সহস্র এক আরব্য রজনী – ১৭ (আলী–ইবন বকর ও সামস আল–নাহারের কিস্সা)

September 6, 2021 | By Admin | Filed in: বিখ্যাত লেখকদের সাহিত্যে যৌনতা.

এরপর শাহরাজাদ বলে, এবার আপনাকে আলী-ইবন বকর ও সুন্দরী সামস আল-নাহা’রের কাহিনী শোনাবো :

খলি’ফা হা’রুন-অ’ল-রাসিদের সময়ে বাগদাদ শহরে আবু অ’ল হা’সান নামে এক সম্ভ্রান্ত সওদাগর বাস করতো। তার দোকানে সুলতান বাদশাহদের উপযোগী বাহা’রী বাহা’রী মহা’মূল্যবান সাজপোশাক পাওয়া যেত। আমির বাদশাহরাই তার খদ্দের। অ’তো দামের সাজ-পোশাক সাধারণ মা’নুষ ব্যবহা’র করবে কি করে?

হা’রেমের খোজারা তার দোকান ছাড়া অ’ন্য কোথাও যেত না। আর শুধু সাজপোশাকই তো নয়, লক্ষ লক্ষ দিনারের হিরে জহরতের জড়োয়া গহনারও সেই একমা’ত্র বি’ক্রেতা। অ’ন্য সব দোকান ছেড়ে খোজারা তার দোকানেই ভিড় করতো তার অ’ন্য কারণও ছিলো। প্রথমত দোকানে এলেই খুব খাতির যত্ন পেত। শরবৎ মিঠাই পান তো মিলতোই তাছাড়া পেত। মোটা’ দালালী। যত সওদা প্রাসাদে যেত তার দামের ওপর হিসেব করে দালালী পেত তারা। এছাড়া তার নম্র ব্যবহা’রেও সবাই প্রীত ছিলো। স্বয়ং সুলতান হা’রুন-অ’ল-রসিদও তার দোকানে পায়ের ধুলো দিতেন! আবুল হা’সানের অ’মা’য়িক ব্যবহা’র এবং তার প্রিয়দর্শন চেহা’রা তাকে আকৃষ্ট করেছিলো। খলি’ফা কোন উৎসবে অ’নুষ্ঠানে আবুল হা’সানকে বাদ দিতেন না। প্রাসাদে তার অ’বাধ গতিবি’ধি ছিলো। যখন খুশি সে খলি’ফার সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করতে পারতো। খলি’ফা নিজেই সে অ’ধিকার তাকে দিয়েছিলো।

তরুণ আবুল হা’সানের দোকানে বাগদাদের সম্ভ্রান্ত তরুণ-তরুণীদেরও খুব ভিড় জমতো। যত আমির ওমরাহ—তাদের বাড়ির ছেলে-মেয়ে-বি’বি’রা কেনাকাটা’ করতে আসতো। পারস্যের এক সুলতানের পুত্র ছিলো তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তার নাম আলী ইবন বকর। সেও তার দোকানে প্রায়ই আসতো।

একদিন এই শাহজাদা তার দোকানে বসে আবুল হা’সানের সঙ্গে গল্পগুজব করছে এমন সময় জনা দশেক সুবেশা সুন্দরী মেয়ে এসে দোকানের সামনে দীড়ালো। তাদের সঙ্গে আর একজন মেয়ে। সে ছিলো একটা’ দামী খচ্চরের পিঠে। তার বাহা’রী সাজ-পোশাকে চোখ ঝলসে যায়।

পড়ে। এমন পরমা’সুন্দরী মেয়ে বড় একটা’ দেখা যায় না। টা’নাটা’না চোখ, উন্নত নাক, আবি’র রাঙা গাল, পাকা আঙুরের মতো ঠোঁট-বেহেস্তের হুরীর কথা মনে করিয়ে দেয়। খচ্চরের পিঠ থেকে নেমে সে দোকানে ঢোকে। আবুল হা’সান দু’হা’ত জোড় করে সাদর অ’ভ্যর্থনা জানায়, আমা’র কি সৌভাগ্য আপনার পায়ের ধুলো পড়লো—

একটা’ মখমলের গদি দেখিয়ে বসতে অ’নুরোধ করে। আবুল হা’সান গাদা গাদা সাজ-পোশাক বের করে দেখায়। কোনটা’ বা সে হা’তে ধরে দেখে, কোনটা’ বা সে হা’তেই ধরে না। কয়েকটা’ সোনার জরি দেওয়া কাপড় ও কিছু মূল্যবান জড়োয়া গহনা পছন্দ করে। পছন্দ করতে করতে কখন সে মুখের নাকাব সরিয়ে ফেলেছে নিজেই বুঝতে পারেনি। সওদাগর আবুল তার অ’নেকদিনের চেনা লোক—তার সামনে অ’তটা’ লজ্জা শরমের কিছু নাই। কিন্তু দোকানে তো বাইরের মা’নুষও বসেছিলো।

তার রূপের জেল্লা আলী-ইবন বকর-এর বুকে আগুন ধরিয়ে দেয়। এমন অ’পরূপ সুন্দরী মেয়ে সে জীবনে কখনও দেখেনি। আলী ইবন আর স্থির থাকতে পারে না। মা’থাটা’ ঝিমা’ঝিম করে ওঠে, বুকের ভেতর মোচড় দিতে থাকে। ভাবে, এখান থেকে ছুটে বেরিয়ে যেতে পারলে ভালো হয়। এত রূপ আর সহ্য করা যায় না। আলী ইবনের এই অ’স্থিরতা মেয়েটির চোখ এড়ায় না। ইতিমধ্যেই আড় চোখে কয়েকবার সে তাকে দেখে নিয়েছে। ঠোঁটের কোণে একটু মুচকি হেসে বলে, আমা’র জন্যে আপনার দোকানের খদের চলে যাবে সে তো হয় না। বরং আমিই চলে যাচ্ছি। আমা’র অ’নুরোধ উনি থাকুন।

আলী ইবন বকর আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে, খোদা কসম বলছি, সুন্দরী, আমি যে আপনার ভয়ে দোকান ছেড়ে চলে যেতে চাইছিলাম তা কিন্তু ঠিক না। আপনাকে দেখা অ’বধি আমি এক অ’সহ্য যন্ত্রণা পাচ্ছি।–জনি না, বলতে পারবো না, কিসের সে যন্ত্রণা। সেই যন্ত্রণার হা’ত থেকে অ’ব্যাহতি পাওয়ার জন্যেই আমি চলে যেতে চেয়েছিলাম।

অ’দ্ভুত সুন্দর করে কথা বলে আলী ইবন। মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকে মেয়েটি। মনের সঙ্গোপনে কিসের যেন অ’নুরণন হতে থাকে। খাটো গলায় সওদাগরকে প্রশ্ন করে, কে এই মেহেমা’ন?

আবুল হা’সান বলে, ওর নাম আলী ইবন বকর। প্রাচীন পারস্য শাহদের বংশধর, যেমন দেখতে সুঠাম সুপুরুষ-ভেতরটা’ও তেমনি খাসা। মেয়েটি বলে, ভারি খুবসুরৎ দেখতে তো!

—হবে না? কত বড় খানদানী শাহ বংশের ছেলে। শরীরের শিরায় বইছে সাচ্চ নীল রক্ত।

মেয়েটি বলে, আমি যদি আমা’র একটি খোজাকে পাঠাই, আপনারা কি একবার তার সঙ্গে যেতে পারবেন? অ’বশ্য আপত্তি থাকলে-আমি শুধু আপনার দোস্তকে একবার দেখাতে চাই, বাগদাদ সুলতানের প্রাসাদে রূপে গুণে যে-সব রত্ন মেয়েছেলে আছে তা পারস্য-সুলতানের হা’রেমের চেয়ে কিছু খাটো নয়।

আবুল হা’সান বুদ্ধিমা’ন ছেলে। তার কথার নিগুঢ় অ’র্থ বুঝতে কিছু অ’সুবি’ধে হলো না। মা’থা নত করে অ’ভিবাদন জানিয়ে বললো, আপনার আদেশ শিরোধার্য করলাম। যথাসময়ে বান্দারা হা’জির হবে।

মেয়েটি আর তিলমা’ত্র অ’পেক্ষা করলো না। নাকাবে মুখ ঢেকে দ্রুত বেরিয়ে গেলো।

আবুল হা’সান এবার আলী ইবনের কাঁধে একটা’ চাপড় মেরে বললো, কি দোস্ত, আমন মন-মরা হয়ে বসে রয়েছ। কেন?

—চোখের সামনে দিয়ে আসমা’নের চাঁদ চলে গেলো, আমি কি খুশিতে ডগমগ হবো। আবুল হা’সান বলে, চলে আর একেবারে গেলো কোথায়। সবে তো তোমা’র গগনে উদয় হবে বলে উকি ঝুকি দিচ্ছে।

–ঠাট্টা’ রাখো। আমা’র দিল পুড়ে যাচ্ছে। কেন যে মরতে তোমা’র দোকানে আজ এসেছিলাম।

আবুল ওর চিবুকটা’ নেড়ে দিয়ে চোখের মণি নাচিয়ে বলে, আহা’, সোনার চাঁদ, না এলে এমন চাঁদমুখের দেখা পেতে?

—কিন্তু ‘ওতো জালি’য়ে আগুন পালি’য়ে গেলো, এ জালা তো সয়না প্ৰাণে।’

—ধৈৰ্য্য ধরো বন্ধু, ধৈৰ্য্য ধরো। আপসে সব ঠিক হয়ে যাবে। আলী ইবন রাগত ভাবে বলে, সব সময় রসিকতা ভালো লাগে না হা’সান। বলো, মহিলাটি কে?

—উনি খলি’ফা হা’রুন-অ’ল রসিদের প্রিয় প্রিয়তমা’। খাস বেগমের চাইতেও কদরের বাদী সামস আল-নাহা’র। খলি’ফা এর জন্যে আলাদা প্রাসাদ বানিয়ে দিয়েছেন। এর দাস-দাসী নফর-চাকর সব আলাদা। খলি’ফা একমা’ত্র তাকেই ভীষণ বি’শ্বাস করে। যে কারণে তার প্রহরায় কোনও খোজাকে রাখা হয়নি। সত্যি কথা বলতে কি হা’রেমের কড়া পাহা’রার মধ্যেও বেগমরা পরপুরুষের প্রেমে আসক্ত হয়। অ’ন্যের ঔরসের সন্তান গর্ভে ধারণ করে। সেদিক থেকে সামস-আল-নাহা’র ভালো! এ পর্যন্ত তার নামে, যদিও তার মতো রূপসী সারা বাগদাদে দুটি নাই, তেমন কোনও কেচ্ছা রটেনি!

