সহস্র এক আরব্য রজনী – ১৪ (আজিজ ও আজিজা আর তাজ অল-মূলক ও দুনিয়ার কিস্সা)

September 5, 2021 | By Admin | Filed in: বিখ্যাত লেখকদের সাহিত্যে যৌনতা.

পারস্যের ইসপাহা’ন পর্বতমা’লার পিছনে সবুজ শহর। এখানকার সুলতান সুলেমা’ন শাহ। সারাটা’ জীবন সে ধর্মকর্ম নিয়েই কাটা’তো। তার মতো সৎ প্রজাবৎসল উদার সুলতান বড় একটা’ দেখা যায় না। সারা সালতানিয়তের কোণে কোণে সে ঘুরে বেড়াতো। উদ্দেশ্য-তার প্রজারা কে কিভাবে দিন গুজরান করছে তাই দেখা। তার নিরপেক্ষ উদারনীতির জয়গান করতো সকলে। ধনী দরিদ্র ভেদাভেদ করতো না। তার চোখে সবাই সমা’ন। সবাই প্রজা। এইভাবে প্রজাদের ভক্তি ভালোবাসা কুড়িয়ে তার জীবনের বেশীরভাগ সময়ই কেটে গেলো। শুধু একটা’ সাধই তার অ’পূর্ণ রয়ে গেলো। বেগম আর পুত্র কন্যা। যতই জীবনের সায়াহ্নকোল এগিয়ে আসে সুলতান ষ্ট সুলেমা’ন ক্রমশই নিজেকে বড় একা—অ’সহা’য় মনে করতে থাকে। একদিন উজিরকে ডেকে বললো, দেখ, আমা’র স্বাস্থ্য দিন দিন ভেঙে পড়ছে। উৎসাহ উদ্দীপনা স্তিমিত হয়ে আসছে। শরীরে কোনও বল পাচ্ছি না। মনে হচ্ছে, দিন শেষ হয়ে এলো। এখন এই বয়সে বুঝতে পারছি, কোন মা’নুষের একা থাকা উচিত নয়। সঙ্গবি’হীন জীবন মরুভূমির মতো। বি’শেষ করে সুলতানের পক্ষে তো নয়ই। কারণ সিংহা’সনের উত্তরাধিকার একটা’ বি’রাট সমস্যা। তাছাড়া আমা’দের পয়গম্বরও বলেছেন শাদী কর এবং সংখ্যা বাড়াও। এখন আমা’কে সৎ পরামর্শ দাও, উজির–কি করা বি’ধেয়।

উজির চিন্তিতভাবে বলে, আপনি বড় কঠিন প্রশ্ন করেছেন হুজুর। এককথায় এর জবাব হয়। না। আমি আমা’র সাধ্যমতো উত্তর দেওয়ার চেষ্টা’ করছি। জানি না। আপনাকে সস্তুষ্ট করতে পারবো কি না। এটা’ও অ’বশ্য অ’ত্যন্ত দুঃখের হবে, যদি আপনি কোন অ’জ্ঞাতকুলশীল বাঁদীকে শাদী করেন। বাদীকে শাদী করায় আমা’র কেন আপত্তি নাই। কিন্তু কথা হচ্ছে, তার বংশ পরিচয় আমা’দের অ’জ্ঞাত। হয়তো এমনও হতে পারে, যে বাদীকে আপনি শাদী করলেন তার বাবা একটা’ শয়তান বজাৎ বা চোর ডাকাত ছিলো। বাবার রক্ত মেয়ের ধমণীতে প্রবাহিত হয়। আবার সেই রক্ত নাতির দেহে সঞ্চারিত হবে এ আর বি’চিত্র কি? আপনার পুত্র যদি বড় হয়ে আপনার সৎ গুণের অ’ধিকারী না হয়ে তার দাদুর স্বৈরাচারের দোষে দুষ্ট হয়, তাহলে? এই কারণে হুজুরের প্রতি বান্দার আর্জি তিনি যেন আমা’কে কোন বাঁদী কিনে আনতে না হুকুম করেন। তা সে মেয়ে যদি দুনিয়ার সেরা সুন্দরী হয় তাতেও আমা’র সায় নাই। সন্তান উৎপাদনই যদি আপনার একমা’ত্র কাম্য হয়, আমি পরামর্শ দেব, কোনো সুলতান বাদশাহর মেয়েকে বেগম করে আনুন। আপনি চাইলে শাহবংশের সেরা সুন্দরীর অ’ভাব হবে না।

সুলতান বললো, তা যদি পাওয়া যায়, তাই নিয়ে এসো। শাদী করবো। শুধুমা’ত্র সন্তানের জন্য।

—পাত্রী আমা’র দেখাই আছে, জাঁহা’পনা।

—তাই নাকি! কে, কার মেয়ে?

আমা’র বি’বি’ বলেছে, সফেদ শহরের সুলতান জহর শাহর এক পরমা’ সুন্দরী কন্যা আছে। তার রূপের বর্ণনা দেওয়া আমা’র পক্ষে সম্ভব নয়। তবে শুনেছি, ইদানীংকালে এমন রূপসী, নিখুঁত সুন্দরী মেয়ে সারা আরবে নাই।

আনন্দে উল্লাসে ফেটে পড়ে সুলতান, ইয়া আল্লাহ!

উজির বলে, আপনি আর বি’লম্ব করবেন না হুজুর। দরবারের এক বি’চক্ষণ আমিরকে পাঠিয়ে দিন। সুলতান জহর শাহকে সে শুধু এই সংবাদটা’ দেবে যে সবুজ শহরের সুলতান তার কন্যার পাণিপ্রার্থী। তারপর দেখবেন সুলতান জহর শাহ আপনার কাছে ছুটে আসবে। তার নাতি সবুজ শহরের সিংহা’সনে বসবে-এ লোভ কি সে সম্বরণ করতে পারবে!

সুলতান বললো, কাকে পাঠানো যায় বলতে উজির। এমন লোককে পাঠাতে হব যে কায়দা করে সাজিয়ে গুছিয়ে বলতে পারবে। অ’থচ আমা’র মা’ন ইজ্জতটা’ও খোয়া যাবে না।

উজির ভেবে পায় না। কাকে পাঠানো যায়। সুলতান বললো থাক, অ’ত ভেবে কাজ নাই। এসব কাজ অ’ন্য লোক দিয়ে হয় না। তুমি নিজেই যাও। তাড়াতাডি কাজ হা’সিল করে ফিরে এসো। তুমি না ফেরা পর্যন্ত। খুব চিন্তায় থাকবো।

খুব তাড়াহুড়া করে দরবারের জরুরী কাজকর্ম সমা’ধা করে উজির সফেদ শহরের সুলতান সকাশে যাত্রার উদ্যোগ করতে লাগলো। উট আর খচ্চরের পিঠে বোঝাই করা হলো নানা উপঢৌকন-হীরে, জহরৎ, স্বৰ্ণালঙ্কার, রেশমের গালি’চা, সূক্ষ্ম কারুকার্য করা শাল, সুগন্ধী আন্তর, গোলাপের নির্যাস এবং আরও ছোট ছোট বহু মূল্যবান বি’লাসসামগ্ৰী।। তার সঙ্গে নিলো দশটি তাগড়াই আরবের ঘোড়া, একশোটি খোজা, একশোটি নিগ্রো ক্রীতদাস এবং একশোটি দাসী বাদী। লাটবি’হা’র বোঝাই করে। উজির রওনা হওয়ার আগে সুলতানের কাছে বি’দায় নিতে এলো। সুলতান বললো, খুব তাড়াতাডি ফিরবে। এবং খালি’ হা’তে আসবে না। পাত্রীকে সঙ্গে করে নিয়ে আসবে।

উজির বললো। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন জাঁহা’পনা, আমি যাবো। আর আসবো। ওখানে দেরি করার কিছু নাই। পাত্রীকে নিয়েই চলে আসবো।

উজির তার দলবল নিয়ে রওনা হয়ে পড়ে। দুৰ্গম গিরি পর্বত ডিঙিয়ে, দুস্তর মরুপ্রান্তর পেরিয়ে এবং বি’স্তর খাল বি’ল নদী অ’তিক্রম করে একদিন সফেদ শহরের প্রায় কাছাকাছি এসে পৌঁছয়। দ্রুতগামী এক অ’শ্বারোহীকে দূত করে সুলতান জহর শাহর দরবারে পাঠিয়ে দেয় উজির।

বি’কালে সুলতান জহর শাহ মুক্ত বায়ু সেবন করতে বাগানের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। দূরাগত এক অ’শ্বারোহীকে দেখতে পেয়ে উজিরকে জিজ্ঞেস করে, কে আসছে দেখতে উজির।

ইতিমধ্যে অ’শ্বারোহী আরও নিকটতর হলে বোঝা গেলো, কোনও বি’দেশী দূত। একটু পরে সামনে এসে অ’ভিবাদন জানিয়ে সে বললো, আমি সুলতান সুলেমা’ন শাহর দূত। আপনার শহরের প্রান্ত সীমা’য় নদীর ওপারে আমা’দের উজির তাবু গেড়েছেন।

সুলতান জহর। আনন্দিত হয়ে বললো। তুমি এখন বি’শ্রাম করো, খানাপিনা সারো। তারপর সব শুনবো।

একজন আমিরকে বললো, একে খুব খাতির করে খাওয়াও। দেখো, যেন বদনাম না হয়।

নদীর ওপারে তাঁবু গেড়ে উজির প্রত্যাশা করে বসে থাকে। তার দূত কখন ফিরে আসবে, কি সংবাদ বহন করে আনবে সে চিন্তায় অ’ধীর হয়ে পথের দিকে চেয়ে থাকে। ধীরে ধীরে রাত বাড়ে, দূত ফিরে আসে না। উজিরের চিন্তা ক্রমশ দুশ্চিন্তায় রূপান্তরিত হতে থাকে। এমন সময় দেখা গেলো, সুলতান জহর শাহর উজির আমির ওমরাহদের নিয়ে তার সামনে এসে হা’জির হলো।

যথাযোগ্য বাদশাহী কেতায় পরস্পরের মধ্যে আলাপ পরিচয় পর্বশেষ হলো। সুলতান শাহর উজির করজোড়ে আমন্ত্রণ জানালো, আপনি যদি অ’নুগ্রহ করে আমা’দের শহরে পায়ের ধুলো দেন, ধন্য হবো।

সুলতান সুলেমা’নের উজির বলে, চলুন, সুলতানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবো বলেই তো এসেছি।

বি’রাট একটা’ দরবার কক্ষে প্রবেশ করলো তারা। দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে আমির ওমরাহরা উপবি’ষ্ট ও প্রান্তের ঠিক মা’ঝখানে এক শ্বেতপাথরের সিংহা’সনে সুলতান জহর শাহ। পিছনে সুলতানের দেহরক্ষী এবং প্রধান সেনাপতি। সারা দরবার কক্ষ পারস্য-গালি’চায় মোড়া। মা’থার উপরে ঝুলন্ত ঝাড়বাতি।

সুলতান সুলেমা’নের উজিরকে সাদর অ’ভ্যর্থনা করে বসানো হলো। সুলতান জহর শাহ উজিরের সম্মা’নে এক ভোজসভার আয়োজন করলো। নানারকম বাদশাহী খানাপিনীয় আপ্যায়িত করা হলো তাকে।

এর পর দরবার থেকে সবাই একে একে বি’দায় নিয়ে চলে যায়। শুধু সুলতান, তার উজির এবং সুলতান সুলেমা’নের উজির বসে রইলো।

সুলেমা’নের উজির উঠে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ জানিয়ে বললো, আপনি মহা’নুভব সুলতান। আপনার দরবারে আমা’র সুলতানের তরফ থেকে একটি আর্জি পেশ করছি। আমা’দের সুলতান আপনার কন্যার পাণি প্রার্থী। আমি তার কাছ থেকে যে সব উপহা’র উপটৌকন নিয়ে এসেছি, আপনি গ্রহণ করে ধন্য করুন।

সুলতান জহর শাহ উঠে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ জানালো। দরবারের সকলে অ’বাক! একি কাণ্ড, সুলতান স্বয়ং উঠে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ জানালেন সামা’ন্য এক উজিরকে। সুলতান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই বললো, আপনি প্রবীণ প্রাজ্ঞ উজির। আপনার প্রস্তাব আমি সর্বান্তিঃকরণে গ্রহণ করলাম। আমা’র কন্যা আপনার সুলতানের কেনা বাদী হয়ে থাকবে। আমি নিজেও তীর একান্ত অ’নুগত প্রজাতুল্য। আমা’র কন্যার পাণি প্রার্থনা করে যে প্রস্তাব তিনি পাঠিয়েছেন সে জন্য আমি তার কাছে চিরঋণী। হয়ে রইলাম!

সুলতান কাজীদের ডেকে পাঠায়। কাজীরা এসে তার কন্যার সঙ্গে সুলতান সুলেমা’নের শাদীনামা’ তৈরি করে দিলো। সুলতান জহর কাগজখানা হা’তে নিয়ে কপালে ঠেকিয়ে সম্মা’ন জানালো।

সুলতান উপস্থিত সকলকে মূল্যবান পোশাক এবং প্রচুর ধনরত্ন উপহা’র দিয়ে খুশি করলো। কন্যার সহচরী হয়ে যাবে যারা, সেই সব দাসী-বাদী বাছাই করা হলো। দশটা’ খচ্চরের পিঠে উপহা’র সামগ্রী বোঝাই করে, পরদিন প্রত্যূষে সুলতান জহর শাসীর সাজে সাজিয়ে কন্যাকে নিয়ে রওনা হয়ে, তিন দিনের পথ অ’তিক্রম করার পর উজির এবং কন্যাকে বি’দায় জানিয়ে আবার নিজের শহরে ফিরে এলো।

আরও তিনদিন চলার পর সবুজ শহরের এলাকায় পৌঁছে উজির এক অ’শ্বারোহীকে পাঠিয়ে সুলতান সুলেমা’নকে খবর পাঠালো : সংবাদ শুভ। পাত্রীকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি।

সুলতান সুলেমা’ন উত্তেজনায়, আনন্দে অ’ধীর হয়ে নিজের গায়ের মহা’মূল্যবান শালখানাই দূতের হা’তে তুলে দেয়।

সারা শহরে আনন্দের হিল্লোল জাগে। তাদের সুলতান শাদী করছেন। এবার সিংহা’সনের নতুন উত্তরাধিকারীর সম্ভাবনা উজ্জ্বল হলো। শহরবাসীরা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে নিজেরা এসে মনোহা’রী সাজে প্রাসাদ সাজাতে থাকে। আলোয় আলোয় ভরে ওঠে শহরের পথঘাট।

সেদিন রাতে সুলতান মধুযামিনী যাপন করে। প্রথম রাতেই বেগম অ’ন্তঃসত্তা হয়। সুলতান নতুন জীবন ফিরে পায়! তার সিংহা’সনের উত্তরাধিকারী আসবে। আনন্দে আত্মহা’রা হয়ে ওঠে।

দশ মা’স পরে বেগম এক পুত্র সন্তানের জন্ম দিলো। চাঁদের মতো ফুটফুটে সুন্দর ছেলে। আদর করে সুলতান তার নাম রাখে তাজ অ’ল মুলুক।

ছেলের যখন সাত বছর বয়স সেই সময় থেকে তার লেখাপড়া শিক্ষা-দীক্ষার জন্য শহরের প্রাচীন জ্ঞানীগুণী শিক্ষক নিযুক্ত করা হয়। তাজ অ’ল মুলুক লেখাপড়ায় বেশ মেধাবী। অ’ল্পকালের মধ্যেই সে নানা বি’ষয়ে পারদর্শী হয়ে ওঠে। লেখাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকে দেহচর্চা। ঘোড়ায় চড়া এবং অ’স্ত্রবি’দ্যা আয়ত্ত করে ফেলে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দক্ষতাও বাড়তে থাকে। আঠারো বছর বয়সে তাজ অ’ল মুলুক সর্বশাস্ত্ব বি’শারদ এক পরিপূর্ণ যুবক হিসাবে খ্যাতিমা’ন হয়ে ওঠে। সে যখন ঘোড়ায় চেপে শিকারে বেরুতে রাস্তার দু-ধারে আবালবৃদ্ধবনিতা জড়ো হয়ে তার রূপের প্রশংসায় উচ্ছসিত হয়ে উঠতো। শিকার তার বড় প্রিয় ছিলো। সঙ্গী সাখী নিয়ে মা’ঝে মা’ঝেই জঙ্গলে চলে যেত।

একদিন নদীর ধারে তাজ অ’ল মুলুক পাখি শিকারে বেরিয়েছে। এমন সময় দেখলো একদল সওদাগর তাদের উট খচ্চরগুলোকে ছেড়ে দিয়ে নদীর ওপারে তাবু গেড়েছে। সওদাগররা নদীর জলে নেমে রুজু করছে। শাহজাদা তাজ অ’ল মুলুক। একজন নফরকে পাঠিয়ে ওদের খবরাখবর জেনে আসতে বলে।

চাকরিটা’ এসে জিজ্ঞাসা করায় ওদের একজন বলে, আমরা বি’দেশী বণিক। চলতে চলতে পরিশ্রান্ত হয়ে এই নদীর ধারে তাঁবু গেড়েছি। এখানে দু’একদিন বি’শ্রাম করে আবার রওনা হবো। এখানকার শস্যশ্যামল প্রান্তর আমা’দের বড় ভালো লেগেছে।

চাকরাটা’ প্রশ্ন করে, তোমরা যে এই অ’জানা অ’চেনা দেশে তাবু ফেলেছে, ভয় করে না? যদি চোর ডাকাত-এর উপদ্রব হয়?

ওরা বলে, আমরা জানি সুলতান সুলেমা’ন শাহর দেশে চুরি রাহা’জানি হয় না। এখানকার মা’নুষ সুলতানের মতোই সৎ এবং ধাৰ্মিক। সুলতান সুলেমা’ন শাহর সত্যনিষ্ঠার খ্যাতি সর্বত্র। আর তা ছাড়া, আমরা শাহজাদা তাজ অ’ল মুলুকের কাছে ভেট নিয়ে যাচ্ছি। আমা’দের ভয় কী?

চাকরাটা’ ফিরে এসে তাজ অ’ল মুলুককে এ কথা জানাতেই সে ওদের কাছে এগিয়ে যায়। তার কাছেই ওরা যাচ্ছে! সঙ্গে উপহা’র সামগ্ৰী।। তাজ অ’ল মুলুক কিছুই বুঝতে পারে না।

শাহজাদাকে আসতে দেখে সওদাগররা এগিয়ে এসে সাদর অ’ভ্যর্থনা করে তীবুর ভিতরে নিয়ে যায়। নানারকম বাহা’রী জিনিসের সে কি বি’চিত্র মেলা। তাজ অ’ল মুলুক যা দেখে তাই পছন্দ করে বসে। এক এক করে অ’নেকগুলো সৌখিন জিনিস তার পছন্দ হয়। সওদাগররা সেগুলো একত্র করে বাঁধাৰ্ছদা করে শাহজাদার হা’তে তুলে দেয়। তাজ অ’লমুলুক জিজ্ঞেস করে, কত দাম? ‘

সওদাগররা নাক কান মলে জিভ কেটে বলে, ও কথা বলবেন না, হুজুর। আমরা আপনার গোলামের গোলাম। এই সামা’ন্য কাঁটা’ জিনিস পছন্দ করে নিয়ে আমা’দের ধন্য করেছেন। আমরা কি দাম নিতে পারি?

চাকরের হা’তে জিনিসগুলো নিজের তাঁবুতে পাঠিয়ে দিয়ে সওদাগরদের কাছ থেকে বি’দায় নিয়ে ঘোড়ার পিঠে চাপতে যাবে, এমন সময় এক বি’ষাদ বি’ষণ্ণ যুবকের দিকে তাজ অ’ল মুলুকের নজর পড়ে। ছেলেটি দেখতে বড় সুন্দর। কিন্তু কিসের যেন ব্যথা, কিসের যেন দুঃখ তাকে মুহ্যমা’ন করে রেখেছে। তাজ অ’ল মুলুক-এর আর চলে যাওয়া হয় না। ছেলেটির কাছে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে, তোমা’র চোখে জল কেন ভাই, কি নাম তোমা’র?

ছেলেটি শান্ত গলায় জবাব দেয়, আমা’র নাম আজিজ।

আর কিছু বলতে পারে না। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে।

তাজ অ’ল মুলুক সান্ত্বনা দিয়ে বলে, কেঁদ না, বন্ধু চুপ কর। দুঃখ সকলের জীবনেই আসে। তাই বলে তার কাছে নিজেকে বি’কিয়ে দেওয়া ঠিক না। বলো, তোমা’র কি দুঃখ। আমি যদি কাটা’তে পারি, কথা দিচ্ছি, প্ৰাণ দিয়েও তা করবো।

ছেলেটি শান্তভাবে বলে, সে কথা শুনে আপনার কি ফয়দা হবে? থাক।

তাজ রাগ করে, তোমা’র বি’শ্বাস হচ্ছে না। আমা’কে? কিন্তু সত্যি বলছি, তোমা’কে দেখামা’ত্র আমা’র অ’ন্তর কেঁদে উঠেছে। বলো বন্ধু, অ’সঙ্কোচে বলো, তোমা’র কাহিনী। তোমা’র দুঃখের কিছু ভাগ নিতে চাই।

ছেলেটি বলে, ঠিক আছে বলবো, চলুন আপনার তাঁবুতে গিয়েই বলবো। এখানে অ’নেক লোকের ভিডি।

ছেলেটিকে সঙ্গে নিয়ে তাজ তার তাঁবুতে ফিরে আসে। দুজনে মিলে খানাপিনা করে। তারপর ছেলেটি বলতে থাকে? আমি আমা’র বাবার একমা’ত্র সন্তান। ধনী সওদাগর হিসাবে বাবার বেশ নামডাক ছিলো। আমা’র কাক মা’রা যাওয়ার সময় তার একমা’ত্র মা’-হা’রা মেয়েকে আমা’র বাবার হা’তে তুলে দিয়ে যান। আমরা দুই ভাইবোন এক সঙ্গেই মা’নুষ হতে থাকি। ওঃ বলতে ভুলে গেছি, আমা’র নাম আজিজ আর আমা’র কাকার মেয়ের নাম আজিজা। আজিজার শাদির বয়স হলো। বাবা বললেন, ভাই মা’রা যাওয়ার সময় হা’তে ধরে বলে গিয়েছিলো, আজিজের সঙ্গে আজিজার যেন শাদী দিই।

আজিজের মা’ বলে, তা তো বেশ ভালোই হবে। মা’নাবেও ভালো। তা ছাড়া ছোট থেকে ওরা এক সঙ্গে হেসে খেলে মা’নুষ হয়েছে, এখন মেয়েটা’ পরের ঘরে পাঠাবে নাকি?

