রোদে ভেজা তিলোত্তমা (১ম পর্ব) – বিদ্যুৎ রায় চটি গল্প কালেকশন লিমিটেড

February 21, 2021 | By Admin | Filed in: আন্টি সমাচার, কাকি সমাচার, বান্ধবী.

রোদে ভেজা তিলোত্তমা’
Written By pinuram

রোদে ভেজা তিলোত্তমা’ (#০১)

তুমি কি রোদে ভিজতে পারো? আমরা কিন্তু রোদে ভিজেছিলাম। সেসময়ে কলকাতা, কল্লোলি’নী তিলোত্তমা’ ছিলো আজকের মতন ব্যাঙের ছাতা হয়ে যায়নি। ময়দানে দাঁড়িয়ে বুক ভরে শ্বাস নিলে গঙ্গার জলো বাতাসে বুক ভরে উঠতো। আউট্ট্রাম ঘাট তখন বাঁধানো ছিলো না, গঙ্গার পাড়ে সোঁদা মা’টির ওপরে বসে চিনে বাদাম কিনে চিবোতে চিবোতে দু পায়ের নিচে দোল খেত গঙ্গার জল। ভিক্টরিয়ায়র সামনে থেকে দোতলা বাসের সামনের সিটে চেপে সোজা শ্যামবাজার আসার একটা’ আলাদা মজা ছিলো। রাজাবাজার ট্রামডিপো থেকে দৌড়ে ট্রাম ধরে কলেজস্ট্রীট যাবার এক আলাদা আনন্দ ছিলো সেই সময়ে। মোড়ের মা’থার চায়ের দোকানের জায়গা নিল রকমা’রি কেক প্যাস্ট্রির দোকান। প্রেসিডেন্সির ঠিক সামনে ফুচকাওয়ালার হা’তের ফুচকা খেয়ে বাড়ি ফেরা হত। বই কিনতে সবাই বই পাড়ায় যেত, আজকের দিনের মতন মোবাইলে ইন্টা’রনেট খুলে বই অ’র্ডার করতো না। বই পাড়ায় ঢুকলেই নতুন বইয়ের গন্ধ হা’রিয়ে গেছে আজ। কাকভোরে বাড়ির চাকর হরি কাকা বেরিয়ে পড়তো হা’তে থলে নিয়ে দুধ আর রাজারহা’টের ভেড়ি থেকে তুলে আনা রুই কাতলা শোল মা’গুর কিনে আনতো। সেই কাঁচের বোতলের হরিণঘাটা’র দুধ হা’রিয়ে গেছে। আজ নিউটা’উনের তলা থেকে সেই রুই কাতলার আর্তনাদ শয়ে শয়ে গাড়ির আওয়াজে ঢাকা পড়ে গেছে। মনে আছে সেবার বর্ষা কালে যদুবাবুর ঘাটে এক জেলের জালে এক জোড়া ইলি’শ উঠেছিলো, একশো টা’কা দাম চেয়েছিলো, খবরের কাগজে সেই ছবি’ও এসেছিলো। ছোটকাকা পরের দিন হেসে বাবাকে বলেছিলো – “তোমা’কে বলেছিলাম এবারে এই গঙ্গায় ইলি’শ উঠবে।” সেই ইলি’শের আর দেখা মেলে না, সবুজ রঙের জল ধীরে ধীরে কালো রঙ নিয়েছে।

মনে আছে একবার দুর্গাপুর থেকে হা’ওড়া নেমে দেখি হা’ওড়া ব্রিজে বি’শাল জ্যাম, হেঁটে হেঁটে হা’ওড়া ব্রিজ পেরিয়ে চিতপুর রোডে এসে টা’না রিক্সা ধরলাম শিয়ালদা আসার জন্য। আজ সেই টুং টা’ং বেজে ওঠা টা’না রিক্সা হা’রিয়ে গেছে তার জায়গা নিয়েছে অ’সঙ্খ্য তিন চাকা ছোট ছোট আটো। বাতাসে শ্বাস নেওয়া দুস্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোন কোন সময়ে খুব ভোরে ছোট পিসিমা’কে নিয়ে শ্যামবাজারের মঙ্গলার হা’টে যেতাম। ভোরে আলো ফোটা’র আগেই সেই হা’ট বসে যেত, দূর দূর থেকে লোকে আসতো কেনা বেচা করতে। ছোট পিসিমা’র টা’কা থাকলেও একটা’ বাই ছিলো কমদামে ভালো জিনিস কেনার। পিসেমশাই আর বাবা খুব বকতো, তাও পিসিমা’ ছাড়তো না, মা’সে একবার মঙ্গলার হা’টে গিয়ে জামা’ কাপড় কেনা চাইই চাই। চলত গেঞ্জির দোকানির সাথে বচসা, দশ টা’কায় দুটো গেঞ্জি। পিসিমা’ অ’নড়, কুড়ি টা’কায় সাতখানা নিয়েই ছাড়তো। হা’ঁটতে হা’ঁটতে পাঁচ মা’থার মোড়ে চলে যেতাম। ঠিক কোনায় একটা’ চায়ের দোকান ছিলো, পিসিমা’ আমা’কে চার আনা দিয়ে বলতো “যা পুটু, বাড়িতে তোর বাবা চা খেতে দেবে না ওই দোকানে খেয়ে আয়।” সেই চার আনায় এক খুড়ি ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপের চুমুকের আনন্দ হা’রিয়ে গেছে সিসিডি, বারিস্তার মা’ঝে। পিসিমা’র সাথে সাথে সেই মঙ্গলার হা’টের সৌন্দর্য হা’রিয়ে গেছে। শনিবারের দুপুরে মা’ কাকিমা’ জেঠিমা’ উঠানে বসে রেডিওতে যাত্রাপালা শুনতো, “শনিবারের বারবেলা……” শয়ে শয়ে মা’ল্টিপ্লেক্স আর ডিশ টিভির আড়ালে সেই বারবেলা হা’রিয়ে গেছে। দুপুরে এক ফেরিওয়ালা আসতো ঠিক বাড়ির সামনে এসে হেঁকে যেত, “হরেক মা’ল পাঁচ সিকা…..” বাড়ির মগ বালতি রুটি সেঁকার জালি’ সব ওর কাছ থেকেই কেনা হত। দু’কান আর্তনাদ করে আবার সেই ডাক শোনার জন্য, সেই আওয়াজ আজ হা’রিয়ে গেছে।

মহা’লয়ার পরেই পাড়ার কর্তারা ধর্না দিত কুমোরটুলি’তে, কত দূর হল দুর্গা মা’য়ের মূর্তি। আজকের দুর্গা হা’রিয়ে গেছে কর্পোরেট কালোচারে, সেই টা’নাটা’না চোখের মা’তৃময়ী মূর্তির জায়গা নিয়েছে অ’্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট। ষষ্টির বোধনের আগে মা’য়ের চক্ষু দান, তার আগে পর্যন্ত মা’য়ের মুখ থাকত কাপড়ে ঢাকা। আমি, নবীন, পিতু, অ’নু, সুকন্যাদি, ছোড়দি সবাই রাত জেগে বসে থাকতাম, কখন নন্দন পাল এসে সেই চক্ষু দান করবে। বুড়ো নন্দন পালের সাথে সাথে সেই চক্ষু দানের অ’ধির হয়ে বসে থাকা হা’রিয়ে গেছে। সেই সময়ে পাড়ায় পাড়ায় পুজোর সময়ে গায়ক গায়িকারা আসতো, ষষ্টি থেকে বাড়িতে রান্না বন্ধ হয়ে যেত। নন্দ কাকিমা’, সেন কাকিমা’, জ্যেঠিমা’ আর মা’য়ের হা’তে রান্নার ভার পড়ত। একসাথে বসে পুজোর মা’ঠের ওপরে রঙ্গিন সামিয়ানার নিচে বসে পাত পেড়ে খাওয়া দাওয়া চলতো দশমী পর্যন্ত। আজ ভিড় হয় শয়ে শয়ে গজিয়ে ওঠা ৩৬ বালি’গঞ্জ প্যালেস, ওহ ক্যালকাটা’, ভজ হরিমা’ন্না ইত্যাদি। মা’ জেঠিমা’র হা’তের রান্না হা’রিয়ে গেছে এই বাঙ্গালি’র মুন্সিয়ানা বাঙালি’ রেস্টুরেন্টের মা’ঝে।

বাড়ির পেয়ারা গাছে পেয়ারা হতো, গলি’র মুখের সেনদের আম গাছে আম হতো, তার পাশের বাড়ির নন্দদের বাড়িতে বেশ কয়েকটা’ নারকেল গাছ ছিলো। আজ সেই সবুজে ঢাকা পাতা ভরা গাছ গুলো নেই, ব্যাঙের ছাতার মতন গজিয়ে ওঠা রক্ত মা’ংসহীন সারি সারি বহুতল দাঁড়িয়ে। নীল আকাশ দেখা বি’রল হয়ে দাঁড়িয়েছে এই কল্লোলি’নীর বুকে। সে সময়ে আগমনীর সুরের আগেই বৃষ্টি থেমে যেত, আজকের দিনের গ্লোবাল ওয়ারমিং তখন এই কল্লোলি’নীকে ছুঁতে পারে নি। শরতের নীল আকাশে পেঁজা পেঁজা তুলোর মতন মেঘ ভেসে বেড়াতো, আজকের দিনের মতন কালো বরষার মেঘের ঘনঘটা’ ছিলো না। পুজোর বাজার করতে মা’ মা’সি পিসিরা সবাই এক না হয় শ্যামবাজার না হয় হা’তিবাগান না হয় গড়িয়াহা’ট যেত আজকের দিনের ব্যাঙের ছাতার মতন গজানো এক হা’জার এক শপিং মলে যেত না। বি’য়ের শাড়ি কিনতে সবাই কলেজ স্ট্রীট যেত। ধীরে ধীরে জামা’ কাপড়ের দোকান বুটিক হয়ে গেল, নাপিত হয়ে গেল হেয়ার ড্রেসার, আর দরজি গুলো ফ্যাশন ডিজাইনারের তকমা’ লাগিয়ে নিল গায়ে। স্কুলের ছোট ছেলেরা ছাড়া কেউ হা’ফ প্যান্ট পরে বাইরে বের হত না। ছোট মেয়েদের ফ্রক হা’ঁটু পর্যন্ত থাকলেও বড় মেয়েদের গোড়ালি’ পর্যন্ত ঢাকা থাকতো। বি’য়ের পরে মেয়েরা সে সময়ে জিন্স প্যান্ট পরে বের হতো না খুব একটা’, বের হলেও সবার চক্ষু লজ্জা বলে একটা’ ভাব থাকতো মনের মধ্যে। বরের সাথে দূর দেশে ভ্রমনে গিয়ে হা’ফ প্যান্ট পরার শখ, জিন্স প্যান্ট পরার শখ মিটা’তো বাঙালি’ মেয়েরা। আজকের মতন পাছার একটু নিচে এসে তাদের স্কার্ট থেমে যেত না। ছেলেরা বাড়িতে লুঙ্গি ছেড়ে বারমুডা পরা শুরু করে দিল, এমন কি বাজারে যেতে হলেও বারমুডা হা’ফ প্যান্ট। সেই চেক কাটা’ সাদা কালো নীল রঙের লুঙ্গি হা’রিয়ে গেল। আজ কাউকে লুঙ্গি পড়তে দেখে লোকে নিম্নবি’ত্তের মা’নুষ বলে। বসিরহা’টের লাল সাদা ডোরা কাটা’ গামছার জায়গা নিল রকমা’রি রঙের তোয়ালে। ছেলেদের জিন্স নিচে নেমে এসে পাছার খাজের নিচে, দুই হা’তে, কাঁধে পিঠে রঙ বেরঙের উল্কি আকা। মেয়েদের স্কার্ট দুধ খাওয়া বাচ্চার প্যান্টের চেয়ে একটু ছোট, ঝুঁকলেই দেখা যায় সত্যি কিছু পরেছে নিচে না একদম খালি’।

কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময়ে আমি, দেবু আর পচা মিলে খান্নার কাছে একটা’ গলি’র মধ্যের মদের দোকান থেকে মদ কিনে খেয়েছিলাম। ভয়ে সেদিন আর বাড়ি ফিরতে পারিনি তিন বন্ধু, বরানগরের কাছে কুটির ঘাটের পোড়ো মন্দিরের চাতালে ঘুমিয়ে কাটিয়ে ছিলাম। সকালো বেলায় ওই গঙ্গার ঘাটে হা’ত মুখ ধুয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম। সে সময়ে মোবাইল ছিলো না তাই মিথ্যে বলতে বি’শেষ অ’সুবি’ধে হতো না, সবাই সমস্বরে বলেছিলাম শিবপুরের সমরের বাড়িতে রাতে ছিলাম। আজকের কোলকাতা বাড়িতে বসে মদ গেলে, শহরের আনাচে কানাচে গজিয়ে উঠেছে বার আর মদের দোকান। মদ খাওয়া আজকের কলকাতার আধুনিকতা বড়লোকি মুন্সিয়ানা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাবা ছেলে একসাথে বসে মদ খায় আজকের কল্লোলি’নীর বুকে। ছেলে আর মেয়ের মধ্যে বন্ধুত্ত, বাপরে, বি’রাট বড় অ’পরাধ বলে মনে করা হতো! প্রেম যে লুকিয়ে চুরিয়ে করিনি সে নয়, সবাই একটু আধটু করেছে তবে হা’তে হা’ত দিয়ে বাড়ির আগের স্টপেজ পর্যন্ত দৌড় ছিলো সেই সময়ে, পাছে পাড়ার কেউ দেখে নেয় আর বাবার কানে খবর চলে যায়। আজকের কল্লোলি’নী হা’তে হা’ত কেন, কোমরে হা’ত দিয়ে বাড়ির নিচে ছেড়ে গালে চুমু খেয়ে বলে, “ডার্লি’ং, রাতে কাপড় খুলে জেগে থেকো আমি ফোন করবো।” ঘুলঘুলি’র মতন ফ্লাটের, এক চিলতে বারান্দা দিয়ে কেউ দেখলো কি দেখলো না, সেই নিয়ে এই কোলকাতার কোন মা’থা ব্যাথা অ’থবা ভ্রূক্ষেপ নেই।

রোদে ভেজা তিলোত্তমা’ (#০২)

আজও মনে হয় এই যেন গতকালের কথা। আমি আর নবীন একটু তাড়াতাড়ি কলেজ থেকে বেরোবো ভেবেছিলাম, প্রিয়াতে “গুরুদক্ষিণা” দেখতে যাবার কথা। পচা, দেবু আর অ’নুসুয়াকে জানানো হয়নি, ওরা জানতে পারলে আর আস্ত রাখবে না আমা’দের। আসল কথা, সেদিন নবীনের ছোট মা’মা’ ওকে দশ টা’কা দিয়েছিলো, আর সেই টা’কাতেই ওই সিনেমা’ দেখতে যাওয়ার কথা।

নামতে গিয়েই সিঁড়িতে মধুছন্দার সাথে ধাক্কা খেলাম। এমনিতে খুব শান্ত প্রকৃতির মেয়ে মধুছন্দা, কিন্তু একবার খোঁচা মা’রলে যেন বোলতার চাকের মতন তেড়ে ওঠে। পড়াশুনায় বরাবর ভালো, গত দুই বছরে মেয়েদের মধ্যে সব থেকে বেশি নম্বর পেয়েছে।

সঙ্গে সঙ্গে অ’গ্নিবীনার মতন ঝাঁঝিয়ে উঠলো মধুছন্দা, “কি রে, দেখে চলতে পারিস না? ঠ্যালা দিয়ে মেরে দিবি’ নাকি?”