এইসব কথাবার্তা চলছে এমন সময় একটি ছোট্ট চাকর এসে আবুল হা’সানের কানের কাছে ফিস ফিস করে বললো, আপনাদের দুজনকে, মা’লকিন যেতে বলেছেন।

আবুল দোকান বন্ধ করে বন্ধু আলীকে সঙ্গে নিয়ে সামস-আল-নাহা’র-এর প্রাসাদের দিকে রওনা হলো। আগে আগে পথ দেখিয়ে চলতে থাকলো সেই ছোট্ট চাকরিটা’।

আলী ভেবেছিলো সে কিছু সুন্দর সুন্দর কবি’তা শুনিয়ে সামস-আল-নাহা’রকে তাক লাগিয়ে দেবে। কিন্তু সে সুযোগ সে পেলো না। বসতে না বসতেই খানসামা’রা নানা রকম খানাপিনা এনে টেবি’লে সাজিয়ে দিলো। খাবারের সুগন্ধে সারা ঘর আমোদিত হয়ে ওঠে। দুজনে তৃপ্তি করে খানাপিনা করলো। সামস-আল-নাহা’র নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সব তদারক করতে থাকলো। খাওয়া দাওয়া শেষ হলে নিজে হা’তে সে গোলাপ জল ঢেলে দিল ওদের দুজনের হা’তে। দামী আদর ছড়িয়ে দিল ওদের সাজ পোশাকে।

এরপর সামস-আল-নাহা’র একটা’ দরজা খুলে ওদের ভিতরের আর একটা’ মহলে নিয়ে গেলো। বি’রাট সেই কক্ষটা’র চারপাশে চব্বি’শটি স্ফটিকের স্তম্ভ। তারা মা’থায় ধরে আছে একটা’ বি’শাল গম্বুজ। সেই গম্বুজের চারপাশ সোনার তৈরি পাখি দিয়ে সাজানো। আর গম্বুজের ভিতরটা’ সূক্ষ্ম শিল্পীর হা’তে আঁকা নানাপ্রকার লতাপাতার নক্সা। দেখলে চোখ ফেরানো দায়। সারা মেজোটা’ পারস্য গালি’চায় মোড়া।

এই সুদৃশ্য মহলে দাঁড়িয়ে বাইরে যেদিকে তাকাও ফুলের সমা’রোহ। চারপাশে ফুলের বাগিচা; শুধু ফুল আর ফুল। চেনা অ’চেনা হরেক রকম দেশ বি’দেশের বাহা’রী ফুলে ফুলে ভরা।

আবুল আর আলী যখন এইসব অ’পরূপ সৌন্দৰ্য্যের সমুদ্রে নিজেদের হা’রিয়ে ফেলেছে সেই সময় দশটি সুদৰ্শন সুবেশ মেয়ে এসে বৃত্তাকারে ছড়িয়ে বসে পড়লো সেখানে। তাদের সবারই টা’নাটা’না চোখ, টুকটুকে রাঙা গাল আর সুগঠিত বুক।

সেই দশটি মেয়ের প্রত্যেকের হা’তে একটি করে তারের বাদ্যযন্ত্র। মেয়েরা বাজাতে শুরু করে আর নাহা’র গান ধরে। সে কি করুণ সুর। আলীর মনে হতে লাগলো। সে যেন কাঁদছে। অ’থচ সত্যিই সে কাঁদছে না। তার গানের করুণ সুর কান্না অ’শ্রু হয়ে গলে গলে পড়ছে। আলী বলে, আবুল, এ গান আমি আর সইতে পারছি না, দোস্ত। এমন ব্যথাও কি মা’নুষ মা’নুষকে দিতে পারে।

সামস-অ’ল-নাহা’র গান থামা’লে মেয়েরা সমবেত কণ্ঠে গান ধরে। আজকের আসরের প্রধান অ’তিথি আলী ইবন বকর। তাই সবারই লক্ষ্য তার দিকে। তাকে ঘিরেই মেয়েরা নেচে নোচে গান করতে থাকে।

প্ৰায় গোটা’ দশ-বারো নিগ্রো ক্রীতদাসী কাঁধে করে বয়ে নিয়ে আসে একটা’ রূপের সিংহা’সন। তার উপরে উপবি’ষ্ট বোরখা ঢাকা এক সুন্দরী। নিগ্রো মেয়েগুলোর বুক অ’নাবৃত। পরণে সংক্ষিপ্ত সাজ। সোনার সুতোয় বোনা জালি’ পায়জামা’ পরণের একমা’ত্র বাস। সিংহা’সনটা’ ঘরের ঠিক মা’ঝখানে নামিয়ে দিয়ে তারা সকলে বাগিচায় গিয়ে দাঁড়ায়।

কাচের মতো প্রায়-স্বচ্ছ নাকাবের মধ্য দিয়ে সামস-আল-নাহা’রের রূপের জৌলুস পুরোপুরিই নজরে পড়ে। নাহা’র স্মিত হেসে আলীকে স্বাগত জানায়। আলীও মা’থা আনত করে জবাব দেয়।

গানের সুরে মন ভরে ওঠে। প্রাসাদের প্রতিটি প্রান্ত। নেচে ওঠে ফুলের বনের নাম-না-জানা পাখি। নেচে ওঠে। আলী ইবন বকর-এর হৃদয়। একটা’ পর একটা’ গান চলতেই থাকে। অ’নেক অ’নেকক্ষণ ধরে চলে। তারপর একসময় গান থেমে যায়। কিন্তু সুর তখনও অ’নুরণন তুলে হৃদয়ে হৃদয়ে ফেরে। আলী মুগ্ধ হয়ে চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। অ’ন্তরের অ’ন্তস্থলে অ’নুভব করতে থাকে গানের মা’ধুরী।

আবুল হা’সান ঠেলা মা’রে, এই—কি হলো?

—না কিছু হয়নি তো এমনিই।

–কী ভালো লাগছে না? আলী কি করে আবুলকে বোঝায়, এমন ভালো লাগা বহুকাল তার লাগেনি। —আমা’র সমস্ত মন প্ৰাণ ভরে গেছে আবুল।

—হুম তবে যে বলেছিলে তখন, আজ কার মুখ দেখে উঠেছিলে। জীবনটা’ তোমা’র বরবাদ হয়ে গেলো।

—না ভাই সত্যি বুঝতে পারি ওই নাকাবের আড়ালে এক ভেন্ধী আছে? সত্যি যাদু জানে ও। আমা’র সমস্ত মন প্ৰাণ প্রথম দর্শনেই নিমেষে কেড়ে নিয়েছে সে। জানি না এরপর কি আছে আমা’র নসিবে।

আবার গান শুরু হলো। এবারের গায়িকা আবার সেই নাহা’র। সেই করুণ সুরের মুচ্ছনা। এত বি’রহ ব্যথার গান সে কেন গায়? কেমন করে গায়।

সামস-আল-নাহা’রের দু’গাল বেয়ে নেমে আসে অ’শ্রুধারাণ। সে দৃশ্য দেখে আলী আর স্থির থাকতে পারে না। সে-ও কেঁদে আকুল হয়।

সামস-আল-নাহা’র উঠে দাঁড়ায়। ধীরপায়ে এগিয়ে যেতে থাকে সে দরজার দিকে। এবার সে বি’দায় নেবে। আলী আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। সে-ও উঠে দাঁড়ায়। ছুটে যায় দরজার দিকে। পর্দার ওপারে গিয়ে নাহা’রের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। নাহা’র আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। আলীর বুকে মা’থা গুজে দিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই সে আচমকা আলী ইবন এর বুকের ওপরে পড়ে গেল। হা’ত দুটো দিয়ে জড়িয়ে ধরল তার যৌবন ও পৌরুষভরা শরীরটিকে। ক্রমে তার হা’ত দুটো সুদৃঢ় হয়ে আসতে লাগল। দৃঢ়…. আরও….আরও দৃঢ়ভাবে জাপটে ধরল তাকে। নিটোল স্তন দুটোকে তার প্রশস্ত বুকের চাপে দলি’ত পিষ্ট করে ফেলতে চাইছে। তার দেহে যেন দৈত্যের শক্তি ভর করেছে। যৌবনজ্বালা তাে এমন করে আগে কোনদিন তাকে জ্বালি’য়ে পুড়িয়ে খাক করে দেয় নি। ইতিপূর্বে প্রৌঢ় খলি’ফাকে বহুবার দেহদান করেছে বটে কিন্তু আজকের মত দিল দরিয়া হয়ে নিজেকে পুরােপুরি বি’লি’য়ে দিতে পারে নি। কিন্তু আজ-এ নওজোয়ান আলী ইবনকে দি নিঃশেষে উজাড় করে দেওয়ার জন্য যেন সে উন্মা’দিনীর প্রায় হয়ে উঠেছে।

আলী তাকে আদর করে। কিন্তু নাহা’রের দেহ অ’বশ্য অ’চৈতন্য হয়ে মা’টিতে লুটিয়ে পড়ে যায়। মেয়েরা ধরাধরি করে তাকে তুলে এনে একটা’ সোফায় শুইয়ে দেয়। একজন ঝারি করে গোলাপ জল এনে চোখে মুখে ঝাপটা’ মা’রতে থাকে। একটু পরে সামস-আল নাহা’র চোখ মেলে তাকায়। একজন একটা’ উগ্র আতরের নির্যাস। এনে ওর নাকের কাছে ধরে। ঝাঁঝালো গন্ধে তন্দ্রাভাব কেটে যায় তার।

সামস-আল-নাহা’র চোখ মেলে এদিক ওদিক তাকায়। কি যেন খুঁজতে থাকে। এক পাশে আলীকে দেখে স্মিত হা’সে। সে হা’সি বড় করুণ, বড় মধুর। আলী আরও কাছে সরে আসে। নাহা’র জিজ্ঞেস করে, আবুল হা’সান কোথায়? তাকে দেখছি না কেন?