একদিন রাতে খান খেতে বসে বাবা বললেন, তোমা’কে শাদী করতে হবে।

আমি তো আশমা’ন থেকে পড়ি। হঠাৎ বলা নাই কওয়া নাই শাদী করতে হবে? আর তা ছাড়া পাত্রীই বা কোথায়? কাকে শাদী করবো! ঘরেই যে পাত্রী বাড়ছে সে কথা কিন্তু একবারও আমা’র মনে হয়নি। কিন্তু তা বলে আজিজা আর আমা’র মধ্যে ভালোবাসা যে কিছু কম ছিলো তা নয়। দুজন দু’জনকে ছেড়ে একটা’ দিন কাটা’তে পারতাম না। কোনও একটা’ ভালো জিনিস দেখলে সব আগে আজিজার কথাই আমা’র মনে পড়তো! তেমনি আজিজাও আমা’কে প্ৰাণ দিয়ে ভালোবাসতো। কোথাও কোনও ভালো খাবারদাবার পেলে আমা’র জন্যে তুলে রাখতো। বলতো, খাও, তুমি খেলেই আমা’র খাওয়া হবে।

এহেন যে সম্পর্ক-ত যে একদিন স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসায় আবদ্ধ হয়ে যাবে তা কিন্তু আমি ভাবতেই পারিনি। বাবা একটু কৰ্কশভাবেই আবার বললেন, আগামী জুম্মা’বার সন্ধ্যায় তোমা’দের শাদীর দিন ঠিক করা হয়েছে। তোমা’র বন্ধুবান্ধবদের—যাদের ডাকতে চাও নিমন্ত্রণ করে এসো।

বাবার ওপরে কথা বলার সাহস আমা’র ছিলো না। মা’থা গুজে খেয়ে দেয়ে উঠে পড়লাম।

শুক্রবার দিন নামা’জ শেষ করেবাড়ি ফিরবো হঠাৎ মনে পড়লো, এক বন্ধুকে এখনও বলা হয়নি। ওর বাড়ির দিকে হেঁটে চললাম। দুপুরের বাঁঝা করা রোদ। একেবারে লু বইছে। চোখমুখ ঝলসে যাবার দাখিল। আমি আর চলতে পারি না। সামনেই একটা’ বাগিচা। ভিতরে ঢুকে পড়লাম। একটা’ গাছের ছায়ায় শান বাঁধানো চকুতরায় বসে একটু জিরিয়ে নেবো। তারপর রোদের ঝাঁঝাঁটা’ একটু কমলে আবার বেরিয়ে পড়বে—এইরকম ইচ্ছা!

ঝির ঝির করে হা’ওয়া দিচ্ছে। একটা’ রুমা’ল বি’ছিয়ে চাবুতরার উপরে শুয়ে পড়ি।

একটু বোধ হয় তন্দ্ৰা লেগেছিলো। হঠাৎ খট করে একটা’ শব্দ হতেই কেটে গেলো। চেয়ে দেখি একখানা লাল রঙের রুমা’লে কি যেন একটা’ বস্তু পড়ে আছে আমা’র কাছেই। তুলে নিয়ে খুলে দেখি, রুমা’লে বাঁধা এক টুকরো পাথর। এদিক ওদিক চাইলাম! দেখি, সামনের বাড়ির দোতলার একটি জানোলা খোলা। তার পাশে বসে এক পরমা’ সুন্দরী কন্যা। বুঝলাম রুমা’লখানা সে-ই ছুঁড়েছে।

সেই মুহুর্তে আমা’র মনের মধ্যে কি যে ঘটে গেলো বোঝাতে পারবো। না। মনে হলো, যাকে প্রণয় বলে, প্রেম বলে—তার প্রথম আস্বাদ পেলাম। নারী আমা’র শৈশবকালের সঙ্গী। কিন্তু এই উন্মা’দনা সে আমা’র অ’ন্তরে জাগাতে পারেনি।

রুমা’লখানার এক কোণে কয়েকটা’ কথা লেখা ছিলো : পথিক, তুমি কি পথ হা’রাতে চাও না? যে পথে চলেছে তার বাইরে তো আরও অ’নেক অ’চেনা অ’জানা দুৰ্গম পথ আছে। সেই পথে পাডি দেবার মজা কি পেয়েছে কখনও?

সেই মুহুর্তে ভালোবেসে ফেললাম সেই অ’জানা অ’চেনা সুন্দরীকে। আমা’র চিত্ত বি’হ্বল হলো। ভুলে গেলাম সেই দিন সন্ধ্যায় আমা’র শাদী।

মেয়েটি আমা’কে অ’নেক রকম ইশারা করে কি সব বোঝাতে চাইলো। প্রথমে তর্জনী ঠোঁটে রাখলো। পরে দু’হা’ত দিয়ে বুকটা’ চেপে ধরলো। কিন্তু আমি তার একবৰ্ণও বুঝতে পারলাম না। একটু পরে জানালা বন্ধ করে দিলো।

আমি তবু ঠাঁয় বসে থাকি। আশা, আবার যদি খোলে, আবার যদি কিছু বলে! আবার যদি তার দেখা পাই। সেই আশায় একদূদ্ষ্টে চেয়ে রইলাম সেই রুদ্ধ কপাট জানালার দিকে। দুপুর গড়িয়ে বি’কেল হয়, বি’কেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। সন্ধ্যাও কখন রাত্রির রূপ ধারণ করে। কিন্তু বসে থাকি সেই চবুতরায়। আশা, যদি আবার সে জানালা খোলে!

কিন্তু না, জানালা আর খুললো না, ব্যর্থ মনে ঘরে ফিরে চলি’! বাবা ক্রুদ্ধ স্বরে বললেন, এই তোমা’র আক্কেল। আজ তোমা’র শাদী, আর তুমি কিনা দুপুর রাতেবাড়ি ফিরলে। এমন যার দায়িত্ব বোধ তার হা’তে মেয়ে দেওয়া নিবুদ্ধিতা। এ শাদী হবে না। আমি বাতিল করে দিলাম।

মা’ কান্নাকাটি করলেন। কিন্তু তিনি বাবাকে ভালো করেই জানতেন। বাবার রাগ বড় চণ্ডাল। একবার না’ বললে, ‘হ্যা’ করানো শক্ত!

আজিজা এলো। আমা’র হা’ত দু’টো ধরে পাশে বসালে, কি হয়েছে বলতো ভাই। আমা’র কাছে লুকিয়ো না, খুলে বলো।

জীবনে কখনও কোনও কথা আজিজার কাছে আমি গোপন করিনি। আজও পারলাম না। সব বললাম।

-প্রথম দৰ্শনেই ভালোবাসা কাকে বলে আমি জানি না। আজিজ, কিন্তু আজ ঐ মেয়েটিকে দেখার পর থেকে সারা দেহমা’নে আমা’র ঝড় উঠেছে। কিছুতেই মন শান্ত করতে পারছি না। কিছুতেই তার মুখচ্ছবি’ মুছে ফেলতে পারছি না। তুমি বলতে পারো আজিজ, এমন কেন হলো! এর কি নাম?

আজিজা বলে, এরই নাম ভালোবাসা। তুমি ওকে ভালোবেসে ফেলেছে।

আমি বাধা দিয়ে বলি’, না না, আজিজ, সে কি করে হয়? আমি তো তোমা’কে ভালোবাসি।

–না। আজিজ। তোমা’র আমা’র সম্পর্ক যে ভালোবাসার, এ ভালোবাসা সে ভালোবাসা নয়। একে বলে প্ৰেম।

আমি চমকে উঠি। প্ৰেম!

আজিজা আমা’কে সোহা’গ জানিয়ে বলে, তুমি কিছু ভেবো না। আজিজ, আমি তোমা’কে সাহা’য্য করবো। তুমি জীবনে সুখী হবে। তোমা’র মুখে হা’সি দেখবো, এর চেয়ে বড় কিছু নেই আমা’র কাছে। তোমা’র জন্যে আমা’র বুকের কলি’জাও ছিঁড়ে দিতে পারি। শুধু আমা’র একমা’ত্র কামনা তোমা’কে খুশি করা। এখন বলো তো মেয়েটা’ তোমা’কে কিছু বলেছে কিনা।

আমি বললাম, অ’ত দূর থেকে কথা বলবে কি করে! এই রুমা’লখানা সে ছুঁড়ে দিয়েছে। আর হা’তের ইশারা করে কি সব বোঝাতে চেয়েছে—আমি কিছুই বুঝতে পারিনি।

—কী ইশারা করেছে।

—প্রথমে হা’তের একটা’ আঙুল ঠোঁটে রাখলো। পরে হা’ত দু’টো বুকে চেপে ধরলো।

আজিজ বলে, বুঝেছি, ও তোমা’কে চুম্বন জানিয়েছে। আর তার হৃদয় তোমা’কে সমর্পণ করতে চেয়েছে। তুমি নিশ্চিত থাক, আজিজ আমি তোমা’দের দু’জনের মিলন ঘটিয়ে দেব। এখন দিন দুই তুমি বি’শ্রাম করো। তারপর আবার তোমা’কে আমি পাঠাবো সেখানে।

আজিজার কোলে মা’থা রেখে আমি তার অ’নেক আদর সোহা’গ খেলাম। নানাভাবে প্রবোধ দিয়ে সে আমা’কে আশ্বস্ত করতে থাকলো। দুদিন পরে বি’কেলে সে নিজে হা’তে আমা’কে সাজালো। দামী পোশাক পরলো। আন্তর ছড়ালো শরীরে।

বললো, যাও। কিন্তু তাড়াতাডি ফিরবে। আমি তোমা’র পথ চেয়ে বসে থাকবো।

বাগিচায় ঢুকে সেই চবুতরায় বসে অ’ধীর আগ্রহে বন্ধ জানালার দিকে তাকিয়ে থাকি। এক এক মুহূর্ত মনে হয় এক এক যুগ। একটু পরে জানোলা খুলে যায়। সেই মৃ’গনয়না ষোড়শী। বুক ভরা যৌবন নিয়ে জানালার গরাদ ধরে দাড়ন। এক হা’তে আয়না আর অ’ন্য হা’তে একখানা রুমা’ল। রুমা’লখানা তিনবার ভাঁজ করলো আবার খুললো। রুমা’ল সুদ্ধ হা’তখানা একবার উপরে একবার নিচে উঠাতে নামা’তে থাকে। আয়না দিয়ে তিনবার আমা’র মুখে আলো ফেলে। এর পর গায়ের জামা’টা’র অ’স্তিন গুটা’তে গুটা’তে ধবধবে ফর্সা বাহুমূল পর্যন্ত উন্মুক্ত করে দেখায়। সব শেষে ডান হা’তের পাঁচটা’ আঙুল প্রসারিত করে বুকের ওপর চেপে ধরে। এর পর জানালা বন্ধ করে দেয়।

আমি কিছুই বুঝতে পারি না। ছুটেবাড়ি আসি। আজিজকে সব ইশারাগুলো দেখাই।

আজিজা বললো, এর অ’র্থ হলো, পাঁচদিন পরে সে তোমা’কে তার হৃদয়ের কথা বলবে। ওদের বাড়ির কাছাকাছি একটা’ কাপড় রং করার দোকান আছে, সেখানে তুমি অ’পেক্ষা করবে।

আমি আনন্দে লাফিয়ে উঠি, তুমি ঠিকই বলেছ। আজিজ। ওদের বাড়ির কাছেই একটা’ জহুরীর দোকান আছে। জামা’কাপড় রং করে। কিন্তু আজিজ, পাঁচটা’ দিন তাকে না দেখে আমি বাঁচবো কি করে?

আজিজ বলে, ভালোবাসা বড় বি’ষম বস্তু। কোনও কোনও সময় বছরের পর বছর তার জন্যে অ’পেক্ষা করে বসে থাকতে হয়। তবে দেখা মেলে। তোমা’কে মা’ত্র পাঁচটা’ দিন অ’পেক্ষা করতে হবে, পারবে না? মনটা’ একটু শক্ত কর, সোনা, অ’ত অ’ধৈর্য হলে কি চলে? ওঠ, একটু কিছু মুখে দাও। শরীরে বল পাবে।

কিন্তু আমা’র মুখে কিছু রুচে না। কিছুই খেতে পারি না। সারা রাত এক ফোটা’ ঘুমা’তে পারি না। এই প্রথম অ’নুভব করতে থাকলাম ভালোবাসার কি বি’ষম জ্বালা।

এই পাঁচটা’ দিনের অ’সহনীয় প্রতিটি মুহূর্ত আমা’র পাশে পাশে থেকে আজিজা আমা’কে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা’ করেছে। সে ঋণ আমি কোনওদিন ভুলবো না।

পাঁচদিন পরে সে আমা’কে গরম জল করে দিলো, আমি হা’মা’মে গিয়ে ভালো করে গোসল করলাম। নিজে হা’তে আমা’কে সুন্দর করে সাজিয়ে দিলো সে।

—যাও আর দেরি করো না। সে হয়তো এসে ফিরে যেতে পারে। তার চাঁদ মুখ দেখে নয়ন সার্থক করে এসো। রাতে ঘুমিয়ে তাকে স্বপ্ন দেখতে পারবে।

আমি হন হন করে হেঁটে চললাম। কিন্তু গিয়ে দেখি দোকানটা’ বন্ধ। খেয়াল হলো, আজ শনিবার-বন্ধের দিন। যাই হোক, বন্ধ দরজার সামনে রোয়াকের উপর বসে রইলাম। সন্ধ্যাবেলার নামা’জের সময় হয়ে গেলো। কিন্তু তার দেখা নাই। একটু পরেই রাতের অ’ন্ধকার নেমে আসবে। ভাবলাম, আর বি’লম্ব করা সমীচীন হবে না। উঠে দাঁড়িয়ে মদ্যপ মা’তালের মতো প্রায় টলতে টলতে ঘরে ফিরে আসি। আজিজকে কোনরকমে বলতে পারি, আসেনি। দেখা হয়নি।

তারপর আমা’র আর চৈতন্য ছিলো না। পরদিন সকালে চোখ মেলে দেখলাম, আজিজার কোলে মা’থা রেখে শুয়ে আছি। আমি জিজ্ঞেস করলাম, সারা রাত তুমি ঘুমা’ওনি?

—কি করে আর ঘুমা’ই বলো! তুমি যা ভুল বকেছো, আমা’র তো ভয়ই লেগে গিয়েছিলো। আমি বললাম, কিন্তু সে এলো না কেন আজিজা?

–এও ভালোবাসার একরকম পরীক্ষা। সত্যিই তুমি তাকে ভালোবাস কিনা এবং তার জন্যে কতটা’ ধৈর্য তোমা’র আছে সে পরীক্ষাও সে করে নিলো। যাই হোক, আজি বি’কেলে আবার তুমি বাগিচায় গিয়ে বসে। দেখবে, নতুন কোনও ইশারা জানাবে।

বি’কেলে যথারীতি আজিজা আমা’কে সাজিয়ে গুছিয়ে রওনা করে দিলো। বাগিচার চবুতরায় এসে বসে রইলাম। একটু পরে জানালা খুলে গেলো। এবার দেখলাম তার এক হা’তে একটা’ বঁটুয়া এবং একখানা আয়না অ’ন্য হা’তে একটা’ লণ্ঠন এবং একটা’ ফুলদানী।

প্রথমে আয়নাখানা বটুয়ায় ভরলো। বটুয়ার দডিটা’ এঁটে বন্ধ করে পিছনের দিকে ছুঁড়ে দিলো। তারপর মা’থার চুলগুলো খুলে আলুথালু করে মুখটা’ ঢেকে ফেললো। এরপর সে ফুলগুলোর মধ্যে ঢুকিয়ে রাখলো লণ্ঠনটা’। এর একটুক্ষণ পরেই জানালা বন্ধ করে দিলো।

আমি কিছুই বুঝলাম না। হা’হা’কার করা রিক্ত হৃদয় তুষানলে জ্বলতে থাকলো।বাড়ি ফিরে এসে আজিজকে বললাম।

আজিজ ব্যাখ্যা করে জানালো, আয়নাটা’ বটুয়ার মধ্যে ভরে পিছনে ফেলে দেওয়ার অ’র্থ—দিন শেষ হলে যখন রাত্রি নেমে আসবে। কালো চুলগুলো এলোমেলো করে ফর্স মুখটা’ ঢাকার অ’র্থও ঐ একই। সূর্যের আলো যখন অ’ন্ধকারে ঢেকে যাবে। ফুল—অ’র্থাৎ ফুলবাগানে মা’নে ঐ বাগিচায় যাবে তুমি। আর লণ্ঠন দিয়ে বোঝাতে চেয়েছে, একটা’ আলো দেখতে পাবে। সেই আলো অ’নুসরণ করে গেলেই তুমি তোমা’র ভালোবাসার দেখা পাবে।

এবার আর আজিজার কথা আমা’র বি’শ্বাস হয় না।–তোমা’র কথা মতো যাচ্ছি, কিন্তু দেখা তো হচ্ছে না।

আজিজ বললো, ধৈর্য ধরো, আবার যাও। দেখবে এবার তুমি ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসবে না।

সত্যিই সেদিন তার দেখা পাওয়া গেলো। সন্ধ্যার অ’ন্ধকার সবে ঘনিয়ে এসেছে। বাহা’রী সাজে। সেজেগুজে বাগিচার সামনে আসতেই দেখি সদর ফটকটা’ খোলা। ভিতরে ঢুকলাম। অ’দূরে একটা’ ঝাপড়া গাছের নিচে একটা’ চিরাগ জুলছিলো। আলোটা’ লক্ষ্য করে চলতে থাকি। আলোটা’ও চলতে থাকে। এইভাবে এক সময় এসে ঢুকলাম এক বি’শাল জলসাঘরে।

দরজা জানালায় দামী রেশমী পর্দাঁ। মেজেয় পারস্য গালি’চা। উপর থেকে ঝুলছে বি’রাট বি’রাট ঝাড়বাতি। টেবি’লে নানারকমের বাদশাহী খানাপিনী। একপাশে ফরাশের ওপর রাখা নানা দেশের নানা জাতের বাদ্যযন্ত্র। কিন্তু ঘরে কেউ নাই। একেবারে জনমা’নবশূন্য। ফাঁকা। শুধু আমি একা বসে রইলাম। ভাবছি, এই বুঝি সে আসবে, এই বুঝি তার পায়ের শব্দ শুনলাম। কিন্তু না। পুরো তিনঘণ্টা’ কেটে গেলো। খিদেয় পেট জুলছে। সামনে লোভনীয় খানাপিনা। আমা’র প্রিয় আঙুর। কিন্তু খাই কি করে। যার আমন্ত্রণে এসেছি, তারই দেখা নাই। কিন্তু কতক্ষণ আর অ’পেক্ষা করা যায়। পেটে ক্ষিদে আর সামনে খাবার রেখে বসে থাকার কোনও মা’নে হয় না। খান কয়েক পিস্তার বরফঁী তুলে নিয়ে খেতে থাকলাম। ওফ, কি অ’পূর্ব স্বাদ! এমন জিনিস তো আগে কখনও খাইনি। কতগুলো খেয়ে ফেলেছিলাম বলতে পারবো না। এক সময় দেখলাম রেকবীখানা খালি’ হয়ে গেছে। কিন্তু খিদে একটুও কমলো না। এর পর রসালো ‘বাককালাবাহ’ গুলো একে একে সব গলাধঃকরণ করে নিলাম। তখন আমা’কে খাওয়ার নেশায় পেয়ে গেছে। সফেদ হা’লওয়ার রেকবীও শূন্য হয়ে গেলো। এর পর আমি মোরগ-মোসল্লাম-এর দিকে নজর দিলাম। এক এক করে চারটেই সাবাড় করে ফেললাম। সবগুলো খাবারই অ’পূর্ব স্বাদের। যেখানে যা ছিলো সব চেটেপুটে খেয়ে পেটটা’ বেশ ভরে গেলো। ঝারি থেকে পেয়ালা পেয়ালা সরাব ঢেলে নিয়ে এক এক চুমুকে নিঃশেষ করে দিতে থাকলাম। ধীরে ধীরে মা’থাটা’ ভারি হয়ে আসতে থাকে। চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসে। জোর করে জেগে থাকার চেষ্টা’ করি। কিন্তু ঘুম আমা’কে রেহা’ই দিলো ঈষত না। কার্পেটের উপর অ’ঘোরে ঘুমিয়ে পড়লাম।

এর পর আর বলতে পারবো না, সারা রাতে কিছু ঘটেছে কি না। যখন ঘুম ভাঙ্গলো, দেখলাম জানোলা দিয়ে সোনালী রোদ এসে পড়েছে আমা’র মুখে। হঠাৎ অ’নুভব করলাম, আমি রিক্ত মেজের উপরে শুয়ে আছি। সারা মেজেয় নুন ছড়ানো। কীটা’র মতো বি’ধছে। কে যেন পেটের উপর রেখে গেছে এক রাশ কয়লায় গুড়ো। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। এদিক ওদিক ভালো করে দেখলাম। নাঃ, কেউ কোথাও নাই। সারা শরীর রীরী করতে লাগলো। নিজের নিবুদ্ধিতার জন্যে নিজের হা’ত কামড়াতে লাগলাম।। প্রায় দৌড়তে দৌড়তেবাড়ি ফিরে এসে আজিজার কাছে আছাড় খেয়ে পড়ি।

আমা’র ঐ কিন্তুত কিমা’কার চেহা’রা দেখে ভীতচকিত আজিজা আমা’কে টেনে তোলে, কী সোনা, একি দশা হয়েছে তোমা’র! কেউ কী মা’রধোর করেছে?

–না।

–তবে?

—জানি না। আমি ঘুমিয়েছিলাম। সকালে উঠে দেখি কে বা কারা আমা’র সর্বাঙ্গে কয়লার গুড়ে ঢেলে দিয়ে গেছে।

আজিজা অ’বাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, মেয়েটা’ বলতে পারলো না?

–মেয়েটা’র সঙ্গে আমা’র দেখা হয়নি।

—সে কি, তোমা’র ঘুম ভাঙ্গার আগেই কেটে পড়েছে?

আমি অ’ধৈর্য হয়ে উঠি।—আসলে তো কেটে পড়বে। আদপেই সে আসেনি।

আজিজা আরও অ’বাক হয়। মেয়েটা’ এলো না। অ’থচ তুমি তার ঘরে গেলে কি করে?

আমি সব বললাম। আজিজা হতভম্ব হয়ে বসে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর বললো, ভয়ে আমা’র আত্মা’ শুকিয়ে যাচ্ছে আজিজ। মেয়েটা’র হা’তে তোমা’র অ’নেক দুঃখ আছে। নুনের অ’র্থ হলো—তোমা’র দেহের যৌবন অ’পুষ্ট। যে কারণে নারী সম্ভোগের কামনার চেয়ে আহা’র এবং নিদ্ৰাই তোমা’র কাছে প্রধান মনে হয়। আর কয়লার গুড়োর মা’নে হচ্ছে-তার চোখে তুমি অ’তি ঘূণ্য। মেয়েটা’র ধারণা, তুমি সেখানে শুধু খাওয়া আর ঘুমা’নোর জন্যেই যাও। তার দেহ যৌবন বা ভালোবাসা তোমা’র কাছে তেমন কোনও লোভনীয় ব্যাপার নয়। সেই কারণে আমা’র মনে হয়, তোমা’র সেখানে আর না যাওয়াই উচিৎ।

আজিজার কথা শুনে আমি বুক চাপড়াতে লাগলাম।–ইয়া আল্লাহ, সব দোষ তো আমা’র। বুকে যদি ভালোবাসার আগুন জ্বলতে থাকে। তবে কি আর নাওয়া খাওয়ার কথা মনে আসে। প্রেম এমনই বস্তু যা চোখের ঘুম কেড়ে নেয়। কিন্তু আমি তো সেই তুচ্ছ রসনা তৃপ্ত করতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। এইভাবে প্রেমের অ’পমা’ন করলে কোন প্রেমিকাই সহ্য করে না। সেদিক থেকে ওর তো কোনও দোষ দিতে পারি না। এখন আমা’র কী হবে। আজিজ, সে যদি আমা’কে প্রত্যাখান করে আমি বাঁচবো না। একটা’ কিছু উপায় বাৎলে দাও, সোনা।

আমা’র দুঃখ দেখে আজিজও ব্যথিত হয়। এ জীবনে আমা’কে ছাড়া আর কিছুই সে জানে না। আমিই তার ধ্যান জ্ঞান। আমা’র সুখেই তার সুখ। আমা’র দুঃখে সে কাতর হয়। আমা’কে কী ভাবে হা’সিখুশি রাখবে তার চিন্তাতেই সে পাগল। তা না হলে কোনও মেয়ে তার ভালোবাসার ধন অ’ন্য মেয়ের হা’তে তুলে দিতে পারে? আমি বুঝতে পারি, আজিজার অ’ন্তরে তুষের আগুন জলছে। কিন্তু কী অ’সাধারণ চাপা মেয়ে, মুখে তার বি’ন্দুমা’ত্র প্রকাশ নাই।

—শোনো, আজিজ, আমা’র তরফে যতটা’ করা দরকার আমি করবো। কিন্তু তাতেই কী তুমি সুখী হবে? তাকে পাবে? তুমি তো জানি সোনা, তোমা’র বাবা আমা’র চাচা আমা’র শাদীর জন্যে চেষ্টা’ করছেন। শুনেছি পাত্বও নাকি ঠিক করে ফেলেছেন। তাই এখন আমা’কে তারা ঘরের বাইরে বেরুতে দেবে না। তাছাড়া তোমা’দের দু’জনের ভালোবাসার মধ্যে, আমি একটা’ ফালতু মেয়ে, আমা’র যাওয়াও ঠিক হবে না। আজ রাতে তুমি আবার যাও। কিন্তু সাবধান, ঘুমিয়ে পড়বে না। যদি খানাপিনার লোভ সামলাতে পারো তা হলে চোখের ঘুম ঠেকাতে পারবে। পেট ভরা থাকলে চোখে ঘুম আসেই। তাই বলছি, জিভ দিয়ে জল গড়ালেও খানাপিনা একদম ছোবে না। আল্লাহর উপর ভরসা রেখে যাও, আমা’র মনে হয়, আজ রাতে সে দেখা দেবে। সারাটা’ দিন ছটফট করে কাটা’লাম। সূর্য যখন পাটে বসলো আমি ততক্ষণে সেজেগুজে তৈরি। আমা’র পোশাকে আতর ছড়িয়ে দিতে দিতে আজিজা বললো, আমা’র কথা মনে আছে তো?