বলেই ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে আমা’কে দেখে মুখ চুপসে গেল, কেন জানি না। উজ্জ্বল ত্বকের সাথে সেদিনের হা’লকা গোলাপি শাড়িটা’ বেশ মা’নিয়েছিলো। টিকালো নাকের ওপরে চশমা’টা’ একটু ঠেলে দিয়ে আমা’র দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে ছিলো কিছু উত্তরের জন্য। ওই চোখের আগুনের পেছনে উত্তরের উতসুকতা দেখেছিলাম কিন্তু গলা শুকিয়ে এসেছিলো ওই চাহনি দেখে। কেমিস্ট্রি ল্যাবের সব কেমিক্যাল যেন আমা’র মা’থার ওপরে কেউ ঢেলে দিয়েছিলো বলে মনে হয়।

মা’থা চুলকে বি’ড়বি’ড় করে কিছু বলার আগেই নবীন ওর ওপরে ঝাঁঝিয়ে ওঠে, “এই সিঁড়ি তোর কেনা নাকি যে সারা সিঁড়ি জ্যাম করে নামছিস? মুটকি শ্যামলীকে দ্যাখ, ওই তো সিঁড়ির অ’র্ধেক জায়গা নিয়ে নামে, বাকিরা নামবে কি করে?”

বলতে বলতে ঝগড়া লেগে যায় নবীন আর শ্যামলীর মধ্যে, “আমি অ’ন্তত তোর মতন হা’ড়গিলে নই, আমা’র বাবা খেতে পড়তে দেয়। তোকে দেখে মনে হয় যেন একটা’ হ্যাঙ্গারে একটা’ শার্ট ঝুলি’য়ে রাখা হয়েছে।”

নবীন একটু রোগা গঠনের, শ্যামলীর ওই উক্তির পরে আরো রেগে ওঠে নবীন, “তোর বাপ কি তোকে হা’তির খোরাক দেয়?”

পাশেই দাঁড়িয়ে অ’নুসুয়া, সঙ্গে সঙ্গে নবীনের কলার ধরে বলে, “একদম বাপ তুলে কথা বলবি’ না। ওর বাপ ওকে কি খেতে দেয় না দেয় তাতে তোর দেখার কি দরকার।”

আমি নিরুপায় হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বললাম, “অ’নু প্লি’স এখন ছাড়, সিনেমা’ দেখতে যাবো দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

সঙ্গে সঙ্গে মধুছন্দার চেহা’রার আদল বদলে গেল, বড় বড় চোখ করে উৎসুক হয়ে আমা’র দিকে প্রশ্ন করে, “কোথায় যাচ্ছিস রে তোরা, কি সিনেমা’?”

ওই বড় বড় চোখ দুটো দেখলেই আমা’র মনের ভেতরটা’ কেমন যেন করে উঠতো। মিচকি হেসে উত্তরে বলেই ফেললাম, “প্রিয়াতে গুরুদক্ষিণা চলছে, দেখতে যাবি’?”

অ’নুসুয়া প্রায় আমা’কে তেড়ে মা’রতে আসে, “কলেজ ফাঁকি দিয়ে সিনেমা’ দেখতে যাওয়া হচ্ছে? দাঁড়া কাকিমা’কে বলে দেব।”

আমা’র আর নবীনের ওপরে অ’নুসুয়ার একটু বেশি জোর খাটে। এক পাড়ায় আমা’দের বাড়ি, ছোট বেলা থেকে এক স্কুলে পড়েছি তিনজনে। নবীনের ছোট কাকিমা’ অ’নুসুয়ার ছোট মা’সি হয়, ওদিকে অ’নুসুয়ার বাবা আর আমা’র জেঠুর গলায় গলায় বন্ধুত্ত, দুইজনে ক্যালকাটা’ পোর্টট্রাস্টে কাস্টমসে চাকরি করেন। বছর পাঁচেক আগে অ’নুসুয়ার বড়দা মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করেছে, আমা’র বাবাও ডাক্তার আর বি’শ্বজিৎদা বাবার খুব প্রিয় ছাত্র। সব মিলি’য়ে তিন বাড়ির মধ্যে অ’বাধ যাতায়াত। আমা’দের বাড়ি আর অ’নুসুয়ার বাড়ি একান্নবর্তি পরিবার, জেঠা বাবা কাকা সবাই একসাথে থাকে। পুজো পালা পার্বণে একসাথে খাওয়া দাওয়া এমনকি দুই বছর অ’ন্তর বেড়াতে গেলেও একসাথে দল বেঁধে যাওয়া হয়। এক বাস লোক ভর্তি করে বেড়াতে যাওয়ার আনন্দ আলদা।

পেছন থেকে পচা মা’নে পরাশর চেচিয়ে ওঠে, “”শালা, তোরা দু’জনে নিজেদের মধ্যে ঠিক করে নিলি’?”

নবীন চেঁচিয়ে ওঠে আমা’র দিকে, “মুটকি যখন আমা’র কলার ধরলো তখন মুখে বুলি’ ফোটেনি। আর যেই ন্যাকা সুরে ডাক দিল, কি সিনেমা’ অ’মনি সুর পালটে আমা’দের সাথে সিনেমা’ দেখতে যাবি’? বাড়ি চল শালা, তোর গাঁড়ে আস্ত শাল না ঢুকিয়েছি আমা’র নামে কুত্তা পুষিস!”

অ’নুসুয়া কাছে এগিয়ে মিচকি হেসে কানেকানে ফিসফিস করে বলে, “কি রে পুটু, কিছু চলছে নাকি?”

আমি মা’থা নেড়ে জানালাম কি বলছে আমি কিছু বুঝতে পারছি না, যদিও সব কিছু জলের মতন ঘোলাটে আমা’র সামনে। অ’নু একবার আমা’র মুখের দিকে তাকায়, একবার মধুছন্দার মুখের দিকে তাকিয়ে মিচকি হেসে দেয়। মধুছন্দার কান লাল হয়ে যায় সেই চোরা হা’সি দেখে।

ওদিকে দেখলাম এ যে বড় বেগতিক নবীনকে কিছুতেই খোঁচানো যাবে না। সেই মদ খাওয়ার দিনে আমা’দের দেখে ফেলেছিলো, সেই থেকে আমা’কে আর পচাকে ব্লাকমেল করে রোজ এক প্যাকেট চারমিনার কেনে। লুকিয়ে চুরিয়ে বি’ড়ি সিগারেট খাওয়ার অ’পরাধ সেইসময়ে মা’র্জনা করে দিতেন বাড়ির বড়রা। কিন্তু মদ গেলা, গাঁজা টা’না নৈব চ নৈব চ, একবার বাবা জেঠার কানে কথা গেলে পিঠের ছাল গুটিয়ে খোল বানিয়ে তবে ছাড়বে। ভাগ্য ভালো যে সেই মদের কথা অ’নুসুয়ার কানে যায়নি না হলে আমরা আর আস্ত থাকতাম না। তখন আমা’দের ক্ষমতা ওই বি’ড়ি থেকে চারমিনার পর্যন্ত ছিলো তাই নবীন ওর ওপরে কোনোদিন ওঠেনি।

ওদিকে শ্যামলী আর অ’নুসুয়া বেঁকে বসে, দেবাশিসের সাথে কিছুতেই সিনেমা’ দেখতে যাবে না। বেশ কয়েকদিন আগে দেবাশিস অ’নুসুয়াকে ডাকতে গিয়ে কাঁধে হা’ত রাখে আর তাতে ওর শাড়ির আঁচল একটু খসে যায়। ধুন্ধুমা’র কান্ড শুধু ঘটতে বাকি ছিলো সেইদিন যদি না ওই মধুছন্দা এসে মধ্যস্থতা করতো, শ্যামলী আর অ’নুসুয়া মিলে দেবুর কাপড় খুলি’য়ে ছেড়ে দিত।

তালে বেতালে ঝগড়া কথা কাটা’কাটিতে সেদিন আর সিনেমা’ দেখা হলো না। শেষ পর্যন্ত সবাইকে বাঁচিয়ে অ’নু প্রস্তাব দিল কফিহা’উসে যাওয়ার। মেয়েদের দলের মধ্যে আর ছেলেদের দলের মধ্যে ওই একমা’ত্র যোগসূত্র। যেমন কথা তেমনি কাজ, বাসে চেপে সেই যাদবপুর থেকে সোজা কলেজ স্ট্রিট। মা’ঝে মধ্যেই একটা’ ঝগড়া লাগতো। এক না হয় পচার সাথে শ্যামলীর না হয় দেবুর সাথে অ’নুসুয়ার, আমা’কে আর নবীনকে সামা’ল দিতে হতো, আর মধুছন্দা চুপচাপ একদিকে দাঁড়িয়ে মিচকি হা’সতো ওদের কান্ডকারখানা দেখে। কলেজের বাইরে হোক কি ভেতরে হোক, বি’শেষ মিশুকে না হলেও ওকে সবসময়ে সঙ্গে রাখত অ’নুসুয়া। তবে আমা’দের ঝগড়াঝাটি কোনোদিন কলেজ চৌহিদ্দির বাইরে যায়নি, কলেজের গেটের বাইরে এই সাত জনের এক অ’ন্য রুপ। তার মূলে অ’বশ্য আমি আর অ’নুসুয়া, কিছু না কিছু করে সবাইকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে চুপ করিয়ে দিতাম। দেবু, অ’নুসুয়ার সাথে আগ বাড়িয়ে ঝগড়া করতে ওস্তাদ, জানে শুধু ঝগড়ার মা’ধ্যমে ওর সাথে কথা বলতে পারবে কিন্তু মনের কথা বলার সময়ে ওর হা’ঁটু কাঁপতো। মা’ঝে মা’ঝেই আমা’র কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করতো ওই সুন্দরী অ’নুসুয়ার একটু সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য। গতবারে স্বরস্বতী পুজোর সময়ে একটা’ ছোট হা’তির দাঁতের লকেট কিনেছিলো ভেবেছিলো অ’নুসুয়াকে দেবে। শেষ পর্যন্ত নিজে হা’তে দিতে পারলো না, আমা’র হা’ত দিয়েই দেওয়া করিয়েছিলো। সেই হা’তির দাঁতের লকেট পেয়ে বড় বড় চোখে কটমট করে তাকিয়েছিলো অ’নুসুয়া।

আমি ওকে প্রশ্ন করলাম, “কেন তোর এত রাগ ওর ওপরে একবার খুলে বলতো?”

অ’নুর উত্তর, “দূর শালা, সবসময়ে কেমন ভাবে তাকিয়ে থাকে আমা’র দিকে।”

আমি বললাম, “কেন তাকাবে না বল? তুই ক্লাসের সেরা সুন্দরী, তোর দিকে সবার নজর। আর আমা’দের ব্যাচে কটা’ মেয়ে বলতো? কড় গুনে সাতজন।”

ঠোঁট উলটে নাক বেঁকিয়ে হেসে বলে, “খুব সুন্দর হয়েছে লকেটটা’ ওকে বলে দিস। আর হ্যাঁ, তুই কবে কাকে দিচ্ছিস এই রকম একটা’ লকেট?”

আমি উত্তরে জিজ্ঞেস করি, “কাকে দেওয়া যায় বলত এই রকম লকেট? তোকে একটা’ দিলে কেমন হয়?”

ঠোঁট কামড়ে উত্তর দেয় অ’নুসুয়া, “আমা’কেই দিস একটা’, তোর হয়ে মধুছন্দাকে দিয়ে দেবো।”

বর্তমা’নে অ’নুসুয়া, দেবুর অ’ফিস ফেরার পথ চেয়ে অ’ধির আগ্রহে বসে থাকে, সেই গল্প আলাদা। সে নিয়ে পরে অ’বশ্য আমরা অ’নেক হা’সাহা’সি করেছি প্যারিসে দেবুর বাড়িতে বসে। পচা এখন বোর্দে থাকে, মা’ঝে মা’ঝেই হা’না দেয় দেবুর বাড়িতে। সময় পেলেই নবীন ফ্লাইট ধরে ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে চলে আসে দেবুর বাড়িতে। দামী চুরুটের পাতা ছিঁড়ে সেই কল্লোলি’নীর চারমিনারের স্বাদ খুঁজতে চেষ্টা’ করি সবাই। একসাথে বসলেই শ্যামলীকে ফোন করা হয় আর ওন্টা’রিও থেকে ফোনে আমা’দের মুন্ডপাত করে। কোন কোন মা’সে লন্ডনের ব্রিক লেনে আমা’র বাড়িতে আড্ডা বসে। কখনো থেমসের জল দেখে, অ’থবা রাইন, অ’থবা গারননের জল দেখে থমকে দাঁড়িয়ে যাই সবাই, সবার বুকে যে গঙ্গা আঁকা সেই মা’ধুর্য নেই এই জলে।

রোদে ভেজা তিলোত্তমা’ (#০৩)

সেই সময়ে হা’ত খরচ বাবদ প্রতিদিনের বরাদ্দ ছিলো পাঁচ থেকে সাত টা’কা। যদিও অ’নুসুয়ার বাড়িতে আর আমা’দের বাড়িতে দুটো করে গাড়ি কিন্তু সেই গাড়ি আমা’দের জন্যে নয়। ট্যাক্সি চাপার বাহুল্য আমা’দের কপালে ছিলো না তাই বাসে চেপে যাওয়া হল কফি হা’উসে। আমি বারেবারে আড় চোখে মধুছন্দার দিকে তাকাই। চশমা’র আড়ালে ওই দুই উজ্জ্বল চোখের থেকে চোখ ফেরানো বড় কঠিন। নাকের ডগায় বি’ন্দু বি’ন্দু ঘাম জমেছে। সামনে পুজো তাই আকাশ বেশ পরিষ্কার আর সেই মৃ’দু রোদে ওর ত্বক যেন আর শত গুন ঝকমক করছে। মা’ঝে মা’ঝেই ওর চোখের সাথে আমা’র চোখ মিলে যেত আর ভুরু কুঁচকে মৃ’দু এক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিত আমা’র দিকে, “কি দেখছিস ওই ভাবে?”না, কোন উত্তর নেই আমা’র কাছে। কি করে বলি’ ওই দুই উজ্জ্বল চোখের হা’তছানিতে ভেসে যাওয়ার কথা।

পুজোর গল্পে, গরমের ছুটিতে আমরা সবাই মিলে দেরাদুন মুসৌরি ঘুরতে গেছিলাম সেই গল্পে, কলেজের প্রফেসারদের মুন্ডপাত করা এই সবে কখন যে দুই ঘন্টা’ কেটে গেল ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। দুই ঘন্টা’ টা’না আড্ডা মেরে কফি হা’উস থেকে বেরিয়ে পচা আর দেবু বাসে চেপে চলে গেল, ওদের বাড়ি বেলুড়। শ্যামলী সেই সময়ে থেকেই লুকিয়ে প্রেম করতো মেকানিকালের ফাইনাল ইয়ারের ঋতুরাজের সাথে। একটু পরে যথারীতি ঋতুরাজের বাইকে চেপে বাড়ি উদ্দেশ্যে পাড়ি দিল শ্যামলী। আমা’র আর নবীনের বাড়ি ফেরার বি’শেষ ইচ্ছে ছিলো না, ভেবেছিলাম হা’ওড়া ব্রিজের তলায় বসে একটু গাঁজার কলকেতে টা’ন দেব। অ’নুসুয়াকে বললাম যে আমা’দের বাড়ি ফিরতে দেরি হবে।

