ভিষেক-তাঁবুতে নিয়ে যাওয়া হলো। সারা তাবুটা’ ফুলের মা’লায় সাজানো হয়েছিলো। সেনাবাহিনী জাতীয় সঙ্গীত বাজিয়ে চলেছে। একে একে আমির ওমরাহরা এসে তাঁবুর ভিতরে দরবার মহলে গিয়ে আসন গ্রহণ করলো। সব শেষে দু-আল-মা’কানকে এনে বসানো হলো সিংহা’সনে। উপস্থিত পরিষদরা উঠে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ জানাতে থাকলো। দু-আল-মা’কনের হা’তে সোনার তলোয়ার-অ’ভিষেকের সময় এই তলোয়ার বংশগত ভাবে উত্তরাধিকারীরা পেয়ে আসছে। আজ যেমন পেলে দু-আল-মা’কান। তলোয়ারখানা মা’থায় ঠেকিয়ে হলফনামা’ পড়তে হয়। দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন—এই তার একমা’ত্র ন্যায় ধর্ম।

এরপর একে একে আমির ওমরাহরা সামনে এসে আভূমি আনত হয়ে কুর্নিশ জানিয়ে হলফ করলো, আজ থেকে আপনি আমা’দের মহা’মা’ন্য সুলতান। আপনার আদেশ শিরোধার্য করে নেবো।

এই সময়ে রাত্রি প্রভাত হয়ে আসে। শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে থাকে।

অ’ভিষেক শেষে নুজাতের স্বামী এক ভোজসভার আয়োজন করলো। দামা’সকাস থেকে যে সব খানাপিনা সঙ্গে এসেছিলো সেনাদের মধ্যে সব বি’তরণ করে দেওয়া হলো।

সুলতান দু-আল-মা’কান আমির ওমরাহদের সঙ্গে বসে খানাপিনা সারলো। উজির দানাদানকে নুজাৎ জিজ্ঞেস করে, কিভাবে আব্বাজানের মৃ’ত্যু হলো, তার বি’স্তারিত বি’বরণ শুনতে ইচ্ছে করে।

উজির দানদান বলে, নিশ্চয়ই বলবো, মা’। এই ভোজ সভাতেই সে কাহিনী শোনাবো সকলকে।

দানদান বলতে শুরু করে :

তোমরা চলে যাওয়ার পর অ’নেক খোঁজাখুঁজি করা হলো। মক্কা-মদিনী চষে বেড়ালাম। কিন্তু কেউই বলতে পারলো না, তোমরা কোন পথে গেছে। যাই হোক, তোমা’দের শোকে তাপে সুলতান মুহ্যমা’ন হয়ে প্রাসাদে থাকেন। কারো সঙ্গে বড় একটা’ দেখা-সাক্ষাৎ করেন না। নেহা’ৎ জরুরী কাজ না থাকলে দরবারেও নিয়মিত বসেন না। সুলতানের মনোবেদনা বুঝতে পেরে আমরাও তাকে ছোটখাটো কাজে বি’ব্রত করতাম না। এই সময় একদিন এক বৃদ্ধা রমণী এলো। সঙ্গে তার পাঁচটি অ’পরূপ সুন্দরী স্বাস্থ্যবতী তরুণী। সুলতানের দর্শনপ্রার্থী হয়ে আমা’কে বললো, কনস্তানতিনোপল থেকে সে এসেছে। সুলতানের জন্যে এই পাঁচটি খুবসুরৎ মেয়ে নিয়ে এসেছে। শুধু রূপেই তারা দুনিয়ার সেরা নয়। তাদের তুল্য সর্বগুণান্বি’তা মেয়ে তামা’মদুনিয়ার আর কোথাও পাওয়া যাবে না।

সুলতানকে জানালাম। তিনি বৃদ্ধাকে ডেকে পাঠালেন। মেয়ে পাঁচটিকে দেখলেন। সত্যি কথা বলতে কি, গুণ কতটা’ আছে তখনও আমরা জানি না, অ’মন রূপসী রমণী আমি কখনও দেখিনি। স্বয়ং সুলতানও তারিফ করলেন। হ্যাঁ, সুন্দরী বটে।

বৃদ্ধ বললেন, জাঁহা’পনা, আপনি ওদের যাচাই করে দেখুন। দুনিয়াতে এমন কোনও বি’দ্যা, এমন কোনও শাস্ত্ব নাই—যা তাদের অ’জানা। আচার আচরণ আদব কায়দায় দস্তুর মতো শাহী।

সুলতান সহা’স্যে মেয়েদের দিকে তাকালেন, কি গো মেয়েরা, তোমা’দের কত্রী যা বলছে সব ঠিক-?

মেয়েগুলো অ’ভিবাদন জানিয়ে ঘাড় নাড়ে-সব ঠিক।

এখন সুলতান বললেন, ঠিক আছে, কি বি’দ্যা শিখেছে, তার কিছু নমুনা দেখাও।

একটি মেয়ে এগিয়ে এসে বাদশাহী ঢং-এ কুর্নিশ জানিয়ে বলতে শুরু করে।

শুনুন, জাঁহা’পনা মা’নুষ বেঁচে থাকে কেন? সে নিজের ওপর প্রভুত্ব দেখিয়ে যেতে চায়। এই বাসনা তার অ’ন্তরে অ’ঙ্কুরিত থাকে বলেই সে আল্লাহর দোয়ায় বেঁচে থাকতে চায়। বড় হতে চায়। নাম যশের অ’ধিকারী হতে চায়।

আল্লাহ মা’নুষকে জীবন দান করে সংসারে পাঠান কেন? কারণ সে তার নিজেকে-সঙ্গে সঙ্গে অ’পরকেও সুন্দর করে গড়ে তুলবে—এই তার ইচ্ছা!

সুলতানই প্রথম পুরুষ। তার পুণ্যতেই প্রজারা পুণ্যবান হয়। তার সুখেই সুখী হয়। তাঁর দুঃখেই তারা দুঃখ পায়। সংস্কৃতিবান জ্ঞানী ব্যক্তিরা বি’নয়ী, মিতভাষী এবং ন্যায়পরায়ণ হয়ে থাকেন। প্রকৃত বন্ধুকে চিনে নিতে পারেন। শক্ব সম্পর্কে সতর্ক থাকেন। বন্ধুর জন্য প্রাণ উৎসর্গ করতে দ্বি’ধা করেন না। কারণ তিনি জানেন, দুনিয়াতে সব কিছুই সুলভ। একমা’ত্র প্রকৃত বন্ধুত্ব পাওয়াই সঙ্গে বি’বাহিত বি’বি’র তুলনা চলে না। কারণ প্রয়োজন বোধে এক বি’বি’ তালাক দিয়ে অ’ন্য বি’বি’ ঘরে আনা যায়। কিন্তু বন্ধুর সঙ্গে বি’চ্ছেদ ঘটলে নতুন বন্ধু খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। বন্ধুত্বে একবার চিড় খেলে তার আর জোড়া দেওয়া যায় না।

পীর পয়গম্বরদের একটা’ বাণী শোনাচ্ছিঃ এক কাজী ধনী-দরিদ্র ভেদাভেদ করতেন না। তার চোখে সবাই সমা’ন ছিলো। নিরপেক্ষ বি’চার করে উচিত রায় দিতেন। তিনি সব সময়ই চেষ্টা’ করতেন। দুইপক্ষের সমঝোতা করিয়ে দিতে। এতে শান্তি অ’ব্যাহত থাকে। যেখানে তা সম্ভব হতো না, নানা দৃষ্টিকোণ থেকে তার সমস্ত দিক পর্যালোচনা করে দেখতেন, নানা সাক্ষী প্রমা’ণে নিঃসন্দেহ হতেন, তারপর রায় দিতেন। কিন্তু মনের কোণে বি’ন্দুমা’ত্র দ্বি’ধা বা সন্দেহ থাকলে রায়দান স্থগিত রেখে পুনরায় তা খতিয়ে দেখতেন। ন্যায় বি’চার মা’নুষের প্রথম এবং প্রধান কর্তব্য। অ’ত্যাচার করে ভয় দেখিয়ে বা ক্ষুধার্ত রেখে কাউকে দিয়ে কিছু স্বীকার করিয়ে নেওয়া কোনও বি’চারকের কর্তব্য নয়। এর দ্বারা সুবি’চার সম্ভব হয় না। অ’নেক সময়ই মা’নুষ অ’ত্যাচারের ভয়ে বা ক্ষুধার তাড়নায় মিথ্যাকেই সত্য বলে স্বীকার করতে বাধ্য হয়।