–কি কথা?

—বাঃ রে, তোমা’কে বলেছিলাম না, যখন তোমা’র ‘ভালোবাসা’ তোমা’য় সোহা’গ করবে, তখন একটা’ প্রেমের গান শোনাবে তাকে। আমা’র মনে পড়ে। আজিজা আমা’কে একটা’ ভালোবাসার

আজিজা বলতো, গানের গলা নাকি আমা’র চমৎকার।

দেখলাম, ওরা দু’গাল বেয়ে জলের ধারা নেমেছে।

—আজিজ তুমি কাঁদছো।

–না না, কই না তো।

ওড়নার আঁচল দিয়ে চোখ দু’টো মুছে ফেলে বলে, ও কিছু না। চোখে একটা’ কুটো পড়েছে।

আমা’র তখন ভালোবাসার ভীমরতি ধরেছে। আজিজার অ’ন্তরের ব্যথা তলি’য়ে দেখার ফুরসৎ নাই।

আজিজ আমা’কে বি’দায় দিতে দিতে বলে, দেখে শুনে যেও। আর যা যা বলে দিয়েছি মনে থাকে যেন।

সেদিনও গিয়ে দেখি, সাজানো গোছানো আগের দিনের মতোই করা হয়েছে। কিন্তু কোথাও কোনও জন প্রাণী নাই। শূন্য ঘরে একা বসে রইলাম। প্রত্যাশা আজ সে আসবে। দেখা হবে। আমা’য় ভালোবাসায় ভরিয়ে দেবে। কিন্তু কেউ এলো না। অ’নেক রাত অ’বধি একা একা বসে রইলাম। খুব খিদে পেয়ে গেলো। আর থাকতে পারলাম না। ভাবলাম খেয়ে নিই। ঘুম যদি আসে জোর করে জেগে থাকবো। এক এক করে সব খানা পিনা চেটে পুটে খেলাম। আজ আমি খুব হা’ঁশিয়ার আছি ঘুম এড়াতেই হবে। চোখ দু’টো বুজে আসতে চায়। কিন্তু উঠে দাঁড়িয়ে, পায়চারী করে জেগে থাকার চেষ্টা’ করতে থাকলাম। কিন্তু বৃথাই চেষ্টা’। কখন যে ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম, বুঝতেই পারিনি। ঘুম ভাঙতে দেখি সকাল হয়ে গেছে। কিন্তু একি! আমি তো জলসাঘরে ছিলাম, এই ঘোড়ার আস্তাবলে এলাম কি করে? সারা শরীর কাদা-চোনায় মা’খমা’খি হয়ে গেছে। আমা’র পেটের ওপর কতকগুলো মা’ংসের হা’ড় আর একটা’ গোলাকৃতি বল। কিছু তরকারীর খোসা, কিছু শুকনো শুটি, দু’টো দিরহা’ম আর একখানা ছুরি। ঝেড়ে ঝুড়ে উঠে দাঁড়ালাম। শুধু ছুরিখানা হা’তে নিয়ে বাড়ির পথে ছুটে চললাম।

আমা’র সেই উদ্রান্ত চেহা’রা দেখে আজিজা বুঝলো, আজও কোনও অ’ঘটন ঘটে গেছে।

—তোমা’কে পইপই করে বারণ করলাম, তবু ঘুমিয়ে পড়েছিলে?

আমি কান্নায় ভেঙে পড়ি। কোন জবাব দিতে পারি না। আজিজা আমা’কে অ’নেক করেই বলেছিলো, খানাপিনার লোভ করলে ঘুম এড়াতে পারবে না। আমা’র নিজের সর্বনাশ। আমি নিজেই করছি। তার জন্যে কাকে দোষ দেব। আজিজা আমা’কে ভালো পরামর্শই দিয়েছিলো। কিন্তু আমি তা মা’নিনি। তার অ’বশ্যম্ভাবী ফল যা হবার তা-ই হয়েছে।

আজিজা আমা’র কাছে এসে পাখা দিয়ে হা’ওয়া করতে থাকে। মা’থায় হা’ত বুলি’য়ে দেয়। বলে, তুমি ভীষণ বোকা। এখনও বুঝতে পারছে না মেয়েটা’ কি বোঝাতে চায়?

আজিজার প্রশ্নের জবাবে গতরাতের সবই খুলে বলতে হলো।

আজিজা শুনে কপাল চাপড়াতে থাকলো—তোমা’কে তো আমি তোতাপাখির মতো পড়িয়ে দিলাম, সোনা, যত লোভই হোক, খানা খাবে না, মদ ছোবে না। তা আমা’র বারণ শুনলে না কেন?

আমি চিৎকার দিয়ে উঠি।-যা হবার তো হয়ে গেছে। এবার বলো, কি করবো? তাকে না। পেলে আমি মরে যাবো।

আজিজা বলে, ঐ গোল বলটা’র মা’নে হচ্ছে-তোমা’র ভেতরটা’ ফাঁপা বেলুনের মতো, অ’ন্তঃসারশূন্য। শুধু হা’ওয়া ভরা। না আছে কোনও কামনা, না আছে কোন বাসনা। ঐ শব্জীর খোসাগুলো তোমা’র অ’পদার্থতার প্রতীক। আর ঐ শুকনো শুটিগুলো দিয়ে বোঝাতে চেয়েছে-তোমা’র প্রাণের সব রং রস শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। ভালোবাসার নাম গন্ধ নাই। আর ঐ মা’ংসের হা’ড়গুলো দেখে আমি ভয় পেয়েছি—বলতে আমা’র গা শিউড়ে উঠছে।

আমি অ’ধৈর্য হয়ে চিৎকার করি, কিন্তু ঐ ছুরিটা’। তার কথাতো বললে না? তাছাড়া ঐ দুটো দিরহা’মই বা কী?

আজিজা এক মুহূর্ত চুপ করে কি যেন ভাবে। তারপর বলে, শোনো, সোনা, ছুরিটা’র ইঙ্গিত বড় মা’রাত্মক। ঐ দু’টো রূপের দিরহা’ম তার দু’টো চোখের প্রতীক। ওটা’ দিয়ে বোঝাতে চেয়েছে, চোখের কসম খেয়ে সে বলছে ফের যদি তুমি ওখানে গিয়ে খানাপিনা করে নাক ডাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে তোমা’র গলা সে কেটে দেবে।

আজিজার কথা শুনে অ’ঝোরে কাঁদতে থাকি। —আমা’র কোনও পথ নাই। কিন্তু তাকে না। পেলে আমি বাঁচবো কি করে?

আজিজা বললো, যা হয়ে গেছে তার তো আর চারা নাই। এবার নিজেকে একটু শক্ত করা। যা বলি’ মন দিয়ে শোনো। আজ সারাটা’ দুপুর তুমি ঘুমা’ও। তারপর বি’কালে উঠে গোসল করে খানাপিনা করে নেবে পেট ভরে। আমি নিজে হা’তে খানা পাকাচ্ছি। তুমি যা যা খেতে ভালোবাসে সেই সব খানা তৈরি করবো খেতে রুচি হবে। পেট ভরে খেয়ে গেলে খিদেও পাবে। না। আর পেটে খাবার না পড়লে ঘুম আসবে না। তাছাড়া দুপুরে যা ঘুমা’বে। তারপর বড় একটা’ ঘুম পাবেও না।

আজিজার কথায় অ’নেকটা’ ভরসা হলো। বললাম, আমা’র মা’থার কসম খেয়ে বলছি, এবার আর কোনও নড়াচড় হবে না। যা যা বলবে, দেখে নিও, অ’ক্ষরে অ’ক্ষরে মা’নবো।

সারাটা’ দুপুর খুব ঘুমা’লাম। আমা’র শিয়রে বসে আজিজা হা’ওয়া করতে থাকলো। মা’থায় কপালে হা’ত বুলি’য়ে দিতে লাগলো। আমি আরামে ঘুমিয়ে পড়লাম।

বি’কেলে ঘুম থেকে উঠে শরীরটা’ বেশ ঝরঝরে মনে হতে থাকে। হা’মা’মে গিয়ে গোসল করে নিই। আজিজ নতুন সাজ-পোশাক এনে দেয়। এই পোশাক পরে আজিজার সঙ্গে আমা’র শাদী হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু ঘটনাচক্রে সে বি’য়ে ভেঙে গেছে।

আমি বললাম, এ পোশাক কেন আনলে আজিজা? এতো আমা’র শাদীর পোশাক?

—কিন্তু শাদী তো আর হলো না!

–হ’লো না মা’নে—আর কি হবে না?

আজিজা মা’থা নত করে মৃ’দু কণ্ঠে বলে, হবে না কেন? কিন্তু তখন কি আর এই পোশাকের দরকার হবে? শাহজাদীর সঙ্গে শাদী হবে, সাজপোশাকও বাদশাহী বাহা’রী হতে হবে।

আমি বলি’, কেন তোমা’র সঙ্গে হবে না?

—আমা’র শাদী অ’ন্য পাত্রের সঙ্গে ঠিক করছেন চাচা! তোমা’র সঙ্গেই তো একবার ঠিক হয়েছিলো। কিন্তু তুমি তো করছে না। চাচা আর কি করবেন। বাধ্য হয়েই অ’ন্য পাত্রের সন্ধান করেছেন।

আমি আর কোনও জবাব দিতে পারি না। মা’থা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকি। আজিজা আমা’কে আদর করে বলে, তাতে কি হয়েছে আজিজ। শাদী যার সঙ্গেই হোক, আমি তোমা’রই ছিলাম, তোমা’রই আছি, তোমা’রই থাকবো। আর তুমিও যাকেই চাও আমা’র তাতে কিছু যায় আসে না। এ জীবনে তোমা’কে না পেলেও শেষ বি’চারের দিন মিলন আমা’দের হবেই।

টস টস করে দু-ফোঁটা’ চোখের জল গড়িয়ে পড়ে। আজিজা বলতে থাকে, আজ তোমা’র পরম লগ্নের দিন। চোখের জল ফেলে তোমা’র অ’ভিসারের পথ পিছল করে দেব না। যাও, আজ তোমা’র মনস্কামনা পূর্ণ হবে। প্রিয়ার আদর সোহা’গে ভরে যাবে তোমা’র দেহ-মন। এতদিনের সাধ তোমা’র পূর্ণ হবে আজ। কিন্তু আজিজ সেই ভালোবাসার গানটা’ তাকে শোনাতে ভুলো না! তোমা’র মতো গানের গলা ক’জনের হয়। দেখবে, গানের সুরে মুগ্ধ হয়ে আরও কত আদর সোহা’গ করবে তোমা’য়। আমি আল্লাহর কাছে দেয়া মা’ঙছি, সোনা তোমরা যেন ক্ৰৌঞ্চ মিথুন হয়ে সারাজীবন এক হয়ে থাকতে পোর।

আজিজার মতো প্রেমিক। এ সংসারে হয় না। নিজের ভালোবাসার পাত্রকে সাজিয়ে গুছিয়ে অ’ন্য মেয়ের বাসরশয্যায় পাঠাতে পারে কাটা’ মেয়ে?

সন্ধ্যার অ’ন্ধকার নেমে এসেছে। বাগিচার সদর ফটকের সামনে এসে দাঁড়াতেই চোখে পড়লো সেই আলো। নিশানা ধরে এগিয়ে যেতেই পৌঁছে গেলো। সেই সাজানো গোছানো জলসা ঘরে। সেই একই দৃশ্য। খান পিনা সব যথাযথ রাখা আছে। নাই শুধু কোন জনপ্রাণী। আজ আমি আটঘাট বেঁধে এসেছি। কিছুতেই খাবার-দাবার স্পর্শ করবো না। আর ঘুম আজ আমা’র ধারে কাছেও ঘেঁসিতে পারবে না।

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত্রি গম্ভীর হতে থাকে। আমি ঠায় চুপচাপ বসে কডি কাঠ গুনছি। পাশের টেবি’লে খানাপিনা সাজানো আছে। ভুলেও ওদিকে নজর দিচ্ছি না। যদিও আজ আমি খেয়েই এসেছি, পেট বেশ ভর্তিই আছে। তবু বলা যায় না, বাদশাহী খানাপিনা, লোভ যদি না সামলাতে পারি। ধীরে ধীরে চারদিক নিঝুম নিশুতি নিস্তব্ধ হয়ে আসে। আমি গুন গুন করে গান গাই। মা’ঝে মা’ঝে রাত জাগা পাখির কর্কশ আওয়াজে চমকে উঠি। বাগিচার কোথাও হয়তো কোনও জানোয়ার-এর পায়ের শব্দ কান পেতে শুনি।

এইভাবে রাত্রির দ্বি’তীয় প্রহরও কেটে যায়। এবার ধীরে ধীরে হতাশা গ্রাস করতে থাকে। না, সে বুঝি আর আসবে না। আমা’র এত তোড় জোড় এত আশা আকাঙ্ক্ষা সব বুঝি ভেস্তে গেলো। প্রিয়া আমা’র প্রতি বি’রূপ হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

এই সময়ে কিছু নারী কণ্ঠের কলহা’স্যে চকিত হয়ে তাকিয়ে দেখি দশটি সুদর্শনা সখী পরিবৃতা হয়ে সে ঘরের ভিতরে এসে দাঁড়িয়েছে। মনে হলো, দশটি উজ্জ্বল তারার মা’ঝখানে সে এক আসমা’নের চাঁদ। গাঢ় নীল রঙের রেশমী শাড়ি পরেছে। সারা অ’ঙ্গ তার জহরতের গহনায় মোড়া। আরো কাছে এসে সে মুচকি হেসে বললো, বাঃ, চমৎকার। কিন্তু আজ তোমা’র ঘুম গেলো কোথায়, সাহেব। দিব্যি তো জেগে আছো দেখছি।

তোমা’র আগমনের খবর পেয়ে সে পালি’য়েছে, সুন্দরী।

সখীদের ইশারা করতেই তারা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো। সে আমা’র পাশে এসে বসলো।

দু’হা’তে আমা’কে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলো। গভীর আশ্লেষে চুম্বন করলাম তাকে। সেও প্রতিদান দিলো। তারপর কাপেটের উপর শুয়ে পড়লাম দুজনে। সারাটা’ রাত ধরে সে আমা’কে আদর সোহা’গ করতে থাকলো। আমিও তাকে আদর সোহা’গ করলাম। তার পরিপুর্ণ যৌবনবতি দেহটা’কে মনভরে উপভোগ করলাম। দুহা’তে তার বড় বড় ডাসা ডাসা স্তনদুটোকে চটকালাম, তার সারা শরীর চেটে পুটে অ’স্থির করে দিলাম। আহ্ তার যোনিতে মুখ দিয়ে রাখলাম, কি অ’সাধারন তার স্বাধ। তাকে কত বার যে সঙ্গম করলাম মনে নেই। আমা’র এত দিনের কামনা বাসনা আজ চরিতার্থ হলো। দুজনে দু’জনকে জড়িয়ে ধরে সুখ নিদ্রায় ডুবে গেলাম।

সকালবেলা ঘুম ভাঙতেই চেয়ে দেখি, অ’নেক বেলা হয়ে গেছে। আমি বললাম, আজ চলি’।

সে বললো, দাঁড়াও দু’টো কথা বলি’। সারা রাত তো মত্ত হয়েই কেটেছে। কি আলাপ পরিচয় কিছুই হয়নি। তা সাহেবের নাম কি?

-আমা’র নাম আজিজ। তোমা’র?

—আমা’র নাম দুনিয়া। আমা’র বাবা কপূর আর প্রবাল দ্বীপের সুলতান। আজ তোমা’কে একটা’ জিনিস উপহা’র দেব। ভালো করে রেখো। আমা’দের প্রথম মিলনের স্মৃ’তি চিহ্ন। আমি যখন তোমা’র কাছে থাকবে না, এই রুমা’লখানা আমা’র কথা মনে করিয়ে দেবে তোমা’য়। সূক্ষ্ম কাজ করা আছে এক কোণায়। আমা’র নিজের হা’তের কাজ।

এই বলে সে একখানা রেশমী রুমা’ল আমা’র হা’তে তুলে দিলো।

আমি বাড়ি ফিরে এসে দেখি আজিজা কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলি’য়েছে। আমা’কে দেখে সে হা’সলো।

—একি তোমা’র চেহা’রা হয়েছে, আজিজ।

–ও কিছু নয়, আজিজ। আমি বেশ আছি। তোমা’র খবর কি বলো? গত রাতের সব ঘটনাই যথাযথ খুলে বললাম তাকে। রুমা’লখানা ওর হা’তে দিয়ে বললাম, প্রথম মিলনের প্রীতি উপহা’র।

আজিজ। উৎফুল্ল হলো না। কোন উপদেশ দিলো না। শুধু বলতে পারলো, তুমি সুখী হয়েছ। আজিজ? তোমা’র মুখে হা’সি দেখে যেতে পারলেই আমা’র অ’নেক পাওয়া হবে।

আমি উদ্বি’গ্ন হয়ে প্রশ্ন করি, কোথায় যাবে, আজিজা?

–না মা’নে, চিরকালই তোমা’দের এখানে থাকবো নাকি? বি’য়ে শাদী করবো না? শ্বশুরঘর যাবো না?

–ওঃ, এই কথা।

–আমি হতাশ বলি’, আমা’কে ছেড়ে থাকতে তোমা’র কষ্ট হবে না, আজিজা?

—আমি যেখানে যাবো সেখানে কষ্ট বলে কিছু নাই।

আজিজার এই হেঁয়ালী ভরা কথার কোন অ’র্থ করতে পারলাম না। চেষ্টা’ করলাম না। কারণ তখন আমি সুখ, স্বপ্নে বি’ভোর।

আজিজ বললো, আমা’র সেই গানটা’ ওকে গেয়ে শুনিয়েছিলে?

—ও—ই-যাঃ! একদম ভুলে গেছি।

—ভুলে যাওয়াই স্বাভাবি’ক, আজিজ। যাক, আজ যদি মনে থাকে, গেয়ে শুনিও। ভালোবাসার মন্ত্র দিয়ে গড়া ঐ গানখানা। শুনলে, সে গুণী মেয়ে, নিশ্চয়ই তারিফ করবে।

বুঝলাম আমা’র এই ভুলে যাওয়ায় আজিজ আহত হয়েছে! স্বাভাবি’ক ভালোবাসার পাত্র যদি কোনও অ’নুরোধ রাখতে ভুলে যায় তা আমা’ৰ্জনীয় অ’পরাধ! আজিজার সঙ্গে আমা’র যা সম্পর্ক তা তো ভালোবাসা ছাড়া আর কোনও নামেই ব্যাখ্যা করা যায় না। আমি ওর হা’ত দুটো ধরে কাছে টেনে নিলাম। বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে আদর করে চুমু খেয়ে বললাম, আমা’কে মা’ফ করো সোনা, আজই তাকে শোনাবো তোমা’র গান।

সেইদিন সন্ধ্যাবেলায় বাগিচায় ঢুকতেই দেখি দুনিয়া নিজে দাঁড়িয়ে আছে, আমা’র হা’ত ধরে জলসাঘরে নিয়ে গিয়ে বসালো। সেদিন রাতে আমরা একসঙ্গে বসে খানাপিনা করলাম। আদর সোহা’গে আমা’র হৃদয় মন সে ভরিয়ে দিতে থাকলো। আমা’র জীবনে তখন যৌবনের ঢল নেমেছে। সেই অ’বি’শ্রান্ত বর্ষণে সব ভেসে একাকার হয়ে গেলো। সে রাতে আর আমরা ঘুমা’লাম না। একে অ’ন্যের দেহ আশ্রয় করে সারাটা’ রাত মধুর করে কাটিয়ে দিলাম।

ভোরবেলা বি’দায়ের পালা। হঠাৎ আমা’র মনে পড়লো আজিজার সেই ছলছল চোখ। আমা’র গানটা’ তাকে শুনিও। আমি বললাম, বি’দায় নেবার আগে তোমা’কে একটা’ গান শোনাবো। এই আমা’র স্মৃ’তি উপহা’র। যদি কোনওদিন তোমা’র কাছে নাই থাকতে পারি, তবে কখনও বৃষ্টিঝরা দিনে বাতায়ন পাশে বসে আমা’র কথা ভেবো।–আর আমা’র এই গানখানি গুণগুণ করে গোঁও, প্রিয়তমা’।

গান শেষ হতে না হতেই দুনিয়া চিৎকার করে ওঠে, থামো। এ গান তুমি কোথায় পেলে? কে শিখিয়েছে তোমা’কে?

আমি হতবাক। নিছকই একটা’ প্রেম-সঙ্গীত। তা শুনে দুনিয়া কেন এত ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলো। বললাম, গানটা’ আমা’র চাচার মেয়ে আজিজা আমা’কে শিখিয়েছে।

-সে তোমা’কে ভালোবাসে?

আমি চুপ করে থাকি। কিন্তু সে আরও জোরে চিৎকার করে ওঠে, বলো, চুপ করে থেক না।

আমি ঘাড় নাড়লাম।-হ্যাঁ সে আমা’কে প্ৰাণাধিক ভালোবাসে।

—তবে আমা’র সঙ্গে ঢং করতে এসেছে। কেন? একটা’ মেয়ের জীবন বরবাদ করে দিয়ে আর একটা’ মেয়েকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে এসেছো?

—আমি ছিনিমিনি খেলতে আসিনি সোনা, আমি তোমা’কে প্ৰাণ দিয়ে ভালোবেসেছি।

–ছাই করেছো। সে-ও তোমা’কে প্ৰাণ দিয়েই ভালোবাসে। তার জীবনটা’ নিয়েই বা এই রকম জুয়া খেললে কেন? বেচারী বোধ হয়। আর এতক্ষণে বেঁচে নাই।

আমি শিউড়ে উঠি, বেঁচে নাই? কে বলেছে তোমা’কে?

—কে আবার বলবে। আমি লি’খে দিতে পারি। সে আর জীবি’ত নাই! তুমি কি কিছুই বোঝা না, হা’ঁদা? গানটা’র মধ্যেই তো তা পরিষ্কার বলা আছে। যাও,বাড়ি যাও। দেখগে, সে আর এতক্ষণে এ জগতে নাই। ছিঃ ছিঃ আজিজ, একটা’ মেয়ের নিষ্পাপ ভালোবাসা পায়ে দলে কি করে পারলে তুমি আমা’র কাছে আসতে?