আবুল হা’সান তখন ঘরের বাইরে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার মনে এক অ’জানা আশঙ্কা। একটু আগে যা ঘটে গেছে এতক্ষণে সারা প্রাসাদের প্রতি মা’নুষ তা নিশ্চয়ই জেনেছে। আলী এসে বললো, তোমা’কে খুঁজছে।

তােমা’কে সামা’ন্য মৌখিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আর শুকনো ধন্যবাদ জানিয়ে খাটোও করবো না তোমা’কে। তবে একটি কথা জেনে রাখো, আজ তোমা’র জন্যেই আমা’র জীবনের মোড় ঘুরে গেলো। আমি আজ নতুন জীবনের সন্ধান পেয়েছি। যাইহোক, আমি অ’কৃতজ্ঞ নই, আবুল হা’সান। তোমা’র কথা আমা’র মনে থাকবে।

আবুল হা’সান নিজেকে ধন্য মনে করে। নাহা’রকে অ’ন্তরের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলে, আপনি যে আমা’কে মনে রাখবেন তা শুনেই আমি ধন্য হলাম।

সামস-অ’ল-নাহা’র আলীর দিকে চেয়ে মিষ্টি করে হা’সে, তোমা’র ভালোবাসা নিখাদ, আমি আমা’র অ’ন্তর দিয়ে বুঝেছি, আলী। যদিও আমা’র মতো নয়। আমি তোমা’কে আমা’র হৃদয়ের সব চেয়ে উঁচু আসনে বসিয়েছি। মেয়েরা এখানে মা’ত্র একজনকেই বসাতে পারে। মা’ত্র কয়েক ঘণ্টা’র মধ্যে তুমি সেই জায়গায় স্থান পেয়েছে। অ’থচ আমা’র একটু করুণামিশ্রিত ভালোবাসা পাওয়ার জন্যে কত তরুণই না পাথরে নিস্ফল মা’থা কুটে মরেছে। তাদের জন্য আমি দুঃখ পেয়েছি কিন্তু ভালোবাসা ঢেলে দিতে পারিনি। আজ তোমা’র কাছে আমা’র এই আত্মসমর্পণে আমি নিজেও কম। অ’বাক হইনি, আলী।

প্রিয়তমা’, তোমা’র প্ৰেম আমা’র কাছে কোনও বি’চ্ছিন্ন ব্যাপার নয়—আমা’র আত্মা’রই এক অ’বি’চ্ছেদ্য অ’ংশ। মৃ’ত্যুও তাকে আলাদা করতে পারবে না। কিন্তু কি আমা’দের বি’রহ বি’ধুর জীবন। একথা ভাবতে পারি না, পার্থিব জীবনে আমা’দের কখনও মিলন হতে পারে না।

দুজনে আকুল নয়নে কাঁদতে থাকে। আবুল হা’সান বলে, একমা’ত্র খোদাই ভরসা, আমি বুঝতে পারছি না, তোমরা কি করে বাঁচবে। এখন যদি তোমা’দের ছাড়াছাড়ি হয়ে জীবন কাটা’তে হয়, জানি না কি অ’ঘটন ঘটবে। সে যাই ঘটুক পরের ব্যাপার পরে দেখা যাবে। এখন, এই মুহুর্তে যখন এক সঙ্গে রয়েছ, একটু প্ৰাণ খুলে হা’সো। গাও। মৌজ করো।

আবুল হা’সানের এই কথায় নাহা’র চোখের জল মুছে ফেলে। চাকরদের একজনকে ইশারা করতেই সে ভিতরে চলে যায়। একটু পরেই একদল খানসামা’ নিয়ে আসে খানাপিনী। বড় বড় রূপের রেকবী সাজানো হয় টেবি’লে। নানা রকমের বাদশাহী খানা। মা’ংসের চাপ, সম্মিকাবাব, মোরগ মোসাল্লাম, শাহী কোর্মা’ কোপ্তা, কালি’য়া, বি’রিয়ানী, হা’লওয়া, তন্দুরী রুটি প্রভৃতি। টেবি’লের মা’ঝখানে বসানো হয় একখানা বি’রাট সোনার থালা। আপেল, আঙ্গুর, আনার, কলা, কালোজাম, গুলাব জাম ইত্যাদি নানা জাতের ফল। পারস্যের কাজকরা ঝারিতে দুষ্প্রাপ্য সরাব, গোলাপজল।

সামস-অ’ল-নাহা’র আলীকে বলে, তুমি বসে ঠিক মা’ঝখানে। আমি বসবো তোমা’র মুখোমুখি। আবুলকে পাশে বাসায় নাহা’র। নিজে হা’তে পরিবেশন করতে থাকে। একটা’ একটা’ করে তুলে দেয় আলী আর হা’সানের রেকবীতে।

কুমা’রী নিগ্রো বাদীরা মদের পেয়ালা পূর্ণ করে দিতে থাকে। নাহা’র এগিয়ে দেয় আলী আর হা’সানের দিকে। ধীরে ধীরে মৌজ করে খানাপিনা চলতে থাকে।

মেয়েরা গোলাপজলের ঝারি হা’তে দাঁড়িয়েছিলো। খানাপিনা শেষ হলে আলী আর হা’সানের হা’তে জল ঢেলে দেয়। কেউ বা দাঁড়িয়েছিলো তোয়ালে হা’তে।

এরপর সামস-আল-নাহা’র একমা’ত্র গাইয়ে মেয়েদের ছাড়া আর সবাইকে বি’দায় করে দেয়। নাহা’র গান ধরে। এক এক করে মদের পেয়ালা পূর্ণ হয়। আলী হা’সান আর নাহা’র ছোট ছোট চুমুকে শেষ করতে থাকে।

সুধা পাত্র মুখে তোলে। সুরের মুচ্ছনায় আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে।

ধীরে ধীরে মদের নেশা বেশ জমে ওঠে। জমে ওঠে গানের আসর। নাহা’র এবার বাঁশী তুলে নেয় হা’তে। বাঁশীর করুণ সুরে সে এক অ’পূর্ব ইন্দ্রজালি’ রচনা করতে থাকে।

আলীর মনে হয়, সে কোনও এক বেহেস্তের বাসিন্দা। যেখানে বি’ত্ত বৈভবের কোনও চিন্তা ভাবনা নাই। শুধু আছে গান আর গান। হা’সানেরও তাই মনে হতে থাকে। ভুলে যায়, সে এক নামজাদ সওদাগর। লক্ষ লক্ষ টা’কার কারবার। তার দোকানে কত আমির উজিরের মেয়ে বি’বি’রা আসে। কত কেনা-বেচা। গানের অ’পরূপ মা’দকতায় সমা’জ সংসার, জীবনের এই কলরব-সব হা’রিয়ে তলি’য়ে একাকার হয়ে যায়।

আলী কখনও বা হা’সে কখনও কাঁদে! আবুল হা’সানকে জড়িয়ে ধরে বলে, এ তুমি আমা’য় কোথায় নিয়ে এসেছে, দোস্ত। জীবনে এত গান আছে, এত সুর আছে এবং তার মধ্যে নিজেকে এমন করে নিঃশেষ করা যায়, তাতো জানতাম না। এ তুমি আমা’য় কোথায় নিয়ে এলে বন্ধু। আমা’র বড় ভয় করছে, আজকের এই মধুর রাত্রিকাল হয়তো ফুরিয়ে যাবে।

হা’সান বলে, কাল কি হবে সে কথা আজ নাই ভাবলে দোস্ত। আজকের এই মুহুর্তে যা পে.ে কাল যদি তার কণা মা’ত্র অ’বশিষ্ট না-ই থাকে, তাতেই বা কী ক্ষতি? কিন্তু আজকে রাতের এই মধুর স্মৃ’তি সারা জীবন তো অ’ক্ষয় হয়ে থাকবে। ওসব ভবি’ষ্যত ভাবনা ছাড়। এসো, পান করো, গাও, হা’সো।

আবুল দু’খানা বাঁশী তুলে নিয়ে একখানা আলীর হা’তে দেয়। বলে, এসো আমরাও নাহা’রের সঙ্গে সুর মিলাই।

কতক্ষণ। এইভাবে সুরের কল্পলোকে ওরা বি’চরণ করেছিলো মনে নাই। হঠাৎ চৈতন্য হলো। খবর এলো, প্রাসাদ ফটকে এসে দাঁড়িয়েছে মসরুর। তার সঙ্গে আছে আফিফা এবং অ’ন্য অ’নেকগুলো খোজা। সামস-আল-নাহা’র এগিয়ে এসে বললো, মা’লি’ক বাঁশী থামা’ও। শিয়রে শমন হা’জিরা। মসরুর এসেছে। সে তোমা’দের সঙ্গে কথা বলতে চায়।

নাহা’রের এই কথা কানে আসা মা’ত্র আলী আর আবুল দিশাহীরা হয়ে পড়ে। বাজিয়ে মেয়েগুলো আতঙ্কে শিউড়ে ওঠে। কিন্তু সামস-আল-নাহা’র ধীর শান্ত। তার মুখে স্মিত হা’সি তখনও লেগে রয়েছে। —ভয়ের কিছু নাই। তোমরা শান্ত হয়ে বসে।

নাহা’র তার এক বি’শ্বস্ত অ’নুচরকে বলে, মসরুর আর আফিফকে একটু অ’পেক্ষা করতে বলো। আমি যাচ্ছি।

মেয়েদের দিকে তাকিয়ে বললো, আমা’র সিংহা’সনট তোমরা ধরাধরি করে বাগানের মধ্যে নিয়ে গিয়ে রেখে দাও।

তারপর আলী আর আবুলকে উদ্দৌল্য করে সে বলে, তোমরা এই ঘরেই থাকবে। আমি বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে যাবো। না, কোনও ভয় করবে না। যা করার আমিই করবো।

চারিদিকের দরজা জানিলা বন্ধ করে দেওয়া হলো। নাহা’র তার দাসী বাদীদের সঙ্গে নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে দেওয়া হয়। শুধু রুদ্ধ ঘরের মধ্যে বসে থাকে আলী আর আবুল। তাদের মনে শঙ্কা, না জানি কি বা হয়। আলী বলে, দোস্ত আজ প্ৰাণটা’ বেঘোরে মা’রা গেলো। কেন যে তোমা’র কথায় নাচলাম।

আবুল সান্ত্বনা দেয়, নিজেকে শক্ত রাখো, আলী। আল্লাহ সব বি’পদ কাটিয়ে দেবেন।

কিন্তু আল্লাহ কি বলেছিলেন অ’ন্যের মেয়েমা’নুষ নিয়ে ফূর্তি করো?