সম্রাট আলেকজান্দার দেশ বি’জয়ের সময় তিনজনকে সব সময় সঙ্গে সঙ্গে রাখতেন। একজন বি’চক্ষণ বি’চারক, একজন ভালো পাচক আর একজন শিক্ষক। তিনি বলতেন, অ’পরাধী সেনার বি’চারের দায়িত্ব তিনি নিজে নিতে চান না। কারণ ক্রোধের বশবর্তী হয়ে লঘু অ’পরাধে গুরু দণ্ড দিতে পারি। এর পরিণাম ভয়াবহ। সেই কারণে, নিরপেক্ষভাবে বি’চার করার জন্য বি’চক্ষণ বি’চারক অ’পরিহা’র্য। আর ভালো পাচকের দরকার এই জন্য।-সে। আমা’র স্বাস্থ্যের প্রতি সতর্ক নজর রাখবে। আমা’র খাওয়াদাওয়ার দায়িত্ব আমা’র উপর থাকলে বেশিরভাগ দিন অ’নাহা’রেই কেটে যেত। শিক্ষকও নিতান্তই প্রয়োজনীয়। পুত্র কন্যার লেখাপড়া একটা’ প্রধান ব্যাপার। তার জন্যে চাই যোগ্য শিক্ষক। ভালো শিক্ষক ছাড়া ছেলেমেয়েকে উপযুক্ত করে মা’নুষ করা কঠিন। শিশুরাই আমা’দের ভবি’ষ্যৎ। সেই ভবি’ষ্যতের বুনিয়াদ মজবুৎ করতে হলে চাই ভালো শিক্ষক।

এই বলে মেয়েটি নাকাবে মুখ ঢেকে কুর্নিশ জানিয়ে পিছনে সরে যায়। এর পর আর একটি মেয়ে এগিয়ে এসে যথারীতি অ’ভিবাদন জানিয়ে বলতে থাকে :

শুনুন জাঁহা’পনা, লুকমা’ন নামে এক দার্শনিক বলেছেন, বি’শ্ব সংসারে তিনটি প্রধান সত্য পরীক্ষা করার তিনটি চমৎকার কষ্ঠিপাথর আছে! (১) কোন মা’নুষ কতটা’ সৎ এবং মহৎ তার একমা’ত্র প্রমা’ণ পাওয়া যেতে পারে তার ক্রোধের সময়। ক্ৰোধ মা’নুষের প্রকৃত চেহা’রা খুলে ধরে। (২) মুখে যে বাঘ মা’রে তাকে বি’শ্বাস করার প্রয়োজন নাই। প্রকৃত বীরের পরিচয় শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই মিলতে পারে। (৩) কে তোমা’র প্রকৃত বন্ধু কি করে তা বুঝবে? অ’ত্যন্ত বি’পদের দিনে যে পাশে এসে দাঁড়ায়-সেই একমা’ত্র বন্ধু।

স্তাবকদের স্তুতি ব্যঞ্জনা সত্ত্বেও উদ্ধত অ’ত্যাচারী শাসক তার সমুচিত শিক্ষা পায়। এবং অ’ত্যাচারিত একদিন তার সুবি’চার পাবেই। যে যেমন কর্ম করে তাকে সেইরূপ ফল দান করাই সুশাসনের কর্তব্য। কে কি কাজে ফেসে গেলো। তাই দিয়ে তার বি’চার করা উচিৎ নয়। তার প্রকৃত মতলবটো জানার চেষ্টা’ করা বি’ধেয়। মা’নুষের দেহে হৃদয় নামক বস্তুটা’ই সর্বশ্রেষ্ঠ অ’ংশ। একটা’ মা’নুষ খারাপ—তার কারণ তার হৃদয়টা’ খারাপ। এবং এই কারণেই সে মনুষ্য পদবাচ্য হতে পারে না।

ইজরায়েলে এক পরিবারে দুই ভাই ছিলো। এক ভাই অ’ন্য ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিলো, আচ্ছা দাদা, এ যাবৎ যত কাজ তুমি করেছে বা দেখেছে তার মধ্যে সবচেয়ে কঠিন কাজ কি মনে হয়েছে?

দাদা জবাব দেয়, একদিন মুরগীর ঘরের কাছ দিয়ে যেতে একটা’ জাপটে ধরি। দেখলাম, তার মা’থাটা’ বৌ করে এক পাক ঘুরিয়ে নিয়ে এসে আমা’র দিকে তাকালো। তারপর আবার সে উল্টো পাকে পাক ঘুরিয়ে মা’থাটা’ সোজা করলো। আমি অ’বাক হলাম। একটা’ মুরগী অ’নায়াসে যা পারলো আমি মা’নুষ হয়ে শত চেষ্টা’ করেও তা করতে পারবো না। এবার বলে তোমা’র কাছে সব চেয়ে কঠিন কাজ কী মনে হয়েছে।

ছোট ভাই বললো, আমি একদিন ভাবলাম আল্লাহর কাছে কিছু চাইবো। নামা’জের সময় আল্লাহকে ডাকলাম কিন্তু কিছুতেই আর কিছু চাইতে পারলাম না।

এই বলে দ্বি’তীয় মেয়েটি বি’দায় নিলে আর একটি মেয়ে এসে দাঁড়ালো।

আজ আমি সংক্ষেপে দুটি মা’ত্র নীতিকথার উল্লেখ করে বি’দায় নেবো।–মা’নুষের আত্মা’ যদি পরিশুদ্ধ থাকে, তবে সে বেহেস্তের দরজায় পৌঁছতে পারে।

সুফিয়া বলেছেন : মা’নুষের মুখ তার অ’ন্তরের আয়না।

এর পর চতুর্থ কন্যা আসে।

–শেখ ইব্রাহিম একটি গল্প বলেছিলেন, একদিন এক ভিখারী তার ভিক্ষে করে পাওয়া একটি তামা’র পয়সা রাস্তায় হা’রিয়ে ফেলে। আমি তাকে একটা’ রূপের টা’কা দিতে পোব। গেলাম। কিন্তু সে নিলো না। বললো, তামা’র পয়সা হা’রিয়েছি, রূপের টা’কা লগবা কি করবো আমি? পয়সাটা’ আমি নির্বি’বাদে খরচা করে দিতে পারি। কিন্তু টা’কা হা’ত ঈসে গেলে প্রাণে ধরে ভাঙ্গাতে পারবো না।

মনসুর ইবন উমর এই কাহিনীটা’ বলেছিলেন :

আমি একবার মক্কায় হজ করতে যাচ্ছিলাম। অ’ন্ধকার রাত্রি। কুফা শহরের જે পথ দিয়ে হেঁটে চলেছি। এমন সময় কিছুটা’ দূরে একটি লোকের উচ্চকিত কণ্ঠ শুনতে পেলাম। সে বলছে, হে খোদা, আমি তোমা’র গোলাম। তোমা’র বাণী অ’গ্রাহ্য করবো—ক্ষমতা আমা’র নাই। কিন্তু কর্মদোষে আজ আমি পাপী। কিন্তু মনে প্রাণে এই পাপ আমি চাইনি। তোমা’র নির্দেশ আমি মা’থা পেতে নেবো। তুমি আমা’কে পাপমুক্ত করো।

এই প্রার্থনা জানাবার একটু পরে একটা’ প্রচণ্ড শব্দ করে কি যেন একটা’ নিচে পড়ে গেলো। অ’ন্ধকার রাত। কিছুই ঠাওর করতে পারলাম না। আমি অ’নেক ডাকাডাকি করলাম। কিন্তু কেউ সাড়া দিলো না। আমি আমা’র ডেরায় চলে গেলাম। পরদিন সকালে দেখি একটা’ শবদেহ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে গোরস্তানে। মিছিলে এক শোকাহত অ’শীতিপরা বৃদ্ধাকে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, কে মা’রা গেছে? বৃদ্ধ বললো, গতকাল আমা’র ছেলে নামা’জের পর উপস্থিত সবাইকে আল্লাহর বাণী পড়ে শুনিয়েছিলো। তার এক জায়গায় ছিলো, ‘শোনো, তোমরা যারা আমা’র কথা বি’শ্বাস কর, মা’ন, তাদের প্রতি আমা’র নির্দেশ নিজের নিজের হৃদয় উন্মুক্ত কর।’

পবি’ত্র গ্রন্থের এই বাণী শোনার সঙ্গে সঙ্গে একজন পথচারী নিজের বুকে ছুরি বসিয়ে দিয়ে কলি’জাটা’ টেনে বের করে ফেললো।

এর পর শেষ মেয়েটি এসে দাঁড়ালো।

–এক দার্শনিক বলেছেন, যে মা’নুষ তার প্রতিবেশীর সুখ দুঃখের খবর রাখে না সে আল্লাহর করুণাও প্রত্যাশা করতে পারে না। একজন প্রতিবেশীর কাছে যত ঋণ জমা’ হয় নিজের ভাই-এর কাছেও তা হয় না।

একদিন ইবন আদহা’ম মক্কা থেকে ফেরার পথে তার এক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি কিরকম জীবনযাপন করতে ভালোবাসেন?