আমি মা’থা নিচু করে বসে থাকি। তুমি প্রেমের অ’যোগ্য পাত্ব। তোমা’র সঙ্গে আর আমা’র কোনও সম্পর্ক নাই। তুমি নিজে হা’তে তোমা’র প্ৰেমা’স্পদকে খুন করেছে। প্রেমের যে মর্যাদা দিতে পারে না, তার কাছ থেকেই আমিই বা কি পাবো। তুমি যাও, বি’দায় হও। তার কবরে একটা’ ফুলের তোড়া দিয়েও অ’ন্তত তোমা’র পাপের প্রায়শ্চিত্ত কর গে।

আমি ধীর বি’ষণ্ণ পায়ে বাড়ি ফিরি। বাড়ির কাছাকাছি আসতেই চমকে উঠি। একটু করুণ কান্নার রোল উঠেছে। অ’নেক লোকজন জড় হয়েছে।

দুনিয়া ঠিকই বলেছিলো। আজিজা আর ইহজগতে নাই। আজ ভোরেই সে মা’রা গেছে। জহর খেয়েছিলো।

আমা’র সারা শরীর অ’বশ অ’সাড় হয়ে আসে। কান্নায় মুখ ঢেকে বসে পড়ি। একি করলাম আমি। সাব-সব আমা’র দোষী!

সারাটা’ বছর ধরে শুধু কাঁদলাম। সেই প্রথম অ’নুভব করলাম, আমিও আজিজাকে ভালোবাসতাম। সে-ভালোবাসার আগুনের শিখা কোনদিনই লেলি’হা’ন ছিলো না। মৃ’দু মিষ্টি মোমের আলোর মতো সে প্রেম ছিলো স্নিগ্ধ-সুরভিত। সে যতদিন ছিলো—তার অ’ভাব অ’নুভব করতে পারিনি। আজ তার অ’ভাবে বি’শ্ব সংসার আমা’র কাছে বি’ষবৎ মনে হতে থাকে—জীবনের আর কোনও দাম নাই-বাঁচার আরও কোনও মা’নে নাই।

তবু বাঁচতে হয়। তাই আবার রোজগারের ধান্দায় বেরিয়ে পড়ি। দেশে দেশে ঘুরি। মন ভোলানো হরেক রকম বাহা’রী জিনিস ফিরি করে ফিরি। কিন্তু আমরা মন কিছুতে ভোলে না। অ’হরহ সেই এক চিন্তা-আজিজ। আমা’র নয়নের মণি-আমা’র কলি’জা।

 

আজিজের কাহিনী শুনে তাজ অ’ল মুলুক মুগ্ধ হয়ে বলে, দোস্ত আজিজ, দুনিয়াকে দেখার বড় বাসনা হচ্ছে। মেয়েটির রূপ যেমন বুদ্ধিও তেমনি অ’সাধারণ।

আজিজ বললো, তাতে কোনও সন্দেহ নাই।

তাজ তার অ’ভিপ্ৰায় ব্যক্ত করলো। আমি ভাবছি, যাবো সেই কপূর প্রবাল দ্বীপ। দেখবো সেই সুন্দরীর রূপ। আঁজলা ভরে পান করবো তার সুধা।

আজিজ বলে, খুব ভালো কথা। কিন্তু সে মেয়ে কি সহজে বশে আসবে?

–দেখা যাক। কিন্তু তার আগে তোমা’র সঙ্গে আমা’র একটা’ কথা-তোমা’কে আমি ছাড়বো না। আমা’র জিগরী দোস্ত। তোমা’র সঙ্গী সাখী সওদাগরদের বলে দাও, এখানেই তুমি আমা’র আশ্রয়ে থাকবে। ওরা যেন চলে যায়।

প্রাসাদে ফিরে এসে শাহজাদা তাজ অ’ল মুলুক প্রথমে বন্ধু আজিজের বসবাসের জন্য একটি মনোরম প্রাসাদতুল্য ইমা’রতের বন্দোবস্ত করে দিলো। দরবারে তাকে একটা’ উঁচু পদে বহা’ল করে মোটা’ বেতনের ব্যবস্থা করলো। চাকর-নফর দাস-দাসী যা প্রয়োজন সব দেওয়া হলো তাকে।

এরপর তাজ এসে নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে দেয়। সারা প্রাসাদে হৈচৈ পড়ে যায়। শাহজাদার গোসা হয়েছে। কেন, কেউ বলতে পারে না। তবে এটা’ ঠিক, রাগ করে দরজা বন্ধ করেছেন তিনি। এক সময়ে সুলতান সুলেমা’নের কানে গেলো, শাহজাদা নাওয়া খাওয়া বন্ধ করেছেন।

সুলেমা’ন উদ্বি’গ্ন হয়ে ওঠে, কেন?

কি চায় সে? তাজ-এর ছোটবেলা থেকেই এই এক কায়দা। কোনও কিছু চাইতে হলে সোজাসুজি সে চাইবে না।

উজির বলে, সে জানিনা জাঁহা’পনা, আপনি তো জানেন সে কারো সঙ্গে কোনও পরামর্শ করে না!

সুলতান বললো, ঠিক আছে, আমি নিজে তার সঙ্গে কথা বলবো।

সুলতান বুঝতে পারে পুত্র এক আদর্শন নারী প্রেমে আসক্ত হয়ে পড়েছে। তাকে আর কিছুতেই নিরস্ত করা যাবে না। তবু উজিরকে দিয়ে শেষ চেষ্টা’ করে দেখেন। উজির বলে, আমি শাহজাদাকে অ’নেক বোঝাবার চেষ্টা’ করেছি। সাত সমুদ্র তের নদী পারের দেশ কপুর—প্রবালদ্বীপ।

সুলতান প্রশ্ন করে, সে মেয়ের সন্ধান তাকে দিলো কে?

—এক বি’দেশী সওদাগর। বয়সে সে নবীন, শাহজাদারই উমর হবে। সে তার মনে রং ধরিয়েছে। দুনিয়ার মতো সুন্দরী কন্যা নাকি দুনিয়ায় নাই। তার চোখ, তার নাক, মুখ-এর গড়ন নিখুঁত। দুধে-আলতা গায়ের রং।

সুলতান সুলেমা’ন শাহ চিন্তিত হয়। —এমনি দূর দেশ থেকে পাত্রী না আনলে ছেলের পছন্দ হবে না? আমা’দের আশেপাশের সুলতান বাদশাহের ঘরে কি পরমা’ সুন্দরী মেয়ে জন্মা’য় না?

—খুব জন্মা’য়, জাঁহা’পনা। আপনি হুকুম করুন, এখুনি গাণ্ডখানেক এনে হা’জির করছি। বাজিয়ে দেখে নেবেন। যদি কেউ খুঁত ধরতে পারে, নাকে খত দিয়ে চলে যাবো। কিন্তু ছেলের যদি দিল বাঁধা পড়ে থাকে অ’ন্যখানে, তা সে যাকেই এনে দিন, মনে ধরবে না।

সুলতান তাজকে ডেকে বললো, মা’থা ঠাণ্ডা করে ভেবে দেখ বাবা। মেয়ের কোনও অ’ভাব নাই। যদি বলো, আমি পাঁচশো সুন্দরী বাঁদী এনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছি। তার মধ্যে দুনিয়ার সেরা সুন্দরী মেয়ে অ’নেক পাবে। তাও যদি পছন্দ না হয় আশেপাশের সুলতানদের ঘরে অ’নেক সুন্দরী মেয়ে পাওয়া যাবে। তাদের কাউকে পছন্দ কর।

কিন্তু তাজের সেই এক গোঁ। দুনিয়া ছাড়া দ্বি’তীয় মেয়ে সে দেখবে না।

সুলতান ভাবে, বেশি পিড়াপিড়ি করলে ছেলে বি’গড়ে যেতে পারে। উজিরকে বললো, আর ঘাঁটিয়ে লাভ নাই। তুমি কপূর-প্রবাল দ্বীপে যাত্রা কর।

ছেলেকে বললো, তোমা’র আব্দার আমি কখনও অ’পূর্ণ রাখিনি, বাবা। তাই আজ আমা’র অ’নিচ্ছা সত্ত্বেও কপূর প্রবাল দ্বীপের সুলতানের কাছে প্রস্তাব পাঠাচ্ছি। সে যদি আমা’র প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, তা আমি সহ্য করবো না। তার সালতানিয়ৎ গুড়ো করে দেব।

তাজ-এর বন্ধু আজিজকে ডেকে সুলতান জিজ্ঞেস করলো, কপূর-প্রবাল দ্বীপে যাওয়ার পথ ঘাট তোমা’র জানা আছে?

আজিজ জানায়, সে সেখান থেকেই আসছে। পথ ঘাট সব তার নখ-দর্পণে।

সুলতান সুলেমা’ন বললো, তাহলে তোমা’কে বাবা, উজিরের সঙ্গে যেতে হবে।

আজিজ মা’থা হোঁট করে সম্মতি জানায়, যে হুকুম, জাঁহা’পনা।

সুলতান উজিরকে বলে, আর দেরি করে লাভ নাই, উজির। চটপট রওনা হয়ে পড়। কপূর-প্রবাল দ্বীপে পৌঁছাতেই অ’নেক দিন কেটে যাবে।

দু এক দিনের মধ্যে নানা সুন্দর সুন্দর মূল্যবান উপহা’র উপটৌকন সঙ্গে নিয়ে উজির রওনা হয়ে যায়। সঙ্গে চললো আজিজ। অ’নেক খাল বি’ল নদ-নদী মরুপ্রান্তর পার হয়ে অ’বশেষে একদিন কপূর-প্রবাল দ্বীপের সীমা’নায় এসে তাবু গাড়লো। অ’শ্বারোহী দূত গেলো সুলতানের ইষ্ট দূরবীরে। সুলতান সাদরে অ’ভ্যর্থনা করে উজিরকে নিয়ে এলো প্রসাদে।

উজির সুলতান সুলেমা’ন শাহর উপহা’র সামগ্ৰী তুলে দেয় সুলতানের হা’ত।—সুলতানের তরফ থেকে আমি আপনাকে সুক্ৰিয়া জানাচ্ছি, জাঁহা’পনা। আপনি গ্রহণ করে কৃতার্থকরুন।

প্রচলি’ত রীতি অ’নুসারে শাহী মেহমা’নদের বি’শ্রামের আয়োজন করা হলো। একটি বি’লাস বহুল সুরম্য প্রাসাদে থাকার ব্যবস্থা হলো। খানা পিনা আদর আপ্যায়নের কোনও ত্রুটি রাখলে না। সুলতান। এইভাবে পাঁচ দিন বি’শ্রাম নেবার পর আলাপ আলোচনা শুরু হয়। এই এখানকার নিয়ম।

ছয় দিনের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে উজির হা’মা’মে গিয়ে ভালো করে গোসল সারলো। তারপর বাদশাহী উজিরের সাজ পোশাক পরে দরবারে এসে নিজের পরিচয় পত্র পেশ করে সুলতানের দর্শনপ্রার্থী হয়ে অ’পেক্ষা করতে থাকলো। ক্ষণকাল মধ্যে সুলতানের উজির নিজে এসে অ’ভ্যর্থনা করে দরবার কক্ষে নিয়ে গেলো!

উজির যথারীতি কুর্নিশ জানিয়ে সুলতান সমীপে তার সুলতান সুলেমা’ন শাহর প্রস্তাব পেশ করলো।

সুলতান ক্ষণকাল মৌন থেকে চিন্তা করলো। চোখে মুখে অ’জানা আতঙ্কের রেখা ফুটে উঠলো। কি জবাব দেওয়া যায় কিছুই ভাবতে পারে না। সুলতান সুলেমা’ন সবুজ শহরের মহা’প্রতাপান্বি’ত বাদশাহ। তাকে অ’খুশি করার মতো কোনও কথা বলতে গেলে ভাবতে হবে বৈকি! সে তার মেয়েকে খুব ভালো করেই জানে। এর আগেও কয়েকবার তার শাদীর উদ্যোগ করা হয়েছিলো। কিন্তু মেয়ের সেই এক গো, শাদী সে করবে না।

ভেবে কোনও কুল-কিনারা করতে পারে না। অ’বশেষে প্রধান খোজাকে ডেকে বললো, শাহজাদী দুনিয়াকে নিয়ে এসো।

খোজা কুর্নিশ জানিয়ে বেরিয়ে যায়। সুলতান বলে আমা’র কন্যা দুনিয়া বড় এক রোখা। তার জেদ কিছুতেই সে শাদী করবে না। আশে পাশের সুলতান বাদশাহের শাহজাদারা তার জন্যে পাগল। কিন্তু কিছুতেই তাকে রাজি করানো যাচ্ছে না। সে আসুক, আপনার সামনেই আমি মহা’মা’ন্য সুলতানের প্রস্তাব জানাবো। দেখুন, কি জবাব দেয়।

খোজা সেই গেলো তো গোলই। আর ফেরে না। খোজাকে খোঁজার জন্য আর একজন খোজা পাঠানো হলো। প্রায় ঘণ্টা’খানেক বাদে সে হা’ঁপাতে হা’ঁপাতে এসে বললো, জাঁহা’পনা, আমা’কে তাড়া করেছেন।

সুলতান বুঝতে পারে না, তাড়া করেছে? কে তাড়া করেছে?

—জী হুজুর, শাহজাদী।

–দুনিয়া?

–জী হুজুর।

–কেন?

খোজা বলে, আমি তাকে গিয়ে বললাম, সুলতান আপনাকে ডেকেছেন। তা তিনি আসছিলেন। সাজ গোজ সব হয়েই গিয়েছিলো। আমা’কে জিজ্ঞেস করলেন, হ্যারে, কেন ডেকেছে জানিস?

আমি বললাম, হ্যাঁ। আপনার শাদীর লেগে সবুজ শহরের সুলতান উজির এসেছেন।

এই কথা শুনা মা’ত্র, কি বলবো, জাঁহা’পনা, কোমর থেকে ইয়া বড় ছুরি বের করে আমা’কে তেড়ে এলেন তিনি, বাদর আগে বলি’সনি কেন? আমি তোর নাক কান সব কেটে নামিয়ে দেব। এই না শুনে, আমি চো দৌড় দিয়ে পালি’য়েছি। শাহজাদী চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে থাকলেন, আব্বাজানকে গিয়ে বল, ফের যদি আমা’র শাদীর কথা তোলেন তিনি, আমি আত্মঘাতী হবো! আমা’র হুবু স্বামী আমা’র মুখের সুরৎ দেখতে পাবে না। আর তাতেও যদি বাধা দেন, পাহা’রা বসিয়ে রাখেন আমা’র চারপোশ, আমি বাসর ঘরে স্বামীকে খুন করবো। তারপর নিজের কলি’জায় ছুরি বসাবো। বোরখা খুলে আমা’র চেহা’রা দেখার সুযোগ দেব না তাকে।

সুলতান উজিরের উদ্দেশে বললো, আপনি নিজের কানেই সব শুনলেন। এবার বলুন আমা’র কি কর্তব্য?

উজির এর কি পরামর্শ দেবে? সুলতান বললো, আপনি মহা’নুভব সুলতান সুলেমা’ন শাহকে আমা’র অ’ন্তরের শুভেচ্ছা জানিয়ে নিবেদন করুন, আমা’র কন্যার বড় এক রোখা স্বভাব। শাদীর কথা শুনলেই তার মা’থায় খুন চেপে যায়। আমিও জোর জবরদস্তি করি না। আমা’র এক মা’ত্র সন্তান এই দুনিয়া। যে কোন কারণেই হোক, তাকে যদি হা’রাই, সে শোকতাপ আমি সহ্য করতে পারবো না। আল্লাহ। আপনাদের যাত্ৰাপথ নির্বি’ঘ্ন করুন, এই প্রার্থনা করি।

আর দেরি না করে আজিজকে নিয়ে উজির সবুজ শহরের পথে যাত্রা করলো।

সুলতান শুনে ক্ৰোধে কাঁপতে থাকে। এত বড় স্পর্ধা। আমা’র প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান। দরবারের সব আমির ওমরাহদের জরুরী তলব পাঠানো হলো।

সুলতান হুকুম জারি করলো কপূর-প্রবালদ্বীপ আক্রমণ করতে হবে। আর তিলমা’ত্র দেরি না করে সেনাবাহিনী প্রস্তুত কর।

উজির উঠে দাঁড়িয়ে বললো, সুলতানের দরবারে-আমা’র একটা’ আর্জি আছে জাঁহা’পনা, কপূর-প্রবাল দ্বীপের সুলতানের কোন দোেষই নাই। তিনি আমা’দের আদর যত্নের কোন ত্রুটি রাখেননি। সুলতানের প্রস্তাবে তিনি নিজেকে ধন্য মনে করেছেন। কিন্তু বাধ সোধেছে তার অ’বাধ্য

সেই বরকেই সে খুন করবে, পরে নিজেও আত্মঘাতী হবে। তার বাবাও আপনার মতোই ক্রুদ্ধ হয়েছেন মেয়ের উপরে।

সুলতান সুলেমা’নের রাগ কিছুটা’ প্রশমিত হয়। হা’ঁ, উজির যথার্থই বলেছে। দুনিয়ার পিতার সালতানিয়ৎ আক্রমণ করা সঙ্গত হবে না। কারণ সুলতানের কোনও দোষ নাই। আর দুনিয়ার প্রতি প্রতিশোধ নেবার জন্য যদি আক্রমণ চালানো হয়, ফল শুভ হবে না। দুনিয়া আত্মঘাতী হলে তাজ বি’রূপ হবে।

সুলতান পুত্র তাজ অ’ল মুলুককে ডেকে সব বললো। তাজ বললো, আমি কিন্তু আশা ছাড়তে পারছি না জাঁহা’পনা। আপনি আমা’র ওপর সব ব্যাপারটা’ ছেড়ে দিন। আমি তাকে রাজি করাবোই।

সুলতান আঁতকে ওঠে, সে কি। তুমি যাবে নাকি সেখানে? শুনেছি সে পুরুষ বি’দ্বেষী। তোমা’কে দেখামা’ত্র হত্যা করবে।

তাজ বলে, যায়। যদি প্ৰাণ যাবে তারই হা’তে। সে মৃ’ত্যুই আমা’র বেহেস্ত সমা’ন। কিন্তু আমি বলছি, সেসব কিছুই হবে না।

সুলতান আতঙ্কিত হয়। তুমি আমা’র সবে ধন নীলমনি! তোমা’কে হা’রালে আমি বাঁচবো কি

করে? আর এই বি’শাল সালতানিয়তেরই বা কি হবে?

তাজ পিতাকে আশ্বাস্ত করে বলে, আপনি নিশিচন্ত থাকুন, জাঁহা’পনা নিজেকে রক্ষা করার মতো অ’স্ত্ব বি’দ্যা আমা’র রপ্ত করা আছে। আর তাছাড়া আমি তার কাছে শাহজাদার পরিচয় নিয়ে যাবো না।

সুলতান অ’বাক হয়ে বলে, তবে কি ভাবে যাবে?

–আমি এক সওদাগরের ছদ্মবেশ নেবো।

সুলতান বললো, যাই কর বাপু, উজির আর আজিজকে তুমি সঙ্গে নিয়ে যাও। বি’দেশ বি’ভুই-একা একা তোমা’কে ছেড়ে দিতে আমা’র মন চায় না।

তাজের ইচ্ছায় আর সুলতানের হুকুমে প্রায় লক্ষাধিক দিনারের দামী দামী মনোহা’রী বি’লাস সামগ্ৰী সাজ পোশাক আর রেশমী কাপড় কেনা হলো। সুলতান খাজাঞ্চীখানা থেকে নগদ একলক্ষ সোনার মোহর অ’নেক হীরে জহরৎ সঙ্গে দিলো। দিনক্ষণ দেখে উট, খচ্চরের পিঠে সওদা পত্ব বোঝাই করে মা’র কাছে বি’দায় নিতে যায়। মা’ আশীর্বাদ করে একলক্ষ স্বর্ণমুদ্র দিলো। প্রাসাদের আবালবৃদ্ধ বনিতা চোখের জলে ফেলতে থাকে। তাজ সুলতানকে কুর্নিশ জানিয়ে বি’দায় নিলো।

উজির, আজিজ এবং তাজি অ’ল মুলুক প্রায় একমা’স চলার পর একদিন কপূর-প্রবাল দ্বীপে এসে পৌঁছয়। আজিজের কথা মতো একটা’ সরাইখানায় ওরা আশ্রয় নেয়। তাজ-এর হৃদয় আনন্দে দুলে ওঠে। এই সেই কপূর-প্রবাল দ্বীপ-তার মা’নস প্রিয়া-বাসভূমি। সেই রাতটা’ সরাইখানায় কাটা’বার পর পরদিন একটা’ বি’রাটবাড়ি ভাড়া করা হলো। তার পর কাপড় পট্টির দোকানে দোকানে ঘুরে দোকানীদের সঙ্গে আলাপ পরিচয় করতে থাকলো।

উজির বললো, দেখ বাপু, আমা’র মা’থায় একটা’ বুদ্ধি এসেছে।

দুজনে সমস্বরে প্রশ্ন করে কী?

–দোকানে দোকানো ঘরে সওদা না বেচে বরং এক কাজ কর। শহরের মা’ঝখানে এক চৌরাস্তার মোড়ে এক বি’রাট দোকানের সামনে বসবে। খদের যারা আসবে তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলবে। আর আজিজ থাকবে পিছনে। সে শুধু তোমা’র হুকুম মতো কাপড় চোপড় বের করে দেবে। আমা’র মনে হয়, তোমা’দের দুজনের যা সুন্দর চেহা’রা, দু-একদিনের মধ্যে দোকানের পশার জমবে। শাহজাদা তাজ আর আজিজ দুজনেই তারিফ করে বলে, চমৎকার হবে।

তাজ আর আজিজ শহরের কাপড় পট্টির দোকানগুলো যখন ঘুরে দেখছিলো, সবাই ওদের দিকে হা’ঁ করে চেয়ে থাকে। এমন সুন্দর চেহা’রার যুবক তারা কমই দেখেছে। একজন দোকানদার স্বাগত জানিয়ে বলে, দয়া করে একটু পায়ের ধুলো দিন।

উজির বলে, আমরা আপনার খদ্দের হতে আসিনি শেখ!

—তাতে কি হয়েছে। আসুন ভিতরে আসুন। আপনাদের দেখে মনে হচ্ছে বি’দেশী মুসাফির। উজির ঘাড় নেড়ে বলে, ঠিকই ধরেছেন। ছেলে দুটোর লেখাপড়া শেষ হয়েছে এখন ওদের একটা’ ব্যবসা বাণিজ্যে স্থিতি করে দেব বলে দেশ ভ্বমণে বেডিয়েছি। অ’নেক দেশের অ’নেক শহর ঘুরেছি। শেষে আপনাদের শহরে এসে আমা’র খুব ভালো লাগছে। ভাবছি যদি একটা’ মনমতো দোকান ঘর পাই, ভাড়া নিয়ে একটা’ কাপড়ের দোকান করে দেব। তা শেখ সাহেব, তেমন কোন দোকান ঘর এখানে মিলতে পারে? দিতে পারেন কোনও সন্ধান?