হা’সান বললো। ধৈর্য ধরে বন্ধু! প্রেমের পথ বড় বন্ধুর।

এদিকে ঘরের দরজায় কুলুপ এটি সামস-আল-নাহা’র বাগানে গিয়ে সিংহা’সনে বসে। পরনে তার স্বল্পবাস। একটি বাদীকে বলে তেল নিয়ে এসে আমা’র দাবনায় মা’লি’শ করতে থাক।

হা’মা’মে যাবার আগে এ তার নিত্য প্রসাধন।

একটি নিগ্রো বাঁদী মসরুর আর আফিফকে সঙ্গে নিয়ে বাগিচায় আসে। রণ সাজে সজ্জিত মসরুর। হা’তে তার তালা খোলা বঁকা তরোয়াল। সামস-অ’ল-নাহা’রকে ঐ রকম প্রায় বি’বস্ত্ৰা অ’বস্থায় দেখে ওরা দুজনে সেলাম জানিয়ে মা’থা। নত করে দাঁড়ায়।

নাহা’র স্বাগত জানায়, আল্লাহ তোমা’দের মঙ্গল করুন, মসরুর। কি শুভ-সংবাদ নিয়ে এসেছো, বলো।

মসরুর আর সামনে তাকাতে পারে না। মা’লকিনকে এইভাবে দেখবে সে আশা করেনি। মা’থা নত করেই বলে, মা’লকিন, খলি’ফা আপনাকে স্মরণ করেছেন। অ’নেক দিন। আপনার সঙ্গে মোলাকাৎ হয়নি, তিনি বললেন, ‘মসরুর মন আমা’র বড় চঞ্চল হয়ে উঠেছে। যা একবার তোর মা’লকিনের খবর নিয়ে আয়। তার তবি’য়াৎ যদি ভালো থাকে। আমি তার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই। তা সে যদি নিজে আসতে চায় সঙ্গে করে নিয়ে আসবি’। আর যদি আমা’কে যেতে হুকুম করে, আমিই যাবো।

খলি’ফার নাম কানে আসতেই সামস-অ’ল-নাহা’র উঠে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানাবার জন্যে আভূমি আনত হয়ে তার উদ্দেশ্যে কুর্নিশ জানায়। এই-ই প্রচলি’ত বাদশাহী রীতি।

—তুমি তাঁকে গিয়ে বলো, তিনি যদি বাঁদীর প্রাসাদে পায়ের ধুলো দিতে চান আমি ধন্য হবো।

মা’সরুর সেলাম জানিয়ে বি’দায় নিলো। জলসাঘরের তালা খুলে ছুটে গিয়ে আলীকে বুকে জড়িয়ে ধরলো নাহা’র। আকুল হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে, আলী, আমি কি করে বাঁচবো? কেন তুমি আমা’র কাছে এলে? কেন তুমি হা’সানের দোকানে বসেছিলে? কেন—কেন? আমা’র দেহমা’ন তোমা’র জন্যে আকুল হয়ে উঠেছে। অ’থচ ভাগ্যের এমনি পরিহা’স তোমা’কে আমি ধরে রাখতে পারবো না।

আলী নাহা’রকে বুকে জড়িয়ে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা’ করে।–অ’মন করে কেঁদো না, নাহা’র। তোমা’র আমা’র প্রেম যুগ যুগান্তের। তুমি আমা’রই থাকবে আমিও তোমা’র হয়েই থাকবো। নাইবা হলো এ জীবনে আমা’দের মিলন। দৈহিক মিলনটা’ই সব চেয়ে বড় কথা?

নাহা’র বলে, না না না, দেহের মিলনের কথা আমি বলি’নি, সোনা। কিন্তু তোমা’কে তো আর চোখের দেখাও দেখতে পাবো না। আমি অ’ন্তঃপুরে বন্দী হয়ে থাকি। বাইরে বেরুবার স্বাধীনতা কতটুকু আমা’র? কিন্তু তোমরা পুরুষ মা’নুষ—বাইরে পাঁচটা’ জায়গায় ঘুরতে পারো। নানা রকম হৈ-হল্লার মধ্যে কাটা’তে পারো। কত নতুন মেয়ে আসবে দোকানে। তাদের সঙ্গে আলাপ পরিচয় হবে। তাদের রূপে ভুলে যাবে। আমি তখন তোমা’র মন থেকে মুছে যাবো।

এক অ’নুচর ছুটে এসে খবর দিল, খলি’ফা আসছেন।

সবাই সস্ত্বস্ত হয়ে ওঠে। সামস-আল-নাহা’র। আর একবার জড়িয়ে ধরে আলীকে। মেয়েদের লক্ষ্য করে বলে, প্রাসাদের ওদিককার ফটকটা’ খুলে দাও। খলি’ফাকে অ’ভ্যর্থনা করে বসাও। আমি যাচ্ছি।

টা’ইগ্রীসের তীরে নাহা’রেরই নয়নাভিরাম প্রাসাদের আর এক মহল ওদিকটা’য়। সামনে নদীর মনোহর শোভা। খলি’ফা হা’রুন-আল-রাসিদ এলে এই মহলেই ওঠেন।

নাহা’র চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়ায়। বেশবাস সংবৃত করে নেয়। আলীকে শেষ বি’দায় জানিয়ে বলে, এবার তোমরা এসো। এখন আমা’কে তাঁর মনোরঞ্জন করতে যেতে হবে।

নাহা’রের অ’নুচর। আলী আর আবুলকে সঙ্গে করে এদিক ওদিক ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অ’বশেষে এমন একটা’ ঘরে নিয়ে এসে দাঁড় করালো যেখান থেকে প্রাসাদের টা’ইগ্ৰীস মহলটা’ পুরো নজরে আসে। অ’থচ তাদের কেউ দেখতে পাবে না। মেয়েটি বলে, আপনার এখানে আরাম করে বসুন। ইচ্ছে হলে এই পালঙ্কে শুয়ে ঘুমা’তে পারেন। খিদে পেলে খানা খেতে পারেন—টেবি’লে সাজানো আছে। পান করার বাসনা হলে পান করতে পারেন। ঝারিতে সরাব আছে। আর তাছাড়া তো আমি হা’জির আছি সামনে। যা দরকার বলবেন, এনে দেব। কিন্তু একটা’ কথা, জোরে কথাবার্তা বলবেন না। ওদিক থেকে এদিকে কিছু দেখা যায় না, কিন্তু কথাবার্তা শোনা যেতে পারে।

ঘরটা’ বড় অ’ন্ধকার। কিন্তু একটু পরেই চোখে সয়ে গেলো। আলী আর হা’সান এতক্ষণ জলসাঘরের চোখ ধাঁধানো আলো থেকে উঠে এসেছে। তাই প্রথম প্রথম বেশ আঁধার আঁধার লাগলেও পরে আর অ’তটা’ মনো হলো না। মেয়েটি খাটো গলায় বলে, হয়তা একটু অ’সুবি’ধে হবে আপনাদের। কিন্তু এ ঘরে আলো জ্বালানো যাবে না। ওমহল থেকে নজরে পড়লে বি’পদ ঘটতে পারে।

আলী ফিসফিস করে বলে, আলোর কোনও দরকার নাই। ওদিকে যা আলোর রোশনাই।–তাতেই এ ঘর বেশ স্বচ্ছ পরিষ্কার।

জানলার জাফরীতে চোখ রেখে আলী আর হা’সান খলি’ফার প্রমোদ বি’হা’র দেখতে থাকে। প্রায় শ’খানেক অ’ল্পবয়েসী খোজা-প্রত্যেকের হা’তে একটা’ করে চিরাগ। সেই আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠতে থাকে। খোজাগুলো একটা’ বি’রাট এক বৃত্ত রচনা করে ধীরে ধীরে টা’ইগ্রিসের ফটকের দিকে এগিয়ে আসছে। তাদের মা’ঝখানে আরও শ’খানেক বয়স্ক খোজা-হা’তে তলোয়ার আর ঢাল। আর এই খোজাদের মা’ঝে কুড়িটি সুবেশা সুদর্শনা বাঁদী এ ওর হা’ত ধরে খলি’ফাকে কেন্দ্র করে একটি পদ্ম রচনা করেছে। ধীর মন্থর গতিতে এগোতে থাকে তারা।

সামস-আল-নাহা’র জমকালো সাজে। সেজে ফটকেরী সামনে এসে দাঁড়ায়। তার পিছনে পিছনে এক দঙ্গল মেয়ে-সবারই হা’তে নানারকম বাদ্যযন্ত্র।

বাজনার অ’পূর্ব সুরে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে। খলি’ফা ফটকের কাছে এগিয়ে আসতেই নাহা’র আভূমি আনত হয়ে কুর্নিশ জানায়। খলি’ফা তার বাহু ধরে টেনে তোলে, তোমা’র স্থান ওখানে নয়। সুন্দরী, তুমি আমা’র বুকে এসো।

সামস-আল-নাহা’র কাঁটা’ষ হা’নে। পথে ঘাটে এ রসিকতা আমা’র ভালো লাগে না, জাঁহা’পনা। রাস্তার লোকে হা’ঁ করে দাঁড়িয়ে পড়েছে। আর আপনি আমা’কে জড়িয়ে ধরলেন।

খলি’ফা হা’সেন, কই জড়িয়ে ধরিনি তো! তবে ধরতে চেয়েছিলাম। তা তুমি তো দিলে না।

—আগে ভিতরে চলুন। তারপর যতখুশি ধরবেন।

খলি’ফা উপরে উঠে আসেন। বি’শাল খোলা ছাদ। চারপাশ ঘেরা। নানা ফুলের গাছের সমা’রোহ। আর সামনে স্বচ্ছ সলি’লা টা’ইগ্রিস। উপরে উন্মুক্ত নীল আকাশ। এক কথায় অ’পূর্ব মনোহর পরিবেশ।

মা’ঝখানে একটা’ রূপের সিংহা’সন-খলি’ফা আসন গ্রহণ করলেন। পায়ের নিচে সূক্ষ্ম কাজ করা পারস্য-গালি’চা পাতা। সামস-আল-নাহা’র খলি’ফার পায়ের কাছে বসলো।

খলি’ফা বলেন, অ’নেকদিন তোমা’র কাছে আসিনি। নানা কাজের ঝঞ্ঝাটে বড় ব্যস্ত ছিলাম। কিন্তু আর আর কিছুই ভালো লাগলো না। তাই তোমা’র কাছে খবর পাঠিয়েছিলাম।

নাহা’র মা’থা নিচু করে বলে, খোদা মেহেরবান, তাই আজ। আপনাকে পেলাম।

ধরে রাখতে পারি? না ধরে রাখা উচিৎ?

—কেন—উচিৎ নয়, সুন্দরী!

-আমি তো আপনার এক না, আপনার আছে লক্ষ লক্ষ প্রজা-দরবার। কত দায়-দায়িত্ব আপনার। তার মধ্যেও মা’ঝে সাঝে এই বাদীকে যে আপনার মনে পড়ে-এতেই আমি ধন্য। আমা’র মতো সৌভাগ্য কটা’ মেয়ের হয়?

খলি’ফা প্রশ্ন করে, কিসে তুমি সৌভাগ্যবতী? আমি তোমা’কে কি দিয়েছি—কি দিতে পেরেছি, নাহা’র? টা’কা পয়সা ধন-দৌলত এইই কি সব-একটা’ নারীর জীবনে। আমি কি বুঝতে পারি না, কি নিঃসঙ্গ জীবন তুমি কাটা’ও।

সামস-আল-নাহা’র বাধা দিয়ে বলে, কোনও দুঃখ নাই আমা’র, জাঁহা’পনা। আমি বেশ সুখী।

মেয়েরা সেতারে সুর তোলে। পূরবীর সুর। এই আসন্ন সন্ধ্যায় ঝির ঝির করে বসন্তের দখিনা বাতাস কানে কানে কি যেন গোপন কথা বলে যায়। খলি’ফা তন্ময় হয়ে শোনে।

—বড় ভালো বাজায় তোমা’র মেয়েরা। কোন ঘরানা?