বন্ধুর জবাব, আমি স্বল্পাহা’রী মা’নুষ, যেদিন জোটে খাই। যেদিন না জোটে প্রত্যাশা করে বসে থাকি। যদি জোটে খাবো, না হলে খাবো না।

ইবন আদম ঠোঁটকোটা’ মা’নুষ। বলেছিলাম, বাখ-এর কুকুরগুলোও কিন্তু তাই করে। আমা’র কথা বলো, আল্লাহ যেদিন জুটিয়ে দেন। আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। তাঁর গুণগানে পঞ্চমুখ হই। আর যেদিন তিনি বঞ্চিত করেন, সেদিন শুধু তাকে ধন্যবাদ জানাই।

এরপর সে বি’দায় নিয়ে সরে যায়। এবার এগিয়ে আসে তাদের কত্রী-সেই বৃদ্ধা। সুলতানকে অ’ভিবাদন জানিয়ে বলে, ইমা’ম আল সফি বলেছেন : একটা’ রাত্রিকে তিনটি ভাগে বি’ভক্ত করা যায়। প্রথম ভাগে অ’ধ্যয়ন দ্বি’তীয় ভাগে নিদ্রা এবং তৃতীয় ভাগে প্রার্থনার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। জীবনের সায়াহ্নে সারারাতই তিনি জেগে কাটা’তেন।

ইমা’ম আর এক সময় বলেছেন, আমি বি’গত দশ বছর নামমা’ত্র যবের রুটি খেয়ে জীবনধারণ করে আছি। অ’তিরিক্ত আহা’রে দেহ ভারাক্রান্ত হয়। বুদ্ধি ভোঁতা হয়ে আসে। ঘুমে এবং অ’বসাদে শরীর নেতিয়ে পড়ে। সব উৎসাহ উদ্দীপনা নিভে যায়।

ইবন ফুয়াদ বলেছিলেন, একদিন আমি নামা’জের জন্য রুজু করবো বলে নদীর ধারে ছুটে চলেছি। এক সাদা দাড়িগোঁফ ওয়ালা বৃদ্ধ পিছন থেকে বলে উঠলেন, নিষ্ঠা নিয়ে রুজু কর বাপু, অ’ত তাড়াহুড়া করছে কেন? নিষ্ঠাবান না হলে নামা’জ পড়ে কোন ফল পাবে না।

দেখলাম বৃদ্ধ এসে জলে নামলেন। পরিপাটি করে হা’ত মুখ প্রক্ষালন করলেন। তারপর উঠে মসজিদের দিকে রওনা হলেন। আমি তাকে অ’নুসরণ করে চলতে থাকলাম। এক সময় তিনি পিছনে ফিরে আমা’কে জিজ্ঞেস করলেন, কিছু বলবে?

আমি বলি’, মেহেরবানী করে আমা’কে যদি বাৎলে দেন, কিভাবে চললে, আল্লাহকে জানতে পারবো।

তিনি বললেন, আগে নিজেকে জানার চেষ্টা’ কর। যখন নিজেকে জানা সম্পূর্ণ হবে তখন আপন থেকেই তাকে জানতে পারবে।

খলি’ফা আবু জাফর অ’ল মনসুর ঘোষণা করলেন, আবু হা’নিফকে তিনি বাৎসরিক দশ হা’জার দিরহা’ম দক্ষিণা দিয়ে দেশের প্রধান বি’চারপতি নিযুক্ত করলেন। পরদিন সকালে সুলতানের দরবার থেকে অ’র্থসচিবকে পাঠানো হলো, আবু হা’নিফার গৃহে। অ’নাড়ম্বর সাদা মা’ঠ সাজপোশাকে সজ্জিত হা’নিফ বেরিয়ে এলেন। অ’র্থসচিব সবি’নয়ে দশ হা’জার দিরহা’মের তোড়াটা’ তার সামনে রেখে সুলতানের ফরমা’ন জানালো, তিনি এই দশ হা’জার দিরহা’ম আপনাকে এক বৎসরের বেতন হিসাবে অ’গ্রিম পাঠিয়েছেন। এবং বলে দিয়েছেন, এ অ’র্থ কোনও অ’সদুপায়ে অ’র্জিত নয়। হা’নিফ সাহেব যেন গ্রহণ করেন।

আবু হা’নিফা অ’র্থসচিবকে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, তোমা’র সুলতানকে গিয়ে বলো, টা’কাটা’ হয়তো সৎ উপায়ে অ’র্জিত-কিন্তু তোমা’র সুলতান নিজেই তো অ’সৎ, উদ্ধত, অ’ত্যাচারী। এরকম লোকের দাসত্ব করা আমা’র পক্ষে সম্ভব নয়।

এরপর বৃদ্ধ বললো, আজ অ’নেক রাত হয়ে গেছে। এখনকার মতো বি’দায় নিতে চাই। সুলতান যদি ইচ্ছা করেন, পরে আবার শোনাবো।

এই সময় একটুক্ষণের জন্য দানদান থামে। দু-আল-মা’কান আর নুজাৎ অ’ধীর আগ্রহেই শুনছিলো। মা’কান জিজ্ঞেস করে, তারপর?

উজির আবার বলতে থাকে : বৃদ্ধ আর তার পঞ্চকন্যার গুণে মুগ্ধ হয়ে সুলতান উমর উচ্ছসিত প্রশংসা করলেন। এমন সারগর্ভ নীতি কথা তিনি বহুকাল শোনেননি। উজিরকে বললেন, প্রাসাদে যে মহলে ইরবি’জা থাকতো সেখানে এদের থাকার ব্যবস্থা করো। দেখবে, যেন আদর যত্নে কোনও ত্রুটি না হয়।

সুলতান প্রতিদিন নিজে এসে বৃদ্ধ আর পঞ্চকন্যার খোঁজখবর নিতে থাকলেন। আদর আপ্যায়নের কোনও ত্রুটি হচ্ছে কিনা জানতে চাইলেন। আমরা অ’বশ্য তাদের কোনও অ’ভাবই রাখিনি। আতিথেয়তার সব রকম বন্দোবস্তই নিখুঁতভাবে করা হয়েছিলো। বৃদ্ধ সারাদিন কোনও রকম আহা’র করতো না। শুধু রাত্ৰিবেলায় সামা’ন্য একটু রুটি আর সরবৎ খেয়ে কাটিয়ে দিত। সারাদিন তার উপাসনার মধ্য দিয়ে কাটত। বৃদ্ধার এই কৃচ্ছসাধন দেখে সুলতান আরও মুগ্ধ হয়ে পড়েন। তার প্রাসাদ পবি’ত্র তীর্থক্ষেত্র হয়ে উঠছে-এই ভেবে তিনি পুলকিত হতে থাকেন। এইভাবে দশটা’ দিন কেটে গেলো। সুলতান আমা’কে বললেন, এবার আসল কথাবার্তা হওয়া দরকার। বৃদ্ধাকে জিজ্ঞেস কর, কি দাম সে নেবে।

বৃদ্ধ বললো, সোনাদানা যাই দিতে চান, কিছু নেবে না। তা সে যদি এক দিকে মেয়ে আর দিকে হীরে জহরৎ দিয়েও ওজন করে দিতে চান–আমি নেবো না।

—আমি শুধু একটা’ শর্তেই আপনার কাছে বি’ক্রি করতে পারি।

–কী শর্ত?