দোকানী বললো, সানন্দে। আপনারা বি’দেশী। একটু সাহা’য্য না করলে যে মহা’পাতক হবো। আপনারা আমা’র সঙ্গে আসুন, ঐ চৌমা’থার মোড়ে একটা’ প্রকাণ্ড দোকান বি’ক্রি আছে। দোকানের মা’লি’ক বৃদ্ধ হয়েছেন। সন্তান বলতে একটি মা’ত্র কন্যা। তার শাদী হয়ে গেছে। জামা’ই খানদানী ঘরের ছেলে। দোকানে বসা তার ইজতে বাধে। তাই বৃদ্ধ ঠিক করেছেন দোকান পাট বি’ক্রি করে দিয়ে মক্কা চলে যাবেন।

চৌমা’থার দোকান ঘরটা’ বেশ বড়সড়। এক রকম সাজানো–গোছোনই আছে। তার সামা’ন পত্ব এনে তুললে একেবারে জমজমা’ট হয়ে উঠবে। সেই দিনই দরদাম ঠিক হয়ে গেলো। বৃদ্ধ আর দেরি করতে চায় না। উজিরের হা’তে চাবি’ তুলে দিয়ে বললো, আজ থেকে এ দোকান আপনার। আপনার ছেলেরা, আল্লাহর দোয়ায়, দোকানের চেহা’রা চরিত্র পালটে দিতে পারবেন।

পরদিন থেকে দোকান সাজাবার পালা শুরু হলো। বাহা’রী বাহা’রী নানা রঙের সাজ পোশাক সামনে এনে ঝুলি’য়ে দিলো। কয়েক দিনের মধ্যে নতুন নতুন খদ্দেরে জমজমা’ট হয়ে উঠলো।

অ’ল্প দিনের মধ্যেই দোকানের খ্যাতি সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। খানদানী ঘরের নারী পুরুষেরা এসে ভিড় জমা’তে থাকে। দামী দামী বাহা’রী সাজ পোশাক কিনে নিয়ে যায়। কিন্তু যার জন্য দোকান খুলে বসা, -সেই দুনিয়া এক দিনও এলো না।

তাজ আল-মুলুক দিন দিন হতাশ হয়ে পড়ে। তবে কি এত উদ্যোগ আয়োজন সব ব্যর্থ হয়ে যাবে? রাতে শুয়ে ঘুমা’তে পারে না। খানা পিনা কিছুই ভালো লাগে না।

এমনি ভাবে দিন যায়। দোকানে বসে আজিজের কাছে মনের দুঃখ জানায় তাজ। মা’ঝে মা’ঝে খদের আসে। আবার চুপ করে যায়।

একদিন দোকানে বসে, তখন খদের ছিলো না, দুই বন্ধু প্ৰাণের কথা বলে চলেছে। এমন সময় এক বৃদ্ধা মহিলা এসে ঢুকলেন। সাদর অ’ভ্যর্থনা করে বসালো তাজ। বলুন, সাহেবা, আপনার জন্য কি করতে পারি?

বৃদ্ধ প্রশ্ন করে, আচ্ছা বেটা’, তোমরা এদেশের মা’নুষ?

–জী না। আমরা বি’দেশী। এর আগে কখনও এ দেশে আসিনি। এই প্রথম এসে, কিছুদিন হলো দোকান খুলেছি। ব্যবসা কুরাই বড় কথা নয়, আপনাদের দেশে এসে নতুন নতুন মা’নুষের সঙ্গে আলাপ পরিচয় করাই আসল উদ্দেশ্য।

বৃদ্ধা বলে, শুনে খুব খুশি হলাম বেটা’। তা কি ধরনের সাজ পোশাক এনেছো।

সবই তো তোমা’দের নিজের মুলুক থেকে আনা? আমা’কে দু’চারটে বাহা’রী কাপড়-এর থান দেখাও তো।

—জী হা’ঁ। সবই বাহা’রী। এ দোকানে সাধারণ মা’নুষের জন্যে কোন সাজপোশাক আমরা রাখিনি। সবই বাদশাহ, সুলতান, আমির ওমরাহদের বি’বি’ কন্যাদের জন্যে।

বৃদ্ধ বেশ একটু অ’হঙ্কার নিয়েই বলে, আমিও কিনতে এসেছি শাহজাদী দুনিয়ার জন্যে। তার কয়েকটা’ সেমিজ কামিজ বানাতে হবে।

তাজ নিজের কানকে বি’শ্বাস করতে পারে না। বৃদ্ধা যেন কার নাম করলো? —কি বললেন? শাহজাদী দুনিয়া?

—হ্যাঁ গো বাছ, সুলতান শাহরিমা’নের কন্যা দুনিয়া।

তাজ আজিজকে বলে, সব চেয়ে সেরা কাপড়ের থানগুলো বের করে দাও।

সবুজ শহরের তাঁতীদের খ্যাতি অ’নেক কালের। তাদের হা’তে বোনা রেশমী কাপড় দেশ বি’দেশে চালান যায়। সূক্ষ্ম কারুকর্ম অ’সাধারণ। চোখে না দেখলে বলে বোঝান অ’সম্ভব।

তাজ অ’ব মুলুক একটা’র পর একটা’ থান খুলে মেলে ধরে। বৃদ্ধার চোখ আনন্দে নেচে ওঠে। এমন বাহা’রী কাপড় অ’ন্য কোন দোকানে সে দেখেনি।

বৃদ্ধ বলে, দেখে তো সবই নিতে ইচ্ছে করছে। সব গুলোই চমৎকার।

তাজ বলে, তা নিন না। যেটা’ যেটা’ পছন্দ, বলুন আমি বেঁধে দিচ্ছি।

—তাতো বুঝলাম বাছা, কোনটা’র কি দাম বলো, শুনি।

তাজ বলে, দামের জন্যে কেন চিন্তা করছেন। শাহজাদীর পছন্দ হয়। কিনা দেখুন। তিনি যদি মেহেরবানী করে গ্রহণ করেন, আমি নিজেকে ধন্য মনে করবো।

বৃদ্ধ বলে, পছন্দ না হওয়ার কিছু নাই বেটা’। এমন রংদার বাহা’রী কাপড় সারা শহর খুঁজলে একটা’ মিলবে না। তাছাড়া আমি পছন্দ করে নিয়ে গেলে দুনিয়া না বলতে পারবে না। ওকে আমি কোলে পিঠে করে মা’নুষ করেছি।

তাজ বলে, দাম কিছু দিতে হবে না। দাদীমা’, আপনি আমা’র দোকানে পায়ের ধুলো দিয়েছেন তাতেই সব পাওনা শোধ হয়ে গেছে।

—ওমা’ সে কি কথা গো। আমি বুড়ি থুডি মা’নুষ। কচি ডাগর ডাসা রূপসী সুন্দরী হলেও না হয় কথা ছিলো। এক কথায় এত দামের সওদা দিয়ে দেবে আমা’য়?

তাজ হা’সে, আপনার কি ধারণা ডাগর ডাসা রূপসী মেয়ে দেখলেই আমরা ভুলে যাই।

—তা তোমা’দের এই কঁচা বয়েস এখন, ডবকা মেয়েদের দিকেই তো নজর থাকা স্বাভাবি’ক।

—না দাদীমা’, আমন ছোট নজর আমা’র নয়। পথ চলতি অ’ল্প বয়েসী মেয়েছেলে দেখলেই জান খলখল করে উঠবে সে বান্দা আমি নই। মা’রি তো গণ্ডার লুটি তো ভাণ্ডার।

খুশিতে ডগমগ করে ওঠে বৃদ্ধ। —বেটা’ তোমা’র কি নাম?

—আমা’র নাম তাজ-আল-মুলুক।

বৃদ্ধা অ’বাক হয়। —এ রকম নাম তো সুলতান বাদশাহর ঘরে ছাড়া হয় না।

কি বলবে তাজ ভেবে পায় না। আজিজ এগিয়ে এসে বলে, মা’নে— বাপ-মা’য়ের খুব আদরের দুলাল তো, শখ করে ঐ ধরনের শাহজাদাদের নাম রেখেছিলো। কানা ছেলের নাম কি পদ্মলোচন হয় না? সেই রকম আর কি—

আহা’ অ’মন কথা বলো না, বাছা। ষাট ষাট কানা হতে যাবে কেন। সুলতান বাদশাহ ঘরে না জন্মা’লে কি হবে, সুরৎখানা কিন্তু শাহী। এমন বনেদী চেহা’রা কিন্তু হা’ল ফিল উঠতি বড়লোকদের ঘরে জন্মা’য় না, বাবা। রক্তে বংশের ধারা থাকা চাই।

বৃদ্ধার পছন্দ করা কাপড়গুলো আজিজ বাণ্ডিল বেঁধে খচ্চরের পিঠে তুলে দিলো। বৃদ্ধ অ’নেক ধন্যবাদ জানাতে জানাতে চলে গেলো। বলে, আবার আসবে।

বৃদ্ধার হা’তে বাণ্ডিল দেখে দুনিয়া ছুটে আসে।–দেখি দেখি, দাদীমা’, কি আনলে?

দাদীমা’ বলে, সে ভারি রংদার কাপড় এনেছি। তোমা’র কতকগুলো সেমিজ কামিজ বানাতে হবে।

কাপড়গুলো দেখে দুনিয়া আনন্দে লাফিয়ে ওঠে বৃদ্ধাকে জাপটে ধরে বলে, কোথায় পেলে দাদীমা’? এ তো আমা’দের দেশের কাপড় না!

—তুমি ঠিকই ধরেছে, বাছা। এ কাপড় বি’দেশী সওদাগরের ছেলেরা নিয়ে এসেছে। বাজারের ভিতরে কি প্রকাণ্ড দোকান সাজিয়ে বসেছে। দেখলে তাক লেগে যায়।

দুনিয়া বলে, কত দাম বলেছে?

—দামের কথা জিজ্ঞেস করতেই বাছা আমা’য় তেড়ে এলো। বলে কি—শাহজাদী পরবেন, তার আবার দাম নেব কি? তিনি যদি মেহেরবানী করে পরেন, তাই আমা’র অ’নেক পাওয়া হবে। শাহজাদী আমা’র দোকানের খদ্দের শুনলে, আমির ওমরাহদের বাড়ির বি’বি’-মেয়েরা ভিড় করে আসবে।

দুনিয়া রাগ করে। সে হয় না। দাদীমা’! তুমি তাকে সুলতানের সঙ্গে দেখা করতে বলো, আমি বলে দেব, আব্ববাজান তাকে ইনাম দিয়ে দেবে।

তা বাছা, মন্দ বলো নি, হিসেব করে দাম দিতে গেলে বেচারীকে ছোট করা হয়। সুলতান যদি ইনাম দেন নেবে না কেন? দেখে মনে হলো খানদানী ঘরের ছেলে। যেমন সুন্দর দেখতে তেমনি তার আদব কায়দা

দুনিয়া থামিয়ে দিয়ে বলে, থাক থাক, আর অ’তো ব্যাখা করে কাজ নাই। মুখে যে প্রশংসা ধরে না। কী ব্যাপার লোকটা’ গুণ করেছে নাকি তোমা’কে?

তোমা’র মুখে কোন রাখ-ঢাক নাই বাছা। তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে, বুড়ি হয়ে মরতে বসেছি, আমন চাঁদপনা নওজোওয়ান ছেলে আমা’কে গুণ করতে যাবে কেন? তার রূপের জেল্লা দেখলে তোমা’দের মতো কচি ডাসা মেয়েরাই তাকে ভোলাতে চাইবে।

—দাদীমা’? তোমা’র কি মা’থা টা’থা বি’গড়ে গেছে? কি সব আবোল-তাবোল বকছো?

–মা’থা আমা’র ঠিকই আছে, বাছা তাকে একবার দেখলে তোমা’র মা’থাই ঠিক থাকবে না।

দুনিয়া ঝঙ্কার দিয়ে ওঠে, ঠিক আছে, তুমি এখন যাও, লোকটা’কে খবর দিয়ে এসো। সে যেন আব্বাজানের সঙ্গে দেখা করে ইনাম নিয়ে যায়।

—সে আর বলতে, বাছা। আমি এখুনি যাচ্ছি তাকে খবর দিতে।

তাজ দেখলো, বৃদ্ধা আবার এসেছে। আজিজকে বললো, ভালো দেখে শরবৎ আর মিঠাই-এর ব্যবস্থা কর। বুড়িটা’কে জপাতে হবে।

বৃদ্ধাকে সাদর অ’ভ্যর্থনা করে বসালো তাজ অ’ল মুলুক। শরবৎ আর মিঠাই খেতে দিলো। বৃদ্ধ বলে, একটা’ সুখবর আছে, বেটা’। শাহজাদী বলে পাঠিয়েছে, তুমি সুলতানের সঙ্গে দেখা করবে। সুলতান তোমা’কে ইনাম দেবেন।

তাজ ভাবে, বড়শির চারে মা’ছ লেগেছে। বৃদ্ধাকে বললো, আমি আপনার শাহজাদীকে একখানা খৎ লি’খে দিচ্ছি। দয়া করে ওকে পৌঁছে দেবেন?

–কেন দেব না বাছা।

আজিজ, কাগজ দোয়াত কলম এনে দেয়। তাজ লি’খলো : আপনাকে চোখে দেখিনি। কিন্তু আপনার সুবাস আমি আত্মা’ণ করেছি। আপনার রূপের ছটা’য় আমা’র চোেখ ঝলসায়নি, তবে দিল-এ বি’জলি’ হেনেছে। আপনি আমা’র কল্পলোকের মা’নসী। আপনাকে আমি কখনও চোখে দেখিনি। কিন্তু আপনার সঙ্গে আমা’র হা’জার বছরের পরিচয়। আপনাকে দেখেছি আমি প্রস্ফুটিত পদ্মের কোরকে। লাল গুলাবের পাপড়িতে। দূর আশমা’নের সিতারায়। অ’শান্ত সমুদ্রের জলোচ্ছাসে। আর দেখেছি বসন্ত মর্মরে হিল্লোলি’ত দ্রাক্ষাকুঞ্জের লতায় পাতায়। রক্তবর্ণ সূর্যাস্তের বি’লুপ্ত শোভায়–

আজ এই পর্যন্ত
আপনার বান্দা তাজ-আল-মুলুক।

ভাঁজ করে আঠা দিতে মুখ এঁটে বৃদ্ধার হা’তে তুলে দিলো তাজ। সেই সঙ্গে এক হা’জার দিনারের একটা’ থলে।

বৃদ্ধা বি’স্ফারিত চোখে মোহরগুলো দেখে বলে, এ গুলো কি হবে বাবা?

–এ আপনার সেলামী।

বৃদ্ধা ফিরে আসতেই দুনিয়া জিজ্ঞেস করে, তোমা’র সওদাগর ছেলে কি বললো, গো দাদীমা’? চিঠিখানা বাড়িয়ে দিয়ে বৃদ্ধ বলে, মুখে কিছু বলেনি। লি’খে দিয়েছে। জানিনা কি লি’খেছে, পড়ে দেখো।

ক্ষিপ্রহা’তে ছোঁ মেরে চিঠিখানা তুলে নিয়ে দুনিয়া পড়তে থাকে। ধীরে ধীরে চোয়ালের হা’ড় ফুলে ওঠে, ভ্ব কুঞ্চিত হয়। ঠোঁটে দাঁতের কামড় বসিয়ে ফুসে ওঠে, এত বড় স্পর্ধা!

বৃদ্ধ ভয় পায়! —কেন কি হয়েছে, বাছা।

—কি হয়েছে? কি হয়নি। তাই বলো।

বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করে, কেন খুব চড়া দাম হেঁকে বসেছে বুঝি?

দুনিয়া চিৎকার করে ওঠে, দামের জন্যে দুনিয়া থোড়াই পরোয়া করে। খায় তো কাপড় বেচে-ত বামন হয়ে চাদে হা’ত? তোমা’র গুণধর সওদাগর নন্দন আমা’কে প্রেম পত্র লি’খেছেন।

—এ্যাঁ! বলো কি? এত বড় আসাপরদ। এতো ভালো কথা নয় মা’! তুমি খুব কড়া করে জবাব লি’খে দাও। আমি গিয়ে তুড়ে দিয়ে আসবো।

দুনিয়া বলে, চিঠির জবাব দিলে আরো লাই পেয়ে যাবে না?

–না না, চিঠিই লি’খে ওকে বুঝিয়ে দাও, এ বড় শক্ত ঘাঁটি। অ’ত সহজে ডাল গলবে না।

দুনিয়া লি’খতে বসে :

আহা’ম্মকরা নিজেকে পির পয়গম্বর ভাবে। মূর্খের অ’শেষ দোষ। তারা নিজের দাম কষতে জানে না। বান্দরের হা’তে কলাই শোভা পায়। গলায় মুক্তোর মা’লা পরালেও বাঁদর বাঁদরামীই করে।

অ’সভ্য জানোরা লোককে কি করে শায়েস্তা করতে হয়, আমা’র খুব ভালো করে তালি’ম নেওয়া আছে। শুধু একটা’ কথা বলে রাখি, আশমা’নের সিতারা আসমা’নেই থাকে-থাকবে। মুদিখানায় নেমে আসবে না। আগুনে হা’ত দিলে হা’তখানা যাবে। ক্রুশে বি’দ্ধ করে যাদের মা’রা হয় তারা সবাই ষীশুর মতো নিষ্পাপ নয় এই কথাটা’ মনে রাখলে খুশি হবো।

চিঠিখানা নিয়ে বৃদ্ধ ছুটতে ছুটতে তাজ-এর দোকানে আসে। বলে, শাহজাদী জবাব gिशgछ्न्।

তাজের হৃদয় দুলে ওঠে। কিন্তু পড়তে পড়তে মুখের চেহা’রা পাল্টে যায়। বি’ষাদে ভরে ওঠে as

—আমা’কে ধাঁতানী দিয়েছে। ক্রুশে গেঁথে মা’রবে বলে শাসিয়েছে। তা মা’রুক। মরতে আমি ভয় পাই না। এই দুর্বি’ষহ জীবন রাখার চেয়ে মরা অ’নেক ভালো। তাতে চিরকালের মতো শান্তি আসবে। এ চিঠিরও জবাব দেব আমি। তাতে যা নসীবে আছে-হবে।

বৃদ্ধ বলে, তুমি ঘাবড়াবে না, বাছা! আমি তোমা’র সঙ্গে আছি। তোমা’র যাতে না কোন ক্ষতি হয়, আমি দেখবো। লেখো, জবাব লি’খে দাও।

আজিজকে ডেকে তাজ বলে, দাদীমা’কে এক হা’জার দিনারের একটা’ তোড়া দিয়ে দাও। আর আমা’কে এনে দাও দোয়াত কলম। আমি জবাব লি’খবো।

‘তুমি আমা’কে মৃ’ত্যুর ভয় দেখিয়েছে, সুন্দরী। কিন্তু ও ভয়ে আমা’র হৃদয় কঁপে না। তুমি ভোগ বি’লাসিনী নারী। তোমা’র বেঁচে থাকা আর সুখ সম্ভোগ করাই বড় কথা। কিন্তু আমি উদাম, উচ্ছল। আমি নিৰ্ভয়। প্রেমিক। মৃ’ত্যুকেও পরোয়া করি না। তুমি যদি আমা’কে ক্রুশে গেথেই মা’রো, তাতেও আমা’র চিত্ত বি’চলি’ত হবে না। আমি যীশুর খ্যাতি চাই না। আমি হা’সি মুখে মরবো। ভাববো, প্রেম অ’নেকের জীবনে নতুন বসন্ত আনে, আমা’র কাছে সে না হয় মৃ’ত্যুর রূপ ধরেই এলো।’

চিঠিখানা ভাঁজ করে বৃদ্ধার হা’তে দিতে দিতে তাজ বলে, আমা’র জন্যে আপনি কেন এত কষ্ট করছেন? জানি আমা’র মৃ’ত্যু অ’নিবার্য। তবু এর শেষ না দেখে আমি ছাড়বে না। মৃ’ত্যু যদি আসে আসুক।

বৃদ্ধ সান্ত্বনা দিয়ে বলে, ওসব আজগুবি’ চিন্তা ছাড়ো তো। আমি আছি তোমা’র কোনও ভাবনা নাই, বেটা’ তোমা’র মতো ছেলে তার কি অ’পছন্দ হবে? চোখে দেখেনি। তাই আমন তডিবড় করছে। একবার দেখলে ভিরমি খেয়ে পড়ে যাবে। আমি আজ চলি’। শিগ্‌গিরই আবার আসবো। এবার আশা করছি শুভ সংবাদই নিয়ে আসতে পারবো।

দুনিয়ার ঘরে ঢোকার আগে বৃদ্ধা তার মা’থার চুলের ভাঁজের নিচে চিঠিখানা লুকিয়ে রাখলো। দুনিয়া বলে, কি গো দাদীমা’, তোমা’র চাঁদপনা সওদাগর দুলালের খবর কি?

—কি জানি বাছা, আমা’র কি দরকার, তোমা’র চিঠি আমি তার হা’তে ফেলে দিয়ে এসেছি। তারপর কিছু জানিনা। তোমা’দের ব্যাপার তোমরা বোঝা গিয়ে।

দুনিয়া হা’সতে থাকে। বাছাধনকে যা দাওয়াই দিয়েছি। তারপর আর রা কাড়তে হবে না।

বৃদ্ধ বলে, মা’থায় বড় খুস্কি হয়েছে, বাছা। তোমা’র বাঁদীদের কাউকে ডাকো তো, মা’থাটা’ একটু আঁচড়ে দিক।

বাঁদীর কি দরকার কি দাদীমা’, আমিই দিচ্ছি, তুমি আমা’র চুল বেঁধে দিও।

দুনিয়া চিরুনী নিয়ে বৃদ্ধর চুল আঁচড়াতে বসে মা’থায় চিরুনী দিতেই চিঠিখানা নিচে পড়ে যায়।

দুনিয়া চিঠিখানা তুলে নিতেই বৃদ্ধ হা’ঁ হা’ঁ করে ওঠে, ওটা’ আমা’কে দিয়ে দাও বাছা! আমি যখন ছেলেটা’র দোকানে ঢুকেছিলাম তখন বোধহয় ওপর থেকে ওদের চিঠি আমা’র মা’থায় ওপর এসে পড়ে থাকবে। পরের চিঠি খোলার দরকার নাই। দাও, ওদের জিনিস ওদের দিয়ে আসি।

কিন্তু কে কার কথা শোনে, দুনিয়া ততক্ষণে চিঠিখানা খুলে পড়তে শুরু করেছে।

—কি তোমা’র চালাবাজী দাদীমা’। তুমি ভারি দুষ্টু। এই শয়তান সওদাগরটি কে? কোন দেশের বাসিন্দা? আমা’কে কি রকম বি’দ্রুপ করেছে দেখো। বলে কিনা-আমি ভোগ বি’লাসিনী নারী। এত বড় সাহস তার। আমা’র দেশে এসে আমা’কেই অ’পমা’ন। আমি তো তোমা’কে আগেই বলেছিলাম দাদীমা’, জবাব দেওয়া ঠিক হবে না। লোকটা’ লাই পেয়ে যাবে। তা দেখলে তো।

বৃদ্ধ কপট ক্ৰোধে ফেটে পড়ে। —এত বড় শয়তান বেল্লি’ক। তা কি করে জানবো, বেটী। আমি ভেবেছিলাম তোমা’র জবাব পেয়ে তার আক্কেল হবে। যাই হোক, এবার তুমি ওর পিণ্ডি চটকিয়ে একটা’ কড়া করে জবাব লেখো। আমি এখুনি নিয়ে যাবো। এরপর যদি তোমা’র কাছে ক্ষমা’ না চায়, দেখাবো মজা।

‘শরতের ঝিকিমিকি রোদে দূর নীল গগনে এক ঝাক উজ্জ্বল পায়রা ওড়ে। তাদের সফেদ ডানা সূর্যের আলোয় রূপালী হয়। তারাও পাখি। আবার একটা’ ভাগাড়ে বুনো শেয়ালের পচা মৃ’তদেহ ঠুকরে ঠুকরে খায় যে শকুনগুলো—তারাও পাখি। সুতরাং মা’নুষের চামড়া গায়ে থাকলেই কি সব মা’নুষই সমা’ন।’

চিঠিখানা বৃদ্ধর হা’তে দিয়ে দুনিয়া বলে, যদি পেটে কিছু থাকে বুঝতে পারবে চিঠির মৰ্মকথা।

তাজ অ’ল মুলুক চিঠির নির্মম নিষ্ঠুর ভাষায় ব্যথিত হয়। বুঝতে পারে, আর কোন আশা নাই। আজিজের দিকে চেয়ে বলে, এখন বলো, কি করা যায়। আমি আর জবাব দেবার উৎসাহ পাচ্ছি। না। সব আশা ভরসার ইতি হয়ে গেছে।

আজিজ বলে, ঠিক আছে, আপনার হয়ে আমি জবাব লি’খছি।

তাজ বলে, যা ভালো বোঝা কর। ‘এখন আমা’র আল্লাহই একমা’ত্র ভরসা। তোমা’কে যে ভাবে আকাঙ্ক্ষা করেছিলাম, সেই উদগ্র বাসনা নিয়ে যদি আল্লাহকে ডাকতাম, তিনি আমা’কে কোলে তুলে নিতেন। কিন্তু তুমি সামা’ন্য অ’বোধ নারী। তোমা’র কাছ থেকে আল্লাহ মহিমা’ কি করে আশা করতে পারি। একদিন, মা’-বাবা আত্মীয় পরিজন, প্রিয় বাসভূমি ছেড়ে তোমা’র সন্ধানে এখানে এসেছিলাম। কিন্তু তুমি আমা’কে প্রত্যাখ্যান করে ফিরিয়ে দিলে। এর পর আমি যেখানে যাবো, সেখানে তিনি আমা’কে প্রত্যাখ্যান করে ফিরিয়ে দেবেন না। সেখানে সবাইকেই একদিন যেতে হয়, কাউকেই তিনি বাধা দিয়ে ফিরিয়ে দেন না। তার কোলে অ’নেক জায়গা। দিলাটা’ দরাজ।’

তাজ অ’ল মুলুক পড়ে বাহবা দিলো, চমৎকার লি’খেছে, দোস্ত!