নাহা’র বলে, সব আমা’র নিজে হা’তে তালি’ম দেওয়া।

খলি’ফা মুগ্ধ হয়ে বলেন, বড় গুণী মেয়ে তুমি নাহা’র। তোমা’র আর্ক গুণের কদর করতে পারলাম না আমি। আমা’র মতো সুলতান বাদশাহরা পয়সা দিয়ে গুণী মা’নী লোকের মা’থা হয়তো কেনে কিন্তু তাদের মগজের মর্যাদা দিতে পারে কতটুকু?

সামস-আল-নাহা’র তার অ’নুচরকে ইশারা করেত সে মেয়েগুলোকে কি যেন বলে আসে। একটু পরে তারা গান ধরে। ভালোবাসার গান। প্রেমিক গেছে পরবাসে। প্রেমিকা সে বি’রহ জ্বালা সহ্য করতে পারছে না। কবে তাদের আবার মিলন হবে। কবে। আবার তার মুখে হা’সি ফুটবে-এই যন্ত্রণাই ফুটে উঠতে থাকলো সেই গানে।

আলী আর আবুলকে মেয়েটি বলে, আমা’দের মা’লকিনের এখন বি’রহে ব্যাকুল প্ৰাণ। সে এ গান গাইতে বললো কেন জানেন?

আলী জিজ্ঞেস করে, কেন-কেন?

—আপনাকে শোনাবার জন্যে, সাহেব। আপনি তার মন প্ৰাণ কেড়ে নিয়ে বি’বাগী হয়েছেন। সে এখন দিন কটা’য় কি করে?

আলী বুঝতে পারে, মেয়েটি মজা করছে। কিন্তু সত্যিই নাহা’রের হৃদয় তোলপাড় হয়ে হয়ে গেছে। একটা’ দিনের পরিচয় আপাতভাবে এমন কিছুই ব্যাপার নয়। কিন্তু তার মধ্যে হা’জার বছরের বন্ধনের আকর্ষণ অ’নুভব করতে পেরেছে সে।

গান শুনতে শুনতে এক সময় নাহা’র তার পাশে একটি মেয়ের কোলে ঢলে পড়ে। আবু উৎকণ্ঠিত হয়ে মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে, কী ব্যাপার কী হলো?

মেয়েটি মুচকি হা’সে, ও কিছু নয়, মুচ্ছ গেছে, এখুনি ঠিক হয়ে যাবে।

আলী আর ভাবতে পারে না! আবুলকে জড়িয়ে ধরে তার কাধে মা’থা রেখে বলে, কি হবে দোস্ত?

আবুল হা’সান শান্ত করার চেষ্টা’ করে, তোমা’র বি’রহে সে এখন কাতর। তার উপর এই বি’রহ-সঙ্গীত ওকে বি’চলি’ত করে ফেলেছে। কিছু চিন্তার নেই, সব ঠিক হয়ে যাবে।

আলী আর ভাবতে পারে না। আবুলকে জড়িয়ে ধরে তার কাঁধে মা’থা রেখে বলে, কি হবে

আবুল হা’সান শান্ত করার চেষ্টা’ করে, তোমা’র বি’রহে সে এখন কাতর। তার উপর এই বি’রহ-সঙ্গীত ওকে বি’চলি’ত করে ফেলেছে। কিছু চিন্তার নেই, সব ঠিক হয়ে যাবে।

কিন্তু এমন সময় কি যেন এক গুঞ্জন শোনা গেলো। মেয়েটি বলে দাঁড়ান। আমি দেখে আসি।

একটু বাদে ছুটে এসে ঘরে ঢুকে বলে, শিগগির বেরিয়ে আসুন, সর্বনাশ হয়ে গেছে।

আবুল আতঙ্কিত হয়ে বলে, এদিকে যে আরও বি’পদ। আলী মুর্চ্ছা গেছে। একটু পানি ছিটিয়ে দাও ওর চোখে মুখে। মেয়েটি জলের ঝারিটা’ নিয়ে গিয়ে চোখে মুখে ঝাপটা’ দিতে থাকে। একটু পরে চোখ মেলে তাকায় আলী। মেয়েটি বলে, নিন। ধরুন।

আবুল আর মেয়েটির কাঁধে ভর দিয়ে আলী ইবন বকর কোনও রকমে হা’ঁটতে পারলো। খিড়কির দরজা দিয়ে বেরিয়ে তারা এসে দাঁড়ালো প্রাসাদের অ’ন্য প্রান্তের নদী উপকূলে। অ’ন্ধকার রাত। দূরের মা’নুষ চোখে পড়ে না। শুধু অ’নেক দূরে সামস-আল-নাহা’রের দোতলার বি’লাস উদ্যানের মৃ’দু আলোর আভা নজরে আসে।

ওরা তিন জনে নদীর ধারের একটা’ শান বাঁধানে চবুতরায় বসে পড়ে। অ’দূরে একটা’ ছোট্ট ডিঙি নৌকা যাচ্ছিল। মেয়েটি হা’তে তুডি বাজিয়ে ডাকে। নৌকাটা’ কাছে আসে। ওরা মুখে কোনও কথা না বলে নৌকায় গিয়ে উঠে পড়ে। একটি মা’ঝ বয়েসী জেলে ডিঙিটা’ একাই চালি’য়ে চলেছিলো। বলে, সাহেবরা সুলতানের লোক, যেখানে যেতে চায় নিয়ে যাবে।

আবুল হা’সান বলে, আপনাকে প্রাসাদে পৌঁছে দিয়ে আসি।

মেয়েটি বললো, না না। তার দরকার হবে না। আমি দিব্যি যেতে পারবো। আপনারা এখন ভালোয় ভালোয় কেটে পড়ুন তো।

মেয়েটি আর দাঁড়ালো না, সেই আধো আলো, আধো আঁধার পথ দিয়ে আবার খিড়কির দরজার দিকে অ’দৃশ্য হয়ে গেলো।

নদীর ঠাণ্ডা হা’ওয়া মা’থায় লাগতে আলী বেশ সুস্থ হয়ে ওঠে। একটু পরে নৌকাটা’ নদীর ওপারে গিয়ে পৌঁছয়। আবুল হা’সানের কাঁধে ভর দিয়ে সে নেমে পড়ে। কিন্তু একটা’ শেওলা ধরা পাথরের ওপরে পা রাখতেই হড়কে পড়ে যায়। আলী বলে, দোস্ত, ধর ওঠাও, কাদায় পা পুতে গেছে।

টা’ইগ্ৰীসের এপারটা’ চোর-ডাকাতের বড় উপদ্রব। একটু রাত হলেই এদিক ওদিক ওৎ পেতে বসে থাকে তারা। শাঁসালো মক্কেল দেখলেই বাঁপিয়ে পড়ে সর্বস্ব লুণ্ঠ-পাঠ করে নিয়ে পালায়।

আলীর হা’ত ধরে টেনে তোলে আবুল হা’সান। বলে, বেশি দূর হা’ঁটা’হা’ঁটি করে দরকার নাই। কখন কোন চোর ছেনতাই-এর খপ্পরে পড়ে যাবো। তার চেয়ে চলো, কাছেই আমা’র এক বন্ধুরবাড়ি আছে—সেখানে রাতটা’ কাটিয়ে দিই।

আলী আর কি বলবে। এছাড়া এখন উপায় বা কি। রাতও বেশ হয়ে গেছে। এখন ফেরা ফেরিও পাওয়া যাবে না। গেলেও যাওয়া ঠিক হবে না। পথ-ঘাট ভালো না। নদীর বুকেও অ’নেক রাহা’জানি ডাকাতি খুন খারাপি হা’মেশাই হয়, শোনা যায়।

কিছুদূর যেতেই আবুল হা’সানের বন্ধুর বাড়ির দরজায় এসে পৌঁছনো গেলো। কড়া নাড়তেই দরজা খুলে দেয় তার বন্ধু। বি’স্ময়ে আনন্দে উল্লাসে ফেটে পড়ে সে। কী ব্যাপার, এতকাল বাদে এই গভীর রাতে তোমা’র দেখা পাওয়া গেলো দোস্ত। এসো, ভিতরে এসো।

আবুল এক কল্পিত কাহিনী খাড়া করে কারণ দেখালো-কেন তাদের এত রাত হলো ফিরতে। আদি আপ্যায়ন মা’ত্রাতিরিক্ত। প্রায় অ’স্বস্তিকর বলা যায়। সেই মা’ঝ রাতে সারা বাড়িতে হৈ-চৈ পড়ে গেলো। খানাপিনার সে কি মহা’ ঘটা’। কিন্তু কি করে বলবে, সারাদিনে অ’নেক ভালো ভালো খানাপিনা তারা করেছে। এখন এই মা’ঝ রাতে এসব না হলেই বরং ভালো লাগতো। খাবো না-খিদে নাই—অ’থবা শরীর ভালো লাগছে না—এসব ওজর অ’তিথির চলে না। কোনও আপত্তিই তারা কানে তুললো না। দম-ভর খাওয়ালো।

খানাপিনা সেরে দুই দোস্ত পাশাপাশি শুয়ে ছটফট করতে থাকে। কারো চোখেই ঘুম নাই। আলী ইবন বকর ভাবে, এই সে জীবনে প্রথম না বলে বাড়ির বাইরে রাত কাটা’চ্ছে। তার মা’ নিশ্চয়ই এতক্ষণ ঘর-বার করে বেড়াচ্ছেন। আর বাবা রাশভারি মা’নুষ। মুখ দেখে বুকের ব্যথা বোঝে, কার সাধ্য! শ্যাওলায় হড়কে গিয়ে পা-টা’ বেশ চোট লেগেছে, মনে হয়। গা-হা’ত-পা বেশটিনটিন করছে।

আলী ভাবে, সামস-আল-নাহা’র এখন কেমন আছে কে জানে? তাকে মুছিত হয়ে ঢলে পড়তে দেখে এসেছে সে। হয়তো এতক্ষণে খলি’ফা সব জানতে পেরেছেন। ক্ৰোধে রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে তার চোখ। জানিনা কি শাস্তি তিনি বি’ধান দেবেন। হয়তো এতক্ষণে মসরুরের খাড়ার এক কোপে নাহা’রের মা’থাটা’ লুটিয়ে পড়েছে। নানা না, এসব কি আজগুবি’ উদ্ভট কল্পনা করছে সে। খলি’ফা তাকে সত্যিই খুব ভালোবাসে। যে যে-ভাবেই তার কান ভারি করুক হা’তেনাতে প্রমা’ণ না পেলে নাহা’রকে তিনি সাজা দেবেন না। আর তাছাড়া সামস-আল-নাহা’র, নানারকম ছলাকলা জানে, বাক চাতুর্যে খলি’ফাকে কাৎ করে দিতে তার বেশি সময় লাগবে না।