সেদিন আবার অ’নুসুয়ার মনে বান্ধবী প্রীতি জেগে ওঠে আর মধুছন্দাকে নিজের বাড়ি ডাকে। মধুছন্দার বাড়ি বেহা’লা আমা’দের বাড়ি থেকে অ’নেক দূরে। প্রথমে বেশ ইতস্তত করে মধুছন্দা, সন্ধ্যে হলে কি করে বাড়ি ফিরবে, বাড়িতে বলা নেই, মা’ চিন্তা করবে ইত্যাদি। অ’নুসুয়া ওকে বুঝিয়ে বলে যে বাড়ি গিয়ে ওর বাড়িতে একটা’ ফোন করে দিতে তাহলেই সব সমস্যার সমা’ধান হয়ে যাবে। যেই শুনলাম যে মধুছন্দা অ’নুর সাথে যাবে অ’মনি আমা’র কলকে সেবনের কথা মন থেকে উধাও হয়ে গেল। একসাথে এক বাসে যাওয়া যাবে সেই ভেবেই যেন মন নেচে উঠলো। নবীনকে বলে কয়ে রাজি করালাম যে গাঁজা অ’ন্য দিনে টা’না যাবে। অ’নুসুয়া আমা’র মনের অ’ভিপ্রায় ধরে ফেলেছিলো আর তাই হেসে বললো চলে আসতে।

বাসের জন্য অ’নেকক্ষন দাঁড়িয়ে চারজনে, বারেবারে চার চোখ এক হলেই চোরা হা’সি দিয়ে অ’ন্যদিকে তাকিয়ে থাকে মধুছন্দা। অ’নুসুয়া বললো যে অ’নেকক্ষণ ধরে আমরা দাঁড়িয়ে, একটা’ ট্যাক্সি করে গেলেই ভালো হয়। মধুছন্দার সাথে এক ট্যাক্সিতে যাবো, আমা’র যেন শ্বাস রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার যোগাড়। নবীন মা’থা চুলকে জমা’নো দশ টা’কা বের করে দিল, সেই সাথে আমিও পাঁচটা’কা বের করলাম। চারজনের কুড়িয়ে বাড়িয়ে পঁচিশ কি ত্রিশ টা’কা জমা’ হল। যথারীতি ট্যাক্সিতে চাপা হল, পেছনের সিটে অ’নুসুয়া, মধুছন্দা আর নবীন। আমি ইচ্ছে করেই আর পেছনের সিটে বসিনি, কিঞ্চিত দ্বি’ধায় কিঞ্চিত কাষ্ঠতায়। কফি হা’উসে বসে যেমন আমা’দের দুইজনের মধ্যে সরাসরি কোন কথাবার্তা হয়নি তেমনি ট্যাক্সিতেও হল না। মা’ঝে মধ্যে অ’নুসুয়ার ছুঁড়ে দেওয়া প্রশ্নের উত্তরে হ্যাঁ, না বলি’।

যেতে যেতে মধুছন্দা অ’নুকে প্রশ্ন করে, “তোদের বাড়ির মধ্যে তোদের এই মেলামেশা নিয়ে কোন অ’সুবি’ধে নেই?”

অ’নু হেসে জবাব দেয়, “কি যে বলি’স না তুই। আমা’দের তিন বাড়ির মধ্যে অ’ন্য এক যোগসুত্র আছে, নবীনের কাকিমা’ আমা’র ছোট মা’সি হয়। আমা’র দাদা ডাক্তার, পুটুর বাবার ছাত্র। সেই ছোট বেলা থেকে একসাথে বড় হয়েছি তিন জনে। একসাথে ঘুরতে যাওয়া, একসাথে ওঠা বসা। পুটুর বাড়ির পেয়ারা গাছ থেকে পেয়ারা চুরি করে খাওয়া থেকে সেনেদের বাড়ির আম গাছ থেকে আম চুরি করে খাওয়া, সব একসাথে করেছি। শীত কালে ওর জেঠিমা’ ছাদের ওপরে আচার বানিয়ে রাখত আমি আর ওর ছোড়দি মিলে অ’র্ধেক আচার উড়িয়ে দিতাম।”

কলেজের কেউ জানতো না যে আমা’র বাড়ির নাম পুটু, সুতরাং মধুছন্দার প্রশ্ন, “এই পুটু কে?”

অ’নু আমা’র দিকে তাকিয়ে উত্তর দেয়, “পার্থর বাড়ির নাম পুটু, আবার কলেজে গিয়ে ঢাক পিটিয়ে দিস নে যেন।”

মধুছন্দা আমা’র দিকের পেছনে বসেছিলো, সামনে একটু ঝুঁকতেই ওর গায়ের গন্ধে কেমন যেন মা’তাল হয়ে গেলাম। আমা’কে জিজ্ঞেস করলো, “তোকে দেখে তো বোঝা যায় না যে তুই এত বাঁদর ছেলে?”

আমি হেসে জবাবে বললাম, “তুই মুখ ফুটে কোনোদিন কিছু জিজ্ঞেস করিস না তাই জানতে পারিস নি।”

অ’নুসুয়ার হা’ত খানি হা’তের মধ্যে নিয়ে লাজুক হেসে জবাব দেয়, “কলেজের চৌহদ্দির মধ্যে আর তোদের মধ্যে থাকলে স্বস্তি পাই তাই।”

অ’নুসুয়া ওকে বলে, “”এক কাজ করিস এইবারে, পুজোতে আমা’দের এখানে চলে আসিস। এখানেই খাওয়া দাওয়া সবকিছু। সব থেকে বড় ব্যাপার, অ’ষ্টমীর রাতে যাত্রা পালা এবারে মন্টু গুপ্ত আসতে পারে।”

মন্টু গুপ্তের কথা ঠিক কানে পৌঁছাল না মধুছন্দার, ওর মা’থায় বাড়ি ফেরার চিন্তা ভর করে আসে। তাই অ’নুকে জিজ্ঞেস করে, “হ্যাঁ রে আমি বাড়ি কি করে যাবো?”

অ’নু উত্তর দেয়, “সে নিয়ে তোর এতো চিন্তা করতে হবে না। নবীন না হয় পুটু তোকে দাদার বাইকে করে ছেড়ে আসবে।”

নবীনকে একটা’ গুঁতো মেরে অ’নু জিজ্ঞেস করে, “তোর মনে হয় সময় হবে না তাই তো? বাড়ি ফিরে তো টিউশানি করার আছে।”

বুঝলাম ইচ্ছে করেই অ’নুসুয়া আমা’র পথ পরিস্কার করে দিল, যাতে সন্ধ্যেবেলায় মধুছন্দাকে নিয়ে বাইকে করে বাড়ি পৌঁছে দিতে পারি। বড় রাস্তায় গাড়ি ছেড়ে দিয়ে বাড়ির দিকে হা’ঁটা’ দিলাম। অ’নু আর মধুছন্দা মিষ্টির দোকান থেকে বাঁক নিয়ে ওদের বাড়ির দিকে পা বাড়ালো। একবারের জন্য আমা’র মনে হল যেন মধুছন্দার ঠিক ইচ্ছে নেই অ’নুর বাড়ি যাওয়ার, থমকে গিয়ে কি আমা’র দিকে পেছন ঘুরে তাকিয়েছিলো না আমা’র চোখের ভুল?

অ’নু আমা’কে বললো, “এই, তুই সাতটা’ নাগাদ চলে আসিস ততক্ষণে দাদা বাড়ি ফিরে আসবে।”

আহ্লাদে আটখানা কি করে মা’নুষে হয় সেদিন বুঝেছিলাম। বাড়ি ফিরে সময় যেন আর কাটে না। আমা’র ঘর তিনতলায়, খাটে শুয়ে লুকিয়ে একটা’ বি’ড়ি ধরিয়ে বি’কেলের কথা, ট্যাক্সিতে আসার কথা আর সাতটা’ কখন বাজবে সেই চিন্তায় ডুবে গেলাম। এর মা’ঝে বার দুই ছোট বোন এসে ডাক দিয়ে গেল, কারুর কথার কোন ভ্রূক্ষেপ নেই কারুর কথাই মা’থায় সেদিন আর ঢোকেনি। মা’থায় শুধুমা’ত্র একটা’ই চিন্তা কখন সাতটা’ বাজবে আর আমি একদৌড়ে সোজা অ’নুর বাড়িতে যাবো। ঘড়ির কাটা’ পৌনে সাতটা’ ছুঁতে পারেনি কি জামা’ গলি’য়ে জেঠিমা’কে বলে বেড়িয়ে পড়লাম। মা’ কাকিমা’র হা’তের সামনে পড়লে শত প্রশ্ন আমা’দের সাত ভাই বোনেদের একমা’ত্র সম্বল জেঠিমা’। জেঠিমা’ নিজে স্কুলের গন্ডি পার হয়নি সেই একটা’ দুঃখ ছিলো তাই মা’’কে আর কাকিমা’র পড়াশুনা করাতে ছাড়ায়নি। মা’ একটা’ মেয়েদের স্কুলের হেডমিস্ট্রেস আর কাকিমা’ কলেজের কেমিস্ট্রির লেকচারার। বাড়িতে দুই শিক্ষিকা থাকলে যা হয় বাড়িটা’ও কয়েদ খানার মতন মনে হয় তবে ওই জেঠিমা’র জন্য কয়েদখানা থেকে সব ভাই বোনেরা রেহা’ই পেয়ে যেতাম।

যাবার আগে সাবধান বাণী শুনিয়ে দিলেন, “বেশি রাত করিস নে, যেন তাহলে কিন্তু সামলাতে পারবো না।”

আমি বললাম, “আরে না না, বেশি রাত করবো না। তাড়াতাড়িই চলে আসবো।”

এক দৌড়ে মা’ঠ পেরিয়ে অ’নুর বাড়িতে পৌঁছে গেলাম। বাড়ির উঠানে মোটর সাইকেল দেখে বুঝতে পারলাম যে বি’শ্বজিৎদা বাড়িতে আছে, তার মা’নে মধুছন্দাকে নিয়ে অ’নায়াসে বাইকে চেপে কালি’ন্দি থেকে বেহা’লা পাড়ি দেওয়া যাবে। মনের মধ্যে যেন উত্তম সুচিত্রার “এই পথ যদি না শেষ হয়…..” বেজে উঠলো।

অ’নুর বাড়িতে আমা’র অ’বারিত দ্বার তাই সোজা ওর ঘরে যেতে কোন অ’সুবি’ধে হলো না। পর্দা সরিয়ে একটু উঁকি মেরে দেখালাম দুই বান্ধবী বি’ছানার ওপরে আধাশোয়া হয়ে গল্পে মশগুল।

মধুছন্দার পিঠ দরজার দিকে, উপুড় হয়ে বুকের নিচে একটা’ বালি’শ দিয়ে শুয়ে। হা’ঁটু থেকে পা ভাঁজ করার ফলে শাড়ির পাড় গুটিয়ে হা’ঁটুর কাছে চলে এসেছে। ফর্সা পায়ের মসৃণ গুলি’ দেখে বুকের রক্তে হিল্লোল লেগে গেল। ক্ষুধার্ত বাঘের মতন লোলুপ দৃষ্টিতে খানিক তাকিয়ে রইলাম ওই মসৃণ পায়ের গুলি’র দিকে। পাতলা শাড়ির পরতে ঢাকা নধর দেহ পল্লব যেন ঢেউ খেলে বি’ছানার ওপরে মেলে রয়েছে জল থেকে সদ্য ওঠা কোন এক অ’চিনপুরের জলপরী।

রোদে ভেজা তিলোত্তমা’ (#০৪)

আমি বেশ কিছুক্ষন ওইখানে দাঁড়িয়ে মধুছন্দার অ’পরূপ মা’ধুর্য দুই চোখে আকণ্ঠ পান করে গলা খাঁকড়ে জানান দিলাম যে সারথি প্রস্তুত। আমা’র চোখের রক্তিম আভা দেখেই মনে হয় মধুছন্দা বুঝতে পেরে গেছিলো যে আমি ওইখানে বেশ কিছুক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে ওদের লক্ষ্য করে গেছি। আমা’র গলার আওয়াজ শুনেই ধড়মড় করে উঠে বসে শাড়ি ঠিক করে নিল সেই সাথে অ’নু নিজের বেশভূষা ঠিক করে নিল।

অ’নু আমা’কে দেখেই জিজ্ঞেস করে, “কি রে কখন এলি’?”

আমি আমতা আমতা করে উত্তর দিলাম, “এই তো, এক্ষুনি এলাম।”

অ’নু আমা’কে নিচে বসতে বললো আর বললো যে কিছুখনের মধ্যে মধুছন্দাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে। আমি জানি কাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে আর সেই পূণ্য কর্মের জনেই আমা’র প্রত্যাবর্তন। নিচের বসার ঘরে বসে কাকিমা’র হা’তের চা খেতে খেতে উৎকণ্ঠায় শুধু ঘড়ির দিকে দেখি, কখন যে মধুছন্দা বের হবে আর খালি’ রাস্তা দিয়ে আমরা দুইজনে বাইকে করে যাবো। দিদিদের নিয়ে বাইকে যাওয়া অ’থবা অ’নুকে নিয়ে বাইকে যাওয়া আলাদা কথা, সেই প্রথম সত্যিকারের কোন বান্ধবীকে বাইকে বসিয়ে যাওয়া ভাবতেই যেন গায়ে কাঁটা’ দেওয়ার যোগাড়।

নিচে নেমেও যেন ওদের গল্প আর শেষ হয় না, কিছু বলতেও পারছি না শুধু মা’ত্র আড় চোখে দুইজনের দিকে মা’ঝে মা’ঝে তাকাই। পাঁচ মিনিট করতে করতে প্রায় আধা ঘন্টা’ পরে অ’নু মধুছন্দাকে ছাড়ল। বাইকের পেছনে বেশ আড়ষ্ট হয়ে একটু তফাৎ রেখে বসল। বাইকে স্টা’র্ট দেওয়ার আগে অ’নু আমা’কে সাবধান বাণী শুনিয়ে তবে ছাড়লো। আমা’কে ইশারায় জানিয়ে দিল যে এর ঘুষ দিতে হবে। আমিও মা’থা নাড়িয়ে জানিয়ে দিলাম যে দিতে প্রস্তুত আমি।

গলি’ থেকে বড় রাস্তা পর্যন্ত বেশ আস্তে আস্তে চালালাম, ইট পাতা রাস্তা বাইক নিয়ে চলা একটু মুশকিল। তাও বেশ সামলে চলতে হল কারন পেছনে যে বসে তাকে বেশি ঘাঁটা’নো যাবে না পাছে কি ভাবতে কি ভেবে বসে। বড় রাস্তায় বাইক চড়াতেই গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিলাম। সিট ধরে বসে থাকা হা’ত খানি আমা’র ডান কাঁধে উঠে এল। খোঁপা খুলে এলো চুল আমা’র ঘাড়ের ওপরে এসে দোল খেতে লাগলো।

কিছু মনে হয় বললো, কারন আমা’র কাঁধের ওপরে থাবা বেশ জোড়ালো হয়ে গেল। গাড়ি একটু ধীরে করে জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে? ফিসফিস জড়ানো কণ্ঠে আমা’কে একটু ধীরে চালাতে অ’নুরোধ করলো। আমা’র যেমন এই প্রথম কোন বান্ধবীকে নিয়ে বাইকে চাপা তেমনি মধুছন্দার সেই প্রথম কারুর সাথে বাইকে চাপা। দুইজনের মধ্যেই কেমন একটা’ আড়ষ্টভাব প্রতি নিয়ত ফুটে উঠেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে সেই আড়ষ্ট ভাব কাটিয়ে উঠলাম।

কানে ভেসে এল দূর থেকে এক নারীর কণ্ঠস্বর, “তুই কি এর পরেও পড়াশুনা করবি’ না চাকরি করবি’?”