বৃদ্ধা বললো, দীর্ঘ এক মা’সকাল ধরে আপনি উপবাস করবেন। এই উপবাসকালে একমা’ত্র আল্লাহর উপাসনা ছাড়া মনে কোনও কামনা বাসনার প্রশ্রয় দেবেন না। এর ফলে আপনার দেহ মন কলুষমুক্ত পবি’ত্র হয়ে উঠবে। তারপর আপনি মেয়েদের গ্রহণ করবেন। তার আগে নয়। আমা’র এই শর্ত যদি পূরণ করতে পারেন, নগদ মূল্য হিসাবে কিছুই নেবো না। সে ক্ষেত্রে আপনার দেশের যা নাম করা জিনিস তার কিছু আমা’কে উপহা’র দিতে পারেন।

বৃদ্ধার এই অ’ভূতপূর্ব প্রস্তাব শুনে সুলতানের শ্রদ্ধা আরও বেড়ে যায়। তখুনি সম্মতি দেন, আমি রাজি।

বৃদ্ধ বললো, আমিও প্রার্থনাদি করে আপনার উপবাসের সুফল পেতে সাহা’য্য করবো। এখন তামা’র ঝারি করে এক ঝারি পানি আনতে বলুন।

সঙ্গে সঙ্গে একটা’ তামা’র ঝারি পূর্ণ করে জল নিয়ে আসা হলো। ঝারিটা’ হা’তে নিয়ে বৃদ্ধ বি’ড় বি’ড় করে কি সব মন্ত্র পড়লো। তারপর এক টুকরো পাতলা কাপড় দিয়ে মুখটা’ বেঁধে দিয়ে বললো, উপবাসের দশদিন পরে এই পাত্রের জল পান করবেন। এতে আপনার শরীরের দুর্বলতা কেটে যাবে। ক্ষয় পূরণ হবে। আজ আমি বি’দায় নিচ্ছি। ঠিক এগারো দিনের দিন আবার ফিরে আসবো।

এই বলে বৃদ্ধ কুর্নিশ করে বি’দায় নিলে। জলের ঝারিটা’ সুলতান নিজে হা’তে সিন্দুকে বন্ধ করে চাবি’টা’ তার শেরওয়ানীর জেবে রেখে দিলেন।

সেই দিন থেকেই উপবাস শুরু হলো। তখন তার একটা’ই লক্ষ্য, বৃদ্ধার কথামতো দেহ-মন পবি’ত্র করতে হবে। তা হলেই সে ঐ পরমা’ সুন্দরী কুমা’রী তনয়াদের অ’ঙ্কশায়িনী করার অ’ধিকার পাবে।

এগারো দিনের দিন সকালবেলা পিপাসার্ত সুলতান এক নিঃশ্বাসে ঝারির জলটুকু সব পান করলেন। দশ দিনের অ’নাহা’রে দেহ নেতিয়ে পড়েছিলো। পিপাসায় ছাতি ফেটে যাচ্ছিলো। জলটুকু পেটে পড়ায় ক্ষুধার তীব্রতা স্বভাবতই একটু কমে আসে। অ’বসাদও খানিকটা’ কেটে যায়। সুলতান ভাবলেন বৃদ্ধার কথা তো অ’ক্ষরে অ’ক্ষরে ফলে গেলো। এই মন্ত্রপুত জলে নিশ্চয়ই সে এমন কোন দৈবশক্তি রেখে গেছে যার দৌলতে তিনি মুহূর্তেই অ’বসাদ কাটা’তে পারলেন।

জল পান করা শেষ হওয়ার একটুক্ষণ পরে কড়ানাড়ার শব্দ শুনে সুলতান দরজা খুলে দেন। ঘরে ঢুকলো বৃদ্ধা। হা’তে তার কলার পাতায় মোড়া একটা’ মোড়ক। বললো, আপনার উপবাসের একুশ দিনের দিন এই মোড়ক খুলবেন। এতে খানিকটা’ আচার আছে। সেই দিন আপনি খাবেন।

সুলতান বৃদ্ধাকে সাদরে বসালেন। সশ্রদ্ধভাবে কলাপাতার মোড়কটা’ নিয়ে সিন্দুকে চাবি’ দিয়ে রাখলেন।

একুশ দিনের দিন সুলতান আচারটুকু বের করে খেলেন। একটু পরে সেই বৃদ্ধ এসে কড়া নাড়লো। সুলতান রুদ্ধদ্বার খুলে স্বাগত জানালেন। বৃদ্ধ বললো, আমা’র ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। কি শর্তে আপনার হা’তে তাদের কন্যাদের তুলে দেব—জানিয়েছি। এবং আপনি যে আমা’র শর্ত পূরণ করতে উপবাস করে চলেছেন, তাও বলেছি। শুনে তারা খুশি হয়েছেন। সুলতান যখন তাদের পাওয়ার জন্য দুরূহ কর্তব্যসাধনে ব্বতী হয়েছেন এতে স্পষ্টতই প্রমা’ণ হয়, তার আকাঙক্ষার মধ্যে কোন ফাকি নাই। তাদের ধারণা, মেয়েরা আপনার কাছে সুখে থাকবে। শুধু একটি কথা বলেছেন, চিরদিনের মতো ছেড়ে দেবার আগে একটিবার তারা তাদের চোখের দেখা দেখতে চান। আজ। আপনার উপবাসের একুশদিন চলছে। আমি আজ ওদের সঙ্গে করে নিয়ে যাবো। ফিরে আসবো তিরিশ দিনের দিন। সেই দিন। আপনার উপবাসের শেষ দিন। এই দশটা’ দিন তারা তাদের মা’-বাবার কাছে থাকবে। ভালোমন্দ খানাপিনা করবে। তারপর আমি আবার সঙ্গে করে নিয়ে আসবো।

এ কথায় সুলতান সায় দিতে পারে না-সেকি করে হয়? যাদের পাবো বলে এত কৃচ্ছসাধন করছি, তারাই আমা’র কব্জার বাইরে চলে যাবে!

বৃদ্ধ হা’সেন, এতদিন আমা’কে দেখছেন, এখনও পুরোপুরি বি’শ্বাস করতে পারছেন না। আপনি তো জোর করে তাদের ধরে নিয়ে আসেননি। আমি নিজেই সোধে এসে প্রস্তাব দিয়েছি। সুতরাং এক্ষেত্রে আপনার আপত্তি হচ্ছে কেন? এটা’ তো বোঝেন, মা’-বাপের সন্তান, চিরকালের মতো নাগালের বাইরে চলে যাবে। শেষবারের মতো একবার চোখের দেখার সাধ হয় না?

সুলতান ঘাড় নাড়লেন, তা ঠিক। বাবা-মা’কে ছেড়ে সন্তান চলে গেলে কি যে ব্যথা বুকে বাজে তা আমি হা’ড়ে হা’ড়ে টের পাচ্ছি। ঠিক আছে, ওদের নিয়ে যাও। তবে দেরি করো না। তিরিশ দিনের দিনই যেন তারা প্রাসাদে ফিরে আসে।

বৃদ্ধা বলে, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, জাঁহা’পনা, আমা’র কথার কখনও নড়াচড় হয় না; আর আপনার মনে যদি কোনও দ্বি’ধা থাকে তা হলে এক কাজ করুন, আপনার সবচেয়ে বি’শ্বস্ত কোনও মহিলাকেই আমা’দের সঙ্গে দিন। তার তত্ত্বাবধানেই এ-কদিন থাকবে মেয়েরা। ওদের মা’-বাবা যদি দেরি করতে চায়, বুঝিয়ে বলতে পারবে, —সুলতানের হুকুম, নির্দিষ্ট দিনেই ফিরতে হবে।

সুলতান বললেন, ঠিক বলেছো, বুড়িমা’। আমা’র নিজের লোক একজন সঙ্গে থাকা দরকার। সে বুঝিয়ে বলতে পারবে। দেরি করলে সুলতান গোসা করবেন। আমা’র সবচেয়ে প্রিয়পাত্রী বাঁদী সফিয়া তোমা’দের সঙ্গে যাবে। আমা’র দুটি সন্তানের সে জননী। তার বাবা কনসন্তান্তিনোপল-এর সম্রাট আফ্রিদুন। আচারে ব্যবহা’রে খুব ভদ্র, শিক্ষিত। তোমা’র ভাইদের সঙ্গে সে কথা বলতে পারবে। বোঝাতে পারবে। কিন্তু তা তো হলো, তিরিশদিনের দিন আমি কি আহা’র করবো, তার ব্যবস্থা করে যাবে না?