পরদিন সকালে আবুল আর আলী বন্ধুর কাছ থেকে বি’দায় নিয়ে শহরে ফিরে আসে। আলীর ব্যথা তখন বেশ বেড়েছে খুব কষ্ট করে হেঁটে কোনক্রমে আবুলেরবাড়ি পর্যন্ত যেতে পারে। শহরে ঢুকতে বলে, দোস্ত এখানে তুমি বি’শ্রাম করো। বি’ছানাপত্ব খানাপিনা সবই আছে। আগে একটু সুস্থ হয়ে নাও। তারপর তোমা’রবাড়ি পৌঁছে দেব।

আলীর শরীর প্রায় নেতিয়ে পড়েছিলো। বি’ছানায় শোয়ামা’ত্র অ’সাড়ে ঘুমিয়ে পড়লো। যেন মনে হয়, দিনের পর দিন হেঁটে হেঁটে পথ-শ্ৰান্ত হয়ে এই প্রথম বি’শ্রাম করছে সে।

একটা’না একটা’ প্রহর ঘুমা’নোর পর আলী উঠে হা’ত মুখ ধুয়ে রুজু করে। তারপর নামা’জ সেরে বেরুবার তোড়জোড় করতে থাকে। কিন্তু আবুল বাধা দেয়, শোনো বন্ধু, তোমা’র যা তবি’য়ৎ, আজ সারা দিন সারা রাত বি’শ্রাম দরকার। এ অ’বস্থায় রাস্তায় বেরুলে আবার অ’সুস্থ হয়ে পড়বে। বরং আমি তোমা’র মনোরঞ্জনের কিছু ব্যবস্থা করছি।

আলী বলে, কী ব্যবস্থা করবে শুনি?

–কিছু গান বাজনার ব্যবস্থা করছি। সন্ধ্যাবেলায় নামকরা মুজরোদলকে ডেকে আনবো। ওরা তোমা’কে পছন্দসই গান-বাজনা শুনিয়ে যাবে!

কিন্তু সে রাতটা’ আগের রাতের চেয়ে আরও খারাপ কাটলো। গানবাজনা কিছুই সে সহ্য করতে পারলো না।

আবুল বললো, কিন্তু মেয়েগুলো তো খারাপ গায়না দোস্ত।

—আরে, ওরা কেন খারাপ গাইবে-বাজাবে। আসলে আমা’র মেজাজটা’ ঠিক নাই–যতই ভালো হোক, কিছুই ভালো লাগতে পারে না।

পরদিন আলীর শরীর আরও খারাপ হয়ে পড়ে। আর এ অ’বস্থায় এখানে রাখা ঠিক হবে না। ভাবলো, ওর মা’-এর আদর যত্ন পেলে সে তাড়াতাডি সুস্থ হয়ে উঠতে পারবে। কিন্তু পায়ে হেঁটে সে যেতে পারবে না। একটা’ খচ্চর ভাড়া করে পাঠিয়ে দিতে হবে। আলীকে বললো, তুমি একটু অ’পেক্ষ করো। আমি দোকানটা’ খুলে দিয়ে একটা’ খচ্চর নিয়ে আসছি।

দোকান খুলে বসতেই একজন খদের ঢুকলো। তার একটু পরেই এল সামস-আল-নাহা’রএর সেই অ’নুচর।

মেয়েটি তাকে আদাব জানায়। আবুল-এর হৃৎকম্প হতে থাকে। নিশ্চয়ই কোনও দুঃসংবাদ আছে। অ’বশ্য মেয়েটির মুখ দেখে তাই মনে হয়।

আবুল জিজ্ঞেস করে, কী গো, কী খবর? তোমা’র মা’লকিন কেমন আছেন?

মেয়েটি কিন্তু সে কথার জবাব দেয় না। উল্টো প্রশ্ন করে, আলী সাহেব কেমন আছেন?

আবুল বললো, শরীরটা’ তার এমনিতেই ভালো ছিল না সেদিন। তারপর আজ দুটো রাত ঘুম হয়নি। বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে।

মেয়েটির মুখ কালো হয়ে গেলো, আমা’র মা’লকিনের অ’বস্থা আরও খারাপ। নাওয়া খাওয়া বন্ধ করেছে। কেঁদে কেঁদে চোখ মুখ ফুলি’য়েছে।

আবুল বলে, আমরা তো দেখে এলাম, গান শুনতে শুনতে সে অ’জ্ঞান হয়ে পড়ে গেলো। তারপর কী হলো?

মেয়েটি বলতে থাকে : আপনাদের দুজনকে নৌকায় তুলে দিয়ে আমি তাড়াতাডি প্রাসাদে ফিরে এলাম। তখনও দেখি সামস-আল-নাহা’র অ’চৈতন্য হয়ে পড়ে আছে। তার মুখ চোখে পাংশুবৰ্ণ হয়ে গেছে। খলি’ফা হা’রুন-অ’ল-রাসিদ তার পাশে বসে রয়েছেন। আমরা তো ভয়ে জড়সড়। কি করা উচিৎ কি বলা উচিৎ কিছুই বুঝতে পারলাম না।

এইভাবে অ’নেক রাত অ’বধি তার অ’চৈতন্য ভাব ছিলো। মা’ঝ রাতে একবার চোখ মেলে। তাকালো। খলি’ফা খুব সোহা’গ করে ডাকলেন, নাহা’র, মা’নিক সোনা কী হয়েছে তোমা’র? কিন্তু কোন কথা বলতে পারলো না সে। আবার চোখ বন্ধ করলো। শুয়ে শুয়েই খলি’ফার পায়ের উপরে ডান হা’তখানা রাখলো। খলি’ফা আবার জিজ্ঞেস করলেন, তোমা’র কি কষ্ট বলো, নাহা’র। আমি খুব দুশ্চিন্তায় আছি সোনা। তুমি না বললে তো আমি বুঝতে পারবো না-কষ্টটা’ তোমা’র কোথায়?

কিন্তু সামস-আল-নাহা’র কিছুই বলতে পারে না। সুলতান মা’থায় হা’ত বুলাতে থাকে। নাহা’র আবার জিজ্ঞেস করলেন, তোমা’র কি কষ্ট বলো, নাহা’র। আমি খুব দুশ্চিন্তায় আছি সোনা। তুমি না বললে তো আমি বুঝতে পারবো না-কষ্টটা’ তোমা’র কোথায়? কিন্তু সামস-আল-নাহা’র কিছুই বলতে পারে না। সুলতান মা’থায় হা’ত বুলাতে থাকে। নাহা’র আবার চোখ মেলে তাকায় সুলতান আবার জিজ্ঞেস করে, বলো, তোমা’র কি কষ্ট। আমা’র কাছেও বলতে তোমা’র সঙ্কোচ। তাহলে কি আর তুমি আমা’কে ভালোবাস না? নাহা’র এবার ভাঙা ভাঙা স্বরে বলে, বি’শেষ কিছুই না, জাঁহা’পনা, আজ এমন একটা’ নতুন ফল খেয়েছিলাম যা একদম হজম হয়নি। এই বদহজমের জন্যেই শরীরটা’ খুব খারাপ লাগছে। আপনি কিছু ভাববেন না। একটু ঘুমোলেই ঠিক হয়ে যাবে।

সুলতান বলে, তার সঙ্গে কি কি খেয়েছিলে বলো দেখি।

নাহা’র বলে, দুটো পাতিলেবু, ছটা’ কাঁচা আপেল, এক বাটি দই, খানিকটা’ ভাজা বাদাম, আর এক মুঠো কাঁচা কড়াই শুটি।

—দূর, বোকা মেয়ে এ সব খেয়ে কারো বদহজম হয়? এ সবই তো খিদে বাড়ায়। তবে আমা’র মনে হয় খাওয়ার সময়েই ভেবেছিলে, বোধ হয়। হজম হবে না। যা-ই খাও তৃপ্তি করে না। খেলে হজম হওয়া শক্ত। সে যদি হজমিগুলি’ও হয়-দেখবে বদহজম হয়ে গেছে। যাই হোক, তোমা’র জীবনটা’ তো শুধু তোমা’র একার নয়। নাহা’র। তোমা’র কিছু হলে আমি যে সুস্থির থাকতে পারবো না। আমা’র কথা ভেবেও তোমা’র শরীরটা’ দিকে বি’শেষ নজর রাখা দরকার। যাই হোক, এখন আর কোনও কথা নয়, একটু ঘুমা’ও। আমি তোমা’র গায়ে হা’ত বুলি’য়ে দিচ্ছি। ভালো লাগবে।

ভোর না হওয়া পর্যন্ত, বি’শ্বাস করুন, সুলতান সেই একভাবে মা’লকিনের বি’ছানায় বসে রইলেন! চোখে তার একবার তন্দ্ৰাভাব এলো না। কি তাজ্জব ব্যাপার! সকাল হতেই তিনি প্রাসাদ এবং শহরের সব নামজাদা হেকিমকে এক সঙ্গে ডেকে পাঠালেন।

হেকিমরা এসে নানাভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে অ’নেক রকম দাওয়াই ব্যবস্থা করে গেলো। কিন্তু আসলে কোনও রোগ হলে তো দাওয়াই-এ সারবে। এ রোগ-এর গোড়া তো অ’ন্য জায়গায়।

সুলতান এবং হেকিমরা বি’দায় নেওয়ার পর সামস-আল-নাহা’র চোখ মেলে আমা’র দিকে তাকালো। আমি তাকে এক গেলাস সরবৎ এনে দিলাম। সরবৎটুকু খেয়ে নাহা’র। আমা’কে বললো, আমি ওকে না দেখলে বাঁচবো না, তুই একবার আলীর খবর নিয়ে আয়।

আবুল বলে, যা বললাম। এর বেশী খবর এখন আর দিতে পারছিনা, মেয়ে। এখন তুমি যাও। কাল আবার এসো। তখন জানাবো কেমন থাকে।

মেয়েটি চলে যাওয়ার পর আবুল দোকান বন্ধ করে দ্রুত পায়েবাড়ি চলে আসে।

আলীর চারপাশে তখন বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজন এবং হেকিম গিজ গির করছে। আবুল জিজ্ঞেস করলো, এখন কেমন আছো আলী?

আলী বলে, খুব একটা’ ভালো না। ওদিকের কিছু খবর পেয়েছ?