ঠিক শুনতে পারিনি ওর কথা তাই জিজ্ঞেস করলাম, “কি বলছিস?”

মধুছন্দা জিজ্ঞেস করলো, “তুই কি এম টেক করবি’ না এর পরে চাকরি করবি’?”

উত্তরে বললাম, “না রে এখুনি চাকরি করার কোন মতলব নেই আমা’র। বি’ টেক করার পরে এম টেক, পি এইচ ডি রিসার্চ যা আছে সব করব আর বাড়ির অ’ন্ন ধ্বংস করব। বাবা জেঠার এত পয়সা খাবে কে? তুই কি করবি’?”

মিহি কণ্ঠে উত্তর এলো, “না রে, এই ইঞ্জিনিয়ারিং পর্যন্ত আমা’র দৌড় এর পরে আমা’কে চাকরি করতে হবে। মা’ অ’নেক কষ্টে এই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানোর টা’কা যোগাড় করেছে। এর পরে বাড়ির দায়িত্ত, ছোট ভাইকে পড়ানোর দায়িত্ত আমা’কেই সামলাতে হবে। দাদা বি’য়ে করে আলাদা হয়ে গেছে, বাড়িতে টা’কা দেয় না।”

বুঝতে পারলাম যে মধুছন্দার বাবা গত হয়েছেন, কণ্ঠে একটা’ না বলা অ’ব্যক্ত বেদনা ফুটে উঠলো ওর, বেশ কিছু দূর দুইজনেই চুপচাপ থাকলাম।

গাড়ির গোঁগোঁ আওয়াজ বড় একঘেয়ে লাগছিলো তাই আবার আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “পুজোতে আমা’দের এখানে আসবি’? আমা’দের এখানে যাত্রা নাটক হয়”

উদাসিন কণ্ঠের উত্তর, “জানি না রে। ভাবছিলাম মা’মা’বাড়ি যাবো, অ’নেকদিন যাওয়া হয়নি।”

প্রশ্ন করলাম, “তোর মা’মা’বাড়ি কোথায়?”

উত্তর এলো, “জলপাইগুড়ি।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তুই নাটক যাত্রা পালা এই সব দেখিস?”

উত্তরে জানালো, “নাহ সেই সময় কোথায় আমা’র। কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে একগাদা টিউশন থাকে নিজের পড়াশুনা থাকে এই সবে সময় চলে যায়।২

প্রশ্ন করলাম, “আজকে টিউশন ছিলো না?”

উত্তর এলো, “তোর আর অ’নুর টা’নাটা’নিতে আজকে আর হল না, শনিবার ওদের পড়িয়ে দেব খানে।”

সেই সময়ে মেয়েদের সামনে গোঁফে তা দিয়ে সিগারেট খাওয়া খুব বড় ব্যাপার। মনের এক কোনে সেই অ’ভিপ্রায় জেগে উঠলো তাই বাইক দাঁড় করালাম একটা’ পানের দোকানের সামনে। বাইক থামা’তেই মধুছন্দা কারন জিজ্ঞেস করলো, আমি জানালাম যে একটা’ সিগারেট ধরাবো। পকেটে দুটি চারমিনার পরে আছে একটা’ বের করে ধরাতে যাবো তখন মধুছন্দা আমা’কে চারমিনার খেতে বারন করলো।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কি হল, তুই ও কি আমা’কে সিগারেট খেতে দিবি’ না?”

হেসে জবাব দিল, “আমি না বললে তুই শুনবি’ না, তবে ওই সাদা কাগজে মোড়া বি’ড়ি ধরাস না, ওর গন্ধ বড় বি’টকেল। এই নে এক টা’কা, অ’ন্য কোন সিগারেট নিয়ে আয়।”

আমা’র চক্ষু চড়ক গাছ, “তুই আমা’কে সিগারেট খাবার পয়সা দিবি’!”

হেসে জবাব দিল, “জানি জানি তোদের বরাদ্দ বাবদ কত হা’ত খরচ। আজকে পার্স ঝেড়ে পাঁচ টা’কা ট্যাক্সি ভাড়া দিয়েছিস, তোর পকেটে কোন পয়সা নেই সেটা’ জানা আছে।”

অ’নু আর ছোড়দি আমা’র ব্যাঙ্ক কিন্তু সেই কথাও যে অ’নু ওকে বলে দেবে সেটা’ ভাবি’নি। আমি মনে মনে অ’নুর মুন্ডপাত করলাম কিন্তু ওর কাছ থেকে টা’কা নিয়ে সিগারেট খাব সেটা’ ঠিক মনে ধরলো না। তাই ওই চারমিনার ধরালাম।

ওর একটু অ’ভিমা’ন হলো আর অ’ভিমা’নিনী কণ্ঠে আমা’কে বললো, “অ’নুর কাছ থেকে টা’কা নিতে তোর বাধে না, তাহলে আমা’র কাছ থেকে কেন বাধে?”

কি করে ওকে বুঝাই, অ’নুসুয়া আর ওর মধ্যে আকাশ পাতাল তফাৎ। অ’নু আমা’র বান্ধবী, আমা’র দিদি, আমা’র বোন আমা’র অ’নেক কিছু, আর মধুছন্দা এখন পর্যন্ত ঠিক কোন পর্যায় এসেছে সেটা’র ঠিক নেই।

আমি হেসে জবাব দিলাম, “আজকে ট্যাক্সিতে তোর টা’কাও গেছে, কালো তোর পয়সায় আমা’কে সিগারেট খাওয়াস।”

উত্তরে বললো, “না অ’নু আমা’কে পয়সা দিতে দেয়নি।” ঘড়ির দিকে দেখে আমা’কে বললো, “এবারে একটু তাড়াতাড়ি চল, বাড়িতে মা’ একা চিন্তা করবে।”

আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, “মা’সিমা’কে ফোন করে দিয়েছিস তাহলে এত চিন্তা কেন?”

আমা’র মা’থার পেছনে আলতো চাঁটি মেরে জবাব দিল, “তাই বলে কি এই কোলকাতার রাস্তায় তোর সাথে রাত কাটা’বো?”

আমি ওকে হেসে বললাম, “এবারে বুঝলি’ তোর আর অ’নুর মধ্যের তফাৎ। আমি নবীন অ’নু যদি কোথাও এক রাত কাটিয়ে আসি অ’থবা এক বি’ছানায় শুয়ে থাকি তাহলেও ঘুম ছাড়া গল্প ছাড়া কিছু হবার নেই অ’থবা কেউ আমা’দের দিকে আঙ্গুল পর্যন্ত তুলবে না।”

আমি বাইকে বসে পড়লাম, এবারে আগের সেই জড়তা ভাব কাটিয়ে আমা’র কাঁধে হা’ত রেখে বসল। ওই চাঁপার কলি’ আঙ্গুলের ছোঁয়ায় আমা’র শরীরের সহস্র ধমনীতে রক্ত প্রবাহ শত গুন বেরে গেল। বাইক চালি’য়ে সেন্ট্রাল এভিনিউ দিয়ে যেতে যেতে মনের মধ্যে গান বেজে উঠলো।

আমি ওকে বললাম, “মা’মা’বাড়ি না গেলে চলে আসিস আমা’দের এখানে। অ’নু তো থাকবেই, তোর কোন অ’সুবি’ধে হবে না।”

মৃ’দু হেসে উত্তর দিল, “হ্যাঁ অ’নু থাকবে, ভয় তো আর ওকে নিয়ে নয়। ভয় অ’তি অ’চেনা একটা’ বাঁদরকে নিয়ে। হঠাৎ করে যদি আমা’কে খামচে দেয় তাহলে কি হবে?”

এই মস্করার একটা’ যথাযথ উত্তর না দিতে পারলে আর হচ্ছে না। আমি ওকে বললাম, “বাঁদর কে খোঁচালে তবেই বাঁদর কামড়ায়, হঠাৎ করে কোন জড় বস্তুর ওপরে বাঁদর আচমকা হা’মলা করতে যাবে কেন?”

খোঁচাটা’ বেশ হয়েছে তাই খিল খিল করে হেসে বলে, “কে বলেছে আমি জড় বস্তু?”

আমি উত্তরে বললাম, “কলেজে তো সাত চড়ে রা করিস না।”

উত্তরে বললো, “আমি ওই রকম বেশি কথা বললে বাচাল বলে মনে হয়। তাই নিয়ে মা’মা’বাড়িতে আমা’কে সবাই নাক উঁচু বলে ভাবে। কিন্তু কি করার আছে বল?”

এর উত্তরে কিছু বলার নেই আমা’র। বেহা’লা, শখেরবাজার চলে এল, বড় রাস্তায় নামিয়ে দিতে হল ওকে বাড়ির সামনে যদি বাইক থেকে নামে তাহলে আবার পাড়ার কেউ দেখে ফেলতে পারে আর সেই নিয়ে কথা শোনা। আমিও বেশি জোর করলাম না ওকে। যাই হোক দুইজনের মধ্যের জড়তা একটু কেটেছে, আষাঢ়ের মেঘ কেটে শরতের পরশ লেগেছে। চলে যাবার আগে বেশ কিছুক্ষণ আমা’র কাছে দাঁড়িয়েছিলো। কিছু শোনার অ’পেক্ষায় না কিছু বলার অ’পেক্ষায়?

আমি তাও আগ বাড়িয়ে বললাম, “এই টুকু ছেড়ে দিলে হতো না? রাত নটা’ বাজে একা একা যেতে পারবি’ তো?”

মিষ্টি হেসে জবাবে বললো, “এই টুকু যাবার ক্ষমতা আছে। এই সময়ে তোর সাথে বাড়ির সামনে নামলে অ’নেকের ভুরু কুঁচকাতে পারে। আর হ্যাঁ, কালোকে ইনরগ্যানিকের নোটস দিস তো।”

“ঠিক আছে” বলে দাঁড়িয়ে থাকলাম যতক্ষণ না সাপের মতন বেনুনি দুলি’য়ে ওই গলি’র বাঁকে হা’রিয়ে গেল মধুছন্দা।

রোদে ভেজা তিলোত্তমা’ (#০৫)

সকালে বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে অ’নুর প্রশ্ন, “কি ব্যাপার, সব ঠিকঠাক? রাতে ঘুম হয়েছে?”

না, সেই রাতে আমা’র দুই চোখে ঘুম আসেনি, সারা রাত বি’ছানায় জেগে কাটিয়েছিলাম। আমা’র সারা গায়ে যেন মধু মধু গন্ধ মিশে ছিলো। ডান কাঁধে যেখানে হা’ত রেখে সারা রাস্তা এসেছিলো মনে হচ্ছিল এখন পর্যন্ত সেইখানে ওই কাঁধে চাঁপার কলি’ আঙ্গুল রাখা।

দিন যায় আর ভোরের ফুটন্ত শিউলি’র মতন ধীরে ধীরে জড়তা কাটিয়ে কবে দুইজনে বেশ মিশে গেলাম সেটা’র ঠিক নেই। সবার চোখের আড়াল হলেও অ’নু ঠিক বুঝেছিলো আমা’দের দুইজনের মা’ঝের ওই অ’দৃশ্য বন্ধন। সর্ব সমক্ষে চোখে চোখ রেখে কথা বার্তা বলতে সাহস পেত না মধুছন্দা তবে ওই কলেজের মধ্যে একটু দেখা একটু কথা বলা অ’থবা বাস স্টা’ন্ডে দাঁড়িয়ে বাড়ি যাওয়ার আগে একটু গল্প করা পর্যন্ত আমা’দের সময় সীমা’ সীমিত ছিলো। কোনোদিন যদি বলতাম আজকে একটু দেরি করে বাড়ি গেলে হয় না? হেসে জবাবে বলতো বাসে চেপে বাড়ি পর্যন্ত যেতে। আর তার ফলে যাদবপুর থেকে বেহা’লা বাসে চেপে যাওয়া আর গল্প করা। কিছু একটা’ অ’ছিলায় অ’নুকে ক্ষান্ত করতে হতো, কিন্তু ওর শ্যেন নজর এড়ান বড় মুশকিল। কিছুতেই সময় করে মধুছন্দাকে একা পাওয়া যায় না, অ’নু না হয় শ্যামলী না হয় বনানী কেউ না কেউ ওর সাথে সবসময়ে থাকে। কলেজ শেষ হলেই সোজা বাড়ির দিকে হা’ঁটা’ দেয়। বুঝি এই বয়সে মা’থায় অ’নেক চিন্তা আর সেই কারনে ওকে কোনোদিন জোর করার ভাবনা আমা’র মা’থায় আসেনি।

দেখতে দেখতে কাছে এসে গেল বি’শ্বকর্মা’ পুজো। আমিও ছোড়দির পার্স ঝেড়ে কুড়ি টা’কা জমিয়ে ফেললাম, এবারে একান্তে কোথাও একটা’ যেতেই হবে ওকে নিয়ে।

কলেজের পরে মধুছন্দাকে এক দিকে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললাম, “বি’শ্বকর্মা’ পুজোর দিনে বেড়াতে যাবি’?”

প্রশ্ন করলো রমণী, “কে কে যাবে?”

আমি আকাশ থেকে পড়লাম, আমি কিনা ওকে নিয়ে একা কোন জায়গায় বেড়াতে যেতে চাই, ওদিকে মধুছন্দা সবাইকে নিয়ে যেতে চায়। বার কয়েক ঢোঁক গিলে ওকে বললাম, “শুধু আমি আর তুই।”

চশমা’র আড়াল থেকে বড় বড় কাজল টা’না চোখে আমা’র দিকে শ্যেন দৃষ্টি হেনে বললো, “মোটেই নয়। অ’নু, দেবাশিস, পরাশর সবাইকে ডেকে নিলেই হয় সবাই বেশ মজা করতে করতে যাবো। সবাই যদি যায় তাহলে যেতে রাজি আছি।”

আমি ওকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, “এ কিরে সবাই কেন?”

অ’ন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে মিচকি হেসে বললো, “ওই যে বলেছিলাম না, একটা’ বাঁদর কে ভরসা করা বড় দুস্কর সেই কারনে।”

আমি মা’থা চুলকে বললাম, “একা অ’নু যেতে পারে অ’ন্য কেউ নয়।”

মুখ খানি লাল করে হা’সি চেপে আমা’র দিকে তাকিয়ে বলে, “থাক আর ওই বেচারাকে কষ্ট দিয়ে লাভ নেই। কোথায় নিয়ে যাবি’ আমা’কে?” কাছে এসে বাজুর ওপরে চিমটি কেটে বললো, “সবার কাছ থেকে লুকিয়ে নিয়ে গিয়ে অ’ন্য কিছু করার মতলব নেই তো তোর?”

খুব ইচ্ছে করছিলো ওকে ওইখানে জরিয়ে ধরে চেঁচিয়ে বলি’, লুকিয়ে রাখবো বুকের মধ্যে কারন তুই অ’মূল্য। ওর দিকে ঝুঁকে বললাম, “অ’নেক দূরে কোথাও যাবো, তবে এখন ঠিক করিনি কোথায়।”

ওর চোখ দুটো ভাসা ভাসা হয়ে উঠলো পাশ ঘেঁসে দাঁড়িয়ে বললো, “তুই থাকবি’ পাশে তাহলে যেতে রাজি।”

সেদিন ওকে ছেড়ে থাকতে ইচ্ছে করছিলো না কিন্তু বাসে চেপে ওর বাড়ি পর্যন্ত সারা রাস্তা একদম চুপচাপ। ওর বাড়ির বাস স্টা’ন্ডে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। সন্ধে তারার সাথে সাথে একে একে রাস্তার বি’জলী বাতি জ্বলে উঠলো। সময়টা’ যদি দাঁড়িয়ে যেত সেদিন তাহলে বড় ভালো হত।

অ’নেকক্ষণ চুপ থাকার পরে লাজুক হেসে জিজ্ঞেস করলো, “শাড়ি পরবো না সালোয়ার কামিজ?”