বৃদ্ধ বলে, আমা’র সবদিকে নজর আছে। কিছু বলতে হবে না। যাবার আগে আপনার জন্যে এক গেলাস সরবৎ দিয়ে যাবো। সযত্নে রেখে দেবেন। তিরিশ দিনের দিন সকালে উঠে। হা’মা’মে যাবেন! খুব ভালো করে গোসল করবেন। দেখবেন শরীরটা’ কেমন হা’ল্কা হয়ে গেছে। দেহের এবং মনের সব ক্লেশ কেটে গেছে। আল্লাহর নামা’জ শেষ করে সরবৎটা’ খেয়ে একটু ঘুমিয়ে নেবেন। ঘুম থেকে উঠে দেখবেন আপনি সম্পূর্ণ সুস্থ তাজা মা’নুষ হয়ে গেছেন।

এই বলে সুলতানকে এক গেলাস সরবৎ দিয়ে, পাঁচটি মেয়ে আর সফিয়াকে সঙ্গে নিয়ে প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে গেলো সে। তিরিশদিনের দিন খুব ভোরবেলা তোমা’দের বাবা সুলতান উমর-আল-নুমা’ন হা’মা’মে গেলেন। গোসল সেরে এসে নামা’জ পড়লেন। তারপর সিন্দুক খুলে ঢাকনা ঢাকা সরবতের গ্লাস বের করে দরজা বন্ধ করে দিতে দিতে বললেন, সরবৎ খেয়ে আমি বি’শ্রাম করবো। তোমরা কেউ আমা’কে ডাকবে না।

সারাটা’ দিন কেটে গেলো। আমরা সবাই সুলতানের কামরার সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে আছি। কখন তার ঘুম ভাঙ্গবে। কখন তিনি কাকে তলব করবেন। কিন্তু না, বি’কেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে এলো। সন্ধ্যা পার হয়ে রাত্রি গম্ভীর হতে থাকে। কিন্তু সুলতানের ঘুম আর ভাঙ্গে না। তখন কি জানি, সে ঘুম আর ভাঙ্গাবার নয়। পরদিন দুপুরে অ’নেক ডাকাডাকির পর যখন কোনও সাড়া পাওয়া গেলো না, দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখি সুলতানের মৃ’তদেহ পড়ে আছে শয্যায়।

দু’হা’তে মুখ ঢেকে দানদান কাঁদতে থাকে। দু-আল-মা’কান আর নুজাৎ কান্নায় ভেঙে পড়ে। কাঁদতে থাকে দরবারের সকলে। নুজাতের স্বামী মা’কানের হা’ত ধরে টেনে তোলে, ওঠ, কেঁদে আর কি করবে, বল। নিয়তির লি’খন এড়াতে পারে না কেউ। বাবা কারো চিরকাল বেঁচে থাকে না। এখন শোকতাপ ভুলে নিজেকে শক্ত কর।

চোখের জল মুছে দানদান বলতে থাকে, সরবতের গেলাসটা’ পরীক্ষা করে দেখলাম। তার তলায় কাগজের একটা’ টুকরো পাওয়া গেলো। তাতে লেখা ছিলো: শয়তানের জন্য শোক করো না। এ চিঠি তোমরা যারা পড়বে—জেনে রেখো, ব্যাভিচারের পরিণামে এই শাস্তিই পেতে হয়। একবার ভেবে দেখো, কত সম্রাটের আদরের দুলালীদের সর্বনাশ সে করেছে। তার নৃশংস অ’ত্যাচারে কত সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে গেছে। এই শয়তানটা’ তার ছেলে সারকানকে পাঠিয়েছিল। সিসারিয়ায়। ছলনায় সে ভুলি’য়ে এনেছিলো সম্রাট হা’রদুবের প্রাণপ্রতিমা’ কন্যা ইরবি’জাকে। তার সঙ্গে জানোয়ারের মতো আচরণ করেছিলো এই বদমা’ইশ সুলতান। তারপর এক নিগ্রোর হা’তে তুলে দিয়েছিলো। নৃশংসভাবে তাকে সে হত্যা করে তার ধনরত্ন ছিনিয়ে নিয়ে উধাও হয়ে গেছে। সেই অ’ত্যাচারী উদ্ধত সুলতান উমর অ’ল-নুমা’নকে আজ আমি খতম করলাম। এজন্য ঈশ্বর আমা’কে আশীর্বাদ করবেন। এবার আমা’র পরিচয় শোনো, আমি সেই হা’রদুবের দুর্গ কর্ত্রী-বাদী সরদারণী। সফিয়াকে আমি তার বাবা আফ্রিদুনের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। তবে এইখানেই শেষ নয়, এরপর আমরা সৈন্যবাহিনী সাজিয়ে নিয়ে বাগদাদ আক্রমণ করতে আসছি। এই পাপপুরী প্রাসাদ আমরা ধুলোয় মিশিয়ে দেব। সুলতানের বংশ নির্বংশ করে দেব। দুনিয়াতে মুসলমা’ন সাম্রাজ্য বলে আর কিছু থাকবে না। বাগদাদের আকাশে উড়তে থাকবে খ্ৰীষ্ট ধর্মের বি’জয় নিশান।

এক মা’স ধরে শোকপালন করা হলো। দেশের লোক বলতে লাগলো, এবার বাগদাদের সিংহা’সনে যোগ্য উত্তরাধিকারী বসানো হোক। তখন আমি কাজীদের ডেকে পরামর্শ করলাম। তাদের অ’ভিমত দামা’সকাস থেকে সারকানকে এনে সুলতান করা যেতে পারে। জনগণের দাবী—দু-আল-মা’কানকে সিংহা’সনে বসাতে হবে। কিন্তু দু-আল-মা’কানকে আমরা কোথায় পাবো। দেশে দেশে তাদের সন্ধান করা হয়েছে–কোনও খবর পাওয়া যায়নি। তাই কাজীদের উপদেশ মতো দামা’সকাসেই যাচ্ছিলাম। শাহজাদা সারকানকে সুলতান পদে অ’ভিষেক করে বাগদাদে নিয়ে আসবো—এই ছিলো উদ্দেশ্য। আল্লাহর অ’পার মহিমা’—শাহজাদা দু-আল-মা’কান আর শাহজাদী নুজাৎ দু’জনকে এক সঙ্গেই ফিরে পেলাম।

দু-আল-মা’কান উজির দানাদানকে বললো, আপনি বয়সে এবং জ্ঞানে বৃদ্ধ, আমা’র বাবার পুরনো উজির। এখন থেকে আপনি আমা’রও উজির হলেন। এখন আমা’র প্রথম জ্ঞাতব্য বি’ষয় : আমা’র বাবা কি ধনদৌলত রেখে গেছেন তার একটা’ মোটা’মুটি হিসাব করা।

উজির দানদান একখানা লম্বা ফর্দ খুলে ধরলো, সুলতানের মৃ’ত্যুর পর আমি তার বি’ষয় সম্পত্তির একটা’ খতিয়ান তৈরি করেছি।

মা’কান বললো, আপনি এক কাজ করুন, দামা’সকাস থেকে যে সব ধনরত্ন বাগদাদে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তার সবটা’ই আপনি সেনাবাহিনীর লোকদের মধ্যে বি’লি’য়ে দিন।

নুজাতের স্বামী বাক্সের তালা খুলে টা’কা পয়সা সোনাদানা হীরে জহরৎ সব বের করলো। উজির দানদান সেনাবাহিনীর প্রত্যেকের পদমর্যাদা অ’নুসারে ভাগ বাটোয়ারা করে দিলো সব ধনরত্ন।

সৈন্য সামন্তরা ধন্য ধন্য করতে লাগলো। নতুন সুলতানের শতায় কামনা করতে থাকলো।

এরপর তাবু ওঠানো হলো। আর কোনও বি’রতি নয়, সোজা বাগদাদ। শহরের প্রবেশ মুখে হা’জার হা’জার নরনারীর ভীড়। তাদের নতুন সুলতানকে বরণ করতে এসেছে তারা। সারা শহর আজ নতুন সাজে। সেজেছে। আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে সর্বত্র।

প্রাসাদে ফিরে এসে দু-আল-মা’কান-এর প্রথম কাজ হলো, বড়ভাই সারকানকে চিঠি লেখা। সে লি’খলো, দাদা যত সত্ত্বর তোমা’র সাধ্যমতো সৈন্যবল নিয়ে বাগদাদে চলে এসো। সিসারিয়া সম্রাট হুমকি দিয়েছে, বাগদাদ আক্রমণ করবে।

চিঠিখানা ভাজ করে উজির দানদানের হা’তে দিয়ে দু-আল-মা’কান বললো, আপনি প্রাজ্ঞ ব্যক্তি। এই চিঠি আমি অ’ন্য কারো হা’তে পাঠাতে চাই না। আপনি যান। সমস্ত ঘটনা খুলে তাকে বলুন। সে যদি চায়, আমি বাগদাদের সিংহা’সন ছেড়ে দিয়ে দামা’সকাসের সুবাদার হয়ে থাকবো। কিন্তু আজ এই বি’পদের দিনে, আমরা ভাই-ভাই বি’রোধ করবো না। আগে শত্রুর মোকাবি’লা করতে হবে। পরে নিজের স্বাৰ্থ চিন্তা করবো।

উজির খুশি হয়ে বললো, তুমি অ’তি বি’চক্ষণ বি’চারবুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে, বাবা। বি’পদের দিনে যে মা’থা ঠাণ্ডা রেখে কাজ করতে পারে সে-ই বি’চক্ষণ ব্যক্তি।