দুনিয়া চিঠিখানা পড়ে বৃদ্ধার ওপর ক্ৰোধে ফেটে পড়ে। যত সব ফাজিল ফক্কর ডেপো ছোড়ার ন্যাকামী। তোমা’র জন্যেই, দাদীমা’ আমা’র জানটা’ কয়লা হয়ে গেলো। যত নষ্টের গোড়া তুমি। আমা’র সামনে থেকে দূর হও। আর তোমা’র মুখ দেখতে চাই নে আমি। তোমা’র যা বদ মতলব আমি বুঝতে পেরেছি, তাতে কুকুর দিয়ে খাওয়ানো উচিত তোমা’র লাশ।

শাহজাদী ক্ষিপ্ত হলে তার কোন কাণ্ডজ্ঞান থাকে না। তখন সে করতে পারে না এমন কোন কাজ নাই। রাগের মা’থায় মা’নুষও খুন করতে পারে। বৃদ্ধা দৌড়ে পালায়। ছুটতে ছুটতে চলে আসে তাজ অ’ল মুলুকের। দোকানে। তাজ তাকে আদর করে বসায়। জিজ্ঞেস করে, কি দাদীমা’, কি হলো, অ’মন হা’পাচ্ছেন কেন?

–তাড়া করেছে। বাবা, তাড়া করেছে।

–কে?

–কে আবার, ঐ দুনিয়া। বেটি একেবারে রণমূর্তি ধরেছে। ক্ষেপলে আর মা’নুষ থাকে না। তোমা’র চিঠিখানা দেওয়া মা’ত্র তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো। বলে কিনা—আমা’কে কুকর দিয়ে খাওয়াবো।

তাজ প্রশ্ন করে, আসল ব্যাপারটা’ কি বলতো, দাদীমা’? নিশ্চয়ই এর পিছনে কোনও কারণ আছে। এরকম পুরুষ বি’দ্বেষী নারীর কথা তো শুনিনি কোথাও। এ এক ধরনের মা’নসিক রোগ।

–রোগ না আতঙ্ক।

–তা আতঙ্কই এলো কি করে। কোন পুরুষের কাছে চোট ফোঁট খেয়েছে এর আগে?

—না বাবা, সে সব কিছু না। স্বপ্ন!

— স্বপ্ন?

বৃদ্ধা বলে, হ্যাঁ একদিন রাতে স্বপ্ন দেখার পর থেকেই ও ওই রকম হয়ে গেছে। কোনও পুরুষের নাম গন্ধ সে সহ্য করতে পারে না।

তাজ কৌতূহলী হয়ে ওঠে, স্বপ্নটা’ কী? জানো? শুনেছো তার কাছে?

—আলবাৎ শুনেছি। তা হলে শোনো বলছি :

একদিন রাতে দুনিয়া স্বপ্ন দেখছে, এক শিকারী একটা’ বাগানে ঢুকে গাছের তলায় পাখি ধরা জাল বি’ছিয়ে তার ওপর কিছু যবের দানা ছড়িয়ে রেখে গাছের আড়ালে ওৎ পেত দাঁড়িয়ে অ’পেক্ষা করতে থাকলো।

কিছুক্ষণের মধ্যে এক ঝাক পাখি উড়তে উড়তে এসে বসলো বাগানের গাছের ডালে। তার মধ্যে দুটি পায়রা নেমে আসে নিচে-জালের ওপর ছড়ানো যবের দানা খুঁটে খুঁটে খেতে থাকে।

পুরুষ পাখিগুলোর ঢং রং কেমন যেন বাচালের মতো। তিড়িং বি’ড়িং করে লাফিয়ে লাফিয়ে চলে। এক সময়ে জালের ফাসে পুরুষ পাখিটা’র একটা’ পা আটকে যায়। অ’নেক টা’না হ্যাচড়া করেও আর ছাড়াতে পারে না। এ দিকে মেয়ে পাখিটা’ ছটফট করতে থাকে। কি করে তার সাথীকে ছাড়াবো? উন্মা’দের মতো মা’থা কুটতে থাকে। পুরুষ পাখিটা’র পাখার ঝাপটা’নির আওয়াজে গাছের অ’ন্য পাখিরা চকিত হয়ে ওঠে। বুঝতে পারে শিকারীর ফাঁদে পুরুষ পায়রার পা আটকে গেছে। আর তিলমা’ত্র অ’পেক্ষা না করে তারা ঝাক বেঁধে আবার উড়ে পালি’য়ে যায়। কিন্তু মেয়ে পাখিটা’ তার সঙ্গীকে ছেড়ে গেলো না। ঠোঁট দিয়ে ঠুকরে ঠুকরে জালের দড়ি কেটে ফেললো। ছাড়া পেয়ে শো করে উড়ে গিয়ে বসলো গাছের ডালে। এ দিকে মেয়ে পাখিটা’র পায়ে ততক্ষণে ফাঁস আটকে গেছে। ছাড়াবার জন্যে প্ৰাণপণে ডানা ঝাপটে পা ছুড়তে থাকে। কিন্তু আরও কষে এটে যায়। পুরুষ পাখিটা’ কিন্তু আর নেমে এসে তাকে ছাড়াবার চেষ্টা’ করে না। এ দিকে শিকারী দেখলো, একটা’ পালি’য়েছে, এটা’ও যদি পালি’য়ে যায়। ছুটে এসে পাখিটা’কে ধরে খাঁচায় পুরে ফেললো। পুরুষ পাখিটা’ ততক্ষণে হা’ওয়া হয়ে গেছে।

শাহজাদী দুনিয়ার ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঐ রাতেই আমা’কে ডেকে সে স্বপ্নের কাহিনী শোনালো। বললো, কি সাংঘাতিক এই পুরুষ জাতটা’। পশু পাখিদের মধ্যেই যদি এই রকম হয়, না জানি পুরুষ মা’নুষগুলো বা কেমন। তারা আরও খারাপ আরও স্বার্থপর হবে নিশ্চয়ই।

সেই থেকে মেয়ের এক আতঙ্ক ঢুকেছে মনে। পুরুষ মা’নুষের ছায়া মা’ড়াতে চায় না। শাদীর কথা শুনলে ক্ষেপে ওঠে। সে বলে, জ্ঞান থাকতে কোন পুরুষের খপ্পরে পড়তে চাই না আমি।

–কিন্তু দাদীমা’, তাজ অ’ল মুলুক বলে, সব পুরুষই এক রকম-খারাপ স্বার্থপর? আর সব মেয়েই কি ভালো—একেবারে পরের জন্যে প্ৰাণ উৎসর্গ করে। তাকে একবার বলো, না—দুনিয়াতে কটা’ পুরুষ মা’নুষ দেখেছো, ভালো পুরুষেরও অ’ভাব নেই।

কিন্তু বাবা, দাদীমা’ বলে, সে বুঝতে চাইবে না, তাকে বোঝাবো কি করে? সে তার গরবেই বঁচে না।

তাজ বলে, যে ভাবেই হোক, একটি বার তার সঙ্গে দেখা করিয়ে দিন দাদীমা’। আমা’র বি’শ্বাস, আমি তার এই খারাপ ধারণা পালটে দিতে পারবো। আপনার বুদ্ধির চাতুর্য আছে, আপনিই পারবেন।

-শোন সোনা মনি, প্রাসাদের সামনে একটা’ বাগান আছে, সেই বাগানের এক পাশে একটা’ জলসাঘর আছে। দুনিয়া ফি মা’সে একবার করে সেখানে যায়। প্রাসাদ থেকে ঐ জলসাঘরে যাবার একটা’ গুপ্ত দরজা আছে। আজ থেকে এক সপ্তাহ পরে তার যাওয়ার সময় হবে। তখন আমি তোমা’কে সঙ্গে করে নিয়ে যাবো। সেখানে। তার সামনে হা’জির করে দেব। তার পরের ব্যাপার তোমা’র। যদি তাকে ভোলাতে পারো সে তোমা’র হা’তিযশ। তবে আমা’র কি মনে হয় জানো, বাবা তোমা’কে একবার সামনা সামনি দেখলে তার সব ধারণাই পালটে যাবে।

তাজ-এর কিছুটা’ ভরসা হয়। বৃদ্ধাকে বলে, দাদীমা’ চলো, তোমা’কে এক জায়গায় নিয়ে যাব।

দোকান-পাট বন্ধ করে তাজ বৃদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে তাজ আর আজিজ বাসায় আসে। উজির দানদান সব শুনে বলে ঠিক আছে, আমা’র মা’থায় একটা’ মতলব এসেছে। চলো, আগে সেই বাগানে একবার যাই। আগে নিজের চোখে দেখা যাক তারপর কি করা যায় ভাবা যাবে।

বৃদ্ধাকে বাসায় রেখে ওরা তিনজন সুলতানের প্রাসাদ সংলগ্ন বাগানে গিয়ে হা’জির হয়। বাগানের মা’লি’ পালি’ত-কেশ এক বৃদ্ধ। উজির তার হা’তে একশো দিনারের একটা’ তোড়া গুজে দিয়ে বলে, আমরা বি’দেশী মুসাফির। তোমা’র এই বাগানে পুকুরের ধারে বসে একটু বি’শ্রাম করতে চাই, অ’নেক দূর দেশ থেকে আসছি, খানা পিনা হয়নি এখনও, ভাবছি। এই পুকুরের ধারে বসে সেরে নেবো।

বৃদ্ধ মা’লী তো গদ গদ। অ’তগুলো মোহর এসে গেছে হা’তে। বললে, এ আর বেশি কথা কি জনাব। যতক্ষণ ইচ্ছে, বি’শ্রাম করুন। খানা পিনা সারুন। যদি দরকার হয় বলুন দোকান থেকে খানা পিনা যা দরকার। আমি এনে দিচ্ছি।

–না, চাচা, তার দরকার হবে না। খানা আমরা সঙ্গেই এনেছি। শুধু একটু আরাম করে তার পরে খাবো। তা চাচা যে বাগানের ও পাশে একটা’বাড়ি দেখছি, ওটা’ কার?

মা’লী বলে, জানেন না বুঝি, কত্তা, ও হলো আমা’দের শাহজাদী দুনিয়ার বি’লাসমহল। ওখানে উনি মা’সে একবার মা’ত্র আসেন। খেয়াল খুশি মতো দুচার দিন থাকেন।

উজির অ’বাক হয়ে প্রশ্ন করে, শাহজাদীর বি’লাস মহল বলছি, অ’থচ দেখছি আগাছা জঙ্গলে ভরে আছে সামনেটা’! মনে হচ্ছে, কতকাল কলি’ ফিরানো হয়নি। চুন বালি’ খসে খসে পড়ছে, ব্যাপারটা’ কী?

মা’লী বললো, আমরা হুকুমের নফর, সাহেব। তিনি না বললে আমরা কি করতে পারি। অ’নেকবার বলেছি বি’লাসমহলে মিস্ত্রি লাগানো দরকার। কিন্তু শাহজাদী সে কথায় কান দেন না। শুনেছি তিনি নাকি এখন অ’সুখে ভুগছেন। তাই মন মেজাজ ভালো নাই।

উজির বলে, তাই বলে শাহজাদীর বি’লাস ভবন। এইভাবে নষ্ট হবে? চাচা, তুমি আর দেরি করো না মিস্ত্রিটিস্ত্রি যা দরকার এখুনি নিয়ে এসে কাজে লাগাও। এই নাও, একশো দিনার রাখো, দরকার হলে আরও দেব।

মা’লি’ অ’বাক হয়। এ কোন দেশের সওদাগর বাদশাহ। কথায় কথায় খোলামকুচির মতো মোহর বের করে দিচ্ছে। মোহরের তোড়াটা’ নিয়ে সে সাতবার সেলাম ঠুকে বলে, আমি এক্ষুণি শহরের সেরা মিস্ত্রি এনে কাজে লাগাচ্ছি, হুজুর।

উজির বলে, দেওয়াল যারা রং করবে। তারা যেন ভালো আঁকিয়ে লোক হয়। চাচা।

—কেমন আঁকিয়ে চান হুজুর, ঘরের দেওয়ালে এমন ছবি’ এঁকে দেবে, দেখে ভিরমি খেয়ে যাবেন।

উজির মজা পায়, কেন? ভিরমি খাবো কেন?

মা’লি’ বি’চিত্র অ’ঙ্গভঙ্গী করে বোঝাতে থাকে, মন সব বেহেস্তের পরীর মতো ডবকা ছুড়িদের ঠ্যাকারের ছবি’ এঁকে দেবে, দেখে জিভে জল এসে যাবে, কত্তা।

–আহা’-হা’-হা’, ওরকম আঁকিয়ে আমা’র দরকার নাই, চাচা। ওসব বদখদ ছবি’ আঁকলে চলবে না। আমি চাই এমন আঁকিয়ে-যে আঁকতে পারবে, গাছপালা নদনদী সমুদ্র আকাশ লতাপাতা ফুল–

—হ, হ, বুঝেছি জনাব, প্রাকৃতিক দৃশ্য।

–ঠিক-ঠিক বুঝেছি, চাচা।

আপনি কিছু ভাববেন না। এমন ফুল বাগিচা একে দেব, ঘরে ঢুকলে ফুলের বাসে দিল মা’তোয়ারা হয়ে যাবে, হুজুর।

—সাবাস। তোমা’কে দিয়েই হবে, চাচা। তা তোমা’র সেই বি’শ্বকর্মীদের একবার ডাকো। তাদের বলে যাই, কোথায় কি করতে হবে। কি ছবি’ আঁকতে হবে।

মা’লি’ বলে, আপনারা একটু জিরিয়ে নিতে থাকুন, হুজুর। এই আমি—ছুটে যাবো। আর দৌড়ে আসবো।

কোথায় কোথায় মেরামত করতে হবে, কোথায় কি রং করতে হবে–সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মিস্ত্রিদের বুঝিয়ে দিলো উজির। বললো, রংটং সব হয়ে যাবার পর ঘরের দুই দেওয়ালে বি’রাট ছবি’ আঁকতে হবে। দুটো ছবি’ই প্রায় একই রকম হবে। একটু শুধু তফাৎ হবে? একটা’ বি’রাট বাগান। বড় বড় সব গাছ। এক জায়গায় এক শিকারী পাখি ধরা জাল পেতে গাছের গুডির আড়ালে ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে। জালের ফাসে একটা’ মেয়ে পায়রার পা আটকে গেছে। সে শুধু ডানা ঝাপটা’চ্ছে। আর পুরুষ পাখিটা’ তার চারপাশে বই বঁই করে পাক খাচ্ছে।

এই হবে এক দেওয়ালের ছবি’। আর অ’ন্য দেওয়ালের ছবি’তে থাকবে :

পুরুষ পাখিটা’ ঠোঁট দিয়ে জালের দড়ি কেটে দিয়েছে। মেয়ে পাখিটা’ উড়ে পালাচ্ছে। আর পুরুষ পাখিটা’র পায়ে জালের ফাঁস আটকে গেছে। ছাড়াবার জন্যে সে আকুলি’ বি’কুলি’ করছে। ডানা ঝাপটা’চ্ছে, কিন্তু ছাড়াতে পারছে না। গাছের আড়াল থেকে শিকারী বেরিয়ে এসে পুরুষ পাখিটা’কে ধরতে যাচ্ছে। মিস্ত্রি বললো, বহুত আচ্ছা সাহেব, খুব বঢ়িয়া করে এঁকে দেব। আপনি কাল এসে দেখবেন। দেখে আপনার কলি’জা ফেটে যাবে।

উজির চমকে ওঠে, কলি’জা ফেটে গেলে তো আর জানে বাঁচবো না, মিস্ত্রি। আর একটু নিরেন্স করে একো, বাবা।

বাসায় ফিরে দাদীমা’কে সব বলা হলো। দাদীমা’ উজিরের বুদ্ধির তারিফ করে বলে, ভারি চমৎকার ফন্দী আঁটা’ হয়েছে। এবারে এই এক চালেই শাহজাদী দুনিয়া মা’ৎ হয়ে যাবে।

কিন্তু তাজ-এর প্রত্যয় হয় না। দেওয়ালে আঁকা দু’খানা ছবি’ দেখেই তার সব ধ্যান-ধারণা পলকে পালটে যাবে? যাইহোক, প্রত্যাশায় দিন গুণতে থাকলো। সাতদিন পরে শাহজাদী বাগিচা-বি’হা’রে বেরুবে। সেই কটা’ দিন প্রতীক্ষায় বসে থাকতে হবে। আর এই ফিকিরও যদি কাজে না আসে, তা হলে কি উপায় হবে? তাজ রাখবে কি করে এ জীবন?

সাতদিন পরের ঘটনা।

দুনিয়া ছটফট করতে থাকে। সারা প্রাসাদ খুঁজে দেখতে বলে, দেখো, দাদীমা’ কোথায়। দাসী বাদীরা এসে বলে, প্রাসাদে নাই, অ’ন্য কোথাও গিয়ে থাকবে।

শাহজাদী রেগে ওঠে, তাকে খুঁজে পেতে ডেকে আনতে বলেছি। কোথায় আছে না। আছে—সে ফিরিস্তি আমা’কে শোনাচ্ছিস কেন?

খুঁজতে খুঁজতে বাজারে এসে তাজ-এর দোকানে বৃদ্ধাকে পাওয়া গেলো। দুনিয়া তলব করেছে শুনে বৃদ্ধার হা’সি আর ধরে না। ওই—ডাক পড়েছে। এবার বাগিচা বি’হা’রে বেরুবে শাহজাদী। তা আমা’কে সঙ্গে না নিয়ে এক পা কোথাও যাবে না। আমা’কে না বলে কোনও একটা’ কাজ করবে না। আবার রেগে গেলে আমা’কেই মা’রতে তাড়া করবে। একেবারে জ্ঞানগম্য থাকে না—পাগল।

তাজ বলে, আপনাকে খুব ভালোবাসে কিনা।–তাই।

–ভালোবাসে না ছাই। ভালোই যদি বাসবে বাছা, তবে এতদিন ধরে তোতাপাখির মতো পড়াচ্ছি, তা আমা’র কথা আমলাই দিচ্ছে না। আবার কি বলে শাসায়—ফের যদি তোমা’র নাম উচ্চারণ করি, গলা আমা’র কেটে দেবে।

তাজ বললো, ও নিয়ে আপনি মন খারাপ করবেন না, দাদীমা’। মা’ মরা মেয়ে, কোলে পিঠে করে মা’নুষ করেছেন। তাই রাগ, অ’ভিমা’ন, ভালোবাসা, আক্রোশ সবই আপনাকে ঘিরে।

—তা যা বলেছ, বাবা। আমি ছাড়া আর একদণ্ড চলে না। অ’থচ একটু এদিক হলে খাড়া নিয়ে তাড়া করবে। আমি যাচ্ছি। যা বলে গেলাম, মনে থাকে যেন। আজ বি’কেলে সূর্য ডোবালো আগে বাগানে গিয়ে গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকবে। তারপর আমি যেমন ইশারা করবো, তেমনি তেমনি করবে। খুব বাহা’রী রংদার সাজে। সেজে যাবে। চেহা’রাখানা তো শাহজাদার মতো আছেই, তারপর সেজে গুজে গেলে আর দেখতে হবে না।

তাজ-আল-মুলুক বাদশাহী সাজ পোশাকে সেজে যখন বাগানের ফটকে পৌঁছলো তখন বি’কেলের পড়ন্ত রোদের তেজ ঝিমিয়ে এসেছে। মৃ’দু-মন্দ দখিনা বাতাসে বসন্তের আমেজ।

বৃদ্ধ মা’লি’ এসে দরজা খুলে সেলাম করে দাঁড়ালো, আসুন জনাব ভিতরে আসুন। এ আপনার নিজের বাগিচা বলে মনে করবেন। যখন ইচ্ছে হয় এসে যতক্ষণ থাকতে চান থাকবেন।

কিন্তু বৃদ্ধ জানে না, গুপ্ত দরজা দিয়ে ততক্ষণে শাহজাদী দুনিয়া বাগানের ভিতরে এসে গেছে। দাদীমা’ বলে গিয়েছিলো, বাগানের একাধারে একটা’ কেয়া গাছের ঝোপ আছে। সেই ঝোপের আড়ালে তাকে সে দাঁড়াতে বলেছে।

তাজ মা’লি’কে বলে, আমি একটু এদিকটা’য় আছি। তুমি তোমা’র নিজের কাজে যাও চাচা। দরকার হলে ডাকবো।

মা’লি’ বলে, হুকুম করলেই বান্দা হা’জির হবে হুজুর।

মা’লি’ তার নিজের কাজে চলে গেলো। তাজ অ’পেক্ষা করতে থাকে। একটুক্ষণের মধ্যে দাসীবাদী পরিবৃত হয়ে শাহজাদী দুনিয়া ফুল বাগিচার মা’ঝখানে এসে দাঁড়ায়। সঙ্গে সেই বৃদ্ধা দাদীমা’।

—বেটি, বৃদ্ধ বলে, তোমা’কে দু-একটা’ কথা বলতে চাই—

দুনিয়া বলে, বলে না, কি বলবে?

—আগে তোমা’র দাসীবাদীদের বি’দায় কর। তারপর বলবো।

দুনিয়ার ইশরায় সবাই চলে যায়। বৃদ্ধ দুনিয়াকে নিয়ে কেয়াঝোপের দিকে এগোতে থাকে। তাজ এবার দুনিয়াকে পরিষ্কার দেখতে পায়। এমন রূপের জৌলুস এমন নিখুঁত চেহা’রা আগে সে কখনও দেখেনি। বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস করতে থাকে। বৃদ্ধ আর দুনিয়া কিন্তু দাঁড়ায় না। ধীর পায়ে চলতে চলতে বি’লাস মহলের দরজার দিকে চলে যায়।

দুনিয়া খুশিতে উপছে পড়ে, বাঃ, বাহা’রী রং করেছে তো মা’লি’টা’। আমা’কে অ’বশ্য আগে কয়েকবার বলেছিলো, কিন্তু আমি তেমন গা করিনি। কি হবে এসবে? আমি তো কোনও নাগর নিয়ে রাসকলি’ করতে আসবো না। এখানে!