আমি একটু ওর দিকে ঝুঁকে গেলাম আর সঙ্গে সঙ্গে ও পেছনে সরে গিয়ে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো। নাকে ভেসে এলো ওর গায়ের মিষ্টি গন্ধ সেই গন্ধ বুক ভরে টেনে নিয়ে বললাম, “কাপড়ে কি আসে যায় তুই যা পরবি’ তাতেই সুন্দরী দেখাবি’।”

হা’ত বাড়ালাম ওর হা’তের দিকে কিন্তু এপাস অ’পাস দেখে হা’ত টেনে মিষ্টি হেসে বললো, “আজ আসি, পরশু তাহলে ন’টা’য় এস্প্লানেড ট্রাম ডিপোর সামনে দেখা হচ্ছে।”

দুইদিন পরে সকাল সকাল বেড়িয়ে পড়লাম বাড়ি থেকে। বাড়িতে বললাম যে বন্ধুদের সাথে মা’য়াপুর ঘুরতে যাচ্ছি। জেঠিমা’ জিজ্ঞেস করেছিলো যে অ’নু নবীন যাচ্ছে কি না। আমি বলেছিলাম যে না ওরা যাচ্ছে না তবে অ’ন্যরা যাচ্ছে। বাড়ি ফিরতে রাত হবে সেটা’ জানিয়ে দিলাম। অ’নু আর নবীন জিজ্ঞেস করলে কিছু একটা’ বলে দেওয়া যাবে। ঠিক ঘড়ি দেখে সাড়ে আটটা’ নাগাদ এস্প্লানেড বাস স্টা’ন্ডে পৌঁছে গেলাম। জানি আধা ঘন্টা’ আগেই পৌঁছেছি তাও মন মা’নে না, একটু কি তাড়াতাড়ি আসতে পারে না? এই ভেবে ট্রাম ডিপোর কাছে দাঁড়িয়ে একটা’ সিগারেট ধরালাম।

ঠিক তখন কাঁধে হা’ত পড়লো, “সেই চারমিনার? আমা’র সাথে থাকলে ওই চারমিনার ছাড়তে হবে। ওর গন্ধ মোটেই আমা’র ভালো লাগে না বলে দিচ্ছি।”

পেছন ঘুরে দেখি মধুছন্দা একটা’ কচি কলাপাতা রঙের শাড়ি পরে সেই সাথে কপালে ছোট সবুজ রঙের টিপ আঁকা। আমি দাঁড়িয়ে থ বনে গেলাম।

আমা’র থ হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে একটু লজ্জায় পড়ে গেল, “কি হলো? সব ঠিকঠাক না কিছু বলবি’?”

আমতা আমতা করে আধা পোড়া সিগারেটে শেষ টা’ন মেরে বললাম, ” মা’নে চল।”

আমা’র বাঁ পাশ ঘেঁসে রাস্তা পার হয়ে হা’ঁটা’র সময়ে চাঁপার কলি’ নরম আঙ্গুলে ছোঁয়া লাগলো। সেই মুহূর্তে একটা’ ট্যাক্সি ধাঁ করে সামনে দিয়ে বেড়িয়ে গেল। আচমকা ট্যাক্সি এসে যাওয়াতে আমি ওর হা’ত ধরে আমা’র পেছনে করে দিলাম আর ও আমা’র জামা’ খামচে ধরলো ভয়ে।

দাঁত কিড়মিড় করে ট্যাক্সির মুন্ডপাত করতে করতে বললো, “এই পাঞ্জাবী ট্যাক্সিওয়ালা গুলোকে না মা’রতে ইচ্ছে করে।”

আমি ওকে শান্ত করে বললাম, “ছাড় ওই ট্যাক্সিকে। বল এখন কোথায় যাবি’?”

হা’ত উলটে উত্তর দিল, “আমি কি জানি কোথায় যাবো, তুই কোথায় নিয়ে যাবি’?”

বাস স্টা’ন্ডে সবুজ রঙের সারি সারি সরকারি দূরপাল্লার বাস দাঁড়িয়ে। এদিক অ’দিক তাকিয়ে মা’থা চুলকে বেশ খানিক্ষন ভেবে বললাম, “গঙ্গা অ’নেক দেখলাম, এবারে ইচ্ছামতি দেখলে কেমন হয়?”

ভুরু কুঁচকে আমা’র দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “এখানে ইচ্ছামতি নদী কোথায়?”

উত্তর দিলাম, “বাংলাদেশ বর্ডারের কাছে হা’সনাবাদ, যাবি’?”

ক্ষণিকের জন্য মধুছন্দার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, গাঢ় গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলো, “না, ইছামতী নদী দেখার কোন শখ নেই আমা’র। তুই যদি অ’ন্য কোথাও নিয়ে যাস তাহলে যেতে রাজি না হলে আমি বাড়ি চললাম।”

ওর সুন্দর মুখের হঠাৎ পরিবর্তনের কারন ঠিক বুঝতে পারলাম না। কিন্তু দুই ফর্সা কান লাল হয়ে উঠলো সেই সাথে নাকের ডগা লাল হয়ে উঠলো। আমি এই টুকু বুঝলাম যে ওই ইছামতী নদীর সাথে ওর পুরানো কোন ব্যাথা জড়িয়ে। আমি আর ওকে ঘাঁটা’লাম না।

বললাম, “আরে না না একবার বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পড়েছি এখুনি বাড়ি ফিরলে মুশকিল হয়ে যাবে। তোর যখন ইচ্ছে নেই তাহলে মা’য়াপুর নবদ্বীপ ঘুরে আসি।”

চুপচাপ আমা’র পেছন পেছন বাসে উঠে পড়ল। বাস ছেড়ে দিল, কিন্তু মধুছন্দা মুখ নিচু করে জানালার পাশে বসে রইলো। দুই চোখ ছলছল দেখে আমা’র বুকের ব্যাথা শত গুন বেড়ে গেল।

কাঁধে আলতো ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কি হয়েছে তোর, হঠাৎ এমন থম মেরে গেলি’ যে?”

কালো মেঘের ছায়া সরিয়ে মিষ্টি হেসে জবাব দিল, “কই কিছু না, কিছুই হয়নি।”

বাস ততক্ষণে মধ্যমগ্রাম ছাড়িয়ে ছুটে চলেছে হা’ইওয়ে দিয়ে। জানালা থেকে মিষ্টি রোদে ওর সারা মুখ ভিজে গেল, এক অ’নাবি’ল স্বাধীনতার আনন্দে চিকচিক করে উঠলো ওর চোখ দুটো।

আমা’র পাশ ঘেঁসে বসে মিহি কণ্ঠে বললো, “এতদিন পরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আজকে খুব ভালো লাগছে।”

আমি ওকে বললাম, “তোকে একা পাওয়া খুব দুষ্কর সবসময়ে কেউ না কেউ তোর চারপাশে মা’ছির মতন লেগে থাকে।”

উত্তর এলো, “কার কথা বলছিস, অ’নু?”

আমি বললাম, “ওর কথা ছাড় দিকি।”

বারে বারে এক গুচ্ছ চুল ওর মুখের ওপরে এসে দোল খেয়ে যাচ্ছিল আর সেই দুষ্টু চুলের গোছাকে সামলে মিচকি হেসে উত্তর দিল, “ওর নাক কিন্তু বড় কঠিন কিসে না কিসে গন্ধ শুঁকে ঠিক বের করে নেবে যে আমরা মা’য়াপুর গেছিলাম।”

আমি ওর কাঁধে আলতো ধাক্কা মেরে জিজ্ঞেস করলাম, “অ’নু জানলে কি কোন অ’সুবি’ধে আছে?”

নিজের আঙ্গুল গুলো নিয়ে খেলতে খেলতে বললো, “না সে নেই, তবে…..”

আমা’র ভেতরে অ’ট্টহা’সির কলরব ফেটে পড়ার জোগাড়, জানি অ’নুকে একদিন জানাতেই হবে না জানালে আমা’দের প্রেমের পরিণতি কি হবে সেটা’ বলা কঠিন। বাবা জ্যাঠা কাকার সামনে কোন ভাই বোনের আওয়াজ শোনা যায় না, ওদিকে মা’ কাকিমা’র সামনে প্রায় এক রকম অ’বস্থা। একমা’ত্র যদি জেঠিমা’কে হা’তে করা যায় আর সেটা’ সম্ভব ছোড়দি আর অ’নুকে দিয়েই হবে।

রোদে ভেজা তিলোত্তমা’ (#০৬)

দুপুর নাগাদ কৃষ্ণনগর পৌঁছে গেলাম সেখান থেকে বাস বদল করে মা’য়াপুর যেতে হবে। গ্রাম্য রাস্তা দিয়ে গ্রামের লোক বোঝাই বাসে চেপে দুপুরের একটু পরেই মা’য়াপুর পৌছালাম। বি’লি’তি মন্দির তখন সম্পূর্ণ তৈরি হয়নি, ইট কাঠ বালি’ পাথর বোঝাই মন্দির প্রাঙ্গনে। আশেপাশে অ’নেক ছোট ছোট মন্দির আমা’দের অ’বশ্য সেই সব দেখার বি’শেষ বালাই ছিলো না। দুইজনে শুধু মা’ত্র কোলকাতার নাগপাশ ছাড়িয়ে নিভৃতে একে অ’পরের সান্নিধ্য খুঁজতে এসেছিলাম এই গঙ্গাবক্ষে। তাও রমণীর মন্দির দেখা চাই। শেষ পর্যন্ত নৌকায় চেপে গঙ্গা পার করে নবদ্বীপে গিয়ে নিতাই গৌরাঙ্গের মন্দির দেখা হল রিক্সায় চেপে। এই মন্দির দেখা, ঠাকুর প্রনাম করা আমা’র কোনোদিন পোষাতো না। বাড়িতে কালী পুজো হতো বটে, তবে সবার মা’ন রেখে বি’গ্রহের সামনে করজোড়ে বসে থাকতাম। বাঙালি’র পালা পার্বন প্রত্যেক মা’সেই লেগে থাকে আর আমা’দের বাড়ি এইসবে খুব মা’নে। মধুছন্দা সেই রকমের মেয়ে, যেখানে দেখল একটা’ মন্দির অ’থবা বটতলায় একটা’ পাথর আর কিছু ফুল রাখা, সেখানেই দাঁড়িয়ে চটি খুলে ঢিপ করে একটা’ প্রণাম ঠোকা ওর চাই। সেই সাথে জোর করে আমা’কেও করজোড়ে দাঁড়াতে হতো ওর পাশে।

মনে মনে ওর মুণ্ডপাত করতে করতে বললাম, “সবই তো এটম ইলেক্ট্রনের সমা’গম, আচার্য জগদিশ চন্দ্র প্রমা’ন করে দিয়েছেন যে গাছের প্রাণ আছে এখন বল তুই কাকে ছেড়ে কাকে প্রনাম করবি’।”

জনা কুড়ি মন্দিরে ঢুকে প্রনাম করে কপালে সিঁদুরের টিপ নিয়ে ওর কপাল রক্ত ললাটের মতন দেখাচ্ছিল। কিছুটা’ সিঁদুর ওর চশমা’ ওপরে আর ওর নাকের ডগায় পড়েছিলো।

সেই রক্তিম আভাময় মুখ খানি নিয়ে আমা’র দিকে তাকিয়ে বললো, “তোর যদি এতই সমস্যা হয় তাহলে এইখানে নিয়ে এলি’ কেন? অ’ন্য কোথাও যাওয়া যেতে পারতিস, এই ধর কাকদ্বীপ, ডায়মন্ড হা’রবার, রায়চক যেখানে খুশি।”

সত্যি বলতে জানিনা কেন মা’য়াপুরের কথা মনে হয়েছিলো সেদিন। তবে ওর মুখ খানি দেখে মনে হয়েছিলো যে রায়চক, ডায়মন্ড হা’রবার না গিয়ে মা’য়াপুরে এসে ওর যেন বেশি ভালো লেগেছে।

বি’কেলের আগেই আমা’দের ফিরতে হবে। ফিরে যাওয়ার আগে গঙ্গার পাড়ে দুইজনে একটু বসে পড়লাম। পায়ের নিচে ঠাণ্ডা গঙ্গার জল ছলকে ছলকে উঠলো আর নদীর ঠাণ্ডা বাতাসে ওকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করলো। কখন যেন অ’জান্তেই ওর হা’ত উঠে এলো আমা’র হা’তের ওপরে, আমা’র বাম বাজু খানা নিজের হা’তের মধ্যে নিয়ে বাম কাঁধে মা’থা রেখে দূর চোখ রেখে কোথায় যেন হা’রিয়ে গেল মধুছন্দা। ওর ওই খেই হা’রা ভঙ্গিমা’ ভাঙতে বড় কষ্ট লাগলো আমা’র।

অ’নেকক্ষণ না অ’ল্পক্ষণ ঠিক নেই, অ’নেক দূর থেকে ভেসে আসা আওয়াজ এলো আমা’র কানে, “জানিস কেন ইছামতী দেখতে যাই নি।”

কিছুক্ষণ চুপ থাকার পরে কাঁপা গলায় ওর বি’গত দিনের কাহিনী শুনলাম, “হা’সনাবাদের ওই ইছামতীর ওই পাড়ে আমা’দের বাড়ি ছিলো, সাতক্ষীরার এক গ্রামে। পূর্ববঙ্গ তখন জ্বলতে শুরু করেছে দাউদাউ করে। গ্রামের পর গ্রাম রক্তে লাল হয়ে উঠেছিলো ধুসর রঙের মা’টি। সত্তরের এক অ’ঘ্রায়নের গভির রাত। একদল মা’নুষ গভির রাতে আমা’দের গ্রামে চরাও হল। আমা’দের গ্রামে হিন্দু সংখ্যা যাও ছিলো, তার অ’নেকেই আগেই এই পাড়ে চলে এসেছিলো। কিন্তু আমা’দের গ্রামের আজমল চাচা আমা’দের যেতে দিল না, বাবাকে বললো যে এই মা’রদাঙ্গা কিছু দিনের মধ্যে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। কিন্তু সেই আগুন আর নেভার নাম নিল না প্রতিদিন প্রতিনিয়ত বেড়ে উঠলো। সেই রাতে আজমল চাচা আর নজরুল ভাই লাঠি নিয়ে আমা’দের বাড়ির দাওয়ায় দাঁড়িয়ে। কিন্তু ওই দুষ্কৃতির দলকে রোখা গেল না। ওরা জোর করে আজমা’ল চাচাকে সরিয়ে দিয়ে আমা’দের বাড়ি চড়াও হল। ততক্ষণে নজরুল দাদা আমা’র দাদাকে পিঠে নিয়ে আমা’কে আর মা’কে নিয়ে বাড়ির পেছন থেকে বেরিয়ে মা’ঠ ধরে দৌড়াতে শুরু করে দিল। আমি মা’য়ের কোল জাপ্টে ধরে মুখ গুঁজে পড়ে রইলাম, সুধুমা’ত্র দূরে হইহই মা’রামা’রির আওয়াজ শুনতে পেলাম। বাবা আমা’দের সাথে আসতে পারেনি, আজমা’ল চাচা বাবাকে নিজের বাড়িতে ধানের গোলায় লুকিয়ে রেখেছিলো। অ’নেক কষ্টে রেল স্টেশানে পৌঁছে দিয়েছিলো নজরুল ভাইজান। তারপরে ট্রেনে করে শিয়ালদা। তিনদিন তিনরাত পেটে এক দানা পড়েনি, শুধু মা’ত্র কলের জল ছাড়া।”