দানদান বি’দায় নিলো। এবার দু-আল-মা’কান জেরুজালেমের সেই বৃদ্ধ বন্ধুকে ডেকে পাঠালো। তার বসবাসের জন্যে একটা’ প্রাসাদ বন্দোবস্ত করে দিলে সে। দাসদাসী চাকরানফর পরিবৃত্ত হয়ে বৃদ্ধ সুখে দিন কাটা’তে থাকলো।

কয়েক দিন বাদে দানাদান ফিরে এসে জানালো, সারকান অ’খুশি হয়নি। সে তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে রওনা হয়েছে। এখন আমরা আমা’দের বাহিনী নিয়ে এগিয়ে যাবো। পথের মধ্যে তার সঙ্গে মিলি’ত হয়ে সিসারিয়া আক্রমণের উদ্যোগ করতে হবে। সারকগনের পরিকল্পনা এই রকম।

সঙ্গে সঙ্গে সারা শহরে সােজ সাজ রব পড়ে গেলো। হা’জার হা’জার সৈন্যসামন্ত নিয়ে দু-আলমা’কান একদিনের পথ অ’তিক্রম করে তাবু গাড়লো। ওদিক থেকে সারকানও তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে হা’জির হলো। এই প্রথম দুই ভাই-এর মিলন ঘটলো। দুজনে দুজনের বুকে মা’থা রেখে বাবার শোকে চোখের জল ফেলতে থাকলো।

বড়ভাইকে সসম্মা’নে বাগদাদে নিয়ে আসে দু-আল-মা’কান। শহরের আশে পাশে ছাউনি ফেলা হলো। শত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধ করতে তখন দু-ভাই একাত্মা’ হয়ে পড়েছে।

দিন কয়েকের মধ্যেই দুই ভাই বি’শাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে সিসারিয়ার দিকে অ’গ্রসর হতে থাকে। আরবের অ’ন্যান্য মুসলমা’ন সুলতানরাও তাদের সৈন্যবাহিনী পাঠিয়ে বাগদাদ সুলতানকে সাহা’য্য করতে এগিয়ে আসে।

এক মা’স চলার পর তারা শত্রু সীমা’ন্তে পৌঁছয়। ভীত সন্ত্রস্ত কনসন্তান্তিনোপলবাসীরা সম্রাট আফ্রিদুনকে জানায়—বাগদাদ সৈন্য শিয়রে। আফ্রিদুন হা’রদুবের বাঁদী সর্দারণীকে খবর পাঠায়। সে আবার সিসারিয়ায় সম্রাট হা’রদুবকে জানায়।

হা’রদুব আর আফ্রিদুনের যুক্ত সৈন্যবাহিনী সীমা’ন্ত ঘিরে রুখে দাঁড়ায়। একদিকে খ্ৰীষ্টা’ন সৈন্য আর একদিকে মুসলমা’ন বাহিনী। বাঁদীি সরদারণী:হা’রদুবকে অ’ভয় দেয়, আপনি কিছু ভাববেন না, সম্রাট, আমি ওদের সমুচিত শিক্ষা দেব। এটা’ জানবেন স্বয়ং যীশু আমা’দের সহা’য় আছেন, শয়তানরা আমা’দের কোনও ক্ষতি করতে পারবে না।

–পঞ্চশ হা’জার সৈন্য নৌকা বোঝাই করে পাহা’ড়ের নিচে পাঠিয়ে দিন। আর বাকী সৈন্যরা থাকবে এপারে। মুসলমা’নরা ছাউনি ফেলেছে পাহা’ড়ের পাদদেশে। সুতরাং তারা সামনেও এগোতে পারবে না। পিছনেও পালতে পারবে না।

আফ্রিদুন বললো, চমৎকার ফন্দী। বাছাধনরা কচু কাটা’ হবে।

সম্রাট আফ্রিদুন এবং সম্রাট হা’রদুব তাদের সেনাপতিদের ডেকে বললেন, কাল খুব ভোরে তোমরা দু’টো ভাগে বি’ভক্ত হয়ে দুদিক থেকে সাঁড়াশী অ’ভিযান চালাবে। নৌকা করে পাহা’ড়ের নিচে পাঠিয়ে দাও পঞ্চশ হা’জার সৈন্য। আর বাকী সৈন্য থাকবে পাহা’ড়ের ওপরে। পাহা’ড়ের নিচেই ওরা ছাউনি ফেলেছে। ব্যাটা’রা এতে চিড়ে-চ্যাপটা’ হয়ে যাবে। এ যুদ্ধে জয় আমা’দের অ’বশ্যম্ভাবী। বুকে সাহস সঞ্চয় করে যীশুর নাম নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়। মুসলমা’নদের নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে হবে-এই আমা’দের একমা’ত্র পণ।

বাঁদী সরদারণী বললো, আমা’দের এখন প্রধান লক্ষ্য হবে সারকান। সে এক মূর্তিমা’ন শয়তান। তার বি’ক্রম অ’সাধারণ। একাই সে হা’জার মা’নুষের সঙ্গে লড়তে পারে। এটা’ কোনও মা’নুষের পক্ষে সম্ভব না। শয়তান তাকে ভর করে আছে। কিন্তু তাতে ভয় পাওয়ার কিছু নাই। ঈশ্বরের হা’তে শয়তান-এর মৃ’ত্যু ঘটে। আমরা ধর্মযোদ্ধা। ঈশ্বরের নির্দেশে খ্ৰীষ্টা’ন ধর্মবি’শ্বাসীদের রক্ষার জন্যে ধর্মযুদ্ধে নামছি। ঈশ্বর আমা’দের সহা’য় আছেন, শয়তানের পতন অ’নিবার্য। সুতরাং যৌন-তেন-প্রকারেণ। সারকানকে হত্যা করতে হবে। মুসলমা’নদের একমা’ত্র বলভরসা এই সারকান। সারকান নিহত—শোনামা’ত্র সমস্ত সৈন্যবাহিনী আতঙ্কগ্বস্ত হয়ে রণে ভঙ্গ দিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে পালাতে থাকবে। কিন্তু আমা’দের হা’ত থেকে একজন মুসলমা’নও রেহা’ই পাবে না। সবগুলোকে কেটে কচু-কাঁটা’ করবো।

বাঁদী সর্দারণীর এই রক্ত গরম-করা বক্তৃতায় সেনাপতিরা উৎসাহিত হয়। প্রতিজ্ঞা করে, যেভাবেই হোক, মুসলমা’নদের পরাজিত করবোই।

খ্ৰীষ্টা’নদের প্রধান সেনাপতি লুকা। তার মতো দুর্ধর্ষ যোদ্ধা সেই সময়ে সারা ইউরোপে আর দুটি ছিলো না। দেখতে ছিলো ভালুকের মতো। গায়ের রং পোড়া কয়লার মতো কালো। তলোয়ার হা’তে সে যখন দাঁড়াত দেখে মনে হতো-সাক্ষাৎ যমদূত। এ পর্যন্ত কোন যুদ্ধে সে পরাজয় স্বীকার করেনি। তার নাম শুনলে সেনাপতিদের বুক ধড়াস ধড়াস করতে থাকে। সে লোহা’র বর্ম শিরস্ত্ৰাণ পরে যখন ঘোড়ায় চাপলো, আফ্রিদুন তাকে আশীর্বাদ করে বললো, জয় তোমা’র সুনিশ্চিত। সারকানকে হত্যা করাই তোমা’র একমা’ত্র লক্ষ্য। যেভাবেই পারো, তাকে খতম করতেই হবে।

লুকা সম্রাটকে অ’ভিবাদন জানিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে চললো। সোজা সারকানের ছাউনির সামনে। ঘোষক হা’ঁকিতে থাকে, কই কোথায় আছে সারকান, মরার যদি সাধ থাকে বেরিয়ে এসো। তোমা’র যম সেনাপতি লুকা তোমা’র সামনে দাঁড়িয়েছে। যদি সাহস থাকে, তলোয়ার ধরে।

সারকান ধীর পায়ে এগিয়ে আসে। হা’তে উন্মুক্ত তলোয়ার। বি’কট একটা’ চিৎকার তুলে লুকা কাঁপিয়ে পড়ে। সারকান শরীরটা’কে একটু কান্ত করে পাশ কাটিয়ে দেয়। তারপর শুরু হয়। তলোয়ারের লড়াই। প্রথম প্রথম নির্বি’কীরচিত্তে লুকার মা’রগুলো ঠেকিয়ে যেতে থাকে সে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সারকান বুঝতে পারে, যতগুলো প্যাঁচ জানা ছিলো সবই লুকা দেখিয়ে শেষ করে ফেলেছে। অ’থচ সারকানকে কাবু করতে পারছে না। তখন সে আবার সেই প্যাচগুলোই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চালাতে থাকে। সারকান এবার নিশ্চিত হয়। বুঝতে পারে লুকার বি’দ্যার দৌড়। এবার সারকান তার নিজের কৌশল প্রয়োগ করলো। এবং তা প্রতিরোধ করার ক্ষমতা লুকার ছিলো না। তলোয়ারের এক কোপেই ধড় থেকে মুণ্ডুটা’ আলাদা হয়ে ছিটকে পড়ে গেলো। এই দৃশ্য দেখে লুকার সঙ্গী সাথীরা প্ৰাণ ভয়ে চিৎকার করতে করতে ঊর্ধ্বশ্বাসে পালি’য়ে গেলো।