আবুল চোখের ইশারায় বললো, আছে।

আলী ঘর থেকে সবাইকে বাইরে যেতে বলে।

আবুল নাহা’র-এর দূতের কথা শোনায়। তার পর বলে, তোমা’র এত দুঃখের কারণ একমা’ত্র আমি। কেন যে মরতে তোমা’কে নিয়ে গেলাম—। তুমি সুস্থ না হয়ে ওঠা পর্যন্ত আমি আর কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছি না। আল্লাহর দেয়া মা’ঙছি, তিনি যেন তোমা’য় তাড়াতাডি সুস্থ করে তোলেন।

পরদিন সকালে আবার সেই মেয়েটি এল আবুল-এর দোকান।–আমা’র মা’লকিন আপনাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। শাহজাদা আলীর শরীর কেমন আছে আজ?

আবুল বললো, ও কথা আর জিজ্ঞেস করো না, মেয়ে। আজকের খবর আরও খারাপ। সারারাত সে ঘুমা’য় না। খা না। শুধু হা’ হুতাশ করছে সামস-আল-নাহা’র-এর সঙ্গে আর বুঝি তার দেখা হবে না।

মেয়েটি বলে, আমা’র মা’লকিনের অ’বস্থাও ভালো না। একখানা চিঠি দিয়েছে সে। আপনি শাহজাদা আলীকে চিঠিখানা দিয়ে দেবেন। মেহেরবানী করে। মা’লকিন জবাব নিয়ে যেতে বলে দিয়েছে।

আবুল দোকান বন্ধ করে মেয়েটিকে সঙ্গে নিয়ে আলীর বাড়িতে আসে। দরজায় অ’পেক্ষা করতে বলে, আবুল ঢুকে যায়। আলীর ঘরে এসে ইশারায় জানায়, যারা ঘরের ভিতরে আছে তাদের বাইরে যেতে বলে।

আলী উপস্থিত সকলকে বলে আমা’র পেটে বি’ষম ব্যথা হচ্ছে, তোমরা একটু বাইরে যাও। আমি ঘুমা’বার চেষ্টা’ করি।

ঘর ফাঁকা হয়ে গেলে আবুল চিঠিখানা আলীর হা’তে দেয়। নাহা’রের প্ৰেম-পত্রে পড়ে আলী আরও বেশি অ’সুস্থ বোধ করতে থাকে। আবুলকে বলে, আমি নিজে হা’তে এর জবাব লি’খতে পারবো না বন্ধু শরীর বড় দুর্বল, তুমি দেখো, আমি বলে যাই।

আলীর জবানীতে আবুল হা’সান চিঠিখানা লি’খে পড়ে শোনায়। আলী বলে, ঠিক আছে, কলম দাও, আমি সই করে দিই।

আলীকে সেলাম জানিয়ে জবাব দিয়ে মেয়েটি চলে যায়।

আবুল হা’সান দোকানে এসে বসে ভাবতে থাকে, ব্যাপারটা’ ক্রমশই জটিল হয়ে উঠছে। মেয়েটি এখন রোজই চিঠি নিয়ে যাওয়া আসা করবে। প্রাসাদের খোজাদের চোখে ধুলো দিয়ে কতদিন এভাবে চলতে পারবে। শেষে খলি’ফার কানে যাবেই। তারপর-ওরে সর্বনাশ-তারপরের দৃশ্য সে কল্পনাও করতে পারছে না। সুলতান সবাইকে কোতল করবে। কিন্তু আবুল ছা-পোষা মা’নুষ, সে মা’রা গেলে তার সংসারের কী দশা হবে। না না না। এ কিছুতেই চলতে দেওয়া যেতে পারে না। আলীকে সাফ সে বলে দেবে, এসব ফালতু ঝামেলায় সে আর নাই।

পরদিন সকালে আলীর বাড়িতে যায় হা’সান।—তোমা’র মতো প্রেমকাতর মা’নুষ তো আমি আর দুটি দেখিনি, ভাই। নিজের শরীরটা’ ক্ষয় করছে আর এদিকে নিজের মরণ ফাঁদ নিজেই পাতিছে? ছাড়ে-ছাড়ো ভায়া, জীবনে বেঁচে থাকলে অ’নেক পরমা’সুন্দরীর সাক্ষাৎ পাবে। এই অ’লীক মা’য়ার পিছনে ছুটে কোনও লাভ আছে? তুমি কি ভাবছো, সামস-অ’লু-নাহা’র তোমা’র অ’ঙ্কশায়িনী হবে, আর সুলতান তা চেয়ে চেয়ে দেখবে! খলি’ফা যেদিন জানতে পারবেন সে-দিন নাহা’রও বাঁচবে না। আর আমা’র অ’বস্থা বুঝতেই পারছে—ভিটে মা’টি চাটি করে দেবে। তাই এখনও বলছি, বন্ধু কথা শোনো, নিজেকে সংযত করো। দেখো, সময়ে সব সয়ে যাবে।

আলী ইবন বকর বললো, বহুৎ সুক্ৰিয়া দোস্ত, কিন্তু সামস-আল-নাহা’র বি’হীন এ জীবনে আমা’র কোনও প্রয়োজন নাই। তার জন্যেই সপেছি-এজীবন! যায় যাবে, থাকে থাকবে।

বাহবা বাহবা দিয়ে উঠলা আলীর অ’ন্য বন্ধুরা। কেউ বললো, তোমা’র এই প্ৰেমগাথা অ’মর। হয়ে থাকবে দোস্ত। আবার আর একজন বলে, প্রেম করতে বসে আত ভয় করেল চলে আবুল বলে, তাহলে কিন্তু আমা’কে অ’ন্য চিন্তা করতে হবে। আমা’র নিশ্চিত বি’শ্বাস, সুলতান একদিন জানবেই। তখন আমা’দের কারুরই রক্ষা থাকবে না। আমি ভাই এ-সবের মধ্যে থাকতে পারবো না।

আবুল হা’সান বি’দায় নিলো। শুধু সে-দিনের জন্যে নয় চিরকালের মতো। পরদিন আলীর বন্ধু অ’ন্যতম আমিন এসে জানালো, আবুল ভীষণ ভীতু। খলি’ফা ওকে কোতল করবে। ভয়ে ও আজ সকালেই সপরিবারে বসরাহ পালি’য়েছে। সেখানে দোকান পাট খুলে ব্যবসা বাণিজ্য করবে। পরে এসে এখানকার দোকান বি’ক্রি করে দিয়ে যাবে।

আলী শুনে আহত হয়।-আমা’কে এই অ’বস্থায় ফেলে আবুল চলে যেতে পারলো। সে যে আমা’র প্রাণের দোস্ত, আমিন।

আমিন ঝঙ্কার দিয়ে ওঠে, ওরকম ওপর ওপর প্রাণের বন্ধু সবাই হতে পারে, দোস্ত। বন্ধুর পরীক্ষা বি’পদে, দুঃসময়ে দুঃখের দিনে। সুসময়ে সুখের খবর সবাই নিতে আসে। কিন্তু প্রকৃত বন্ধুই শুধু দুঃখের দিনে পাশে থাকে। সে তোমা’র প্রাণের বন্ধু-অ’থচ আজ এই চরম সময়ে সে কেটে পড়লো। তা পড়ুক, তোমা’র কোনও অ’সুবি’ধে হবে না। আমি আছি তোমা’র পাশে। যা করতে হয় আমা’কে বলো, আমি করে দেব। নিজের বলতে আমা’র কেউ নাই। সংসারে আমি একা। এক বুড়ি নিগ্রোঝি আছে সেই রোধে বেড়ে দেয়। সুতরাং সুলতানের রোষে যদি আমা’র এ তুচ্ছ প্ৰাণ যায় তাতেও আমি বি’চলি’ত নই। তবুও বন্ধুর জন্যে যদি কিছু করতে পারি সে-ই আমা’র বড় সাত্ত্বি’না।

আলী বলে, কিন্তু তুমি কি করে আমা’র উপকারে আসতে পারবে বন্ধু! আবুল ছিল খলি’ফার পিয়ারের লোক। প্রাসাদের যত্রতত্র ওর ছিল অ’বাধ গতিবি’ধি। হুই করে নোহা’রের প্রাসাদে ঢুকে গেলেও কোনও নাফর চাকর সন্দেহ করতো না। কিন্তু তোমা’কে তারা ঢুকতে দেবে কেন?

আমিন বলে, ও বাবা, তাও জানি না বুঝি, আমি, আবুলের মতো না হলেও, ছোট খাটো জহরৎ-এর ব্যবসা করি। আমা’র কাছ থেকেও হা’রেমের বেগমরা অ’নেক কিছুই কেনে। অ’নেক সময় খোজাদের দিয়ে ডেকে পাঠায়। আবার আমা’র হা’তে নতুন কোনও জহরৎ এসে গেলে নিজেও গিয়ে দেখিয়ে আসি। সুতরাং প্রাসাদে যে আমা’রও গতিবি’ধি একেবারে নাই তা নয়।

আলী আশ্বস্ত হয়। তা হলে হয়তো কোনও অ’সুবি’ধে হবে না।

এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে আমিন উঠে যায়। একটু পরে ফিরে এসে বলে, সামস-অ’ল-নাহা’রের কাছ থেকে একটি মেয়ে তোমা’র সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।

আলী অ’ধৈৰ্য হয়ে ওঠে, নিয়ে এসো তাকে এক্ষুণি।

মেয়েটি এসে সেলাম জানিয়ে দাঁড়ায়।

আলী জিজ্ঞেস করে, তোমা’র মা’লকিন কেমন আছে?

–আপনার বি’রহে সে প্রায় পাগল। একবার চোখের দেখা দেখতে চায়। কিন্তু তা কি করে হতে পারে?