বৃদ্ধ বলে, তাই বলে ইমা’রৎটা’ ভূতুড়েবাড়ি হয়ে থাকবে? সুলতান বাদশাহ বলে কথা-অ’মনচুনবালি’ খসাইটের দাঁত-বের করা ছিরি দেখলে লোকে বলে কি!

দুজনে জলসাঘরের ভিতরে গিয়ে দাঁড়ায়। অ’নেকদিন বাদে এখানে এলো দুনিয়া। সেই স্বপ্ন দেখার পর থেকে সে বড় আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। নিজের মহল ছাড়া অ’ন্য কোথাও বড় একটা’ যায়-ই না। আগে বাজার করার ভীষণ শখ ছিলো; কারণে অ’কারণে দাদীমা’কে নিয়ে দোকানে দোকানে ঘুরে বেড়াতো। সাজ পোশাক, শৌখিন জিনিসপত্র সবই সে নিজে দেখেশুনে পছন্দ করতো। কিন্তু ইদানিং হা’টবাজারের নাম শুনতে পারে না। ওরেকবাস, ওখানে তো শুধু পুরুষ মা’নুষ কিলবি’ল করে। কোনও পুরুষের ছায়া মা’ড়াবো না আমি।

এই জলসাঘরেও সেই কারণে সে আসে না। এখানে তো আর মেয়েতে মেয়েতে মা’ইফেল জমে না। পুরুষ আর নারীর কামনা বাসনা মেটা’বার জায়গা এই জলসাঘর। কিন্তু দুনিয়ার জীবন থেকে সে পাট বি’দায় নিয়েছে।

দু-পাশের দেয়ালে চোখ পড়তেই দুনিয়া আঁৎকে ওঠে, দাদীমা’—

বৃদ্ধা অ’লক্ষ্যে হা’সে!—কি হলো, বেটা’। ভয় পেলে কিসে?

–-একি দেখছি, দাদীমা’? এ ছবি’ এখানে এলো কোথা থেকে, এ তো আমা’র সেই স্বপ্নের দৃশ্য। হুবহু। কিন্তু এখানে দেখছি পুরুষ পাখিটা’র পা ফাসে আটকে গেছে আর মেয়ে-পাখিটা’ই উড়ে পালাচ্ছে। আমা’র স্বপ্নে তো তা ছিলো না–

-–তুমি ভুল করেছিলে, মা’। স্বপ্নে যা দেখেছিলে, ঘুম ভাঙ্গার পর তা গুলি’য়ে গিয়েছিলো। মেয়েকে পুরুষ আর পুরুষকে মেয়ে ভেবে নিয়েছিলে। ওরকম ভুল হা’মেশাই হয়। সবারই হয়।

দুনিয়া গুম মেরে দাঁড়িয়ে থাকে। স্মৃ’তি হা’তড়াবার চেষ্টা’ করে। চোখ বন্ধ করে সেই স্বপ্নের দৃশ্যটি আর একবার দেখতে চায়। কিন্তু কেমন যেন সব ঝাপস মনে হয়। সবটা’ ভালো করে মনে করতেও পারে না। ভাবে, দাদীমা’ বোধহয় ঠিক কথাই বলছে। স্বপ্নের সবকিছু হুবহু মনে রাখা যায় না। হঠাৎ সে বৃদ্ধাকে দু’হা’তে জড়িয়ে ধরে, দাদীমা’, তুমি কি সুন্দর—তুমি ঠিক বলেছি, আমি স্বপ্নে যা দেখেছিলাম ঘুম ভাঙ্গার পরে মনে তার উল্টো ছোপই পড়েছিলো। আসলে পুরুষ পাখিটা’ই ফাঁদে আটকে পড়েছিলো; আর মেয়ে পাখিটা’ পালি’য়েছিলো।

একটুক্ষণ থেমে আবার বলতে থাকে, এখন আমা’র কি উপায় হবে দাদীমা’? আমি তো কত সুলতান বাদশাহের ছেলেকে ভাগিয়ে দিয়েছি। কোন মুখে আবার আব্বাজনকে বলবো, একটা’ নওজোয়ান পুরুষ না হলে আমা’র আর চলছে না।

বৃদ্ধা বলে, আহা’ আত অ’ধৈর্য হলে চলে? আপসে সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

—কিন্তু দাদীমা’, এখন ছেলেরাই বা রাজি হবে কেন? আর আমা’কে বি’শ্বাসই বা করবে। কি করে? সবাইকে ঢাক পিটিয়ে বলা হয়েছে, কোনও ছেলের সঙ্গে আমা’র শাদী দিলে, আগে পাত্রের গলা কাটবো, তারপর নিজের বুকে ছুরি বসিয়ে দেব। এখন যদি চাউর করেও দেওয়া হয়, শাহজাদী আবার শাদী করতে রাজি হয়েছে, জানের ভয়ে কেউ এগিয়ে আসবে না। ভাববে। এ আবার নতুন কোনও ফন্দী।

বৃদ্ধা দুনিয়ার মা’থায় হা’ত রাখে, তুমি কিছু ভেবো না বাছা, সব ঠিক হয়ে যাবে। চলো, বাগিচায় চলো, ফুলের বাহা’র দেখলে মনটা’ খানিক হা’লকা হবে।

কেয়া ঝোপের আড়াল থেকে তাজ বৃদ্ধার চোখের দিকে তাকায়। বৃদ্ধ ইশারা করে, তাদের সামনে দিয়ে সে যেন নির্বি’কার চিত্তে হেঁটে বাগিচার বাইরে বেরিয়ে চলে যায়।

তাজ আল-মুলুক স্বচ্ছন্দ ভাবে সোজা সদর ফটকের দিকে এগিয়ে চলে। এদিকে সে শাহজাদী তার দিকে আপলক চোখে তাকিয়ে দেখছে, সেদিকে সে লক্ষ্যই করে না। এমনভাব-বাগিচায় অ’ন্য কেউ আছে তা যেন সে দেখেইনি।

দুনিয়া হা’ঁ করে চেয়ে থাকে। তাজ-এর প্রিয়দর্শন চেহা’রা তাকে মুগ্ধ করে।–দাদীমা’, দেখছো?

-হুঁ। ভারি অ’ন্যায়। মা’লি’টা’র কি কোন কাণ্ডজ্ঞান নাই। শাহজাদী বি’হা’রে এসেছে, আর সে ব্যাটা’ নাকে তেল দিয়ে ঘুমা’চ্ছে! তুমি ওকে শূলে চাপাও, শাহজাদী। তবে ব্যাটা’র চৈতন্য হবে।

দুনিয়া বলে, আহা’-হা’ আমি মা’লি’র কথা বলি’নি, দাদীমা’? বলি’, দেখছো, কি সুন্দর নওজোয়ান।

বৃদ্ধা কপট ক্ৰোধে ফেটে পড়ে, সেই জন্যেই তো বলছি, মা’লি’টা’কে শূলে চাপাও। বাগানের দরজা হা’ট করে খুলে রাখে। আর সেইজন্যেই যখন তখন উটকো লোক ঢুকে পড়ছে।

দুনিয়া বলে, আহা’, আস্তে বলো, সাহেব শুনতে পেলে কি ভাববে বলতো?

—ভাববে। আবার কী? এতে ভাবাভাবি’ কি আছে। তুমি আসি। যখন তখন শাহজাদীর বাগানে ঢোকার মজা আমি বুঝিয়ে দিয়ে আসছি।

দুনিয়া বাধা দিয়ে বলে, না, দাদীমা’ অ’মন করো না, দেখছো না কি খুবসুরৎ—মনে হয় কোনও শাহজাদা।

—শাহজাদা না হা’তী! আজিকালি’কার ফচকে ছোঁড়াগুলো বাপের ঘাড় ভেঙে কেতাদুরস্ত সাজ-পোশাক পরে নবাবী চালে রাস্তায় নামে-মেয়ে শিকার করতে।

দুনিয়ার সে কথা বি’শ্বাস হয় না।—এ তুমি বাড়াবাড়ি করছ দাদীমা’। আমি কি ওর সাজ-পোশাক দেখে ভুলে গেলাম-ভেবেছোঁ। পয়সা খরচ করলে বাদশাহী সাজ-পোশাক না। হয় জোগাড় করা যায়। কিন্তু রূপ যৌবন? তাও কি বাজারে কিনতে পাওয়া যায়? দেখছো, না, সুন্দর রূপবান পুরুষ। সারা শহর খুঁজলেও আর একটা’ যোগাড় করতে পারবে?

–বুঝেছি বাছা, বুঝেছি! পিরিতে মজিলে মন কিবা হা’ড়ি কিবা ডোম—

—এ তোমা’র ভারি অ’ন্যায় দাদীমা’। হা’ড়ি মুচির সঙ্গে তুলনা করলে তার?

বৃদ্ধা বি’চিত্র মুখের ভঙ্গি করে বলে, আহা’-হা’, চুক চুক। আমি কি জানি, বাছা, পয়লা নজরেই প্রেমে পড়ে গেছ তার? তা বলো কি করতে হবে।

দুনিয়া বলে, ছুটে যাও। ফটক দিয়ে রাস্তায় নেমে গেলে আর ধরতে পারবে না। যেভাবেই হোক, ওকে একবার আমা’র সঙ্গে দেখা করতে বলো। এমনিতে রাজি না হলে বলবে, অ’নেক টা’কা দেবী। যত চায়। ওকে না পেলে আমি আত্মহত্যা করবো।

—না না, বাছা, অ’মন কাজটি করো না। আমি এখুনি যাচ্ছি। যেভাবে পারি তাকে রাজি করাবোই। আত্মহত্যা করলে যে প্ৰাণে বাঁচবে না মা’! তুমি মা’থা ঠাণ্ডা করে তোমা’র মহলে যাও। আমি দেখছি ছেলেটা’ কতদূর গেলো।

বৃদ্ধ আর দাঁড়ায় না। হন হন করে ফটকের বাইরে বেরিয়ে এলো। তাজ তার জন্যেই অ’পেক্ষা করছিলো। বৃদ্ধ বললো, কেল্লা ফতে—তোমা’র সুরৎ দেখে শাহজাদী কাত। কাল তোমা’র বাসায় যাবো। কখন যাবো বলতে পারছি না। তবে তুমি তৈরি হয়ে থাকবে। আমি সঙ্গে করে নিয়ে আসবো।

বৃদ্ধ আর অ’পেক্ষা করলো না। হন হন করে আবার প্রাসাদের দিকে চলে গেলো।

শাহজাদী অ’ধীর আগ্রহে অ’পেক্ষা করছিলো। বৃদ্ধ ঘরে ঢুকে বলে, দেখা পেয়েছি। কিন্তু রাজি হলো না, বাছা।

–রাজি হলো না? আমা’র কথা বলেছিলে?

–খুব বলেছি। সে বলেকি—আমা’র অ’নেক কাজ। মেয়ে মা’নুষের সঙ্গে দেখা করার ফুরসৎ নাই।

শাহজাদী একেবারে নিভে যায়, তবে? তবে কি হবে দাদীমা’। আমি তো আর এ জীবন রাখবো না। আমা’কে খানিক জহর। এনে দাও।

বৃদ্ধ বলে, ঘাবড়াও মা’ৎ বেটি, আমি সব বন্দোবস্ত করে দেব। আজকালকার ছোকরাগুলোর আর কিছু থাক না থাক, ডাঁট আর ফন্টটা’ ষোলআনা আছে। তা আমা’র কাছে অ’ত ডাট দেখিয়ে পার পাবে না বাছাধন। যে রোগের যা ওষুধ তা আমা’র ভালো করেই জানা আছে।

দুনিয়া ভেবে পায় না, বৃদ্ধ কি ভাবে তাকে রাজি করাতে পারবে। বলে, সে যদি না আসে তাকে তুমি কি পাকড়াও করে আনবে!

—দরকার হলে তাই করবো। তুমি কিছু চিন্তা করো না। ওসবের দরকার হবে না। যখন শুনবে তুমি সুলতান সারিমা’নের মেয়ে—কাপড়ে-চোপড়ে হয়ে যাবে না? আমি তার বাড়ির ঠিকানা নিয়ে এসেছি। কল সকালে যাবো। আজকের রাতটা’ কোনও রকমে কাটা’ও বাছা, কাল তোমা’র প্রেম-নাগরকে এনে মা’লা করে গলায় ঝুলি’য়ে দেব। আর তা যদি না পারি। তবে তাকে কড়ি কাঠে ঝুলাবো।-এও বলে রাখলাম।

–না, দাদীমা’, আর যাই কর, তাকে প্ৰাণে মেরো না। সে যদি না আসতে চায় নাই আসুক। আমা’র বুকের জ্বলায় আমি জ্বলে পুড়ে থাক হবো। কিন্তু ওর যেন কোনও অ’নিষ্ট না হয়।

—হেই শোনো মেয়ের কথা। আমি কি তাকে সত্যি সত্যিই কডিকাঠে ঝুলাবো নাকি? কামড়াবো না, তা বলে কি ফোস করতেও মা’না—!

পরদিন সকালে তাজ-এর বাসায় গিয়ে হা’জির হলো বৃদ্ধা। হা’তে তার শালোয়ার কামিজ আর বোরখার একটা’ মোড়ক। তাজকে বলে, নাও চটপট এগুলো পরে ফেলো। জেনানা সাজিয়ে নিয়ে যাবো তোমা’কে। তা না হলে প্রাসাদে ঢোকা যাবে না। বেটা’ খোজা কাফুর পাহা’রায় বসে আছে। ওকে এড়ানো বড় শক্ত।

তাজ-আল-মুলুক মেয়ে সাজলো। বৃদ্ধা দেখে অ’বাক হয়। তাজের যা রূপ-চাদপোনা সুরৎ, মেয়ের সাজেও সুন্দর দেখায়। বৃদ্ধা বলে, মেয়ে মা’নুষ হয়ে জন্মা’লে ছোড়াগুলো তোমা’কে আর আস্তা রাখতো না। নাও, এই চটিটা’ পর। পথে যখন চলবে, দেখে যেন কেউ সন্দেহ না করে। মেয়েছেলের মতো কোমর দুলি’য়ে দুলি’য়ে হা’ঁটবে। ঠিক এই রকম–

বৃদ্ধ বি’চিত্র ভঙ্গী করে কয়েক পা হেঁটে দেখিয়ে দিলো। তাজ আর হা’সি চাপতে পারে না, ঠিক আছে দাদীমা’, একেবারে নিখুঁত করে হা’ঁটবো, দেখে নিও।

প্রাসাদের অ’ন্দরমহলে ঢোকার মুখেই বসেছিলো খোজার সর্দার। এই-রোখে।

বৃদ্ধা হুঙ্কার দিয়ে ওঠে, কেন, ‘রোখো’ কেন?

খোজা বললো, আমি পরীক্ষা করে দেখবো, তারপর ঢুকবে। সুলতানের কড়া হুকুম আছে নতুন লোক হলে-সে যেই হোক, তল্লাসি না করে ভিতরে ঢুকতে দেবে না।

–তা কি তল্লাসি করবে শুনি, খানদানি ঘরের জেনানা। গায়ে হা’ত দেবে নাকি।

—দরকার হলে, তাও দিতে পারি।

–ওরে আমা’র কে রে, গায়ে হা’ত দেবে! হা’ত ভেঙ্গে দেব না।

–সে যাই বলো, দাদীমা’ না দেখে ছাড়তে পারবো না।

–তাই বলে আমিরের ঘরের লেড়কী। তোমা’র সামনে বেহা’য়ার মতো বোরখা খুলে দাঁড়াবে? মা’ন ইজ্জৎ বলে কি আর কিছু নাই।

খোজা বলে, বোরখানা খুললে হা’ত চালাবো। আমা’কে তো বুঝতে হবে, আসলি’ মেয়েছেলে কিনা।

—আসলি’ না তো কি নকলি’ নাকি খোজা সর্দার। আচ্ছা তুমি কী? সারাটা’ জীবন আমা’র এই প্রাসাদে কেটে গেলো। মা’থার চুল সব সফেদ হয়ে গেছে। এই বয়সে তোমা’র কাছে মিথ্যে বলে দোজকে যাবো?

খোজা জিজ্ঞেস করে, যাবে কোথা?

বৃদ্ধ কপালে হা’ত রাখে, ইয়া আল্লাহ, তাও জানো না। এক আমিরের বি’বি’ খুব ভালো সূচের কাজ জানে শুনে সুলতান তাকে বলেছিলো, তার বি’বি’ যেন মা’ঝে মা’ঝে এসে শাহজাদী দুনিয়াকে শিখিয়ে যায়। তাই তো আমি তাকে নিয়ে।, আসতে গিয়েছিলাম। নাও, পথ ছাড়া। এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে। শাহজাদী বোধহয় এতক্ষণে ক্ষেপে বোম হয়ে আছে। তুমি কিছু মনে করো না মা’, সর্দার আমা’র সঙ্গে একটু মা’সকরা করছে। এসো, আমা’র সঙ্গে এসো।

খোজা পথ ছেড়ে দেয়। বৃদ্ধ তাজকে নিয়ে হলঘরের ভিতরে ঢুকে যায়। অ’দ্ভুত কায়দায় তাজ পাছা দোলাতে থাকে। সদরের যত খোজা সবাই লোলুপ নয়নে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। এমহল ওমহল পার হতে হতে এক সময়। শাহজাদীর মহলের সামনে এসে হা’জির হয়। বৃদ্ধ বলে, এই যে লাল রেশমী পর্দা দেওয়া দরজা দেখছো, এই রকম ছ’খানা দরজা পার হওয়ার পর যে দরজাটা’ পাবে, খেয়াল রেখো, সেই দরজাই দুনিয়ার। আমি এখানে দাঁড়ালাম। তুমি দরজাগুলো গুণতে গুণতে চলে যাও। দুনিয়ার ঘরে ঢুকে দেখবে সে এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি। তার পরের ব্যাপার যা করার তুমি করবে—আমি আর বলে দেব না।

তাজ গুণে গুণে ছ’খানা দরজা ছেড়ে দিয়ে পরে দরজার পর্দা তুলে দেখলো, পালঙ্কে মখমলের শয্যায় শাহজাদী ঘুমে বি’ভোর। কামিজের সব কটি বোতাম খোলা, পায়ের ওপরে উঠে এসেছে শালোয়ার। নিটোল স্তনদুটো ঘাসের ফাঁক দিয়ে উকি দেয়া আধ-ফোঁটা’ পদ্মের কুঁড়ির মত অ’ংশ বি’শেষ বেরিয়ে রয়েছে। এলোমেলো চুলের খুচরো দু’এক গাছি এসে পড়েছে চিবুকের পাশে। তাজ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে থাকে। জাগাবে কি জাগাবে না—ঠিক করতে পারে না। একবার হা’ত দিয়ে মুখের চুলগুলো সরিয়ে দিতে যায় আবার কি ভেবে হা’তখানা সরিয়ে নেয়। আস্তে আস্তে ওর পাশে এসে বসে। চাঁদের শোভা দেখতে থাকে। অ’পলক নয়নে। আপনা থেকেই মুখটা’ আনত হয়ে আসে। কি সুন্দর পাকা আঙুরের মতো ঠোট। তাজ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরে। আপনা থেকে হা’ত দু’খানা উঠে আসে ওর দেহে।

শাহজাদীর ঘুম ছুটে যায়। কিছুই বুঝতে পারে না–স্বপ্ন না। সত্যি। ঝটিকা মেরে উঠ পড়তে চায়। কিন্তু তাজের বজমুঠিতে বাঁধা আছে তার দেহ। দুনিয়া চিৎকার করতে চায়। কিন্তু ওর ঠোঁট চাপা আছে আর এক ঠোঁটে। তার পৌরুষের কাছে হা’র মা’নতে হয় তাকে। হা’র মা’নতে হয় সব নারীকেই।

দুনিয়া এতক্ষণে বুঝতে পারে। ওর চোখ হেসে কথা বলে, তুমি-তুমি এসেছে। আমি তো সারাটা’ রাত তোমা’র কথাই ভেবেছি প্রিয়। তোমা’র স্বপ্নেই এতক্ষণ আচ্ছন্ন ছিলাম। তুমি কখন এলে?

তাজও চোখেই কথা বলে, তুমি শুধু সারাটা’ রাত আমা’র কথা ভেবেছো? স্বপ্ন দেখেছ? আর আমি সারাটা’ বছর তোমা’র কথা ভেবে ভেবে সারা হয়েছি, প্রিয়া। তোমা’কে পাবো বলে পাহা’ড় নদী প্রান্তর ডিঙিয়ে এসেছি। এখানে।

দুনিয়া দু’হা’ত বাড়িয়ে তাজকে জড়িয়ে ধরে। বুকের যৌবনচিহ্ন দুটোকে নিজের বুকে চেপে ধরে পিস্ট করতে থাকে। খোলা কামিজের ভিতর হা’ত ঢুকিয়ে স্তনগুলোর উপর পরম মমতায় প্রথমে হা’ত বুলাতে থাকে, তারপর আস্তে আস্তে মুঠোকরে চাপতে চাপতে পরে আটা’ ধলার মতো দলতে থাকল। একসময় সকল পোশাক খুলে যৌবনপুস্ট দেহের প্রতিটি লোমকোষ, অ’ঙ্গে চুম্বন, চোষন, পেষন করে সম্ভোগ করতে থাকে। বাকি বর্ননা না হয় নাই বা দিলাম।

পুরো একটা’ মা’স দুনিয়ার ঘরে তাজ রয়ে গেলো। সারাদিন ধরে খায় দায়, নাচ-গান হৈ-হল্লা করে কাটা’য়। তাজ-এর হৃদয় কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। দুনিয়াও নিজেকে নিঃশেষ করে বি’লি’য়ে দেয়। তাজ-আর দুনিয়া-দুই-এ মিলে এক সুখের নীড় রচনা করতে থাকলো।

এদিকে উজির আর আজিজ। সারাটা’ রাত উদগ্রীব হয়ে বসে থাকে। কিন্তু তাজ আর ফেরে না। একদিন দুদিন করে এক সপ্তাহ কেটে যায়। কিন্তু তাজ-এর কোন সন্ধান নাই। সেই বৃদ্ধাও আর আসে না। উজির ভাবলো, নিশ্চয়ই সে ধরা পড়েছে। এবং সুলতান তাকে কোতল করে ফেলেছে। ভাবতেও গা শিউড়ে ওঠে।

আজিজ বললো, একমা’স বাদে আবার বি’লাস মহলের ফটক খুলবে। শাহজাদী বি’হা’রে আসবে। ততদিন পর্যন্ত কি অ’পেক্ষা করবেন?

অ’গত্যা তাই করতে হবে। না হলে এই অ’বস্থায় কি সংবাদ নিয়ে যাবো সবুজ শহরে কি বলবো সুলতান সুলেমা’নকে?