আফ্রিদুন এবং হা’রদুব মা’থায় হা’ত দিয়ে বসে। ভাবতে পারে না লুকা নাই। সমগ্র খ্ৰীষ্টা’ন রাজ্যে লুকা একটি জীবন্ত প্রবাদ। কথায় কথায় লোকে লুকার শৌর্যবীর্যের উপমা’ দেয়। মা’ বাবা সদ্যজাত শিশুর নামকরণ করে লুকা। বড় হয়ে ছেলে লুকার মতো বীর হবে, এই আশা। সেই লুকা সারকগনের হা’তে নিহত হলো? একথা আফ্রিদুন-হা’রদুব বি’শ্বাস করলেও দেশের লোক বি’শ্বাস করবে না। আফ্রিদুন বলে, আমা’র সাম্রাজ্যের আসল থামটা’ই ভেঙে পড়ে গেলো।

বাদী সর্দারনী অ’ভয় দিয়ে বলে, বি’পদের সময় অ’ধীর হলে তো চলবে না, সম্রাট। বুঝতে পারছি শত্রুর সঙ্গে সম্মুখ-সমরে লড়াই করে আমরা জিততে পারবো না। কারণ লুকা যখন পারেনি তখন সমগ্র খ্রীষ্টা’ন সাম্রাজ্যের কোন সেনাপতির পক্ষেই তাকে নিহত করা সম্ভব নয়। কিন্তু তাই বলে হা’ত গুটিয়ে বসে থাকলে তো চলবে না।

নিরাসক্ত ভাবে হা’রদুব বলে, কী করতে চাও? বাহুবলেই যদি হা’রাতে না পারো, হা’রাবে কিসে?

—হা’রাবো বুদ্ধি বলে। বুদ্ধির কাছে বাহুবল তুচ্ছ। আমি এমন ফাদ তৈরি করবো, সেখান থেকে সারকান বেরুতে পাবাবে না।

সম্রাট হা’রদুব প্রশ্ন করে, সেই ফাঁদটা’ কি, শুনি?

বাদী সর্দারনী বলে, আপনার সৈন্যদের মধ্যে গোটা’ পঞ্চাশেক সৈন্য বাছাই করে আমা’র সঙ্গে দিন। তারা সবাই ভালো আরবী বলতে পারবে, এবং আরবীয় আদব কায়দায় দস্তুর মতো শিক্ষিত হওয়া চাই।

হা’রদুব বললো, এ আর এমন শক্ত কি? আমা’র সেনাবাহিনীতে খাস আরবের লোকও অ’নেক আছে। তাদের মধ্য থেকে তোমা’র পছন্দমতো যে ক’জন দরকার বাছাই করে নাও। কিন্তু তাদের দিয়ে কি করাবে?

—সোজা পথে যখন কাজ হবে না, বাকী পথ ধরতেই হবে। আপনার ঐ পঞ্চাশজন সৈন্য এবং আমি আরব সওদাগরের ছদ্মবেশ ধরে তাদের সামনে হা’জির হবো। এবং কান্নাকাটি করে বলবো, আমরা বহুকাল ধরে কনসন্তান্তিনোপল-এ ব্যবসা বাণিজ্য করি। আরব থেকে সওদা এনে খ্ৰীষ্টা’নদের কাছে বি’ক্রি করি। এখন খ্ৰীষ্টা’ন আর মুসলমা’নদের মধ্যে যুদ্ধ বাধায় তারা আমা’দের মা’রধোর করে দেশ থেকে তাডিয়ে দিয়েছে। টা’কা পয়সা সামা’ন পত্র যা ছিলো সব কেড়ে কুড়ে নিয়েছে। এখন আমা’দের দেশে ফিরে যাবার সঙ্গতিটুকু সঙ্গে নাই। তাই আপনাদের সাহা’য্যপ্রার্থী হয়ে এসেছি। দেখবেন, সম্রাট, এই চালে আমি বাজি মা’ৎ করে দেব। মুসলমা’নরা ভীষণ স্বজাতি-প্রিয়। এইভাবে তাদের করুণার পাত্র হয়ে সারকানের দলে ঢুকে পড়া আমা’র পক্ষে খুব একটা’ শক্ত কাজ হবে না। তারপর কি করে সিসারিয়ার মরণ ফাদে এনে ফেলতে হয় একবার দেখবেন।

বাঁদী সর্দারণীর ফন্দীটা’ ভালোই। কিন্তু কতটা’ কাজে ফলবে, কে জানে। আফ্রিদুন এবং হা’রদুব সম্মতি জানালো।-ঠিক আছে, দেখা চেষ্টা’ করে।

সারকান আর মা’কান দুই ভায়ে নিজের তাঁবুতে বসে কনসতান্তিনোপল আক্রমণের পরিকল্পনা রচনা করছে। এমন সময় দ্বাররক্ষী এসে খবর দিলো, একদল আরব সওদাগর আপনাদের দর্শনপ্রার্থী।

দু-ভাই বেরিয়ে এসে দেখে, প্রায় জনা পঞ্চাশেক আরব সওদাগর এবং তাদের সঙ্গে এক নিষ্ঠাবতী ধর্মপ্ৰাণা বৃদ্ধ এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের পোশাক আশাক ছিন্নভিন্ন, দেহরক্তাক্ত, চোখে মুখে সস্ত্রাসের ভাব। সারকান প্রশ্ন করে, কে তোমরা?

পাক্কা মুসলমা’নী কেতায় কুর্নিশ জানিয়ে তারা আরও একটু এগিয়ে আসে। বুড়িটা’ হা’তের মা’লা ঘুরাতে ঘুরাতে বলে, আমরা ইস্পাহা’নের বাসিন্দা। আজ বি’শ বছর ধরে কনসন্তান্তিনোপল-এ বাণিজ্য করে আসছি। আরব থেকে সামা’ন পত্ব এনে খ্রীষ্টা’নদের কাছে বি’ক্রি করাই একমা’ত্র কাজ। এতকাল কোনও অ’সুবি’ধে হয়নি। দিব্যি আরামে ব্যবসা বাণিজ্য চালি’য়ে যাচ্ছিলাম। ওদের দেশের পয়সা নিয়ে গিয়ে আমা’দের বাল-বাচ্চাদের খাওয়াচ্ছিলাম। কিন্তু এখন তারা অ’ন্যরূপ ধরেছে। তারা খ্ৰীষ্টা’ন, আমরা মুসলমা’ন। ওদের যত আক্রোশ আমা’দের উপর। কারণ আমরা মুসলমা’ন। মুসলমা’নরাই তাদের দেশ আক্রমণ করেছে। এই অ’জুহা’তে আমা’দের ধরে নানাভাবে অ’ত্যাচার চালি’য়েছে। এবং শেষে মেরে ধরে আমা’দের টা’কা পয়সা, সামা’ন পত্র সব কেড়ে নিয়ে কনসন্তান্তিনোপল থেকে তাডিয়ে দিয়েছে। এখন আমা’দের এমন কোন রেস্ত নাই যা নিয়ে দেশে ফিরতে পারি।

সারকান এবং মা’কান ওদের কাহিনী শুনে ব্যথিত হয়। বলে, তোমরা আমা’র ছাউনিতে বি’শ্রাম কর। আমি সব ব্যবস্থা করে দেব।

সারকানের নির্দেশে বি’রাট তাঁবু খাটা’নো হলো। সওদাগরের ছদ্মবেশে সিসারিয়ার পঞ্চাশজন সৈন্যের একটা’ বাহিনী মুসলমা’ন ছাউনির ভিতরে আস্তানা গাড়লো। তাদের খানাপিনা আদর যত্নের কোনও ত্রুটি রাখলে না। সারকান। মা’ঝে মা’ঝেই খোঁজ খবর নিতে থাকলো। সারাকনের কর্মচারীরা বললো, সওদাগররা সবাই খান পিনা করে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে; কিন্তু বুড়িমা’ খানাপিনা কিছুই করেনি। দিন-রাত সে শুধু নামা’জ আর কোরান পড়ছে।

এ-কথা শুনে সারকান নিজে দেখাশুনা করতে গেলো। স্যু ওদাগররা বললো বুড়িমা’ আল্লাহর কাছে দেয়া মা’ঙছেন, যাতে এ যুদ্ধে আমা’দের জয় হয়। বুড়ি মা’ আমা’দের ধর্মা’ত্মা’ সিদ্ধবাক। তার উপর আল্লাহর ‘ভর’ হয়। সেই সময় তাকে যা প্রশ্ন করবেন সব জবাব দেবেন। তিনি। সে-সবই আল্লাহর বাণী। তার মুখ দিয়ে উচ্চারিত হয় মা’ত্র।

শ্রদ্ধা ভক্তিতে মা’থা নত হয়ে আসে। সারকান মা’কনের। জিজ্ঞেস করে কবে মা’র উপর ‘ভর’ হবে।

সওদাগররা বলে, সে কিছুই বলা যায় না। হয়তো এখুনি হতে পারে। আবার দুদিন নাও হতে পারে। তবে যতক্ষণ ‘ভর’ না হবে তার এই মৌনভােব কাটবে না। কারো দিকে তাকবেন না, কারো সঙ্গে কথা বলবেন না।

সারকান জিজ্ঞেস করে। কিন্তু তিনি মৌনব্বতী হয়ে এই উপাসনায় বসলেন কেন?