আমিন বলে, যদি কিছু মনে না করো, আলী একটা’ কথা বলি’। আমা’র বাড়ির সামনেই আর একখানা আমা’র খালি’বাড়ি আছে। সেখানে কেউ থাকে না। তালা বন্ধ করে রেখেছি। যদি চাও সেখানে তোমা’দের নিভৃত মিলন করিয়ে দিতে পারি।

দুর্বল অ’সুস্থ আলী যেন মুহূর্ডে চাঙ্গ হয়ে ওঠে। —তোমা’কে কবলে যে কৃতজ্ঞতা জানাবো, ভাই—

আমিন বলে, কৃতজ্ঞতার কি আছে। আমি যদি তোমা’দের কোনও উপকারে আসতে পারি, নিজেকে ধন্য মনে করবো।

মেয়েটি বললো, আমি আমা’র মা’লকিনকে গিয়ে বলি’। সে যা বলে কাল এসে আপনাদের জানাবো।

পরদিন সকালে আবার সে এলো। আমিনকে বললো, মা’লকিনকে সব বললাম। সে আমা’কে বললো, আপনাকে তার প্রাসাদে নিয়ে যেতে।

মেয়েটির এই কথায় আমিনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে আসে। একটা’ অ’জানা ভয় যেন তাকে গ্রাস করে ফেলবে। ঠোঁট দিয়ে জিভ চেটে বলতে থাকে, আমি-মা’নে আমা’র কি সেখানে যাওয়া ঠিক হবে? যদি খোজারা সন্দেহ করে? তার চেয়ে তাকেই আমা’র বাড়িতে আসতে বলে। মন খুলে কথাবার্তা বলা যাবে।

মেয়েটি বুঝলো, আমিন যাবে না। বললো, ঠিক আছে তাই গিয়ে বলি’—

সামস-আল-নাহা’র এতই দুর্বল যে উঠে বসতে পারে না। কিন্তু মেয়েটি যখন গিয়ে বললো, তারা কেউ আসবে না, আপনাকেই যেতে বলেছে, তখন ঐ অ’বস্থাতেই সে উঠে দাঁড়ালো। কোনও রকমে সাজ পোশাক পরে একটা’ সাধারণ বোরখায় শরীর ঢেকে সবারই অ’লক্ষ্যে প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে পড়লো। মেয়েটি তাকে সঙ্গে করে নিয়ে চলে এল আমিনের বাড়ি।

আমিন বাড়িতেই অ’পেক্ষা করছিল। মেয়েটি নাহা’রকে বাইরে দাঁড় করিয়ে আমিনের সঙ্গে কথা বলতে থাকে।—এ বাড়িতে আর কে কে থাকে?

-আমি আর এক বুড়ি নিগ্রো ঝি। কিন্তু এ বাড়িতে আর কে কে থাকে? আঃ একটা’বাড়ি আছে আমা’র। সে বাড়িতে কেউ বাস করে না। সেখানেই আমি দেখা সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেছি।

মেয়েটি বলে, কিন্তু এ নিগ্রো বুড়িটা’ও যেন সে বাড়িতে না ঢোকে।

আমিন বলে, তুমি নিশ্চিত থাকে, কেউ টের পাবে না। চল ঐ বাড়িতেই যাই। এবার সামস-আল-নাহা’র মুখের নাকাব সরিয়ে মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলো, এই সেই সাহেব? এর কথাই তুই আমা’কে বলেছিলি’?

আমিন দেখলো, তার রূপের আলোয় ঘরটা’ ভরে গেলো। আলীর পছন্দ আছে বটে। এ রুদাপের জন্যে কোেনা পাগল হতে পারে?

নাহা’র এবার আমিনের দিকে তাকায়, আপনার নাম-ই আমিন?

—জী হা’ঁ।

–আপনি বি’বাহিত?

–জী না। তাছাড়া মা’ বাবা কেউই আমা’র নাই। ছোটবেলা থেকেই আমি অ’নাথ।

একটা’ সুসজ্জিত কক্ষ খুলে দিয়ে আমিন বললো, আপনি এখানে বি’শ্রাম করুন, আমি আলীকে নিয়ে এখুনি আসছি।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সে আলীকে নিয়ে ফিরে এলো।

অ’নেক কয়দিন বাদে দুজনেই দুজনকে দেখে আনন্দে আত্মহা’রা। আলীর বুকে কাঁপিয়ে পড়লো নাহা’র।

অ’নেক রাত অ’বধি খানাপিনা হৈ-হল্লা আনন্দের মধ্যে কাটলো। এক সময় আমিন আর নাহা’রের অ’নুচর মেয়েটি বি’দায় নিয়ে চলে গেলো। ওরা দরজা বন্ধ করে দিলো।

পরদিন সকলে সারা পাড়ার লোক জমে গেছে বাড়িটা’র সামনে। দরজার কপাট ভাঙ্গা। কাল রাতে ডাকাতি হয়ে গেছে আমিনের এই খালি’ কুঠিতে। পাড়ার প্রত্যক্ষদশীদের একজন এগিয়ে এসে বললো, গতকাল মা’ঝ রাতে অ’নেকগুলো ডাকাত এসে দরজা ভেঙে বাড়ির সামা’ন-পত্র আর আমিন সাহেবের দুজন মেহেমা’নকে চুরি করে নিয়ে গেছে। তাদের হা’তে ইয়া বড় বড় ছোরা বল্লম দেখে আমি ভয়ে চিৎকার করতে পারিনি।

প্রতিবেশীরা অ’নেকেই উপদেশ দিল, কোতোয়ালকে গিয়ে নালি’শ করো। ডাকাতকে তারা পাকড়াবার ব্যবস্থা করবে। কি করবে কি করা উচিৎ কিছুই ভাবতে পারে না। আমিন। এমন সময় একজন অ’চেনা লোক তার সামনে এসে বললো, শোনও, তোমা’র সঙ্গে একটা’ কথা আছে।

একটু আড়ালে নিয়ে গিয়ে বললো, ডাকাতদের আস্তানা আমি জানি, যাবে আমা’র সঙ্গে… এসো।

আমিন যেন হা’তে স্বৰ্গ পায়, বলে, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই যাবো চলুন।

হা’ঁটতে হা’ঁটতে তারা ট্রাইগ্রীসের ধারে এসে পড়ে। লোকটি বল, ওপারে যেতে হবে। একটা’ নৌকায় চেপে ওপরে গিয়ে নামে। তারপর আলি’গলি’ একে বেঁকে এমন এক গোলক ধাঁধার মধ্যে আমিনকে নিয়ে গিয়ে হা’জির করে, যেখান থেকে ছেড়ে দিলেও সে বেরিয়ে আসতে পারবে না।

একটা’ পোড়ো বাড়ির দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। লোকটা’ ট্যাক থেকে চাবি’ করে করে তালা খোলে। আমিনকে সঙ্গে নিয়ে ভিতরে ঢোকে। আমিন দেখলো, দশজন সাণ্ডা-গুণ্ডা মা’র্ক লোক বসে বসে খানা পিনা করছে। আমিনকে বসতে বলে লোকটিও মুখ হা’ত ধুয়ে এসে ওদের সঙ্গে বসে পড়ে। বলে, খাবে নাকি? এসো।

আমিনের বেশ খিদে পেয়েছিলো। কিন্তু বসতে ভরসা হলো না। কি জানি, বি’ষ টিস যদি খাইয়ে দেয়। বলে, না খিদে নাই।

লোকটা’ হা’সে, বি’শ্বাস করতে পারছে না।–তাই না? আরে, আমরা ডাকাত হলেও লোক ভালো। স্বাচ্ছন্দে বসে খেতে পারে।

আমিনের হৃদকম্প শুরু হয়। লোকগুলো ডাকাত! এদিক ওদিক চেয়ে দেখে, নানা রকম মা’রাত্মক অ’স্ত্ব শস্ত্র রাখা আছে এক পাশে।

লোকটা’ বলে, কাল রাতে তোমা’র বাড়িতে আমরাই ডাকাতি করে এসেছি।

আমিন শিউরে ওঠে, তাহলে আমা’র মেহেমা’নদের কি—

–না মেরে ফেলি’নি। তারা নিরাপদ আশ্রয়ে আছে। রাজপ্রাসাদেও তেমন সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের বন্দোবস্ত নাই—তেমনি ভাবেই তাদের রাখা হয়েছে। দেখতে চাও? একটু সবুর করো খানা শেষ হলে তাদের সঙ্গে দেখা করিয়ে দেব। কিন্তু তার আগে একটা’ সত্যি কথা বলবে? ওরা কারা? কি ওদের পরিচয়? কিন্তু সাবধান, যা বলবে, সত্যি বলবে। মিথ্যে কোনও কথা বললে আমরা ধরে ফেলবো? এবং তার পরিণাম বড় খারাপ হবে।

আমিন আর কোনও কথা গোপন করলো না। সামস-আল-নাহা’র এবং আলীর সমস্ত বৃত্তান্ত খুলে বললো।

আর একবার ঝালাই করে নেয় লোকটা’, তোমা’র সব কথা বি’শ্বাস করতে পারি?

–একশোবার। এর এক বৰ্ণও বানিয়ে বলি’নি।

এমন সময় পাশের একটা’ দরজা খুলে ঘরে এসে ঢুকলো সুলতানের কোতোয়াল। পরণের বেশবাসেই চেনা গেলো।

–তোমা’র সব কথা আমি পাশের ঘর থেকে শুনেছি। সব সত্যি বলেছো?

আমিনের তখন কাপড়-চোপড়ে অ’বস্থা। কাঁপতে কাঁপতে বলে, জী হুজুর, সব সত্যি।

কোতোয়াল বলে, ঠিক আছে, তুমি যেতে পারো।

লোকটিকে ইশারা করতেই দরজা খুলে আমিনকে নিয়ে বেরিয়ে আসে সে।

—এখন বুঝতে পারলে আমরা ডাকাত কিনা?

আমিন বলে বুঝেছি, আপনারা সবাই সুলতানের লোক।

লোকটি বলে, একথা তোমরা ভুলে গেলে কি করে? হয়তো বা কখনও আল্লাহর চোখেও ধুলো দিতে পারো, কিন্তু খলি’ফা হা’রুন-অ’ল রসিদের সঙ্গে বি’শ্বাসঘাতকতা চলে না।

এর পরের ঘটনা অ’তি সংক্ষিপ্ত। সামস-আল-নাহা’রকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো তার প্রাসাদে। আর বেচারী আলী-ইবন-বকর-এর গর্দান গেলো সুলতানের হুকুমে।

এইখানেই এ কাহিনীর পরিসমা’প্তি ঘটতে পারতো। কিন্তু আরও একটু বাকি ছিলো।

সামস-আল-নাহা’র কে আদর-সোহা’গ করে খলি’ফা বললেন, আমি তোমা’র সব গোস্তাকি মা’ফ করে দিলাম, নাহা’র। ভুল মা’নুষ মা’ত্রেরই হয়। তাই বলে তার কি সংশোধন নাই? আমা’র ভালোবাসা তুমি ঠিক বুঝতে পারেনি, সোনা। তাই অ’ন্য দিকে হা’ত বাড়িয়েছিলে? কিন্তু বি’শ্বাস করো, জীবনে আমি কখনও মিথ্যা বলি’ না, তোমা’র আমি প্ৰাণ দিয়ে ভালোবাসি। তুমি আমা’র প্রাণাধিক প্রিয়া।

তাঁর কথা শেষ হতে না হতেই সামস-আল-নাহা’রের দেহটা’ খলি’ফার কোলে ঢলে পড়ে জহরে নীল হয়ে যেতে থাকে। ওর স্বর চাপার মতো দেহখানা।

Please follow and like us:

fb-share-icon

নতুন ভিডিও গল্প!


Tags: , , , , , ,

Comments are closed here.