ওর কথা শুনতে শুনতে আমা’র গলা শুকিয়ে গেল। আমি বড় হয়েছি প্রাচুর্যে, জন্মের পর থেকে সাদা ধবধবে নরম বি’ছানা আমা’র জন্য অ’পেক্ষা করেছে। নিজে হা’তে খেতে শিখেছি অ’নেক পরে, অ’নেক দিন পর্যন্ত বড়দি খাইয়ে দিত। রাতের খাওয়ার পরে শেষ পাতে মিষ্টি না হলে আমা’র খাওয়া শেষ হতো না, সেই জন্য কাকা রোজ দিন অ’ফিস ফেরত রসগোল্লা নিয়ে আসতো আমা’দের সবার জন্য।

কাঁপা কণ্ঠে মধুছন্দা ওর গল্প বলে চলল, “চারদিনের দিন ওই খালি’ পেটে দাদা কয়েক বস্তা মা’ল বয়ে চার আনা নিয়ে এলো, সেই চার আনায় এক খুড়ি মুরি আর একটু গুড় খেয়ে কাটা’লাম আমরা। ওই শিয়ালদা স্টেশানে আমা’দের মতন অ’নেকেই ছিলো, বানের জলে ভেসে আসার মতন বর্ডার থেকে যত ট্রেন আসত সব ট্রেনে গরু ভেড়া খেদানোর মতন মা’নুষে ভর্তি। কারুর মা’থা ফেটে গেছে, কারুর বাবা মা’রা গেছে, কারুর মা’ বোনের সাথে জোর জবরদস্তি করা হয়েছে। সব মা’নুষ ভিটে ছাড়া উদ্বাস্তু। সাতদিনের দিন একটা’ ট্রেনে চেপে আমা’র বাবা শিয়ালদা পৌছাল। বাবাকে দেখে সেকি আনন্দ, হা’তে যেন চাঁদ পেয়ে গেলাম। তারপরে শুরু হল কঠিন জীবন যাত্রা, কোথায় যাই কোথায় ঠাঁই পাবো তার কোন ঠিকানা নেই। স্টেশানের পাশের একটা’ ক্যাম্পে আমা’দের ঠাই হল। রোজ সকালে দাদাকে নিয়ে বেড়িয়ে যেত বাবা, সন্ধ্যে হলে কিছু না কিছু কিনে আনত খাবার জন্য। যা কিছু ছিলো সব এক রাতে খুইয়ে চলে এসেছিলাম তবে আজমা’ল চাচা বাবাকে বলেছিলো যে দাঙ্গা শেষ হলে ফিরে আসতে। কিন্তু ফিরে আর যাওয়া হলো না আমা’দের ভিটে মা’টি সাতক্ষীরায়।”

আমি ওর কাঁধের ওপরে হা’ত রাখতেই আমা’র দিকে সরে এলো, কাঁধে ওপরে মা’থা রেখে চোখ বন্ধ করে বসে রইলো কিছুক্ষণ। সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজতে চেষ্টা’ করলাম কিছুক্ষণ ধরে। নির্জন এই গঙ্গাবক্ষে ওকে এই প্রশস্ত বুকের মা’ঝে লুকিয়ে ফেলতে বড় ইচ্ছে করলো।

আমি ওকে সান্তনা দিয়ে বললাম, “ছাড় ওই সব কথা, অ’ন্য কিছু বল।”

চশমা’ খুলে চোখের কোল মুছে আমা’কে বললো, “তোদের সবার ক্ষোভ যে আমি চুপচাপ থাকি বেশি কথা বলি’ না। কাকে কি বলব বল? এতদিন চুপচাপ ছিলাম আর চুপ করেই থাকতাম যদি তুই না এসে আমা’কে নাড়িয়ে দিতিস।”

ওর মা’থার ঘন কালো চুলে নাক ডুবি’য়ে একটু ঘষে আলতো চুমু খেয়ে বললাম, “আমি আছি তোর পাশে তুই এত চিন্তা করিস না সব ঠিক হয়ে যাবে।”

আমা’র হা’ত খানি বুকের কাছে নিবি’ড় করে জড়িয়ে ধরে নাক ঘষে বললো, “আমা’র সব থেকে বড় ভয় সেখানেই। শুকনো বালি’র মতন যেটা’কে আঁকড়ে ধরতে যাই তাই আঙ্গুলের ফাঁকা দিয়ে পিছলে যায়।”

আমি ওকে বললাম, “কেন এইসব উল্টো পালটা’ চিন্তা ভাবনা করছিস? বাড়ি ফেরার ইচ্ছে আছে না নেই।”

আমি মজা করে বলি’নি, অ’থবা আমা’র কোন শয়তানি অ’ভিপ্রায় ছিলো না ওই বার্তার মধ্যে। কিন্তু মধুছন্দা চোখ মুছে দুষ্টুমি ভরা হা’সি নিয়ে তাকিয়ে বললো, “এতো তাড়াতাড়ি এক সাথে রাত কাটা’বার ইচ্ছে নাকি শয়তান ছেলে?” দুম করে বুকের ওপরে একটা’ কিল বসিয়ে দিয়ে বললো, “ধরতে এলে কিন্তু কামড়ে দেব তোকে!”

আমি ওকে জড়িয়ে ধরতে যেতেই হা’ত ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে খিলখিল করে হেসে দিল। সাথে সাথে আমিও উঠে ওর হা’ত ধরে ফেললাম, “পালাবি’ কোথায় এখানে আমি আর তুই ছাড়া আর কেউ নেই?”

লজ্জায় লাল হয়ে গেল ওর ফর্সা গোল মুখ। হা’ত ছাড়ানোর দুর্বল প্রচেষ্টা’ চালি’য়ে গেল কিছুক্ষণ কিন্তু ততক্ষণে ওকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে এলাম। মিহি কণ্ঠে বারেবারে বলতে লাগলো, “প্লি’স ছেড়ে দে।”

আমা’র শরীরের সহস্র ধমনীতে রক্তের মা’তন লেগেছে, সেই সাথে মধুছন্দার তপ্ত শ্বাসের ঢেউয়ে আমা’র বুক ভেসে যাচ্ছে। ডান হা’তে ওর পাতলা নরম কোমর জড়িয়ে নিবি’ড় করে কাছে টেনে নিলাম। শরীরের সাথে শরীর মিশে গেল, বুকের ওপরে পিষে গেল দুই নরম কুঁচ। ধীরে ধীরে মুখ নামিয়ে আনলাম ওর মুখ মন্ডলের কাছে। চশমা’র পেছনে দুই চোখ শক্ত করে বন্ধ করে নিচের দিকে তাকিয়ে রইলো। ওর সারা শরীর উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে, আমা’র বাহু পাশে ছটফট করে চলেছে এক সর্পিল কন্যে। আমি তর্জনী দিয়ে ওর থুঁতনি ছুঁয়ে আমা’র দিকে ওর মুখ উঠিয়ে আনলাম। ওর লাল নরম ঠোঁট জোড়া তিরতির করে কাঁপতে শুরু করে দিল আসন্ন অ’ধর মিলনের আশঙ্কায়। ঠোঁট জোড়া ছুঁতেই ওর ঠোঁট খুলে গেল। ওর হা’ত উঠে এলো আমা’র জামা’র কলারে, প্রাণপণ শক্তি দিয়ে আমা’র জামা’র কলার খামচে ধরলো। আর সেই সাথে আমা’দের দুই জোড়া ঠোঁট মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। এই গঙ্গাবক্ষ আমা’দের এই মিলনের সাক্ষী হয়ে রইলো আদি অ’নন্ত কালের জন্য।

বাকি সারাটা’ রাস্তা ওর মুখ দিয়ে কোন বুলি’ ফুটলো না। বাসে উঠে আমা’র হা’ত খানা কোলের কাছে শক্ত করে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। এক বারের জন্য আমা’র দিকে চেয়ে তাকালো না। বুঝতে বাকি রইলো না যে লজ্জায় আর আমা’র দিকে তাকানোর শক্তি নেই। বাস থেকে নেমে আবার বাসে চেপে ওর বাড়ি পর্যন্ত গেলাম, ততক্ষণে রাত ঘনিয়ে এসেছে কোলকাতার বুকে। এবারে আর বাস স্টা’ন্ড নয়, হা’ঁটতে হা’ঁটতে ওদের পাড়ার গলি’র মুখ পর্যন্ত চলে গেলাম। পাশাপাশি হেঁটে ছিলাম তবে হা’ত ধরতে পারিনি। গলি’র মুখে এসে আধো আলো আধো অ’ন্ধকারে আমা’র মুখের দিকে তাকালো। সারা মুখে রক্তিম প্রেমের আভা সেই অ’ন্ধকার ম্লান করে দিল।

আমা’র হা’তের ওপরে চিমটি কেটে বললো, “কামড়াতে পারলাম না তাই চিমটি কেটে শোধ নিলাম।”

চিমটি খেয়ে সম্বি’ত ফিরলো। না, যা হয়েচে সেটা’ সত্যি সত্যি হয়েছে, কোন স্বপ্ন নয়, “উরি বাঃবা, এই ভাবে কেউ চিমটি কাটে নাকি? এক কেজি মা’ংস তুলে নিলি’ যে?”

কাছে এসে মিহি কণ্ঠে বললো, “আর তুই আমা’র সম্মতি না নিয়ে কি করে দিয়েছিস সেটা’র কি হবে?”

ওর হা’ত টেনে কাছে আনতে যাবো, কিন্তু সর্ব সমক্ষে সেটা’ করা ভীষণ বি’পদ, তাই একটু তফাতে দাঁড়িয়েই বললাম, “এই চিমটির দাম তোর কাছ থেকে সুদে আসলে উসুল করব কিন্তু।”

দুষ্টু মিষ্টি অ’নুরাগ দেখিয়ে বললো, “এর পরে আসিস, সত্যি যদি না কামড়িয়েছি তাহলে আমা’র নাম বদলে নিস।”

আমিও কম গেলাম না, “এখুনি নাম বদলাতে রাজি, ছন্দা।”

নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে লজ্জা সংবরণ করে বললো, “অ’নেক হয়েছে, এবারে বাড়ি যা। পয়সা আছে না দিতে হবে?”

আমি মিচকি হেসে জবাব দিলাম, “না না আছে।”

ছেড়ে যেতে কিছুতেই ইচ্ছে করছিলো না আমা’র, তাও রাতের গভীরতা দেখে আমা’কে বললো, “আমি আসি তাহলে।”

আমি ওইখানে দাঁড়িয়ে রইলাম যতক্ষণ না বাড়ির গেট খুলে বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেল। বাড়ি ফিরলাম এক ঘোরের মধ্যে, চারপাশের সব কিছু কেমন রঙ্গীন, রাস্তার বি’জলী বাতি সেদিন যেন বেশি করে জ্বলছে, আশেপাশের সব মা’নুষ বেশ খুশি, এই পৃথিবীতে দুঃখ কষ্ট যেন সব উধাও হয়ে গেছে। সেই রাতে আমা’র আর ঘুম হল না, তিন তলার আমা’র ঘরের জানালা দিয়ে আকাশ দেখে কাটা’লাম আর খোলা চোখে দেখলাম এই সুন্দরী জলপরীকে। পরের দুই দিন আমা’র সাথে ঠিক ভাবে কথা পর্যন্ত বলেনি ছন্দা। কালো ভ্রমরের মতন ওর পেছনে লেগে ছিলাম কিন্তু মুখের বুলি’ ফুটা’তে পারিনি।

দুই দিন পরে আমা’কে জানিয়েছিলো যে সেই রাতে ওর ঘুম হয়নি। সারা রাত জেগে আকাশের তারা গুনেছিলো।

রোদে ভেজা তিলোত্তমা’ (#০৭)
যদিও ষষ্টি থেকে কলেজের ছুটি কিন্তু মহা’লয়ার পর থেকেই আমা’দের কলেজে আসা এক প্রকার বন্ধ হয়ে গেল আর সেই সাথে মধুছন্দার সাথে নিয়মিত দেখা হওয়া বন্ধ হয়ে গেল। এমন দুষ্টু মেয়ে শেষ দিনে বলে পর্যন্ত গেল না কোলকাতায় থাকবে না জলপাইগুড়ি যাবে। অ’নু ঠিক শুঁকে শুঁকে গন্ধ পেয়ে গেল আমা’দের ব্যাপারে আর তারপর থেকেই আমা’র পেছনে লাগতে শুরু করে দিল। ওকে জিজ্ঞেস করলেই খ্যাপাতে শুরু করে দেয়, আমি যে ঘোড়া ডিঙ্গিয়ে ঘাস খেয়েছি তাই ছন্দার কোন ব্যাপারে আমা’কে কিছুই জানাতে রাজি নয়। ওই পুজোতে আমা’র ঘাড় ভেঙ্গে এক জোড়া জুতো কিনলো। জুতো কিনতে যাবার দিনেও ওকে কত অ’নুরোধ করলাম একবারের জন্য ছন্দাকে ডেকে নিতে, কিন্তু শয়তানি হা’সি দিয়ে জানিয়ে দিল যে ছন্দার কোন খবর ওর কাছে নেই। আমা’দের বাড়িতে একটা’ই টেলি’ফোন ছিলো, সেই টেলি’ফোন আবার এক তলার বৈঠক খানায়। একবার রিং বেজে উঠলে সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ে, কার ফোন এলো কার ফোন এলো। ওই বারোয়ারি ফোন থেকে প্রেমা’লাপ করা কেন সামা’ন্য কথা বলা অ’সম্ভব ব্যাপার। বাবা জ্যাঠা কাকা ছাড়া বি’শেষ কারুর ফোন আসতো না। মা’ঝে মা’ঝে দুর্গাপুর থেকে বড়দির ফোন আসতো, আর সেই সময়ে বড়দির সাথে কথা বলার জন্য লাইন লেগে যেত।

বাবা জেঠা পুজোর কর্তা, কিন্তু আমা’দের মা’নে আমি, নবীন, বি’ষ্টু, বাপ্পা এদের মা’থায় সব কাজের ভার এসে পড়তো। ডেকোরেটা’রের কাছে দৌড়ানো থেকে রান্নার লোক খোঁজা। মা’ জেঠিমা’র বয়স হয়েছে, রান্নায় যোগদান দিলেও একটু আধটু হা’তা খুন্তি নাড়া ছাড়া বি’শেষ কিছুই করতে পারে না। মা’ জেঠিমা’র পরের প্রজন্মের হা’তে তখন রান্নার ভার, কিন্তু আমা’র কাকিমা’ হেঁসেলে যায় না বললেই চলে। নন্দ কাকিমা’ আর অ’নুর ছোট কাকিমা’ শ্রেয়সী, আজকাল রান্নার তদারকি করে, তবে জেঠিমা’র হা’তের পায়েস আজও অ’মৃ’ত। সবাই পাত চেটে খেয়ে যায়।

চতুর্থীর আগের রাতে শিব মন্দির মা’ঠের পাশের তাল দীঘির ঘাটে আমি নবীন দেবু আর বাপ্পা আয়েশ করে সিগারেট টা’নছি। মন্দির মা’ঠের একপাশে দুর্গা মন্ডপ অ’ন্য দিকে যাত্রা পালার জন্য মঞ্চ বাঁধা হয়েছে। মন্টু গুপ্ত আসতে পারবে না কিন্তু হা’তিবাগানের এক নামকরা নাট্য কম্পানি অ’ষ্টমীর রাতে যাত্রা পালা করতে আসছে। ওদিকে দেবুর ঘ্যানর ঘ্যানর আরো বেড়ে গেল।

সিগারেটে টা’ন মেরে দেবু কানের কাছে ভ্যান ভ্যান করে বললো, “প্লি’স পুটু, আমা’র একটা’ হিল্লে করে দে।”

আমি বললাম, “কি হয়েছে, নিজে থেকে বলতে কেন পারিস না।”

দেবু মিন মিন করে বললো, “কথা বলতে গেলেই তেড়ে আসে যে, কি করে মনের কথা বলি’ বলতো। অ’ত দামী একটা’ হা’তির দাঁতের লকেট দিলাম, তাও যে সুন্দরীর মন গলাতে পারলাম না।”

নবীন একটু তফাতে বসে ছিলো সেই খান থেকে চেঁচিয়ে বললো, “আমা’দের দুইজন কে আমিনিয়ায় ভালো করে খাওয়া তবে ভেবে দেখবো।”

দেবু ওর ওপরে খেপে গিয়ে বলতো, “শুয়োর রোজ দিন এক প্যাকেট চারমিনার মা’রিস, তাতেও তোর মন ভরে না?”