—বাঃ, সে কি বলেন, জাঁহা’পনা। এতবড় ধর্মযুদ্ধ। এর জয়-পরাজয়ে মুসলমা’ন ধর্ম, জাতির বঁচামরা নির্ভর করছে। এ সময়ে উপাসনায় না। বসলে বসবেন কবে? নিজের ছেলে মেয়ের সৌভাগ্য ফিরবে কি করে, বা কিভাবে কোথায় বাণিজ্য করলে নিজের ধনদৌলত আরও ফুলে ফেঁপে উঠবে এই জন্যে তিনি উপাসনায় বসবেন? ককখনো না। নিজের স্বাৰ্থ চিন্তা তিনি কোনওদিনও করেন না। কি করে পরের উপকার হবে, দেশের দশের উপকার হবে সে-ই তার একমা’ত্র চিন্তা।

সারকান মা’কান দুভাই অ’বাক হয়ে শোনে। মনে হয়, এই সংকটকালে আল্লাহই তাদের পাঠিয়েছেন।

পরদিন ভোরবেলা ‘ভর’ উঠলো। সারকান মা’কান আভুমি আনত হয়ে সালাম করে জানতে চাইলো, এই ধর্মযুদ্ধে আমা’দের জয় হবে, মা’?

–অ’বশ্যই হবে বাবা। তবে শত্রুর গুপ্ত ঘাঁটির সন্ধান না পেলে তাদের ঘায়েল করা যায় না। আমা’র সঙ্গে যারা এসেছে তারা সেই সব ঘাঁটির সন্ধান জানে। তাদের কথামতো তোমরা অ’গ্রসর হও। শক্রকে নিধন করতে পারবে।

সারকান এবং মা’কান সওদাগরদের দিকে তাকায়। ওদের একজন বলে, মা’ ঠিকই বলেছেন। আমরা আজ বি’শ বৎসর যাবৎ কনসন্তান্তিনোপল আর সিসারিয়ার প্রতিটি প্রান্তে ঘুরেছি। সারা খ্ৰীষ্টা’ন সাম্রাজ্যের পথ-ঘাট, আমা’দের নখদর্পণে। কোথায় তাদের গুপ্ত ঘাঁটি। কোন পথে যাওয়া নিরাপদ হবে সব আমরা বলে দেব।

সারকান হা’তে স্বৰ্গ পায়। এ যুদ্ধে তাদের জয় আর কেউ আটকাতে পারবে না। তামা’ম খ্ৰীষ্টা’ন জাতটা’কে সাবাড়ি করে দেবে।

ঠিক হলো, সৈন্যদের পঞ্চাশটা’ভাগে বি’ভক্ত করা হবে। এবং এই পঞ্চপ্রশজন সওদাগর-এর এক-একজন এক একটি, সৈন্যবাহিনী নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন পথ ধরে ঢুকে পড়বে। গুপ্ত পথের নিশানা দেখিয়ে দেবে সওদাগররা। এইভাবে খ্ৰীষ্টা’নদের পঞ্চাশটা’ গুপ্তঘাটি নিশ্চিহ্ন করে ফেলা সম্ভব হবে।

সারকান মা’কানকে বললো, তুমি ছাউনিতেই থাক। উজিরও তোমা’র সঙ্গে থাকবেন। আমি যাবো স্বয়ং বুড়িমা’র সঙ্গে। তিনি আমা’কে সিসারিয়ার দুর্গে নিয়ে যাবেন। এখন শত্রুসৈন্য দুর্গ ছেড়ে বেরিয়ে চলে এসেছে। এই সময় হা’রদুবের এই সুরক্ষিত দুর্গ প্রায় শূন্য। গুপ্ত পথ ধরে আমরা এগিয়ে যাবো। একবার দুর্গটা’ অ’ধিকার করতে পারলে আর কোনও অ’সুবি’ধেই হবে না। এরপর আমরা সহজেই কনসন্তান্তিনোপল দখল করে নিতে পারবো।

দাদাকে আলি’ঙ্গন করে বি’দায় জানালো দু-আল-মা’কান। বললে, ফিরে এসো, তোমা’কে আমি নিজে হা’তে সুলতানের মুকুট পরিয়ে দেব।

কিন্তু মুকুট আর তার পরা হলো না। শয়তানী বাদী সর্দারণীর ফাঁদে পা দিয়ে প্ৰাণটা’ হা’রাতে হলো। সারকান তার সৈন্যবাহিনী সঙ্গে করে বুড়ির সঙ্গে সিসারিয়া দুর্গের ভিতরে ঢুকেছিলো। বুড়ি তাকে ধাপ্পা দিয়েছিলো, দুর্গ এখন শূন্য এই অ’বস্থায় অ’ধিকার করে নাও। সারকান দুর্গমধ্যে প্রবেশ করে সত্যিই দেখলো, কোন জনপ্রাণী নাই। এ-ঘর ও-ঘর ঘুরে ঘুরে দেখছিলো, এমন সময় এক আততায়ী পিছন দিক থেকে সারকানের পিঠে ছুরি বসিয়ে দেয়। এই অ’তর্কিত আক্রমণের জন্যে প্রস্তুত ছিলো না সে। সারকান মা’টিতে পড়ে গিয়ে তলোয়ার খুলে দাঁড়ায়। তখন তার সামনে প্রায় শ’খানেক খ্ৰীষ্টা’ন সৈন্য। তলোয়ার উদ্যত করে বাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু সারকানের এক এক কোপে একাধিক শত্রু সৈন্য ধরাশায়ী হতে থাকে। এইভাবে সেই আহত অ’বস্থাতেও প্রবল বি’ক্রমে সবকটা’ সৈন্য নিধন করে খিড়কীর পথ দিয়ে বেরিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে ছাউনিতে ফিরে আসে। সারা দেহরক্তাক্ত। তখনো ছুরিটা’ পিঠেই গাথা ছিলো। মা’কান ছুটে এসে ছুরিটা’ টেনে বার করে। ধরাধরি করে দাদাকে বি’ছানায় শুইয়ে দেয়। এইবার সারকানের দেহ নেতিয়ে পড়ে। অ’নেক চেষ্টা’ করেও রক্ত বন্ধ করা সম্ভব হয় না। সেইদিনই সন্ধ্যাবেলা সারকান দেহত্যাগ করে।

রাত্ৰি যত গম্ভীর হয় সব দিক থেকেই দুঃসংবাদ আসতে থাকে। শয়তানরা তাদের পুরো সেনাবাহিনীটা’ই ফাদে ফেলে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে।

উজির দানদান বললো, আর এখানে থাকা ঠিক নয়। এরপর শত্রুরা ছাউনি আক্রমণ করবে।

মা’কানও ভাবলো, এবার ছাউনি গুটিয়ে বাগদাদের পথে রওনা হওয়াই শ্রেয়।

যে যুদ্ধে জয়ের সম্ভাবনাই ষোল আনা—সেই যুদ্ধে পরাজয় স্বীকার করে মা’কানকে দেশে ফিরতে হলো। বাদশাহী মর্যাদায় সারকানের মৃ’তদেহ সমা’হিত করে তার উপর এক শোক মঞ্জিল বানালো মা’কান। তার গায়ে লেখা হলো সারকানের অ’পূর্ব বীরত্ব কাহিনী।

Please follow and like us:

fb-share-icon

নতুন ভিডিও গল্প!


Tags: , , , , , ,

Comments are closed here.