একটি মা’স পুরো হয়ে গেলো একদিন। কিন্তু বি’লাস ভবন-এর দরজা খুললো না। এবার উজির শঙ্কিত হলো। আর তো এখানে অ’পেক্ষা করা চলে না; আজিজকে বললো, চলো আজিজ, দেশে ফিরতে হবে। আর অ’পেক্ষা করে লাভ নাই। সুলতানের কাছে সব খুলে বলা ছাড়া গতি নাই।

আর দেরি না করে পরদিনই তারা যাত্রা করলো। কয়েক দিন পরে সবুজ শহরে পৌঁছে কাঁদতেকাঁদতে  জানালো, তাজ অ’ল মুলুক কপূর প্রবাল সুলতানের প্রাসাদে বন্দী হয়ে আছে। আজ প্রায় দু মা’স তার কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি।

সুলতান আর্তনাদ করে ওঠে। মনে হয় তার পায়ের তলার মা’টি সরে গেছে। দু’হা’তে মুখ ঢেকে শিশুর মতো কাঁদতে থাকে।

কিন্তু বসে বসে কাঁদলে তো ছেলেকে ফেরৎ পাওয়া যাবে না। একটা’ ব্যবস্থা করতে হবে। কপূর দ্বীপের সুলতান ভেবেছে কি? আমা’র হুঙ্কারে ইস্পাহা’ন পাহা’ড় কেঁপে ওঠে। আর ওই সামা’ন্য কপুর-সুলতান? ওকে আমি রেণু রেণু করে গুড়িয়ে দেব।

উজির বললো, এখনি ব্যবস্থা কর। সেনাপতিদের খবর পাঠাও। কপূর দ্বীপ আক্রমণ করতে হবে। সারা শহরে সােজ সাজ রাব পড়ে গেলো! ঢাল তরোয়াল, বর্শা, সড়কী নিয়ে বেরিয়ে এলো হা’জার হা’জার সৈন্য। আল্লাহ আকবর, আল্লাহ আকবর ধ্বনি করতে করতে এগিয়ে চললো।

এদিকে দুনিয়া আর তাজ সুখের সায়রে ভাসছে। একদিন তাজ দুনিয়াকে আদর করতে করতে বললে, সোনা, তুমি আমা’কে অ’নেক দিয়েছ, আমিও দিয়েছি সাধ্যমতো। কিন্তু একটা’ জায়গায় একটু খুঁত রয়ে গেছে। সেই জন্যেই স্বস্তি পাচ্ছি না।

—কি সোনা? তুমি যাচাও যেভাবে আমা’কে পেতে চাও আমি কি সেভাবে দিতে পারছি না। তাজ ওকে বুকে টেনে নেয়। না, সোনা, ওসব কিছু না। ওদিক থেকে আমা’র কোন কিছুর অ’ভাব নাই। তুমি আমা’কে দু’হা’ত ভরে উজাড় করে দিয়েছে। আমিই তোমা’র কাছে খানিকটা’ চেপে গেছি।

দুনিয়া অ’বাক হয়, সে কী?

আমি আমা’র আসল পরিচয় তোমা’কে দিইনি।

–মা’নে?

আমি শাহেনশাহ সুলেমা’ন শাহর পুত্র তাজ-আল মুলুক। সবুজ শহর এবং ইস্পাহা’ন পর্বতমা’লার অ’ধিপতি আমা’র বাবা। তোমা’র কাছে সওদাগরের ছদ্মবেশে এসেছি। অ’নেকদিন ধরেই তোমা’কে বলবো বলবো ভাবি’, কিন্তু বলা আর হয় না।

দুনিয়ার চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। তুমি সুলতান সুলেমা’নের ছেলে। তোমা’র উজিরই না আমা’র বাবার কাছে এসেছিলো শাদীরা

মুখের কথা কেড়ে নিয়ে তাজ বলে, শাদীর প্রস্তাব নিয়ে উজিরই এসেছিলো তোমা’র বাবার কাছে। তোমা’র বাবা দারুন খাতির যত্ন করেছিলেন, কিন্তু তুমিই বেঁকে দাঁড়িয়েছিলে। মনে আছে খোজকে খাড়া নিয়ে তাড়া করেছিলে!

—হুঁ! খুব মনে আছে। তখন আমা’র মা’থায় শয়তান ভর করেছিলো। পুরুষ মা’নুষের নাম শুনলে খুন চেপে যেত।

তাজ বললো, আজ কামা’স হয়ে গেলো, উজির কোন খবর না পেয়ে কি যে ভাবছে, কি যে করছে কিছুই বুঝতে পারছি না। আমিও এমন নেশায় মত্ত হয়েছিলাম ওদের কথা মনেই ছিলো না। কিন্তু এত দিনে কি আর তারা এখানে আছে?

—নেই। আমি দাদীমা’র কাছে খবর পেয়েছি। দাদীমা’ গিয়েছিলো। তোমা’দের দোকানও আর খোলা হয় না। বাড়িও তালা বন্ধ! বাড়িওলার কাছে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, আজ মা’স-দুই তারা দেশে গেছে।বাড়ি ছাড়েনি। এক বছরের অ’গ্রিম ভাড়া জমা’ দিয়ে গেছে।

তাজ বলে, সর্বনাশ হয়েছে।

–কেন?

—যুদ্ধ অ’নিবার্য। উজির নিশ্চয়ই ভেবেছে তোমা’র বাবা আমা’কে বন্দী করেছে অ’থবা মেরে ফেলেছে। সে দেশে গিয়ে বাবাকে বলা মা’নেই যুদ্ধ। আমা’দের হা’জার হা’জার সৈন্য সামন্তের কাছে তোমা’র বাবা কি দাঁড়াতে পারবেন? একেবারে ছাতু ছাতু হয়ে যাবে সারা শহর।

দুনিয়া আঁৎকে ওঠে, তা হলে কি হবে?

তাজ বলে, আর দেরী নয়, সোনা, চলে আমরা সবুজ-শহরের পথে রওনা হই। আমা’কে চোখে না দেখা পর্যন্ত বাবাকে কেউ থামা’তে পারবে না। রাগলে সে আর মা’নুষ থাকে না।

এই সব কথা বলতে বলতে রাত প্রায় শেষ হয়ে আসে। দুনিয়া বলে, এখন একটু ঘুমিয়ে নাও। কালই আমরা রওনা হয়ে যাবো।

দু’জনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ে। এই ভাবে অ’নেক বেলা পর্যন্ত তারা সুখনিদ্রায় বি’ভোর হয়ে থাকে।

সেই দিন সকালে সুলতান সারিমা’নের দরবারে এক জহুরী এসে কুর্নিশ জানালো। জহুরীর হা’তে একটা’ গহনার বাক্স। সুলতানের হা’তে তুলে দিয়ে বলে, পারস্য থেকে এক সওদাগর নিয়ে এসেছে, জাঁহা’পনার যদি প্রয়োজনে লাগে এই ভেবে নিয়ে এসেছি।

সুলতান সারিমা’ন দেখলো, মূল্যবান জড়োয়া গহনা। নানা রকম হীরা চুনী মুক্তো পান্না বসানো বাহা’রী কাজ করা। লক্ষাধিক মোহর দাম হতে পারে। সুলতান ভাবে, দুনিয়ার যদি পছন্দ হয় রেখে দেবে। খোজা সর্দারকে ডেকে বলে কাফুর, অ’ন্দরমহলে শাহজাদীকে গহনাগুলো দেখিয়ে আয়, তার যা পছন্দ-সে যেন রেখে দেয়।

গহনার বাক্সটা’ হা’তে নিয়ে কাফুর শাহজাদীর মহলে চলে আসে। বৃদ্ধ দাদীমা’ দুনিয়ার সামনে একটা’ গালি’চা পেতে শুয়ে ঘুমা’চ্ছিল। কাফুর তাকে ডিঙিয়ে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢোকে। সঙ্গে সঙ্গে কাফুরের চোখের সামনে সারা ঘরটা’ যেন দুলতে থাকে। মা’থাটা’ ঝিমা’ঝিম করে ওঠে। চোখ দুটো হা’ত দিয়ে ডলে আবার দেখে, নাঃ, সে তো স্বপ্ন দেখছে না। সত্যি সত্যিই শাহজাদী উলঙ্গ হয়ে একটি ছোকরাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমে অ’চেতন।

এতক্ষণে কাফুরের সামনে সব খোলসা হয়ে যায়। এই জন্যেই শাহজাদী শাদীর নাম শুনলে ক্ষেপে যেত। এই জন্যেই তাকে সে একদিন ছোরা নিয়ে তাড়া করেছিলো। ইম, এতদিনে বোঝা গেলো, রহস্যটা’ কোথায়। কাফুরের মনে প্রতিশোধ প্রবৃত্তি মা’থা চাড়া দিয়ে ওঠে। আমা’কে ছুরি নিয়ে তেড়ে এসেছিলে? দাঁড়াও মজা দেখাচ্ছি।

বাক্সটা’ হা’তে নিয়ে, ঘর থেকে পা টিপে টিপে বেরিয়ে, উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে আসে কাফুর। সুলতান জিজ্ঞেস করে, কি খবর কাফুর?

—এই নিন জাঁহা’পনা, আপনার বাক্স।

–কী ব্যাপার, একটা’ও পছন্দ হলো না শাহজাদীর?

—আমা’কে মা’ফ করবেন জাঁহা’পনা, এত লোকের সামনে ঘরের কথা বলতে পারবো না।

সুলতানের ইশারায় দরবার ফাঁকা হয়ে গেলো। কাফুর গলা খাটো করে বললো, শাহজাদীর ঘরে ঢুকে দেখি একটা’ খুবসুরৎ নওজোয়ানকে নিয়ে শুয়ে আছে। এর বেশি আর জিজ্ঞেস করবেন না, হুজুর।

সুলতান হুঙ্কার ছাড়ে, কী? কার ঘাড়ে কটা’ মা’থা আছে আমা’র অ’ন্দরমহলে ঢোকে। তোরাই বা সব কি করিস। বাইরের পুরুষ মা’নুষ অ’ন্দরে ঢুকলো কি করে? তুই ঠিক দেখেছিস তো কাফুর?

—হুজুর, প্রথমে আমা’র চোখকে বি’শ্বাস করতে পারিনি। ভাবলাম বুঝি খোয়াব দেখছি। তারপর আবার ভালো করে দেখলাম, শাহজাদির শরীরে কোনও বস্ত্রই নাই, জাঁহা’পনা!

—থাম, সুলতান আর সহ্য করতে পারে না, একটা’ নিগ্রোকে ডাক। ওদের দুজনকেই ধরে বেঁধে যেমন করে পারে আমা’র সামনে হা’জির করুক। আমি নিজে চোখে দেখতে চাই বেতমিজ বদমা’ইশটা’কে।

তাজ আর দুনিয়াকে এনে দাঁড় করানো হলো সুলতানের সামনে। সুলতান চিৎকার করে উঠলো, তা হলে কাফুরের কথা মিথ্যে নয়। তরে রে শয়তান—

এই বলে সুলতান নিজে হা’তেই একখানা বর্শা ছুঁড়ে মা’রে। কিন্তু ক্ষিপ্রগতিতে দুনিয়া তাজকে টেনে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে, মা’রতে যদি হয় দু’জনকে এক সঙ্গেই মা’রুন জাঁহা’পনা। দোষ তো ওর কিছু নাই। আমি একে আমা’র ঘরে না আনলে আসতে পারে কখনও?

সুলতান কৈফিয়ৎ তলব করে, কে তুমি, কি তোমা’র পরিচয়?

তাজ বি’নীতভাবে বলে, আমা’র নাম তাজ আল-মুলুক। আমা’র বাবার নাম সুলতান সুলেমা’ন শাহ-সবুজ শহর আর ইস্পাহা’ন পর্বতমা’লার অ’ধিপতি। আপনার যদি ইচ্ছা হয় আমা’কে হত্যা করতে পারেন। মৃ’ত্যুকে আমি ভয় পাই না। কিন্তু আপনার পরিণাম কি হবে একবার চিন্তা করে দেখুন। আমা’র বাবার বি’ক্রম আপনার অ’জানা নাই। এই কপূর দ্বীপ কপূরের মতোই উড়িয়ে দেবেন। তিনি। সুতরাং আমা’কে খতম করার আগে আপনার নিজের বাঁচার পথটা’ ঠিক করে রাখুন।

তাজের কথায় দিশাহা’রা হয়ে পড়ে সুলতান! কি করা উচিৎ কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। উজিরকে জিজ্ঞেস করে, কি করা যায় বলতো। ছেলেটা’ যা বলছে তা যদি ঠিক হয় তাহলে তো সমূহ বি’পদ।।

উজির বলে, লোকটা’ একেবারে ফেরেববাজ। ওর কথা বি’লকুল বি’শ্বাস করবেন না, হুজুর। ধাপ্পাবাজির আর জায়গা পায়নি। সুলতান সুলেমা’নের পুত্র। তার ছেলে এই রকম বেলেল্লাপনা করতে আসবে? আপনি ওরা ওসব ভাওতায় ভুলবেন না, জাঁহা’পনা, কোতল করে ফেলুন। শত্রুকে বেশিক্ষণ জিইয়ে রাখতে নাই।

—তুমি ঠিক বলেছ উজির, সুলতান সুলেমা’নের পুত্র এই রকম বেলেল্লা হতে পারে না। এই কুকুরের বাচ্চাটা’র মৃ’ত্যুই একমা’ত্র সাজা।

সুলতান যখন বললো, এই কুকুরের বাচ্চাটা’র মৃ’ত্যুই একমা’ত্র সাজা, ঠিক সেই সময় প্রহরী এসে খবর দিলো, সবুজ শহরের সুলতানের প্রতিনিধি এসেছেন সুলতানের সঙ্গে দেখা করতে।

সুলতান উজিরকে বললো, ওদের সসম্মা’নে নিয়ে এসো।

উজির এবং আজিজ এসে কুর্নিশ জানিয় দাঁড়াতেই তাজ অ’ল মুলুককে দেখে আনন্দে লাফিয়ে ওঠে, শাহজাদা—

তাজ-আল-মুলুক বলে, কে বললে আমি শাহজাদা। আমি তো একটা’ ধাপ্লাবাজ মিথ্যেবাদী, শয়তান।

সুলতান স্বয়ং সিংহা’সন থেকে নেমে এসে তাজকে বুকে জড়িয়ে ধরে–আমি উজিরের কথায় তোমা’র উপর অ’বি’চার করেছি। বাবা। অ’নেক কটু কথা বলেছি। তুমি কিছু মনে করো না। আমি ঐ উজিরটা’কে শূলে চাপবো। মা’থা মোটা’ একটা’ হা’ঁদা কোথাকার! সারিমা’ন ভাবে ভাগ্যে জল্লাদকে সে হুকুম দিতে দেরি করেছিলো। আর এক দণ্ড পরে যদি এঁরা আসতেন তা হলে তাজ-এর কাটা’ মুণ্ডু এতক্ষণে মা’টিতে পড়ে থাকতো। উফ ভাবতেও শরীর শিউরে ওঠে সারিমা’নের। উজির জানায়, সুলতান সুলেমা’নের সেনাবাহিনী জোর কদমে এগিয়ে আসছে কপূর দ্বীপের দিকে। ওদের খবর পাঠাতে হবে। নইলে শহরের ভিতর ঢুকে সব ধুলোয় মিশিয়ে দেবে-এই রকম হুকুমই তাদের দেওয়া আছে। সুতরাং আমি আর অ’পেক্ষা করতে পারছি না। সেনাপতিদের সঙ্গে দেখা করে সেনাবাহিনী ফিরিয়ে নিতে হবে।

ভয়ে সুলতান সারিমা’নের হা’ত পা কাঁপতে থাকে। উজির বলে, আপনি আশ্বস্ত হোন জাঁহা’পনা, আমি সব ব্যবস্থা করছি। আর আপনি আপনার বৃদ্ধ উজিরকে এর জন্যে কোন তই শাস্তি দেবেন না। এই আমা’র আর্জি। কারণ সে নিজের স্বার্থের জন্য কিছু করতে চায়নি। যা কিছু করেছে সুলতানের মঙ্গল চিন্তা করেই করেছে। হয়তো তার বি’চারে ভুল হতে পারে। এর জন্য প্রাণদণ্ড হয় না।

আমিও সেই কথাই বলি’, জাঁহা’পনা, ওকে আপনি এযাত্রা রেহা’ই দিন। ভুল মা’নুষ মা’ত্রেরই হয়।

সুলতান সারিমা’ন বলে, ঐ ব্যাটা’ খোজা কাফুর, সব নষ্টের গোড়া সে। ওকে আমি ক্রুশে গেঁথে মা’রবো।

তাজ বলে, সে আপনার ইচ্ছা। এ ব্যাপারে আমি কিছু বলতে চাই না। তবে লোকটা’র জন্যেই যে আমা’র গর্দান যেতে বসেছিলো, এ বি’ষয়ে কোনও সন্দেহ নাই।

উজির এবং আজিজ দুজনেই এগিয়ে এসে বলে, শুভকোজ সামনে। এখন আর নরহত্যা না হয় নাই করা হলো। এ যাত্রা ওকে ক্ষমা’ঘেন্না করে না হয় ছেড়েই দিলেন।

সুলতান সারিমা’ন বললো, এ ব্যাপারে আপনারা যা বলবেন আমি তাই করবো। খোজাকে শূলে চাপাতে বলেন শূলে চাপাবো। ছেড়ে দিতে বলেন ছেড়ে দেব।

তাজ বলে, ঠিক আছে, এবারের মতা ওর বেয়াদপি মা’ফ করেই দিন।

সুলতান সারিমা’ন বলে, আর বাবা, আমা’র গুনাহর কে বি’চার করবে?

তাজ বলে, ও কথা বলে লজ্জা দেবেন না জাঁহা’পনা। এখন থেকে আপনি আমা’র দ্বি’তীয় পিতা। পিতাপুত্রের সম্পর্ক তো বি’চার-বি’বেচনার সম্পদ নয়, জাঁহা’পনা।

সারিমা’ন তাজকে বুকে জড়িয়ে ধরে। উজির আর আজিজ সেনাপতিতদের সঙ্গে দেখা করতে চলে যায়। আমির ওমরাহ এবং দরবারের সচিবরা তাজকে নিয়ে যায় হা’মা’মে। এদিকে কাজীদের খবর পাঠানো হয়। সারাপ্রাসাদে হৈচৈ পড়ে যায়। শাহজাদী দুনিয়ার শাদী।

সুলতান সারিমা’ন এবার কন্যা দুনিয়ার ঘরে আসে। মেয়ে হয়তো মনে আঘাত পেয়েছে। দরবারে ডেকে উজিরের সামনে তাদের এইভাবে হেনস্থ করা হয়েছে। অ’ভিমা’নী মেয়ের মনে চোট লাগা স্বাভাবি’ক।

ঘরে ঢুকতেই চমকে ওঠে। শাহজাদী দুনিয়া একখানা ছুরি হা’তে বাগিয়ে ধরেছে। আর এক মুহূর্ত দেরি হলে নিজের বুকে বসিয়ে দিত। সুলতান ক্ষিপ্রহা’তে ছুরিখানা ছিনিয়ে নিয়ে বলে, এ কি করছিলে, মা’।

দুনিয়া কেঁদে ওঠে, এ জীবন আমি আর রাখবো না বাবা।

সুলতান সারিমা’ন আকুল হয়ে বলে, ও কথা মুখে আনতে নাই মা’। তুমি আমা’র একমা’ত্র সন্তান। তুমি না থাকলে আমি বাঁচবো কি নিয়ে?

দুনিয়া বলে, তাজ ছাড়া আমা’র জীবনের কোনও মূল্য নাই। সে আমা’র জীবনের একমা’ত্র ভরসা ছিলো। তুমি তাকে হত্যা করেছ। আমি কি নিয়ে থাকবো?

—না মা’, না। সে এখনও বেঁচে আছে। আমি ভুল করে তাকে সাজা দিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু আল্লাহ বাঁচিয়েছেন। সবুজ শহর থেকে সুলতান সুলেমা’নের উজির এসেছেন। তার কাছেই জানলাম, তাজ কোনও ধাপ্পা দেয়নি। ওঠা মা’, ওঠা। আমি তোমা’দের মিলন ঘটিয়ে দিচ্ছি।

তাজ-আল-মুলুক হা’মা’ম থেকে ফিরে আসে। সুলতান নিজে হা’তে ধরে তাজকে নিয়ে এলো দুনিয়ার ঘরে।–এই দেখো, মা’। তাজ বেঁচে আছে।

দুনিয়া ছুটে এসে তাজ-এর হা’ত ধরে, আনন্দে তার দু’চোখ বেয়ে নেমে আসে অ’শ্রুধারা। সুলতান ঘরে ছেড়ে বেরিয়ে যায়।

তাজ দুনিয়াকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে।-ওরা আমা’কে মা’রতে চেয়েছিলো, সোনা। কিন্তু আমা’দের ভালোবাসা আমা’কে রক্ষা করেছে। চলো, আর দেরি করবো না। বাবা বড় দুশ্চিন্তায় দিন কাটা’চ্ছেন। আজই আমরা সবুজ শহরের পথে রওনা হবে।

সেই দিনই তাজ, দুনিয়া, উজির, আজিজ এবং সুলতান সারিমা’ন সবুজ শহরের পথে যাত্রা করে। কিছুদিন বাদে যখন তারা এসে পৌঁছয় সারা সবুজ শহর তখন আনন্দের বন্যায় ভেসে চলেছে। দূত এসে আগেই সুলতান সুলেমা’নকে খবর দিয়েছিলো, শাহজাদা তাজ-আল-মুলুক পাত্রী শাহজাদী দুনিয়াকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে আসছেন।

শহরের প্রবেশ মুখে বি’রাট তোরণদ্বার তৈরি করা হয়েছিলো। হা’জার হা’জার নরনারী এসে সমবেত হয়েছে। তাদের ভাবী সুলতান আর তার ভাবী বেগমকে সাদর অ’ভ্যর্থনা জানাতে সবুজ শহর। আজ ভেঙে পড়েছে। কাঁড়ানাকাড়া বাজিয়ে চলেছে সেনাবাহিনী। রাস্তার দুপাশে

ফুলের মা’লায় সাজানো হয়েছে প্রাসাদ। সুলতানের হুকুমে জনে জনে দান করা হচ্ছে নতুন পোশাক, খানাপিনা, ফল ফুল, আতর, গোলাপজল।

তাজ প্রাসাদে ঢুকেই প্রথমে সুলতান সুলেমা’নকে জড়িয়ে ধরে।—আব্বাজান, আমা’র জন্যে বড় দুশ্চিন্তায় দিন কেটেছে আপনার। অ’নেক কষ্ট পেয়েছেন। আমা’কে ক্ষমা’ করুন।

ছেলেকে বুকে জড়িয়ে সুলতান বলে, আল্লাহ যখন যাকে যে ভাবে রাখেন। তাই থাকতে হয় বাবা। ও নিয়ে আমা’র কোনও দুঃখ নাই। আজ যে আবার তোমা’কে ফিরে পেয়েছি। এজন্যেই তাকে আমা’র হা’জার হা’জার সালাম জানাই।

দুই সুলতান এবং তাজ একসঙ্গে বসে খানাপিনা করলো। কাজীরা এসে শাদীনামা’ তৈরি করে দি নানারকম সাজপোশাক এবং নগদ অ’র্থ উপহা’র নিয়ে বি’দায় নিলো। সেনাবাহিনীর মধ্যে দু’হা’তে ধনদৌলত বি’তরণ করা হতে থাকলো। নাচ গান বাজনা হৈ-হল্লায় মেতে উঠলো। শহরবাসী। চল্লি’শ দিনব্যাপী চলতে থাকলো এই আনন্দ উৎসব। দুনিয়া আর তাজ ভালোবাসার সায়রে গা ভাসিয়ে দিয়ে স্বৰ্গ-সুধা পান করতে লাগলো।

তাজ কিন্তু আজিজকে ভোলেনি। দামী দামী সাজপোশাক, মূল্যবান গালি’চা পর্দা, খটপালঙ্ক নানা রকম শৌখিন বি’লাস সামগ্ৰী এবং প্রচুর ধনরত্ন সহ দাসদাসী নফরবাদী উট খচ্চর গাধা। ঘোড়া সঙ্গে দিয়ে আজিজকে তার মা’র কাছে পাঠিয়ে দিলো। আজ কতকাল তার মা’ ছেলেকে চোখে দেখেনি। হয়তো সে বেচারী কেঁদে কেঁদে অ’ন্ধ হয়ে গেছে।

সুলতান সুলেমা’নের মৃ’ত্যুর পর তাজ-আল-মুলুক সুলতান হলো। আজিজকে করলো তার উজির। আর সেই বাগানের বৃদ্ধ মা’লি’র কথাও ভোলেনি তাজ। সবুজ শহরে এক বি’রাট রেশমী কাপড়ের দোকান করে দিলো তাকে।

Please follow and like us:

fb-share-icon

নতুন ভিডিও গল্প!


Tags: , , , , , ,

Comments are closed here.