আমি ওকে বললাম, “এক কাজ করিস, এবারে পুজোতে আমা’দের পাড়ায় চলে আসিস। একটা’ হিল্লে হয়ে যাবে তোর।”

বাপ্পা ওকে জিজ্ঞেস করলো, “শালা পাড়ার মেয়েকে হা’তিয়ে নিয়ে বেড়িয়ে যাবি’, আমরা কি পাবো, লবডঙ্কা?”

নবীন হঠাৎ সিগারেট ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে দেবুর দিকে শান্ত অ’থচ গম্ভীর ভাবে তাকিয়ে বললো, “শোন দেবু, অ’নুকে বুঝাতে পারি বলতে পারি এই মা’ত্র, তবে জোর করবো না। যদি অ’নু মেনে নেয়, তাহলে বি’য়ে পর্যন্ত তোদের পাশে থাকবো, ওর বাড়িকে মা’নিয়ে নেওয়ার দায়িত্ত আমা’র আর পুটুর। কিন্তু একটা’ কথা মনে রাখিস। কোনোদিন যদি অ’নুর চোখে জল দেখেছি, কাল হোক কি ত্রিশ বছর পরে হোক, যেখানে থাকবি’ সেখানে গিয়ে তোকে কেটে ওইখানে পুঁতে রেখে আসবো।”

অ’নু আমা’দের চোখের মণি সেটা’ দেবু সেদিন হা’ড়ে হা’ড়ে টের পেল। নবীনের মুখে ওই গুরু গম্ভীর বার্তা শোনার পরে গুম মেরে গেল। আমি ওকে দুইজনকে শান্ত করে বললাম, যে জীবনের এখন অ’নেক বাকি কে কখন কোথায় কি অ’বস্থায় থাকবে সেটা’র ঠিক নেই। ভবি’ষ্যৎ নিয়ে এখুনি মা’থা ব্যাথা করে কোন লাভ নেই, সময়কে তার নিজের প্রবাহে ছেড়ে দেওয়া বুদ্ধিমা’নের কাজ।

পঞ্চমীর দিন বি’কেলেই বড়দি আর ভাগ্নে ভাগ্নি বাড়িতে এসে গেল। বাড়ির সব থেকে ছোট ভাগ্নি, বুবাই থপথপ করে সারা ঘর ময় ঘুরে বেরায়। নবীন আসলেই ওর বেশি মজা কারন নবীন ওকে নিয়ে ঘুরতে যায়, কোল্ড ড্রিঙ্কস কিনে দেয়, কাঁধে করে মেলায় নিয়ে যায়। নৈহা’টি থেকে বড় মা’মা’ সবার জন্য নতুন কাপড় নিয়ে এসে গেছে, বড় মা’মা’ মা’নে জেঠিমা’র বড় ভাই, সেই সকলের বড় মা’মা’। নৈহা’টিতে খুব বড় কাপড়ের দোকান, আমা’দের বাড়ির অ’ধিকাংশ জামা’ কাপড় মা’মা’র দোকান থেকেই আসে, কথায় আছে মা’মা’ বাড়ির আবদার সেটা’ই খাটা’ই তাঁর ওপরে।

ক্লাস টেনের পরে আর চক্ষু দান দেখা হয়ে ওঠেনি আমা’দের। ছোড়দি একবার আমা’কে জিজ্ঞেস করলো চক্ষু দান দেখতে যাবো কি না। কিছু একটা’ ভেবে শেষ পর্যন্ত যাবো বলে ঠিক করলাম।

খাওয়া দাওয়া সেরে রাত এগারোটা’ নাগাদ মন্ডপের দিকে হা’ঁটা’ দিলাম, যাওয়ার আগে নবীন আর বাপ্পাকে ডেকে নিলাম। দুইজনে আমা’কে জিজ্ঞেস করলো অ’নুকে ডাকতে, আমি জানিয়ে দিলাম পাড়ার পুজো ইচ্ছে হলে আসবে না ইচ্ছে হলে আসবে না আমি কারুর পায়ে তেল মা’খিয়ে ডাকতে যেতে পারছি না।
ওদিকে নন্দন পাল রঙ তুলি’ নিয়ে তৈরি, চক্ষু দান দেখতে অ’নেকেই এসেছে। ধিরে ধিরে কাঁপা কাঁপা হা’তে মা’য়ের মুখের ওপর থেকে কাপড় সরিয়ে নন্দন পাল সরু তুলি’ দিয়ে চোখ আঁকা শুরু করে দিলেন। প্রায় ছয় বছর পরে মা’য়ের প্রতিমা’র চক্ষু দান দেখে মন হা’রিয়ে গেল, আপনা হতেই মা’থা নুইয়ে এলো ওই কাঠ মা’টির বি’গ্রহের সামনে। মা’টির প্রতিমা’ আর মা’টির রইলো না, প্রানবন্ত হয়ে উঠে দশ হা’তে নির্মল চোখে আমা’দের সবার দিকে তাকিয়ে আশীর্বাদ করছেন।

আলতো হা’তের ছোঁয়াতে সম্বি’ত ফিরে এলো সেই সাথে নাকে ভেসে এলো অ’তি পরিচিত সুবাস। কানে এল অ’তি পরিচিত অ’তি আকাঙ্খিত কণ্ঠস্বর, “যতই এটম ইলেকট্রন হোক না কেন, এই মা’টির বি’গ্রহের মহিমা’ আলাদা, তোর মা’থা ঠিক নুয়াতেই হলো।”

আমি অ’বাক হয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখি ছন্দাকে সাথে নিয়ে আমা’র পেছনে অ’নু দাঁড়িয়ে। অ’মি কিছু বলতে যাবার আগেই অ’নু আমা’কে চুপ করে থাকতে বললো কারন আমা’র বাবা আর জেঠা মশায় মন্ডপে এসে গেছেন, সেই সাথে বেশ কয়েকজন কর্তা ব্যাক্তি। কালো প্রারম্ভ পুজো শুরু হবে কয়েক ঘন্টা’ পরেই। আমি এপাশ অ’পাশ তাকিয়ে চুপচাপ মন্ডপ থেকে বেড়িয়ে এলাম, সবার চোখ আড়াল করে পেছন পেছন ছন্দাও বেড়িয়ে এলো।

আমি ওকে অ’ন্ধকারে টেনে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “তোর কি ব্যাপার বলত? বলা নেই কওয়া নেই।”

আমা’র গালে আলতো চাপর মেরে বললো, “কেমন চমক দিয়েছি বল।”

আমি ওকে কাছে টা’নতে গেলাম কিন্তু কিছুতেই কাছে আসবে না, না না বলে লাজুক হেসে একটু তফাতে দাঁড়িয়ে বললো, “সেই বি’কেলে এসেছি আর অ’নুর ঘরের জানালা থেকে তোকে শুধু ঘর বাহির করতে দেখে গেলাম।”

আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, “একবার ডাক দিলেই পারতিস, ডাকলি’ না কেন?”

মিচকি হেসে বললো, “তাহলে এই চমকের কি মা’নে হতো?”

আমি বললাম, “যদি না আসতাম তাহলে কি করতিস?”

আমা’র কাছে সরে এসে বললো, “অ’নু প্লান করেই ছিলো, যদি তুই না আসতিস তাহলে ও তোকে জোর করে বাড়ি থেকে তুলে আনতো।”

আকাশ পানে তাকিয়ে বললো দুষ্টু মিষ্টি কণ্ঠে বললো, “তোর খুব ইচ্ছে ছিলো একসাথে রাত কাটা’নোর, দেখ তোর ইচ্ছে পুরন হয়ে গেল। আমি আর তুই একা এই রাতে এই খোলা আকাশের তলায়।”

আমি ওর কাঁধে আলতো ধাক্কা মেরে বললাম, “একা যখন তখন নিশ্চয় সংকোচ বোধ চলে গেছে।”

ভুরু কুঁচকে আমা’র দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো, “মা’নে?”

আমি ওকে হেসে বললাম, “মা’নে আর কি, আমি আর তুই একা নির্জনে নিভৃতে কি হতে পারে সেটা’ বুঝে নে।”

এই বলেই ওর হা’ত ধরে টেনে আনলাম। টা’ল সামলাতে না পেরে আমা’র শরীরের ওপরে ঢলে পরে গেল আর সেই সাথে আমি ওর কোমর জড়িয়ে বুকের কাছে টেনে নিলাম। আধো আলো অ’ন্ধকারে ওর চোখ দুটি চকচক করে উঠলো, সেই সাথে আমা’র মনে হল ওকে পিষে দেই। ওদিকে ঢাকের বাদ্যি বেশ জোরে বেজে উঠলো, মা’থা নামা’তে গিয়েও আর নামা’ন হল না ঠোঁটের জায়গায় ওর নরম গালের ওপরে চুম্বন এঁকে ক্ষান্ত হতে হলো।

কোনোরকমে আমা’র বাহুপাশ ছাড়িয়ে আমা’কে একটু ঠেলে দিয়ে বললো, “দিনে দিনে খুব শয়তান হয়ে যাচ্ছিস তুই।”

ঠিক সেই সময়ে অ’নু এসে গেল আর ধড়মড় করে ছন্দাকে ছেড়ে আমি একটু তফাৎ দাঁড়িয়ে পড়লাম। অ’নু আমা’দের দুইজনকে দেখে হেসে বললো, “সারা রাত কি এখানে দাঁড়িয়ে থাকবি’ না বাড়ি যাবার ইচ্ছে আছে? এই ছন্দা, দেড়টা’ বাজে কিন্তু।”

ছন্দার অ’বস্থা ত্রিশঙ্কুর মতন। একদিকে আমি মুখ কাঁচুমা’চু করে দাঁড়িয়ে, অ’ন্য দিকে অ’নু ডাক দিচ্ছে বাড়ি ফেরার জন্য। আমা’র একদম ইচ্ছে ছিলো না যে অ’নু ছন্দার সাথে চলে যাক আর সেই এক ভাবব্যাক্তি ছন্দার সারা চেহা’রায় ফুটে উঠেছিলো, বুঝতে পারলাম যে বি’ধি বাম। আমি অ’নুকে অ’নুরোধ করলাম যে পরে ছন্দাকে বাড়ি পৌঁছে দেবো।

ছন্দা মুখ কাচুমা’চু করে অ’নুর কাছে গিয়ে বললো, “দয়া করে কিছু একটা’ কর।”

অ’নু ওর গাল টিপে মিচকি হেসে বললো, “বাঃরে, এতদিন গাছে জল দিলাম আমি, বড় করলাম আমি আর একদিনে এসে টুক করে ফল পেড়ে খেয়ে নিলি’? ওইসবে ভবি’ ভুলবে না, কিছু ঘুষ দিতে হবে!”

আমি অ’নুকে বললাম, “এই মেলা বাজে বকিস না, তোকে জুতো কিনে দিয়েছি আর তুই এইটুকু করতে পারবি’ না?”

অ’নু আমা’কে বললো, “ঠিক আছে কিন্তু খুব সাবধানে। মন্ডপে কিন্তু বাড়ির অ’নেকে বসে আছে। একটু পরে কাল প্রারম্ভ শুরু হবে এই ঘাটে কিন্তু জেঠিমা’ আর মা’ জল ভরতে আসবে।”

আমি মা’থা নাড়িয়ে বললাম, “হুম বড় সমস্যা বটে। তোদের চিলেকোঠা ঘরে গিয়ে আড্ডা মা’রা যেতে পারে।”

শেষমেশ তাই ঠিক হলো। ওদের চিলেকোঠা ঘরে আড্ডা মা’রা যাবে। অ’নু এক দৌড়ে আমা’র ছোড়দিকে জানিয়ে এলো যে আমি রাতে ওদের বাড়িতে থাকবো। আমা’দের বাড়ির কেউ ছন্দাকে চিনতো না, তাই অ’নুর সাথে ওদের বাড়ি যাওয়াতে কারুর মনে কোন সন্দেহ হলো না।

রোদে ভেজা তিলোত্তমা’ (#০৮)

অ’নুর বাড়ির দিকে যেতে যেতে আমি অ’নুকে বললাম, “তোর সাথে একটু কথা আছে।”

অ’নু জিজ্ঞেস করলো, “কি কথা?”

আমি ওকে দেবুর ঘ্যানঘ্যানানির কথা, নবীনের সাবধান বাণী সব খুলে বললাম। সব কিছু শুনে অ’নু চুপ করে গেল, বেশ কিছুক্ষণ কোন কথা বললো না। তারপরে আমা’কে বললো একবার নবীনকে ডেকে দিতে। আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ওর মনের ভাব বুঝতে চেষ্টা’ করলাম কিন্তু কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না। আমা’কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঠ্যালা মেরে বললো তাড়াতাড়ি যেতে আর নবীনকে ডেকে আনতে। আমি নবীন কে ডাকতে গেলাম, নবীন কে বললাম যে অ’নুকে দেবুর কথা বলেছি কিন্তু অ’নু একবার ওর সাথে দেখা করতে চায়। আমা’র কথা শুনে নবীন আমা’কে জানিয়ে দিল যে যা বলার অ’নুকে সব যখন আমি বলেই দিয়েছি তাহলে ওর আর কিছু বলার নেই। আমি পড়লাম মহা’ মুশকিলে, এই দুইজনের মধ্যে আবার কি ফল্গু ধারা চলছে? যাই হোক পেছনে তাকিয়ে দেখি ছন্দা আর অ’নু দাঁড়িয়ে।

অ’নু হা’জার প্রশ্ন মা’খা চাহনি নিয়ে নবীনকে জিজ্ঞেস করলো, “তোর কি কিছু বলার আছে?”

মা’টির দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে জবাব দিল, “পুটুর কাছ থেকে সবই তো শুনেছিস, আবার আমা’কে জিজ্ঞেস করছিস কেন?”

দুইজনে চুপ, ছন্দা আমা’র দিকে তাকিয়ে এক অ’দ্ভুত হা’সি দিয়ে চুপ থাকতে বললো। আমি ওই দুজনার দিকে কিংকর্তব্যবি’মুঢ়ের মতন চেয়ে রইলাম।

বেশ কিছুক্ষণ পরে অ’নু হেসে ওকে বললো, “তুই নাকি দেবু কে কেটে ফেলবি’ বলেছিস?”

সেই শুনে নবীন জবাবে বাঁকা হা’সি দিল, “আমি চাই তুই ভালো থাক তাই বলেছি। এর চেয়ে বেশি কিছু বলার নেই।”

বুক ভরে শ্বাস নিল অ’নু, তারপরে ছন্দার হা’ত ধরে বললো, “চল, বাড়ির দিকে চল।”

নবীন ওইখানে একা দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ তারপরে অ’ন্ধকারে কোথায় যেন হা’রিয়ে গেল।

বাড়ির পথে যেতে যেতে অ’নু, ছন্দাকে জড়িয়ে ওর গালে চুমু খেয়ে আমা’কে বললো, “তোদের দেখার পরে জীবনে একবারের জন্য প্রেম করতে বড় ইচ্ছে করছে।”

ছন্দা হেসে ওকে বললো, “তুই কি আর সত্যি আমা’দের জন্য অ’পেক্ষা করেছিলি’? তোর নিজেরই ঠিক নেই দেবুকে হ্যাঁ বলবি’ না না বলবি’।”

অ’নুকে কোনোদিন লজ্জা পেতে দেখিনি, কিন্তু ওইদিন মেয়েটা’ লাজুক হেসে আমা’কে বললো, “আগেকার কথা ছেড়ে দে। দেবুর সাথে ঝগড়া করতাম এই কারনে কেননা ওর বুকে সেই পাটা’ নেই। বি’য়ের পরে দেখলাম ওকে আমা’কেই খাইয়ে দিতে হচ্ছে।”

কথায় গল্পে অ’নুর বাড়ি যেন খুব তাড়াতাড়ি চলে এলো। বাড়ি ঢুকতেই অ’নুর ছোট কাকিমা’ আমা’কে দেখে জিজ্ঞেস করলো যে আমি রাতে থাকবো কি না। আমি মা’থা নেড়ে জানিয়ে দিলাম যে রাতে এই বাড়িতেই থাকবো। ছোট কাকিমা’ একবার আমা’দের তিনজনের দিকে তাকিয়ে অ’দ্ভুত এক হা’সি দিয়ে বললো যে আমি যেন এক তলার বসার ঘরের পাশের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ি। আমি কিছু বললাম না, আমি কি এখানে ঘুমা’তে এসেছি নাকি?

কাকিমা’ চলে যেতেই অ’নু আমা’কে নিয়ে পা টিপে টিপে দুতলায় উঠে এলো। ওর ঘর দু’তলার বারান্দার একদম শেষে। অ’নু ছন্দাকে নিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল, আর আমা’কে বললো ছাদের চিলেকোঠার ঘরে চলে যেতে। আমি ওর দিকে চোখ রাঙ্গিয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম যে এত রাতে এখানে আমি ঘুমা’তে আসিনি ওই দিকে ছন্দা মিচকি হেসে আমা’র দিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বেনুনি দুলি’য়ে চলে গেল। আমি কিংকর্তব্যবি’মুঢ়ের ন্যায় ওই সিঁড়িতে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম তারপরে চুপচাপ চারতলার চিলেকোঠার ঘরে চলে গেলাম।

এই ঘরটা’য় কেউ শুতে আসে না, এই ঘরে বরাবর ছেলেদের আড্ডা জমে। বি’শ্বজিৎদার বন্ধু, মেজদার বন্ধু, মা’ঝে মা’ঝে আমি নবীন পিতু এসে এখানে মেজদার সাথে আড্ডা মেরে বি’ড়ি খেয়ে যাই। পকেটের শেষ সিগারেটটা’ ওই মন্ডপে শেষ করে এসেছিলাম। আমি ঘরে ঢুকে এদিক ওদিকে খুজে একটা’ আধা পোড়া সিগারেট পেলাম আর সেটা’কে জ্বালি’য়ে ছাদে চলে এলাম। ছাদের কার্নিশে বসে পা দুলি’য়ে আয়েশ করে পোড়া সিগারেটে বেশ কয়েকটা’ টা’ন দিলাম। মা’থার ওপরে গাঢ় নীল আকাশে পেঁজা তুলোর মেঘের ভেলা, এদিক অ’দিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মেঘের মা’ঝে হা’জার হা’জার তারায় আলোকিত আকাশের বুক।

পায়ের শব্দে চোখ তুলে দেখি শাড়ি ছেড়ে অ’নুর একটা’ মা’ক্সি পরে ছন্দা দাঁড়িয়ে। আমি উঠে দাঁড়িয়ে ওর কাছে গেলাম।

একটা’নে আমা’র হা’তের পোড়া সিগারেট ফেলে দিয়ে মুখ ঝামটা’ দিয়ে বললো, “আর যদি এই সব টেনেছিস তাহলে কিন্তু চলে যাবো। শেষ পর্যন্ত কি না পোড়া বি’ড়ি?”

এমনিতে সাত চড়ে রা কাড়ে না, বন্ধু বান্ধবীদের সাথে থাকলেও বেশি কথা বলে না, নতুন মা’নুষের সামনে একদম মুখে কুলুপ আঁটা’। কিন্তু যদি কেউ আমা’দের অ’ইদিন রাতে দেখতো তাহলে বুঝতো যে ছন্দা আসলে কত কথা বলতে পারে। বি’গত পাঁচদিনের কথা আর গল্প যেন আর ফুরায় না, ওর পুরানো দিনের গল্প ওর বাড়ির গল্প, যে ছেলে মেয়ে গুলোকে পড়ায় তাদের বাঁদরামোর কথা ওর ভাইয়ের কথা আরও কত নি। ওর ব্যাপারে অ’নেক কিছু জানা গেল, ওর ভাই, সত্যজিত ওর চেয়ে বছর দশেকের ছোট, পড়াশুনায় খুব ভালো, ভাইয়ের জন্মের এক বছরের মধ্যেই ওর বাবা গত হন। বাবা আগে এস এস কে এম হা’সপাতালে কিছু একটা’ কাজ করতেন, বাবা মা’রা যাওয়ার পরে ওর মা’ এস এস কে এম হা’সপাতালে আয়ার চাকরি পায়, তারপরে নার্সিং পড়ে সেই হা’সপাতালে নার্স হয়ে যান। কতক্ষণ ওই ভাবে দুইজনে গল্প করেছিলাম সে ঠিকানা নেই।

দূর থেকে শাঁখের আওয়াজ শুনে বুঝতে পারলাম যে কাল প্রারম্ভ শুরু হয়েছে আর একটু পরেই বোধন পুজো শুরু হবে। কিছু পরে চোখ ডলতে ডলতে অ’নু এসে আমা’দের একটু বকাঝকা দিল।

ছন্দার মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই যে সারা রাত জেগে ওর চোখ দুটো তখন চকচক করছে আর একটু বসলে কি এমন হয়ে যেত। কিন্তু অ’নুর জন্য সেখানেই ক্ষান্ত হল আমা’দের গল্প। ছন্দা চলে যাওয়ার পরে চিলেকোঠার ঘরের তক্তপোষে শুয়ে শুয়ে ভাবতে শুরু করলাম যে সব ঠিক কিন্তু বাড়িতে কি করে বলবো যে প্রেম করেছি আর ওই মিস মধুছন্দা সমা’দ্দারকে মিসেস মধুছন্দা চট্টোপাধ্যায় করতে চাই। যাক সে সব না হয় পরে ভাবা যাবে।

সেবার পুজোর সময়ে ছন্দা দুই দিন ছিলো অ’নুর বাড়িতে। একমা’ত্র সেই রাতে ছোট কাকিমা’ ছাড়া আর কেউ আমা’দের একসাথে দেখেনি তাই অ’নু ছোট কাকিমা’কে হা’তে করে নিয়েছিলো। সর্বসমক্ষে ছন্দা অ’নুর বান্ধবী আমা’দের কেউ নয় আমরা চিনিনা, সুতরাং না আমি না নবীন কেউ দিনের আলোতে ওর সাথে কথা বলতে পারতাম না। অ’বশ্য দিনের বেলায় অ’নেক কাজ থাকত আমা’দের, পুজোর মন্ডপে বসা, খাওয়া দাওয়া তদারকি করা ইত্যাদি। আগে এই সব বি’শ্বজিৎদা, আকাশদা অ’রা করত এখন আমা’দের ঘাড়ে। মা’ঝে মা’ঝে ফুলটুসির মতন সেজে গুজে দুইজনে এসে দেখা দিয়ে যেত কিন্তু দিনের আলোতে সেই পর্যন্ত দৌড় ছিলো। রাতের লোকজনের ভিড়ে একটু সময় পেতাম ওর সাথে গল্প করার আর সেই গল্প চলতো অ’নেক রাত পর্যন্ত। অ’ষ্টমীর দিনে সকালো বেলাতেই মধুছন্দা বাড়ি চলে গেল। নবীন বি’শ্বজিৎদার বাইকে করে ওকে বাড়ি ছেড়ে দিয়ে এসেছিলো।

অ’ষ্টমীর দিনে দেবুকে ডাকলাম, ওকে দেখে অ’নু এমন ভাব দেখালো যেন ওর জন্য প্রতীক্ষা করেছিলো সারা জীবন ধরে। ওদের কথার শুরু সেই একটা’ ঝগড়া দিয়েই, কেন দেবু নিজে থেকে বলতে পারেনি এতোদিন সেই নিয়ে ওদের কথা কাটা’কাটি। আমি আর নবীন দেখলাম যে এবারে চার চোখ মিলে গেছে, আমে দুধে মিশে গেছে এবারে আঁঠির আর কি কাজ। ষষ্টির দিনে যেমন আমি অ’নুর বাড়ির চিলেকোঠা ঘরে রাত কাটিয়েছিলাম তেমনি অ’ষ্টমীর রাতে দেবু আর অ’নুকে নিয়ে আমা’র ছাদের ঘরে ছেড়ে দিয়েছিলাম। সারা রাত কি করেছিলো জানি না তবে এইটুকু প্রত্যয় ছিলো যে অ’নু ওকে হা’ত ধরা ছাড়া বেশি কিছু করতে দেবে না। অ’নুর আমা’দের বাড়িতে থাকা কোন ব্যাপার নয় তবে দেবুকে মা’ঝরাতে ঘরে ঢুকাতে হয়েছিলো আর সকালেই ওকে নবীনের বাড়িতে পাচার করে দিতে হয়েছিলো। আমি আর নবীন সারা রাত ধরে যাত্রা পালা দেখলাম। আমা’র বারেবারে শুধু মনে হয়েছিলো ইস যদি ছন্দা থাকতো আমা’র সাথে, তাহলে বেশ মজা হতো।

পুজো ভালোয় ভালোয় শেষ হলো। দশমীতে মেয়েদের দেবী বরন, সিঁদুর খেলা ইত্যাদি শেষ হয়ে যাওয়ার পরে বি’সর্জনের পালা। লরি করে গঙ্গার ঘাটে গিয়ে প্রতিমা’ বি’সর্জন দেওয়া হলো, সেদিন আর বাড়ি ফিরলাম না। সেদিন প্লাস্টিক কিনে সেই গিলে সবাই কুটির ঘাটে রাত কাটা’লাম। মা’ঝরাতে মেজদা মা’নে আকাশদার কি নাচ, সেদিন নবীন কে জোর করে মদ খাওয়ানো হলো। সবাই মিলে চেপে ধরে জিজ্ঞেস করলাম যে কবে প্রেম করবে, শালা মদে টোল হয়েও মুখ থেকে একটা’ কথাও বের করলো না।

বেশ কিছুদিন থেকে ছোড়দির জন্য ছেলে দেখা হচ্ছিলো, আর ঠিক কালী পুজোর আগেই বাড়িতে বোমা’ ফাটা’লো ছোড়দি। ওর কথা শুনে সবার চক্ষু চড়ক গাছ, এমন কি আমি আর অ’নু তো বি’শ্বাস করতে পারছিলাম না যে বি’শ্বজিৎদা আর ছোড়দি ডুবে ডুবে এত জল খেয়েছে। বাবার কাছে পড়তে এসে যে একদম ছোড়দিকে হা’তিয়ে নেবে সেটা’ ঠিক কেউ বি’শ্বাস করতে পারছিলো না। যা হোক দুই বাড়ির যেমন আম দুধের সম্পর্ক, তাতে ওদের এই ভালোবাসা মেনে নিতে কারুর কষ্ট হল না।

বড় জামা’ইবাবু ডিভিসি তে ইঞ্জিনিয়ার, এবারে আরেক জামা’ই হল ডাক্তার। চাপ পড়ে গেল মেজভাই শুভদিপ আর ছোটভাই অ’নির্বাণের ওপরে। মেজ ভাই এতদিন গায়ে হা’ওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াতো, আগে আমা’র ওপরে চাপ ছিলো ডাক্তার হও ডাক্তার হও। ঠাকুরদা বড় ডাক্তার ছিলেন, বাবা ডাক্তার আর এই বাড়িতে একজন ডাক্তার হবে না? তবে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাওয়ার পরে আমা’র ওপরে সেই ক্ষোভ একটু কমে গিয়েছিলো।

অ’নু ছোড়দিকে বললো, “এই ছোড়দি, তোকে কিন্তু বৌদি বলে ডাকতে পারবো না, তোকে ছেদি বলে ডাকবো, চলবে ত?”

শুভ বললো, “এ কি রকম ব্যাপার? বউ কি হেঁটে হেঁটে স্বশুর বাড়ি যাবে নাকি?”

আমি বললাম, “তুই হা’গতে আসিস এই বাড়িতে আর ছুঁচাতে যাস ওই বাড়িতে।”

মেজদা মা’নে আকাশদা বললো, বর যাত্রীর জন্য বাস ভাড়া করতে হবে, কিছু না হোক নৈহা’টি মা’মা’বাড়ি থেকে ঘুরে আসবে বাস চেপে। বরযাত্রী কারা হবে, দুই বাড়ির লোকই তো বর যাত্রী আবার কনে যাত্রী দুটোই।

এসব নিয়ে কি হা’সাহা’সি। বি’য়ে ডিসেম্বরে কিন্তু দুই বাড়িতে সাজ সাজ রব পরে গেল। অ’নু বায়না ধরলো জামদানি দিতে হবে, তার কমে কিছু নয়। দুই বাড়িতে লোক সংখ্যা কম নয়, এক হা’ঁক পারলেই জনা চল্লি’শ লোক জড় হয়ে যাবে শুধু দুই বাড়ি মিলি’য়ে।

আমি ভাবলাম যে এই প্রেম ভালোবাসা নিয়ে যখন কারুর অ’মত নেই তাহলে আমা’দের সময় বি’শেষ কিছু অ’সুবি’ধে হবে না। ছন্দাকে সব খুলে বললাম, সব কথা শুনে ছন্দা হা’ঁফ ছেড়ে বললো, “তোর বাড়ি যা কড়া তাতে কখন কি হয় বলা একটু মুশকিল আছে। সময় হলে দেখা যাবে তবে বেশি দেরি করিস না যেন।”

আমি হেসে বললাম, “আরে না না, তুই অ’ত চিন্তা করিস না, সব ঠিক হয়ে যাবে। ছোড়দির পরে আমা’র নাম্বার আর তোকে মিসেস চট্টোপাধ্যায় করতে বি’শেষ দেরি হবে না।”

আমা’র কথা শুনে লজ্জায় কোথায় মুখ লুকাবে সে আর বুঝে পেল না।

চলবে…

নতুন ভিডিও গল্প!


Tags: , , , , , ,